ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ে তাহার আগমন

৪র্থ পর্ব

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

রাত দশটা। খাবার টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছেন নাজমিন বেগম, লিপি বেগম। রুহিনী বেগম আর ঝর্ণা বেগম বাটিতে খাবার তুলে রাখছেন ডেকচি থেকে। একে একে দশটা পনেরো বাজতেই সকলে এসে খাবার টেবিলে বসল। মেহেরুন নেছা থেকে শুরু করে বাড়ির ছোট-বড় সবাই। বাড়ির কর্তীরা শুধু বসলেন না। স্বামীদের পেছনে দাঁড়িয়ে রইলেন খাবার এগিয়ে দেওয়ার জন্য। হেলাল সাহেব খাবার টেবিলে বসেই সবাইকে একবার দেখে নিয়ে রাশভারী গলায় জানতে চাইলেন, 'নুসরাত কোথায়? ও কী ঘুমিয়ে পড়েছে?'

নাছির সাহেব এক মুহূর্ত বিলম্ব করলেন না। ভাইয়ের কথার বিপরীতে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বললেন, 'আপনার আদরের ভাতিজি খাবে না এখন।'

হেলাল সাহেব খ্যাক করে উঠলেন। গলা ফাটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন?'

মেহেরুন নেছা আরশের দিকে চেয়ে বললেন, 'ও মনে হয় আরশরে লজ্জা পাচ্ছে। হয় হয়, বিয়ের প্রথম প্রথম এমন হয়।'

মায়ের কথায় বিরক্ত হলেন হেলাল সাহেব। বাচ্চা একটা মেয়ের সাথে তিনি কী মিলাচ্ছেন! মাকে ধমকাতে গিয়েও থেমে গেলেন। ঈষৎ কাঠিন্য মিশানো কণ্ঠে ডেকে উঠলেন, 'নুসরাত, নুসরাত, খেতে আসো মা, বাবা অপেক্ষা করছি।'

নুসরাতের ফিরতি কোনো জবাব এলো না। লাগানো দরজার নিচ দিয়ে চোখ লাগিয়ে বসে রইল সে। দেখতে চাইল, কে আসছে এদিকে। এর মধ্যে নাছির সাহেব নুসরাতকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলার চক্করে হেলাল সাহেবের সামনে ভুলে বলে ফেললেন, 'উনি আসবেন না। আমার কাছ থেকে ওয়াদা করিয়েছেন যে টেবিলে বসে আরশ ভাই ভাত খাবে, ওই টেবিলে উনি বসবেন না।'

হেলাল সাহেব আরশের দিকে রাগী চোখে তাকালেন। ক্রোধে পরিপূর্ণ কন্ঠে জানতে চাইলেন, 'কারণ কী?'

নাছির সাহেব দু-কাঁধ ঝাঁকালেন। হেলাল সাহেব শোহেবের দিকে তাকালেন খেপাটে চোখে, তিনি ও না করে দিলেন জানেন না। সোহেব সাহেবের দিকে তাকাতেই দেখলেন, তিনি আগে থেকেই না করছেন। জায়িনকে চাপা ক্রোধ কন্ঠে চেপে রেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার ভাই কী করেছে?'

জায়িন নির্বিকার চিত্তে চোখ তুলে তাকাল। নির্লিপ্ততার সহিত বলল, 'যা করেছে, নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ আছে।'

জায়ানের দিকে তাকাতেই সে বলল, 'আমি ও মনে করি।'

এবার আরশের দিকে রাগী চোখে তাকালেন হেলাল সাহেব। চোয়াল শক্ত করে রুঢ় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার উপর রেগেছে কেন নুসরাত?'

আরশ খাবার খাওয়া হাত থামিয়ে দিল। এতক্ষণ সকল খাবার না খেয়ে কথা বললেও এই ব্যক্তি নিজের দানা একমনে খেতে ব্যস্ত ছিলেন। হেলাল সাহেবের প্রশ্নে এমনভাবে তাকাল যেন এতক্ষণ সে এখানেই ছিল না। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, 'কিছু বলছিলেন পাপা?'

হেলাল সাহেব রগরগে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'নাছিরের মেয়ে ভাত খেতে এলো না কেন?'

নাছির সাহেব কথায় ফোড়ন কাটলেন। মুখ দিয়ে বিরক্তি সূচক শব্দ বের করে বললেন, 'আহা, তুমি কিছু একটা পেলে, সেটা নিয়ে বসে যাও। খাবেনা এখন, পরে খাবে।'

হেলাল সাহেব জেদি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'পরে কেন খাবে? এখন কেন নয়?'

নাছির সাহেব একশত পার্সেন্ট সিওর আজ হয়ে গেলেন যে তার মেয়েটা পুরো হেলাল সাহেবের উপর গিয়েছে। এই বয়সে এসে এই লোক এত জেদ ধরে, তাহলে ওই মেয়ে পুচকি জেদ ধরবে না কেন! তিনি কথা সরানোর জন্য বললেন, 'তুমি বলোনা, নুসরাত কার মতো হয়েছে, ওই মেয়ে পুরো তোমার মতো হয়েছে।'

হেলাল সাহেব নাছির সাহেবের কথা হটলেন না নিজ জায়গা থেকে। তিনি জিদ্দি সুরে আরশকে শুধালেন, 'ওকে মেরেছ তুমি?'

আরশ চোখ তুলে একবার তাকিয়ে পানি খাওয়ার জন্য হাত বাড়াল গ্লাস নেওয়ার জন্য। গ্লাস হাতে তো নিতে পারল না, পুরো খাবারের টেবিল নড়ে উঠল হেলাল সাহেবের হাতের থাবায়। তিনি কঠোর সুরে নিজের প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন। হিসহিসিয়ে বলে ওঠলেন, 'খাবার গিলা বন্ধ করো, আর বলো, ওর সাথে কী করেছ?'

গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে করতে ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছেন টেবিলের কাপড়। রাগে থরথর করে কাঁপছে তার শরীর। আরশ নিজেও উঠে দাঁড়াল। হেলাল সাহেবের চোখে চোখ রেখে উত্তর দিল, 'থাপ্পড় মেরেছি।'

হেলাল সাহেব প্রায় জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়লেন। চোখগুলো বৃহৎ আকার ধারণ করে অদম্য রাগ চাপা দিয়ে কঠোর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোন সাহসে তুমি থাপ্পড় মেরেছ আমার মেয়েকে?'

আরশ চোখ নিবদ্ধ করল নিজের পিতার চোখে। রাগে ফোঁস ফোঁস করছেন ভদ্র লোক। আরশের দিকে চেয়ে বলে ওঠেন, 'যে আমি তোমার মায়ের গায়ে এখনো একটা আঁচ পর্যন্ত দেয়নি, সেই তুমি আমার ছেলে হয়ে মেয়েদের গায়ে হাত তোলো? এত সাহস তোমার হলো কীভাবে?'

নাছির সাহেব বিরক্ত হলেন। বললেন, 'এবার তুমি বেশি করছ। বাচ্চা ছেলে রাগের মাথায় মেরে বসেছে।'

হেলাল সাহেব কেটে দিলেন কথা। চোখের আইরিশ ঘুরিয়ে নিয়ে আঙুল তুলে বললেন, 'আজ ও একটা ছোট মেয়ের গায়ে হাত তুলতে থামছে না, আগামীকাল আমাদের গায়ে হাত তুলবে না তার কী গ্যারান্টি?'

জায়িন গম্ভীর গলায় হেলাল সাহেবকে বলল, 'এবার আপনি বেশি টানছেন আব্বু!'

হেলাল সাহেব আরশের দিকে আঙুল তুলে কেন্দ্রবিন্দু করতে করতে বললেন, 'ওকে দেখো, এখনো চোখ তুলে আমার পানে তাকিয়ে আছে, চোখে বিন্দুমাত্র লজ্জা, এমনকি অনুসূচনার ছায়া নেই।'

আরশ এবার মুখ খুলল। রগরগে কন্ঠে নিজের কথায় অটল থাকতে জিদ্দি কন্ঠে বলল, 'থাপ্পড় মেরেছি, বেশ করেছি।'

এইটুকু ছিল আগুনে কেরোসিন ঢালার মতো। হেলাল সাহেব এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তেড়ে গেলেন আরশের দিকে। কিছু বোঝার আগেই ঠাস করে গালে বসিয়ে দিলেন থাপ্পড়। শোহেব সাহেব হায় হায় করে উঠে বললেন, 'এ কী করলেন আপনি? এত বড় ছেলের গায়ে হাত তোলা কী ঠিক হলো?'

হেলাল সাহেব আরেকটা ঠাসিয়ে আরশের গালে বসাবেন, নাছির সাহেব এসে হাত চেপে ধরলেন। দু-হাতে টেনে নিয়ে গেলেন ভাইকে দূরে। লিপি বেগম নিজেও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কী বেয়াদব হয়েছে ছেলে! বাপের মুখে মুখে তর্ক করে...!

নাজমিন বেগম দৌড়ে গিয়ে আরশকে চেপে ধরলেন। বললেন, 'রুমে চলো বাবা, বড় ভাইয়ের মাথা এখন গরম, ঠান্ডা হলে এমনি কথা বলা যাবে। চলো, চলো...!'

হেলাল সাহেব নাছির সাহেবকে ঠেলে সরিয়ে দিলেন। খাবার টেবিল দু-হাতে উল্টে ফেলে দিয়ে বললেন, 'নাও, খাবার খাও এবার। আমার মেয়ে খাবার খাচ্ছে না, আর সবাইকে দেখো গান্ডেপিন্ডে গিলতে চলে আসছে। অসভ্য! কত বড় সাহস, বাচ্চা মেয়েটাকে ও থাপ্পড় মারে। আমরা কী মরে গেছি! শাসন করার লোক নেই এই বাড়িতে। উনি মোরগ খাড়া হচ্ছেন। চার চারজন বাপ চাচা থাকতে উনি শাসন করছেন। গায়ে হাত দিয়ে, বাহ্, ব্রাভো, উনার জন্য হাত তালি! আবার খাবারও খাচ্ছেন! ওদিকে বাচ্চা মেয়েটা খাবার না খেয়ে পড়ে আছে।'

নাছির সাহেব আরশের পক্ষপাতিত্ব করে বলেন, 'নুসরাত কিছু করেছে, তাই ও মেরেছে। আজ কাউকে কিছু না বলে ও কোথায় গিয়েছিল জানো?'

হেলাল সাহেব খ্যাক করে উঠে বলেন, 'নুসরাত যেখানে ইচ্ছে যাবে, ওকে থাপ্পড় মারার! যা ইচ্ছে করবে, তবুও হাত তোলার সাহস ওকে কে দিয়েছে? কোন সাহসে আমার মেয়ের গায়ে হাত দেয় ও? ও কী কী করে বেরিয়েছে তার কোনো হিসেব আছে? মুখ খুলব আমি? কিছু বলিনা বলে মাথায় চড়ে বসবে সবাই?'

আরশকে টেনে নিয়ে চলে গেলেন নাজমিন বেগম। টেবিল উল্টে ফেলে দেওয়ায় ঝনঝন করে কাচের প্লেট মেঝেতে পড়ে ভেঙে তা ছিটকে এসে গায়ে লেগেছে আরশের। হাতের চামড়া কেটে গিয়েছে। নাজমিন বেগম নিজের থেকে আট ইঞ্চি লম্বা ছেলেটার হাতে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে দিতে দিতে বলেন, 'মনে বিদ্বেষ রাখে না বাবা। রাগ মনে চেপে রেখো না।'

আরশ কিছু বলল না। লাল চোখে শুধু দেখল আর শুনল হেলাল সাহেবের চিৎকার। হেলাল সাহেব তখনো চিৎকার করে বলছেন, 'আমার টাকা খেয়ে, আমাকে চোখ দেখায়। কত বড় সাহস ওর! ওর বড় ভাইয়েরা এখনো আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলে না, আর ও আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ রাঙিয়ে বলে, মেরেছি, বেশ করেছি। নিজ টাকায় পেলে পুষে সাপ তৈরি করছি।'

নাছির সাহেবের চিৎকার ভেসে আসলো এবার, 'হয়েছে, এত বড় ছেলের গায়ে হাত তুলেছ, তারপর আবার খাবারের খোঁটা দিচ্ছো, আর বারবার যে বলছো, আরশ চোখ দেখিয়েছে, নুসরাত তো সমসময় তোমার চোখে চোখ রেখে কথা বলে, তখন তো কিছু হয় না। বেচারা সামান্য একদিন এভাবে কথা বলায় এমন করছো?'

হেলাল সাহেব উপহাস করে হেসে উঠলেন। বললেন, 'এই যে ছেলে ছেলে করছিস, এরা লাথি মারতে দু-মিনিট সময় লাগায় না। বিয়ে হয়ে গেলেই এরা পর হয়ে যায়, আর মেয়েরা জামাইয়ের বাড়ি চলে গেলেও বাপের বাড়ির মায়া কখনো ছাড়ে না।'

আরশ শুধু শুনল। নাজমিন বেগম রুমের দরজা লাগিয়ে দিলেন যাতে কথা ভেতরে না আসে। আরশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই বিশ বছরের পরিপূর্ণ যুবকটা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল পানির বাহার। নাজমিন বেগম দু-হাতের আজলায় মুখ চেপে ধরে বললেন, 'এ বাবা, এত বড় ছেলে কাঁদেনা। মানুষ বলবে কী! ইয়া আল্লাহ...!'

নাজমিন বেগম আরশকে জড়িয়ে ধরলেন। আরশ নিজের মুখ নাজমিন বেগমের কাঁধে চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। নাজমিন বেগম নীরবে শুধু পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন