#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া
#পর্ব_৬
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
এ বাড়িতে সামনে পরীক্ষা নিয়ে বসে থাকা শুধু দুটো মানুষই আছে— রিমি আর মিমি। যাদের সামনে খুব তাড়াতাড়ি পরীক্ষা। আর এটাই হলো আকাশের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ! নিশান তখন কল কেটে দেয়ার আগে বলেছে, যে তোকে খবর দিয়েছে তার সাথে অত কথা বলিস না, সামনে তার পরীক্ষা। তার মানে এতে তো স্পষ্ট বোঝা যায় নিশান মিমি বা রিমির কথাই বলছে। আর নিশান ভাই যে এমন কথা বলেছে, সেই কথাটা শুনেই বেচারি রিমি পড়েছে বড্ড বড় ঝামেলায়। চিন্তাতে মাথা কাজ করছে না তার। বাকিদের থেকে রিমি একটু বেশি বুঝদার হওয়ায় নিশান যে তার আকাশের রিলেশন সম্পর্কে অবগত, এটাও কথার ধরন বুঝে আকাশ না বুঝলেও রিমি এক পলকে বুঝে গেছে। আর বোঝার পর থেকেই অনবরত কেঁদে যাচ্ছে সে।
প্রিয়তমা রিমির কান্নার দমকে আকাশের ইচ্ছা করল বঙ্গোপসাগরে আল্লাহর নামে ডুব দিতে। কিন্তু সে ডুবে পটল তুললে, তার রিমিকে কে দেখবে! এই ভেবে বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার পরিকল্পনা ক্যানসেল করে আকাশ চুপ থাকার এক মহাসিদ্ধান্ত নিল৷ সে কিছুই জানেনা, কাওকে কিছু বলবেও না! আর ওর এমন ভাব দেখে রিমিও বুঝে গেল যা করার তাকেই করতে হবে। তাই খুব বড় আলোচনায় বসল রিমি আর আকাশ। ওরা এখন অনেক ভিতরের দিকে একটা ছোটখাটো রেস্টুরেন্টে বসে আছে। আকাশ আসার পরপরই এসব শুনিয়েছে রিমিকে। আর রিমি তখন থেকেই থ মেরে আছে।
রিমি এবার ঠোঁট ভিজিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল,
—" এবার কী হবে আকাশ? নিশান ভাই নিশ্চিত সব জানতে পেরে গেছে! উনি সবই জানেন, আই থিংক!"
আকাশ নিজেও ভয়ে আছে, তবুও রিমিকে স্বান্তনা দিতে ও মেকি হেসে মিথ্যে সাহস নিয়ে বলল,
—" আরে ধুর, চিন্তা করো না তো। ওই বেডা তো নিজেই নিজের অনুভূতিই বুঝতে পারেনা! শালা আমাদের লুকানো সম্পর্ক ধরবে কেমনে? মেবি ওই সময় অন্ধকারে ঢিল মেরে আমায় কথাটা বলেছে!"
রিমি রাগে ফুঁসতে থাকে। ভ্রু কুঁচকে গেছে ওর, ঠোঁট ফুলে উঠেছে। দুই কানে দুল দুলছে রাগে। পেছনের ওয়েটার বিস্কুট দিয়ে গরম দুধ দিচ্ছিল, রিমির এমন চেহারা দেখে একবার ঢোক গিলে আবার পিছিয়ে গেল। রিমি এবার চেয়ারে বসেই ঠোঁট কামড়ে বলল,
—" আকাশের বাচ্চা পাতাল একটা, তুমি বুঝতে পারছো না! নিশান ভাই মুখে কিছু না বললেও, ওনার চোখ, ওই চোখে সব লেখা থাকে! আর আজকে উনি যা বলেছে, তাতে আমি নিশ্চিত, উনি সবই জানেন। শুধু চুপচাপ দেখছেন কখন ধরা খাবো! জানো, আমি এখনই যদি বাসায় যাই, হয়তো বড়মার হাত দিয়ে এক গ্লাস পানি খাওয়ার আগেই নিশান ভাই আমার সামনে চেয়ারে বসে বলবে, তোর বয়ফ্রেন্ডের নামটা কী? বা জিজ্ঞেস করবে আকাশের সাথে কতদিন ধরে এসব চলছে?"
আকাশ এবার ভ্রু তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—"হায় খোদা! এই প্রেম এতদিন লুকিয়ে রাখলাম, আর একটাই ঠান্ডা কলেই গপ্পো ফাঁস হয়ে গেলো? আমি তো ভাবছিলাম, আমি জামাই হওয়ার আগে কমসে কম একটা থ্রিলার সিন থাকবে! কিন্তু এখানে তো এক কলেই গল্প শেষ!"
রিমি এবার প্রায় চোখের পানি চেপে ধরে বলল,
—"তুমি সিরিয়াসলি কিছু বুঝতে পারছো না আকাশ! আমরা যদি এখনই প্ল্যান না করি, উনি কিছু না বলে আমাদের রিলেশনশিপ ফাঁস করে দিবেন। তখন সব শেষ! আমি তো তোমার কথা ভেবে চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছি!"
আকাশ এবার দম ধরে হাসি আটকে রিমির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
—"একটা কথা বলি শোনো, রিমি, এমনটা যদি হয়েই থাকে, তাহলে তোমার ভাইয়ের সামনে দাঁড়ায়া আমি বিয়ের প্রস্তাব দিবো। হ্যাঁ, দিবো! ওই ব্যাটারে বলবো, হ্যাঁ ভাই, শোন, আমি তোর বোনকে ভালোবাসি, আর ওর বিয়ে হলে আমি ছাড়া আর কেউ করবে না! এরপর ও যদি আমাকে জুতা ছুঁড়ে মারে, তখন আমি কান্না করে বলবো, এই জুতার নিচেই কি তোর আর আমার ভালোবাসা ছিল ভাই! এই তোর বন্ধুত্ব! কি এমন চেয়েছি তোর কাছে, শুধু তোর সুন্দরী বোনটাকেই তো চাইলাম!"
রিমি এবার চোখে পানি নিয়েই ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে বলল,
—"তুমি সবসময় ফালতু সিরিয়াস কথাও নাটক বানিয়ে বলো জানো।"
আকাশ ভ্রু নাচিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—"আরে বেবি, তুমি তো জানোই, আমার হাই প্রেসারেও কমেডি চলে। কিন্তু তোমার চোখে কান্না মানায় না, প্লিজ আর কেঁদো না। বিশ্বাস রাখো, সব ঠিক হবে। তোমার ভাই যদি কিছু বুঝে থাকে, আমি ওর সামনে গিয়ে সব স্বীকার করব। আর যদি না বুঝে থাকে, তাহলে এই কথাটা ছিল আমার গড গিফটেড গাট্টা!"
রিমি এবার একটু শান্ত হয়। কিন্তু মুখে রাগ রেখে বলে,
—"তুমি যদি একবার সিরিয়াস হতে, তাহলে আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার নামের পাশে একটা মিঃ জুড়ে দিতাম। কিন্তু তুমি...!"
আকাশ এবার হেসে ঠোঁট চেপে বলল,
—"আচ্ছা শোনো, সিরিয়াস হচ্ছি... কিন্তু যদি নিশান এখনই আমাকে ধরে ফেলে, আমি চুপচাপ ওর পায়ের কাছে বসে বলবো, ভাইরে দয়া করে তুই আমারে মাফ কইরা তোর বোনটারে এই গরিবের হাতে তুলে দে!"
রিমি এবার হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হেসে ফেলল, আর আকাশ চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে,ভয়ের ভিতরে প্রেম, আর প্রেমের ভিতরে ভয়,এইটুকুই তো জীবনের আসল থ্রিল। যাই হোক, দেখাই যাক কি হয়! আসলেই কি নিশান সব জানে?
***************
শৈলী নিজের রুমে পায়চারি করছে। ঘরের দরজাটা ভেজানো। জানালার পর্দা কাঁপছে হালকা বাতাসে, কিন্তু ঘরের ভেতরে যেন এক অস্থির ঝড় বইছে,শুধু সেটা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। শৈলী হাঁটছে, জোরে জোরে অস্থির ভঙ্গিতে হাঁটছে। কাঁধে ঝুলে থাকা ওড়নার আলগা দোলাচলে ঘরের নীরবতা এক অদ্ভুত ছন্দে ভাঙছে। একবার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে নিজেকে দেখে, তারপর হঠাৎ ঘুরে যায়। আবার জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, তবু মন টেকে না, ফিরে আসে মাঝখানে, পায়চারি শুরু হয় আবার। চোখদুটো লালচে, কপালে চিন্তার ভাঁজ।
কিন্তু সবকিছুর মাঝেও, তার বাম হাতে সূর্যের আলোর ন্যায় চকচক করছে সেই একজোড়া চুড়ি, যা নিশান উপহার দিয়েছিলো। একটা ঝিলিক, একটা স্পর্শ, একটা অনুভূতি জমে আছে কাঁচের সেই বৃত্তে। শৈলী ওর চোখের দিকে তাকায় আয়নায়, তারপর আবার সেই হাতটা একটু উঁচু করে দেখে, চুড়ির গায়ে লেগে থাকা আলোটুকু।
শৈলী খুব যত্ন করে চুড়ি দুটো হাতে পড়েছে। কি যে সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার! এক মুহুর্তের জন্য শৈলী আবিষ্কার করল এই চুড়িজোড়াকে সে অসম্ভব যত্ন করছে। লজ্জায় নিজেই হেসে ফেলল শৈলী। কিন্তু সে এখন পড়েছে আরেক চিন্তায়। এইযে নিশান ভাইয়ের দেয়া চুড়িদুটো সে হাতে পড়ল। এখন যদি এই হাত নিশানকে একবার দেখানো না হয়, তাহলে কিই বা হলো?
নিশানের মুখ থেকে ছোট্ট প্রশংসা পাওয়ার লোভটা সাথে সাথে ঘিরে ধরল শৈলী। ওর খুব ইচ্ছে করছে এই মুহুর্তে দৌঁড়ে গিয়ে নিশানের চোখের সামনে বাম হাত টা এগিয়ে দিয়ে বলতে,
—" দেখুন নিশান ভাই, আপনার দেয়া চুড়িদুটো হাতে পড়েছি। আমাকে কি মানিয়েছে?"
কিন্তু এভাবে বলার মত এত সাহস শৈলীর আসলেই নেই। নিজের অপারগতা স্বীকার করে ভীষণ হতাশ হয়ে বিছানায় বসে পড়ল শৈলী।
কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে মেঝেতে তাকিয়ে থেকে নিজের সাথেই ফিসফিস করে সে বলে ওঠে,
—" এই হাতটাই যদি এখন... এখন যদি উনাকে দেখাতে পারতাম... তাহলে কি ভালো হতো না? না না না! উনি কী ভাববে! আমি কী ভাবছি? আমি কি একটুও শান্ত থাকতে পারি না! এমন বাচ্চাদের মত করলে কি হয় নাকি?"
কিন্তু তৎক্ষনাৎ আবারো শৈলীর মন বলে উঠলো একটাবার বাচ্চামো করলে কিছুই হবেনা। মাথা নেড়ে শৈলী একবার দরজার সামনে গিয়ে থামে। দাঁড়ায়, হাত বাড়ায়, মনে হলো খুলে বেরিয়ে যাবে নিশানের ঘরের দিকে। তৎক্ষণাৎ আবার নিজের চুড়ির দিকে তাকায়, মুখে তীব্র দ্বিধার ছাপ। চুড়ি গুলো একটু জোরে নড়ে উঠল তার অস্থির নড়াচড়ায়, টুং করে। শৈলী হঠাৎ নিজের কপালে হাত দিয়ে ধপাস করে খাটে বসে পড়ে।
—" ধুর, পারবনা আমি।"
চুড়ির আওয়াজ থেমে যায়, ঘরে কিছুক্ষণের নীরবতা নামে। শৈলী এবার চুড়ি পরা হাতটা বুকের কাছে এনে চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। লজ্জা, ভালোবাসা আর ভয় মিশে যে ককটেল তৈরি হয়, শৈলী এখন তারই তীব্র মাদকতায় আচ্ছন্ন।
শৈলী ধীরে ধীরে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে দাঁড়ায়। চোখে তখন তীব্র দ্বিধার ঝড়। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত কাঁপছে, হাত-পা কেমন শূন্য মনে হচ্ছে। একপলক নিজের চুড়িপরা হাতটার দিকে তাকায়, তারপর আরেক পলক নিশানের ঘরের দরজার দিকে।
—"এবার না গেলে হয়তো সারা জীবন আফসোস করব!"
মনে মনে নিজেকে সাহস দেয় শৈলী। তারপর হঠাৎ, যেন নিজেকেই অবাক করে দিয়ে, চুড়ির ঝুনঝুন শব্দ তুলে এক দৌঁড়ে দরজার সামনে গিয়ে ফট করে। দেখে মনে হলো উড়ন্ত গাড়ি হুট করেই ব্রেক করেছে। নিশানের ঘরের দরজাটা বন্ধ। হাত বাড়িয়ে নক করবে, নাকি মুখ দিয়ে ডেকেই ঘোষণা দিয়ে ফেলবে নিজের আসা, তা নিয়ে আবার দ্বিধা! মাথার ভেতর তখন ছুটছে হাজারটা ভাবনা।
—"উনি যদি বিরক্ত হন? যদি ধমক দেন? তাহলে কি ভীষণ অপমান হবে? কিন্তু না দেখালে তো উনি বুঝবেন না আমি কত্তটা... কত্তটা..."
ঠোঁট কামড়ে দৃষ্টি নামিয়ে নেয় শৈলী। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে চোখ রাখে চুড়িপরা হাতটায়। চুড়ির কাঁচে ল্যাম্পশেডের আলো পড়ে একরকম রঙিন ঝিলিক ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই বুকের ভেতর এক ঠুকঠুক শব্দ তোলে, সাহস! এবার আর পেছনে ফেরার উপায় নেই। সে ধীরে হাত তোলে দরজায় নক করার জন্য। দরজায় নক করার পরও ভেতরে নীরবতা। শৈলী ঢোক গিলে কান পেতে দাঁড়ায়।
তখন হঠাৎ ভেতর থেকে নিশানের গলা ভেসে আসে, একটু ঘুম জড়ানো, একটু ক্লান্ত, তবু স্পষ্ট,
—" কে?"
নিশানের কন্ঠ শুনে ঢোক গিলে শৈলী। আয়হায়! এ কি নেশালো কন্ঠ? লোকটা কি ঘুমোচ্ছিল নাকি? আচ্ছা, নিশান ভাই কি জানেন যে তার ঘুমন্ত অবস্থার কন্ঠ শুনতে কতটা মারাত্মক লাগে! বারবারই চমকে যায় শৈলী। মনে হয় যেন নেশায় জড়ানো কিছু একটা টানছে! তবে এই সময় কি নিশান ভাইয়ের কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দেয়া ঠিক হলো? শৈলী ভাবলো, চলে যাবে। দুপুরে একটু ঘুমোচ্ছে ঘুমোক! বিকালে না হয় দেখাবে।
এসব ভেবেই শৈলী প্রস্থান নিতে গেলে ভেতর থেকে নিশান আবারো ভাঙা স্বরে ডেকে উঠে,
—" শৈলী? "
আসলে নিশান নিশ্চিত হতেই এভাবে ডাকল। শৈলীর বুক ধপাস করে ওঠে। উনি তো জানতেন না যে সে এসেছে! তাহলে এই নাম ধরে ডাকলেন কেনো? তাহলে কি উনি আসলেই আমার উপস্থিতি বুঝতে পারেন? নাকি চুড়ির শব্দে ভেতরের মানুষটা বুঝে ফেলেছে কে এসেছে। এই চুড়িগুলো তো তারই বেছে দেয়া। শৈলী এবার নিঃশব্দে একটুখানি হাসে। মাথা নিচু, চোখে একটু ভয়, একটু আনন্দ, ঠোঁটে লজ্জার রেখা। সে ধীরে বলে,
—" নিশান ভাই, আমি পরে আসব। আপনি ঘুমিয়ে নিন। তেমন কোনো জরুরি কথা নেই আসলে..
শৈলীর কথা শেষ করার আগেই নিশান ভেতর থেকে আদেশ ছুঁড়ে দিল,
—" দরজা খোলা, ভেতরে আয়!"
************
আকাশ পড়েছে অনেক বড় বিপদে। তার একমাত্র ছন্টুমন্টু গার্লফ্রেন্ড রাগ করে তাকে ব্লক করে দিয়েছে। এসব কি মানা যায় নাকি? এক এক করে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, নাম্বার, সব জায়গা থেকে রিমি ব্লক করেছে বেচারা আকাশ খানকে। এসব আসলেই নি"র্ম"ম অত্যাচার ঠেকছে তার কাছে। সে এখন কল করবে কি করে! যোগাযোগ করবেই বা কি করে! অনেক চিন্তা ভাবনা করার পর আকাশ নিজের ছোট ভাই আবিদের ফোন টাই বেছে নিল তার অস্ত্র হিসেবে। এরপর আবিদের নাম্বার থেকেই কল করল রিমিকে৷ স্বভাবসুলভ রিমি অচেনা নম্বর ধরল না। কিন্তু আকাশ বেচারা হাল ছাড়লোই না। রিমি বিরক্ত মুখে আবার ফোনটা বাজতে দেখে, মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল ওর। তারপর মিমি বলে উঠলো,
—" ধর তো, হয়তো জরুরি কিছু!"
রিমি এবার ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে চেনা সেই স্বর ভেসে এলো,
—" রিমি, আমার রিমি, সোনা, রূপা, জান, ময়না, পাখি, তুমি আমারে ব্লক মা"র"ছো কেন প্রিয়তমা? রাগ করছো? এই অধম রে ব্লক মেরে তুমি এ কি শাস্তি দিচ্ছো রিমিরাণী?"
আকাশের গলা শুনে রিমি চোখ বড় করে তাকালো ফোনের স্ক্রিনে। তারপর কৌশলে মিমিকে ঘরে রেখে বারান্দায় চলে এলো। বারান্দার দরজা ঠিকঠাক চাপিয়ে দিয়ে ধমকের দিয়ে গলা নামিয়ে বলল,
—" এই, তোমার সাহস হয় কি করে এভাবে কল করার? বলেছিনা, তোমার সাথে কথা নেই। নিশান ভাইয়ের ভয়ে এদিকে মরে যাচ্ছি আমি। আর তুমি রঙ্গের আলাপ করতে আসছো? ফোন রাখো! যেদিন নিশান ভাইয়ের কাছে আমার জন্য প্রস্তাব দিতে পারবা, সেদিন কল দিবা হাদারাম! "
আকাশ ওপাশ থেকে চুপ মেরে গেল। ফোনের ওপারে একমুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর গলা নামিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল,
—"রিমি, ট্রাস্ট মি পাখি, আমি তোমার ওই বড়ভাইরে ভয় পাই ঠিকই, কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয়টা আরও বড়। নিশান যদি রেসলিংয়ের চ্যাম্পিয়ন হয়, তবুও আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো, তোমার হাতটা চাইবো। শুধু একটুখানি সময় দে রে জান আমার, আমি সত্যিই প্রস্তুত হচ্ছি।"
রিমি এবার আর কিছু বলল না। ফোনটা বুকের কাছ থেকে নামিয়ে একবার দেখল স্ক্রিনে থাকা নাম্বারটা, অনুমান করল আবিদেরই নাম্বার এটা। এক মুহূর্ত দম আটকে থাকল তার। তারপর ধীরে গলা মিহি করে বলল,
—"তুমি যদি সত্যিই প্রস্তুত হও, তবে আর পালানোর রাস্তা নেই আকাশ। আমি তো তোমারই। কিন্তু,যদি খেলাচ্ছলে কিছু বলো, আমি কিন্তু এবার সত্যিই সব বন্ধ করে দিবো। নিশান ভাইকে যত দ্রুত সম্ভব জানাও সবকিছু! "
আকাশ এবার ঠোঁট চেপে গম্ভীর গলায় বলল,
—"রিমি, মোনা আমার, শোনো, আমি খেলাচ্ছলে শুধু পাবজি আর ফ্রি ফায়ার খেলি মাঝে মাঝে। ভালোবাসা নিয়ে না। প্রমিস।"
রিমির ঠোঁট কাঁপে, তবু সে শক্ত করে বলল,
—"একটা কথা বলি? যদি নিশান ভাইকে একদিন সত্যি প্রস্তাব দিতে পারো, আমি ওইদিনই এই আকাশ নামে তোমার হাওয়া হয়ে যাওয়া শরীরটা জড়িয়ে ধরবো, জানিয়ে দিলাম। সো, যা করার দ্রুত করো!"
আকাশ চোখ বন্ধ করে গভীর একটা নিশ্বাস ফেলল
—"তোমার এই কথাটাই এখন থেকে আমার প্রতিজ্ঞা হয়ে গেল জান। এবার তোমাকে বউ না করে ছাড়ব না।"
রিমি আর কিছু বলল না। কেবল ফোনটা কেটে দেয়ার আগ মুহূর্তে ধীরে বলল,
—"ভুলে যেও না, আমার ভাই কিন্তু নিশান তালুকদার। তার থেকে তোমাকে জিতে আসতে হবে, আকাশ খান।"
ফোন কেটে গেল। আর আকাশ সেই নিঃশব্দ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তখনো ফোনটা ধরে বসে আছে, যেন রিমির কণ্ঠ এখনো ভেসে আসবে। একটুও নড়ছে না সে। চোখে গাঢ় একটা স্থিরতা। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটুকরো দুষ্টু হাসি চেপে উঠল।
সে মুখে ফোনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—"রিমিরাণী, তুমি যে বললে নিশান তালুকদারের থেকে জিতে আসতে হবে...ওই শালা তো নিজের প্রেমেই ব্যাকআপ রেখে চলে! জীবনে ভালোবাসি কথাটা উচ্চারণ করতে পারছে নাকি? শালা ভীতু! শৈলীর চোখের পানি মুছিয়ে ব্যান্ডেজ লাগায়, আবার বাসরে গিয়ে সোফায় ঘুমায়! এই মানুষরে ভয় পাইলে প্রেম করা যায়? ওয় তো নিজেই মদনটাক!"
আকাশ এবার নিজের ফোনটা কানে ঘষে ঘষে হাসতে হাসতে বলে,
—"আল্লাহ্, ওই যে আমার বেস্টফ্রেন্ড, নিশান তালুকদার, নিজের প্রেমিকার সামনে দাঁড়ায়ে তুই তো পেতনির মতো জায়গা দখল করে ঘুমাস বলে, আর আমি... আমি যদি একবার রিমিকে বিয়ে করার প্রস্তাব টা দিতে পারি, তাহলে ওর আগে বাসর ঘরে ঢুকবো আমি। আমি নিশানরে কালকেই বলে দিব, ভাই, এখন থেকে তুই আমার শালা! তোর আগে বাপ হয়ে যাব আমি দেখিস!"
একটু চুপ করে থাকল আকাশ। তারপর চোখ বন্ধ করে আস্তে বলল,
—"তবে ওই হারামিটাও কম না, যেভাবে শৈলীর চোখের পানি দেখেছে, বুঝেছে, আর নিঃশব্দে ভালোবেসে গেছে। এই কথাটা স্বীকার করি, ওর মত প্রেম কেউ করতে পারে না। আমি হয়ত মুখে ফালতু বকবক করি, কিন্তু ওর ভালোবাসাটা নিঃশব্দে চলা এক মহাযুদ্ধের মতো। তবে প্রেম তো প্রেমই, আমি তো আর হেরে যাবো না! নিশানের সামনে দাঁড়াতে এখন থেকে শার্ট ইন করে হাঁটবো। "
বলেই সে ফোনটা বুক পকেটে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল আকাশ, গম্ভীর হয়ে বলল,
—" তার আগে নিশানের বিয়েটা খেয়ে আসি। এমনিতেও ওর যে অবস্থা, আমার মনে হয়না বিয়ের দু তিন মাসেও বাসর-টাসর হবে। এর মধ্যেই রিমিকে বিয়া কইরা ফেলমু৷ তারপর বাপও হইয়া যামু। হা হা হা!"
***********
শৈলী চুড়ি পড়া বাম হাতটা পেছনে লুকিয়ে নিশানের বিছানায় বসে আছে। নিশান তাকে বসিয়ে রেখে বাথরুমে ফ্রেশ হতে গেছে। তাই শৈলী এখন অপেক্ষা করছে নিশানের বের হওয়ার। বিছানার এক কোণে বালিশে হালকা হেলান দিয়ে বসে পড়ল সে। লাল টুকটুকে মুখটা যেন মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো হলো, চোখ দুটো ঘনভাবে পড়েছে চুড়ি পরা বাম হাতে। ঠিক যেন শৈলী চুড়ি দুটোকে লুকাতে গিয়ে আরও বেশি করে জড়িয়ে ধরেছে। পেছনে লুকোনো হাতটায় যেন লুকিয়ে আছে তার সমস্ত উল্টোপাল্টা অনুভূতি, লজ্জা, কৌতূহল, আকাঙ্ক্ষা আর অনুচ্চারিত ভালোবাসা।
বাথরুম থেকে মাঝে মাঝে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। শৈলী বুঝলো নিশান গোসল করছে, মানুষটা এই বিকেলের দিকে কেনো গোসল করছে বুঝলোনা সে। ঘরের ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও এখন শৈলীর কানে বিষম সুরের মতো বাজছে। সে ফিসফিস করে নিজের সাথেই বলে উঠল,
—" উনি বের হতেই তো আর আমি হাত বাড়িয়ে বলব না, দেখেন তো আমাকে মানিয়েছে কিনা... না না! উনি যদি কিছুই না বলেন? তাহলে মাথা নিচু করে ঘর থেকে দৌঁড়ে বের হয়ে যাব।"
তারপর হঠাৎ দাঁত কামড়ে ঠোঁট চেপে ধরে শৈলী। আবার চোখ মেলে তাকায় ঘরের দেয়ালের দিকে, তারপর বাথরুমের দরজার দিকে।
—" কিন্তু যদি বলেন, তোকে তোকে খুব মানিয়েছে, তাহলে?"
শৈলী হঠাৎ আবার নিজের বুকের কাছে হাতটা টেনে নেয়। চুড়ির টুংটাং শব্দে নিজেই চমকে উঠে বিড়বিড় করে বলে,
—"ধুর, এই শব্দটাও আজ এমন লাগে কেন?"
ঠিক তখনই বাথরুমের দরজার হাতল ঘোরার শব্দ হয়। শৈলীর চোখ ভয়ে আর লজ্জায় গোল হয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, গাল দুটো যেন লাল হয়ে আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে। চুড়ি পড়া হাতটা এখনো পেছনেই বন্দি। শুধু হৃদস্পন্দনটাই যেন এখন সবচেয়ে জোরে বেজে চলেছে।
শৈলী যতটাই লজ্জায় ছিল, তা না হয় সহ্য করার মতো, কিন্তু নিশানকে খালি গায়ে শুধু তোয়ালে পড়ে বের হতে দেখে রীতিমতো বিষম খেলো বেচারি মেয়েটা। এ কি ভয়নাক দৃশ্য! নিশান ভাই গায়ে কিছু পড়েননি কেনো? শুধু একটা তোয়ালে! হায়হায়! এ কি সর্বনাশের ব্যাপার! সাথে সাথে নিশানের চওড়া বুকটার দিকে নজর পড়লো শৈলীর, সাথে সাথে ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো। বুকের মাঝে পানির বিন্দুকণা দেখে কেনো যেন লোভ হলো মেয়েটার। লোকটা কি জানেনা, এমন ভয়ানক ভাবে কোনো মেয়ের সামনে আসতে নেই, বিশেষ করে উনার মত আকর্ষণীয় পুরুষদের। এর আগেও এভাবে শৈলীর হৃদয় কাঁপিয়েছে নিশান! সেদিন পিঠে মুছে দিতে গিয়েও তো এমন অবস্থা হয়েছিল!
নিশান নির্বিকার ভঙ্গিতে বের হয়ে এক হাত দিয়ে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে কাবার্ডের কাছে গেল। একবারও শৈলীর দিকে তাকালোনা, হয়তো বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছে। নিশানের চলনের সাথে সাথে শৈলীর চোখের মণিও যন্ত্রের মত তার দিকে ঘুরে গেল।
নিশান কাবার্ডে কাপড় খুঁজতে ব্যস্ত, আর শৈলী নিশানের সদ্য ভেজা ফর্সা পিঠটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা তো মুক্তোর মত লাগছে। শৈলী নিশানকে দেখে শুকনো ঢোক গিলল, পেছনে থাকা হাতটাও মুঠো হলো।
ঠিক তখনই নিশান ওদিকে ফিরেই শৈলীর দিকে না তাকিয়ে হালকা গলায় বলে উঠল,
—" খাম্বার মত দাঁড়িয়ে আছিস কেনো তুই? মনে হচ্ছে ঘরে কোনো চোর ঢুকেছে, আর তুই তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিস ধরা খাবি কিনা!"
শৈলী কেঁপে উঠল কথাটা শুনে। মুখটা লালচে থেকে এবার গাঢ় টমেটোর মতো হয়ে গেল। চোখ বড় করে নিশানের পিঠ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে চাইলেও, যেন পারল না! সে রীতিমতো অপরাধীর মতো মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—" না মানে, আপনি... মানে আপনি গায়ে কিছু.. পড়েননি কেনো?"
নিশান এবার একটু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, চোখে সেই ঠান্ডা অভিব্যক্তি। হালকা কণ্ঠে বলল,
—" কিছু পড়িনি মানে? এই তোয়ালেটা কি অকাজের জন্য পড়েছি? এটা কি সুতো মনে হচ্ছে তোর? নাকি তুই চাইছিস, একদম কিছুই না পরি?"
শৈলী এবার পুরোই হতভম্ব হয়ে কেমন যেন ঘাড় নামিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
—"না না! তা কেনো হবে? মানে... আমি কি এমন বললাম! আমি তো...মানে... আপনি তো...!"
শৈলী তোতলামি করতে শুরু করল। এ কি পরিস্থিতি! ওর এমন অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে নিশান এবার নীরবে হেসে ফেলল। ধীরে ধীরে কাবার্ড থেকে একটা টিশার্ট আর ট্রাউজার টেনে বের করে নিল। কিন্তু না পড়ে সেগুলো বিছানায় ফেলে দিল। তখনও শৈলী কাঁপা কাঁপা চোখে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে, যেন এখনই দৌড়ে পালাবে। পরিকল্পনা তো সেটাই ছিল! কিন্তু তা তো আর হচ্ছেনা! পা শুদ্ধ জমে গেছে।
ঠিক সেই সময় নিশান ঠান্ডা গলায় বলল,
—" কী বলবি বল?"
শৈলী চমকে বিছানায় থাকা টি-শার্টের দিকে তর্জনী তাক করে বলল,
—" আগে....ওই টিশার্ট আর ট্রাউজার টা পড়ে নিন। তা...তারপর বলছি।"
ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে নিশান বলল,
—" কেনো? এভাবে কী সমস্যা?"
শৈলী এবার ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
—" না মানে...!"
নিশান এবার সূক্ষ্ম হাসি মুখে আনলেও গম্ভীর স্বরে বলল,
—' ঠিক আছে। তুই ওদিকে মুখ ঘুরে থাক। জাস্ট ট্রাউজার টা পড়ে নিচ্ছি। টি শার্ট পড়তে পরবনা। গরম লাগছে খুব!"
শৈলী চোখ পিটপিট করে দেয়ালে থাকা এসির দিকে তাকিয়ে দেখলো টেম্পারেচার ১৯° এ দেয়া। এই তাপমাত্রাতেও এই লোকের গরম কীভাবে লাগছে? তবুও কোনো কথা না বাড়িয়ে শৈলী বাধ্যের মত মাথা নাড়িয়ে কৌশলে হাতটাও লুকিয়ে অন্যদিকে মুখ করে চোখ বুঁজে থাকে।
নিশান এবার কোনও দুরুক্তি না করে ট্রাউজারটা হাতে তুলে নিল। খুব সাবধানে, দ্রুত ট্রাউজারটা পরে ফেলল। তারপর হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—"হয়েছে। এখন ফিরে তাকাতে পারিস।"
শৈলী চোখ মেলে একটুখানি উঁকি দিল। দেখে সত্যিই নিশান ট্রাউজার পরে নিয়েছে, তবে শরীরে এখনো কেবল একরাশ ভেজা আলো আর খোলা বুকের প্রশান্তি। নিশান ততক্ষণে বিছানার ধারে বসে তার লুকানো দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে একরকম রহস্যময় প্রশ্রয় মাখা হাসি।
নিশান দুহাতে বিছানার সাথে হেলান দিয়ে নিচু গলায় বলল,
—"এবার বল, কী বলতে চেয়েছিলি?"
শৈলী ধীরে পা টেনে আবার ফিরে এলো বিছানার পাশে। এবার আর হাতটা পেছনে না রেখে ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে তার চুড়ি পড়া হাতটা সামনের দিকে আনল। চোখ নামিয়ে খুব মিষ্টি করেই বলল,
—"আপনার দেয়া চুড়িগুলো...পরেছি।"
বলেই হাতটা দেখানোর জন্য বাড়িয়ে দিল নিশানের দিকে। শৈলীর এমন বাচ্চামো দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকালো নিশান। এই মেয়েটা নাকি তাকে ভীষণ রকম লজ্জা পায়, ভয় পায়। অথচ এই যে এখন কত আকুল হয়ে হাতটা দেখাতে এসেছে, এটা কি সেই অন্যরকম অনুভূতির প্রমাণ নয়?
নিশান এবার সত্যি সত্যিই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার ভেতরটা গভীর হয়ে উঠল। নিজেও দাঁড়িয়ে গিয়ে শৈলীর কাছে চলে এলো, খুব কাছে। মাথা নিচু করা শৈলী সদ্য গোসল করে আসা নিশানের শরীরের সেই অদ্ভুত নেশালো ঘ্রাণ টা পেতেই চোখ বুঁজে বড় করে শ্বাস নিল। এর মধ্যেই অনুভব করল নিশান ওর হাতটা ধরেছে।
শৈলীর হাতটা টেনে আরেকটু কাছে এনে নিশান একটু একটু করে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল চুড়িদুটো। এরপর শৈলীর চিকন আঙুলগুলোও নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে ছুঁলো। কিঞ্চিত হেসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে নিশান বলল,
—" যখন আমার কথা খুব মনে পড়বে, তখন এই চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবি। চুড়িদুটো মানিয়েছে তোকে। খুব বেশি। তবে তোর হাতটা এমনিতেই অনেক সুন্দর বুঝলি! যাই পড়িস না কেনো খুব সুন্দর লাগবে। তুই যখন ছোট ছিলি, তখনই দেখেছিলাম, তোর হাতে চুড়ি, আংটি, এসব হাতে পড়ার জিনিসগুলো খুব সুন্দর মানায়!"
শৈলীর চোখ ফের চুড়ির দিকে চলে গেল, ঠোঁটে নিজের অজান্তেই হাসি খেলে গেল। মুগ্ধ হয়ে তাকালো নিশানের দিকে। নিশান এবার শৈলীর হাতটা ধরে ওর চোখের দিকে তাকালো। শৈলী আগে থেকেই চেয়ে থাকায় চোখাচোখি হয়েই গেল। কিন্তু এবার আর কেনো যেন চোখ সরাতে পারল না শৈলী। তাকিয়েই রইলো ওই নেশালো চোখ দুটোর দিকে। না জানি কি আছে ওই চোখে!
নিশান এবার একটা ভয়ানক কাজ করে বসল। শৈলীর চোখের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থেকেই ধীরে ধীরে শূণ্যে তুলল ওর নরম হাতখানা। শৈলী প্রথমে বুঝতেই পারলনা নিশান কি করছে। কিন্তু ওর গরম নিঃশ্বাস হাতে পড়তেই হুঁশ ফিরল শৈলীর। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। নিশান এবার চোখ বুঁজে শৈলীর হাতের উল্টো পিঠে খুব সময় নিয়ে একটা গাঢ় চুমু খেলো। নিশানের ঠোঁটের ছোঁয়া হাতের উপর পেতেই আবেশে চোখ বুঁজে ফেলল শৈলী। শুকনো ঢোক গিলল আবারো। কেঁপে উঠলো হাতের সাথে দেহখানাও। কিন্তু নিশান এখনো চোখ খোলেনি। ও আরেকটু সময় নিয়ে আরো দুটো চুমু খেলো শৈলীর হাতে। এরপর সেখানেই ঠোঁট রেখে চোখ খুলে তাকালো শৈলীর দিকে৷ লজ্জামাখা মুখটা দেখার এক ক্ষুদ্র প্রয়াস!
শৈলীর শরীর কাঁপছে, কিন্তু সে পালায় না। সে চোখ ফিরিয়ে নেয় না, হাতটা সরায় না। কারণ এই মুহূর্তটা সে চায়। চায় নিশানের স্পর্শ, নিশানের নিঃশ্বাস, নিশানের চোখে নিজেকে দেখে নিতে। গাল দুটো লাল হয়ে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে, তবু সে চুপ। নিশান তখনো শৈলীর হাতে ঠোঁট ঠেকিয়ে রেখেছে, মনে হয় একটুকরো প্রতিজ্ঞা আঁকছে নরম ত্বকে। তারপর ধীরে ঠোঁট সরিয়ে নিল, কিন্তু হাতটা ছাড়েনি।
নিশান নিজেও ঢোক গিলে নেশালো গলায় বলে উঠলো,
—" সারাদিন বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরে যখন তোর অপেক্ষারত মুখটা দেখি, তখনই সকল ক্লান্তি নিমিষেই চলে যায় জানিস। অথচ আমি জানতামও না যে তোর লজ্জায় নামিয়ে রাখা মুখটা দেখলে আমার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠে! আজ বুঝতে পারছি, তুই কতটা ভয়ানকভাবে কাহিল করেছিস নিশান তালুকদারকে!"
শৈলীর নিঃশ্বাস যেন গলায় আটকে গেল। সে নিশানের চোখে তাকাতে পারছে না, তবু অনুভব করছে, ওর সমস্ত মনোযোগ এখন কেবল তার হাতে, তার আঙুলে, সেই দুটো চুড়িতে, আর চোখে। নিশান এবার একদম নিচু গলায় আরও ধীরে বলল,
—"তুই যখন এগুলো পরবি, আমার দিকে তাকিয়ে হাসবি, তখন আমি প্রতিদিন বুঝে যাব, আমার পৃথিবী ঠিকঠাক আছে। বিয়ের পর এই চুড়ি দুটো যেন হাত থেকে খুলতে না দেখি। মনে থাকবে?"
শৈলী এবার আর কিছু বলার সাহস পেল না। শুধু হাতটা নিজের করে ওর হাতে রাখল, মাথা নিচু করেই হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল,
—" হুম। মনে থাকবে।"
নিশান এবারও ছাড়লো না শৈলীকে। ওর হাতখানা ধরে রেখে ওভাবেই কি যেন দেখতে লাগলো। চোখটা স্থির রাখলো শৈলীর মুখের দিকে। শৈলী ভেবেছিল তার হাতটা বোধ হয় নিশান ভাই ছেড়ে দিবে। তাই ও অপেক্ষা করছিল। কিন্তু অনেকক্ষণ পর যখন হাতটা বন্দি অনুভব করল, তখন মাথা নিচু করে থাকা শৈলী ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো, আর তৎক্ষনাৎ দুর্বোধ্য চোখজোড়ার সম্মুখীন হলো। এ কি নজর নিশানের। এমন আকুল চোখে তাকিয়ে কি দেখছেন উনি।
শৈলী নিশানের ওই চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে মিনমিন করে বলল,
—" ক...কী দেখছেন ওভাবে?"
নিশান ঠোঁট চেপে হেসে একটুও দৃষ্টি না সরালো না। চোখ তখনো ওর চোখে গভীরভাবে আটকানো। কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ টের পাওয়া যাচ্ছে, খুব কাছ থেকে। শৈলীর প্রশ্ন শুনে নিশান একটুও চোখ না সরিয়ে গলা নামিয়ে বলল,
—"তোকে দেখছি। তোর চোখদুটো দেখছি!"
শৈলী আরও গুলিয়ে গেল। চোখ নামিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। নিশানের চাহনি টানছে, দেহের সমস্ত অনুভূতি জমাট বাঁধছে। নিশান আবার বলল,
—"এই চোখে ভয়, লজ্জা, তোর ভাষায় ভালোবাসা, সব একসাথে দেখে ফেলেছি আজ। এই চোখ দুটো যে আমাকে অনেক আগেই কবুল করে ফেলেছে, সেটা বুঝতে এতদিন দেরি করেছিলাম আমি। আজ বুঝেছি। আরো একবার বুঝেছি!"
শৈলী এবার কাঁপা কণ্ঠে বলল,
—"আপনি তো.... কিছুই বলেননি।"
নিশান এবার নিঃশ্বাস ছেড়ে হেসে ফেলল। শৈলীর হাতটা আরেকটু টেনে নিয়ে বলল,
—"তুই চোখের ভাষায় লিখেছিলি, আমি চুপচাপ পড়ে নিয়েছি। তুই মুখে বললে যেটা হতো, আমি চোখে দেখেই সেটার চেয়ে বেশি বুঝেছি।"
শৈলী ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। ওর চোখে পানি এসে গেল, কিন্তু হাসি ঠোঁটে লেগেই থাকল। একটা মুহূর্ত, নীরবতা। তারপর হঠাৎ নিচে থেকে রিমি চেঁচিয়ে উঠল,
— "শৈলী, কই তুই? নিচে আয় বোইন! বড়মা ডাকছে তোকে।"
শৈলীর হুঁশ ফিরল। নিশানও একটু সজাগ হলো। এতক্ষন সে ঘোরের মধ্যেই ছিল। শৈলী সাথে সাথে লজ্জায় দৌঁড়ে হাত ছাড়িয়ে উঠে চলে যেতে চাইবে, কিন্তু নিশান এক ঝটকায় হাতটা টেনে নিয়ে আবার বলে,
—" কাল সকালে তৈরী থাকবি। তোকে নিয়ে শাড়ি পাঞ্জাবি আরো যাবতীয় যা আছে, সব কিনতে যাব। আর হাত থেকে এখন চুড়িটা খুলে ফেলিস। বিয়ের পর আমি পড়িয়ে দেব আবার!"
শৈলী নিশানের কথায় লজ্জায় এতটাই গলে গেল যে মনে হচ্ছিল, মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
—"আ... আচ্ছা।"
তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি। চুড়ি পরা হাতটা বুকের কাছে এনে নিচু মাথায় এক দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রিনঝিন শব্দ যেন হৃদয়ের তালে তালে বাজছিল নিশানের কানে। ওর ওড়নার কোণার নাচ, চুলের ভাঁজে নাচা আলো, সব মিলিয়ে সেই মেয়েটা যেন বাতাস হয়ে বেরিয়ে গেল। নিশান বিছানার কিনারায় বসে তার চলে যাওয়া দরজার দিকে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর ফিসফিস করে বলল,
—" পালিয়ে লাভ কী, যখন ঘুরে ফিরে এই নিশান তালুকদারের বুকেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে!"
একটু থেমে নিশান চোখ বুঁজে কন্ঠ খাদে নামিয়ে গুনগুন করে উঠলো,
—❝ আমি তোর ছায়া হবো
কিছুটা বেহায়া হবো
চেয়ে নেবো চেনা আবদার! ❞
চলবে.…..........
⚠️নোট— ২০০+ রিয়েক্ট না হলে আমি সত্যিই আর নতুন পর্ব দেবোনা। আমি সত্যিই সকলের এমন অবস্থা দেখে হতাশ! এভাবে তো লেখার আগ্রহ পাইনা। প্রতিদিন পড়াশোনা শেষ করে রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে গল্প লিখি, তার এই প্রতিদান? 😊
যাইহোক, #কিসকার্স গল্পটা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকবে। কারন আপনারা তো পড়েন না😊
এখন নিশান ভাই চলবে...পরিস্থিতি অনুযায়ী এটাও বন্ধ করে দেব।
কমেন্টে জানান আপনার অনুভূতি 🫶🤌 ভালোবাসা রইলো 💖