ফন্ট সাইজ:
থিম:
একমুঠো সঙ্গীন প্রনয়াসক্তি

৫ম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা

সায়রের খামখেয়ালিতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাজে লেগে পড়ে অর্ণব। সে দু'দুটো করে মোট চারটে ইন্সট্যান্ট টেন্ট তৈরি করে প্রথমে, যাতে অরু, এলিসা কিংবা তার ছেলে আর্থারের থাকতে কোনো অসুবিধা না হয়। তারপর ক্যাম্পফায়ার জ্বালিয়ে এক হাতে কফি আর অন্য হাতে একটা দূরবীন নিয়ে বসে পড়ে চেয়ারের উপর। এমন একটা জায়গা বেছে নেয়, যেখান থেকে ওকে দেখা না গেলেও ফ্রন্ট ইয়ার্ড থেকে শুরু করে গেইট অবধি স্পষ্ট দেখা যায়।

সময় গড়ালো। বিষণ্ণ সন্ধ্যার ধূসর বর্ণে আরেকটু কালো গুলে হয়ে উঠলো গভীর রাত। একে তো চারিদিকে হাড়হীম করা ঠান্ডা, তার ওপর আকাশের গায়ে বিজলীর ঝলখানি। অর্তকিতে বজ্রপাত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। চোখের সামনে দ্বিখণ্ডিত আকাশ ফের মিলিয়ে যাচ্ছে তমশায়। এলোমেলো শীতল বাতাসের তোড়ে ক্যাম্পফায়ারের কমলা রঙের তীব্র অগ্নিশিখা ঢেউয়ের মতো দোল খাচ্ছে ইতিউতি। বৃষ্টি এলো বলে।

এরই মাঝে বিরাট বড় এক হকিস্টিক হাতে বেরিয়ে এলো এলিসা। অর্ণব ভ্রু কুঁচকালো। অদ্ভুত স্বরে প্রশ্ন করলো, 'এটা দিয়ে কি করবি?'

'পিটাবো।'

এলিসার দায়সারা জবাব।

'যেহেতু জেকে কে ফ্লাওয়ার বুকে পাঠায়, সে নিশ্চয়ই কোনো মেয়ে। না বুঝে রেগেমেগে আগেই মার শুরু করিস না, প্লিজ দোস্ত, না মনে বউ। আই রিকোয়েস্ট ইউ।'

অর্ণবের কথায় চুল পরিমাণ দমলো না এলিসা। হকিস্টিকটা কাঁধের উপর তুলে একটা বেজবল ক্যাপ মাথায় চাপিয়ে বললো, 'মেয়ে হোক আর যেই হোক, মে'রে তক্তা বানিয়ে দিবো আজ।'

এলিসার কথার পাছে অর্ণব উদ্বিগ্ন স্বরে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সায়রের কাইকুই আওয়াজ। কথা স্পষ্ট নয় তার। মনে হচ্ছে মুখের মধ্যে কাপড় ঠুসে তারপর কিছু একটা বলার বৃথা চেষ্টা করছে সে। সায়রের আওয়াজ পেয়ে তৎক্ষণাৎ ফ্রন্ট ইয়ার্ডের দিকে ছুটে গেলো ওরা দু'জন।

কাছাকাছি যেতেই শুনতে পেলো, 'ধোত, উমউম, ধতেচি ধতেচি।'

সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেলো এলিসা।

'কিহ বললো?'

এগিয়ে যেতে যেতে হতাশ গলায় বাক্য ছুড়লো অর্ণব, 'বলেছিলাম একটু কম কম খা। এখন গলায় আটকালো কার?'

অবশেষে ফ্রন্ট ইয়ার্ডে গিয়ে আসল কাহিনি উদ্ধার করতে পারলো ওরা। দেখলো, সায়র মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে দু'হাতের বাঁধনে শক্ত করে আবদ্ধ করে রেখেছে কাউকে। বান্দা এতোটাই জোড়ালো হাতে ধরেছে যে মেয়েটার দমবন্ধ হয়ে জিভ বেড়িয়ে আসার উপক্রম। অর্ণব ফাঁকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সায়রের পানে বিরস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, 'দোস্ত, ধরেছি ধরেছি, চোর ধরেছি। না মানে মেয়েটাকে ধরেছি।'

সায়র আনমনা হয়ে কথা বলছিল, সেই সুযোগে আচানক সায়রের বাহুতে নিজের দুপাটি দাঁত বসিয়ে দিলো মেয়েটা। ঘটনার আকস্মিকতায় সায়র ব্যথায় জর্জরিত হয়ে 'আয়ায়ায়া' করে চিৎকার দিতেই শ্বাসনালীতে খাবার আটকে গেলো তার। যার দরুন অসর্তকায় হাতের বাঁধন ছুটে গেলো তৎক্ষণাৎ। মেয়েটাও এবার সুযোগ বুঝে দৌড় লাগালো ফটাফট। কিন্তু শেষ যাত্রায় আর রক্ষা হলোনা তার। গেইট অবধি পৌছানোর আগেই অরু এসে অকস্মাৎ পথরোধ করে দাঁড়িয়ে পড়লো তার। আগন্তুকের মুখাবয়ব পরখ করে দু'চোখ জ্বলে উঠলো অরুর। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে উচ্চারিত হলো, 'সায়নী!'

পরক্ষণেই পেছন থেকে ভেসে এলো সায়রের করুন আর্তনাদ, 'এটা মেয়ে নাকি রাক্ষসী? হাতের অর্ধেক মাংস ছিড়ে নিয়ে গেলো আমার।'

'মিথ্যা কথা বলছিস কেন? চুপ থাক।'

সায়রকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে, পায়ে পায়ে সামনে এগিয়ে এলো এলিসা। নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে আড় চোখে পরখ করে অরুকে শুধালো, 'অরু, তুমি চেনো এই মেয়েকে?'

অরু নির্লিপ্তে মাথা নাড়ালো। কন্ঠে আক্রোশ ঢেকে জিজ্ঞেস করলো, 'কেন সায়নী? তুমি তো আমার ভালো বন্ধু।'

বাট আহ লাভ জেকে স্যার অরু তোমার আগে থেকে আমি তাকে

ভালোবাসি।'

ঝটিকা প্রবাহের মতোই অতর্কিতে কথাগুলো উগড়ে দিলো সায়নী।

'এ্যাইই!'

পাশ থেকে চোখ রাঙিয়ে গর্জে উঠলো এলিসা। তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি সায়নীকে রাস্তায় ফেলে মারবে সে। অর্ণব ওর কোমর আঁকড়ে ধরে পিছিয়ে নিলো দু'কদম। শান্ত করার প্রয়াসে বললো, 'প্লিজ এলি, ওদের কে কথা বলতে দে। আফটার অল দে আর ফ্রেইন্ডস।'

একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোঁসফাস করছে এলিসা, সেদিকে একপল দৃষ্টিপাত করে বুকের উপর দু'হাত ভাজ করে ঘুরে তাকালো অরু। সায়নীর পানে পূর্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত পিষলো সে।

'আর ইউ ইনসেইন সায়নী? হি হ্যাজ বিন লাভ উইথ মি ফ্রম ম্যানি ইয়ার্স এ্যাগো।'

'তুমি তো আর বাসো নি।'

সায়নীর একরোখা প্রত্যুত্তর। সঙ্গে সঙ্গে কোনো যৌক্তিক কথা খুঁজে পেলো না অরু। সহসা সায়নী জানালো, 'কিন্তু আমি বেসেছি। ভার্সিটিতে জয়েন হওয়ার পর থেকেই জেকে স্যারকে ভালোবেসে এসেছি আমি সেই শুরু থেকে স্যারকে ফুলও পাঠাই আমি।'

অরু উপহাস করে হাসলো। ক্রীতিকের ভালোবাসার উপর দৃঢ় বিশ্বাস অটুট রেখে শক্ত গলায় বললো, 'তোমার কি মনে হয়? ফুলের বুকে, গিফট, উইশকার্ড এসব পাঠালে জায়ান ক্রীতিক তোমার হয়ে যাবে? আমাকে বাদ দিয়ে তোমাকে ভালোবাসা শুরু করে দিবে?'

'মানুষ পরিবর্তনশীল অরু।'

সায়নীর কণ্ঠে দৃঢ়তা। অরু আবারও উদ্দেশ্যহীন হাসলো। অতঃপর বিদ্রুপাত্তক স্বরে বলে উঠলো, 'এখনো ভুলের মধ্যে আছো। তুমি তো আজ অবধি জানোই না যে তোমার জেকে স্যারের গোলাপে অ্যালার্জি হয়। তোমার পাঠানো শতশত গোলাপ যে আমার গেট ছাড়িয়ে বাড়ির সীমানায় প্রবেশ করার আগেই ট্র্যাসবীনে ফেরত যায়, সে হদিস কি রাখো তুমি সায়নী?'

সায়নীর ফর্সা চেহারায় আঁধার ঘনালো। অরু আবারও বলে উঠলো, 'যাও, আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম। যত খুশি ফুল পাঠাও, ইচ্ছে মতো অ্যাপ্রোচ করো, যদি জায়ান ক্রীতিক মুগ্ধ হয়ে একবার তোমার দিকে তাকায়, আমি অরু সেই মুহূর্তে তার জীবন থেকে সরে যাবো। আর যদি তা না হয়, তবে তুমি এসে নিজ থেকে ক্ষমা চাইবে আমার কাছে।'

অরুর এহেন কঠোর শর্তে হতভম্ব হয়ে গেলো ওরা সব। কারোর আর বুঝতে বাকি নেই যে ক্রীতিকের নাজুক, সরল, অষ্টাদশী অরু বড় হয়ে গিয়েছে। সে এখন ভালোবেসে চ্যালেঞ্জ নিতে জানে। অরুর কথার পাছে সায়নী শক্ত করে কিছু বলবে তার আগেই কোথা থেকে যেন একটা কালো বাইকের হেডলাইট জ্বলে ফের নিভে গেলো গেটের সামনে এসে। অরু সায়নী থেকে শুরু করে সকলের দৃষ্টি এখন গেটের অভিমুখে।

অন্ধকারের মাঝেই বাইক স্ট্যান্ড করে হেলমেট খুলে দাঁড়িয়ে পড়লো অবয়বটি। আলোর স্বল্পতায় ঝাপসা দেখাচ্ছে সবকিছু। আগন্তুকের মুখ দেখার উদ্বেগে বারবিকিউ চিবাতে চিবাতে আগ বাড়িয়ে গেটের কাছে এগিয়ে গেলো সায়র। অমনি ঝড়ের গতিতে ওর উপর ঝাপিয়ে পড়ে হুডির কলার চেপে ধরলো শক্ত দু'টো আক্রমণাত্মক হাত। আকস্মিক আক্রমণে গলার মধ্যে খাবার আটকে গেলো সায়রের, অসাবধানতায় বেঁকে গেলো তার কোমর। ভয়ে আতঙ্কে নাজেহাল হয়ে খুক খুক করে কেশে উঠতেই অন্ধকারের মাঝে ধ্বনিত হলো গম্ভীর এক হাস্কিস্বর, 'সায়রের বাচ্চা.... তুই এখানে? তাহলে আমার অরু কই?'

সায়র হাঁপাতে হাঁপাতে অস্ফুট স্বরে জবাব দিলো, 'ভাই, তুই এমন কেন? আমি কি জিপিএস মেশিন? যে যেনে বসে থাকবো তোর অরু কই। আশেপাশে খোঁজ আমাকে কেন ধরছিস?'

একটুবাদেই ক্যাম্পফায়ারের প্রগাঢ় অগ্নিশিখার কমলা আলোয় দৃশ্যমান হয়ে ধরা দিলো প্রতিক্ষিত সেই সুদর্শন পুরুষালি মুখখানি। অরু টের পেলো স্যান্ডাল উডের সেই স্নিগ্ধ সুবাসে ভরে উঠেছে চারপাশ। অকারণ এক মুগ্ধতা বসন্তের হাওয়ার মতোই এক নিমেষে ছুঁয়ে গেলো হৃদয়ের দগদগে কার্ণিশ। পরক্ষণেই চোখ ঘুরিয়ে সায়নীর পানে তীর্যক দৃষ্টিপাত করে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো রমণী। ক্রীতিক আসতে না আসতেই অরুর জন্য ছটফট শুরু করে দিয়েছি। এতো কেন ভালোবাসা? কি আছে অরুর মাঝে?

এবারও সায়নী থমথমে গলায় বলতে যাবে কিছু, তন্মধ্যে ওপাশ থেকে হাওয়ার বেগে ছুটে এসে ব্যগ্র থাবায় অরুর বুকের কাছের জামাটা খামছে ধরলো ক্রীতিক। জ্বলজ্বলে ক্রোধান্বিত দৃষ্টির অগ্নিশিখায় মেয়েটাকে ভস্ম করে দিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো, 'কি করেছিস?'

ক্রীতিকের বিচলিত নয়নে বিহঙ্গের মতো খুঁজে ফেরে থমকালো অরু। ভেতর থেকে কথা আসছে না। কণ্ঠনালির অগ্রভাগে প্রস্তরের মতো চেপে বসে আছে অভিমানের ঢেউ। চাপা কান্নায় ভিজে যাচ্ছে চোখ। অভিযোগ, বিস্ময়, অভিমানে ভর করে উচ্চারিত হলো অস্পষ্ট কিছু আওয়াজ, 'আ.. আব... তু.. তুমি।'

'এ্যাই চুপ্প! আমাকে দুর্বল করে এরিয়ে যাবি, সেটা ভাবলে ভুলের মধ্যে আছিস। কি করেছিস তুই আমার বাচ্চার সাথে? বল কি করেছিস?'

অরুর ছোট্ট শরীরটাকে দু'হাতে ঝাঁকিয়ে ধমকে উঠলো ক্রীতিক। অরুর অভিমানের পারদ আশ্চয্যের সীমানায় গিয়ে ঠেকলো। হতবিহ্বলিত স্বরে প্রশ্ন করলো, 'বাচ্চাকে কি করবো?'

বাক্য শেষ হতেই নিজ উদরে হাত বোলালো সে। ক্রীতিক সেটা দেখলো, অতঃপর চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টিপাত করলো অর্ণব এলিসার পানে। ক্রীতিকের রক্তিম চোখের দৃষ্টি দেখেই শুষ্ক ঢোক গিলে এলিসার পেছনে লুকিয়ে পড়লো অর্ণব। এলিসা ওকে মানানোর চেষ্টা করে বললো, 'তোকে কিছুতেই রিচ করতে পারছিলাম না জেকে। এদিকে তোর জন্য অরু কেঁদেকেটে একাকার। এই অবস্থায় এভাবে কান্নাকাটি তো মোটেই ঠিক নয় বল? তাই এভাবে মিথ্যা বলতে হয়েছিল। আমাদের মনে হয়েছিল একমাত্র বাচ্চার কথা বললেই তুই ছুটে আসবি। নয়তো তোকে খুঁজে পাওয়া আমাদের সাধ্যে নেই। ইট'স যাস্ট আ ওয়ে অব অ্যাপ্রোচ।'

থেমে থেকে কথাগুলো বলে, অপরাধী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো এলিসা।

ক্রোধ দমিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ক্রীতিক। হতাশার স্বরে আওড়ালো, 'তাই বলে আমার তিন মাসের অনাগত বাচ্চাটাকে নিয়ে এতো বড় মিথ্যাচার করবি তোরা? হাউ রুড এলিসা।'

'রুড! কে কাকে রুড শেখাচ্ছে এখানে? স্ট্রেইঞ্জ!'

নিরুদ্বেগ স্বরে কথাটা বলে ঠোঁট উল্টালো সায়র। কটমট চোখে তাকিয়ে ক্রীতিক কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো অরুর ক্রন্দিত কণ্ঠস্বর, 'আমার লাগছে জায়ান, ছাড়ুন।'

অরুর আকুতি শুনে ঘুরে তাকালো ক্রীতিক। অন্ধকারের মাঝে অসাবধানতায় কখন যে মেয়েটার নরম ত্বকে নখ দেবে গিয়েছে, খেয়াল করেছে একদম। রক্ত জমাট বেঁধে কালচে বেগুনির আবরণে ঢেকে গিয়েছে ফর্সা ত্বক। অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় সেদিকে দৃষ্টিপাত করেই ঝটকা খেলো ক্রীতিক। তৎক্ষণাৎ হাতের বাঁধন ঠিলে করে অপরাধী গলায় জানতে চাইলো, 'ব্যথা লেগেছে?'

অরু জবাব দিলোনা। তার দু'চোখে অব্যক্ত বেদনাশ্রু।

'খবরদার অরু, এটুকু ব্যথায় কাঁদবিনা একদম। বেবির কিছু হলে তোকে আজ মেরেই ফেলতাম আমি।'

ক্রীতিকের কণ্ঠে জমানো ক্রোধ। এখনো কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না সে। উত্ত্যক্ত মস্তিষ্কটা ছাইচাপা আগুনের মতো তেতে আছে। অতঃপর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর বন্ধুদের দিকে, যারা এই প্ল্যানের নাটেরগুরু। লম্বা দম ফেলে ত্যক্ত স্বরে বললো, 'এই একটা খবরে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম আজ বাড়ি ফিরে অরুকে ঠাটিয়ে এক চড় মারবো। কিন্তু আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার জীবনে আরও তিন তিনটে আপদ আছে।'

'শালা, মীরজাফর বলে কি? আমরা নাকি ওর আপদ? দেখেছিস অর্ণব, যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর।'

ছদ্ম রাগ নিয়ে ভ্রু কুঁচকালো সায়র। মুখগহ্বরে জমে আছে বারবিকিউ টুকরোর অমৃত স্বাদ। তাই ঠিকঠাক ক্রোধটা প্রতিফলিত হচ্ছে না বোধ হয়। সহসা চিবানো বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে।

'তোরা হলি ঘরের শত্রু বিবিসন। নয়তো এভাবে প্যানিক অ্যাটাক দিতে পারতি না আমাকে। আমি ঠিক কতটা রাস্তা রাইড করে এসেছি, সেটা তোদের কল্পনারও বাইরে।'

একহাতের অরুর কব্জি চেপে ধরে, অন্য হাতের পিঠে বারবার নাকের ডগা ঘষছিল ক্রীতিক। অরু উদ্বিগ্ন হয়ে সেদিকে তাকাতেই দেখলো টকটকে লালাভ তরলের উপস্থিতি। তৎক্ষণাৎ বিচলিত স্বরে বলে উঠলো, 'আপনার নোজ ব্লেডিং হচ্ছে।'

শার্টের আস্তিনে নাক মুছতে মুছতে জবাব দিলো ক্রীতিক, 'এ আর আজকে নতুন কি? তোর কারণে যন্ত্রণা পাওয়াটা আমার জন্য নতুন কিছু নয়।'

ওদের মান অভিমানের মাঝেই, ওপাশ থেকে ধ্বনিত হলো এলিসার আহত কণ্ঠস্বর, 'ভুলটা আমাদের জেকে, তুই অরুকে বকিস না প্লিজ। বেচারি তোর অভাবে আধমরা হয়ে বেঁচে আছে। যাকে এতোটা ভালোবাসিস, তাকে এভাবে না পোড়ালেও তো পারিস। তোর ভালোবাসা ভয়ংকর ভীষণ।'

এলিসার কণ্ঠে অনুনয়। ক্রীতিক আর জবাব দেয় না, মুহূর্তেই অরুকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় টেন্টের দিকে। পেছন থেকে হাঁক ছেড়ে ডাকে সায়র, 'কিরে, ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস? বার্বিকিউ খাবে না ও?'

সায়রের কথায় ওর পানে একযোগে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে অর্ণব আর এলিসা। অর্ণব দাঁত খিচিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, 'শালা, সুখে থাকতে ভূতে কিলায় তোরে তাই না?'

এতোক্ষণের পুরো ঘটনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো সায়নী। ও যে একটা মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে, একদম চোখের সামনে, ক্রীতিক সেটা খেয়ালই করলো না। উল্টো কোথা থেকে যেন এসে ঝটিকা প্রবাহের মতো উড়িয়ে নিয়ে চলে গেলো অরুকে।

ওরা চলে যেতেই সায়নীর নিকট এগিয়ে আসে এলিসা। মেয়েটার বেলুনের মতো চুপসানো মুখের পানে পূর্ণদৃষ্টি নিক্ষিপ্ত করে বলে, 'দেখলে তো, জেকের ভালোবাসা এমনই, বড্ড বেশী জটিল। ওকে সামলানো এতো সহজ নয়। অরু যেটা খুব সহজেই পারে। ইউ নো? রূপ, গুন, কোয়ালিটি, এফোর্ট এসব দিয়ে সবকিছু হয়না। কিছু জিনিস আসলে ন্যাচারাল। একদম ভেতর থেকে চলে আসে। ওই ফিলিংসটা এতোই এক্সক্লুসিভ যে, দুনিয়ার সকল বিলাসিতা দিয়েও তার অভাব অপূরনীয়।'

কথা শেষ হতেই অর্ণব এসে সন্তোর্পণে ওর গলায় হাত ঝুলিয়ে দাঁড়ায়। অমোঘ চোখে চেয়ে মিষ্টি করে বলে, 'চল বউ।'

অর্ণবের গাড়া ইন্সট্যান্ট টেন্টের ছায়ায় ভেসে আছে দু'টো ছায়ামূর্তির অবয়ব। পুরুষালি ছায়াটা বেশ লম্বা, সৌষ্ঠব তার শরীরের গঠন।

এলোমেলো চুলগুলো ঘাড় ছুয়েছে আলগোছে। গ্রীবাদেশ বাকিয়ে ঝুঁকে আছে সে নারী অবয়বের পানে। আরেকটু ভালোভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, ঠিক ঝুঁকে নয়। তার রুক্ষ অধর প্রবল তৃষ্ণায় ডুবে আছে মানবীর ভেজা ঠোঁটের রহস্যে। আমোদে উদ্ভাসিত ফুলের মতো সেই ওষ্ঠপুটের জাগতিক মিষ্টতা গিলে গিলে নিচ্ছে মানব। যেন এই মিঠেমধুর ছোঁয়াটুকু একান্ত তার। শুধুই তার।

'অরুহ! হার্টবিট!'

বহু আকাঙ্ক্ষিত ডাক নাম। শব্দটা শ্রবনেন্দ্রিয় ভেদ করতেই একটুবাদে নারী ছায়াটা দু-হাতে ঠেলে সরালো তাকে। সহসা তীব্র ব্যথায় নীল হয়ে গেলে তার মুখ। অরু অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়াতে, পেছন থেকে ভেসে এলো হিমশীতল কণ্ঠস্বর,

'একটা চুমুও খেতে দিবি না? এটা কি খুব বেশি অস্বস্তিদায়ক?'

ক্রীতিকের কণ্ঠে মাদকীয় ঘোর। অরু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, প্রসঙ্গ পাল্টে রুক্ষ আওয়াজে প্রশ্ন ছুড়লো,

'আমার একটা চুমুর অপূর্ণতা যদি আপনাকে এতোটা পোড়ায়, তাহলে আপনি কোথায় ছিলেন এতোদিন? কিভাবে থেকেছেন আমাকে ছাড়া?'

'ছিলাম কোথাও একটা।'

ক্রীতিকের দায়সারা প্রত্যুত্তরে ঘুরে তাকালো অরু। তপ্তরাগে বিহ্বল হয়ে মেজাজ হারালো তক্ষুণি।

'কোথাও একটা মানে? আমাকে একা রেখে এভাবে চলে যেতে একটুও মনে বাঁধলো আপনার? আমি কিভাবে আছি, কেমন আছি, কি খাচ্ছি, না খাচ্ছি, আপনাকে ছাড়া আদৌও কি ঠিক আছি? কোনো কিছুই জানতে ইচ্ছে করলো না? রাগের মাথায় হুড়মুড় করে চলে গেলেন। এতো হৃদয়হীন কেন আপনি?'

'আমি তোর ইচ্ছা পূরণ করেছি অরু। বলেছিলাম না, এখন থেকে তুই যা চাইবি, যেভাবে চাইবি, তাই হবে। তাই বলে এটা ভাববি না আমি তোকে ছাড়া ভালো ছিলাম। আমি তোর পার্ফেক্ট হাসবেন্ড হতে চাই, যেমনটা তুই চাস।'

ক্রীতিকের কথা শেষ হতেই ক্ষ্যাপাটে গলায় চেচিয়ে উঠলো অরু,

'না, আমি চাইনা। আমি চাইনা আপনি এভাবে বদলে যান। নিজের চিরাচরিত রাগী, গম্ভীর, বেপরোয়া সত্তাটাকে বিসর্জন দিয়ে সো কল্ড ভালো মানুষীর মুখোশ পরে থাকেন। নিজেকে এই কৃত্রিম খোলসে মুড়িয়ে আপনি যে আমার থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন সেটা কি বুঝতে পারছেন না? আমি আপনার বেপরোয়া ভালোবাসায় অভ্যস্ত জায়ান। তাহলে এমন করে কেন বদলে গেলেন? কে বলেছে আপনাকে পার্ফেক্ট হাসবেন্ড হয়ে উঠতে?'

কাঁদতে কাঁদতে ক্রীতিকের শক্ত বুকে সজোরে ধাক্কা দিলো অরু। পুরুষালি শরীরটা টলে উঠলো একটুখানি। ফের দু'কদম এগিয়ে অরুকে বুকে টেনে নিলো ক্রীতিক, নীরবে বাক্য নিসৃত করলো তার কণ্ঠস্বর।

'অরু বোঝার চেষ্টা কর।'

'আর কিচ্ছু বুঝতে চাইনা।'

অরু বোধ হয় আজ ধরাশায়ী করেই ছাড়বে বেপরোয়া লোকটাকে। আবারও বলতে আরম্ভ করলো,

'পার্ফেক্ট হওয়ার নাম করে আপনি আমাকে অবহেলা করেছেন দিনের পর দিন। কেন জায়ান ক্রীতিক? আমি তো আপনাকে চাই। আমার জায়ান কে চাই। যে আমার জন্য পাগলামি করবে, জেদ করবে, জোর খাটাবে এমনকি পুরো দুনিয়ার সঙ্গে লড়বে। সমগ্র পৃথিবীর কলুষতা থেকে মেঘের মতো আড়াল করে রাখবে আমায়। নয়তো নিজের সৎ মায়ের মেয়েকে বিয়ে করা এতোটাই সহজ? কোথায় গেলো আপনার সেই দম্ভ, আভিজাত্য? কেন আপনি পাল্টে গেলেন বলুন? কি কারণে?'

কথা বলতে বলতেই অভিমানী কান্নায় ভেঙে পড়লো অরু। ক্রীতিক তাকে বুকে আগলালো সন্তোর্পণে। মাথার উপর চুমু খেয়ে, ধীর, শান্ত, শীতল কন্ঠে আওড়ালো,

'রিল্যাক্স বেইবী। আমিও খুব যন্ত্রণায় ছিলাম। প্রতিটা মুহুর্তে তোকে দেখার তাড়নায় ছটফট করেছে ভেতরটা। তুই কি জানিস, গত এক সপ্তাহে ঠিক কি পরিমাণ নোজ ব্লেন্ডিং হয়েছে আমার? আই ওয়াজ কম্পিলিটলি ডেস্পারেট ফর ইউ।'

'তাহলে কেন চলে গিয়েছিলেন? জানেন আমি কত কেঁদেছি?'

অরুর ক্রন্দিত বাক্যে হৃদয় ছেঁড়া আক্ষেপ। অবুঝ বালিকার মতো অব্যক্ত অভিমান।

ওর মোম নরম কপালে ক্রীতিক চুমু আঁকলো সশব্দে। নিগূঢ় স্বরে আওড়ালো,

'আল এক্সপ্লেইন।'

ক্ষণকাল নৈঃশব্দ্য। অতঃপর নিজে থেকেই বলতে আরম্ভ করলো ক্রীতিক,

'আমি বদলে যায়নি অরু। তোকে কম্ফোর্ট দিতে চেয়েছিলাম শুধু। সেদিন হসপিটালে অনুর মিসক্যারেজের পর প্রত্যয় যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে আরম্ভ করলো, তখন আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। শুধু ভাবতে থাকি, কতটা নিগূঢ়, নৃশংস ব্যথা একটা পুরুষকে এভাবে কাঁদাতে পারে? ঠিক ওই মূহুর্তে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল দু'টো নিস্পাপ মুখ। একটা তুই, আরেকটা তোর আর আমার অংশ। আমাদের অনাগত অস্তিত্ব। ভাবছিলাম এই পরিস্থিতিতে আমি থাকলে আমার ঠিক কি রকম অবস্থা হতো? আমি কি আদৌও বেঁচে থাকতাম? নাকি কাউকে বাঁচতে দিতাম?

ওই সময় থেকেই ভেতর ভেতর একটা অদৃশ্য অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল আমাকে। মনে হয়েছে আমার ভালোবাসা গুলো তোর কাছে অসহনীয়। তুই বোধ হয় এই সম্পর্কটায় হাঁপিয়ে উঠেছিস। আমার আরেকটু সিনসিয়ার হওয়া উচিৎ, তোকে কম্ফোর্ট দেওয়া উচিৎ, তোকে স্বাধীনতা দেওয়া উচিৎ। নিজের উগ্র মেজাজটা একটু হলেও সংযত করা উচিৎ। কিন্তু তোর ধারে কাছে থেকে সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক দিনের অভ্যাস তো, নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না কিছুতেই। ভালো মানুষ হতে গিয়েও বারবার তোকে কথার আঘাত দিয়ে ফেলেছি। তাই ডিসাইড করলাম, কিছুদিন দূরে দূরে থাকবো। তবু যদি তুই ভালো থাকিস একটুখানি। আমি তোকে অশান্তি দিতে চায়নি অরু। বিলিভ মি জান, তুই ছাড়া আমার কেউ নেই। তোর কিছু হয়ে গেল আমি একদম শেষ।'

শেষ কথাতে দু'হাত চেপে ওর মুখের কথা আটকে দিলো অরু। ক্রীতিক খেয়াল করলো পায়ের আঙুলে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। সহসা রমণীর নির্মেদ বাঁকানো কোমর খানি বাহুবদ্ধ করে তাকে শূন্যে তুলে ধরলো ক্রীতিক।

ভয়ে সিটিয়ে গিয়ে তৎক্ষণাৎ স্বামীর গ্রীবাদেশ আঁকড়ে ধরে অরু। নাক টেনে ফুপিয়ে উঠে বলে,

'আপনাকে এতো ভালো চাইতে কে বলেছে আমার? আমি আপনাকে না জেনে ভালোবেসেছি? জেনে শুনে বিষপান করেছি অথচ আক্রান্ত হবো না তা কি করে হয়? আপনি আমার চোখে শ্রেষ্ঠ জায়ান, আমার বেস্ট হাসবেন্ড। আপনার থেকে ভালো আর কেউ নয়। যদি থেকেও থাকে তবে সেই ভালো না পাওয়াই থাক। আপনার বেপরোয়া, উগ্র, অসামাজিক স্বভাব কখনো কষ্ট দেয় না আমাকে। সেই সুযোগ আপনি রাখেন না কখনো। তার চেয়েও দিগুণ ভালোবাসা আর আন্তরিকতায় সবসময় ভরিয়ে রাখেন আমার অন্তর। আপনি না থাকলে আমার দুনিয়াটা ফিকে মনে হয়, আপনার শরীরের সুঘ্রাণ ছাড়া সবকিছু ম্লান হয়ে যায়, আপনিহীন অরু তার নিজস্বতা হারায়, ডুবে যায় অন্তহীন মরীচিকায়। আর কখনো এভাবে যাবেন না বলুন? আপনার ক্রোধ, আপনার অভিমান, আপনার উন্মাদ ভালোবাসা সবকিছু সহ্য করার ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু আপনার অবহেলা নয়।'

'অরু...'

অনুভূতির প্লাবনে বানভাসি হয়ে অরু বোধ আরও কিছু বলতো, তার আগেই ওকে থামিয়ে দিলো ক্রীতিক। নরম স্বরে জবাব দিলো অরু,

'হুমম।'

'একবার তুমি করে ডাক।'

'কোনো কথাই তো শোনেন না আমার। কেন ডাকবো তুমি?'

'একবার ডাক, তোর সবকথা শুনবো, প্রমিস।'

ক্রীতিকের কণ্ঠে আশ্বাস। অরু চোখের জল মুখে হাসি নিয়ে ডাকলো,

'তুমি।'

'সে এগেইন।'

'তুমি, তুমি, তুমি। শুধু তুমি।'

ক্রীতিক চমৎকার করে হেসে উঠলো। কি সুন্দর সেই হাসির ঢেউ। অরু বিমুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলো। প্রিয় পুরুষের একটুখানি হাসিতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো অন্তরের সমগ্র যাতনা। অভিমান, হতাশা উবে গিয়ে সূর্যের মতো সোনালু আলোয় ঝলমল করে উঠলো অরুর মেঘ থমথমে হৃদয়। ক্রীতিকের বিগলিত হাসিতে ডুবে গিয়েই আহ্লাদী স্বরে আবদার করে বসলো,

'আমি বাইক রাইডিং এ যেতে চাই।'

'না।'

মূহুর্তেই গম্ভীরতার ছায়ায় ঢেকে গেলো ক্রীতিকের প্রানোচ্ছল হাসির রেশ। চোয়ালের পেশী শক্ত করে স্পষ্ট আওয়াজে না করলো সে। মুখ ভার হয়ে গেলো অরুর। অদম্য উচ্ছাসে ভাটি পড়লো একটু খানি। মৃদু স্বরে বললো,

'আপনি কিন্তু বলেছিলেন, যা চাইবো তাই দিবেন।'

'তাই বলে বাইক রাইড?'

'তো কি হয়েছে?'

ক্রীতিক চোখ বুজলো। অকারণ একটা মেজাজ খারাপ পদ্মাসন হয়ে জেঁকে বসলো মস্তিষ্কে। কিন্তু অরুকে বুঝতে দিলো না। তপ্তশ্বাস ছেড়ে বোঝালো,

'অরু বোঝার চেষ্টা কর। আমি আর কখনো রাইড করবো না। আজ তো শুধু তোর জন্য এভাবে...'

আবারও মুখ চেপে ধরে ক্রীতিকের বাক্য রোধ করলো অরু।

'আমার জন্য ছেড়েছেন, আবার আমার জন্যই ধরলেন। হয়ে গেলো না কাটাকাটি?'

'না, এটা সম্ভব নয় অরু।'

'কেন সম্ভব নয়?'

'বিকজ আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু লস ইউ এনিমোর। একবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেও স্বাদ মেটেনি তোর?'

অরু প্রসন্ন মুখে হাসলো। নরম দু'হাতে ক্রীতিকের খরখরে গাল দু'টো আঁজলা করে ধরলো। তীক্ষ্ণ চোয়ালে আবেশিত আঙুল বোলাতে বোলাতে দৃষ্টির মিলন ঘটিয়ে বললো,

'আপনি আছেন তো। উপরওয়ালা না চাইলে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না আমায়।'

'অরু।'

মোহাবিষ্ট হয়ে ডাকলো ক্রীতিক। অতএব, হিমালয় টলছে। অরু আরেকটু আবেগ ঢাললো তাতে,

'প্লিজ, একবারই তো। আর কোনোদিন বলবো না।'

'ঠিক আছে, এটাই লাস্ট, এন্ড এটাই লিস্ট। এরপর কখনো এমন অহেতুক আবদার করলে মার খাবি। আই রিপিট ইউ উইল বি পানিশড।'

'ঠিকাছে, ঠিকাছে, আর করবো না আবদার। এটাই শেষ।'

ডিল সম্পন্ন হলে অরুকে কোলে নিয়েই বাইকের কাছে এগিয়ে যায় ক্রীতিক। ওকে বসিয়ে হেলমেট পড়িয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, বাইকে চড়ে কোথায় ঘুরতে চাস?

ক্রীতিক বাইকে বসার সঙ্গে সঙ্গে অরু দু'হাতে তার কোমর আঁকড়ে ধরলো। মসৃণ চওড়া পিঠে মাথাটা আলগোছে এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে আওড়ালো,

'পুরো দুনিয়া।'

অতঃপর সায়রের চোখের সামনে থেকেই কাল বৈশাখী ঝড়ের মতো উড়ে চলে গেলো ইয়ামাহা খচিত মস্ত বাইকটা।

গভীর রাত, নিস্তব্ধ সড়ক দিয়ে হাওয়ার মতো ছুঠছে বাইক। আজ আবারও এতোদিন বাদে ক্রীতিকের সঙ্গে বাইক রাইডিং এ বেড়িয়ে প্রণয়ের শুরু দিনগুলোতে ফিরে গেলো অরু। ভয় ছিল, শঙ্কা ছিল, তবুও বুকের ভেতর কোথাও যেন অদ্ভুত এক সুখ ছিল। আজ ওরা দু'জন নয়, তিনজন মিলে বাইকে ঘুরছে ভাবতেই আবেশিত অন্তর খুশিতে বুদবুদ করে উঠলো অরুর। রমণীর মনস্তাত্ত্বিক স্মৃতিচারণের মাঝেই হাওয়ায় ভর করে ভেসে এলো ক্রীতিকের গমগমে কণ্ঠস্বর,

'অরু, ধরে বস, স্পীড বাড়াবো।'

'ধরেছি তো।'

'আরও শক্ত করে ধর, আই ওয়ান্ট ফিল ইউওর টাচ।'

স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে প্রত্যুত্তর করলো ক্রীতিক। তার কথায় মুক্ত বিহঙ্গের মতো অতর্কিত শিহরণে কেঁপে উঠল অন্তর। প্রিয় পুরুষের চাহিদানুয়ী তাকে শক্ত করে ধরলো অরু। মধ্যবর্তী সবটুকু দূরত্ব ঘুচিয়ে ক্রীতিকের শরীরে লেপ্টে গিয়ে আরক্ত মুখে আওড়ালো,

'এবার হয়েছে?'

অরুর শরীরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা টের পেয়ে ক্রীতিক আনমনে হাসলো। অরুকে লজ্জার সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়ে বললো,

'সফ্ট ফ্লাফি এ্যান্ড ভেরী হট।'

তৎক্ষণাৎ ওর পিঠে আলতো চাপড় বসালো অরু। দাঁত খিঁচে আওড়ালো,

'অসভ্য।' ওদিকে গাড়িটা চলে যেতেই বেকুবের মতো স্বগোতক্তি করে উঠলো সায়র,

'যাব্বাহ! আমি যে এখানে একটা মানুষ বসে আছি, সেটা খেয়ালই করলো না কেউ? ব্রিটিশ হিটলার ঝড়ের বেগে আসলো, বউকে তুললো, আবার টর্নেডোর বেগে চলে গেলো। আশ্চর্য!'

আনমনা হয়ে ঠোঁট উল্টালো সায়র। কোল্ড ড্রিংকসের ক্যানে গাঢ় একটা সিপ নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখলো, ক্যাম্পফায়ারের সামনে বসে এলিসার কোলে মাথা রেখে বই পড়ছে অর্ণব। টুইস্টেড কিংডম, বেশ রোমান্টিক। সায়র দৃষ্টি ঘুরিয়ে হাতের উপর ভর দিয়ে পেছন দিকে গা এলিয়ে বসলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকালো আকাশের দিকে।

এখান থেকে আকাশটা একদম স্পষ্ট। কুচকুচে কালো কুন্তলরাশির মতো একঢাল আঁধার জমে আছে সেথায়। আজ চাঁদের দেখা নেই, নেই কোনো আলো ঝলমলে তারকারাজি। মেঘের গর্জনে মুখরিত দিগন্ত। তবুও বিমুগ্ধ নয়নে আকাশের পানে দৃষ্টিপাত করে আছে সায়র। মেঘ ভেঁজা তমশাচ্ছন্ন আকাশটাও আজ চমৎকার লাগছে ভীষণ। মন বলছে, এমন নিঝুম নিস্তব্ধ আকাশ একাকী দেখতে নেই। নীরবতা ভাগাভাগির জন্য হলেও অনেক সময় কাউকে প্রয়োজন।

সায়রের ফুরফুরে মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠলো হঠাৎ। হুডির আস্তিনে মাথা ঢেকে তৎক্ষণাৎ সে ডায়াল করলো একটা নাম্বারে। সায়রের কাছের মানুষ, তার প্রয়োজনের প্রিয়জন। ফ্রন্ট পেইজে গুটিগুটি অক্ষরে ভেসে উঠেছে যার ডাকনাম, 'রাগিণী'।

কল পড়ার কয়েক মুহূর্ত বাদেই কল রিসিভ হলো। বিপরীত প্রান্ত থেকে হ্যালো বলার আগেই ধ্বনিত হলো সায়রের গভীর কণ্ঠস্বর,

'হাঁটতে যাবে নীলিমা?'

নীলিমা আশ্চর্য হয়। একটু বিস্ময় নিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে শুধায়, 'এতো রাতে?'

'ছ, এতো রাতে।'

অপ্রতিরোধ্য সায়র। নীলিমা তন্দ্রা কেটে গিয়েছে এতোক্ষণে। সে সন্দিগ্ধ হয়ে জানতে চাইলো,

'আপনি না বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলেন? সেখানে আমি কিভাবে....'

বাকি কথা জিভে আঁটকে গেলো নীলিমার। তার আগেই অতর্কিত ক্ষোভঝাড়লো সায়র,

'সবগুলে বউ নিয়ে ভেগেছে। মীরজাফর একেকটা।'

গভীর রাতের নিকশ আঁধারটুকু ঠোঁটে পিষিয়ে হাসলো নীলিমা।

কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলো,

'কোথায় যাবেন হাঁটতে?'

'যেদিকে দু'চোখ যায়।'

সায়রের বেখেয়ালিপনায় আন্দলিত হলো রমণী। আরেকটু ভণিতা করে

শুধালো,

'কতক্ষণ হাঁটবেন?'

'নিরবধি, নিরন্তর।'

সায়রের নির্বিকার প্রত্যুত্তর। নীলিমা একটু আহ্লাদ নিয়ে বললো,

'আমিতো অসুস্থ, যদি হাঁটতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি?'

'আমি দু'হাতে কোলে তুলে নিবো।'

সায়রের প্রত্যুত্তর শুনে নীরবে হাসলো নীলিমা। তার হাসির ঢেউ ফোনের দূরত্ব ছাপিয়ে সায়রের হৃদয় ছুঁলো। তৎক্ষণাৎ ধ্বনিত হলো অধিকার মিশ্রিত বাক্য,

'চলে এসো এক্ষুণি।'

'কিন্তু আপনি কোথায়?'

সায়র আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করলো। মেঘের গুরগুর ধ্বনিতে

পুলকিত হয়ে জবাব দিলো,

'আকাশের নিচে?'

'মজা করছেন?'

এতোক্ষণে কিছুটা সতর্ক হলো সায়র। গলা পরিষ্কার করে তরল কণ্ঠে জবাব দিলো,

'নোও, নট অ্যাট অল। আমি ম্যানেজারকে বলে দিচ্ছি, তোমাকে আমার

কাছে পৌঁছে দিবে।'

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন