হাতে টিসি নিয়ে বাড়ি পৌঁছে কাউকে কিছু জানাল না। বিকেলে খেয়ে দেয়ে কিছুক্ষণ মোবাইল দেখল দু-জনে শুয়ে বসে। এরপর হাঁটাহাঁটি করল। একদম নরমাল থাকল। রাতে খাবার খাওয়ার সময় হাতে টিসি নিয়ে এসে তা নিজ নিজ বাবাদের হাতে ধরিয়ে দিল। অতঃপর দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিল হেলাল সাহেবের কেন্দ্রস্থলে। হেলাল সাহেব দু-হাতে দু-জনকে বুকে চেপে ধরলেন। গা কাঁপিয়ে হাসতে হাসতে না দেখেই বলে দিলেন, 'এইজন্য বলি, এতদিন হয়ে গেল কেন, এখনো টিসি আসেনি, এবার একটু শান্তি লাগছে এটা দেখে।'
হেলাল সাহেবের সামনে কেউই কোনো শব্দ করল না। হেলাল সাহেব চলে যেতেই বাঘিনীর মতো নাজমিন বেগম এসে নিজের জুতো দিয়ে পিঠে আঘাত করলেন ধুপধাপ। শোহেব সাহেবের থাপ্পড় দুটো করে পড়ল গালে। ঝর্ণা বেগমের ঝাটার বারি আর রুহিনী বেগম কচ্ছপ বানিয়ে রাখলেন একঘণ্টা। পুরো একদিন লিপি বেগম কিছু খেতে দিলেন না। ইরহাম আর নুসরাতের পকেট মানি দু-মাসের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। কঠিন এই শাস্তি পাওয়ার পর দু-জন নিজেদের কিছুটা শুধরে নিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তখনো ঠিকই শয়তানি করে বেড়াচ্ছে।
এক বাংলা ব্যাকরণের ক্লাসে স্যার ইরহামকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বাংলা ব্যাকরণ মানে তোমার কাছে কী? এর ভেতর থেকে তুমি কী শিক্ষা অর্জন করেছ?'
ইরহাম গলা খাঁকারি দিয়ে উঠে দাঁড়াল। নুসরাত ততক্ষণে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। কানে আসলো ইরহামের কথা, 'স্যার, হাছা কথা কই, নাম লিখিয়া রাখছে ঠিকই বাংলা ব্যাকরণ, কিন্তু ভেতরে ঢুইকা দেখি পুরা চায়নিজ ভাষা। তাই এইসব বাল পড়ব না ভেবে ফেলে রাখছি চাইনিজ ব্যাকরণ বইটা কোন চিপায়। ওখানে সব বাল লিখে রাখছে, বা ল পড়মু না বলে বালটার খবরও রাখি না। এখন এই চায়নিজ ব্যাকরণ নিয়ে আমার অনুভূতিটাই চায়না বালের মতো হয়ে গিয়েছে।'
আধঘণ্টা পর পঞ্চম টিসি হাতে নিয়ে এসে ইরহাম একা সৈয়দ বাড়ির ফটকে দাঁড়াল না, নুসরাতও দাঁড়াল। সে প্রিন্সিপালের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ভুলে বদমাশ বলে ফেলেছে। এভাবেই দিন চলতে থাকল, হাসি মজা, আর দুষ্টুমির ভেতর। সৈয়দ বাড়িতে তখন বাহিরে ঘরে রঙ বেরঙের প্রজাপতির আনাগোনা। খুশির শেষ নেই। প্রতিদিন বিষন্ন দুপুরে বসে বাড়ির কর্তীরা ভিডিও কলে কথা বলেন নিজেদের ছেলেদের সাথে। দিন দুপুরে বিরশ হয়ে যাওয়া মুখখানা ছেলেদের সাথে কথা বললেই হাসি ফোটে তাদের।
ক্যালেন্ডারের মধ্যে কাটা পড়ল আরেক বছর। এস-এস-সি পরীক্ষা সময়
ধীরে ধীরে কাছে আসলো। সব পরীক্ষা দিল নুসরাত আর ইরহাম খুব ভালো। কিন্তু মনে একটা খুঁতখুঁত ভাব থেকেই গেল। পরীক্ষা শেষে নুসরাত আর ইরহাম পুরো আলেম। দু-জনের একজনের মাথায় সবসময় টুপি আর আরেকজনের মাথায় হিজাব হাঁটু সমান। প্রতিদিন তাহাজ্জুদের নামাজ মিস নেই তাদের। এক তাহাজ্জুদ নামাজের সময় নুসরাতের বুকের ধড়ফড়ানি বাড়ল, রেজাল্ট কী হবে ভেবে! দু-হাত আল্লাহর দরবারে তুলে কেঁদে দিল সে। নীরবে কান্না করল শেষ রাতের দিকে। কান্নার একটু পরিমাণ শব্দ হলো না। সেজদাহ্ এ মাথা ঠেকিয়ে দোয়া করল, 'হে আল্লাহ! আমি জানি না কিভাবে ডাকলে আপনি আমার ডাকে সাড়া দিবেন। আমি জানি না কিভাবে চাইলে আমার চাওয়া আপনি পূরণ করবেন। আমি জানি না কিভাবে হাত উঠালে আমার হাত আপনি ভরে দিবেন। আমি জানি না কিভাবে দোয়া করলে আমার দোয়া গুলো আপনি কবুল করবেন। কিন্তু আপনি আপনার গুণাহগার বান্দার অন্তরের খবর জানেন। ইয়া রব, আপনি তো আমার অন্তরটা দেখেন। আপনি তো বলছেন- "তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।” তোমরা আমার কাছে চাও, আমি তোমাদের চাওয়া পূরণ করবো। আপনি তো বলছেন, আপনি খালি হাত ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। আমি আপনার অযোগ্য বান্দা হওয়া সত্ত্বেও, আপনি আমার যোগ্যতার বাহিরে অনেক কিছু দান করেছেন। আমি এবারও বিশ্বাস করি, আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না। আমি জানি, আমি ছাড়া আপনার কাছে অনেক উত্তম বান্দা আছে। কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই আবদার করার মতো, ডাকার মতো, চাওয়ার মতো। ইয়া রব, আমি দুর্বল, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না। আমি তার উপযুক্ত নই। আমার পরীক্ষা সহজ করে দিন। ইয়া আমার রব, আমার ডাকে সাড়া দিন। আমার চাওয়াকে পূরণ করুন। ইয়া মালিক, ইয়া রাব্বুল আলামিন, আমার খালি হাত আপনার রহমত দিয়ে পূর্ণ করে দিন। আমার মনের আশা ভরসা সব কবুল করুন। হ্যাঁ আল্লাহ, আপনি আমাকে রূপ, গুণ, সৌন্দর্য দেননি, কারণ আপনার কাছে আমি সুন্দর, তাই আপনি আমাকে বানিয়েছেন। এই নিয়ে আপনার প্রতি আমার কোনো নারাজি নেই। শুধু একটাই দোয়া করব, আমার কালো মুখের মতো আমার ভাগ্যটা আপনি
কালো করবেন না। মানুষ বলে, মেয়ে মানুষের চেহারার থেকে ভাগ্য
সুন্দর হওয়া জরুরী। ইয়া আমার রব, আমার ভাগ্যটা আপনি সুন্দর করে দিন। আপনার রহমতের বর্ষণ আমার ভাগ্যের উপর করুন। আপনি উদার, আমি জানি, আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না। আপনার নিকট এই আর্জি আমার।'
এর পরের দিন থেকে নুসরাতের মন ফুরফুরে হয়ে গেল। মনের ভেতরের ভয়গুলো উবে গেল কোথাও একটা। কারোর সামনে ভয় জাহির না করলেও, তাহাজ্জুদের নামাজের সময় দোয়া করতে গেলেই নুসরাতের বুক ভয়ে ধুরুধুরু করে কাঁপত। রেজাল্ট যেদিন বের হবে, সেদিন সকাল থেকে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে তসবিহ আঙুলে ঝপতে শুরু করল নুসরাত। হাঁটল আর পড়ল দোয়া ইউনুস। খাবার দাবার নেই তার। ইরহামের অবস্থা ও তেমন। সে জায়নামাজে বসে। সে পণ করেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত রেজাল্ট দিবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সে এখান থেকে উঠবে না। নুসরাত মনে মনে আল্লাহর কাছে মানল দশ রাকাত নফল নামাজ আর কুরআন শরীফ এক খতম দিবে। যদি এ-প্লাস আসে, আর না আসলেও দিবে। বারোটার সময় রেজাল্ট পাবলিশ হলো। তখন সার্ভার পুরো ডাউন। নেটওয়ার্ক প্রবলেম এত হলো, নুসরাত প্রায় ঘেমে নেয়ে গোসল করে ফেলল ভয়ে। দু-পাশে দু-জন ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। নুসরাত যখন লগইন করল, তখন বোর্ড রোল আর রেজিস্ট্রেশন রোল দিতে গিয়ে হাত কাঁপতে কাঁপতে একদম যাতা অবস্থা। ইরহাম সোহেদ সাহেবকে ল্যাপটপের সামনে বসিয়ে, সে শ্বাস বন্ধ করে চিৎ হয়ে শুয়ে রইল। ইরহামের রেজাল্ট আগে শো করল ল্যাপটপের স্ক্রিনে। সোহেদ সাহেব ইরহামের গায়ে ধাক্কা দিয়ে উচ্ছ্বাসিত গলায় বললেন, 'ফোর পয়েন্ট এইট এইট এসেছে আমাদের ইরহামের।'
নুসরাত মুখ কালো করে ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে তখনো। তার বেলায় এই নেটওয়ার্ক হেক্কের হেক্কের করছে কেন। শেষ পর্যন্ত যখন রেজাল্ট শো হলো, নুসরাত সবার আগে দেখল ফেইল করেছে কিনা। যখন নিশ্চিত হলো ফেইল করেনি, তখন পয়েন্টের দিকে তাকাল, আর এতেই তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে ঠাস করে পড়ে গেল সোফার উপর। সবাই মনে করল, হয়তো এক সাবজেক্টে ফেইল এসেছে, তাই এমন। নুসরাত মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়ে হুঁশ হারিয়েছে। সবাই নুসরাতকে সান্ত্বনা বাণী দিল। নাজমিন বেগম মনে করলেন, নুসরাত অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে, গলা ফাটিয়ে হাই হুতাশ করে বললেন,
'ইয়া আল্লাহ, ফেইল করলে কোর্টের সমস্যা নেই, আবার পরীক্ষা দিবি। এবার পাস করিসনি, সামনের বার পাস করবি। আমি তোকে মারব না। হুঁশে আয় মা আমার।'
তখন ফোনের অপর ফোন আসছে সবার কাছ থেকে। আরশের কল থামার নেই। সকাল দশটা থেকে সে কল দিয়েই চলেছে। কাজ থেকে এসে এখনো ঘুমায়নি। সবাই বলছে ঘুমিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু সে অটল বসে আছে রেজাল্ট জানার জন্য। লিপি বেগম আরশের কল ধরে বললেন, 'খারাপ হয়ে গিয়েছে মনে হয় রেজাল্ট।'
ইসরাত মায়ের হাই হুতাশ দেখে নিজেই ল্যাপটপ টেনে নিল। স্ক্রিনে পয়েন্টে জায়গায় মোটা মোটা অক্ষরে লেখা ৫.০০।
লিপি বেগমের কথা শেষ হতেই আরশ নীরবে ফোন রাখতে যাবে, তখন ইসরাতের উচ্ছ্বাসিত সুর ভেসে আসলো। সে চিৎকার দিয়ে বলছে, 'আরে, আরে, খারাপ হয়েছে রেজাল্ট কে বলেছে! নুসরাতের তো জি-পি-এ ফাইভ এসেছে।' লিপি বেগমের চোখদ্বয় বড় বড় হয়ে গেল। অফিস থেকে নাছির সাহেব, শোহেব সাহেব, এমনকি হেলাল সাহেবও কল দিচ্ছেন। নুসরাতের নানা বাড়ির লোক, ইরহামের নানা বাড়ির লোক ফোনের উপর ফোন করছে। নাজমিন বেগম ঠাস করে নুসরাতের বাহুতে থাপ্পড় মারলেন। আক্ষেপের সুরে নুসরাতকে শুধালেন, 'তাহলে এমন ভঙ্গ ধরে পড়ে আছিস কেন?'
নুসরাত হেসে ফেলল। কোনো কথার উত্তর না দিয়ে নফল নামাজ আদায় করতে দৌড়াল। ইরহাম নিজেও দৌড়াল নুসরাতের পিছু পিছু। রুমে গিয়ে মাথায় টুপি পরে ওযু করে নামাজে লুটিয়ে পড়ল শুকরিয়া আদায়ের জন্য।
নুসরাতের দরজা লাগিয়ে খুশিতে হাউমাউ করে কান্না করছে। নুসরাতের কান্নার শব্দ এত জোরালো যে মেহেরুন নেছা আরশের কথা কানেই শুনছেন না। তিনি বললেন, 'তোর বউ পাস করার খুশিতে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে, শুনছিস কী কান্না করছে!'
আরশ কথা বলল না। কিচেনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা কাটতে কাটতে শুধু শুনল ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা যৌবনে পা দেওয়া যুবতীর কান্নার আওয়াজ। মেহেরুন নেছার কথাও তার কানে গেল না। নীরবে শ্রবণ করল কান্নার শব্দগুলো। এরপরই থেমে গেল।
নুসরাত নিজের গলার আওয়াজ নামিয়ে নিল। সকল আবেগ মিশিয়ে আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করল। সে বলল, 'ইয়া আল্লাহ, আপনার নিকট আমি যা চেয়েছি, আপনি তার থেকে দ্বিগুণ আমাকে দিয়েছেন। ইয়া আমার রব, ইয়া আমার সৃষ্টিকর্তা, আপনার কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। হাজারো শুকরিয়া আদায় করলাম আপনার নিকট। আপনি আপনার এই গুণাহগার বান্দাকে ফিরিয়ে দেননি। আপনি আমার দোয়া কবুল করেছেন, আল্লাহ, আপনি মহান, আপনি মহান আমার রব। আপনি হলেন উত্তম পরিকল্পনাকারী।'
নুসরাত সেদিন নামাজে কাঁদল অনেক সময়। সব সাবজেক্টে ভালো মার্ক পেল সে, শুধু পিজিক্স, ইংরেজি, আর ইসলাম শিক্ষায় মার্ক কম আসলো। নুসরাত চোখ উলটে চেয়ে রইল ইসলাম শিক্ষার মার্কের দিকে। মাত্র চার মার্কের জন্য তার এ প্লাসটা গিয়েছে। তিনটা মাত্র প্লাসের জন্য তার গোল্ডেন চলে গেল। তাই নুসরাত ঠিক করল বোর্ড চ্যালেঞ্জ করবে। ইসরাত নিষেধাজ্ঞা জারি করল। ধমকে উঠে বলল, 'গোল্ডেন এ প্লাসের সামনে কী গোল্ডেন লেখা থাকে? আর থাক! বোর্ড চ্যালেঞ্জ করার দরকার নেই।'
নুসরাত কত কষ্ট পেল, কাকে বলে বোঝাবে! এরপরের দিনগুলো তরতর করে কেটে গেল। চার বছর বয়সে প্রাইমারিতে ভর্তি হওয়ায় ষোলো বছরে নুসরাত এসএসসি দিয়েছে। সতেরো বছরে এইচএসসি। যখন নুসরাত এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন একদিন তার কানে আসলো আরশ ভাই আর দেশে আসবেন না। তা নিয়ে জায়িন ভাইয়া আর ইসরাতের সাথে কথা বলছেন বড় আব্বু। অহ হ্যাঁ, গত বছর ইসরাত জায়িন ভাইয়ের কাছে পাড়ি জমিয়েছে। বাড়িতে এখন শুধু নুসরাত, ইরহাম আর আহান। আরিশা হোস্টেলে থাকে। মানুষে বড়পুর বাড়িটা এখন মানুষের অভাবে খা খা করে।
একদিন সকালে নুসরাত আর ইরহাম কম্বলমুরি দিয়ে রেস্টুরেন্টে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল একটা কাপল বসে আছে। তারা অতোটা পাত্তা দিল না। দুটো ক্যাপাচিনো আর একটা পাস্তা অর্ডার করল। দু-জন মুখোমুখি বসে পাশে বসা কাপলের দিকে আড় চোখে অবলোকন করতে লাগল। এই সতেরো বছরের জীবনে দু-জনের একজনের দ্বারা রিলেশন হয়নি। নুসরাতকে একবার একটা ছেলে প্রপোজ করেছিল। নুসরাত ইরহামের কাছে সাজেশন নিতে আসলে ইরহাম বলল, 'গলা পর্যন্ত ইগো নিয়ে তুই করবি রিলেশন, হাসাইলিরি ছকিনা।'
এরপর আর ওসবের ধার ধারেনি নুসরাত। তার মনে মনে কিছু উদ্ভট চিন্তা প্রেম ভালোবাসা নিয়ে তৈরি হলো। ভালোবাসা, প্রেম এসব ফালতু জিনিস। সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই হয় না এতে। যারা এসব করে, এদের অতিরিক্ত সময়, নুসরাত তো খেয়ে দেয়ে সময় পায় না, আবার এসব বাবু সোনা করবে। অসম্ভব! ভাবনাই আনা এসব বিলাসিতা। নুসরাত আর ইরহাম কাপলকে দেখে মিটিমিটি করে শুধু হাসল একে অপরের দিকে তাকিয়ে। তখন ছেলেটার কথা তাদের কানে আসলো। ছেলেটা মেয়েটার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলছে, 'তোমার জন্য আকাশের চাঁদ তারা পর্যন্ত আমি নিয়ে আসতে পারি।'
নুসরাত আর ইরহাম শব্দ করে হেসে ফেলল। নুসরাত নিজের ভেতর কথা চেপে রাখতে না পেরে জোরে জোরে বলেই দিল, 'হ চাঁদ তারা তো তগো বাপ দাদার সম্পত্তি, গেলি, হাত বাড়ালি, পকেটে পুরে নিয়ে চলে আসলি।'
এটা বলতেই দু-দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই লেগে গেল। নুসরাত ইরহামের দিকে তাকিয়ে বলল, 'মেরে দেই ঘাড়ে একটা?'
ইরহাম মাথা নাড়াল। নুসরাত হাত সোজা করে ছেলেটার ঘাড় বরাবর একটা থাপ্পড় বসাতেই ছেলেটা হেলে পড়ল। ইরহাম চোখ বড় বড় করে জানতে চাইল, 'নুসরাতরে মেরে ফেললি নাকি?'
নুসরাত আতঙ্কিত চোখে ইরহামের পানে চাইল। চোখের আকার প্রকট করে বলে ওঠল, 'মনে হয় রে দোস্ত।'
ইরহাম আর্তনাদ করে উঠল। হতবাক চেহারা নিয়ে একবার ঢোক গিলল। নুসরাতকে ভৎসনা করে বলল, 'তোকে বলেছিলাম অজ্ঞান করতে, তুই কেন মেরে ফেললি? তোকে দিয়ে একটা কাজ ঠিক করে হয় না।'
নুসরাত চ্যাত করে উঠল। নিজের দোষ স্বীকার না করে সাফাই গাইল, 'আমি কী জানতাম মরে যাবে! আমি তো একটা শুধু ক্যারাটের স্টেপ ইউজ করেছি। এটা অজ্ঞান হওয়ার বদলে টপকে যাবে কে জানতো!'
ইরহাম এক হাতে নুসরাতের হাত চেপে ধরে বলল, 'তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, বলদ, পালা ভাই পালা... নাহলে কঠিন বিপদ ঘটে যাবে।'
কয়েকদিন পর জানা গেল ছেলেটা ডিহাইড্রেশনের কারণে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। নুসরাতের জন্য না। আর নুসরাত ভেবে বসেছিল ছেলেটা তার জন্য মারা গেছে। কথাখানা ভেবে ভেবে ডিপ্রেশনে প্রায় চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু এই খবরে সে আর ডিপ্রেশনে গেল না। এইচএসসি দেওয়ার পর আরো দু-বছর কেটে গেল। আরশের বিদেশ যাওয়ার ততদিনে সাত বছর পেরিয়ে আটে পা দিচ্ছে। নুসরাতের সাথে তার কথা হয় না দশ বছর যাবত। দু-জনে এক সুতো বাঁধা মানুষ, দু-দেশে দু-ভাবে গড়ে উঠতে লাগল। সময়ের বির্বতনে নুসরাত পূর্ণ যুবতীতে পরিণত হলো আর আরশ একজন চওড়া দেহি যুবক থেকে পরিপূর্ণ পুরুষ। উজ্জ্বল শ্যামলা মুখটার রঙ পরিবর্তন হয়ে বিদেশিদের ছাপ পড়ল। বাঙালিয়ানা কথা বলার মধ্যে ও পরিবর্তন হলো ব্যাপক। লিপি বেগম যখন কথা বলেন, তখন শোনা যায় লোকটার কথা। আগের মতো মিনমিনে গলা থাকেনি। বড় গলা দিয়ে কথা বলে সে। কথা বলার মধ্যে মাঝে মাঝে ফ্রান্সি ভাষার কিছু শব্দও চলে আসে। ধীরে কথা বললেই শোনা যায় লোকটার কথা। নুসরাত এ নিয়ে দু-দিন ফোনের ওপাশে লোকটার কথা শুনেছে। একদিন লিপি বেগম জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'দেশে আসবি না?'
গমগমে গলার কোনো দেনামোনা ছাড়া সরাসরি উত্তর ওপাশ থেকে এসেছিল, 'না।'
আরেকদিন ভুলে কান খাঁড়া করে শুনে ফেলল, লিপি বেগম জিজ্ঞেস করছেন, 'ওখানে বিয়ে করে নিবি?'
সোজাসাপ্টা উত্তর ওপাশ থেকে আসলো, 'হ্যাঁ!'
তারপর লিপি বেগম বললেন, 'তাহলে নুসরাতকে ডিভোর্স দিয়ে দে, সংসার না করলে ওর নামের প্রথম থেকে তোর নামের ট্যাগ সরা।'
আবারো গম্ভীর সেই কণ্ঠ বলল, 'দিয়ে দিব!'
সেদিন রাতে নুসরাত রোজকার মতো এশার নামাজ পড়ছিল। নামাজ শেষে দু-দিকে সালাম ফিরাল। দু-হাত তুলে দোয়া করল নিজ মনে কিছু। দোয়া শেষে আমিন বলতে গিয়ে থেমে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল আরশের মুখের প্রতিচ্ছবি। নুসরাত বুঝল না, তার কী হলো, আকস্মিক চোখ ছাপিয়ে জল বের হলো। নৈঃশব্দে অতিবাহিত হলো কয়েক পল। পরপর কিঞ্চিৎ আলোপূর্ণ রুমের ভেতর থেকে গুমরে কান্নার শব্দ আসলো। ফিসফিসিয়ে কিছু দোয়া শোনা গেল, 'হে আমার রব, আপনি তো সব দেখেন, সব জানেন, আমার অন্তরে তার জন্য থাকা সকল অভিমান, রাগ, অভিযোগ মিটিয়ে দিন। সে যদি আমার জন্য এদেশে না আসে, তাহলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। সে আসুক... আমি চাই সে আসুক..! আমি লজ্জিত আমার কর্মে। আপনি তো জানেন, আমি নিজের অভিমানগুলো প্রকাশ করতে পারি না, নিজের কাজের জন্য কারোর কাছে ক্ষমা চাইতে পারি না, আপনি সব দেখেন, আপনি সব জানেন, আমার মনের ভেতর চাপা রাখা সকল আবেগ আমি প্রকাশ করতে চাই। এমন দম বন্ধ করে থাকা পরিস্থিতি হতে আমি মুক্তি চাই! আমি জানি বড় মা আমাকে কিছু বলে না, কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট ভাসে সে কষ্ট পাচ্ছে। ইয়া আল্লাহ, তার ভেতর তোমার রহমত বর্ষণ করুন, যাতে তার হৃদয় নরম হয়। সে যেনো ফিরে আসে, আমি তাকে সানন্দে গ্রহণ করব। 'হালালের শুভ্র চাঁদরে সবটুকু সুন্নাত গায়ে জড়িয়ে, সে আসুক হৃদয় ভরা হেদায়েত নিয়ে।'
এতটুকু দোয়া করে নুসরাত নীরব হয়ে গেল। কয়েক মিনিট নিশ্চুপ চোখের জল ফেলল জায়নামাজে।