ফন্ট সাইজ:
থিম:
একমুঠো সঙ্গীন প্রনয়াসক্তি

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা

কথাশেষ করে কল কাটলো সায়র। ততক্ষণে আকাশ ফুটো হয়ে ঝমঝম করে নেমে এসেছে শীতল বারিধারা। ক্যাম্পফায়ারের প্রগাঢ় অগ্নিশিখা ম্লান হয়ে এসেছে ধীরে ধীরে। শীতে জুবুথুবু হয়ে অর্ণব এলিসা টেন্টের ভেতর ঠায় নিয়েছে। হয়তো বা বৃষ্টিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এতোক্ষণে প্রবল ভালোবাসার আলিঙ্গনে মেতে উঠেছে তারা।

মানবশূন্য প্রান্তর। ক্রীতিকের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডটা শুনশান করছে নীরবতায়। কনকনে শীতল বর্ষায় অস্তিত্ব মেলে দিয়ে একাকী সায়র সেখানেই বসে থাকলো। নীলিমার অপেক্ষায়। প্রবল বৃষ্টির মাঝে কোল্ড ড্রিংকসের মিষ্টতায় ঠোঁট ভেজাতেই উচ্ছ্বাসিত দস্যি বালকের মতোই হেসে উঠলো তার অন্তর। লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে আনমনেই গান ধরলো, 'আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো,

হারিয়ে যাবো আমি তোমার সাথে....'

আকাশে মেঘের গর্জন। একটু বাদে বাদেই তরিৎ এর নীল আলোয় চমকে উঠছে প্রকৃতি। বর্ষণে ধোঁয়াসা চারিপাশ। রাস্তার ধারে বাইক থামিয়ে একটা মোবাইল বুথের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে ক্রীতিক অরু। বৃষ্টির নরম ছাটে আধভেজা দু'জন।

ক্রীতিক ব্যস্ত হাতে চুল ঝেড়ে বিরক্তির স্বরে আওড়ালো,

'তোর সাথে রাইডিং এ বেরোলেই কেন বৃষ্টি আসে বলতো?'

অরু হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁলো। ঠান্ডা জলের হিমশীতল পরশে জমে গেলো তার অন্তর। অথচ মস্তিষ্ক জুড়ে নিদারুণ দুষ্টুমি। দু'হাতে জলকেলি অবিরত রেখেই আনমনে জবাব দিলো,

'কি জানি?'

অরুর বৃষ্টিস্নাত মাধুর্য্য অবলোকন করে থমকালো ক্রীতিক, মোহাবিষ্ট হয়ে আওড়ালো,

'তুই মেঘের মতো কোমল তাই। তোর এই কোমল অস্তিত্বটুকু নিজের কাছে ধরে রাখার জন্য সব করতে পারি আমি। নিজেকে ভাঙতেও পারি আবার গড়তেও পারি। নিজের মধ্যে পুষে রাখা জেদ, এ্যাটিটিউড, এ্যারোগেন্সী সবকিছু দু'হাতে পায়ে ঠেলে দিতে পারি। তুই সেই নিষ্ঠুর মানবী অরু, যে আঙুলের ইশারাতে পুতুলকে নাচায়, আর আমি সেই চেতনাহীন বদ্ধ উন্মাদ পুতুল, যে তোর ইশারায় নাচি।'

ক্রীতিক সাধারণত এতো অবলীলায় মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেনা কখনোই। আজকে তার বলা প্রতিটি বাক্য আচানক কর্ণগুহরে ঝঙ্কার তুললো অরুর। ভেতরের নমনীয় সত্তাটা দ্রবীভূত হয়ে উদ্ভব হলো মুগ্ধতার। রমণীর গোলাপি কোমল পুরন্ত ঠোঁট জোড়া প্রসারিত হলো বেখেয়ালে, মনের কিনারে উঁকি দিলো প্রণয়ের সয়লাব,

'হতে পারি বদনাম, হতে ডাকনাম...

হতে পারি সত্যি, তোমারই জন্য।

হতে পারি গল্প... তুমি কাছে টানলে,

হতে পারি জানালা,

এ হাওয়া, ও তোমার কারণে...'

কথাগুলো বলতে বলতেই ধীর বেগে অরুর গা ঘেঁষে দাঁড়ালো ক্রীতিক।

রমণীর জলসিক্ত হাতটা টেনে নিয়ে নিজের মুঠোয় পুরে রেশমের মতো

কৃষ্ণকুন্তলে অধর ডোবালো সন্তোর্পণে। ঘটনার আকস্মিকতায় শিউরে উঠলো অরু। ফর্সা ঘাড়ের উপর রুক্ষ অধরের অপ্রতিরোধ্য বিচরণ অনুভূত হতেই অজানা আড়ষ্টতায় ঝিমঝিম করে উঠলো সর্বাঙ্গ। ক্রীতিকের গভীর থেকে গভীরতর স্পর্শে গুটিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে লজ্জায় আরক্ত হলো রমণীর মুখ। যা দৃশ্যমান হলো ফোনবুথের স্বচ্ছ কাচের প্রতিবিম্বে। সেদিকে চোখ পড়তেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো ক্রীতিক। রমণীর কানের লতিকার সংস্পর্শে গিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ালো,

'আমার স্পর্শ পেলে তুই ফুলের মতো ফুটে উঠিস অরু। একবার তাকিয়ে দেখ।'

লাজুক দৃষ্টে একপল চেয়ে ফের কলমিলতার মতো নুয়িয়ে গেলো অরু।

অস্পষ্ট জড়ানো গলায় শুধালো,

'আপনি কি বললেন এতোক্ষণ?'

'যা সত্যিই তাই।'

ঠোঁটের সাথে তাল মিলিয়ে হাত চলছে ক্রীতিকের। লজ্জায় দিশেহারা অরু কুঁকড়ে গেলো একপ্রকার। মিষ্টি যাতনায় বিপর্যস্ত হয়ে এক লহমায় ঘুরে দাঁড়িয়ে চিত্ত পুত্তলিকার মতো সিটিয়ে গেলো স্বামীর প্রশস্ত বুকের মাঝে।

ক্রীতিক আবারও হিসহিসালো,

'আজ আর তোকে দুনিয়া ঘোরাতে ইচ্ছে করছে না অরু। চল বাড়ি ফিরে যাই।

।'বাড়িতে ফিরেই লম্বা হট শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়েছে ক্রীতিক। তার ঠান্ডার ধাঁচ আছে ভীষণ। তার ওপর সময়টা শীতকাল। ক্রীতিক বেড়োতেই অরু টাওয়াল হাতে এগিয়ে গেলো। আজ আর বলে দিতে হল না। নিশ্চল কদমে এগিয়ে গিয়ে খাটের উপর বসলো ক্রীতিক। ঘাড় ছুঁই ছুঁই সিল্কি চুল বেয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার।

সেগুলোকে ডান হাতে ঝেড়ে অন্য হাতে অরুকে কাছে টেনে নিয়ে এলো সে। দূরত্ব কমতেই স্বামীর চুল মুছিয়ে দিতে ব্যস্ত হলো অরু। কারোর মুখে কথা নেই। চোখের চাউনিই যেন হাজারো বাক্যের অদৃশ্য

আদান-প্রদান। অবিরত হাত চালাতে গিয়ে অরু টের পেল তার তুলতুলে নরম বুকে মুখ ডুবিয়েছে ক্রীতিক। অরু একটু সরতে চাইলে ক্রীতিক শক্ত হাতে টেনে ধরলো তাকে। আবেশে আকুল হয়ে বললো,

'বি মাইন অরু।'

অরু থমকায়, প্রসঙ্গ পাল্টে জড়ানো গলায় বলে ওঠে,

'না মানে...'

'তোর কি এখনো মুড সুইং হচ্ছে? প্লিজ হার্টবিট!'

ক্রীতিকের অস্থির ব্যাকুলতা সহ্য হলো না অরুর। সে জড়তা কাটিয়ে বলে উঠলো,

'কিন্তু আপনি তো....'

'আ'1 বি জেন্ট্যাল।'

বাক্য সম্পন্ন করার প্রয়োজন পড়লো না অরুর। তার আগেই ভেসে এলো বেপরোয়া লোকটার মাদকীয় প্রতিশ্রুতি। স্বস্তিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার ফুরসত পেলো না অরু। মৌন সম্মতি পাওয়া মাত্রই এক নিমেষে ক্রীতিক তাকে টেনে নিয়ে গেলো ভালোবাসা বিজরিত মধুর এক মায়া কাননে। রাত গাঢ় হতেই বৃষ্টির তোড় বাড়লো, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়লো ক্রীতিকের অস্থিরতাও। নাজেহাল অরু কসরত করে বলে উঠলো,

'আপনি বলেছিলেন জেন্ট্যাল।'

'হুশশশ! জাস্ট স্ক্রিম অন মাই নেইম বেইবি।'

সঙ্গে সঙ্গে চাপা শীৎকারে কঁকিয়ে ওঠে অরু,

'ক্রীতিইইক!'

দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলো কতগুলো মাস।

শীতের রুক্ষতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। ঝলমলে নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো শুভ্র মেঘের আস্ফালন। গরমটাও জেঁকে বসেছে ধীরে ধীরে। পুরো আমেরিকা জুড়ে শুরু হয়ে সামার ভ্যাকেশন। কর্মস্থলের একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুদিনের বিরতি পেয়ে সবাই যেন হাঁফ ছেড়েছে ক্লান্তিতে।

গেইটের সামনে চেরিব্লোসম গাছ দু'টো ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিল শীতল শুষ্কতায়। আজ এতোদিন বাদে বাসন্তিক আমেজে প্রফুল্ল সজীবতায় মাথা চাঁড়া দিয়েছে তারা। তরতর করে গজিয়ে উঠেছে হালকা সবুজ কচিপাতা। চারিদিকে অদ্ভুত এক নৈরাশ্য, মরা বিকেলের ভ্যাপসা গরমের মাঝেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফুরফুরে বাতাসে তিরতির করে নৃত্য করছে চেরিব্লোসম গাছের সদ্য গজানো কচি পল্লব।

ক্রীতিকের মাস্টার বেডরুমের বিশালাকৃতির জানালাটার পর্দা সরিয়ে বাইরের ফ্রন্ট ইয়ার্ডটায় একঝলক চোখ বুলিয়ে নিলো অরু। অতঃপর হাতে এক কাপ কফি নিয়ে, নিভে থাকা ফায়ারপ্লেসের পাস ঘেঁষে বসে পড়লো জানালার মুখোমুখি হয়ে। আজকাল বাড়ির কথা মনে পড়ে অরুর। কিছুটা সময় একা থাকলেই মানসপটে ভেসে ওঠে একের পর এক সুখের স্মৃতি। পুরান ঢাকার ক্রীতিক কুঞ্জের প্রতিটি আটপৌরে দেওয়াল, শ্যাওলা ধরা বৈঠকখানা, শক্ত পাঁচিল আবৃত দেওয়াল-সবকিছুই চৌম্বকের মতো টানে ওকে।

বিড়াল ছানা ডোরাকে নিয়ে ভালোই আছে অনু এখন। শুনেছে ডোরার ও নাকি বাচ্চা হবে শীঘ্রই। অরুর মা আজমেরী শেখ তার যান্ত্রিক জীবনের ধরাবাঁধা নিয়মে অভ্যস্ত এখন। আজকাল ক্রীতিকের সাথে খুব একটা ঝামেলায় জড়ান না তিনি। ক্রীতিক আর সায়রের হাড্ডাহাড্ডির যাঁতাকলে অরু নীলিমা দু'জনই এখন সন্তানসম্ভবা। কেউ যে কারো তদারকি করবে তার কোনো উপায় নেই।

গোটা আমেরিকা জুড়ে সামার ভ্যাকেশন। অথচ আজ সকাল সকাল ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গিয়েছে ক্রীতিক। কি নাকি ক্লায়েন্ট ফ্লায়েন্টের সাথে দরকারি মিটিং রয়েছে, না গেলেই নয়। নয়তো অরুর অসুস্থতার পর থেকেই খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া স্ব'শরীরে ভার্সিটিতে যায় না সে। বাড়িতে বসেই নিজ দায়িত্বগুলো বেশ নৈপুণ্যতার সহিত সামলে নেয় মানুষটা। যদি কখনো অফিসের কাজে প্রয়োজন পড়ে তো প্রত্যয়ই বাড়ি বয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ঠিক আগের মতোই।

সর্বদা নাকউঁচু, উগ্র স্বভাবের লোকটা বেশ ধৈর্যশীল হয়েছে আজকাল। অরুর গর্ভকালীন সময় যত এগিয়েছে, ক্রীতিক ততই সহনশীল, নমনীয়, আর বুঝদার রূপে ধরা দিয়েছে। এটাই বোধ হয় বাস্তবতা। নিজের মাঝে পরিবর্তনটা আসলে মানুষ ধরে বেধে আনতে পারেনা, সময় আর পরিস্থিতির গায়ে ভর করে আপনাআপনিই চলে আসে। তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো জায়ান ক্রীতিক চৌধুরী।

সারাজীবন একা থাকতে পছন্দ করা ক্রীতিক গত পাঁচ মাস ধরে দু'জন সার্ভেন্ট রেখেছে বাড়িতে। অরুর আন্ডার এইজ প্রেগন্যান্সি, ডক্টর বলেছে খুব সাবধানে থাকতে, মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা ও প্রকট। তাই রান্নাবান্না থেকে ঘরের যাবতীয় কাজ, সবকিছু এখন সার্ভেন্ট দ্বারাই করানো হয়। এছাড়া সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামা অরুর জন্য সম্পূর্ণ নিষেধ এখন। ক্রীতিক পারেনা অরুকে দিনরাত কোলে বসিয়ে রাখতে। আজকাল অস্বাভাবিক খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছে লোকটা। এটা ধরা যাবেনা, ওটা করা যাবেনা, এটা খাওয়া নিষেধ, সেটা ভালো না। দিনরাত যেন পেছন পেছন আস্ত এক চ্যাটজিপিটি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় অরু। যদিও সার্ভেন্ট দু'জন গরমের ছুটিতে এখন। তাইতো ক্রীতিকের এতো দুশ্চিন্তা।

অনুর মিসক্যারেজের পর থেকে অরু নিজেও বেশ ভয়ে থাকে এসব নিয়ে। মন চাইলেও খুব বেশি একটা ধকল দেয় না নিজের শরীরকে। অবশ্য এই ত্রুটিপূর্ণ প্রেগন্যান্সির পেছনে মোক্ষম কারণ রয়েছে। কারণটা আর কেউ নয়, স্বয়ং মাথা গরম, রগচটা, বেপরোয়া ক্রীতিক নিজেই।

ক্রুটিপূর্ণ প্রেগন্যান্সির কথা ভাবতে গিয়েই নয় মাস ধরে বেড়ে ওঠা নিজের বড়সড় উদরে আলতো করে হাত ছোঁয়ালো অরু। মিষ্টি হেসে বিড়বিড়ালো,

'-আর মাত্র একটা মাস সোনা। তাড়াতাড়ি চলে আসো। মাম্মা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য।'

বাচ্চার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অরুর মানসপটে ভেসে উঠলো আরও একটি ভয়াবহ স্মৃতি। মনে মনে ভাবতে লাগলো সেদিন সকালের কথা।

সেবার নেদারল্যান্ডের টিউলিপ গার্ডেনে ঘুরতে গিয়ে ভ্যাকেশনটা বেশ ভালোই কেটেছিল ওদের সবার। সায়র, নীলিমা, অর্ণব, এলিসা সহ মোট তিন জোড়া কাপল একসাথে যাওয়ায় টিউলিপ গার্ডেনের পাশেই একটা মস্তবড় ভিলা রেন্ট করেছিল ওরা। যেই ভিলাতে দু'তলার প্রত্যেকটা বারান্দা থেকে টিউলিপের বাগান স্পষ্ট দেখা যেত।

নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর পরে তিন-চারটা দিন সবাই একসাথে ঘুরে ফিরে, হইহুল্লোর করে ভালোই আনন্দে কেটেছিল ওদের সবার। কিন্তু বিপত্তি ঘটে পাঁচ দিনের মাথায়। সেদিন হঠাৎ করেই ঘুম থেকে উঠে অরুকে পাশে পেলোনা ক্রীতিক। এমনটা সাধারণত কখনো হয় না, কারণ আড়মোড়া ভেঙে যাওয়ার পরেও, ওই শক্ত চওড়া বুকের মধ্যে ঢুকে খানিকটা সময় ধরে ওম না নিলে, মোটেই ভালো লাগেনা অরুর। অথচ আজ সে সকাল সকাল গায়েব।

আগের রাতে অনেক বেশি দেরি করে ঘুমাতে যাওয়ার দরুন ক্রীতিক ভেবেছিল হয়তো ওর নিজেরই ঘুম থেকে উঠতে বেলা হয়ে গিয়েছে। তাই অরু হয়তো আছে লিভিং রুমে কিংবা অন্য কোথাও। কিন্তু কিসের কি? পুরো ভিলাতে কোথাও অরু নেই।

শেষমেশ না পেরে দরজায় নক করে করে ওদের সবার ঘুম ভাঙিয়েছে ক্রীতিক। তবে ওরাও কোনো হদিস দিতে পারলো না অরুর। এমন একটা অচেনা দেশে, অচেনা জায়গায় এসে হুট করে কোথায় হারিয়ে গেলো মেয়েটা? কোনো বিপদ আপদ হলোনা তো আবার? এক আকাশ পরিমাণ হিজিবিজি ভাবতে ভাবতেই একহাত দিয়ে নিজের চুল নিজেই খাঁমচে ধরলো ক্রীতিক। ওকে এভাবে উদ্বিগ্ন হতে দেখে এলিসা মানানোর স্বরে বলে,

'শান্ত হ জেকে, ঠান্ডা মাথায় ঠিক করে ভাব কোথায় যেতে পারে মেয়েটা? আচ্ছা, ফোন করেছিলি নিশ্চয়ই?'

এলিসার কথায় দাঁত দাঁত চাপে ক্রীতিক। অতঃপর বিরক্তির সুরে বলে,

'ফোনটা নিয়ে গেলে তো করবো? ইডিয়েট একটা, আজ ওকে খুঁজে পেলে খবর আছে, আমি যে ওর কি হাল করবো নিজেও জানি না।'

ক্রীতিকের কথার মাঝে ওকে থামিয়ে দিয়ে, ওর দিকে টিস্যু বক্স এগিয়ে দিতে দিতে সায়র বললো,

'তোর নোজ ব্লেডিং শুরু হয়েছে আবার।'

ক্রীতিক এক টুকরো টিস্যু হাতে নিয়ে, সেটা দ্বারা নাক মুছতে মুছতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো,

'এই মেয়েটা আর আমাকে শান্তি দিলোনা। আমার জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে ওকে খুঁজে বের করতে করতে।'

কথা শেষ করে টি টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা কুড়িয়ে নিয়ে বাইরের দিকে হাঁটা ধরে ক্রীতিক। ওকে চলে যেতে দেখে অর্ণব উদ্বিগ্ন গলায় বলে ওঠে,

'কোথায় যাচ্ছিস তুই একা একা? আমরা আসবো?'

ক্রীতিক যেতে যেতে জবাব দেয়,

'দরকার নেই, আসেপাশের টুরিস্ট এরিয়া গুলো একটু খুঁজে দেখে আসছি আমি। তারপরেও যদি না পাই, তো পুলিশের কমপ্লেইন করা ছাড়া আর উপায় দেখছি না।'

ক্রীতিকের কথার পেছনে অর্ণব পুনরায় বলে,

'কিন্তু তোর তো নোজ ব্লেডিং হচ্ছে, কার ড্রাইভ করতে পারবি তো?'

ক্রীতিক আর দাঁড়ায় না। ইতিমধ্যে ওর বুকের মধ্যে দাউদাউ করে অস্থিরতার আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে ও আর নিজেকে সামলাতে পারবে না, নির্ঘাত বুকের ব্যথায় দম বন্ধ হয়ে মা'রা যাবে। তাই আর দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যেতে যেতে তপ্তস্বরে জবাব দিলো ক্রীতিক,

'পারবো।

সারাটা দিন হন্যে হয়ে এদিক সেদিক খুঁজেও লাভ হলো না কোনো। ক্রীতিক ধারণা করেছিল অরু হয়তো পাকামি করে একা একাই কোনো টিউলিপ গার্ডেনে ঢুকে পড়েছে, কিন্তু তেমন কিছুই নয়। অবশেষে উপায়ন্তর না পেয়ে একরাশ বিষন্নতা আর ভারাক্রান্ত মন নিয়ে পুনরায় ভিলাতে ফিরে এলো ক্রীতিক, উদ্দেশ্য ফোন করে পুলিশকে জানানো, তারা যদি কোনো সোর্সের মাধ্যমে খুঁজে দিতে পারে ওর হৃদস্পন্দনকে।

তখন তাড়াহুড়োয় ফোনটাও নিয়ে বের হতে পারেনি, তাই আবারও ভিলাতেই ফিরতে হলো ক্রীতিককে। ক্রীতিক যখন চোখ বন্ধ করে ভারী নিঃশ্বাস ছেড়ে ঘরের দুয়ারে পা রাখে, ভেতরে গিয়ে সবার একেক করে নানান প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, সেই ভেবে যখন ওর বক্ষপিঞ্জর ব্যথায় টনটন করে ওঠে, ঠিক তখনই ভেতর থেকে ভেসে আসে এলিসার ধমকা ধমকির আওয়াজ। কাউকে উদ্দেশ্য করে একটু রাগান্বিত স্বরেই এলিসা বলছে,

'কোথায় গিয়েছিলে তুমি? সারাটা দিন একটা খোঁজ নেই, খবর নেই। জেকে তো উদভ্রান্তের মতো খুঁজে বেরিয়েছে তোমায়, কি জানি হয়তো পুলিশেও কল করে দিয়েছে এতোক্ষণে। আজও ভিলাতে ফিরলে তোমার সাথে কি হবে ভাবতে পারছো?'

এতোটুকু শোনা মাত্রই ক্রীতিকের কৌশলী মস্তিষ্কটা সচল হয়ে উঠলো। কারও উপর ভীষণ ক্রোধান্বিত হয়ে চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেলো মুহুর্তেই। মাথার মধ্যে ভলভলিয়ে বেড়ে ওঠা তীব্র ক্রোধটাকে ক্রীতিক সামলালো না মোটেই, বরং দু'হাত মুঠি বদ্ধ করে হনহনিয়ে ভেতরে গিয়ে বাজপাখির মতো ছো মেরে শক্ত হাতে চেপে ধরলো অরুর চোয়াল। ক্রীতিকের হাতের বাঁধন এতোটাই শক্ত যে অরুর মনে হচ্ছিল এক্ষুনি গালের হাড় হাড্ডি সব গুড়ো গুড়ো হয়ে ভেঙে যাবে।

'আমাকে না জানিয়ে কোথায় গিয়েছিলি বল?' দাঁতে দাঁত পিষে অরুর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছোড়ে ক্রীতিক।

ক্রীতিকের এমন ক্ষ্যাপাটে সিংহের মতো আচরণে ভড়কে যায় সবাই। নীলিমা ভয়ে সিটিয়ে গিয়ে সায়রের শার্ট খামচে ধরে হিসহিসিয়ে বললো,

'ভাইয়াকে থামাও, অরুকে তো মেরে ফেলবে আজ।'

সায়র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো, অতঃপর নীলিমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বিড়বিড়ালো,

'কিছুই করবে না।'

ক্রীতিক চক্ষু গরম করে অরুকে ভস্ম করে দিতে চাইলো। সেভাবেই ক্ষুদ্ধ কন্ঠে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,

'কোথায় গিয়েছিলি, জবাব দে? তোকে না পেলে আমি যে কুত্তার মতো তোকে খোঁজার জন্য পুরো শহর চষে বেড়াবো, সেই হুঁশ ছিল না তোর ব্রেইনে? আন্সার মি!'

গর্জে উঠলো ক্রীতিক। ওর এহেন কঠোর ধমকে কম্পিত হয়ে উঠলো অরু, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে তৎক্ষণাৎ জবাব দিলো,

'আমি তো একটু বড় টিউলিপ গার্ডেন দেখতে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম চলে আসবো তাড়াতাড়ি, কিন্তু গাড়ি পাইনি একটাও।'

'এইইই! কাকে মিথ্যে গল্প শোনাচ্ছিস তুই? শহরের এমন কোন টিউলিপ গার্ডেন নেই যেখানে আমি তোকে পাগলের মতো খুঁজিনি, আর তুই এখানে আমাকে বানিয়ে বানিয়ে উপন্যাসের ডায়লগ শোনাচ্ছিস? কলিজায় ভয় নেই?'

এই পর্যায়ে গর্জে উঠে অরুর বুকের কাছের জামাটা খামচে ধরে ওকে নিজের কাছে নিয়ে এলো ক্রীতিক।

অরুর মিথ্যে জবাবে ক্রীতিকের রাগের পারদ দিগুণ তালে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে, এবার এলিসা এগিয়ে এসে ক্রীতিকের হাতটা টেনে হিঁচড়ে ছাড়ালো অরুর থেকে। অতঃপর ক্রন্দনরত অরুকে নিজের বাহুতে টেনে নিয়ে বললো,

'অনেক হয়েছে জেকে, আজকের মতো ছেড়ে দে মেয়েটাকে। কাল না হয় ঠান্ডা মাথায় শুনিস সবকিছু।'

ক্রীতিক ক্রুদ্ধস্বরে বললো,

'ওকে সাফসাফ উত্তর দিতে বল এলিসা, ও সারাদিন কোথায় গিয়েছিল, নয়তো আজ আর ওকে ছাড়াছাড়ি নেই। আমি ওর সাথে যা ইচ্ছে হয় তাই করবো আজ।'

এলিসা আর অরুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো না ক্রীতিকের সম্মুখে, বরং তাড়াহুড়ো করে অরু সমেত চলে গেলো নিজের বেডরুমে।

তখন গভীর রাত। সন্ধ্যা রাতে অরু ক্রীতিকের ঝামেলার দরুন পুরো ভিলা এখন শুনশান নিস্তব্ধতায় ছেয়ে আছে। অন্য কোনো দিন হলে হয়তো এখনো সবাই লিভিংয়ে বসে আড্ডা আনন্দে মেতে থাকতো।

কিন্তু আজ সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতি। খানিক বাদে বাদেই রাতের আঁধারকে সঙ্গ দিতে লেকের পার থেকে ভেসে আসছে কোলাব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ আওয়াজ। সেই সাথে টিউলিপের বাগান থেকে ধেয়ে আসা রাতজাগা পাখিদের ডানা ঝাপ্টানোর শব্দে গভীর ঘুমে কাঁদা হয়ে আছে সকলে। ঠিক এমন সময় অর্ণবের গভীর আরামদায়ক ঘুমের ইস্তফা দিয়ে ওর মুঠোফোনটা বেজে উঠল তার স্বরে।

এতো রাতে এই ফোনের আওয়াজ বড্ড বিরক্ত ঠেকলো অর্ণবের কানে।

অগত্যাই ফোনটা কেটে দিয়ে পাশ ঘুরে শুয়ে পড়লো অর্ণব। কিন্তু ফোনের ওপাশে থাকা ব্যক্তিটির বোধ হয় এই প্রত্যাখ্যান সহ্য হলো না মোটেই, যার দরুন আবারও ঝনঝনিয়ে বেজে উঠল মোবাইলটা। এবার আর উপায়ন্তর না পেয়ে ঘুমু ঘুমু চোখে মোবাইল রিসিভ করে কানে ধরলো অর্ণব। তবে এপাশ থেকে কিছু বলার ফুরসত না দিয়ে ওপাশ থেকে বিরক্তির স্বর ভেসে এলো ক্রীতিকের। সে দাঁত কটমটিয়ে বিরক্তিকর কণ্ঠে বলে উঠলো,

'শালা ফোন তুলছিস না কেন? মরে গেছিস?'

অর্ণব চোখ কচলাতে কচলাতে হাই তুলে বললো,

'মরিনি, তবে তুই কেন অন্য রুম থেকে বারবার কল দিয়ে আমার হার্ট অ্যাটাকের বন্দোবস্ত করছিস সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না?'

ক্রীতিক ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গম্ভীর গলায় বললো,

'আমার বউ কই?'

'লাইক সিরিয়াসলি জেকে? তোর বউ কই সেটা জানার জন্য তুই আমায় মাঝরাতে কল দিয়ে ঘুম ভাঙিয়েছিস?'

ক্রীতিক দমলো না, নতুন উদ্যমে গম্ভীর গলায় বললো,

'তোর বউ তখন আমার বউকে বগলদাবা করে রুমে নিয়ে গিয়েছে। এখন দিয়ে যেতে বল, বউ ছাড়া আমার ঘুম আসেনা।'

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অসহায় সুরে ক্রীতিককে মানানোর চেষ্টা করে বললো,

'ভাই বিশ্বাস কর, এতো রাতে এলির ঘুম ভাঙালে ও নির্ঘাত আমায় উষ্ঠা মেরে ইউ এস এ পাঠিয়ে দেবে।'

'তাহলে ট্রিক্স খাটা।'

ক্রীতিকের কথায় অর্ণব ভ্রু কুঞ্চিত করে শুধালো,

'ট্রিক্স খাটাবো মানে?'

ক্রীতিক নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো,

'মানে আবার কি? তুই এই মুহূর্তে এলিসাকে কল করে বলবি, তোর প্রচণ্ড পেট ব্যথা করছে, ঘরে বাইরে শুরু হয়ে গিয়েছে। এক্ষুনি হসপিটালে না গেলে বাইরে যাওয়ার আর উপায় থাকবে না, ঘরেই শুরু করতে হবে।'

ক্রীতিকের কথায় অর্ণব নাকটা সিকোয় তুলে বলে ওঠে,

'ইউউ, এসব বলবো? ভাই এসব আমি বলতে পারবো না, তুই প্লিজ আজকে রাতটা একটু নিজেকে সামলা। কাল ভোর হলেই তোর বউকে আমি নিজে তোর হাতে তুলে দিয়ে আসবো। প্লিজ ভাই।'

অর্ণবের কন্ঠে ভীষণ আকুতি, অথচ ক্রীতিক তাতে দু'পয়সার আবেগ না ঢেলেই কাঠ কাঠ কণ্ঠে বললো,

'যা বলেছি চুপচাপ তাই কর, নয়তো কাল এলিসা নয়, আমি নিজেই তোকে কিক মেরে ইউ এস এ পাঠিয়ে দেবো।'

এরপর অর্ণব আর কিছু বলতে গিয়েও পারলো না, কারণ কথা বলার আগেই পিক পিক আওয়াজ করে লাইন কেটে দেয় ক্রীতিক।

অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে উপায়ন্তর না পেয়ে বুকে মাথায় ক্রুশ একে এলিসার নাম্বারে কলটা করেই ফেললো অর্ণব। গভীর রাত, ঘুমে তলিয়ে আছে পুরো শহর। অত্যাধুনিক ভিলার প্রত্যেকটা জানালা হাট করে খুলে রাখা হয়েছে। সেখান থেকেই বইতে থাকা ঝিরিঝিরি হিমেল হাওয়ায় ঘুমটা গাঢ় হয়ে উঠেছে অরুর। ঠিক এমন সময় তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হতেই ধীরে ধীরে কিছুটা তন্দ্রা কেটে গেলো ওর। ঘুমের মাঝেই মনে হতে লাগলো, ও হাওয়ায় ভাসছে।

প্রচণ্ড হাওয়ার তোড়ে লম্বা চুল উড়ে এসে আঁচড়ে পড়ছে চোখে-মুখে। কিন্তু ঘুমের মাঝে এমন অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ার কারণটা কি? এটা কি স্বপ্ন? কথাগুলো মস্তিষ্কে ক্যাচ করতেই অকস্মাৎ চোখ খুলে ধরফরিয়ে উঠলো অরু।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে লাফিয়ে ওঠায় কোথাও একটা থেকে পড়ে যেতে গিয়েও পড়লো না ও, কারণ কেউ একজন দৃঢ় হাতে সামলে রেখেছে ওকে। ঘুমটা পুরোপুরি ছুটে গেলো এবার। অরু চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, ওকে কাঁধে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ক্রীতিক। অন্ধকারের মাঝেও ক্রীতিকের উপস্থিতি টের পাওয়ার মতো ক্ষমতা অরুর আছে, কিন্তু এভাবে ঘুমের মধ্যে অপহরণ করে তুলে নিয়ে যাওয়ার মানেটা কি? কেন যেন বিরক্তিতে শরীরটা চিড়বিড়িয়ে উঠলো অরুর। ক্রীতিক সবসময় বাড়াবাড়ি করে। তাই অরু এবার ধাতস্থ হয়ে ক্রীতিককে কয়েকটা কড়া কথা শোনানোর প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু তার আগেই ওকে রুমে এনে বিছানায় ছুড়ে মারলো ক্রীতিক। অরুকে বিছানায় রেখে এগিয়ে গিয়ে দরজা জানালা গুলো লাগিয়ে দিতে দিতে কঠিন স্বরে বলে,

কোথায় ছিলি সারাদিন সত্যি করে বল অরু।'

ব্যাস, এক বলেই ছক্কা হাঁকালো ক্রীতিক, যার ফলসরূপ অরুর সব হাওয়া ফুঁসস। অরু ভেবেছিল ক্রীতিক হয়তো ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছে এতোক্ষণে, এখন হয়তো একান্তে অরুর সঙ্গ চায় বলেই এভাবে তুলে নিয়ে এসেছে ওকে। কিন্তু না, এটা তো জায়ান ক্রীতিক, ওভার পসেসিভ, ওভার রিয়েক্টিভ। তার কাছ থেকে ছাড় পাওয়া কি এতোই সহজ?

অরু ভাবছে দেখে ক্রীতিক আবারও এগিয়ে এসে অরুর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর রাশভারি আওয়াজে শুধায়,

'কি হলো, এই ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর দিতে এতো সময় লাগছে কেন? আমি কি খুব কঠিন প্রশ্ন করেছি?'

অরু ভড়কালো, সামান্য তোতলানোর সুরে বললো,

'দদেখুন প্রত্যেকেরই তো এইটুকুনি প্রাইভেসির প্রয়োজন, তাই না? তাছাড়া আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আমি কোনো খারাপ কাজ করিনি।'

অরুর কথায় সন্তুষ্ট হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো ক্রীতিকের দৃষ্টিতে অগ্নিস্ফুলিং ফুটে উঠলো মুহূর্তেই। তীক্ষ্ণ চোয়ালটা শক্ত হয়ে ব্লেডের মতো ধারালো হয়ে উঠলো যেন। সে এগিয়ে গিয়ে বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চকচকে হ্যান্ডকাফ বের করতে করতে বললো,

'তোর মাঝে এমন কি আছে? যা আমার অজানা অরু? কি এমন প্রাইভেসি এখনো অবশিষ্ট রয়েছে, যা আমি উন্মুক্ত করিনি? চল, দেখবো আজ।'

ক্রীতিকের গতিবিধি পরখ করে অরু এবার ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে ক্রীতিককে মানানোর চেষ্টা করে কিছুটা আতঙ্কিত সুরে বললো,

'এমনটা করোনা প্লিজ, এটা মোটেই উচিত হবে না, খুব বেশি অন্যায় হয়ে যাবে।'

অরুর তুলতুলে নরম গালে পরম আবেশে হাত বুলিয়ে, হাস্কিস্বরে ক্রীতিক বলে,

'আই হ্যাভ প্রোপার রাইট টু মেকিং লাভ উইথ ইউ বেইবি, এখানে অন্যায় কোথায় দেখলি? আমাকে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা ভুলেও করিস না।'

ক্রীতিকের কথার টোনে হুমকি সুস্পষ্ট, কিন্তু অরু তাও বাঁধা দিচ্ছে ওকে। বারবার বলছে,

'প্লিজ, এভাবে না, এটা ঠিক হচ্ছে না।'

ক্রীতিক সেসবের তোয়াক্কা না করে অরুর হাতদুটো আটকে ফেললো দু'হাতে। অতঃপর ওর কান্না থামাতে মুখে লাগিয়ে দেয় এক টুকরো ডাকট টেপ। এবার অরু পুরোপুরি ক্রীতিকের বশে। ব্যাপারটা উপলব্ধি করতেই অরুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ক্রীতিক হিসহিসিয়ে বললো,

'তোর ভালোর জন্য বেঁধেছি, কারণ আজকে যতক্ষণ না সত্যিটা বলবি, ততক্ষণে আমার হাত থেকে তোর নিস্তার নেই। বি রেডি ফর ইওর হার্ড প্যানিশমেন্ট বেইবি।'

অরুর মুখ বাঁধা, তাই ও কাঁদতে কাঁদতে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ালো শুধু, যার অর্থ,

'এটা করবেন না প্লিজ।'

তবে ক্রীতিক আর অপেক্ষা করে না, নিজের সবটুকু আকর্ষণ, উন্মাদনা অরুর মাঝে বিলিয়ে দিয়ে ডুবে যায় ভালোবাসার অতল গহ্বরে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন