ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া

৫ম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_৫ ( স্পেশাল পর্ব - প্রথম অংশ✨)

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

—" আমি লামিয়াকে বিয়ে করিনি। বাধ্য হয়ে শুধু একটা নাটক সাজিয়েছিলাম।"

নিশানের ঠান্ডা কন্ঠে বলা কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্রই বড়সড় একটা বজ্রপাত হলো তালুকদার নীড়ের বসার ঘরে। সবাই রীতিমতো হা হয়ে তাকিয়ে রইলো সোফায় আরাম করে বসে থাকা নিশানের দিকে। একমাত্র নাসিরুল তালুকদার বাদে, তিনি এমন ভাবে মুখ কুঁচকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন যেন আগে থেকেই তার ছেলের এমন নাটকের কথা সম্পর্কে তার অবগত। অবশ্য কথাটা মিথ্যে নয়। গতদিন যখন নিশান বড়গলায় বলে গেল—আমি মিথ্যে বলিনা বাবা। সেদিনই নাসিরুল তালুকদার বুঝে গেছেন এই ছেলে দুবছর আগে বলা কথাটা মিথ্যে বলেনি, কিন্তু এবার ঠিকই মিথ্যে নাটক করছে। সবই কপাল তার! ভাগ্যক্রমে এক দারুণ ছেলের জন্ম দিয়েছেন তিনি, যার মাথায় এত প্যাঁচ যে সবাই তব্দা খেতে বাধ্য।

নাসিরুল তালুকদার নিশানের কথাটাকে পাত্তা না দিয়ে মাথা এলিয়ে দিলেন সোফায়৷ আর অপেক্ষা করলেন একেকজনের দুর্দান্ত প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। বিশেষ করে দুজনের রিয়েকশন দেখার জন্য নাসিরুল তালুকদার উদগ্রীব —শৈলী আর খাদিজা তালুকদার। শৈলী রীতিমতো চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলো। তার দুপাশে থাকা রিমি আর মিমিও তাকিয়েছে, তবে অবাক হয়েছে শুধু মিমি। কারন রিমি তো আগে থেকেই ধরতে পেরেছে বিষয়টা। রাশিদা তালুকদার মুখ কুঁচকে তাকালেন, না জানি আর কত নাটক দেখতে হবে এই ছেলের। লামিয়া সোফায় বসে ঢোক গিলল। দুপুরে খাবারের পর সবাইকে জরুরি ভিত্তিতে বসার ঘরে একত্র করে ডেকে যে এমন একটা ধাক্কা দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে নিশান, তা জানলে শৈলী হয়তো ঘর থেকেই বের হতো না। এবার অনেকক্ষণ পর খাদিজা তালুকদারের চোখ গোল হয়ে গেলো, তিনি মুখ জমিয়ে এক ঝটকায় হাত কপালে রেখে হায়হায় করে বলতে শুরু করলেন,

—" এ তুই কী বলছিস নিশান! হায় কপাল! এসব কী শুনতে হচ্ছে। এইটা কী হইলো আল্লাহ্‌! আমি কি এখন বুড়ি বয়সে নাটক-সিনেমা লাইভ শো দেখতে থাকবো? এক ছেলে আমার, সেই ছেলে আবার এমন নাটক করে! মানুষজন কী বলবে! আমি কী বলব! শোনো সবাই, আমি কিন্তু জানতাম না! আমি কিছু জানতাম না! দেখেছেন নিশানের বাপ, আপনার ছেলের কান্ড দেখেছেন!"

নাসিরুল তালুকদার নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিলেন,

—" হুম দেখেছি!"

এবার কান্নার মতো গলা করে খাদিজা বলতে লাগলেন,

—"হায় আল্লাহ! আমি কত লোককে মিষ্টি খাইয়েছি, বলেছি ছেলের বিয়ে হয়েছে, নতুন বউ এসেছে! এখন মানুষ হাসবে আমারে নিয়ে! আমি বলি নিশান, তুই কি অন্ধ নাকি? হঠাৎ এই ন্যাকামি মাথায় এলো কেন তোর? জীবনে শান্তি দিবি না তুই আমাকে!"

নিশান ঠান্ডা ভঙ্গিতে হালকা হাসল। মাথা নিচু করে একটু চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নিজেই আবার মাথা তুলে একেবারে স্বাভাবিক স্বরে বলল,

—"আমি জানি মা, তুমি জানো না। কেউ জানত না। আমি চাইওনি কেউ জানুক। এই বাড়িতে, এই পরিবারের সুনাম, সম্মান,সবকিছুর ভার মাথায় রেখেই কাজ করেছি আমি।"

খাদিজা তালুকদার আবার হু হু করে ওঠেন,

—"আরে ছেলে, নাটক না করে সোজা করলি না কেনো? ওই মেয়ে কে, কই থাকে, ওরে আশ্রয় দেয়ার জন্য বিয়ের নাটক করতেই হলো? "

নিশান এবার গম্ভীর হয়ে গেল। তার কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা ফুটে উঠলো,

—" মা শোনো, লামিয়া হলো জিৎের গার্লফ্রেন্ড। জিৎকে তো চেনোই, আমার বন্ধু! তো ওরা একে অপরকে ভালোবাসে, বিয়ে করতে চায়। আর ওর পরিবার রেজিস্ট্রি করিয়ে জোর করে বিয়ে দিচ্ছিল ওকে, একজন অন্য ছেলের সঙ্গে। জিৎ কোনো এক কারনে বিদেশে আটকে পড়েছে। আসতে পারেনি সময়মতো। আমি যদি ওকে বান্ধবী পরিচয়ে নিয়ে আসতাম, তখনও সন্দেহ করত, হয়তো ঠেকাত না। কিন্তু বউ পরিচয়ে আনলে কিছু করার সাহস ওদের হতো না। এটাই ছিল আসল লক্ষ্য।"

এবার রাশিদা তালুকদার ধীরে বললেন,

—"তুমি কি জানো তুমি কেমন একটা উদ্ভট কথা বললে? তুমি একটা মেয়েকে এই বাড়িতে এনেছো, আমাদের সামনে বসিয়েছো, তার মাথায় ঘোমটা দিয়েছো, আর এখন বলছো, বিয়ে করোনি? অন্তত আমাদের কে সত্যি টা বললে কী হতো? আমাদের বলতে যে নাটক করছি!"

নিশান এবার মাথা নিচু করে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো শৈলীর দিকে, রহস্যময় গলায় বলে উঠলো,

—" সত্যিটা বলে দিলে কীভাবে বুঝতাম যে একজনের চোখে এত পানি! আমি তো এখনো বুঝতে পারিনা, মানুষ কিভাবে চোখে সমুদ্র নিয়ে ঘুরে!"

রিমি এবার বিড়বিড় করে বলল,

—" নিশান ভাই এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন। একজনকে সাহায্য করাও হলো, বিনা পরিশ্রমে শৈলী আপুর মনের কথাও জানা গেল। রিয়েলি জিনিয়াস!"

এদিকে নিশানের কথা কেও বুঝলোনা, বোঝার চেষ্টাও করল না। কিন্তু চোখের পানির কথা শুনে ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা নামালো শৈলী। তার কেনো যেন মন বলছে নিশান ভাই তাকে ইঙ্গিত করেই কথাখানা বললেন। কিন্তু কেনো? উনি কীভাবে দেখলো যে আমি কেঁদেছি! এদিকে খাদিজা তালুকদার খুব বেশি হতাশ হয়ে উপরে চলে গেলেন। আর রাশিদা তালুকদার চোখ সরু করে বললেন,

—" তো এই মেয়ে আর কতদিন থাকবে এখানে?"

নিশান মাথা নেড়ে বলল,

—" আর কিছুক্ষণ। একটু পরেই জিৎ চলে আসবে। ওরা এখনি চলে যাবে।"

রাশিদা এবার বোঝার ভঙ্গিতে ওও বলে দাঁড়ালো। এরপর কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেলে রিমি মিমিকে ধাক্কা দিয়ে বলল, —চল আমরা যাই। এরপর একে একে সবাই প্রায় বিরক্ত হয়েই বসার ঘর ছাড়লো। শুধু রইলো সোফায় বসা নিশান, নাসিরুল তালুকদার, জিৎের অপেক্ষায় থাকা লামিয়া, আর শৈলী। শৈলী আসলে কেনো দাঁড়িয়ে আছে তা নিজেও জানেনা। কিন্তু লামিয়াকে নিজ চোখে চলে যেতে না দেখলে তার শান্তি হবেনা। এদিকে সে আরেক চিন্তায় মগ্ন হলো। যদি লামিয়ার সাথে বিয়ে না হয়, তাহলে কাল যে বাসর ঘর সাজানো হলো! ওখানে কি নিশান যায়নি? ঘুমালো কোথায় তবে? এসব ভাবতে ভাবতেই চোখ গেল নিশানের উপর।

এ পর্যায়ে নাসিরুল তালুকদার সোজা হয়ে বসে নিশানের দিকে তাকিয়ে বলেন,

—" নিশান, শোনো, দু বছর আগে একটা কথা বলেছিলে তুমি আমায়৷ নিশ্চয়ই মনে আছে। তুমি বরং এসব নাটক বাদ দিয়ে সেই কথাটা বাস্তবে রূপান্তর করো। যত দ্রুত সম্ভব, কি করার করো। এরপর বাকিটা আমি দেখব৷"

নিশান এবার সতর্কতার দৃষ্টি ফেলল শৈলী আর লামিয়ার উপর, এরপর সরু চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,

—" হঠাৎ এ কথা বলছো কেনো তুমি?"

নাসিরুল তালুকদার শৈলী আর লামিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—" এদের সামনেই বলব?"

তৎক্ষনাৎ সতর্ক হলো নিশান। তড়িঘড়ি করে বলল,

—" রাতে তোমার ঘরে কথা বলতে যাব আমি।"

বলেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। শৈলীর কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়াতেই তটস্থ হয়ে চোখ তুলে তাকালো শৈলী৷ নিশান এবার একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

—" গতকাল তোর ঘরে ছিলাম। অবশ্যই সোফাতে। কারন বিছানাতে তুই পেতনির মত জায়গা দখল করে ঘুমিয়েছিস! যদিও আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট।"

শৈলী হতবাক হয়ে তাকালো নিশানের দিকে৷ লোকটা কি জাদুটাদু জানে নাকি। উনি কীভাবে বুঝতে পারলেন যে শৈলী গতরাতে নিশান কোথায় ছিল সেটাই ভাবছে। ভয়ে জড়সড় হয়ে ঢোক গিলল শৈলী। মাথা নামালো তৎক্ষনাৎ। নিশান এবার আগের মত গম্ভীর হয়ে বলে উঠলো,

—" একটু পর জিৎ আসলে লামিয়াকে বিদায় করে দিস তুই৷ আমার ঘুম পাচ্ছে, ঘুমোতে গেলাম। ঘরে যেন কেও ডিস্টার্ব করতে না আসে। "

বলেই উপরে চলে গেল নিশান। এরপর নাসিরুল তালুকদারও লামিয়ার সাথে ফর্মালি কথা বলে চলে গেলেন। শুধু হতবাক হয়ে থাকা শৈলী দাঁড়িয়ে রইলো অবুঝের ন্যায়। কাল তবে নিশান ভাই তার ঘরে ছিল? কিন্তু কেন? আর শৈলী কিছু বুঝতে পারল না কেন?

লামিয়া তখনো শান্তভাবে বসে ছিল, কিন্তু নিশানের চলে যাওয়ার পর হালকা করে পাশ ফিরে তাকালো শৈলীর দিকে। শৈলী ততক্ষণে নিজের দম আটকে রেখেছে, মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরে রীতিমতো ঝড় চলছে। লামিয়ার ডাকে চমকে উঠল সে।

—"শৈলী?"

শৈলী ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকালো। লামিয়ার চোখে কোনো শত্রুতা নেই, বরং একরাশ মায়া। লামিয়া একটু সরে গিয়ে পাশে বসতে ইশারা করে বলল,

—"বসো আমার পাশে। একটু কথা বলি, মেয়ে হয়ে একটা মেয়ের সাথে, হয়তো একদিন এসব মনে থাকবে না, কিন্তু আজ থাকুক...!"

শৈলী একটু দ্বিধা নিয়ে বসে পড়ল। গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে থাকা কথাগুলো ওর কণ্ঠ আটকে রেখেছে। লামিয়া হঠাৎ করেই খুব সাবলীলভাবে বলে উঠল,

—" জানো শৈলী, তোমার চোখের পানি কিন্তু খুব দামি। খুব বেশি দামি। কিছু মানুষ সেই দামে নিজের সমস্ত আবেগের হিসেব কষে ফেলে।"

শৈলী ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। লামিয়া একটু হেসে বলে,

—"তুমি হয়তো জানো না, কেউ কেউ আছে, যারা চোখে চোখ রেখে কিছু বলতে পারে না, কিন্তু চোখের পানি দেখলে নিজের ভেতর পুড়ে যায়। নিশান ভাই তেমনই একজন। উনি কখনো মুখে কিছু বলবে না, কিন্তু সব বলেও দেবেন, কাজের ভেতর দিয়ে, চুপ থেকে, রাগ দেখিয়ে, কিংবা হাসির আড়ালে একটা দীর্ঘশ্বাস রেখে।"

শৈলী এবার ভ্রু নত করে নিচের দিকে তাকায়, দম আটকে আসে তার। নিশানের কাল রাতে ঘরে থাকা, কোলবালিশ, ব্যান্ডেজ দেওয়া হাতের কথা হঠাৎ করে খুব বেশি সত্যি মনে হয়। লামিয়া এবার একটু থেমে গভীরভাবে বলে,

—"আমি নিশ্চিত, নিশান ভাই এমন কেউ না, যিনি কারো জন্য রাতভর জেগে পাশে বসে থাকেন। আমি নিশ্চিত, ওনার জোরে কেউ না কাঁদলেও, তবু কারো চোখের অশ্রু দেখে যদি মনে পুড়ে, তবে সেটা কিছু একটা তো বটেই।"

শৈলী এবার ঠোঁট কামড়ে ফেলে। চোখ ছলছল করলেও চুপচাপ বসে থাকে। কথা নেই, উত্তর নেই, শুধু মনে হচ্ছে কেউ যেন তার বুকের গভীর ভাবগুলো পড়ে ফেলেছে। একটু পরে লামিয়া এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে,

—"তোমার জন্যই তো উনি গত রাতটা ওভাবে পার করল ভোরে। তোমার নীরব অভিমান বোঝার জন্যই তো তার সব মিথ্যে নাটক সত্যি হয়ে গেল আজ।"

শৈলী এবার তাকায় লামিয়ার দিকে। লামিয়া হেসে বলে,

—"এটা বলছি না যে আমি জানি, তুমি উনাকে ভালোবাসো। কিন্তু এটুকু বুঝি, ভালোবাসাটা যদি একতরফাও হয়, তাও তো কষ্ট হয়, তাই না?"

শৈলী এবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। একটু কাঁপা স্বরে শুধু বলল,

—"আমি তো জানতামই না, কেউ এভাবে..."

লামিয়া এবার ওর হাত চেপে ধরল। তারপর বলল,

—"এবার মুখ খোলো শৈলী। কারণ ভালোবাসাটা একতরফা নয়। শুধু একটু সাহস দরকার তোমারও।"

*********

বসার ঘরের হালকা গুঞ্জন, বিদায়ের প্রস্তুতি, আর অচেনা এক শূন্যতা ঘিরে ধরেছে তালুকদার বাড়িটাকে। জিৎ এসে গেছে, স্মিত হাসি আর ভেজা চোখে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কারো কোনো কথা বলার নেই, শুধু কুশল বিনিময় আর কিছু গোপন দীর্ঘশ্বাস। শৈলী নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লামিয়ার চোখে একটা তৃপ্তি দেখে। সেই মেয়েটা, যে নাটকের বউ হয়ে এসেছিল, সত্যিকারের একটা সুরক্ষা পেয়ে এখন নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে ফিরে যাচ্ছে।

—"ভালো থেকো শৈলী!"

ফিসফিস করে বলল লামিয়া, ঠিক এই বিদায়ের মুহূর্তে। শৈলী মাথা নাড়ল, কিন্তু কিছু বলল না। শুধু মনে মনে বলল, আমি থাকব। লামিয়া আর জিৎ বেরিয়ে গেল দরজার বাইরে। ভেতরটা হঠাৎ নিঃসঙ্গ লাগল। এক অজানা টানেই শৈলীর পা ঘুরে গেল নিশানের ঘরের দিকে। দরজাটা ঠিকভাবে লাগানো নয়, হালকা ফাঁকা। শৈলী ধীরে ধীরে উঁকি মারল। নরম আলোয় ভেসে আসছে শান্ত এক দৃশ্য। নিশান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো ভাবছে, হয়তো শূন্য দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছ । তার একটা হাত জানালার কাঠে ভর দেওয়া, আরেক হাতে একটা পেপার ওয়েট।

শৈলীর চোখ আটকে যায়। নিশান জানে না যে কেউ তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই নিশান হঠাৎ ধীরকন্ঠে বলে উঠলো,

—"আজ লামিয়া গেল। কিন্তু যার আসার কথা, সে কি কোনোদিন আসবে?"

শৈলীর চোখ কাঁপে। নিশান এবার ধীরে পেপার ওয়েট টা টেবিলের উপর রাখে, তারপর নরম গলায় বলে,

—"আমার ঘরের সেই মেয়ে, যে পেতনির মতো বিছানাজুড়ে ঘুমায়, যার চোখে অশ্রু দেখে আমার বুক ভারী হয়ে যায়, যার ছোট্ট একটা স্পর্শে আমার রাত ঘুম হয় না,সে যদি কোনোদিন জানতে পারত, আমি তাকে কতটা....!"

শৈলীর নিঃশ্বাস আটকে যায়। বুক ধকধক করতে থাকে। বলুন না নিশান ভাই। একবার বললে কি এমন ক্ষতি হয়ে যায়। নিশান হঠাৎ দরজার দিকে তাকায়, একঝলকেই বুঝে যায়, কেউ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে চোখ পড়ে। শৈলীকে চরমভাবে চমকে দিয়ে নরম গলায় বলে উঠলো নিশান,

—"আর কতক্ষণ উঁকি মারবি শৈলী?"

চমকে বিষম খায় শৈলী। শুকনো ঢোক গিলে পর্দার আড়ালে গেলে নিশান ভ্রু কুঁচকে বলে,

—" উঁকি মারা হয়নি তোর? আরো কোনো গোপন তথ্য উদ্ধার করতে চাস নাকি? ঘরে ঢুকলে ঢোক, নইলে দূর হ তো। জ্বালাস না এখন! নিজের সাথে কথা বলছি!"

শৈলী কোনো কথা বলল না। চোখ নামিয়ে ফেলল, তারপর চলে না গিয়ে ধীরে দরজার ভেতরে পা রাখল। পায়ের শব্দ যেন নরম কম্বলের মতো মেঝেতে গলে গেল। নিশান জানালার পাশ থেকে সরে এলো, তারপর ধীরে ধীরে তাকাল শৈলীর চোখে। চোখের সেই দৃষ্টিতে কিছু ছিল,কষ্ট? ভালবাসা? অনুতাপ? অভিমান? সবই হয়তো। শৈলী একটুও শব্দ করল না, শুধু নিঃশ্বাস নিতে নিতে সামনে এসে দাঁড়াল। দুজনের মাঝে ছোট্ট একটা টেবিল, যেটা চাইলে এখনই সরিয়ে ফেলা যায়, আর না চাইলে সেটাই থাকবে তাদের দূরত্বের প্রতীক হয়ে। নিশান প্রথমে কিছু বলল না। তারপর কণ্ঠটা হঠাৎ ভারী করে, নিচু স্বরে বলল,

—" কিছু বলবি তুই?"

মাথা নামিয়েই দুদিকে মাথা নেড়ে শৈলী বলে,

—" নাহ!"

— " তাহলে আমি বলি?"

শৈলী আগের মতোই মাথা এলিয়ে দিল। বলুন নিশান ভাই! আপনিই বলুন। আমি বরং শুনি। কখনো শোনা হয়নি যে। নিশান বোধহয় বুঝলো শৈলীর আকাঙ্ক্ষা টা, সে বলতে শুরু করল,

—"আমি জানি, তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। বাসরঘরের মত জায়গা, যেখানে স্বপ্ন থাকে, সেটা তোর জন্য বুকের ব্যথা হয়ে গেছে। আমি জানি। কিন্তু, তুই আমাকে বিশ্বাস করেছিলি, না করেও করেছিলি। তোর চোখে আমি ভয় দেখেছি, কষ্ট দেখেছি, কিন্তু সবসময়, সব কথা মুখে বলা যায় না শৈলী।"

শৈলী এবার মাথা তুলল। তার চোখে অশ্রু, কিন্তু ঠোঁটে চাপা কাঁপন।" তাহলে আজ বলুন। মুখে বলুন নিশান ভাই, আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন?"কথাটা নিজেও মুখে আনতে পারলনা শৈলী। তবে ম্যাজিশিয়ান নিশান তবুও শুনলো মনে মনে বলা জোরালো কথাটা।

নিশান চুপ করে তাকাল তার দিকে। তারপর ধীরে টেবিলটা সরিয়ে দিল মাঝখান থেকে, বুঝিয়ে দিল, এই দূরত্ব থাকবেনা আর। এক কদম সামনে এগিয়ে এসে নিশান নিচু গলায় বলল,

—"তোর সাথে কোনোদিন ওসব অনুভতি নিয়ে কথা বলিনি, কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। তুই যদি ভুল বুঝে আমায় ইগনোর করা শুরু করিস, ফিরে না তাকাস, ঘৃণা করিস, তখন তো আর সেটা সহ্য করতে পারতাম না শৈলী। থোরাই না আমি দুবছর ধরে মুখে তালা মেরে রেখেছি!"

শৈলীর মুখটা মুহূর্তেই থমকে গেল। চোখ যেন ঘোলাটে হয়ে এলো, নিঃশব্দে নিশানের দিকে তাকিয়ে রইল সে কিছুক্ষণ। তারপর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

—"দুই... দুই বছর?"

নিশান তার দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল, মাথা ঝাঁকিয়ে হালকা কাঁপা গলায় বলল,

—" কেনো? দুবছর কম হয়ে গেছে বুঝি?'

শৈলী যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেছে কিছু সময়ের জন্য। তার চোখে বিস্ময়, কপালে ভাঁজ। এই লোকটা এত খারাপ! দুবছর! দুবছর ধরে এভাবে চুপ করে আছে। কিন্তু শৈলী তো নিজেই নিশানকে গত এক বছর ধরে ভালোবাসে। নিশান এবার শৈলীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর চোখে বলল,

—"বোঝানোর মতো সাহস ছিল না শৈলী। তুই যে আমার কাছের হয়ে গিয়েছিলি, এটা তোর অজান্তেই হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু চেয়েছি তুই ভাল থাকিস!"

শৈলী এবার নিঃশব্দে চোখ বুজল। তারপর চোখ খুলে বলল,

—"আর আপনি ভেবেছেন, আমি বুঝিনি?"

নিশান একটু চমকে তাকাল। মেয়েটা কথা বলল তবে! শৈলী তার দিকে এগিয়ে এসে মৃদু কণ্ঠে বলল,

—"একটা মানুষ যে আমার প্রতিটা অনুভূতি বুঝে নেয়, আমার ব্যথায় রাতে ঘুমায় না, আমার মুখের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তাকে চিনে নিতে কি সত্যিই ভাষা দরকার হয় নিশান ভাই?"

এক চিলতে হাওয়া ঘরটাকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করল। নিশানের মুখে তখন গভীর এক বিস্ময় আর তীব্র ভালোবাসা। সে শুধু মৃদু কাঁপা কণ্ঠে বলল,

—"তুই জানতিস?"

শৈলী হেসে মাথা নেড়ে বলল,

—" উহু না!"

—" জানবিও না। বলদ যে তুই। তুই জানিস না, কীভাবে তোর নীরবতা আমার বুক চিরে দেয়। কীভাবে তোর একটা আঙুল কা"টা দেখে আমি সারারাত জেগে বসে থাকি, জানিস না। তুই হয়তো ভাবিস, আমি পাথর, কিন্তু আমি তোকে...যাক গে, শোন শৈলী, সেই অনুভতি যে কোনো ঘর নয়, একটা জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখে, তোকে নিয়ে, শুধু তোকে নিয়ে।"

শৈলীর চোখ বেয়ে টুপ করে অশ্রু ঝরল। ঠোঁট কাঁপছিলো, কিন্তু তাতে একটুও ভয় ছিল না, ছিল শুধু এক গভীর স্বস্তি। সে নিচু গলায় বলল,

—"আর যদি আপনার কথায়ও আমার চোখে ঘৃণা না আসে নিশান ভাই? যদি আমি আজও আপনার কাছে বসে, শুধু বলি,যেখানে রাখবেন, আমি থাকবো! তাহলেই কি বোঝাতে পারব, আমার ভিতরেও আপনাকে নিয়ে একটা সমুদ্র গড়ে উঠেছে?"

নিশানের গলা শুকিয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,

—"তাহলে....... তাহলে এবার শুধু একটা কথাই বলি, শৈলী...!"

শৈলী কাঁপা গলায় বলল,

—"বলুন!"

নিশান তার কণ্ঠটা শক্ত করল। এরপর একদম ধীর কণ্ঠে বলল,

—"তুই আমার বউ হয়ে এই ঘরে থাকিস, আজীবন। ব্যবস্থা টা করতেই যাচ্ছি এখন!"

বলেই টি শার্টের উপর জ্যাকেট পড়তে থাকলো নিশান। এদিকে শৈলী কিছু না বুঝে তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করল,

—" মানেহ? কীসের ব্যবস্থা করতে যাবেন?"

নিশান বলল,

—" দুবছর আগে তোর বড় বাপটাকে বলেছিলাম যে তোকে বিয়ে করতে চাই৷ এখন না করা পর্যন্ত উনি খোটা দিতেই থাকবে৷ দেখলিনা, বসার ঘরে বলল তাড়াতাড়ি কথাটা বাস্তবে রূপান্তর করতে। তাই যাই, ব্যবস্থা টা করে আসি। এদিকে আমার মা সবাইকে যেহেতু মিষ্টি খাইয়েছে, তাহলে সত্যি সত্যিই বউটা আনা দরকার বুঝলি! তুই যা, ঘরে যা। পরে পার্মানেন্টলি আসিস এ ঘরে!"

চলবে........

কি লিখলাম নিজেও জানিনা!🙂 আমি রাইটিং ব্লকে পড়ে গেলাম। একসাথে অনেক গল্প লিখছি তো। যাক আজকের ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর হয়তো পরবর্তী পর্ব আসতে সময় লাগবে। তাই ভালোবাসা রইলো 🫶✨#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_৫ ( স্পেশাল পর্ব - শেষ অংশ✨)

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

শৈলী এখন পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছেনা যে নিশান তাকে রীতিমতো বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে গেলো। এ কি ঝামেলা! এভাবে হুট করে মনটা কে পুকুর থেকে তুলে সাগরে ফেলে দিলে কি হবে? বেচারি শৈলী তো এখন পর্যন্ত বিষয়টা নিতেই পারছেনা। নিশানের এমন অদ্ভুত আচরণ আসলেই দুর্লভ! এমন হতে থাকলে তো বেচারি শৈলী মুর্ছা যাবে। বিছানায় বসে চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। চোখে-মুখে এক ধরনের থমথমে বিভ্রান্তি। মাথার ভেতর যেন টর্নেডো বইছে,

—"এইমাত্র উনি কী বললেন? বিয়ে করবেন আমায়? আমি কী সত্যি শুনেছি ওটা? না, না..,এমন হুট করে কেউ এমন কথা বলে? কই, এতদিন তো বললেন না কিছু! এমন কথা ফট করে মাথায় এলো কীভাবে? "

শৈলী একবার কপালে হাত রাখছে, আবার মনে হচ্ছে বুকটা খুব জোরে ধুকপুক করছে। নিশান কি আসলেই? না না, এভাবে তো কেউ সাগরে ফেলে দেয় না কাউকে! পুকুরের পানি পর্যন্ত সহ্য হয়নি এখনো তার, আর সাগর তো, "আল্লাহ, আমি কি মুর্ছা যাব!"

এমনভাবেই মুখ চেপে নিজের মনে বিড়বিড় করছিল শৈলী, ঠিক তখনই দরজায় অবিরত ধাক্কা দিতে শুরু করল কেও।

—"শৈলী!! শৈলী!!"

মিমি দৌঁড়ে এসে ঢুকলো শৈলীর ঘরে, চোখ-মুখে একদম তাড়াহুড়া ভঙ্গি। শৈলী আঁতকে উঠে বলল,

—"এই কী হয়েছে? এভাবে ছুটে আসছিস কেনো মিমি?"

মিমি এবার হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—" শৈলী, বোইন আমার, গ্রেট নিউজ। বড়মা কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দেখে একদম বেলন আর সিলিন্ডারের মত লাগছে আমার। অ্যাসথেটিক সিনারি!"

শৈলী নাক মুখ কুঁচকে হতবাক হয়ে বলল,

—" কিহ? কেনো? কী হয়েছে?"

মিমি এবার ঢোক গিলে ধীরে ধীরে বলল,

—" মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে। তোর নাম করেই কাঁদতেছে রে। নিশান ভাই একটু আগে বড় আব্বুকে বলল তোর সাথে তার বিয়ের আয়োজন করতে, তাও আবার আগামী তিন দিনের মধ্যে। এমন থ মার্কা কথা শুনে বড় মা বকতেছে, নিশান ভাই নাকি জাদুর কবলে পড়ে এখন তোকে বিয়ে করতে চায়! এগুলো ভেবেই নাকি তার বুক ফেটে যাচ্ছে! আমি তো বললাম, আরে বড়মা কাঁদছো কেনো, এখনো তো বিয়ে হয়নি, চিন্তা করোনা। কিন্তু বড়মা হুহা করে কাঁদতেছে!"

শৈলী এবার একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করে তাকালো, বড় বড় চোখ করে বলল,

—" এসব কী বলছিস তুই মিমির বাচ্চা মিমি। উনি কি সত্যিই বলে দিয়েছে। হায়হায় রে, এখন কী হবে? আর...আর বড়মা! আল্লাহ! উনি আমাকে মেনেই নেবে না। আর নিশান ভাই কীভাবে এমন একটা কাজ করতে পারল!"

মিমি এবার হাসি আটকে রাখতে না পেরে বলল,

—"আরে ধুর, শৈলী, বাদ দে। এখন আর ভাবার টাইম নাই! নিচে চল। একটা কিছু করতে হবে, না হলে বড়মার কান্না থামবে না। আর তুই যদি নিশান ভাইয়ের কথায় সত্যি হ্যাঁ বলিস, বিয়েতে রাজি হোস, তাহলে মনে কর বড়মার রুমে আমাদের স্যালাইন লাগাতে হতে পারে! ডক্টর ডেকে রাখা ভালো বুঝলি!"

শৈলী এবার কপালে হাত দিয়ে চুপ করে বসে রইলো। এরপর ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

—" বড় আব্বু কী বলল?"

মিমি এবার একটু ভেবে বলল,

—" বড় আব্বুর মনে হয় কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে বুঝলি। কথাটা শোনার পর এমনভাবে তাকিয়ে আছে, মনে হয় আগে থেকেই জানে। বিশেষ করে বড় আব্বু বড় মার দিকেই তাকাচ্ছিল। তারমানে বড় আব্বু আগে থেকেই রাজি। এসবে উনার কোনো সমস্যাই নেই। শুধু বাকিদের রিয়েকশন দেখছে। উফ! এমনটা হলে সেই মজা হবে!"

শৈলী মুখ কুঁচকে বলল,

—" তোর মজা লাগছে মিমি? আমার মাথা চরকির মত ঘুরতেছে, বিটিভির মত ঝিরঝির করতেছে চোখ দুটো!"

মিমি এবার ঠিক যেন লাফিয়ে উঠে হেসে ফেলে! মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে,

—" আরে শৈলী, কিউট বোন আমার, কী যে দুষ্টু কথা বলো না তুমি! বিটিভির মত ঝিরঝির করলে তো এখন একটাই সল্যুশন, বিয়ের বিজ্ঞাপন চালাও, আবার স্পন্সর করে ফেলো, নিশান ওয়েডস শৈলী!"

শৈলী এবার মিমির দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,

—"তুই একটু চুপ করে থাকবি মিমির বাচ্চা! মাথার মধ্যে এমনিতেই বিশ্রী কুয়াশা জমেছে, তার ওপর তোর এই তামাশা! "

মিমি এবার গম্ভীর মুখ করে বিছানায় বসে পড়ে বলল,

—"আচ্ছা বল, একটা জিনিস তোকে জিজ্ঞেস করি। তুই কি চাস না নিশান ভাই তোকে বিয়ে করুক? ধর, বড়মা পরে রাজিও হয়ে গেল, এমনিতেও নিশান ভাই রাজি করিয়েই ছাড়বে, কিন্তু তখন কি তুই বলবি যে, না, আমি কিছু চাই না?"

শৈলী থমকে যায়। ঠোঁট কাঁপে, চোখ পলক পড়ে না। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে সে ধীরে বলে,

—"আমি জানি না, মিমি, আমি শুধু জানি, উনি আমার চোখের পানি দেখেছে। আর আমি কাঁদলে কেউ তা দেখতে পারুক বা না পারুক, উনি দেখেছে। জানিস, উনি আগে থেকেই জানত যে আমি ওনাকে ভালোবাসি। কীভাবে বুঝলো বল তো? চোখের দিকে না তাকালে তো কিছু বোঝা যায়না। তারমানে উনি তাকিয়েছেন। এটা, এটা কিছু না তো?"

মিমি এবার একদম চুপ করে গেল। শৈলীর কথাগুলো একেবারে বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করল তার। এক মুহূর্তের জন্য ঠোঁট কামড়ে বসে রইল সে, তারপর ধীরে ধীরে হাসল। কিন্তু সে হাসি ছিল না কোনো খিলখিল করা উচ্ছ্বাসের, ছিল একরকম কোমল, গভীর মায়ার মতো।

—"কিছু না হলেও এটাই সব। শৈলী শোন, মানুষ তো চোখে তাকিয়ে বুঝতে শেখে, কিন্তু কেউ যদি তোর চোখের অশ্রু না দেখেও তা অনুভব করতে পারে, তবে বুঝে নিস, সে তোর মনের মধ্যেই থাকে। নিশান ভাই তাকিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু শুধু চোখে না, তোর আত্মার ভেতরে, তোর নিঃশব্দ অনুভূতির শব্দ শুনেছেন উনি।"

শৈলী এবার কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,

—"তখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম মিমি... কিন্তু সেই ঘুমের মধ্যেও কেউ আমাকে কম্বল দিয়েছিল, আমার আঙুলে ব্যান্ডেজ করেছিল, পাশে কোলবালিশ রেখেছিল। আমি তখন কাঁদছিলাম... চোখে পানি ছিল। আমি জানিও না, কখন! কীভাবে?"

মিমি এবার কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলল,

—"তুই ঘুমিয়ে ছিলি, কিন্তু কারো মন জেগে ছিল। তোর কান্না তার ঘুম ভাঙিয়েছিল, আর তোকে না দেখে তার শান্তি হয়নি। নিশান ভাই তো কথায় ভালো না, কিন্তু কাজে, তিনি ছায়ার মতো, নীরব ভালোবাসার ছায়া।"

একটু থেমে মিমি হেসে আবার যোগ করল,

—"শুধু একটা কথা বলি শৈলী শোন, এমন কেউ যদি জীবনে আসে, তাকে ভয় পেয়ে দূরে ঠেলে দিস না। কারণ, চোখের পানি মুছে দেওয়া মানুষগুলো এই দুনিয়ায় খুব বিরল।"

শৈলী মুচকি হাসলে একটু থেমে মিমি খুনসুটি করে যোগ করল,

—"আর তুই না চাইলেও, আমি কিন্তু কাল রাত থেকেই বিয়ের গিফট প্ল্যান করে ফেলছি। নাহলে এই বাসর সাজানো আর ব্যান্ডেজের বাসর, দুটার গল্প নিয়ে আমি একখান বইই লিখে ফেলব! কি নাটকটাই না করতে পারে আমাদের নিশান ভাই! "

শৈলী এবার হেসে ফেলল না, কিন্তু চোখের কোণে যে একফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, সেটা আর লুকিয়ে থাকল না। ঠোঁট চেপে বলল,

—"চল, নিচে যাই। বড়মার কান্না থামাতে হবে। আর, হয়তো আমাকেও আমার মনের কথাটা একটু একটু করে বোঝাতে হবে, নিজেকেই।"

°°°°°°°°°

নিচে নেমে এসে শৈলী প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যায়। খাবার ঘরের পাশের সোফার এক কোণে বসে থাকা খাদিজা তালুকদার মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদছেন। পাশে বসে আছেন রাশিদা তালুকদার, যিনি মাঝে মাঝে পানি খাইয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, আবার মুখে মুখে রুমাল চেপে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যাচ্ছেন বারবার। নিশান নেই, নাসিরুল তালুকদার নিজের ঘরে। শৈলী আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারে না। হঠাৎ করেই সাহস খুঁজে পায় সে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে বড়মার সামনে। খাদিজা তালুকদার ধীরে মাথা তুলে তাকালেন। শৈলী চুপচাপ, মুখ নিচু, ঠোঁটে হালকা কাঁপুনি। সে আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে খাদিজা তালুকদারের পাশে বসে পড়ল। একটু সময় নিয়ে শান্ত গলায় বলল,

— "বড়মা..." শৈলীর কণ্ঠে অনুরোধ, মায়া আর এক চিলতে ভয় মিশে একাকার। খাদিজা তালুকদার একটু হাত সরিয়ে তাকান। চোখ লাল হয়ে আছে, মুখটা অভিমানে ভার।

—"তুই এসেছিস? এবার কি আমায় বোঝাবি যে সব ঠিক আছে? আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। আমার নিশান, আমার ছেলেটা, এত কিছু করে গেল, তুই কিছুই বুঝলি না? এইদিন দেখার জন্য তোকে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছি! আমার ছেলেটাকে আগে থেকেই হাত করেছিস তুই! তারউপর ওর বাপও নাকি সব জানতো! তোরা পুরো বংশ আমায় সারাজীবন জ্বালালি!"

শৈলী এবার ঠোঁট কামড়ে চোখে পানি চেপে রাখার চেষ্টা করল। তারপর মাথা নিচু করে নরম গলায় বলল,

—"আমি যদি না বুঝতাম, তাহলে আজ এখানে এসে তোমার পায়ের কাছে বসতাম না বড়মা। আমি হয়তো দেরি করে বুঝেছি। কিন্তু আজ আমি ঠিক বুঝেছি। তবে, একটা কথা বলি বড় মা, তোমার ছেলে বড্ড চাপা। তার অনুভূতি কোনো চিৎকার করে বলা গল্প না, এটা নীরবে নিভৃতে লেখা উপন্যাস। আমি পড়েছি বড়মা, পাতায় পাতায় পড়ে ফেলেছি। কিন্তু একটু দেরিতে। বিশ্বাস করো, আমি জানতাম না। আমি তো ভেবেছিলাম একতরফা ভালোবাসা নিয়েই বেঁচে থাকব।"

খাদিজা তালুকদার এবার চোখে পানি নিয়ে তাকালেন ওর দিকে। হাত বাড়িয়ে শৈলীর মাথায় রাখলেন। এরপর ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন,

—" আমার কিছু বলার ভাষা নেই। না জানি কি এমন জাদু করেছিস তুই। কিন্তু আমিও নিরূপায়। নিশান আমার কলিজার টুকরা। আমি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার ছেলে যাকে বিয়ে করতে চাইবে, তাকেই আমি মেনে নেব। এই কারনে লামিয়ার ক্ষেত্রেও দ্বিমত করিনি। সেখানে তো তুই... যাক, আমি শুধু এটাই দেখব তুই কীভাবে আমার ছেলেকে সামলাস। ও তোকে বিয়ে করতে চায়। তোর বড়বাপটা তো আগে থেকেই এক পা খাড়া হয়ে রাজিও হয়েছে। আমি আর কিছু বললাম না। পরে যদি কোনোভাবে শুনেছি যে আমার ছেলেকে তুই অখুশি রেখেছিস, তখন তুই চিনবি আমাকে।"

শৈলী বিশ্বাস করতে পারলনা। অজান্তেই চোখদুটো ভিজে গেল, ঠোঁট চেপে নীরবে চোখের পানি ফেলে খাদিজা তালুকদারের শাড়ির আঁচল খাঁমচে ধরল শৈলী। খাদিজা এবার নিজের চোখ মুছে মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,

—" এই! সর এখন সামনে থেকে। কান্না করার জায়গা পাস না। সবাই নাটক শুরু করেছে। একেকটার ঢঙ দেখে বাঁচিনা। সর! অনেক কাজ বাকি! তিনদিনের মধ্যে বিয়ের আয়োজন করা কি মুখের কথা? আমার সোনার ছেলে আবার তিনদিনের মধ্যে বিয়ে করার আবদার করেছে! একেকজন রঙ্গ শুরু করছে! সব আয়োজন দৌড়াদৌড়ি করে তো এখন আমাকেই করতে হবে!"

শৈলী অবাক হয়ে তাকিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়াল, চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসির নিচে একটা কেঁপে ওঠা বুক লুকিয়ে আছে, একটা অচেনা আনন্দে মন কাঁপছে তার। খাদিজা তালুকদার মুখ ঘুরিয়ে বসে পড়লেন সোফায়, যেন কিছুই হয়নি। অথচ চোখের কোণে যে এখনো অল্প অল্প জল টলমল করছে, সেটা শুধু খুব আপনজন দেখলে বোঝে। শৈলী পেছনে পা ফেলতে ফেলতে একবার তাকাল বড়মার দিকে। খাদিজা তালুকদার তখন সোফার পাশের টেবিল থেকে চায়ের কাপ তুলছেন, মুখে কঠোর অভিব্যক্তি রেখে বললেন,

—"তোরে একদিনও যদি দেখি, আমার ছেলেকে মুখ ভার করিয়ে রেখেছিস, মনে রাখিস, আমি এখনো লাঠি চালাতে জানি। ওই পুরনো রেজিস্ট্রি খাতার সঙ্গে আমার বিয়ের সময়কার বাঁশের লাঠিটাও রেখে দিয়েছি, কাজে আসবে।"

শৈলীর চোখ চকচক করে উঠল, সে মুখ নিচু করে মাথা নাড়ল, কিন্তু ঠোঁটে ফুটে উঠল নিঃশব্দ একটা হাসি। সেই হাসির মধ্যে লুকিয়ে ছিল স্বস্তি, ভালোবাসা, আর একটু ছেলেমানুষি। আরেকবার নিজের চোখ মুছে খাদিজা তালুকদার ফিসফিস করে বললেন, যেন কেউ না শুনতে পায়,

—" বড় মা না বলে মা ডাক শোনার জন্য কবে থেকে কান পেতে বসে আছি তা তো আর কেও জানেনা! যত্তসব ঢঙ! আমার ছেলেটাও নাটকবাজ! এই মেয়েটাও নাটকবাজ! তালুকদার বাড়ির একটা ছেলে মেয়েও স্বাভাবিক না, সবাই দুনিয়ার ঢঙ শিখেছে!"

শৈলী এবার মুখ চেপে কান্না চাপতে চেষ্টা করল। তবু তার চোখ থেকে দুইফোঁটা অশ্রু ঠিকই গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। মিমি এসব দেখে উঁকি মেরে বলল,

—" আহা! আহারে! এই দৃশ্য ক্যামেরায় রাখলে ঈদের নাটকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে দিলেই হতো! এখন চল মিমি, অনেক কিছু বাকি। তিনদিনের মধ্যে বিয়ে, চা খেতে না খেতেই শাদি!"

সবাই হেসে উঠল। শৈলী চোখ মুছল, আর খাদিজা তালুকদার মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট চেপে হাসলেন, এই যে সম্পর্কের শুরু, এই যে ভালোবাসার নির্ভরতা, এটাই তো জীবন।

ওপাশ থেকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা নিশান দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিল। মুখে কোনো শব্দ নেই তার, চোখে গভীর প্রশান্তি। ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি খেলে গেল, অবশেষে, যার চোখের জল সে মুছেছিল, আজ সেই মেয়েটা তার হয়ে গেল। নিশান মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

—" আজও কিছু বললাম না, তবু তুই শুনে ফেললি, এটাই তো তোর ভাষায় ভালোবাসা, তাই না? এবার তো আমার ঘরে তোর পার্মানেন্ট থাকাটা কনফার্ম!"

°°°°°°°

শৈলী উপরে উঠে নিজের ঘরের দরজার কাছে পৌঁছাতেই বিপরীত দিক থেকে উপরে উঠে আসা নিশানকে দেখতে পেলো। আজ তার চোখে কেমন প্রশান্তির ছায়া, একটুও না গম্ভীর, না উত্তপ্ত। শৈলী থমকে দাঁড়ালো। নিশানও। একটা মুহূর্ত, নিঃশব্দ, স্থির, অথচ ভেতরে দু'জনের হৃদয় যেন গোলমাল করছে। নিশান একটু হেঁটে তার পাশে এসে বলল,

—"মা কে সামলাতে পারলি?"

শৈলী কিছুটা চমকে তাকাল নিশানের দিকে। এমন স্নিগ্ধ, নরম স্বরে কথা, যেটা সাধারণত গম্ভীর, কড়া মুখের এই মানুষটার কাছে আশা করা যায় না। তাতে শৈলী এক মুহূর্তের জন্য ভুলেই গেলো কী উত্তর দেবে। সে চোখ নামিয়ে ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। নিশান এবার পাশে এসে দেয়ালে হেলান দিয়ে একটু নিচু স্বরে বলল,

—"তোর চোখ দেখে বুঝতে পারি কখন কান্না করবি কবে রাগ হবি, লজ্জা পাবি। আজ শুধু একটা জিনিস জানতে চাই, মা যে আমাদের নাটকবাজ বলল, তো তুই কি এই নাটকটাকে সত্যি করতে পারবি? আমি কিন্তু প্রস্তুত।"

শৈলী থতমত খেয়ে গেলো। এতটা সোজাসাপ্টা কথা! তাও এমনভাবে! বুকের ভেতরটা যেন ধকধক করতে শুরু করল। মুখ না তুলেই ফিসফিস করে বলল,

—" আমি তো...

নিশান কথা কেড়ে নিয়ে বলল,

—" হুম জানি। তুই তো একটা বলদ!"

কপাল কুঁচকে মাথা নামালো শৈলী। এভাবে মুখের উপর অপমান করার কোনো মানে হয়? শৈলীর এমন মুখভঙ্গি নিশান হালকা হাসল। তারপর পকেট থেকে কিছু একটা বের করে শৈলীর হাতে দিয়ে বলল,

—"এটা তোর জন্য। আজ না হোক কাল, তুই আমার হবি। এখন থেকে সময় কম, কাজ বেশি। তোকে প্রস্তুত থাকতে হবে। বিয়ে মানে শুধু মেহেদী আর সাজগোজ না, এটা পুরো একটা জীবন। তোর সাথে সেটা শুরু করতে চাই আমি।"

শৈলী এবার ধীরে চোখ তুলল। হাতে রাখা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে চোখ ছলছল করে উঠল। এটা ছোট্ট নকশা করা একজোড়া কাঁচের চুড়ি। হয়তো খুব সাধারণ কিছু, কিন্তু তাতে একরাশ গভীরতা। নিশান নিজে হাতে দিয়েছে, তাই সেটা শৈলীর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহার। সে শুধু মাথা নাড়ল। কথা বলার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে গেছে। নিশান তখন হালকা গলায় বলে,

—"ঠিক আছে। আয়না দেখে মনে মনে একবার বল বলতো, নিশান ভাই আমার হবু বর। প্রাকটিস করতে করতে অভ্যেস হয়ে যাবে।"

শৈলী হা হয়ে তাকাল। তার প্রতিক্রিয়া কে এড়িয়ে নিশান এটা বলেই নিজের ঘরের দিকে যেতে থাকলে শৈলী এবার রীতিমতো চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো,

—" নিশান ভাই শুনুন!"

ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো নিশান। আবারো থমকে গেল শৈলী। ইশ! এভাবে কেও তাকায়! নিশানের চোখদুটো এতটাই তীব্র, এতটাই নেশালো যে শৈলীর মনে হলো কেউ যেন তাকে একটানে টেনে নিচ্ছে এক অজানা ঘূর্ণিপাকে। শৈলী ঢোক গিলে চোখ নামিয়ে ফেলল নিজের অজান্তেই। ভেতরে কোথাও যেন ঘড়ির কাঁটা গুলিয়ে গেল, শরীরটা ভারী হয়ে এল হঠাৎ। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,

—"এভাবে তাকাবেন না....এটা অন্যায়।"

আর তখনি নিশানের ঠোঁটের কোণে আবার সেই বিখ্যাত বাঁকা হাসি খেলে গেল। ও শুধু বলে উঠলো,

—"এইভাবে তাকানোটা সহ্য করার অভ্যাস করিস, বাকি জীবন তো এভাবেই তাকিয়ে থাকব তোর দিকে। কিছু করার নেই।"

শৈলী ভীষণ রকম লজ্জা পেলেও প্রকাশ করল না, চোখ সরিয়ে বলল,

—"আপনি আগে কেনো বলেননি?"

নিশান এবার মুচকি হেসে বলল,

—"কারণ আমি চেয়েছিলাম, একদিন তুই নিজেই চোখে চোখ রেখে বলবি, হ্যাঁ, আমিও আপনাকে ডট ডট ডট। যাক গে, তোর মত বলদ তো বলবে না! দরকারও নেই বলার। "

শৈলী এবার কিছু না বলে চুপ করে রইল। একটু পরে আস্তে করে বলল,

—"তা হলে ওই কথাটার আগে একটা ছোট্ট প্রশ্ন...!"

নিশান চোখ কুঁচকে বলল,

—" কি প্রশ্ন?"

শৈলী নিচু গলায় হেসে বলল,

—" গত রাতে, সোফায় শুয়ে শুয়ে... মানে শুধু, জেগেই ছিলেন? নাকি ঘুমিয়েছেনও?"

নিশান এবার চুপ। ঠোঁট চেপে হাসল ও। শৈলী যে শুধু নিশানের সাথে কথা এগোনোর অযুহাত খুঁজছে তা বুঝতে পেরে নিশান গম্ভীর গলায় বলল,

—" ঘুমোতে দিস নি তুই আমায়। তাই তাকিয়েই ছিলাম, কারণ ঘুমানোর সময় হারাম ছিল, ঘরজুড়ে তো একটা মায়া ছিল, সেটা জেগেই উপভোগ করছিলাম।"

শৈলী এবার নিজেও হাসি সামলাতে পারল না। আর তখনই পাশের ঘর থেকে মিমি চেঁচিয়ে বলল,

—"আবার রেডিও চালু হইছে নাকি? এইটা কি রোমান্টিক গান না নাটক চলতেছে? শৈলী! এই শৈলী? কার সাথে পিরিতের আলাপ করিস হ্যাঁ? নিশান ভাই কে খবরটা দেব নাকি?"

নিশান বিরক্তিতে শ্বাস ফেলে চেঁচিয়ে উঠলো,

—" ঘরে ঢুকলে দুটোরই পিঠের ছালচামড়া তুলে নেব কিন্তু। বেয়াদব কোথাকার! পেকে গেছিস খুব? বিয়ের ব্যবস্থা করব তোদের?"

রিমি আর মিমি এবার একসাথে ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,

—" সরি নিশান ভাই! পিলিজ ইউ ক্যারি অন! "

শৈলী অদৃশ্য হাতে কপাল চাপড়াল, তবে নিশানের কথা শুনে চোখ গোল করে তাকাল তার দিকে, গাল লাল হয়ে গেল লজ্জায়। নিশান আবারো সেই হালকা স্মিত হেসে পিছিয়ে গেল নিজের ঘরের দিকে। যাওয়ার আগে থেমে বলল,

—"আর হ্যাঁ, পরশু দিনের মাঝে তিনবার তোকে দেখতে আসব। একটু বউয়ের মত সুন্দর হয়ে থাকিস। না হলে...আমি কিন্তু বউ বদলাবো না, সাজগোজ বদলাবো!"

শৈলী এবার আস্তে করে দরজা ঠেলে ঢুকে গেল ঘরে। কপালে হাত দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—"আল্লাহ! এই সময়টা শেষ না হোক! কিছুতেই যেন শেষ না হয়!"

দরজা বন্ধ করতেই শৈলী হুশ ফিরে পেল নিজের অস্তিত্বে। বুকের ভিতরে ধুকপুক ধুকপুক চলছে, যেন একটানা বাজছে কোনো উৎসবের ঢোল, অথচ মুখের ভিতরে একদম শুকনো ঝড়। একমুঠো শ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকালো সে। আয়নায় দেখা গেল তার ক্লান্ত, লাজে রাঙা মুখ, কাঁপা কাঁপা ঠোঁট, আর চোখে একধরনের হিমশীতল ভয় আর উত্তাপ একসাথে। সে ধীরে ধীরে আয়নার সামনে এগিয়ে গেল। তারপর নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—"নিশান ভাই... আমার হবু বর।"

এক সেকেন্ড, দুসেকেন্ড, তারপর নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরে চোখ বড় বড় করে শৈলী বলল,

—"না না! এভাবে বলা যায়? আবার বলি..!"

আরেকটু দাঁত চেপে দৃঢ় হয়ে বলল,

—" নিশান ভাই আমার হবু বর।"

এবার একটু রাগ মিশে গেলো গলায়,

—"হবু বর, হবু বর! আহ! কেউ কি এমন চোখে তাকায়! উফ! মাথা কাজ করছে না।"

তবে আয়নার দিকে তাকিয়ে শৈলী একটু থেমে আবার বলল,

—"তবুও, ভালোই তো লাগে শুনতে। নিশান ভাই... আমার হবু বর।"

একটু পর হেসে ফেলল শৈলী। আয়নায় নিজের মুখ দেখে বলে উঠল,

—"তোর হাসি থামা উচিত রে শৈলী। কাল আবার বলবি, সবই স্বপ্ন ছিল!"

এই বলে সে আবার ঠোঁট কামড়ে মুখ নিচু করল। কিন্তু আয়নার কাচে তখনও দেখা যাচ্ছে ওর মুখে লুকানো এক চিলতে স্বপ্নের হাসি, নিশান নামক অধ্যায়ের সূচনার হাসি।

°°°°°°°°°°°°

নিশান নিজের ঘরে ঢুকেই দরজাটা হালকা ঠেলে বন্ধ করে দিলো। এক নিঃশ্বাসে যেন বুকের জমে থাকা কতকালের ভার নামিয়ে রাখল সে। ঘরের আলোটা মৃদু, জানালার পর্দা নড়ে উঠছে হালকা বাতাসে। এ ঘরটা যেন তার একমাত্র আশ্রয়, আর আজ, এই ঘরেই এসে সে নিজেকে একবার নিঃস্ব ও পূর্ণ দুটোই মনে করল। ধীরে ধীরে জুতা খুলে, শার্টের বোতাম খুলে, নিশান বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর একরাশ প্রশান্তি নিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিলো বিছানায়। বালিশে মাথা রাখতেই চোখ বন্ধ করল। ঠোঁটে একটা অদ্ভুত হাসি।

দুই বছর। দুটো বছর সে নীরবে ভালোবেসেছে। কতবার চিৎকার করে বলতে চেয়েছে, শৈলী, তোকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসি! কিন্তু পারেনি। ভেবেছে, যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়! যদি সেই চোখের নির্ভরতা হারিয়ে যায়, আজ সে বলেছে। নরম করে, ধীরে, যেন একটা দীর্ঘ সময়ের অচেনা কণ্ঠস্বর তার হৃদয়ের ফিসফাস হয়ে বেরিয়ে এসেছে। চোখ বন্ধ করেও যেন মনে পড়ে যাচ্ছে, শৈলীর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মুখ, তার ভিজে চোখ, তার ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে রাখা নির্ভার ভঙ্গিমা। এসব কিছুই নিশানকে ভিতর থেকে নরম করে দিচ্ছে। সে এক হাত চোখের উপর রাখে, অন্য হাত ছড়িয়ে দেয় পাশে, একটুকরো ফাঁকা জায়গা, যার জায়গা এখন ভরে যাবে। মনেই হয়, যেন নিঃশব্দে বলে উঠল,

— " শৈলী, আমার হিমরূপা, আজ আমি একটুও একা নই।"

আরেকটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস। নিশান ঘুমিয়ে পড়েনি, কিন্তু চোখ বন্ধ করে এভাবেই পড়ে রইল। নিজের অনুভবের গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে নিয়েছে সে। আজ তার দুবছরের না বলা কথা, অমোঘ প্রেম, শৈলীর চোখে প্রতিফলিত হয়েছে। আজ তার ভালোবাসার দিন।

ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হুট করে বেজে উঠলো ফোনের রিংটোন। নিশান চোখ বন্ধ করেই সামান্য ভ্রু কুঁচকে ফেলল। বিরক্তির একটা ভাঁজ গড়িয়ে উঠল কপালে। তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে ফোনটা তুলে চোখের সামনে আনল। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো, — "Dui number Bolod Akash " calling

.....

নিশান চোখ ছোট করে তাকাল স্ক্রিনে। আসলে তার জীবনের এক নাম্বার বলদ হলো শৈলী, আর দুই নাম্বার হলো স্বয়ং আকাশ। এইজন্যই নিকনেম টা এভাবে সেভ করে রাখা। নিশান সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,

—"এই ব্যাটা কি কোনোদিন শান্তিতে থাকতে দেবে না আমাকে!"

তবু ফোনটা রিসিভ করল। ঘুম জড়ানো, শান্ত গলায় বলল,

—" বল আকাশ!"

ওপাশ থেকে চিৎকার করে হেসে উঠল আকাশ,

—" এই হারামি, গিরগিটির নানা, শালা তোর জীবনে ভালো হবেনা। তোর নাকি বিয়ে! তুই নাকি তোর বাপকে কইছিস শিলপাটারে বিয়া করবি! তিনদিন পর বিয়ে!"

নিশান ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান হয়ে বলল,

—" হুম...!"

আকাশ আরো ক্ষেপে গেল,

—" হুম মানেহ? এ ব্যাটা হু মানে কি হ্যাঁ? শালা বেইমান! তুই আমারে আগে খবরটা দিলিনা কেন হ্যাঁ? এত বড় একটা খবর দিলি না আমাকে। অথচ এইসবে কি আমি তোকে হেল্প করিনি! হায় কপাল, এই দিন দেখার জন্য বেঁচে ছিলাম আমি? শালা, তোরে অভিশাপ দিলাম, ডজনখানেক বাচ্চার তলায় পিষে চ্যাপ্টা হবি তুই!"

নিশান চোখ ঘুরিয়ে, এক হাত কপালে রেখে ক্লান্ত গলায় বলল,

—"আকাশ, সত্যি বলছি, এই মুহূর্তে ফোন না করলেই তুই অনেকদিন বাঁচতি। ট্রাস্ট মি, ফোনের মধ্যে ঢুকে তোকে রাম"কে"লানি দিতে মন চাচ্ছে!"

আকাশ আরো কিছু বলার আগেই নিশান এবার গুরুতর কন্ঠে বলে উঠলো,

—" তুই আগে আমাকে এটা বল, এত আপডেট খবরটা তোকে কে দিল? আমি তো তোকে বলিনি। তোর সাথে তো এ বাড়ির কারো যোগাযোগ নেই। তো তুই কীভাবে জানলি? শৈলীও তো একটু আগে আমার সামনেই ছিল। লেটেস্ট নিউজটা কোথ্থেকে পেলি সেটা আগে বল তো।"

এ পর্যায়ে বেলুনের মত চুপসে গেল আকাশ। শুকনো গলায় ঢোক গিলে মেকি হাসলো। ফোনের দিকে ঠোঁট উল্টিয়ে তাকিয়ে নিজেকেই হাজারটা গালি দিল সে। আকাশ এখন কীভাবে বলবে যে সে তার গার্লফ্রেন্ড, মানে নিশানের বোন রিমির কাছ থেকে খবর পেয়েছে। এসব কি বলা যায়? তাদের সম্পর্কের কথা তো কাকপক্ষীও জানেনা! খুবই সতর্ক হয়ে তারা নিজেদের প্রেম চালিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি নিশান জানতে পেরে যায় তাহলে যে কী অবস্থা হবে তা ভেবেই কপালে ঘাম জমলো আকাশের।

নিশান আবারো জিজ্ঞেস করলে আকাশ নিজেকে বাঁচাতে এবার শুকনো গলায় একটু কেশে নিয়ে মেকি হেসে বলল,

—"আরে ভাই, তুই কি ভাবিস আমি শুধু তোর বন্ধুই? আমি তো তোর লাইভ রাডার! চারদিকে আমার ইনফরমার ছড়ানো আছে। আমি চোখ বন্ধ করেও জানি কখন তুই ডান দিকে ঘাড় ঘুরাস!"

নিশান ঠান্ডা গলায় বলল,

—"সোজা বল, কে বলেছে তোকে?"

আকাশ এবার গলা নামিয়ে বলল,

—"শুন না ভাই, আসলে তোকে না বলেই মনের দুঃখে কাকে যেন ফোন করেছিলাম। ওহ! মনে পড়ছে, মনে হয় ভুল নম্বরে কল চলে গেছিল... তারপর ঐ ভুল নাম্বারটাই আবার আমায় ইনফরমেশন দিয়ে দিল। কপাল! আমি কী করব বল?"

নিশান চোখ ছোট করে বলল,

—"আকাশ..."

আকাশ এবার গম্ভীর স্বরে বলল,

—"ভাই, বিশ্বাস কর, আমি আসলে ভবিষ্যৎ দেখতে পারি। এই খবরটা আমি স্বপ্নে দেখছিলাম অনেকদিন আগে থেকেই। শৈলীকে তো তুই কবে থেকে টাইপ করস, আমি জানি না নাকি?"

নিশান এবার রীতিমতো বিরক্ত হয়ে উঠে বসে বলল,

—"আকাশ, তুই না... না থাক, আজকে তোর ভাগ্য ভালো যে আমার মুডটা ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা কানে গেঁথে রাখ, আমার কোনো বোন বা শৈলীর কাছ থেকে যদি এক ফোঁটাও শুনে থাকিস, তাহলে তোকে আমি একটা ফ্রি হেলিকপ্টার রাইড দিব, তাও ছাদ থেকে নিচে।"

আকাশ এবার সত্যিই কেঁপে উঠল, কিন্তু ভেতরে হাসি চাপতে চাপতে বলল,

—"হেলিকপ্টার? ভাই, তুমি না আসলেই রোম্যান্টিক! এসব দুষ্টু কথা কেও কি বলে নাকি। হে হে। তবে একটা কথা বলি দোস্ত, বিয়ের কার্ডে যদি শৈলী তালুকদার ও নিশান তালুকদার এর নিচে ‘ভাই-বোন রিলেশনস’ হিসেবে আমার নাম না থাকে, তাহলে আমি কিন্তু প্রিন্টিং প্রেস পুড়িয়ে ফেলব!"

নিশান এবার হাসতে গিয়েও মুখ চেপে ফেলল। একটা রুদ্ধ হাসির দমক উঠল বুকের ভিতর, কিন্তু সে সংযত কণ্ঠে বলল,

—"কাল সকাল সাতটায় বাড়িতে হাজির হবি। আর হ্যাঁ, কোনো নাটক চলবে না। এসে ভদ্রের মত থাকবি। মেবি কাল শপিং শুরু হবে, পরশু হলুদ, তরশু বিয়ে আর...! "

নিশান কথা শেষ করার আগেই আকাশ দুষ্ট হেসে বলে উঠলো,

—" তারপরে হলো বাসর রাত....তাইনা বন্ধু। উহুম উহুম! তুমি যতই ভদ্র থাকার নাটক করো, আমি কিন্তু ঠিকই জানি তুমি কিসব দুষ্টু দুষ্টু প্লান করে রেখেছো!"

নিশান চোখ সরু করে বলল,

—" তাইই নাকি?"

আকাশ এবার ফোনের ওপাশ থেকে হেসে বলল,

—" অবশ্যই, আরে ভাই, তুই ভাবছিস আমি জানি না? বাসরঘরে ফুল শুধু ডেকোরেশনের জন্য ছিল নাকি? তুই তো মাথায় প্ল্যান করে বসে আছিস, শৈলী দরজায় ঢুকবে,তুই ঘাড় হেলিয়ে বসে থাকবি,তারপর হুট করে ওর চুলের মধ্যে গোলাপ গুঁজে দিয়ে বলবি, আজ তোমার সুন্দর চুলে ফুলটা একদমই বেমানান ! উফফ, কী রোমান্টিক! এইটা তোর পুরনো ট্রেডমার্ক রে!"

নিশান এবার দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—"তুই থামবি?"

আকাশ থামল না একটুও। বরং আরো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল,

—" না থামবো না। তারপর শোন, একটা হালকা বাতি জ্বালাবি, বিছানায় এক কোণে বসে বলবি, শৈলী, তোর চোখে কিছু পড়ে গেছে। শৈলী চোখ ঘষবে, আর তুই বলবি, আমার ভালোবাসা পড়েছে! কী ডায়লগ রে! আমার তো মনে হয়, তুই বাসরের আগেই সিনেমার স্ক্রিপ্ট বানায় ফেলছিস! পরে অবশ্য একটা গান বাজানো যেতে পারে লাইক, তুমি দিও না গো বাসর ঘরের বাতি নিভাইয়া!"

নিশান এবার কপাল চুলকে শান্তভাবে বলল,

—"আকাশ, বিশ্বাস কর, তোকে ট্রাকের নিচে পিষে মহাসমুদ্রে ডুবায় দিয়ে আসব! তারপর তোর ভবিষ্যতের বাতি নিভে যাবে!"

আকাশ হেসে হেসে থামছেই না।

—" অ"শ্লী"লতা করে এটাসেটা নেভানোর কথা বলোনা তো বন্ধু। আই হ্যাভ কিউট মাইন্ড! আগে শোন, আরেকটা প্ল্যান না বললেই নয়, বাসরে ঢুকে প্রথমেই তুই বলবি, আজকে তোর চোখে চোখ রেখে ভালোবাসব। আর ঠিক তখনই হঠাৎ কারেন্ট যাবে, আর তুই হঠাৎ কণ্ঠ বদলে বলবি,এই সুযোগ, এই সময়! ব্যস! ব্যান্ডেজে মোড়ানো ভালোবাসার ফুল ফোটাবি তুই!"

একটু থেমে আকাশ আবারো বলল,

—"দোস্ত, বল তো, ঘরের রং কি হবে? গোলাপি নাকি সাদা? আর বিছানায় কী শুধু ফুল থাকবে, না কি ব্যান্ডেজও থাকবে অপশন হিসেবে? ড্রাম রোল... আর ঢাকঢোলের মাঝে নিশান ভাইয়ের লাফ দিয়ে বাসরে ঢোকা, সেই হবেনা?"

নিশান এবার চোখ বন্ধ করে কপাল চাপড়াল।

—"আকাশ... তুই একটা চলন্ত বিপদ। মানুষ তো বন্ধু পায় সাহায্যের জন্য, আর আমি তোকে পেয়েছি আমার বাসরের বর্ণনা লেখার জন্য!"

আকাশ থেমে না থেকে বলেই যাচ্ছে,

—"তা তো বটেই। দোস্ত, আমি ঠিক করছি বাসরের সময় নিচে বসে জারুল গাছে ল্যাপটপ নিয়ে একটাই গান চালাবো, জন্ম জন্ম যুঁথি বাসর রাইত! সঙ্গে হবে স্লাইডশো তোর মাথায় ফুলের টোকা, আর শৈলীর চোখে জল নয়, ঘুম! কী রোমান্টিক না দোস্ত?"

নিশান এবার মুচকি হেসে বলে উঠল,

—"তুই তো শুধু বাসরের হাইলাইটস জানিস, কিন্তু গত বাসরে আমি কীভাবে ভিজে চোখ মুছে, ব্যান্ডেজ বেঁধে, কোলবালিশ সাজিয়ে ঘুমিয়েছিলাম,এই ট্র্যাজেডি জানলে তো তোর পেট ব্যথা করে হাসতে হাসতে!"

আকাশ হেসে বলল,

—"ওইটাই তো! সেই মুভির সিকুয়েল হইতেছে এবার! বাসর ২.০, ফুলের মাঝেই ব্যান্ডেজ! আমি তো ভাবছি, সাউন্ড সিস্টেম, ক্যান্ডেল, আর একটা স্লো মোশন এন্ট্রি, এই নিয়ে তোর জন্য প্রপার ইনট্রো বানাব!"

নিশান এবার চোখ ঘুরিয়ে বিছানার বালিশে মুখ গুঁজে গম্ভীর গলায় বলল,

—"আকাশ, কাল সকালে যদি তোকে এই বাসরের বিছানায় ঝুলতে দেখি, তখন বলবি ভাইরে, আমি বুঝিনি যে বন্ধুত্বেরও সীমানা থাকে! বুঝতে পারলি তো কী বলতে চাচ্ছি!"

মারাত্মক হুমকি খেয়ে আকাশ হেসে হেসে গড়াগড়ি খেয়ে বলল,

—"ঠিক আছে দোস্ত, থেমে গেলাম। কিন্তু একটা কথা বলি, বাসরে ঢোকার সময় ক্যামেরায় হাসিমুখে ঢুকিস,শুধু আমার জন্য। কারণ আমি চাই, তোর জীবনের এই অধ্যায় শুরু হোক ফুল, ফান আর ফ্রেন্ডশিপ দিয়ে। আর,দোস্ত, সত্যি বলছি,শৈলী তোর জন্য পারফেক্ট।"

নিশান এবার চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর নিচু গলায় বলল,

—"আমি জানি। শৈলী আমার জীবনকে শুধু সুন্দর করেনি, ও আমার ভিতরের মানুষটাকেও ঠিক করে দিয়েছে।"

আকাশ এবার প্রথমবারের মতো সিরিয়াস গলায় বলল,

—"তাহলে এই নাটক থেমে গেছে। এবার পর্দা উঠুক সত্যিকারের ভালোবাসার।"

নিশান এবার মৃদু হাসল ঠিকই, কিন্তু গলায় একটা দৃঢ়তা এনে বলল,

—"শোন আকাশ, আমি হয়তো তোর মতো মুখফুটে বলি না, কিন্তু তুই যদি জানতি, আমি কেমন করে ওই মেয়েটাকে........ তাহলে এতক্ষনে তুই থেমে যেতিস।"

এই কথায় আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেল আকাশ। কয়েক সেকেন্ড পর ওর গলায় একদম আলগা সুর,

—"ভাই, সত্যি বলি...তুই যখন সিরিয়াস হোস, তখন আমার গলায় কেমন একটা দলা পাকায়।"

নিশান এবার শান্ত গলায় বলল,

—"কারণ তুই জানিস, আমি নাটক করলেও, আমার অনুভূতি কখনো স্ক্রিপ্টেড হয় না।"

আকাশ এবার গভীরভাবে বলল,

—"শুভকামনা বন্ধু। ভালোবাসার গল্পটা এবার যেন শুধু শুরু না হয়, শেষটাও একসাথেই হয়!"

নিশান ফিসফিস করে হাসল।

—"এইবার ফোন রাখ, আর যার কাছ থেকে আমার বিয়ের খবর নিছিস, তার সাথে বেশি কথা বলবি না, সামনে পরীক্ষা তার।"

আকাশ এক মুহূর্তের জন্য থ হয়ে গেল। নিশান ফোন কেটে দেবার পর ফোনের স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল সে। ঠোঁট কাঁপছে, গলায় শুকনো ঢোক গিলছে, চোখে ঝিলিক দেওয়া ভয় আর অবাক মিশ্র অনুভব। তারপর হঠাৎ গলার স্বর একটু কেঁপে উঠে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠল,

—"এইটা কেমন কথা হইলো রে ভাই? নিশান এই কথাটা বলল কেনো? কিসের ইঙ্গিত দিল ও। আমি তো কিছুই বলিনি। রিমিও তো বলে নাই, না, ও বলতে পারে না। তাহলে? তাহলে কি ও সব বুঝে ফেলেছে?"

একটা শ্বাস টেনে, মাথার চুলে হাত বুলিয়ে আকাশ ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়ল।

—"আমি তো সবকিছু গোপনে করছিলাম। বোনের ভাই! যদি জানে রাগে ছাই করে দিবে আমাকে, ওরে বাবা! এ আমি কি করলাম! রিমি রে, আজ তোর ভাই আমারে গলায় দড়ি দেওয়ার দিকে ঠেলে দিলো রে। আমি আর বাঁচব না মনে হয়।"

এদিকে নিশান এবার ফোন কেটে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। চোখ বন্ধ করতেই ঠোঁটের কোণে একটুকরো শান্তির হাসি খেলে গেল। অবশেষে! অবশেষে সে নিজের হিমরূপা কে পাবে! হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া শুধু একান্তই তার হবে!

চলবে...............

✨ নোট—বিয়ের দাওয়াত রইলো। 😞🫶 মানে, নিশান ভাই আর শৈলীর বিয়ের দাওয়াত!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন