ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ে তাহার আগমন

৯ম পর্ব

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

দেশে আসার পর থেকে বিজনেসের দিকে মন না দিয়ে রাজনীতি নিয়ে পড়ে আছে আরশ। কয়েকদিনের ভেতর রাজনীতি প্রাঙ্গণে উজ্জ্বল মুখ হয়ে উঠেছে সে। আরশের চোখের চাহনিতে যেমন দৃঢ়তা, তেমনই তার কন্ঠেও কঠোরত্ব। আরশের হাত নাড়িয়ে কথা বলা, চলন-বলন, কঠোরত্ব, সততা, বর্তমান সমাজে তাকে উজ্জ্বল মুখ করে তুলেছে। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের গায়ে যখন সাদা পাঞ্জাবী জড়িয়ে বাহিরে বের হয় লোকটা, তখন মুগ্ধতা তাকে আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে ফেলে। হাতে রোলেক্স সাবমেরিনের কালো বেল্টের ঘড়ি জড়ানো থাকে সবসময়। হঠাৎ হঠাৎ যখন হৃষ্টপুষ্ট শক্তির অধিকারী লোকটা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন লোকটার সুঠাম দেহি শরীরটা মনোযোগ কাড়ে সবার আগে। সাদা ট্রাউজার টাখনুর উপর ভাঁজ করা থাকে। যদি কখনো সেন্ডো গেঞ্জি গায়ে জড়ানো থাকে, তাহলেও আরশের হাত থেকে ঘড়ি সরে না। আরশ যেই পথে হাঁটে, সেই পথে নীরবতা বয়ে যায়। আরশের একটা গর্জনে জমা হয় বাড়ির সামনে হাজারো ছোটো বড় বাচ্চাদের দল। রাজনৈতিক সমাবেশে তার কী ভাষণ! হাত নাড়িয়ে আরশ যখন ভাষণ দেয়, তখন বাড়ির এক একটা সদস্য হা করে দেখে। মিথ্যে বলবে না, নুসরাতও দেখে।

নুসরাত রাজনীতিকে ঘৃণা করে। রাজনীতির তুলনায় আরশকে বেশি ঘৃণা করে। কিন্তু আজকাল নুসরাতের ঘৃণা করায় কমতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা ফাঁপা দেখা যাচ্ছে। ঘৃণা ঠিকভাবে করছে না সে আরশকে। আরশ কোথাও বের হলে বা কোনো সমাবেশে যোগ দিতে গেলে অতর্কিত হামলার কথা ভেবে নুসরাতের বুক ধুক করে ওঠে। ভয়ে থাকে, নুসরাত হঠাৎ কিছু হয়ে যায় নাকি! আরেক মহা জ্বালা হয়েছে নুসরাতের। আগে যে আরশ ভাইকে দেখলে গা পিত্তি জ্বলে ওঠতো, আজকাল সেই আরশ ভাইয়ের প্রতি প্রেম প্রেম অনুভূতি আসে তার। নুসরাত বিরক্ত, মহা বিরক্ত, নিজের প্রতি, নিজের এই অস্বাভাবিক অনুভূতির প্রতি। এসব বালের অনুভূতি কীভাবে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া যায়, তার কোনো ট্রিকস সে খুঁজে পায়নি। মনের ভেতর কারোর জন্য অনুভূতি জমা হতে দেওয়া হলো বড়সড় ভুল, আর নুসরাত এই ভুল কখনো করবে না। সে সদা সতর্ক থাকবে। যার মনে এইসব অনুভূতি একবার জন্ম নেয়, সে দুর্বল হয়ে পড়ে। নুসরাত কোনোমতে দুর্বল হয়ে পড়বে না। এটা সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করল। কিন্তু তার প্রতিজ্ঞা কায়েম থাকল না, আরশ দেশে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই পা পিছলে প্রেমে পড়ল। দিন যত কাটছে, ভেতরের অনুভূতিগুলো যেনো তরতর করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ির সবাই মনে করে নুসরাত হয়তো আরশের উপর অভিমান করেছে, কিন্তু তারা হয়তো জানে না অভিমান জিনিসটা নুসরাতের হয় না। তার নাকের ডগায় রাগ থাকে আর তা ফটাফট উঠে যায় মাথায়। আগে যে লোকটার গলার আওয়াজ না শোনার জন্য নুসরাত কানে তুলো গুজে রাখতো, সেই নুসরাত লোকটার কথা শোনার জন্য বসে থাকে অধীর আগ্রহে। যখন চাচ্চুদের সাথে কথা বলে আরশ, তখন নুসরাত দরজায় কান পেতে শোনে। আর শুনতেই থাকে। আরশের চোখ তুলে তাকানোর ভঙ্গিমা দেখলে নুসরাতের পেটের ভেতর প্রজাপতি উড়ে। আগে আরশ কথা বললে নুসরাতের কাছে মনে হতো, এরকম গরুর মতো কথা বলে কেন! কিন্তু এখন লোকটার কথা শুনলে তার ইচ্ছে হয় সারাদিন কান লাগিয়ে শুনতেই যেনো থাকে। এ কী মহা জ্বালা হয়েছে নুসরাতের। এর মধ্যে ফটফট করে কেটে গেল দুয়েক দিন। নাজমিন বেগম দু-দিন পূর্বে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করলে তা ভেস্তে গেল স্বামীর ধমকে। তাই আস্তে ধীরে বিয়ের তোড়জোড় করলেন। দাওয়াত দিলেন, আগামী শুক্রবার আসতে সৈয়দ বাড়িতে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আরশ নুসরাতের বিয়ে দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার রাত। তখন প্রায় দেড়টা বেজে গিয়েছে। নুসরাতের পেটের ভেতর খিদের চুটে ইদুর ছুটছে। নুসরাত আলসি ছেড়ে ওঠে দাঁড়াল। দরজার নব ঘুরিয়ে রুম থেকে বের হয়ে ঘুম ঘুম চোখে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল, তখন ধমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে গেল তার শরীর। নুসরাত আড়াআড়ি দু হাতে নিজেকে পেঁচিয়ে ধরল। ধীর পায়ে এগিয়ে চলল নিস্তব্ধ বাড়িটার ড্রয়িং রুমে। সদর দরজা ঠা করে খোলা রাখায় মৃদু আলো আসছে বাহির হতে। নুসরাত চোখের উপর হাত রেখে উঁকি মারল, না, কেউ নেই সেখানে। হয়তো ভুলবশত দরজা বন্ধ করতে মা চাচিরা ভুলে গিয়েছে। নুসরাত হেলেদুলে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। ভুতের ভয় নেই তার। একটু আকটু ভেতরে ভেতরে জ্বীনের ভয় আছে। সূরা পড়ে বুকে ফু দিয়ে দিল, যাতে খারাপ বাতাস স্পর্শ না করে। আজ সকালেই তার মা-চাচিরা হলুদ লাগিয়ে দিয়েছেন তাকে। তাদের এখানে একটা কুসংস্কার আছে, নতুন বউয়ের গায়ের হলুদের ঘ্রাণ নাকি পেলে অশরীরিরা ভর করে তার উপর। এটা মনে পড়তেই সদর দরজা টেনে নুসরাত লাগিয়ে দৌড় দিল কিচেনে। এতক্ষণ যতটুকু আলো ছিল, ততটুকুও নিভে গিয়েছে। নুসরাত বুকে এক হাত রেখে অন্যহাত দিয়ে ফ্রিজের দরজা খুলল। ফ্রিজের ভেতর প্রায় মাথা ঢুকিয়ে দেখল খাওয়ার মতো কী আছে। সামান্য ফ্রিজের আলো তখন কিচেনের অন্ধকারকে নিবারণ করছিল। কার্লি চুল খোলা হওয়ায় তা বরাবরের মতো মুখের একপাশে জুড়ে আছে। আইস্ক্রিমের বাটি শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেতেই ফ্রিজের দরজা লাগিয়ে দিল। নিশ্চুপ ভঙ্গিতে ফিরতে যাবে, অনুভব হলো পেছনে দৈত্যের মতো সটান হয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নুসরাত থমকে গেল। জ্বীন টিন নয়তো? বুকের ধড়ফড় বাড়ল শতগুণ, যেন রেইসিং এ নেমেছে! পিঠ সোজা করে দাঁড়িয়ে টানটান থেকে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল, 'আল্লাহ, খারাপ কিছু হলে হুঁশ এখানেই উড়িয়ে দাও, আমি জ্বীন দেখতে চাই না।'

নুসরাত মাথা সামান্য কাত করতে নিবে, কানের কাছ বেয়ে বয়ে চলে গেল হিম করে দেওয়ার মতো একটি স্বর। শব্দের প্রতিটা অংশ জুড়ে গম্ভীরত্বের প্রতিচ্ছাপ। রাতের অন্ধকার চিড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে শব্দগুলো বয়ে গেল নুসরাতের শ্রবণ ইন্দ্রিয় বেয়ে। প্রখর গম্ভীর সুর ভেসে আসলো, 'গত দশ বছরে অনেক জ্বালিয়েছেন আপনি, আগামীকাল রাত থেকে শুরু হবে আমার জ্বালানো।'

নুসরাত ভয়ে চোখমুখ লাল করে ফেলল। আরশ ভাইয়ের গলা না, এটা! আরশ ভাইয়ের রূপ ধরেছে এই জ্বীন। আল্লাহর কাছে দোয়া করল, ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখলে জাগিয়ে তুলতে, কিন্তু কোনো কিছুই হলো না। সে অটল, অসাড় দাঁড়িয়ে রইল। সহসা আবারো নিজের ঘাড়ে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেল। নুসরাতের মনে পড়ল, নাজমিন বেগম একবার বলেছিলেন, জ্বীনের শরীর হিম শীতল হয়। নুসরাত হলফ করে বলতে পারে, এটা আরশ ভাই না, কোনো দুষ্টু জ্বীন তার রূপ নিয়েছে। নুসরাত নিজের জায়গা থেকে নড়চড় করতে গেলে মনে হলো হাত পা শক্ত হয়ে গিয়েছে মেঝের সাথে। ততক্ষণে আরশের রূপ ধারী জ্বীনের হাতটা নুসরাতের ঘাড় বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসলো গলার কাছে। তর্জনী আঙুল দিয়ে স্পর্শ করল নুসরাতের পালস পয়েন্ট। গ্রীবা বাঁকিয়ে কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠল, 'আজকের রাতের জন্য ছাড় দিলাম, আগামীকাল রাতে কোনো ছাড়াছাড়ি নেই।'

হাওয়ার বেগে ভেসে যাওয়া শীতল কথাগুলো কান বেয়ে বয়ে যেতেই হাত থেকে শব্দ করে পড়ে গেল আইস্ক্রিম ভর্তি বাটিটা। নিশ্চল দেহটা হেলে পড়ল আরশের গায়ে। তা নির্বিঘ্নে সামলে নিল আরশ। বুকের কাছে পাখির মতো ছোট শরীরটা জায়গা করে দিল। একহাত উরুর নিচে রেখে অন্যহাতে মেয়েলি পৃষ্ঠদেশ চেপে ধরে কোলে তুলে হাঁটা ধরল। ঠোঁটের কোণ উঁচু হলো সামান্য। সময়ের ব্যবধানে মিলিয়ে গেল তা!

নুসরাতের ঘুম ভাঙল দুপুর বারোটার দিকে। চোখে হাত দিয়ে ডলে উঠে বসল। বাড়িটা কেমন জানি আজ নিশ্চুপ হয়ে আছে। শুধু রান্না করার সুঘ্রাণ আসছে সাথে ডেকচিতে হাত চালানোর শব্দ। নুসরাত নাইটস্ট্যান্ড থেকে নিজের চশমা তুলে নিয়ে চোখে পড়ল। ধীরে সুস্থে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল। ব্রাশে টুথপেষ্ট লাগিয়ে তা দাঁতে স্পর্শ করতেই চোখে পড়ল আয়নায়। অনিহা ভঙ্গিতে ব্রাশ করাতে মনোযোগী হতেই আবার তড়াক করে আয়নার দিকে তাকাল। চোখ বড় বড় করে চেয়ে রইল আয়নার পানে। নিজের মুখের এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারল না সে। হাত দিয়ে স্পর্শ করল নিজের মুখ। গোল গোল চোখে চেয়ে থেকে বিড়বিড় করল, 'রঙ এত পরিস্কার হলো কীভাবে!'

নিজের এমন পরিবর্তনে নিজে বেসামাল হয়ে উঠল। মনে পড়ল মেহেরুন নেছার কথা। মেহেরুন নেছা বলেন, বিয়ের ফুল ফুটলে মেয়ে মানুষের রঙ ও ফুলের ন্যায় ফুটে উঠে। আজ নুসরাতের বিশ্বাস হলো তা! নাকের দিকে চোখ পড়তেই নুসরাতের হাত আপনা আপনি সেখানে চলে গেল। জ্বল জ্বল করতে থাকা নাকের ফুলের মধ্যে হাত স্পর্শ করতেই নিজের শরীর অসাড় হয়ে আসলো। এটা কে পরালো তাকে! আরশ ভাই! না, সে হবে না! বড় আম্মু হতে পারে! নুসরাত মাথা নাড়াল। ব্রাশ শেষে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই গতকাল রাতের কথা মনে পড়ল। আর তখনই ছুটন্ত পায়ে দৌড়াল সে নিচে। উল্কা পিন্ডের মতো কিচেনে ঢুকে লিপি বেগমকে শুধাল, 'আইস্ক্রিমের বাটি কী মেঝেতে ফেলা ছিল?'

লিপি বেগম ভ্রু উচিয়ে তাকিয়ে বললেন, 'না!'

নুসরাত মুখ ফসকে বলে ফেলল, 'তাহলে গতকাল রাতে যে আমার হাত থেকে বাটি পড়ল!'

লিপি বেগম চালানো হাত থামিয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত কন্ঠে বললেন, 'হয়তো। স্বপ্ন দেখেছিস।'

নুসরাত মাথা নাড়াল। আবারো দ্বিধা ভরা কন্ঠে জেরা করে জানতে চাইল, 'সদর দরজা গতকাল কী লাগানো হয়নি?'

লিপি বেগম ডেকচিতে চালানো হাত থামিয়ে দিলেন। সামান্য বিরক্তি ভরা কন্ঠে বললেন, 'আমি নিজ হাতে লাগিয়েছি সদর দরজা। আর কিছু থাকলে তাড়াতাড়ি বল, বলে বিদেয় হ এখান থেকে।'

নুসরাত লিপি বেগমকে ভেংচি কেটে বলে ওঠল, 'কুটনী শাশুড়ী হয়ে যাচ্ছো দিন দিন।'

লিপি বেগম হাতের খুন্তি শূন্যে তুলে বললেন, 'কুটনী শাশুড়ী পিঠে ও কয়েক ঘা দেয়, দিব তোকে?'

নুসরাত চোখের চশমা ঠেলে চলে গেল কিচেন থেকে। আরো দু-এক মিনিট ফিরে এসে শুধাল, 'নাকের ফুলটা কী তুমি দিয়েছো?'

লিপি বেগমের তীক্ষ্ণ চোখজোড়া নুসরাতের নাকের সরু সাদা পাথরের নাক ফুলের দিকে চলে গেল। কিছু বলবার পূর্বেই মেহেরুন নেছা এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। বললেন, 'তোর ভাতার পরাই দিছে গতকাল রাতে।'

নুসরাত থোড়াই বিশ্বাস করল মেহেরুন নেছার কথা। ঝাড়ি মেরে বলে ওঠল, 'যত্তসব, আউল-ফাউল আজাইরা কথা।'

মেহেরুন নেছা বললেন, 'হ বিশ্বাস কইরো না আমার কথা, যখন সব চুরি করি নিব, তখন বোঝবা।'

সন্ধ্যার দিকে মেহমান আসা শুরু হলো। দূরের মেহমান যারা এসেছিল, তারা অনেকদিন যাবত নুসরাতকে দেখেনি। তাই কনেকে চোখের সামনে দেখেও কেউই চিনতে পারল না। অচেনার মতো তাকে পাশ কাটিয়ে গেল সবাই। এক ভদ্রমহিলা ঝাঁঝ মিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে আসলো দূর হতে। নুসরাত চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে, উনি তার বাবার ফুফাতো বোন। বাবাদের মতোই জোর গলায় কথা বলেন ভদ্রমহিলা। গলা ফাটিয়ে বলছেন, 'নাছিরের মেয়ে কোথায়? আমার আরশের বউ কই?'

নুসরাত চোরের মতো ডেকচিতে হাত ঢুকিয়ে বিরিয়ানি খাচ্ছিল। ভদ্র। মহিলা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বিষম উঠে গেল। দু-হাতে মাথায় ড্যাবড্যাব করে মারতে লাগল। চোখ মুখে ইতস্তত ভাব ফুটিয়ে কিচেন থেকে বের হতে নিবে, ভদ্রমহিলা এসে প্রবেশ করলেন ভেতরে। অক্ষিপট ঘোরালেন চারিপাশে। কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নুসরাতকে কিৎকাল সরু চোখে অবলোকন করলেন। চোখ মুখে কাঠ্যিনের চাপ। শাড়ির আঁচল গুছিয়ে ভাঁজ করে রাখা কাঁধে। মুখ মন্ডল হিজাবের আড়ালে ফোটে উঠেছে অপরূপভাবে। চোয়াল শক্ত করে শুধালেন, 'আরশের বউ কোথায়?'

নুসরাত কিছু বলবে, এমন মুহূর্তে ভদ্রমহিলা তাকে কেটে দিয়ে বললেন, 'বাসন দেখছ না সিঙ্কে রাখা, ওগুলো ধুয়ে রাখছ না কেন? তোমাকে এখানে বসে খাওয়ার জন্য আনা হয়নি!'

নুসরাত হতবিহ্বল চেহারা নিয়ে চেয়ে রইল। ভদ্র মহিলা গটগট পায়ে চলে গেলেন। তখনো স্তব্ধ নয়নে দরজার পানে চেয়ে নুসরাত। কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হতেই আবারো ভদ্রমহিলে এসে কিচেনে প্রবেশ করলেন। সুক্ষ্ম চোখে উপর নিচ দেখে তেজস্রীয় ভঙ্গিতে শুধালেন, 'নাছিরের মেয়ে তুই?'

নুসরাত কাঠপুতলির মতো মাথা নাড়াল। ভদ্র মহিলা এগিয়ে এসে নুসরাতের গালে চুমু খেয়ে শুধালেন, 'তাহলে চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?'

নুসরাত মুখ নাড়াতে পারল না। একদলা বিরিয়ানি তার জিভের ডগায় গাপটি মেরে আছে। নুসরাত নিতান্ত ভদ্র বাচ্চার মতো তাকিয়ে রইল। তাড়াহুড়ো করে মুখের খাবার গিলে নিয়ে বলে ওঠল, 'আসসালামু আলাইকুম ফুফু!'

ভদ্রমহিলা সালামের উত্তর দিয়ে গালে চুমু খেলেন আরেকটা। নুসরাত মুখ কুঁচকে হাসল। নম্র সুরে বলল, 'আপনি বসুন গিয়ে ড্রয়িং রুমে।'

নায়মা হেসে চলে গেলেন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে। নুসরাত উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখল ভদ্র মহিলা চলে গিয়েছেন কিনা, তারপর চোরের মতো হাত বাড়িয়ে গুঁড়ো দুধের বোয়াম হাতে নিল। চামচ ঢুকিয়ে ভর্তি করে তা মুখের সামনে তুলে ধরতেই পেছন থেকে কানে ভেসে আসলো সেই গম্ভীর গলার আওয়াজ। কারোর সাথে রুঢ় কণ্ঠে কথা বলছে ওই লোক। নুসরাত কান পাতল। কানে আসলো ক্ষীণ কিছু শব্দ। লোকটা হিসহিসিয়ে বলছে, 'তুমি কেন বুঝতে পারছ না, আমি আসতে পারব না।'

নুসরাত কপালে ভাঁজ ফেলল। অতোটা পাত্তা না দিয়ে মুখের ভেতর। চামচ ঢোকাতেই নিজের সান্নিধ্যে সেই কন্ঠস্বর পেল। কেঁশে উঠল শব্দ করে। দুধের বোয়ামটা শক্ত করে ধরে ওড়না আড়ালে ঢাকল। হয়তো সফল হলো, ঠিক বুঝল না সে! পেছনের জনের ভাবগতি ও ভালো ঠেকল না নুসরাতের নিকট। বাতাসের সাথে হঠাৎ নাকে এসে লাগল ব্লাক বেরির মিষ্টি ঘ্রাণ। যতক্ষণ লোকটা নিশ্চুপে তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত নুসরাত ও সোজা দাঁড়িয়ে রইল সামনে। নিজের পেছনে দাঁড়ানো আরশকে না দেখার ভান করল। লোকটা ধুপধাপ পায়ে চলে যেতেই ঘ্রাণটা ও সময়ের সাথে মিলিয়ে গেল।

কাজী সাহেব অনেকক্ষণ যাবত বসে রয়েছেন। হাতে খাতা তার, সাথে উকিলও আছেন। উকিলের হাতে একটা কালো লেদার ব্যাগ। যার ভেতর হয়তো রেজিস্ট্রি এর কাগজ পত্র। সাদা পাঞ্জাবী গায়ে জড়িয়ে সোজা এসে সোফার উপর গম্ভীর মুখে বসে পড়ল আরশ। নীরবতা চলল অনেক সময়। ড্রয়িং রুমে নিস্তব্ধতা চিড়ে ফেলতে নুসরাতের শক্ত গলার আওয়াজ এসে বারি খেল সকলের কানে। সে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলছে, 'আমি শাড়ি পরব না, প্রয়োজন হলে লুঙ্গি আর শার্ট পরে বিয়ে করব।'

এরপর ঠাসঠাস দুটো শব্দ হলো। আরশ উঠে দাঁড়াতে যাবে, দেখল ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে নুসরাত এগিয়ে আসছে। পরণে বাড়ির সাদামাটা কাপড়। নাজমিন বেগম একহাতে নুসরাতের গা চেপে ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছিলেন, অর্ধেক সিঁড়ি নেমে নুসরাত বিরক্ত হয়ে উঠল। টেনে নাজমিন বেগমের হাত থেকে নিজের বাহু ছাড়িয়ে নিল। নাজমিন বেগম চোখ রাঙিয়ে আবারো চেপে ধরতেই নুসরাত ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, 'এমন মুরগীর মতো হাঁটলে, আগামী ত্রিশ দিনেও ড্রয়িং রুমে পৌঁছাতে পারব না। আমার হাত ছাড়ো তো, ছাড়ো, আমি একাই যেতে পারব।'

নুসরাত টেনে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। দু-লাফে অর্ধেক সিঁড়ি নেমে এসে ঘোমটার আড়ালে ঢাকা উৎসুক চোখগুলো চারিদিকে ঘুরিয়ে হেলাল সাহেবকে শুধাল, 'বড় আব্বু কোথায় বসব?'

হেলাল সাহেবকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মেহেরুন নেছা ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, 'আরশের কোলে বইসা যা!' নুসরাত ঠোঁটস্ত মুখস্ত কণ্ঠে বলে ওঠল,

'আচ্ছা...!'

আরশের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল সে। মেহেরুন নেছার দিকে ফিরে ভ্রু কুঞ্চন করে শুধাল, 'কী বললে আবার বলো?'

মেহেরুন নেছা আবারো হেসে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, 'আরশের কোলে বইসা যাওয়ার কথা কইছি।'

নুসরাত ঘাড় বাঁকিয়ে সোফায় বসে থাকা আরশের দিকে গোল গোল চোখে তাকাল। এমন মুহূর্তে আরশ নিজেও চোখ তুলে তাকাল। কাপড়ের আবরণে ঢাকা চোখের সাথে মিলন ঘটতেই সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি মেয়েলি নরম সত্তা পুরো নাড়িয়ে তুলল। বুকের ভেতরের ধুরুধুরু কাঁপতে থাকা হৃৎপিন্ডটা কেঁপে উঠল। এরপর আর নুসরাত নাছির কোনো তর্ক ছাড়াই বসে গেল আরশের পাশ ঘেঁষে, কিছুটা দূরত্ব রেখে। সুরসুর করে নাকে এসে লাগল কড়া কুস্তুরীর সুঘ্রাণ। নুসরাতের কাছে অনুভব হলো পুরুষালি শক্ত শরীরটা তার সান্নিধ্যে আসছে। ধীরে ধীরে প্রখর নিঃশ্বাস নিজের গায়ের উপর পেল। নুসরাতের গা ঘামতে লাগল। তড়িৎ গতিতে বিদ্যুৎ খেলে গেল পুরো শরীরে। তলপেটে উড়াউড়ি করতে লাগল হাজারো প্রজাপতির বাহার। বিয়ে পড়ানো শুরু হলো যখন, তখন যেন নুসরাত ঘোরের ভেতর ছিল, নিজের চিন্তায় বিভোর থেকে চুপচাপ কবুল বলে দিল। আরশ নিজেও নির্দ্বিধায় কবুল বলে উঠে দাঁড়াল। হেলাল সাহেব শুধাল, 'কোথায় যাচ্ছো?'

আরশ সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে ওঠল, 'পার্টি, অফিসে কাজ আছে, অপেক্ষা না করে ঘুমিও পড়ো সবাই।'

আরশের কথাটা যে নুসরাতের উদ্দেশ্যে ছিল তা সবাই বুঝল। কারণ আরশ কখনোই এমন করে বলে না। ঠোঁট টিপে বড় থেকে শুরু করে সকল সদস্য মিটিমিটি হাসল। মেহেরুন নেছা পেছন থেকে বলে ওঠলেন, 'সরাসরি বলে দাও না ক্যা, বউ আমার জন্য অপেক্ষা কইরো না। এত ঘোরাই পেঁছাই কইয়া আমাগো ঢোকাও ক্যা মিয়া!'

আরশ মেহেরুন নেছার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে হনহন করে চলে গেল। মেহেরুন নেছা নুসরাতকে চ্যাতানোর জন্য কিছু বলতে যাবেন, নুসরাত চোখ রাঙিয়ে বলে ওঠল, 'চুপ নির্লজ্জ বুড়ি, একদম চুপ!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন