নুসরাত একদিন গভীর চিন্তায় বসল আরশ আসার আগে। আর চিন্তার ফল বের হলো যে হ্যাঁ, আরশ ভাইকে সে ঘৃণা করে। এর কারণও আছে বিশেষ কিছু। এখন তার কাছে মনে হচ্ছে সবকিছুর মূলে তার দাদা আজমল আলী। মানে মানুষ কতটা ইউজলেস চিন্তার অধিকারী হলে মরার পথে কিন্তু নাতি নাতনীর বিয়ে দেখে যেতে চায় বলে। সে নাকি নুসরাত আরশের, জায়িন ইসরাতের সুখের সংসার দেখতে চায়। এদিক থেকে দেখতে গেলে ইসরাতের সুখের সংসার। শুধু নুসরাত কপাল ফোটা করে জন্ম করেছিল, তার না আছে সুখের সংসার, না আছে একটা জামাই। যা ছিল তাকেও নিজ দায়িত্বে সে লাথি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। আরশ যখন নুসরাতের কাছে জাহির করল, সে একটা মেয়েকে পছন্দ করে, তখন নুসরাত জেলাস হয়েছিল। আর আজ গিয়ে সে এটা বুঝল। ওই বয়সে করা নিব্বিদের মতো কাজ মনে হলেই ইচ্ছে করে কচু গাছে ফাঁস দিয়ে তার মরে যেতে।
আরশ বিদেশ যাওয়ার আগে যখন নুসরাতকে মেয়েটার ছবি দেখাল, তখন নুসরাতের মাথা এত গরম হলো, এক মুহূর্তে নুসরাতের পায়ের নিচের তালু জ্বলে ওঠল। মোবাইল থেকে বের করে দেখাচ্ছেন, 'এই দেখ, তোর ভাবি।' কী একটা মাথা মোটা লোক, নিজের বউকে দেখায় নিজের প্রেমিকার ছবি! আমি নুসরাত নাছির, সৈয়দ বংশের রক্ত আমার গায়ে বইছে, তাই কোনো কিছু হওয়ার আগেই আমার রক্ত গরম হয়ে ওঠে। আর হলে তো সোজা বটি দিয়ে কোপ মারার সিদ্ধান্ত নিয়।
নাজমিন বেগম বলেন, ছেলেদের নাকি ম্যাচুরিটি আসে বাইশ তেইশ বছরে। কিন্তু সেদিন নুসরাতের কাছে মনে হয়েছিল, তার সামনে দাঁড়ানো ছ'ফুট উচ্চতার গাধাটা শুধু লম্বা হয়েছে, মাথায় এখনো গিলুর জন্ম হয়নি। এর আবার কীসের ম্যাচুরিটি আসবে? গিলুহীন ব্যাটা তার মতো ভদ্র মেয়ের ভাগ্যেই পড়তে হলো। আরশের সামনে দাঁড়িয়েই নুসরাত রাগে সিদ্ধান্ত নিল, সে ও প্রেম করবে। সে কোন দুঃখে বিয়ের পরোয়া করতে যাবে! সে কেন পিছিয়ে থাকবে! শুধু মেয়েরা কেন সেক্রিফাইজ করবে, ছেলেদেরও একটু করুক। আরশ প্রেম করতে পারবে, সে কেন নয়! আরেকটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাচ্চাকালে একদম বড় মানুষের মতো করে নুসরাত, ওই ব্যাটা আরশকে তালাক দিয়ে দিবে সে। যাক, পরিবার ভেঙে, তার কিছু যায় আসে না। যে লোক বউ থাকতে নিজে প্রেম করে, তার সাথে আবার কীসের সংসার? আরশের মুখের উপর তালাক নামক জামাঘষে দিয়ে এসে নুসরাতের কী যে ভালো লেগেছিল, শুধু স্বামীরা কেন তালাক দিবে, স্ত্রীরাও পারে তালাক দিতে। ওই খচ্চরটা নুসরাতকে তালাক দেওয়ার পূর্বেই নুসরাত এক তালাক দিয়ে দিয়েছি।
সেদিন লোকটার মুখটা দেখার মতো হয়েছিল, কী এক অবস্থা! উজ্জ্বল শ্যাম মুখ একদম কালো হয়ে গিয়েছিল। নুসরাত যখন রুম থেকে ভাব নিয়ে বেরিয়ে আসছিল, তখন পেছন থেকে চ্যাত করে ওঠে আদরের সহিত ডাকল নুসরাত বলে। নুসরাত তবুও কাছ ঘেষল না আরশ নামক বদমায়েশটার। জীবনে প্রথমবারের ন্যায় আরশ নামক বাঁদরের পুরুষালি ইগোতে আঘাত করে নুসরাতের মনে শান্তি নেমে এসেছিল। সেদিন ভেতর থেকে ধ্বনিত হয়েছিল, 'দিল পে ঠান্ডাক পে গায়ি। আয় হায়!'
আট ডিসেম্বর আরশ দেশে ফিরল। দীর্ঘ আট বছর বিদেশের মাটিতে থেকে চেঙ্গিস খান হয়ে ফিরে আসলো আরশ। নুসরাত আট বছর পর আরশের মুখ জানালার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দর্শন করে কিৎকাল হা করে চেয়ে ছিল। একটা কথাই ভাবাল, ওই কালো মানিক এত সুন্দর হলে কী করে! কী ইউজ করে মুখে এই বেডা! আরশ যখন ফিরে এলো বাড়িতে, কী ঢাক-ঢোল পিটানো হলো। নুসরাতের মহামান্য মাতা পারলে আরশকে কোলে তুলে নাচতে শুরু করেন। শুধু পারছে না বলেই কোলে তুলছে না, নাহলে নুসরাত হলফ করে বলতে পারে, এতক্ষণে পারলে আরশ ভাই তার মায়ের কোলেই থাকতেন।
নুসরাতের রুমের দরজা সবসময় হা করে খোলা থাকে। সেদিনও ছিল। আরশ দেশে আসায় নাজমিন বেগমের খুশি দেখে কে। নুসরাতের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নাচতে নাচতে শুধালেন, 'এই নুসরাত, আরশ এসেছে, দেখা করেছিস?'
নুসরাত চোখ পাকিয়ে তাকাল। মানে কী! সে নুসরাত নাছির, তার এক্স হাজবেন্ডের সাথে দেখা করবে, সেটা তার মা কীভাবে ভাবলেন! তাই ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ নাজমিন বেগমের উচ্ছাসিত মুখ দেখল। এরপর মায়ের মুখের উপর ধুপ করে দরজা আটকে দিল। দরজাটা নুসরাত তার মায়ের মুখের উপর আটকায়নি, আটকেছে তার মায়ের পেছন থেকে ভাল্লুকের মতো হেঁটে আসা চেঙ্গিস খানকে দেখে। নুসরাত নিশ্চিত এবার চেঙ্গিস খানের মুখ দেখার মতো হবে। এত জোরে দরজা লাগিয়েছে সে, পণ করে বলতে পারে, পুরো বাড়ির ইট, পাথর, সিমেন্ট, বালু সব কেঁপে ওঠছে তার শব্দে। নুসরাতের চলন-বলনে একটু ও মেয়েদের ভাব নেই। সারাদিন চুল ছেড়ে কাজের বেডির মতো ঘুরে সে। নাজমিন বেগম উরফে নুসরাতের মা কুসংস্কারে খুবই বিশ্বাসী মানুষ। আরশ দেশে আসার এক সপ্তাহ পর একদিন কথায় কথায় নুসরাত বলে দিল, সে আরশকে তালাক দিয়ে দিয়েছে। যখন এই খবর জানলেন, নুসরাত এক তালাক দিয়ে দিয়েছে চেঙ্গিস খান নামক আরশকে, সেদিন তার মায়ের চোখ রাঙানো ছিল বাজ পাখির ন্যায়। পুরো বাড়ি চিৎকার করে প্রথমে কুরুক্ষেত্র তৈরি করেছেন, এরপর তেড়ে এসে থাবা মেরে ধরে ছিলেন নুসরাতের মসৃণ হাত। পারলে টেনে হিঁচড়ে নুসরাতের গায়ের চামড়া ছিঁড়ে ফেলেন তিনি। দাঁত খিঁচিয়ে নিয়ে কটমট করতে করতে বললেন, 'জীবনে আরশের মতো ছেলে পাবি তুই? নিজেকে দেখ আয়নায়, কাজের মহিলা লাগে। সারাদিন চুল ছেড়ে, পুরুষ মানুষের মতো প্যান্ট শার্ট পরে ঘুরিস। ভাগ্যের জুড়ে আরশের মতো ছেলে পেয়েছিস, কদর করতে শিখ, নাহলে সব যাবে।'
নুসরাত নিজের হাত টেনে ছাড়িয়ে আনলো নাজমিন বেগমের কাছ থেকে। বিরক্তিতে শব্দ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে, বিরক্তিমাখা কন্ঠ গলা দিয়ে বের করে বলল, 'জীবনে আমার আরশের মতো ছেলের প্রয়োজন ও নেই। তোমাদের ছেলে তোমাদের যাই ইচ্ছে করো। যদি ইচ্ছে হয় সানসেটের উপর বসিয়ে দাও, ইচ্ছে হলে জ্বলন্ত চুলোয় বসিয়ে দাও। তুমি তোমার আরশকে নিয়ে জাহান্নামে যাও, আমার কিছু যায় আসে না। আবারো বলছি, তুমি তোমার আরশ চুলোয় যাও, আমার কিছু যায় আসে না। এম আই ক্লিয়ার আম্মা?'
কথা শেষ করতে পারল না, নাজমিন বেগম নুসরাতকে ঝুঁকিয়ে পিঠে ধুপধাপ কিল বসালেন। তীক্ষ্ণ কন্ঠে, চোয়াল শক্ত করে আওড়ালেন, 'তোদের বিয়ে আবার হবে, আর আগামীকালই হবে।'
নুসরাত এত বিরক্ত হলো, ইচ্ছে হলো মাথা কিছু দিয়ে ফাটিয়ে ফেলতে। নাজমিন বেগম দিন থেকেই তোড়জোড় শুরু করলেন বিয়ের। তার সাথে লাগিয়ে নিলেন তিন কর্তীকে। সবাই যখন জানল নুসরাতের এসব কথা, তখন চারজন হাই হুতাশ করল বসে বসে। নুসরাত তাদের এমন ব্যবহার দেখে সরাসরি বলে বসল, 'এমন অভিনয় করছো যেন কেউ মরে গেছে, আমার বাপ চাচা মরলে তোমরা এত হাই হুতাশ করবে না যতটা আমি তোমাদের ছেলেকে তালাক দেওয়ায় করছ।'
মেহেরুন নেছা পেছন থেকে লাঠি দিয়ে নুসরাতের পিঠে খুঁচো দিলেন। মুখ দিয়ে কড়মড় করে শক্ত গলায় বললেন, 'ধুর মুখ পুঁড়ি, মুখ দিয়ে ভালো কথা বের হয় না তোর?'
নুসরাত মেহেরুন নেছার চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল, 'না।'
বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রতি কঠিন অনিহা নুসরাতের। তাই কীভাবে এই বিয়ের অনুষ্ঠান ভেঙে ভেস্তে দেওয়া যায় তার জন্য প্ল্যান করল সে। মাথায় আসলো, এখন একমাত্র আরশ ভাই তাকে সাহায্য করতে পারে। তাই সাহায্য চাইতে নাছির সাহেবের একটা সাদা শার্ট আর কালো ওয়াইড লেগ জিন্স পরে মাথায় কেলভিন কেলিনের টুপি লাগিয়ে নুসরাত বের হয়ে গেল বাড়ি থেকে। বাড়ি থেকে বের হলেও মাঝ রাস্তা থেকে সাদিয়। এসে নুসরাতকে বগলদাবা করে নিয়ে চলে গেল রেস্টুরেন্টে। নুসরাত মুখে শুধু এক বুলি ফুটল, 'কোথায় যাচ্ছি আমরা?'
সাদিয়া মিনমিনে কন্ঠে উত্তর দিল, 'গেলেই দেখতে পাবি। বিগ সারপ্রাইজ আছে তোর জন্য।'
উন্দালে পৌঁছাতেই দেখা মিলল সৌরভি, ইরহামের। দু-জনেই দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষারত। নুসরাত ইরহামের পানে চেয়ে এক ভ্রু উচাল। ইরহাম নিজেও জানে না সে এখানে কেন! সাদিয়া হঠাৎ করেই ফোন দিয়ে বলেছে আসতে দেখা করার জন্য। সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতেই দেখা মিলল এক লোকের। সাদিয়া সেদিকে এগিয়ে গেল। সবার সাথে লোকটা পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাবে, নুসরাত বলল, 'এই দাদুটা আবার কে?'
সাদিয়া দু-পাশে তড়িৎ মাথা নাড়িয়ে বলল, 'দাদু না দাদু না, ও আমার উডবি।'
ইরহাম এ্যাঁ আকার শব্দ মুখ দিয়ে বের করে চেয়ে রইল সাদিয়ার দিকে। নুসরাত তো ফোঁস করে হেসে ফেলল। সাদিয়ার কথা অবিশ্বাস করে বলে ওঠল, 'দূর, মজা করিস না, যদি তোর উডবি এর সাথে দেখা করাতে নিয়ে আসিস, ওর সাথেই দেখা করা, এমন দাদুর বয়সী লোককে দুলাভাই বলিস না!'
ইরহাম তো বলেই ফেলল মিনমিনিয়ে, 'সাদিয়া বোন, আমার মজা করিস না, এই দাদু কী তোর শ্বশুর?'
নুসরাত বলল, 'দুলাভাই কই? দুলাভাইয়ের সাথে পরিচয় করা!'
সৌরভি হাসতে হাসতে বলল, 'তুই মজা করার স্বভাবটা এখনো ছাড়িসনি? নিজের শ্বশুরকে কেউ দুলাভাই বানায়?'
সাদিয়া সকলের কথা নীরবে শুনে ঠোঁটে মেকি হাসি ঝুলিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'সত্যি বলছি, হিজ ইজ মাই ফিয়োন্সে।'
নুসরাত, ইরহাম, সৌরভি ঠোঁট চেপে হাসি আটকাল। নুসরাত নিজের হাসি আটকাতে পারলেও মুখের জবান আটকাতে পারল না। ঠোঁট এলিয়ে বলল, 'দাদুকে দেখহেমনে হচ্ছে সারাদিন হাচি, কাঁশির উপরই থাকেন। আমার তো মনে হয় কখনো কখনো হাচি দিতে গিয়ে পেছন দিয়ে বাতাস ছেড়ে দেন। তুই এমন মানুষের সাথে থাকবি কী করে, বোন?'
সাদিয়া চোখ রাঙিয়ে বলল, 'তোদের পরিচয় করাতে নিয়ে আসছি বলে এমন করে অপমান করবি।'
ইরহাম, নুসরাত, আহান ভেটকানো মার্কা হাসি দিল। বলল তিনজন একসাথে, 'আমাদের তো তোদের কাপল দেখে খন্দকার মোশতাক, আর তিশার কথা মনে পড়ে গেছে।'
ইরহাম সাথে সাথে আবারো বলল, 'তিশাটা কীভাবে নিজের স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, একটু দেখা তো নুসরাত!'
নুসরাত গলা খাঁকারি দিল। সামনের জনের চোখের রাঙানি পাত্তা না দিয়ে বলতে লাগল, 'মিট মাই হাজবেন্ড খন্দকার মোশতাক, মোশতাক তুমি কিছু বলো...!'
এর পরেরটুকু ইরহাম বলল। গলার আওয়াজ মোটা করে গমগমে সুরে বলল, 'হুউউউররাম..!