ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া

১৫তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_১৫

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

মাত্র কয়েক সেকেন্ডে কী এমন হলো তা এখনো বুঝতে পারলেন না বাড়ির কোনো সদস্য। খাদিজা তালুকদার এখনো হাতে বাটি নিয়ে উজবুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নিশান বাড়ি থেকে কেনো বের হলো, তা তো বুঝলেনই না। সাথে শৈলী কেনো এভাবে পাগলের মত চিৎকার করছে তাও বুঝলেন না। নিশান গাড়ি নিয়ে পুরোপুরি চলে যাওয়ার পর রিমি আর মিমি শৈলীর কাছে ছুটে এলো। দুজন মিলে তাকে ধরে এনে সোফায় বসিয়ে দিল। শৈলী উন্মাদের মত বারবার রিমির হাত খাঁমচে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চুল এলোমেলো হয়ে গেছে, মুখে যেন আগুন লেগে আছে, হাতে বারবার নিজের কপালে আঘাত করছে। মিমি আর রিমি অনেক ভয় পেয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠতে পারেনা, রিমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

—" শৈলী, কি হয়েছে? নিশান ভাইয়া কী বলেছে তোকে?"

শৈলী মাথা নাড়িয়ে শুধু বলল,

—" কিছু না...উনি কিছু বলেনি। কিছুই বলেনি। কিছু না বলেই তো শেষ করে দিল...সব শেষ...আমি কেনো বললাম ওই কথা, আমি কেনো...!"

মিমি ওর গায়ে হাত রেখে শান্ত করতে চেষ্টা করল,

—" তুই আগে পানি খা, শৈলী। তারপর যা বলার বলবি, প্লিজ আগে শান্ত হ।"

শৈলী গলা ছেড়ে কেঁদে উঠল আবার,

—" আমি ঘৃণা করি নিজেকে...আমি ঘৃণা করি ওই মেয়েকে... আমি ঘৃণা করি..! "

ওর কান্না আর কথাগুলো মিলেমিশে ঘরজুড়ে একটা বিষাদঘন নিঃশব্দতা ছড়িয়ে দিল। খাদিজা তালুকদার ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বাটিটা নামিয়ে রেখে চোখ মুছলেন। কিছু একটা তো ঘটেছে। খাদিজা শৈলীর কাছে আসতেই শৈলী পাগলের মত জাপ্টে ধরে বলতে থাকলো,

—" আমার ভুল হয়ে গেছে বড়মা। আমি ওভাবে বলতে চাইনি বিশ্বাস করো। নিশান ভাই কে আসতে বলো। আমি ক্ষমা চেয়ে নেব। পা ধরে ক্ষমা চাইবো সত্যি। আসতে বলো উনাকে। তোমার ছেলেকে আটকালেনা কেনো বড় মা? উনি আর আসবেনা তো! ডেকে আনো প্লিজ।"

খাদিজা তালুকদার শৈলীর মুখে এসব কথা শুনে হতবাক হয়ে তাকালেন রিমি, মিমির দিকে। তারাও কিছু বুঝেনি বলে মাথা দুদিকে নেড়ে কাঁধ উঁচালো।

-----------------

জীবনে দ্বিতীয় বারের মত রাতের আঁধারে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে তুলল নিশান, গম্ভীর আঙ্গিকে ঠোঁটে গুঁজে নিয়ে ধোঁয়া ওড়ালো। এদিকে তাকে সিগারেট খেতে দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আকাশ, এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো কেও তাকে জোর করে এসব মিথ্যে দৃশ্য দেখাচ্ছে।

নিশান আজ পর্যন্ত একবারই সিগারেট ছুঁয়েছে। আকাশের এখনো মনে পড়ে সেই পড়ন্ত বিকেলের কথা। নিশান যখন নবযৌবনে পদার্পণ করেছিল, তখন একবার আকাশের খপ্পরে পড়ে জোর করে সিগারেট খেতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু সেদিন সিগারেট খেয়ে বাড়িতে ফেরার পর কিশোরী শৈলী নাকি নাক-মুখ কুঁচকে বলেছিল—এমন বিদঘুটে গন্ধের জিনিস কেনো খেয়েছেন নিশান ভাই? এটা ভালো লাগেনা। দম বন্ধ হয়ে যায়।

সেই যে মেয়েটার কথা শুনেছে আজ পর্যন্ত নিশানকে কেও আর সিগারেটের কাছেই যেতে দেখেনি। অথচ সেই নিশান আজ ব্রিজের উপরে দাঁড়িয়ে কি সাবলীলভাবে সিগারেট খাওয়া শুরু করল। আকাশ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এই যে নিশান দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজের রেলিং ধরে, গা এলিয়ে দেওয়া ভঙ্গিতে, ঠোঁটে গুঁজে রাখা আধজ্বলা সিগারেট, চোখদুটো নদীর দিকে অথচ মন জানি কত দূরে,এ যেন সেই নিশানই নয়। হতেই পারেনা!

এক সময় পেছন থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আকাশ নিশানের কাঁধে হাত রাখল। গলা নিচু করে হতভম্ব হয়ে বলল,

—" ভাই কী করছিস তুই? তুই সিগারেট ছুঁলি? তুই? কী হয়েছে ভাই? বল না, বাড়িতে ওভাবে শৈলীকে কাঁদিয়ে রেখে এলি আবার। কাহিনী বল! এই! "

বলতে বলতেই নিশানকে জোরপূর্বক নিজের দিকে ঘোরালো আকাশ। তৎক্ষনাৎ চমকে গেলো, চোখজোড়া সহসা বড় করে হকচকিয়ে বলল,

—" নিশান তুই কাঁদছিস?"

কথাটা কানে আসতেই বুড়ো আঙুলে চোখের কোণে আসা সদ্য পানিটা ছিটকে ফেলল নিশান। আবারো ঠোঁটে সিগারেট তুলে অন্যদিকে ফেরার চেষ্টা করতে থাকলো। নিশানের চোখজোড়া অসম্ভব লাল হয়ে আছে। সবকিছু দেখে আকাশ মুহুর্তেই অস্থির হয়ে গেলো, নিশানের বাহু ধরে ঝাঁকাতে লাগলো সে,

—" এই নিশান৷ ভাই আমার! কী হয়েছে? আরেহ বল না! এমন করছিস কেনো? তোর চোখে পানি কেনো নিশান?"

নিশান মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়েই থাকল। ঠোঁটে সিগারেট চেপে ধরেছে বটে, কিন্তু তা নিভে গেছে অনেক আগেই। বাতাসে কেবল পোড়া গন্ধ আর চোখজোড়া রক্তচোখের মত লাল হয়ে উঠেছে। আকাশ নিশানের কাঁধ ধরে আরও এক ধাক্কা দিল,

—"ভাই, এমন করিস না প্লিজ। তোকে কখনো এমন দেখিনি। তুই বল না ভাই, কী হয়েছে তোদের মাঝে?"

নিশান ঠোঁট শক্ত করে রাখল, চেষ্টা করল গলার ভিজে আওয়াজটাকে আটকে রাখার। কিন্তু তাতেও পারল না। আকাশ যখন দুই কাঁধে হাত রেখে চোখে চোখ রাখল, তখন মুহূর্তেই যেন সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল নিশানের ভেতরে। হঠাৎ করেই একটা ধাক্কার মত করে নিজের কপালটা আকাশের কাঁধে ঠেকিয়ে কেঁদে ফেলল নিশান। বুক ফেটে কান্না নয়, কিন্তু যেভাবে ফিসফিস করে নিঃশব্দে চোখ দিয়ে জল পড়ছিল, তা কাঁপিয়ে দিল আকাশকেও। শৈলীর তীক্ষ্ণ কথাগুলো মস্তিষ্কে আসতেই নিজেকে আর সামলানো গেলো না। সমস্ত বেড়িবাঁধ ভেঙে নিশান তালুকদারের মত পাথরও অশ্রু বিসর্জন দিল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো নিশান। গড়গড় করে বলতে শুরু করল মনে থাকা সব কথাগুলো,

—" আমি ব্যর্থ আকাশ! ব্যর্থ আমি! আমি কী এমন করেছিলাম রে আকাশ? কিসের এত বড় শাস্তি পেলাম আমি? আমি কি ওকে ঠকিয়েছি? একটা মেয়ে, যাকে আমি বুকের মধ্যে রেখে আগলে রাখছি এত বছর... সে-ই একদিন আমায় বলে আমি নাকি শুধু ওকে ভোগ করতে চাই... আমি ওর চরিত্রে প্রশ্ন তুলি নি, একবারও না..কিন্তু ও আমার সব কিছুতেই প্রশ্ন তুলে দিল! আমাকে, আমার ভালোবাসাকে, আমার মানুষটাকেই অচেনা বানিয়ে দিল! ও কীভাবে কথাগুলো বলল আকাশ! কীভাবে???"

নিশান ফুঁপিয়ে উঠল, গলার স্বর ভেঙে যাচ্ছে বারবার, থামলো না তবুও,

—"আকাশ আমি তো ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, আমি তো বিয়ে করতে চেয়েছি শৈলীকে। তোদের সবাইকে নিয়ে হাসিখুশি একটা পরিবার করবো ভেবেছিলাম, আমি ওর জন্য সবকিছু ছেড়ে দিতে চেয়েছি, আমি তো শুধু ভালোবেসেছি, ভুলটা করলাম কোথায় আকাশ? কোথায় বল? কোথায় ভুল করলাম? তুই তো জানিস, আমি ওর জন্য কত কী করেছি! দেখেছিস তো তুই! কীভাবে নিজেকে ওর কাছে বিসর্জন দিয়েছি!"

আকাশ নিশানের কাঁধ চেপে ধরে রাখল। নিজের চোখও ভিজে উঠছে তার। এখনো বুঝতে পারল না শৈলীর মত মেয়ে কি এমন বলেছে নিশানকে। সে এক হাতে মাথা চেপে ধরে বলল,

—" তুই আমাকে পরিষ্কার করে না বললে কিভাবে বুঝবো নিশান! এ শালা, বল না। কি বলেছে ও তোকে? আরেহ, ও তো ছোট মানুষ। বাচ্চা মেয়ে!ওর কথা ধরলে হবে বল?'

নিশান চোখ মুছল বারবার, কিন্তু কান্নাটা থামলো না।

সে বলল,

—"তুই জানিস না রে আকাশ.. তুই বুঝবি না। শৈলী বলেছিল, আমার গায়ে সিগারেটের গন্ধ সহ্য হয় না। ওই কথাটার পর আমি আর কোনোদিন ছুঁইনি এই জিনিসটা। অথচ আজ...ও আমার চরিত্রে প্রশ্ন তুলেছে। আমি এখন পর্যন্ত হিসাব মেলাতে পারলাম না শৈলী কিসের অপবাদ দিলো আমাকে!"

নিশান হঠাৎ থেমে গেল। আকাশ তাকিয়ে রইল শূন্য দৃষ্টিতে। অবাক না হয়ে পারল না! শৈলী? শৈলী এমন করেছে? এটা কি আদৌও সম্ভব!

-------------------

রিমি আর মিমি মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে মুখ ফুলিয়ে লাল করে থাকা শৈলীর দিকে। তারা মেয়েটাকে বোকা বলবে, নাকি পাগল বলবে সেটাও বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণের জন্য ঠিক কী ভাববে বুঝে উঠতে পারল না তারা। দ্বিতীয়বারের মত রিমি ছবিগুলো আবার ঘেঁটে দেখল, মিমিও চোখ গলিয়ে একেকটা ছবির ত্রুটি খুঁজে বের করতে লাগল। ভ্রু কুঁচকে রিমি ফিসফিস করে বলল,

—" আরেহ ধুর, ভালো করে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। এগুলো তো এআই ইমেজ! দেখ, হাতের আঙুলগুলো কেমন বিকৃত। দেখ! "

মিমি দ্রুত মাথা নেড়ে সম্মতি দিল,

—"হুম, আর মুখের শ্যাডোগুলোও অস্বাভাবিক। আমি তো প্রথমেই সন্দেহ করেছিলাম। আশ্চর্য! একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই তো বোঝা যাচ্ছে এগুলো আর্টিফিশিয়াল! "

তাদের কথা শুনেই শৈলী চোখ বড় বড় করে তাকাল। এবারে তার অবস্থা টা আরো দেখার মত হলো। কি একটা বাজে কাজ করে ফেলেছে সে, উপলব্ধি করতেই চিৎকার দিয়ে কাঁদতে মন চাইলো। ইচ্ছে করল নিশানকে ডাকতে। ঠোঁট কাঁপছে তার, চোখের কোণায় কান্না জমে আছে। গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এলো,

—" এসব কী বলছিস রিমি? সত্যি? "

কান্নারত মুখ নিয়েই অসহায় দেখালো শৈলীকে। ওকে দেখে মায়া হলেও রিমির ইচ্ছে করল শৈলীর মাথায় দুটো থাবড়া মারতে। মেজাজ খারাপ করে ও দ্রুত শৈলীর সামনে বসে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,

—" আরে বলদ মাইয়া। চোখ টা খুলে ভালো করে তাকাইয়া দেখ। এটা কি নিশান ভাইয়ের হাত? এমন শিয়ালের মত হাত আমাদের ভাইয়ের? তারপর মুখটা দেখ, নিশান ভাইয়ের চেহারা জাস্ট বসিয়ে দিয়েছে। তুই কি গাধা শৈলী? এটুকু জিনিসটা নিয়ে এত বড় একটা কান্ড ঘটালি?"

শৈলী এবার টলমল করা চোখ নিয়ে কাঁপা হাতে ফোনটা নিল। জুম করে ভালো করে দেখলো। এ পর্যায়ে ওর মনে হলো এটা তো আসলেই নিশান ভাই না! শৈলীর কাঁপা হাতে ধরা ফোনটা যেন আগুন হয়ে উঠলো। ছবিটা আবারো জুম করতেই চোখের সামনে স্পষ্ট হলো সেই বিকৃত আঙুলগুলো, মুখের অদ্ভুত আলোছায়া, আর সেই পরিচিত অথচ কৃত্রিম হাসি, যেটা কখনোই নিশান ভাইয়ের হতেই পারে না।

ঠোঁট কাঁপছে শৈলীর , নিঃশ্বাস আটকে আসছে, বুকের ভেতর হঠাৎ করে যেন জমে থাকা সব পাথর একসাথে পড়ে গেল। এ কি করেছে সে! একটা এআই ছবির ওপর ভর করে, একটা ফেইক মুখের ওপর বিশ্বাস করে সে নিজের ভালোবাসা, নিজের আত্মসম্মান, নিজের সম্পর্ক, সব জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়েছে। তাও আবার নিজ হাতে? রাগে,দুঃখে, কষ্টে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল শৈলী। ফোনটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো শৈলী। গলা ফাটিয়ে, নিঃশ্বাস ভেঙে ভেঙে কান্না,যেন বুকে আটকে থাকা হাজার বছরের যন্ত্রণা এখন বেরিয়ে আসছে।

—"আমি... আমি উনাকে,,,এগুলা কী বলে ফেললাম! আল্লাহ! আমি তো জানিই না কিছু... আমি তো জানিই না! উনাকে এত বড় কথা বললাম...! নিশান ভাই আমাকে মাফ করবেনা!"

রিমি দাঁত চেপে বসে পড়লো ওর পাশে। মুখে বিরক্তি আর চোখে চাপা কষ্ট, জোরে গলা তুলে বলল,

—" ঠিকই আছে। বেশ হয়েছে। ভুল টা তোর! বলদের মত সীমার কথা বিশ্বাস করলি? ওই মাইয়া তো প্রথম থেকেই খচ্চর! তুই কি পাগল শৈলী? একটা ছবির কারণে! একটা তুচ্ছ এডিটেড ছবি দেখে! তুই নিশান ভাইকে ওই কথা গুলা বলে দিছিলি? তুই উনাকে ফাঁকি দিলি শৈলী, তুই সন্দেহ করলি! ছিঃ!"

শৈলী কাঁপা কাঁপা গলায়, শ্বাস নিতে না পেরে হেঁচকি তুলে বলল,

—"আমি জানি না রিমি... আমি তো ভেবেছিলাম... উনি আমাকে ঠকিয়েছে... আমি...

রিমি আর মিমি একে অন্যের দিকে তাকাল। কী করবে ভেবে পেলো না। তবে রাগ উঠলো শৈলীর উপরেই। বোকার মতো বিশ্বাস করেছিল মেয়েটা কারো একটা এডিট করা এআই ছবি। হয়তো একটু বেশি অনুভূতিপ্রবণ, একটু বেশি রঙিন কল্পনার পাখা মেলতে চেয়েছিল সে। শৈলী এবার হঠাৎ মুখ ঢেকে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।

মিমি এবার বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,

—" আরে ভাই, সেটা তো বড় কথা না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তুই নিশান ভাই কে বিশ্বাস করিস না শৈলী? এই তোর বিশ্বাস? এত ঠুনকো বিশ্বাস? ছিঃ!

শুধু ছবির ওপর ভরসা করে, তুই কী করলি জানিস? তুই যার জন্য দিনরাত কেঁদে বসে থাকতি, যার একটুখানি মন খারাপে তুই ছুটে যেতি, যাকে তুই বলতি ‘আমার নিশান ভাই’, তাকেই তুই বিশ্বাস করতে পারলি না?"

শৈলী থরথর করে কাঁপছে। মুখের কান্না যেন জবাব দিতে চাইলেও শব্দ বের হতে দিচ্ছে না। বুক ফেটে কান্না আসছে তার! মিমি দাঁত চেপে বললো,

—"ছবি দেখে তুই ভাবলি, নিশান ভাই তোকে শুধু ভোগ করতে চায়? এটাই ভাবলি? এত জঘন্য একটা চিন্তা করলি কীভাবে? তুই ভুলে গেলি কে সকাল থেকে রাতে তোর মুখের এক ফোঁটা হাসির জন্য কী কী করে? কার হাতে তুই অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারালে পানি খেয়েছিস? কে হাসপাতালের বিছানায় বসে নিজের খাবার ভুলে তোকে ঘুম পাড়িয়েছে?"

রিমি এবার নিচু গলায় সংযতভাবে বললো,

—"সীমা কেবল তোকে ঠকায়নি শৈলী। ও নিশান ভাইকে ঠকানোর চেষ্টাও করেনি, ও শুধু একটা ছবি পাঠিয়েছে। কিন্তু ওর প্ল্যান তখনই সফল হয়েছে, যখন তুই ছবি দেখেই নিশান ভাইরে খারাপ ভাবছিস। মানে তোর ভেতরে এমন কিছু ছিল বলেই তুই ওমন কথা বলতে পেরেছিস।"

শৈলী এবার মুখটা দুই হাত দিয়ে ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল, গলা কেঁপে উঠলো,

—"আমি খারাপ... আমি... আমি বিশ্বাস করিনি উনাকে... আমি বিশ্বাস করিনি উনারে... আমি... উনাকে আসতে বল..আমি পা ধরে মাফ চাইব!"

মিমি এবার একদম ঠাণ্ডা গলায়, স্পষ্ট করে বলল,

—"ভালোবাসায় ভুল হতেই পারে, কিন্তু বিশ্বাসের ভিত যদি না থাকে, সেই ভালোবাসা তো কাচের মতো... একটু চাপেই চুরমার।"

কথাটা শৈলীর হৃদয়ের ঠিক মাঝখানে গিয়ে বিঁধলো। ওর ভেতরে হাহাকার করে উঠল। আতঙ্ক চেপে ধরলো বুক। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পেল, নিশান ফিরে আসছে না। হয়তো কোনোদিনও না। ওর গলা রুদ্ধ হয়ে আসলো। চিৎকার করে উঠল না, শুধু একটা চাপা, দমবন্ধ কান্নায় ফেটে পড়ল। এই প্রথম সে অনুভব করলো—কখনো কখনো একটা ভুল বিশ্বাস, একটা অবিশ্বাস, একটা কল্পিত দাগ মানুষের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকেও চিরতরে দূরে ঠেলে দেয়।

রিমি আর মিমি হতাশ হয়ে যে যার ঘরে চলে গিয়েছে। এদিকে খাদিজা তালুকদার সবকিছু জেনে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিছুই করলেন না। কারন তিনিও চরম হতাশ। তবে নিশান যে আজ রাতে আর বাড়ি ফিরবে না, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই কারোর। খাদিজা তালুকদার নিজের ছেলেকে হাড়ে হাড়ে চেনেন। তাই অপেক্ষা না করেই তিনিও ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। এই ছেলেপেলের কান্ড তারা নিজেরাই ঠিক করুক! নাসিরুল তালুকদার অফিসে থাকায় বাড়িতে ঘটে যাওয়া চরম ঝড়টা সম্পর্কে জানতেও পারলেন না।

তবে শৈলী থ মেরে নিজের ঘরে বসে রইলো। ভাবতে থাকলো কীভাবে নিশান ভাই কে বাড়িতে ফিরিয়ে আনবে? এভাবে তো ম'রেই যাবে শৈলী! গ্লানি মোচনের চেষ্টা টাও করার সুযোগ দেবে না লোকটা? এত নিষ্ঠুর তো না সে! নিশান কে যে করেই হোক বাড়িতে ফেরাতে হবে, শৈলী পারলে নিশানের পা ধরে ঝুলে পড়বে বলেও সিদ্ধান্ত নিলো, কিন্তু অবশ্যই তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। যা করেছে, যা বলেছে, তা আসলেই অনেক বেশি জঘন্য!

----------------

আকাশের রুমটা সুনসান। ঘড়ির কাঁটা যেন কেবলই টিক টিক করে হাঁটছে, আর নিস্তব্ধতা চিরে মাঝেমাঝে বাজছে ফোনের রিংটোন। আকাশ কপালে হাত বুলিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানার এক কোনে বসে আছে। এক হাতে নিজের ফোন, আরেক হাতে নিশানের। দুটোতেই একের পর এক কল আসছে—রিমি, মিমি, খাদিজা তালুকদার, এমনকি শৈলীও পাগলের মত কল করেই যাচ্ছে। বেচারা আকাশ শুধু চোখ দিয়ে একেকজনের নাটক দেখছে। তামাশা শুরু করেছে সবাই! এদিকে একজন মরার মত বিছানায় পড়ে আছে, আরেকজন কল দিতে দিতে উড়িয়ে দিচ্ছে সব। এমনিতেই অনেক কষ্টে নিশানকে নিজের বাসায় এনেছে আকাশ। এভাবে তো ছেড়ে দেয়া যায়না!

—"আরে একটু শান্তি দে তোরা! সব্বাই একসাথে কল দিচ্ছে কেন!"

বিড়বিড় করতে থাকলো আকাশ। নিশান বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে আছে, চোখ ফ্যানের দিকে স্থির। ঠোঁটের কোণে ধরা সিগারেটের আগুন জ্বলছে-নিভছে। সে যেন কিছুই শুনছে না, না ফোনের শব্দ, না আকাশের বিরক্তি। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে তার গা বেয়ে, চোখের পাতায় এসে পড়ে কিছুটা, তবুও সে পলক ফেলছে না।

আকাশ একবার তাকায় ফোনের স্ক্রিনে, একবার নিশানের দিকে। ওর ভেতরটা ছটফট করছে। এই নিশান কি সেই লোকটা, যে পাঁচ মিনিটে সব ঠিক করে ফেলে? এই লোকটা কি সেই, যার চাহনিতে রিমি-মিমিও চুপসে যেত? না, আজ সে নিঃশব্দ, নিস্তেজ। একটা ভাঙা মানুষের মতো।

আকাশ ধীরে নিশানের পাশে বসে, তার দিকটা দেখে। ঠোঁট কেঁপে ওঠে,

—"ভাই হয়েছে,... আর কতটা ভাঙবি তুই? নিশান তালুকদার কে এভাবে সহ্য করা যায়না!"

কোনো উত্তর আসে না। সিগারেটের ছাইটা টুপ করে বিছানার চাদরে পড়ে। নিশান তাও টের পায় না। আকাশ ফিসফিস করে,

—" ভাই! তোরা কী শুরু করছোস? এই দেখ, শৈলী পাগলের মত লাগাতার কল করছে। কল টা ধরতেও দিচ্ছিস না তুই? কী করতে চাইছিস বলতো?"

ফোনে আবার রিং ভেসে আসলো। আকাশ বিরক্ত হয়ে ফোনটা মিউট করে পাশে ফেলে দেয়। বাতাসে তখনও ধোঁয়ার গন্ধ, আর একটা ভাঙা নিশ্বাস,যেটা কেউ শুনতে পায় না, শুধু বুঝে নেয়।

নিশান এবার আরেক টান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,

—" শৈলীর কল ধর!"

নিশ্চিত হতে চাইলো আকাশ,

—" ধরব? "

নিশান ঠোঁট কাঁমড়ে ক্ষীণ হেসে বলল,

—" কল রিসিভ করে বল, নিশান তালুকদার ম'রে গেছে!"

হতাশ হয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো আকাশ। বেডা আবার শুরু করেছে! তার হয়েছে এক জ্বালা! মিয়া বিবির কাহিনী তে সে শুধু শুধু চ্যাপ্টা হচ্ছে। এসব তামাশা দেখে আকাশেরই ইচ্ছে করল সাত তলা থেকে লাফ দিয়ে জীবন ত্যাগ করতে। আকাশ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—" ভাই, আমার মনে হয়না, শৈলী শুধু শুধু এমন করবে। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। আমি একটু খোঁজ নিব নাকি? বিষয়টা কী জেনে নিই!"

নিশান এবার চোখ বন্ধ করে ফ্যানের শব্দে নিজের কান ডুবিয়ে দিল। ভেতরটা একদম শুন্য। শৈলীর কান্না, কল, আহ্বান,সবই তার কাছে এখন কেবলই একধরনের প্রতিধ্বনি, যে প্রতিধ্বনি কেবলই আঘাত করে ফিরে আসে। আকাশের কথা শুনে প্রথমে চুপ রইলো নিশান। মুখ দিয়ে ধোঁয়ার একটা বড় কুণ্ডলী ছাড়লো। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। কণ্ঠস্বর নিচু, ঠান্ডা, কিন্তু চোখ দুটো আগুনে পোড়া স্নায়ুর মত করে বলল,

—"তোকে কিছু করতে বলিনি আমি আকাশ?"

আকাশ এবার মুখ কুঁচকে অসহায়ের মত বলল,

—"ভাই, অন্তত জানলে তো... শৈলীকে তো আমি অনেকদিন ধরেই চিনি। ও এমন না। নিশ্চয়ই কিছু একটা...!"

নিশান এবার ঠোঁটের কোণে হালকা বিদ্রুপের হাসি টেনে বলল,

—"এই জন্যই তোরা সবাই আজও শিশু। কারণ তোদের কাছে বিশ্বাস কাগজের নৌকা, একটুখানি জলে গেলেই ডুবে যায়। বুঝি আকাশ, ওই মেয়ে আর ওর কান্না... এগুলো শুধু সময় মতো ব্যবহৃত অস্ত্র। আর আমি কোনো যুদ্ধেই এখন আর দাঁড়াতে চাই না। তাই, শোন, কেউ কল করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যাক, আমার যায় আসেনা! কিছু জানার দরকার নেই!"

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আবারো ধোঁয়া ছাড়লো নিশান,

—"আর যদি বেশি জানার ইচ্ছে হয়... তো তুইও আমার লিস্ট থেকে বাদ পড়বি।"

আকাশ যেন মুখ থুবড়ে পড়ে ভেতরে ভেতরে। কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে গিলে ফেললো। এবার আর প্রতিবাদ করল না। শুধু চুপচাপ নিশানের ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নিলো, সেই ফোনটাই এখন যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্ফোরক।

—"ঠিক আছে ভাই, তুই যা বলিস... তোর পাশে থাকবো, কথা দিচ্ছি... কিন্তু ভেতরটা ছিঁড়ছে আমার..তোদের একেকজনের যে ঢঙ!"

নিশান আবারো ফ্যানের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো। বাইরে কোথাও নাম নাম না জানা পাখি মৃদু সুরে ডেকে উঠলো। ঘরে তখন শুধুই ধোঁয়া আর নিস্তব্ধতা।

চলবে...….....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন