ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ে তাহার আগমন

৭ম পর্ব

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

শীতের মৌসুম। গাছ হতে শিশিরের ফোটা চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে তখন। দক্ষিণে ঠান্ডা হাওয়া বইছে ধীরে ধীরে। ক্যালেন্ডারের পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা ডিসেম্বর মাসের সাত তারিখ। সাল দুই হাজার বাইশ। নাইট স্ট্যান্ডে পড়ে আছে চশমা, চিপসের প্যাকেট, জুস, আরো হাবিজাবি কিছু জিনিস। কনকনে শীতে কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে নুসরাত। গায়ে মোটা কম্বল থাকলেও শরীরে কোনো সোয়েটারের অস্তিত্ব নেই। প্লাজু সেলোয়ার পরণে থাকায়, তা হাঁটুর উপর উঠে গেছে। কম্বলের নিচ থেকে বের হয়ে আছে এক পা। সেদিকে কোনো ধ্যান না দিয়ে বালিশের মধ্যে মাথা রেখে ভুসভুস করে ঘুমাতে ব্যস্ত সে। মাথা পর্যন্ত টানা কম্বল। এলার্ম ভেজে চলেছে নিজ দায়িত্বে প্রতিদিনের মতো। নুসরাত তবুও এসব শুনছে না। সে ঘুমাচ্ছে, ঘুমাতে ব্যস্ত। এলার্ম কেন, তার কানের কাছে আস্তো একটা মানুষ এসে গলা ফেড়ে চিৎকার করলেও সে উঠবে না। এলার্মের আওয়াজ এত বেশি যে নিচতলা থেকে নাজমিন বেগমের শব্দ সহ্য করতে না পেরে ধুপধাপ পায়ে চলে আসলেন নুসরাতের রুমে। শব্দ করে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন তিনি। দু-হাতে কালো রঙের পাতলা পর্দা সরিয়ে দিলেন তিড়িৎতার সহিত। বিছানায় তখনো মাথা রেখে ঘুমিয়ে নুসরাত। নাজমিন বেগম গায়ের উপর থাকা কম্বলখানা টেনে সরিয়ে দিলেন। শক্ত হাতে এলার্ম অফ করে অন করে দিলেন ফ্যানের সুইচ। অতঃপর যেমন গটগট পায়ে এসেছিলেন, তেমন গটগট পায়ে চলে গেলেন।

নুসরাতের তখনো ঘুমের চোটে চোখ খুলতে পারছে না। নিভু নিভু চোখে চেয়ে দেখল রুমটা। তারপর আবারো নড়েচড়ে ঘুমানোর পয়তারা করতেই ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করল গায়ে। তখনই টনক নড়ল। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট সুরে শব্দ বের হলো, 'আম্মায়ায়া, সমস্যা কী তোমার?'

আর ঘুমাতে পারল না সে, উঠে ফ্যান বন্ধ করল সবার প্রথমে। তারপর অলস ভঙ্গিতে মাথায় ঢিলেঢালা একটা খোপা করে ওয়াশরুমে চলে গেল। রুমের পর্দা থেকে শুরু করে টাইলস পর্যন্ত কালো রঙের। এমনকি নুসরাতের বিছানা কালো আর গোল্ডেনের মিশ্রণে। বাথরুমের জুতো জোড়ায় শুধু নাইকের সাদা লোগো। বাথরুমে রাখা বাথরোবট। পর্যন্ত কালো রঙের। নুসরাত ব্রাশ করে মুখে পানির ঝাপটা দিল। তারপর টাওয়াল দিয়ে মুছে নিল মুখটা। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে প্রথমে নাইটস্ট্যান্ড থেকে ময়লা পরিষ্কার করল। বিছানা ওভাবেই ফেলে রেখে দিল। বিছানা গোছানো টোছানো এসব পারে না সে। হেলেদুলে ঘরের বাহিরে বের হয়ে আসলো। পরণে হ্যালো কিট্টির কালো রঙের টি-শার্ট আর হলুদ কালার প্লাজু। গলায় ল্যাভেন্ডার কালার ওড়না আর চোখে নিজের সাদা ফ্রেমের চশমা। নিচে নেমে আসতেই দেখল সবদিকে একটু বেশি রমরমে ভাব আজ। নুসরাতের কাছে খটকা ঠেকল কেমন জানি। সে চেয়ার টেনে নাস্তার টেবিলে বসতে বসতে শুধাল, 'বিশেষ কিছু কী দু-একদিনের ভেতর?'

মেহেরুন নেছা ড্রয়িং রুম থেকে বসে খুশি মনে বললেন, 'তোর জন্যই তো বিশেষ কিছু!'

নুসরাত কপালের ভাঁজ উপরে তুলে বাহবা দিল। নিজের দিকে ইশারা করে বলে ওঠল, 'আমার জন্য কী বিশেষ কিছু?'

মেহেরুন নেছা খিলখিল করে হাসলেন। বললেন, 'তোর ভাতার আইতাছে বাড়ি।'

নুসরাত মেহেরুন নেছার কথা সিরিয়াস নিলই না, সে হেসে উড়িয়ে দিল। এর মধ্যে রুহিনী এনে তার সামনে নাস্তার প্লেট দিলেন। নুসরাত রুহিনীর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। রুটি মুখে পুরে শুধাল, 'হাসছো কেন?'

রুহিনী বেগম মিটিমিটি হাসলেন। বললেন, 'তোমার ও আসছে।'

নুসরাত ভ্রু দ্বয়ের মাঝখানে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল, 'আমার ও কে?'

রুহিনী বেগমের ঠোঁটে তখনো মিটিমিটি হাসি। নির্দ্বিধায় বললেন, 'আরশ আসছে।'

নুসরাত আনমোনা ছিল। সে হেসে দিল রুহিনী বেগমের সাথে। নিরেট গলায় বলল, 'আরে, এটা বলতে এত হাসছো, আমি মনে করেছি কী না... কীঈইইইইইইইইই?'

নুসরাত তড়াক করে রুহিনী বেগমের দিকে তাকাল। চোখ বড় বড় করে হতবিহ্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'কী বললে আবার বলো!'

রুহিনী বেগম গলার আওয়াজ নিচু করে বললেন, 'তোমার ও আসছে।'

তারপর হাসতে হাসতে চলে গেলেন রান্নাঘরে। কিন্তু টেবিলে বসিয়ে রেখে গেলেন মূর্তির মতো নুসরাতকে। সে নড়তে প্রায় ভুলে গেল। চোখের পাতা ফেলা থেকে কতক্ষণের জন্য অবসর গ্রহণ করল। গা দিয়ে বয়ে গেল ঠান্ডা বাতাস। শরীরের লুম দিয়ে শিহরণ বয়ে গেল। সমস্ত অঙ্গের নিউরণ, কোষ, সব ঠান্ডা পড়ে রইল পুরো অস্তিমজ্জায়। মেহেরুন নেছার হেঁড়ে গলা তখন পেছন থেকে আসলো। তিনি কিশোরীদের মতো খিলখিল করে হেসে সুর টেনে বললেন, 'আমার কথা বিশ্বাস হইলো এইবার।'

অতঃপর নুসরাতকে ভেঙে গাইলেন, 'ভাতার তোমার ফ্রান্স গিয়াছে চাকরি করিতে, একলা বিছানায় আরশের বউয়ের ঘুম আসেনা ছটফটায় রাইতে।'

নুসরাত বুড়ির এমন গানে চোখ বড় বড় করে চেয়ে রইল। কী রকম তাকে ভেঙে গান গাচ্ছে এই মহিলা। নুসরাত ভেংচি কাটল মেহেরুন নেছাকে। এর মধ্যে নাজমিন বেগম এসে বললেন, 'আগামীকাল আরশ আসছে।'

নুসরাত নিমেষে ভুলে গেল গতকাল রাতে কী বলে দোয়া করেছিল। আরশ আসছে, তা দিয়ে সে কী করবে! তার কানের গোড়ায় কেন এসে প্যানপ্যানানি করছে আরশ আসছে বলে বলে। তাই নিজের ঘাড়ত্যাড়ামি বজায় রাখতে বলে ওঠল, 'তো, মাথায় তুলে নাচো তুমি।'

নাজমিন বেগম ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলেন, 'তুই এমন করে কথা বলছিস কেন? আরশ আসছে বলে তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে?'

নুসরাত অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বলল, 'আমার কেন সমস্যা হতে যাবে?'

'তাহলে তুই আরশ আসার কথা শুনতেই চ্যাত করে উঠেছিস কেন?'

নুসরাত নাক কুঁচকে তাকাল। মুখ ফুলিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। বলে ওঠল, 'আমার ভুল হয়েছে, খ্যামা করে দাও। তোমার আরশ আসলে মাথা তুলে নাচো, গাও, যা ইচ্ছে করিও, আমি চ্যাত করে উঠব না। মাফ দাও আমার মা!'

নাজমিন বেগম বললেন, 'তুই এমন ব্যবহার আরশের সাথে ও করবি?”

নুসরাত দু-ঠোঁট টেনে হাসল। খাবার রেখে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। খেতে আর ইচ্ছে হচ্ছে না তার। নাজমিন বেগমের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল, 'আমার এত সাহস আরশ ভাইয়ের সাথে এ ব্যবহার করব! আমি আরশ ভাই আসতেই তার ফর্সা চরণ দু-খানা ধরে ঝুলে পড়ব। তারপর যখন আরশ ভাই আমাকে লাঞ্ছি দিয়ে উনার পা থেকে ফেলে দিবে, তখন আমি উনার কোলে চড়ে বসব। ঠেলে ধাক্কিয়ে ফেলে দিতে চাইলেও আমি উনার কোলের উপর থেকে নামব না। বলব, আরশ ভাই, আরশ ভাই, চলেন ন্যাকামি করি আমরা।'

নাজমিন বেগমের কড়া চোখ নিজের পেছনে উপলব্ধি করল নুসরাত। সে পাত্তা দিল না। তার মা তার দিকে এমন করেই সবসময় তাকায় আর আজও তাকাচ্ছে। সে ভেবে পায় না, আরশ তার মায়ের আসল ছেলে নাকি সে আসল মেয়ে। তার মাথা মহোদয়া পারলে তো আরশকে মাথায় তুলে বসে যান। যত্তসব ফাউল মানুষজন তার বাড়িতেই বসবাস করে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন