আট
কথাটা বলেই ক্রীতিকের সামনে গাল পেতে ধরলো অরু। ক্রীতিক প্রথমে হতাশায় কপাল চাপড়ালো। মেয়েটার এতো মুড সুইং কেন হচ্ছে ইদানীং? এটাও কি কোনো মেডিকেল কন্ডিশন? পরক্ষণেই শব্দ করে একটা গাঢ় চুমু খেয়ে গাল ভিজিয়ে দিলো অরুর। অরু অবাক নয়নে তাকালো, হতচকিত কণ্ঠে আওড়ালো,
'এটা কি হলো?'
'আই লাভ ইউ, অরু।'
অরুর লম্বা চুলে নাক ঘষতে ঘষতে গভীর হাস্কি স্বরে বিড়বিড়ালো ক্রীতিক। অরু জানতে চাইলো,
'সত্যিই ভালোবাসেন?'
'প্রমাণ চাই?'
হঠাৎ করে কোনো উত্তর খুঁজে পেলোনা অরু। ক্রীতিক আবারও বললো,
'তোর পেটে আমার বাচ্চা, এটাই যথেষ্ট নয় কি?'
'নাহ, আরও প্রমাণ দিন।'
কিশোরীর মতো জেদ ধরলো অরু। ক্রীতিক কিছু একটা বলার আগেই সে জানালো,
'কেক বানিয়ে দিন, আমি কেক খাবো। মিন্ট ফ্লেভারের কেক।'
অরুর কথা শুনে হতবুদ্ধি হয়ে গেলো ক্রীতিক। নীরবে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে তপ্তশ্বাস ফেলে বললো,
'তারমানে কেক খাওয়ার জন্য এতো নাটক?'
অরু জবাব দিলো না, চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আহ্লাদী বালিকার মতো ঠোঁট উল্টালো শুধু। ক্রীতিক চিন্তিত স্বরে বললো,
'কিন্তু এতো রাতে মিন্ট ফ্লেভার কোথায় পাবো? ভ্যানিলা করে দিই? অথবা চকোলেট?'
'নাহ! আমি মিন্টই খাবো। আমার ক্রেভিং হচ্ছে।'
'মাঝরাতে তোর টুথপেস্ট খাওয়ার ক্রেভিং হলো?'
ক্রীতিকের কথায় অরু জোরে জোরে মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ হ্যা। ক্রীতিক আর কিইবা করবে বাধ্য হয়ে প্রত্যয়কে কল করে। ওপাশ থেকে কল তুলতেই ক্রীতিক বলে,
'মিন্ট লাগবে। মিন্ট নিয়ে এক্ষুনি আমার বাড়িতে আসো, কুইক।'
প্রত্যয় ঘুমাচ্ছিল। এতরাতে মিন্টের খোঁজ করায় পুরন্ত কপালে ভাজ পড়লো তার। তন্দ্রালু গলায় জিজ্ঞেস করলো,
'মিন্ট দিয়ে কি হবে ভাই?'
মুখের উপর প্রশ্ন করায় প্রথমে মেজাজ খিঁচড়ে গেল ক্রীতিকের। তপ্ত রাগে ফেটে পড়ে জবাব দিলো,
'মিন্ট দিয়ে মানুষ কি করে? মাথায় দেয় না নিশ্চয়ই?'
'তাহলে একটা কাজ করুন ভাই, আপাতত মিন্টের বদলে টুথপেস্ট খেয়ে ঘুমিয়ে যান। সকালে উঠে আমি দেখছি ব্যাপারটা।'
'আমার বউ মিন্ট ফ্লেভারের কেক খাবে, ইডিয়ট। কেক কি আমি ওকে টুথপেস্ট দিয়ে বানিয়ে দিবো?'
ক্রীতিক দাঁতে দাঁত পিষে কথাটা বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ঘুমে বুদ হয়ে থাকা প্রত্যয়ের দায়সারা প্রত্যুত্তর,
'হ্যা বানিয়ে দিন। আফটার অল ফ্লেভার তো একই।'
'প্রত্যয়য়য়য়য়য়য়য়! রাগিও না আমায়! এই মুহূর্তে যদি তুমি ঘুম থেকে না জাগো, আর মিন্ট নিয়ে আমার বাড়িতে না আসো, তাহলে আগামীকাল নিজে গিয়ে সাসপেন্ড করে আসবো তোমাকে আমি। পুরো একমাসের স্যালারী গচ্ছা যাবে। বুঝতে পারছো?'
প্রত্যয় ঘুমের ঘোরে কথাগুলো বললেও, ওপাশ থেকে ভেসে আসা ক্রীতিকের জোড়ালো হুংকারে ভয়ে আঁতঙ্কে পর্যুদস্ত হয়ে লাফ দিয়ে উঠে বসলো সে। হাঁপাতে হাঁপাতে জবাব দিলো,
'আসছি আসছি ভাই, এক্ষুনি নিয়ে আসছি।'
মনেমনে তপ্ত রাগে চিড়বিড়িয়ে উঠে বিড়বিড়ালো,
'পাগল, পাগল, পাগল, ক্রীতিক কুঞ্জের সবকটা পাগল। 'আবহাওয়ার অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ। সন্ধ্যা থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। রাত যত বাড়ছে, তত ভয়ংকর হচ্ছে পরিবেশ। বৈশাখী জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে গাছপালা সব উপড়ে যেতে চাইছে যেন।
হঠাৎ করে দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। আমেরিকাতে সচরাচর লোডশেডিং হয় না কখনোই, কিন্তু ক্রীতিকের শহরতলীর এই বাড়ির আশেপাশে প্রচুর গাছপালা থাকায় অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লাইনচ্যুত হয়ে যায় বিদ্যুৎ।
ঝোড়ো হাওয়ায় মুখর চারিপাশ, দানবের মতো হুংকার ছেড়ে তড়িৎ এর ন্যায় জ্বলে উঠছে আকাশ। জানালার ফাঁক গলে ঝিরিপথের মতো ঝাপিয়ে পড়ছে বৃষ্টির ছাঁট। ক্রীতিক এগিয়ে গিয়ে মসৃণ হাতে থাই গ্লাসটা টেনে দিলো। তারপর পেছনে ঘুরে নরম কম্ফোর্টারের উষ্ণতায় ঢেকে দিলো অরুকে। পেটের ভেতর সদ্য প্রাণ আসা অভূমিষ্ঠ অস্তিত্বখানি ঢলঢল করে নড়ছে তার। নিজ অংশের এহেন অস্থির হুটোপুটির প্রত্যক্ষদর্শনে অকারণ এক প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেলো ক্রীতিকের অন্তরজুড়ে। সে গিয়ে বসলো অরুর পেটের কাছে, হাত এগিয়ে বেড়ে ওঠা পেলব ত্বকে একটুখানি আঙুল দাবাতেই সেখানটায় নড়েচড়ে উঠে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে দিলো অংশ তার। সন্তানের প্রথম আলিঙ্গনে আপ্লুত হয়ে সর্বদা গুরুগম্ভীর ক্রীতিক অধর কামড়ে চমৎকার হাসলো। ভাগ্যিস, সেই হাসির ঝিলিক অরু দেখতে পায়নি; দেখলে হয়তো আরও হাজারবার অসভ্য লোকটার প্রেমে পড়ার যথোপযুক্ত কারণ তৈরি হতো।
ক্রীতিক আস্তে আস্তে অরুর দিকে ঝুঁকলো, অতঃপর মাথাটা আলগোছে দাবিয়ে দিলো গোলাকার পেটের উপর। নরম চামড়ার আবরণকে উপেক্ষা করে স্পর্শ করলো তার অভূমিষ্ঠ অংশকে। তৃপ্তির শিয়রে পৌঁছে হিসহিসিয়ে বললো,
'মাম্মাকে কেন এতো জ্বালাতন করছো প্রিন্সেস? তোমার মাম্মা অনেক ছোট, সারাদিন তোমাকে সামলে সে ক্লান্ত এখন। একটু ঘুমাতে দাও।'
ক্রীতিক কথা বলতেই ফের নড়চড়ে উঠলো অস্তিত্ব তার। যা দেখা মাত্র ক্রীতিক একটু মুখ গম্ভীর করলো। বললো,
'হোয়াই আর ইউ সাচ আ নটি ওয়ান? ডু ইউ ওয়ান্ট টু মিট পাপা সুন?'
ওপাশের ক্ষুদ্রপ্রাণ যেন সারা দিচ্ছে, তেমন করেই এলোমেলো ভঙ্গিতে নড়েচড়ে উঠছে সে। নিগূঢ় দৃষ্টে সেই নড়চড়া পর্যবেক্ষণ করলো ক্রীতিক। অরুর পেটে আলতো চুমু খেয়ে অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,
'আর মাত্র কয়েকটা দিন। দেন পাপা উইল হোল্ড ইউ ইন হিজ আর্ম। আর ইউ এক্সাইটেড প্রিন্সেস?'
এরকম ঠিক কতক্ষণ ধরে বাবা সন্তানের অন্তঃস্থলের আলাপন হলো তা বলা মুশকিল।
সেই সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল অরু। ক্রীতিক ভার্সিটির কিছু ডকুমেন্টস নিয়ে নাড়াচাড়া করে ঘুমাতে গিয়েছে মাঝরাতে। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে একটু বাদেই। ক্রীতিকের চোখ দু'টো লেগে আসতেই সে আজকেও টের পেলো অরুর মৃদু ক্রন্দন। আজ কান্নার আওয়াজটা ভীষণ করুন শোনালো। যেন কোনো কিছু হারানোর তাড়নায় কুণ্ঠিত হয়ে আছে রমণী।
ক্রীতিক ঘাবড়ালো না প্রথমে। তার ঢঙ্গি বউ নতুন কোনো ঢং শুরু করেছে ভেবে তন্দ্রালু গলায় শুধালো,
'বেইবী, আর ইউ ওকে? তোর ফেভরেট কেক মিনি ফ্রীজে আছে, চেক কর।'
অরু কিছুই বললো না। কান্নার তোড়ে কণ্ঠনালি বুজে আসছে তার। মেয়েটার প্রত্যুত্তর না পেয়ে ক্রীতিক আবারও বলে,
'আ'ম টায়ার্ড হার্টবিট। একটু ঘুমাতে দে....'
কথা শেষ হয়নি, তন্মধ্যে অকস্মাৎ চিৎকার দিয়ে উঠলো অরু। তন্দ্রাচ্ছন্ন ক্রীতিকের কানে বাজলো,
এটা কি করে হলো!
অরুর চিৎকার শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো ক্রীতিক। দেখলো অরুর জামা কাপড় থেকে শুরু করে পুরো বিছানা জুড়ে থৈথৈ করছে মাতৃত্বের স্বচ্ছ তরল। অরু তার মধ্যিখানে বসে বাড়ন্ত পেটটাকে চেপে ধরে শ্বাস ফেলছে জোরে জোরে। ক্রীতিকের দমবন্ধ হয়ে এলো। সে রুদ্ধশ্বাসে আওড়ালো,
'ডেলিভারির এখনো পনেরো দিন বাকি। এতো তাড়াতাড়ি ওয়াটার কিভাবে ব্রেক হলো? ও মাই গড!'
অরুর ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। সে আবারও চোখ খিঁচে আর্তনাদ করে উঠতেই মোহভঙ্গ হলো ক্রীতিকের, জলদি এগিয়ে গিয়ে অরুর মুখটাকে দু'হাতে তুলতেই নিঃসৃত হলো বিগলিত কণ্ঠস্বর,
'কোথায় কষ্ট হচ্ছে বেইবী! কোথায়!'
অরু কিছু বলছে না, অধর কামড়ে উগড়ে দিচ্ছে একের পর এক দীর্ঘশ্বাস। ক্রীতিক যেন উন্মাদ হয়ে পড়েছে, দিগভ্রান্তের মতোই চেঁচিয়ে উঠলো সে,
'সে সামথিং অরু। আমার দম আঁটকে আসছে। কথা বল এক্ষুণি।'
অরু হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
'আমি মরে যাচ্ছি জায়ান, আমি মরে যাচ্ছি! কিছু করুন, এক্ষুনি কিছু করুন।'
বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডব যেন ক্রীতিকের প্রতিটি নিউরনে নিউরনে বয়ে গেলো। তার অরু কষ্ট পাচ্ছে। কেমন কষ্ট, ক্রীতিকের জানা নেই। কিন্তু অরুর অস্থির ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে বুকের ভেতরটা যে দুমড়ে মুচড়ে রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে, সেই ব্যথাটা ঠিকই টের পাচ্ছে ক্রীতিক। অগত্যা কি ভেবে যেন অরুর শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয় নিজের মুখের মধ্যে পুরে নিলো সে। বড় যত্ন করে ভালোবাসার মিষ্টতায় সিক্ত করে দিতে দিতে চুলের মধ্যে আঙুল ডোবালো, অতঃপর কপালে কপালে ঠেকিয়ে গভীর স্বরে আশ্বস্ত করে বলতে লাগলো,
'আমি আছিতো। একটু, সামান্য একটু ধৈর্য ধর। তুই কষ্ট পেলে আমার খুব ব্যথা করে অরু। এখানে ব্যথা করে।'
নিজ বুকের বাম পাশে আঙুল দাবালো ক্রীতিক। টলমলে চোখে তাকালো অরু, পরপরই ক্রীতিকের বিমর্ষ মুখটা দেখে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে ফ্যাসফ্যাস করে বললো,
'আর পারছি না। মনে হচ্ছে এক্ষুনি মরে যাবো।'
তৎক্ষণাৎ টান মে'রে ওকে বুকে চেপে ধরলো ক্রীতিক। ধ্বণিত হলো তার দৃঢ় রাশভারী কণ্ঠস্বর,
'কিচ্ছু হবেনা। আমি বেঁচে থাকতে কিচ্ছু হবে না তোর।'
প্রতিমূহুর্তে অরুর অবস্থার অবনতি লক্ষ্য করে ক্রীতিক সর্বপ্রথম কল করলো প্রত্যয়কে। মাঝরাত, তারউপর তুমুল জলোচ্ছ্বাস। ফোন তোলাটা ধৈর্যের ব্যাপার। ক্রীতিক ধৈর্য ধরতে পারলো না, কল দিতে লাগলো এক নাগাড়ে বিরতিহীনভাবে। একটু বাদেই ফোন রিসিভ করলো প্রত্যয়।
ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই ক্রীতিক রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলো,
'কোথায় তুমি? আমার বাড়িতে চলে এসো, কুইক!'
'কিন্তু ভাই, আমি তো'
প্রত্যয়কে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফের ধ্বনিত হলো ক্রীতিকের রুষ্ট আওয়াজ,
'কোনে কিন্তু নেই, অরু ইজ ইন পেইন। সম্ভবত ডেলিভারী পেইন উঠেছে ওর।'
প্রত্যয় হকচকালো। অস্থির স্বরে বললো,
'ভাই, আমি তো ব্যাংককে। গতকাল রাতের ফ্লাইটে আজমেরী ম্যাম না মানে শাশুড়ী ম্যামের সাথে বিজনেস ডিলে এসেছি। আপনার এজেন্ট হয়েই এসেছি। আ....'
'ফাক অফ!'
প্রত্যয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই কল কেটে দিলো ক্রীতিক। পরপরই তাড়াহুড়ো হাতে ডায়াল করলো অর্ণবের নাম্বারে। রিং হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মাথায় কল তুললো অর্ণব। এপাশ থেকে ক্রীতিক কিছু বলার আগেই অপরপ্রান্ত থেকে সে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
'দোস্ত, নীলিমার পেইন উঠেছে। আমরা সবাই হসপিটালে আছি। তুই জলদি চলে আয়।'
একনাগাড়ে কথাগুলো শেষ করে সঙ্গে সঙ্গে কল কাটলো অর্ণব।
এদিকে পরিস্থিতির জটিলতায় একহাতে চুল টেনে মাথা নোয়ালো ক্রীতিক। বিরক্তি, হতাশা, আর অস্থিরতার চরম শিয়রে পৌঁছে আওড়ালো,
'শীট! শীট! শীট!'
পরক্ষণেই কিছু একটা ভাবতে গিয়ে তার কর্ণগুহর ভেদ করলো অরুর তীব্র আর্তনাদ। প্রচণ্ড ব্যথায় ক্ষণে ক্ষণে ছটফট করছে মেয়েটা। অরুর একেকটা চিৎকার যেন একেকটা ধারালো ছুরির ফলা। তেমন করেই আহত হচ্ছে জায়ান ক্রীতিকের অন্তঃকরণ। সে প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো, তারপর বিনাবাক্যে একহাতে টান মে'রে কোলে তুলে নিলো অরুকে।
বাইরের ঝোড়ো হাওয়া, জলোচ্ছ্বাস সবকিছুকে উপেক্ষা করে নিয়ে বসালো গাড়িতে। অরু তখনো ব্যথায় দিশেহারা। মেয়েটার প্রতিটা হৃদয়বিদারক চিৎকারের তালে তালে বিকট আওয়াজ তুলে গর্জে উঠে দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে অমানিশার আকাশ। কাছে কোথাও বাজ পড়লো মনে হয়। দমকা হওয়ায় ঝাপসা চারিপাশ। তার মাঝেই গাড়ি স্টার্ট দিলো ক্রীতিক। অরুর কষ্টে দিশাহীন হয়ে সে ভুলেই গেলো যে তার পায়ে জুতা নেই। একজোড়া স্লিপার পড়েই দিকভ্রান্তের মতো ড্রাইভ করছে সে। অরু পাশের সিটে বসে কাতরাচ্ছিল। ক্রীতিক ওর মাথাটা টেনে এনে নিজের প্রশস্ত কাঁধে ঠেকালো। শান্ত, নরম, ধীর গলায় বলতে লাগলো,
'অরু! হার্টবিট! তুই কি জানিস? যে একসপ্তাহ আমি তোর কাছ থেকে দূরে ছিলাম, সেই প্রতিটা দিন আমি তোকে দেখতাম?'
অরু কান্নাকাটি থামিয়ে একটু স্থির হওয়ার প্রয়াস চালালো। ক্রীতিক একইভাবে বলতে লাগলো,
'সেই শুরু থেকেই তোকে আমি দেখে আসছি। প্রথম দেখলাম এক ঘোর আচ্ছন্ন রাতে, জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে অনুভব করলাম একটা নরম ছোট্ট শরীর গুটিশুটি মে'রে ঘুমিয়ে আছে আমার বুকে। তার দেহের উষ্ণতায় আমি জ্বরের মাঝেও দরদর করে ঘামছিলাম। কি একটা ভেবে তাকে আরও কাছে নিলাম। একদম বুকের মাঝে মিশিয়ে ধরলাম। তুলোর মতো নরম আর কমনীয় একটা দেহ। অথচ মূহুর্তেই সবকিছু ছাপিয়ে গেলো তার লম্বা চুলের মাদকীয় সুঘ্রাণ। তার কোমল চেহারার জোৎস্নাভেজা মাধুর্য্য। আমি মুগ্ধ হইনা সহজে, কিন্তু সেদিন কি জানি কি হলো, কলের পুতুলের মতোই আমি সারারাত চেয়ে থাকলাম। সময় যত যেতে লাগলো ধীরে ধীরে টের পেলাম কিছু একটা ধিক, ধিক করছে বুকের ভেতর। আমি আবিষ্কার করলাম এটা আমার হৃদস্পদন্দন। যা অনুভব করার জন্য আমার এই ছোট্ট শরীরের মানুষটাকে প্রয়োজন। প্রয়োজন বললে ভুল হবে, তার চেয়েও অধিক কিছু, হতে পারে আসক্তি। সেই থেকেই তুই আমার হার্টবিট।
একটু থেমে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মহাসড়কের দিকে ইউটার্ন নিলো ক্রীতিক। অরু ঠোঁট কামড়ে শ্বাস ফেলছে। এতো ব্যথার মাঝেও ক্রীতিকের কথাগুলো তাকে অধরা এক প্রশান্তির ভুবনে টেনে নিচ্ছে। সড়কের মাঝে দৃষ্টি আবদ্ধ রেখে আবারও বলতে আরম্ভ করলো ক্রীতিক,
'সেবার একসপ্তাহ, প্রতিটা সন্ধ্যায় আমি বাইক নিয়ে গেইটের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম। যতক্ষণ না তোর রুমের লাইট অফ হতো, ততক্ষণ দেখে যেতাম। মাঝেমধ্যে তুই জানালায় এসে দাঁড়াতিস। কিন্তু বাইক রাইড ছেড়ে দিয়েছি বলে হয়তো আমাকে খেয়াল করিসনি। অরু, তুই কি জানিস আমি শুধু তোর জন্য বেকিং শিখেছি? থার্ড ট্রাইমেস্টারের পর থেকেই তুই শুধু কেক খাওয়ার বায়না ধরিস, তাই আমি একসপ্তাহ ভার্সিটি গ্যাপ দিয়ে বেকিং ক্লাসে গিয়েছি। আই নো, আ'ম নট আ পার্ফেক্ট ওয়ান, বাট আ'ম ট্রাইড বেইবী।
আমি নিজের ফিলিংসগুলো কখনো সেভাবে প্রকাশ করতে পারি না, আমার দ্বারা বোধ হয় কষ্টটাই বেশি পেয়েছিস তুই। কিন্তু আজ বলতে ইচ্ছে হলো খুব। অরু, আই লাভ ইউ, আ'ম ম্যাডলী লাভ উইথ ইউ। আজ, কাল, কিংবা আগামীদিন নয়। চিরন্তন.... মৃত্যুর পরেও যদি জীবন বলে কিছু থেকে থাকে, আমি সেখানেও তোকে তাই। শুধু তোকে, নো ওয়ান এলস।'
ক্রীতিকের কথা শেষ হতে না হতেই গলা ছিড়ে আবারও চিৎকার দিয়ে উঠলো অরু। রাত তখন প্রায় দু'টোর কাছাকাছি। নীলিমাকে ডেলিভারি রুমে পৌঁছে চিন্তিত মুখ নিয়ে আউটডোরে বসে ছিল ওরা তিনজন। গভীর রাত হওয়ার দরুন শুনশান নীরবতায় ছেয়ে আছে হসপিটালের বিস্তৃত করিডোর। সায়রের চেহারায় ভর করেছে নীরব এক আতঙ্ক। অর্ণব পাশেই একটা চেয়ারে বসে দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল, ঠিক তখনই পাশ থেকে এলিসা বলে ওঠে,
'ওদিকে দেখ।'
এলিসার কণ্ঠে বিষ্ময়ের আভাস পেয়ে অর্ণব আর সায়র তড়াক করে চাইলো সম্মুখে। দেখলো, অবচেতন অরুকে বাহুতে আগলে নির্জীব পুত্তলিকার মতো দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং ক্রীতিক। বৃষ্টির তোড়ে কাক ভেজা হয়ে আছে তার সমগ্র শরীর। নির্ঘুম দু'চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। ওদের তিনজনকে কারোর কিছু বলে দিতো হলোনা। একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, অর্তকিতে ছুট লাগালো তিনজন। ততক্ষণে ক্রীতিক হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়েছে। তিন বন্ধুর উদ্বিগ্নতায় অযাচিত এক স্বস্তি ভোরের আলোর মতো ঘিরে ধরেছে তাকে। তবুও আত্মাটা যেন নিজের মাঝে নেই। জীবনে প্রথমবার ভীষণ ভয় হচ্ছে ক্রীতিকের, অরুকে হারানোর ভয়।
টিকটিক করে ঘুরতে ঘুরতে ঘড়ির কাটা গিয়ে পৌঁছেছে ঠিক চারটা পঁইতাল্লিশ। মাঝরাতেই কোল আলো করে জন্ম নিয়েছে নীলিমা আর সায়রের প্রথম পুত্র সন্তান নিনিত। অথচ বাবা হওয়ার খুশি মোটেই ছুঁতে পারেনি সায়রকে। কী করে ছোঁবে? চোখের সামনে তার শক্তপোক্ত, গম্ভীর আচরণের, হিমালয়ের মতো অটল বন্ধুটা করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে হাতের পৃষ্ঠে নাক ঘষে যাচ্ছে এক নাগাড়ে। ছলছলে কাতর চোখ দু'টো নিষ্প্রভ হয়ে আঁটকে আছে ডেলিভারি রুমের দরজায়। ডাক্তার বলেছে বেবি ব্রিজ পজিশনে আছে, এমতাবস্থায় নরমাল ডেলিভারি খুবই কষ্টসাধ্য। তারা নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করবে, কোনোভাবেই সম্ভব না হলে সি-সেকশন।
অথচ সেই থেকে চেষ্টা চলছে, কোনো খবর নেই। ওদিকে অরুর প্রত্যেকটা চিৎকার, প্রত্যেকটা আহাজারিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে ক্রীতিক। এরকমটা চলতে থাকলে খুব সম্ভবত মরে যাবে ও। ক্রীতিকের চোখ জ্বলছে ভীষণ। অনভ্যাসবশত কান্নাটাকে ওর জ্বলুনি মনে হচ্ছে। বারবার শুধু তর্জনী দিয়ে পরিষ্কার করছে চোখের কোটর। ক্রীতিকের বেগতিক অবস্থা লক্ষ্য করে ওর নিকট এগিয়ে এলো এলিসা। কাঁধে আলতো হাত ছুঁয়িয়ে বললো,
'চল ওদিকে একটু বসবি।'
'নাহ! আমি ঠিক আছি।'
ধীর কণ্ঠে মানা করে দিলো ক্রীতিক। এলিসা ফের বললো,
'না, তুই ঠিক নেই, তোর নোজ ব্লেডিং হচ্ছে।'
এতোক্ষণে নিজের শক্ত খোলস থেকে বেরিয়ে দু'হাতে মুখ ঢাকলো ক্রীতিক, ভগ্নস্বরে বলে উঠলো,
'ওদের কে বল সি-সেকশন করাতে। প্লিজ এলি, অরু সহ্য করতে পারছে না। আমার অরু অনেক ছোট। এতোকষ্ট সহ্য করতে গিয়ে ওর নিশ্চয়ই খুব ব্যথা লাগছে? আচ্ছা, কতটা ব্যথা? একটা হাড় ভাঙার মতো?'
মলিন হেসে না সূচক মাথা নাড়ালো এলিসা। তপ্তশ্বাস ছেড়ে জবাব দিলো,
'আরও বেশি।'
এলিসার কথাটুকু শ্রবণেন্দ্রিয় ভেদ করতেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালো ক্রীতিক। বললো, 'আমি ভেতরে যাবো।'
পাশ্চাত্য দেশে ডেলিভারির সময় স্বামীকে এলাও করা হয়। সহসা ক্রীতিককেও স্যানিটাইজ করে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো। ভেতর ঢুকতেই ক্রীতিককে দেখতে পেয়ে হাত পা ছুড়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লো অরু।
'আমি আর পারছি না। জায়ান, আমি আর পারছি না। তুমি কিছু করে।। তুমি আমার সুপারম্যান তাইনা? তুমিতো সব পারো। তাহলে আমাকে কেন এতো কষ্ট দিচ্ছো? কিছু করো জায়ান! আমি আর পারছি না... হৃদয়টা ছিড়ে যাচ্ছে আমার।'
হৃদয় বোধ হয় অরুর পাশাপাশি ক্রীতিকেরও ছিড়ে গেলো। সে অরুর মুখের কাছে মুখ নিয়ে উদভ্রান্তের মতো বলতে লাগলো,
'আই নো! আই নো, আই নো, আই নো বেইবি, আই নো!'
অরু আবারও চিৎকার দিয়ে উঠতেই ডক্টরের উপর চড়াও হলো ক্রীতিক,
'নরমাল ডেলিভারির প্রয়োজন নেই, আমার ওয়াইফকে সি-সেকশন করান এক্ষুণি।'
'বাট, মি. জায়ান....'
ডক্টরকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে কাটকাট শব্দে জানালো,
'ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু ওয়োরি। দ্যা রিস্ক ইজ মাইন।'
সহসা হ্যা সূচক মাথা নাড়িয়ে স্টাফদের তৎক্ষণাৎ অটি রেডি করতে বললো ডাক্তার। একজন বাইরে গিয়ে অর্ণব, এলিসা, আর সায়রের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলো,
'এখানে এ পজিটিভ ব্লাড ডোনেট করার মতো কেউ আছেন?'
সায়র হাত তুললো। সঙ্গে সঙ্গে নার্স জানালো,
'প্লিজ কাম উইথ মি।'
অরুকে নিয়ে যাওয়া হলে ধীর পায়ে, সময় নিয়ে ডেলিভারি রুমে থেকে বেরিয়ে এলো ক্রীতিক। ক্রীতিক বেরোতেই ওর নিকট ছুটে এগিয়ে এলো অর্ণব আর এলিসা।
অর্ণব ক্রীতিকের কাঁধে ভরসার হাত রাখলো। এলিসা মায়ের মতো কোমল হাতে টিস্যু দিয়ে ওর নাকের রক্ত মুছলো। ততোধিক নরম গলায় বললো,
'কিচ্ছু হবেনা। উপরওয়ালার উপর ভরসা রাখ জেকে। গড ক্যান চেঞ্জ এভরিথিং।'
এলিসার শেষ কথাটা একদম ছক্কা লাগার মতোই ক্রীতিকের মস্তিষ্কে গিয়ে লাগলো। তার অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া অন্তরটা এতোক্ষণে যেন শুকনো বালুচরের খোঁজ পেয়েছে একটুখানি। অগত্যা কোনো রূপ বাক্যালাপ না করেই নিরুদ্দেশ চলতে শুরু করলো ক্রীতিকের পা দু'টো।
পেছন থেকে অর্ণব শুধালো,
'আর কোথায় যাচ্ছিস এই সময়ে?'
'গুরুত্বপূর্ণ একটা আছে। সবকিছু ম্যানেজ করিস অর্ণব।'
ক্রীতিকের বলিষ্ঠ দেহটা দৃশ্যের আড়াল হতে না হতেই কপাল গোছালো অর্ণব। মাথা চুলকে আনমনে বিড়বিড়ালো,
'অরুর থেকেও ইম্পর্টেন্ট কাজ? কী হতে পারে?'
একশোর গতিতে ড্রাইভ করে মাইল দু'য়েক রাস্তা নিমেষেই চলে এসেছে ক্রীতিক। বৃষ্টি শেষে আদ্র হিমেল হওয়ায় শীত শীত একটা আরাম ছড়াচ্ছে চারিদিকে। ভোরের আলো এখনো ফোটেনি। সারারাতের বর্ষণে ধুয়েমুছে ছাফ হয়ে গেছে প্রান্তর। মসজিদ প্রাঙ্গণে আসতে না আসতেই তেলাওয়াত আর জিকিরের আওয়াজে অভূতপূর্ব এক প্রশান্তিতে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠলো হৃদয়টা। সারারাত ধরে অস্থির হয়ে থাকা নির্ঘুম মস্তিষ্কাটাও যেন খুঁজে পেলো শিথিলতা। ক্রীতিক সময় নষ্ট করলো না, তড়িৎ হাতে টুপিটা মাথায় দিয়ে সোজা ঢুকে গেলো মসজিদে।