ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ে তাহার আগমন

৫ম পর্ব

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

এরপরের দিনগুলো কেটে গেল নীরবে। সৈয়দ বাড়িতে থাকা প্রাণগুলো সকলেই প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। যে হেলাল সাহেবের সাথে কথা বলতে সারাদিন উদ্বিগ্ন হয়ে বসে থাকতো বাড়ির বাচ্চারা, সেই হেলাল সাহেবের পায়ের শব্দ শুনলেও এদিক থেকে ওদিক দৌড়ে পালায় সবাই।

নুসরাতের সাথেও আরশের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে দিন দিন। সেই ঘটনার পর থেকে আর কখনো আরশের কাছে পড়তে যায়নি সে। আরশকে আসতে দেখলেই নিজের রুমের ভেতর ঢুকে বসে থাকে সে। আরশ ডানে গেলে সে বামে যায়, আরশ সোজা গেলে সে উল্টো পথে যায়। খাবার খাওয়ার সময়ের ও পরিবর্তন হয়েছে নুসরাতের। আরশকে খাবার টেবিলে দেখলে সে ডায়নিং রুমে পা ও দেয় না। পালিয়ে, দৌড়ে, লুকিয়ে, এমন করে থাকে। নুসরাতের ভাগ দৌড়ের মধ্যে কেটে গেল মাসখানেক। আরশের মুখদর্শন নুসরাত করলেও আরশ তার ছায়ার টিকিটি কোথাও খুঁজে পেল না। এমন করে লুকিয়েছে নিজেকে, বম মেরে খুঁজলেও তাকে পাওয়া যাবে না। হঠাৎ হঠাৎ নিজের পেছন থেকে ছোট ছোট পায়ের দৌড় সে শুনতে পায়, তখন অতোটা পাত্তা দেয় না। যে পালাতে চায়, তাকে পালাতে দেওয়াই উত্তম।

সময় গড়াল। দেখতে দেখতে একদিন জায়িন চলে গেল দূর দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য। এরপরে জায়ানও পাড়ি জমাল জায়িনের কাছে। সময়ের অতিবাহিত হতে থাকল তার নিয়মে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত পালা করে আসলো আর গেল। এভাবে করে কেটে গেল একটা বছর। এই একটা বছরে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও নুসরাত আর আরশের ভেতরে সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হলো না। তাদের দু-জনের। সম্পর্কে তৈরি হলো যোজন যোজন দূরত্ব। যা বাড়ির সবাই অনেক চেষ্টা করেও কমাতে পারল না। সময়ের বিবর্তনে এক শীতের সকালে আজমল আলী ইহলোক ত্যাগ করলেন। বাড়িতে তখন নেমে আসলো দুঃখের ছায়া। তা কাটিয়ে উঠতে অনেকদিন সময় লাগল সবার। এরপরের দিনগুলোও কেটে গেল ঝড়ের গতিতে। দু-হাজার চৌদ্দ সালে সবাইকে অবাক করে দিয়ে একদিন আরশ জানাল উচ্চ শিক্ষার জন্য সে প্রবাসে যাবে। এর জন্য সে অনেক আগে স্কলারশিপের আবেদনও করে ফেলেছে। আর অবাক করার বিষয় হলো আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা আরশকে নিতে চাচ্ছে। আরশের এই সিদ্ধান্তে হেলাল সাহেব দ্বিমত পোষণ করলেন। কোমল কন্ঠে আরশকে একপ্রকার আদেশ দিলেন, 'তুমি ফ্রান্সে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হেলাল সাহেব দ্বিমত পোষণ করলেন। কোমল কণ্ঠে আরশকে একপ্রকার আদেশ দিলেন, স্কলারশিপের জন্য আবেদন করো। দু-জন ফ্রান্সে থাকবে, আর একজন আমেরিকায় থাকবে, এটা কেমন দেখায় না? এর চেয়ে ভালো স্কলারশিপ নিয়ে ফ্রান্সে চলে যাও।'

হেলাল সাহেবের কথায় আরশ বিরোধিতা করল না। নীরবে সম্মতি জানিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। এক বছর আগের ঘটনা পর আরশ আগের তুলনায় একটু বেশি গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। কথা বলে একদম মেপে মেপে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলে না, আবার কারোর কাছ থেকে শুনেও না।

ধীরে ধীরে সময় কাটল। সৈয়দ বাড়ির সকলেই বড় হতে লাগল। আরশের বয়স গিয়ে ঠেকল বাইশে কোটায়, আর নুসরাতের বয়স বারো এর কোটায়। পুরুষালি ওভাল আকৃতির মুখে ততদিনে গোফ দাড়ি নিজেদের স্থায়িত্ব গেড়ে নিয়েছে খুব ভালো করে।

নুসরাতেরও দারুণ পরিবর্তন হতে শুরু করল। দু-বছর আগে গুরু গম্ভীর হয়ে যাওয়া মেয়েটা আবারো চঞ্চলতা ভর করল। কাঁধ সমান কার্লি চুলগুলো লম্বা হয়ে মাঝ পিঠে গিয়ে ঠেকল। মেয়েলি শরীরের গঠন পরিবর্তন হলো অনেক বেশি। শ্যাম বর্ণের রঙটা আরেকটু পরিষ্কার হলো। মুখে যৌবনের এক দারুণ উজ্জ্বলতা ভর করল। সাথে শুকনো চেহারায় একটু মোটাতাজা ও হলো। এক দেখায় চার ফুটের মেয়েটা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির লম্বা হয়ে গেল। এতদিন বাচ্চামি করে উল্টাপাল্টা কাজ করে সকলকে বিরক্ত করা মেয়েটা এক দেখায় বড় হয়ে গেল। সকল বড় হওয়ার সাথে সাথে ম্যাচুরিটি আসলো সবার মধ্যে। নুসরাত আর আরশের তখনো পুলিশ চোর খেলা চলছিল। নুসরাত এই দু-বছরে কখনো আরশের সামনে পড়েনি। এমনকি দু-জনের একজন আরেকজনের নাম নিজেদের মুখে পর্যন্ত নেয়নি। নুসরাত নিজের এই কঠোর অনশনে সাফল্য অর্জন করছিল, কিন্তু হঠাৎ একদিন রাতে আরশের গলার শব্দ নুসরাত পেল নিজের রুমের সামনে।

যেকোনো সময় যে-কেউ নুসরাতের উপর আক্রমণ করতে পারে, ভেবে দরজা সবসময় আটকে রাখে সে। সেদিন রাতেও তেমন করে আটকে রেখেছিল। ভুলেও কোনো রিস্ক নিচ্ছিল না নিজের উপর। মা নামক ভয়ানক মহিলা জুতো নিয়ে হামলা করতে পারে, সেই ভয়ে এমন লুকিয়ে চুরিয়ে থাকা তার। যদি একবার টের পায় তার রুমের দরজা খোলা, তখন আর তার রক্ষা নেই। বাহির থেকে নক করার শব্দ আসতেই নুসরাত মনে করল, নাছির সাহেব এসেছেন। তাই দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতে ছিটকিনিতে হাত রাখল, আর তখনই আরশের গলা ভেসে আসলো দরজার বাহির থেকে। আরশ গলা পরিষ্কার করছে ওপাশে দাঁড়িয়ে। নুসরাতের শিরা উপশিরা টানটান হয়ে গেল। তুমি করে বলা লোকটার সাথে এই কয়েকদিনে, কয়েকদিন নয়, এই দু-বছরে সম্পর্কে এত অবনতি হয়েছে যে আপনি সম্বোধনে জড়তা কাজ করল নুসরাতের। কাঠখোট্টা কন্ঠ আসলো বাহির হতে, 'খাবার খেতে আসো।'

এই তিনটি শব্দে বোঝা গেল নুসরাত আর আরশের সম্পর্কে পরিধি কোথায় গড়িয়েছে। সামান্য এক থাপ্পড়ের কারণে তুই সম্বোধন থেকে তুমিতে গড়িয়েছে আরশের কথা। নুসরাত চোখের আকৃতি বৃহৎকার ধারণ করে তক্কুল মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝে পেল না ঠিক কী করবে...! এর মধ্যে আবারো আরশের গলা ভেসে আসলো, 'আগামীকাল সকালে আমার ফ্লাইট, হয়তো আর কয়েক বছর দেখা হবে না। কে বাঁচবে, কে মরবে, তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। আসো এসে শেষবারের মতো আমার সাথে খেতে বসো। রাগ অভিমান না হয় একপাশে ফেলে দাও আজকের জন্য।'

ওই থাপ্পড়ের দু-বছর সময় প্রায় গড়িয়েছে, আর আজ সে এসেছে তার কাছে অভিমান ভাঙাতে। যাবে না নুসরাত! সে কোনো প্রকার অভিমান করেনি। এটা তার জেদ, আরশ ভাইয়ের সাথে কোনোভাবেই মুখ দেখাদেখি করা যাবে না। তাই জেদ বজায় রাখতে সেদিন নুসরাত টু শব্দটি করেনি। এরপর আর কোনো শব্দ আসেনি দরজার বাহির থেকে। হয়তো নৈঃশব্দে আরশ সেই স্থান পরিত্যাগ করেছে।

এর পরের দিন সকালেই আরশ চলে গেল দূর দেশে। নুসরাত ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেছিল লোকটার যাওয়া। চোখের মধ্যে পানি জমা হয়েছিল সবাইকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে, কিন্তু তা চোখ। ফেড়ে বের হয়ে গড়ায়নি। লাল লাল চোখগুলো ঘুরিয়ে সবার পানে চেয়েছিল আরশ। মাকে ও অনেক সময় জড়িয়ে ধরে রেখেছিল বুকের মধ্যে। গাড়িতে বসার পর একবার তার রুমের দিকে ও আরশ তাকিয়ে ছিল। এটা দেখতেই তড়াক করে জানালার পর্দার কাছ থেকে সরে আসলো নুসরাত। চুপটি করে পর্দার অপাশে দাঁড়িয়ে থেকে সব শুধু লক্ষ করল। আরশের চলে যাওয়া ভীষণ মন খারাপ ছিল নুসরাতের। তা স্থায়ী হলো দশ মিনিট। এরপর ধিনতানা ধিনতানা করে নাচতে নাচতে রুম থেকে বের হয়ে যেতে নিল, তার পূর্বেই দরজার কাছে একটা কাগজ পড়ে থাকতে দেখল সে। হাতে তুলে নিয়ে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে পড়ল। ঠোঁটের ফাঁক গলে শব্দ উচ্চারণ হলো, 'সাময়িক সময়ের জন্য বিদায় নিচ্ছি, তাই বলে ফিরে আসব না তা মনে করবেন সময়ের জন্য বিদায় নিচ্ছি, তাই না। ততদিন পর্যন্ত আমার আমানতের দায়িত্ব আপনার উপর বর্তালাম, খিয়ানত যেন না হয়, মিসেস আরশ!' নুসরাত বুঝল না, এটা কে দিয়েছে! তবুও মনে একটা খটকা লাগল। ভ্রু কুঁচকে নিয়ে সেটা রেখে দিল যত্ন করে তুলে। তারপর হেলেদুলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। এতক্ষণের মন খারাপ সব উবে গেল বাতাসে, যখন মনে হলো আরশ তাকে থাপ্পড় মেরেছিল। আরশ যাওয়ার দুঃখের তুলনায় সেই থাপ্পড়ের জন্য ঘৃণাটা ছিল প্রবল। কী এক হৃদয় জ্বালানো সেই অনুভূতি! আরশকে দেখলেই নুসরাতের রাগ হতো। আপদ বিদেয় হয়েছে এটা ভেবেই খুশি সে। সময় বাড়ল, দিন গেল, মাস গেল, বছর কাটল, আরশের সাথে নুসরাতের কোনো কথা নেই। আরশও কখনো নুসরাতের সাথে কথা বলার ইচ্ছে পোষণ করেনি, নুসরাতও করেনি। কিন্তু দূরে থেকেও তার প্রভাব বিস্তার হল নুসরাতের উপর। ধীরে ধীরে নুসরাতের সব দায়িত্ব বর্তালেন নাছির সাহেব আরশের ওপর। দু-বছর কাটার পর এক সকালে লিপি বেগম হঠাৎ এসে বললেন, 'এখন থেকে তোর যা প্রয়োজন, তার লিস্ট করে আমার কাছে দিবি। মেজ ভাইয়ের কাছে কোনো কিছুর লিস্ট যেন তোর না যায়।'

এরপর থেকে নুসরাতের সকল জিনিসের ভার চলে গেল লিপি বেগমের কাছে। ইসরাতকে জায়িন ভাই মাসে মাসে খরচ করার জন্য মোটা অংকের একটা টাকা দিতেন। তখন নুসরাত হাই হুতাশ করে বলেছিল জায়িনকে, 'আজ একটা আপনার মতো বড়লোক জামাই নাই বলে।'

এই কথা বলার পরের মাস থেকে নুসরাতকে নিজের খরচের জন্য একটা মোটা অংকের টাকা দেওয়া হতো। সে এটা দেখল না, কে টাকাগুলো তাকে দিচ্ছে! তার মতামতে যেই দিক, একজন দিলেই হলো।

আরশ প্রথমে কমার্সের ছাত্র ছিল। ভয়ানক পড়াশোনার বিষয়ে। মনোযোগী লোক সে। সৈয়দ বাড়ির ভেতর পড়াশোনার বিষয়ে ভন্ড নুসরাত, ইরহাম, আহান আর জায়ান। আর সবগুলো হলো বই পোকা। নুসরাত ভেবে পায় না, ইসরাতটা তার বোন হলো কীভাবে! তার মতো পড়াশোনাকে ভাত না দেওয়া ব্যক্তির বোন ইসরাত, এটা মেনে নিতে তার ভীষণ কষ্ট। আরশ এইচ-এস-সি দেওয়ার পর ইকোনোমিক্স মেইন সাবজেক্ট নিয়ে পি এইচ ডি করার জন্য স্কলারশিপের আবেদন করার প্রস্তুতি নিল, তারপর সবার অগোচরে আবেদন করে ফেলল। স্কলারশিপ পেয়ে গেল। ভাগ্যের জোরে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চান্স হলো। হেলাল সাহেব না করে দিলেন। অনার্স চতুর্থ বর্ষে পা রাখতেই ভালো রেজাল্টের জন্য ঐ বছরই আবারো তার স্কলারশিপের জন্য আবেদন করা কনফার্ম হলো। ফ্রান্সের সুনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় দ্যা আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ প্যারিসে চান্স পেল আরশ সরকারিভাবে উচ্চ ডিগ্রি অর্জনের জন্য পাড়ি জমাল ফ্রান্সে।

নুসরাতও পড়াতে ভালো ছিল। লিপি বেগমের মুখে শুনেছিল, আরশ নাছির সাহেবকে বলেছে তাকে কমার্স বিভাগে ঢোকাতে, কিন্তু নুসরাত এটা জানার পর ঘাড়ত্যাড়ার মতো জেদ ধরে সাইন্স বিভাগে ঢুকল।

নুসরাত কোনো রকম পাস করে যেত টেনেটুনে। তারপর মনে হলো, এমন করে চলে না, তাই মনোযোগী হলো পড়াশোনায়। এর মধ্যে পঞ্চম বারের মতো সে আর ইরহাম হাই স্কুল থেকে টিসি পেয়ে গিয়েছে। প্রথম টিসি পেল ক্লাস এইটে থাকতে। একটা ছেলে প্রপোজ করায় সে আর ইরহাম মিলে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে ফেলেছে ওই ছেলের। দ্বিতীয় টিসি পেল স্যারের সাথে কথা বলতে বলতে নুসরাত ঝগড়া বাঁধিয়ে ফেলায়। ইরহাম বসে থাকতে পারেনি, তার জানের জিগার দোস্তকে ঝগড়া করতে দেখে। পরপর দু-মাসের মধ্যে দুটো স্কুল পরিবর্তন করানো হলো তাদের। নাছির সাহেব পুরো বিরক্ত হয়ে পড়লেন দু-জনের প্রতি। নাজমিন বেগম দশ মিনিট এক পায়ে ভর দিয়ে কানে ধরিয়ে বাড়ির বাহিরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। আর তা ভিডিও করে আহান পাঠিয়ে দিল জায়িনের কাছে। জায়িনের কাছ থেকে ভিডিও গেল জায়ানের কাছে, আর জায়ানের কাছ থেকে পৌঁছাল এই ভিডিওটা আরশ পর্যন্ত।

আরশ কিৎকাল ভ্রু কুঁচকে চেয়ে ছিল মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে। তারপর অনিহা নিয়ে মোবাইল রাখতে গিয়ে ভিডিও জুম করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। মেয়েলি মুখটা স্ক্রিনে পরিষ্কার হতেই হাত থেমে গেল, আর জুম করল না আরশ। চোখের আকার ধীরে ধীরে সরু হয়ে আসলো তার। অস্ফুটে একটাই শব্দ মুখ দিয়ে উচ্চারণ হলো, 'এত বড় হলো কবে?'

আর এটা শুনে নিল জায়ান দরজার বাহির থেকে, তা নিয়ে ভেঙে আরশকে অনেকদিন যাবত। শেষ পর্যন্ত একদিন মুখ ফসকে এই কথা বলে দিল সবার কাছে। ইরহাম এটা জানার পর থেকে নুসরাতের পিছু লেগে থাকে সারাক্ষণ। নুসরাত কথা বললেই একটা কথা বলে থামিয়ে দেয়, 'এত বড় হলো কবে,' বলে!

ক্লাস এইটে দু-বার টিসি পাওয়ার পর কোনো রকম ভালোয় ভালোয় নাইনে পর্দাপন করল দু-বাঁদর। সেখানে ভালোয় ভালোয় কয়েকদিন কাটল। মাস তখন মে। সাল তখন সতেরো। এক স্যার পড়াতে পড়াতে বললেন, 'সর্বদা একটা কথাই মনে রাখবে, পড়াশোনা করে যে গাড়ি ঘোড়া চলে সে। আপনাদের কারোর কী দ্বিমত আছে এই কথায়?'

সকলে হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাল। শুধু নুসরাত আর ইরহাম এতে দ্বিমত পোষণ করল। ইরহাম এক হাত উপরে তুলে বলে ওঠল, 'স্যার, আই হেভ গভীর প্রশ্ন ইন মাই ইনসাইড।'

স্যার বললেন, 'জ্বি, বলুন কী প্রশ্ন!'

ইরহাম গম্ভীর মুখ বানিয়ে উঠে দাঁড়াল। নিজের সুন্দর মুখখানা ঘুরিয়ে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল তাকে সমর্থন করার জন্য।

নুসরাত ভরসা দিল, সে সমর্থন করবে যাই হয়ে যাক না কেন! ইরহাম কঠিন প্রতিবাধী সুরে বলে ওঠল, 'স্যার, আমাদের ক্লাসের ডংকি, আই মিন রণি, সারা বছর কিছু পড়ে না, সরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ কী, তাও চেনে না। এমন কী, ও নিজের নাম লিখতে পর্যন্ত পারে না, গত দু-বছর ধরে এক ক্লাসে, তবুও সে মার্সিডিজ বেঞ্জের কালো গাড়িতে চড়ে রোজ স্কুলে আসে। কিন্তু আপনারা এত পড়ালেখা করে কী হলো? আপনি আসেন সাইকেলে করে, আমাদের রফিক স্যার আসে বাইকে করে, আর প্রধান শিক্ষকের কথা না বললেই চলে। উনি তো আপনাদের থেকে বেশি শিক্ষিত হয়ে রোজ হেঁটে হেঁটে স্কুলে আসেন। তাহলে পড়াশোনা করে হবেটা কী!'

স্যার তক্কুল মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নিজের জায়গায়। কঠোর কন্ঠে কিছু বলতে যাবেন, নুসরাত উঠে দাঁড়াল। তর্জনী আঙুল তুলে ভাষণ দিল, 'স্যার, আপনাদের পড়াশোনা করে যে গাড়ি ঘোড়া চলে, সেটা অল্ড ভার্সন প্রবাদ হয়ে গিয়েছে। নতুন প্রবাদ বাক্য হলো, পড়াশোনা করে যে অনাহারে মরে সে।'

পুরো ক্লাসরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। ইরহাম নুসরাত নিজেদের। জায়গায় অটল দাঁড়িয়ে। সারাদিন কোনো কিছু ঘটল না। ছুটির সময় পিয়ন এসে তাদের হাতে টিসি ধরিয়ে দিয়ে গেল। নুসরাত আর ইরহাম কাঁধ মিলিয়ে বাড়ি যেতে যেতে হাসল। নুসরাতকে সৌরভি জিজ্ঞেস করল, 'তোরা অবাক হলি না কেন টিসি দেওয়ার পর?'

ইরহাম কিছু বলতে যাবে, নুসরাত থামিয়ে দিল। সে বলল, 'আমরা জানতাম আজ আমাদের শেষ দিন স্কুলে। মদন স্যার রাগী রাগী চোখে কেমন করে তাকাচ্ছিল, দেখলি না আমাদের দিকে! আজ যদি এরা টিসি না দিত, তাহলেই আমরা বেশি অবাক হতাম। টিসি দেওয়ায় অবাক হইনি। জীবনে এত বেশি অবাক হয়েছি যে, অবাক হওয়ার সিস্টেমটা এখন আর কাজ করে না, অকেজো হয়ে গিয়েছে।'

বাড়িতে মুখ গোমড়া করে নিয়ে টিসি যখন হেলাল সাহেবের হাতে তুলে দিল দু-জনে, তখন ঝর্ণা বেগমের ঝাটার বারি খেল। ঝাটার বারি খেয়েও দু-জনে দাঁত কেলিয়ে হাসল। এরপর অনেক কষ্টে সুপারিশ করে ইরহাম আর নুসরাতকে নিয়ে ভর্তি করানো হলো নতুন স্কুলে। এবার সোহেদ নিয়ে ভর্তি করালেন। আর বাড়ি থেকে দু-হাত জোর করে বলে দেওয়া হলো যেনো কোনো প্রকার বদমায়েশি না করে। নুসরাত আর ইরহাম তো থেমে যাওয়ার পাত্র না। দু-মাস কাটল নেচে-কুঁদে। ততদিনে নুসরাত ভালো ছাত্রী হিসেবে অনেক স্যারের মন জয় করে নিয়েছে। পদার্থ বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় পড়াতে গিয়ে স্যার একটা কথা বললেন, 'নিউটনের মাথায় আপেল পড়েছে বলে সে এটা নিয়ে রিসার্চ করেছে। সৈয়দ, আপনার মাথায় আপেল পড়লে আপনি কী করতেন?'

নুসরাত লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। চোখে মুখে টানটান ভাব বজায় রেখে স্যারের দিকে একবার তাকাল। পুরো ক্লাসরুম তখন নিস্তব্ধ। পদার্থ বিজ্ঞানের জয় স্যারকে সবাই ভয় পায়। লোকটা হাত দিয়ে মারে না, কিন্তু কথা দিয়ে লজ্জা দেয় অনেক বেশি। সবার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু নুসরাত। অনেকেই অনেক ভাবে মেয়েটাকে চিনে। কেউ গুন্ডি হিসেবে, কেউ খারাপ হিসেবে, আর কারোর কাছে ভালো মেয়ে হিসেবে। একেকটা ক্লাসের ছেলে চোখ ফেড়ে নুসরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে। নুসরাত অস্বস্তি বোধ করল, এমন চাহনি নিজের দিকে নিবিষ্ট হতে দেখে। তা আবার ঝটপট ঝড়ে ফেলে ঠোঁট নাড়িয়ে খুবই মশ্রিণতার সহিত উত্তর দিল, 'নিউটন একটা বোকা চন্দ্রবিন্দু ছেলে। আপেলের মতো একটা সুস্বাদু ফল দিয়ে কেউ কী রিসার্চ করে? আমি ওর জায়গায় হলে প্রথমে আপেলটা খেয়ে দেখতাম, স্বাদ আছে কী নেই! আর যদি বিষাদও হতো, তাহলেও আমি খেয়ে ফেলতাম, কারণ এটা হলো আপেল ফল। ওসব বালের রিসার্চ টিসার্চ আমি নুসরাত নাছির কখনো করতাম না। এসব করে চোখের নিচে কালো দাগ ফেলার কোনো মানেই হয় না। কবি নুসরাতদ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, 'নিজে সুখে থাকো, অন্যকে কখনো সুখে থাকতে দিও না,' আর তার প্রতিফলন ঘটেছে নিউটন হালার ফুতের মধ্যে। রিসার্চ করেছে ওই ব্যাটা গোলামের ফুত, আর ঠেলা সামলাতে হচ্ছে আমাদের। পড়তে হচ্ছে সাইনস্কয়ার টিটা প্লাস কসস্কয়ার টিটা ইকুয়াল ওয়ান। মানে ভন্ডামির একটা লিমিট থাকা প্রয়োজন। ফলটা খেয়ে নিলে কী এমন হতো! এটা উত্তল, অবতল, সমতল, যেদিকে পড়ুক, তোর সমস্যা কী ভাই! আপেলটা হা করে একটা কামড় দিয়ে খেয়ে নিতি, সবকিছুর সমাধান হয়ে যেত। না, তা কেন করবে সে! আমাদের বড় বড় বাঁশ তো দিতেই হবে ওর। তাই আপেলটা না খেয়ে আমাদের জন্য বড় বড় বাঁশ রেখে গিয়েছেন উনি। অতএব বোঝা যায়, মানুষ নিজেও ছোট বাঁশ খেলেও পরের জন্য বড় বড় বাঁশ রেখে যায়, আর এটাও প্রমাণিত হলো যে নিউটন স্যারের জায়গায় আমি থাকলে আপেলটা খেয়ে নিতাম।'

ইরহাম নুসরাতের কথায় দাঁড়িয়ে পড়ল। পুরো ক্লাসরুম তখন নিশ্চুপ হয়ে বসে। জয় স্যার হলেন নিউটনের বিগেস্ট ফ্যান, আর এই মেয়ে নিউটনকে গালি টালি দিয়ে এখন স্যার ডাকছে। আজ এই মেয়ের রক্ষা নেই। নিরিবিলি ক্লাসে আরো বেশি নীরবতা ভর করল। তখনই তাদের কানে আসলো ইরহামের গলা। সে দাঁড়িয়ে বলছে, 'স্যার, নুসরাতের কথা শুনে একটা গানের কথা মনে পড়ে গেল।'

জয় স্যার দু-হাত বুকে বেঁধে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দেখছেন তাদের। হাত সামনে বাড়িয়ে রাজকীয় ভঙ্গিমায় ইরহামকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিরেট সুরে বললেন, 'জ্বি, গেয়ে ফেলুন।'

ইরহাম সুর টেনে গেয়ে উঠল,

'এক হু গায়িই হাম অর তুম

তু উঠ গায়ি নিন্দে রে

অর খানকি, খানকি, খানকি, খানকি, খানকি, পায়েল মাস্তি মে।'

এর পরপর স্যার ক্লাস ছাড়লেন। দু-মিনিটের মধ্যে প্রিন্সিপাল অফিসে ডাকা হলো তাদের। নুসরাত আর ইরহাম বইয়ের ব্যাগ, ছাতা, পানির পট সব হাতে নিয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে নিল। তারা হলফ করে বলতে পারে টিসি তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে। তাই সব নিয়েই যাচ্ছে। প্রিন্সিপাল রুমে পা রাখতেই এসির ঠান্ডা হাওয়া লাগল দু-জনের গায়ে। তখনই ফিসফিস করে ইরহাম নুসরাতের কানে কাছে বলল, 'দেখছিস মা, দার চু* দে রা কীভাবে এসির বাতাস খাচ্ছে, আর আমাদের ফ্যানের গটগট শব্দ শুনিয়ে বাতাস খাওয়াচ্ছে। এসব স্কুলকে আমার বালও বারি মারবে না।'

প্রিন্সিপালের সামনে দু-জনেই নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে দাঁড়াল।

প্রিন্সিপালের সামনে দু-জনেই নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে দাঁড়াল। এমনভাবে এখানে কী হচ্ছে, উনারা বুঝতে পারছে না। প্রিন্সিপাল চশমার উপর দিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাদের দিকে তাকালেন। থমথমে গা হিম করা শীতল সুরে জিজ্ঞেস করলেন, 'সৈয়দ বাড়ির ছেলে মেয়ে?'

দু-জনেই হ্যাঁ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল। ঠোঁটে তখন কোনো কথাই ফুটছে না। প্রিন্সিপাল জিজ্ঞেস করলেন, 'ভয় পাচ্ছো আমাকে?'

ইরহাম একহাতে নুসরাতের হাত চেপে ধরে চিমটি কাটল, যাতে হ্যাঁ বলে। নুসরাত তা মানলই না। সে এতক্ষণ ইনোসেন্ট মুখ বানিয়ে যে হাসি আটকে রেখেছিল, তা ফুস করে ছেড়ে দিল। মিনমিনিয়ে বলেই ফেলল, 'আপনাকে দেখে ভয় পাওয়ার থেকে হাসি আসছে আমার বেশি। কার্টুনের সেই পেট উঁচু, ঘুষখোর হাবিলদার লাগছে আপনাকে দেখতে স্যাআআর।'

ইরহামও এতক্ষণ হাসি সংবরণ করলে এবার হেসে দিল। দু-জনেই হে হে করে হেসে পুরো প্রিন্সিপাল রুম ফাটিয়ে ফেলল। কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হলো এভাবেই। এর পরেই তাদের ময়লা ফেলার মতো হাতে টিসি ধরিয়ে স্কুল থেকে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলা হলো গেটের বাহিরে। সিকিউরিটি গার্ড তাদের মুখের উপর লাগিয়ে দিল লোহার তৈরি গেট।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন