ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া

১৭তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_১৭

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে পুরোদমে নাক ডেকে ঘুমোতে থাকা আকাশের দিকে। শৈলী বুঝলো না কেনো নিষ্ঠুর নিশান বেচারা ঘুমন্ত আকাশের দিকে চোখে আগুন নিয়ে তাকিয়ে আছে। একটু আগেই ঘরে ঢুকেছে তারা। শৈলী ভাবলো হয়তো এখনই বাড়ির উদ্দেশ্যে তাদেরকে রওয়ানা দিতে হবে। কিন্তু নিশান জানালো এই রাতে তারা আর যাবেনা। একদম ভোরেই বাড়ি ফিরবে। শৈলীও মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছে। একটা রাত আকাশ ভাইয়ের বাড়িতে থাকাই যায়। কিন্তু তাই বলে ঘুমন্ত আকাশের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে কী? শৈলী এবার পাশ থেকে নিশানের বাহু ঝাঁকিয়ে মৃদু সুরে বলল,

—" নিশান ভাই, আকাশ ভাইয়া তো ঘুমোচ্ছে। উনার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?"

নিশান দৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হলো। আকাশ অনেক জোরে জোরে নাক ডেকে নিজের ঘুমন্ত অবস্থা বর্ননা করতে চাইছে। নিশান এবার চোখ সরু করে ম"রার মত পড়ে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে শৈলীকে আদেশ ছুঁড়ে দিল,

—" রান্নাঘর থেকে ঝাড়ু টা নিয়ে আয় তো!"

শৈলী মুখ কুঁচকে ফিসফিস করে বলল,

—" সেকি? কেনো?"

নিশান চোখ গরম করে শৈলীর দিকে তাকালে চুপসে যায় বেচারি। মাথা নিচু করে নখ খুটতে খুটতে বেরিয়ে যায় রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে। ধীর পায়ে ফিরে আসে, হাতে ঝাড়ু। এক হাতে ঝাড়ুটা বাড়িয়ে দেয় নিশানের দিকে, চোখে মুখে বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন, সংশয়ের ছায়া নিয়ে নিচু গলায় বলে

—"এই ঝাড়ু দিয়ে আপনি কী করবেন এখন?"

নিশান তখনো আগুন-চোখে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। চাদর মুড়ি দিয়ে মস্ত "ঘুমিয়ে থাকা" নাটক করছে বেচারা। নাক ডাকার শব্দ এতটাই জোরে যে পাশের বাসার কুকুর পর্যন্ত ঘেউ ঘেউ বন্ধ করে দিয়েছে, ভয়ে। গলা পর্যন্ত চাদর তুলে রেখেছে, এক হাতে বালিশ জড়িয়ে রেখেছে বুকের সাথে, মুখে শান্তির রাজ্য।

নিশান মুখে রহস্যময় হাসি টেনে ফিসফিস করে বলে,

—"এই ঝাড়ু দিয়েই আমি একটা জাতীয় ষড়যন্ত্র দমন করতে যাচ্ছি। একটু সরে দাঁড়া। ইতিহাস রচনা হবে এখন।"

শৈলী হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, আর নিশান হঠাৎ করে ঝড়ের বেগে এগিয়ে যায় আকাশের দিকে। শৈলী চুপচাপ পাশ থেকে দেখে, মনে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি নামছে, অস্ত্র হাতে। ঝাড়ুর প্রথম ঘা, এক মোক্ষম বাড়ি পড়ল আকাশের কোমরের নিচে।

আকাশ "আআ" করে চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে ওঠে, তারপরই আবার গড়াগড়ি দিয়ে পড়ার ভান করে,

—"আমি ঘুমোচ্ছি ভাই, ওফ্! ঘুমোচ্ছি কইতাছি! নিশানের বাচ্চা মা"রিস না রে! ও আল্লাহ, এই রাত বেরাতে অ"ত্যা"চার করতেছে রে! ঘুমন্ত মানুষকে নি"র্যাতন করলে পাপ হবে রে নিশান! "

নিশান এবার ঝাড়ুর স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

—"ঘুমোচ্ছিস হ্যাঁ? নাটকবাজ কোথাকার! শৈলীকে তুই ডেকে এনেছিস না হ্যাঁ? ভাবছিস আমি জানি না? ওকে এত রাতে কে খবর দিয়েছে? বলদ পেয়েছিস আমায়? পিটিয়ে তোর পা'ছার চামড়া লাল করে দেব আমি!"

শৈলী ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা নিচু করে হেসে ফেলল ফেলল। তবে একটু কষ্টও হলো। সর্বনাশ! তাকে যে এখানের খবর টা রিমি দিয়েছে। আকাশ তো কিছুই বলেনি। আহারে! বেচারা আকাশ ভাইয়া শুধু শুধু মা"র খাচ্ছে!

আকাশ ঝটপট চাদর মুড়িয়ে বলে,

—"ভাই, ভাই, প্লিজ! এটা বন্ধ কর! আমি তোকে ভালোবাসি ভাই! তুই তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড!"

নিশান থেমে বলল,

—"তুই হলি আমার শত্রু, জাতশত্রু! তোকে বেস্ট ফ্রেন্ড বানিয়ে জীবনেই ভুল করলাম! কে বলেছে শৈলীকে এখানে নিয়ে আসতে? পাকনামো করেছিস কেনো? ওটাকে এখানে এনেছিস কেনো তুই? আমি তো ভেতরে বসে কষ্টের গান শুনছিলাম! একটু দেবদাস হয়েও থাকতে দিলি না!"

আকাশ এবার ঝাড়ুর খপে ধরা অংশটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,

—" ভাই, ট্রাস্ট মি, আমি যদি তোর "ওটাকে" না ডাকতাম, এখনো অগ্নিদাহ মার্কা গান শুনে বালিশে চোখ মুছতিস! ভাইরে... প্রেমে পড়লে মানুষ এমন হইয়া যায়! কথাটা বিশ্বাস কর। তোর কষ্ট দেখতে না পেরেই তো খবর পাচার করেছি! এটাকে ভালুপাশা বলে! টুরু লাভ!"

নিশান চোখ বড় করে রেগে তাকালে আকাশ মেকি হাসে শৈলী পাশ থেকে হাসি চেপে এখন আর পারছে না, সে হঠাৎ বলে উঠে,

—"আকাশ ভাইয়া, আপনি তো বলেছিলেন নিশান ভাই ‘টাইটানিক’ টাইপ রোমান্টিক নন, এখন তো দেখছি উনি ঝাড়ু হাতে ‘ভিলেনিক’! বিষয়টা কিউট না? তবে কথা হলো, খবর তো আপনি দেন নি! খবর তো আমায় দিয়েছে...

আঁতকে উঠলো আকাশ, সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠলো,

—" মুখ বন্ধ কর রে মা। দেখছো যে ঝাড়ুর পিটা খাচ্ছি, তার উপর ঘি ঢালছো কেনো? যা বলতে চাইছো, তা বললে আমাকে টুকরো টুকরো করে কে"টে জ্যান্ত এখানেই পুঁতে দেবে!"

শৈলী বোঝার ভঙ্গিতে ওও করে ঠোঁটে আঙুল রাখলো, যার অর্থ সে চুপ থাকবে। আকাশ হতাশ মুখে বলে,

—" এ আমি কাদের জন্য কী করলাম? এই মেয়েটাও ওর দলে গেল! আমি আজ একা। আমার বাঁচার অধিকার নাই!"

নিশান থামছে না। একের পর এক ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করতে করতে চেঁচাচ্ছে,

—"তোর মত অভিনয়শিল্পীকে তো নাটকে নামানো উচিত ছিল রে! ঘুমের নাটক করিস হ্যাঁ? আমায় বোকা বানাতে চাস? পিকচার তুলিস, ভিডিও করিস, তোর সাহস তো কম না!"

আকাশ তখন উঠে দাঁড়িয়ে এক হাত মাথায়, এক হাত কোমরে রেখে বলছে,

—"আরে ভাই! এটা আবার কেমনে বুঝলি বাপ? বিশ্বাস কর ভিডিও করিনি, দুটো ছবি তুলেছি শুধু! ছবিগুলো প্রিন্ট করে তোর বাসর ঘরে লাগিয়ে দেব প্রমিজ! আর আমি তো নাটক করিনি, ঘুমিয়ে গেছিলাম। একটু সাউন্ড এফেক্ট বেশি হয়ে গেছিলো হয়তো...!"

—"চুপ! সাউন্ড এফেক্টের নামে ট্রেন ছাড়তি! এখন দেখ সাউন্ড অফ!"

বলেই আবার একটা ঝাড়ু ঘাড় বরাবর পড়ল! শৈলী তো পাশে দাঁড়িয়ে হাসি চেপে রাখতে রাখতে শেষ। এক সময় আর থাকতে না পেরে সোজা হেসে গড়িয়ে পড়ে বিছানায়। হাসির ফাঁকে ফিসফিস করে বলল,

—"আকাশ ভাইয়া তো এখন নিশান ভাইয়ের প্রেমের লাঠির প্রথম ভিকটিম!"

আকাশ মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—"এই মেয়েরাও কিছু না, নিজেদের প্রেম হয়ে গেলে পরে আমরাই হয়ে যাই জুতোর তলা! শৈলী তুমি দেখছি বেইমানি করছো আমার সাথে। নিজের রোমিও কে থামাতে পারছো না?"

শৈলী মিনমিন করে বলল,

—" মাফ চাই ভাইয়া। আমি আবার নিশান ভাইয়ের দলে থাকতে সেফ ফিল করি।"

আকাশ হতাশ চোখে তাকালো শৈলীর দিকে। চিন্তিত হলো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তার ছোন্টুমন্টু রিমিও যদি এর মত হয়, তাহলে তো বিপদ! বলা যায় না! হতেও পারে! একই রক্তের বোন বলে কথা! এমন বেইমানি করলে তো নিশানের হাতেই একদিন জান যাবে আকাশ খানের।

নিশান ঝাড়ু থামিয়ে দাঁত বের করে হাসল,

—"তোর জন্যে একটা মেডেল বানাচ্ছি, বিশ্ব নাট্য দিবসে বিশেষ ভূমিকা রাখায় আজীবন সম্মাননা’!"

আকাশ চাদর গায়ে জড়িয়ে মুখে কষ্টের ভঙ্গি এনে বলল,

—"ভাইরে.. আমি তোকে শুধু ভালোবেসেছিলাম, এত ঘৃণা পাইলাম ক্যান! অভিশাপ দিলাম, বাসর রাতে তুই বাসর করতে পারবিনা!"

নিশান চোখ সরু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। শৈলী বিষম খেলো সহসা,লজ্জা পেলো খানিক। নিশানের দৃষ্টি দেখে আবার মেকি হাসলো আকাশ। বুঝতে পারল, বন্ধু তার এ বিষয়ে সিরিয়াস। তাই বলল,

—" হে হে, না মানে, বাসর রাতে বাসর করতে পারবি। কিন্তু বাসর রাতের পরের দিন বউয়ের দেখা পাবি না শালা। অভিশাপ দিলাম, পুরো একটা দিন বউকে চোখে দেখতে পাবিনা। হা হা হা!"

নিশান এবার একটুও রাগ না করে হাসতে হাসতে বলল,

—"তুই থাকলে এই জীবনে কষ্ট থাকবেই। কিছু করার নেই। বাট, ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, তোর অভিশাপ আমার লাগবেনা। আজকের রাতের ঝাড়ু কোটা শেষ। এখন শুয়ে পড়!"

আকাশ চুপচাপ শুয়ে পড়ে, এক হাত দিয়ে পিঠ ঘষতে ঘষতে বলে,

—"শুয়ে পড়লাম ভাই, শুধু বলো, কাল থেকে আবার বন্ধু হিসেবে গণ্য করবা তো?"

নিশান বলে,

—" আমি কালকে তোর একটা ব্যবস্থা করব আকাশ।ভাবিস না ছেড়ে দিয়েছি! শৈলীকে এত রাতে এখানে আনতে, তোর যে একার হাত নেই, তা আমি খুব ভালো করেই জানি। নিশ্চয়ই তুই আরো কারো সাহায্য নিয়েছিস। তোর সাথে আরো একজন আছে। বিষয়টা খুটিয়ে দেখতে বাধ্য করিস না আমায়! কেঁচো খুঁজতে গিয়ে সাপ যে বের হবে তা আমি জানি!"

শৈলী ভ্রু কুঁচকে নিশানের কথা শুনলো। কিছু একটা ভাবল, এরপর আকাশের দিকে তাকাতেই, আকাশ চোখের ইশারায় শৈলীকে বলতে মানা করল। এতক্ষণে হুঁশ ফিরল শৈলী। নিশানের চিন্তায় বিষয়টা খেয়ালই করেনি সে। আসলেই তো! রিমি কীভাবে খবর পেলো যে নিশান আকাশের বাড়িতে। আর কেনো আকাশের থেকে খবর পেলো যে নিশান তার বাড়িতে! এত রাতে রিমির সাথে আকাশের কথা হবে কেনো? তাহলে কি সত্যি ওদের মধ্যে কিছু চলছে! আকাশের কথা চিন্তা করে এ বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল শৈলী। থাক, কিছুই বলবে না সে। এ বিষয়ে একটু চিন্তা করে বড় করে শ্বাস ফেলতেই ভ্রু কুঁচকে ফেলে শৈলী।

ঘরে সিগারেটের গন্ধ পেতেই কেশে উঠে বলে,

—" আকাশ ভাইয়া, ঘরে সিগারেটের গন্ধ কেনো? আপনি সিগারেট খেয়েছেন?"

এ পর্যায়ে খুশিতে চোখ জ্বলজ্বল করল আকাশের। বাঁকা হেসে তাকালো নিশানের দিকে। নিশান ঠোঁট কাঁমড়ে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখে তেলতেলে হাসি মেখে কৌশলী ভঙ্গিতে উঠে বসল আকাশ। নিশান তখনই বুঝে গেল, এবার আকাশ তার ঝাড়ু-জ্বালা ভুলে প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছে।

আকাশ ভ্রু উঁচিয়ে অভিনয়ের ভঙ্গিতে কাশতে কাশতে বলল,

—"উফ! সত্যি বলতে কি শৈলী, আমিতো সিগারেট খাই না জানোই তো। সিগারেটের গন্ধে আমার এলার্জি হয়, পেট ঘুলিয়ে উঠে। আমি তো ঠিকমতো নিঃশ্বাসও নিতে পারছি না!"

বলেই কাশতে কাশতে নিশানের পাশ থেকে এক গজ দূরে গিয়ে বসে পড়ল। এ পর্যায়ে নিশান চোখ বড় করে আকাশকে চুপ থাকতে ইশারা করল। কিন্তু এতক্ষণ ঝাড়ুর পিটানি খাওয়া আকাশ প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে চুপ থাকলো না, ভীষন অসহায় ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

—" তুমি তো জানোই শৈলী, এ ঘরে আমি ছাড়া এতক্ষণ কে ছিল?"

শৈলী সাথে সাথে অনুভূতিশূন্য চোখে তাকায় নিশানের দিকে। নিশান চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেলে, যার অর্থ আকাশ মিথ্যে বলছেনা। আকাশ আবারো বলে,

—" বিশ্বাস করো, আমি মানা করেছিলাম। কিন্তু ও শোনেই নি। কতগুলা সিগারেট খেয়েছে তুমি কল্পনাও করতে পারবেনা!"

শৈলী তখন গম্ভীর মুখে নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"নিশান ভাই আপনি সিগারেট খেয়েছেন? আপনি তো বলেছিলেন আপনি এগুলো ছেড়ে দিয়েছেন! আপনি জানেন তো আমি এগুলো একদম সহ্য করতে পারি না! মিথ্যে বলেছিলেন আমায়?'

নিশান এক মুহূর্ত থতমত খেয়ে গেল, তারপর চোখ রাঙিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"তুই শালা এক নম্বর নাট্যকার! আমি খেয়েছি, তো তুই কিসের গন্ধে শ্বাস বন্ধ করে ছিলি? আমার খাওয়ার পর তো তুই জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলি, ঐ দিক দিয়ে বাতাস যাইই না!"

আকাশ ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,

—"তুই খেয়েছিস এটা নিজেই স্বীকার করলি, ব্যস! আমি কিছু বলিনি! তুমি এত বড় ভালোবাসার দৃশ্য রেখে শেষে সিগারেট! ছি ছি ভাই, ছি ছি! তুই শৈলীকে দেয়া কথা ভঙ্গ করলি? তোর কাছ থেকে আশা করিনি নিশান!"

শৈলী এবার সত্যি মন খারাপ করল। অসহায় চোখে একবার নিশানের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। তবে রাগ হলো না। অপরাধবোধ অনুভব করল! তার জন্যই তো নিশান ভাই সিগারেট ছুঁয়েছেন। দোষটা তো তারই। শৈলীকে মন খারাপ করতে দেখে ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ গরম করে আকাশের দিকে তাকালো নিশান। ইশারায় বুঝিয়ে দিল —খবর আছে তোর। আকাশ এবার সুযোগ বুঝে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। এসবে সে আর নেই! আগুন ধরাতে পেরেছে। এটাই অনেক! খুশি লাগছে তার! হে হে! এবার নিশান বাবাজি বুঝবে কত ধানে কত চাল!

আকাশ বাথরুমে ঢুকলে হাতে থাকা ঝাড়ুটা তৎক্ষনাৎ অদূরে ছুঁড়লো নিশান। এগিয়ে আসলো শৈলীর দিকে। নিচু করে রাখা মাথাটা একবার দেখে নিয়ে এক হাত গালে রেখে মুখটা উঁচু করে ধরল। শৈলী পিটপিট করে তাকালো নিশানের দিকে। নিশান ঠোঁট ভিজিয়ে নিস্তেজ গলায় বলল,

—" সরি। আমি জেদের বশে খেয়েছি। তোর উপর রাগ হয়েছিল। তাই তোর অপছন্দের কাজটা করেই শান্তি লাগছিল। রাগ করিস না। বেশি রাগ হলে অবশ্য বকতে পারিস আমায়!"

শৈলী নিশানের চোখে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু চোখ দুটোতে যেন একরাশ কষ্ট জমে আছে। তারপর হঠাৎই নিশানের হাতটা নিজের গালে থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের দুহাত দিয়ে ধরে ফেলল। নরম গলায় বলল,

—" না, বকবো না। বরং.. সরি। আমি-ই বোকা ছিলাম। দোষ আমারই! নিজের আবেগে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি। আপনি যে কেমন রাগী আর জেদী, সেটা তো জানিই। বুঝেও বুঝিনি আমি। নিজেই তো চলে গিয়েছিলাম, আপনাকে না জানিয়ে। তাতে আপনি এতটা কষ্ট পাবেন, এমনটা ভাবিনি। আমার জন্য আপনি আবার সিগারেট ছুঁয়েছেন, এটাতেই মনটা ভারী হয়ে গেল। আমার কারণে আপনি নিজেকে কষ্ট দিয়েছেন..আমি খুব দুঃখিত, নিশান ভাই।"

নিশান কিছু বলল না, শুধু তাকিয়ে রইল শৈলীর চোখের দিকে। এবার শৈলী আবার বলল,

—" সিগারেট ছুঁবেন না নিশান ভাই। ভালো জিনিস না ওটা। কখনো ছুঁবেন না, না রাগে, না দুঃখে, না কষ্টে। প্লিজ!"

নিশান এবার একটানা শৈলীর চোখে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। এরপর বাধ্য ছেলের মত বলল,

—" ঠিক আছে।"

শৈলী খুশি হলো। মুচকি হেসে মাথা নিচু করতেই নিশানের মাথায় হুট করে একটা দুষ্টু বুদ্ধির উদয় হলো। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো,

—" সিগারেট ছোঁবো না। তবে একটা শর্ত আছে। সিগারেটের বদলে অন্য একটা জিনিস খেতে দিতে হবে?"

শৈলী উদগ্রীব হলো, আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—" কী জিনিস, নিশান ভাই?"

নিশান এবার গভীর চোখে তাকালো শৈলীর দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা এক পলকের দেখে নিল তিড়তিড় করে কাঁপতে থাকা মেয়েলি ঠোঁটজোড়া। এরপর আবারো শৈলীর চোখের দিকে তাকালো। একটু ভাবতেই ফিক করে হাসলো নিশান। এখন যেটা ওর মনে চলছে, তা যদি শৈলীকে সত্যিই বলে তাহলে লজ্জায় আর শৈলী তার সামনেই আসবেনা। তাই আপাতত বিষয়টা মুখে বলতে চাইলো না নিশান। শৈলীর কপালে দু আঙুলে টোকা দিয়ে বলল,

—" কিছু না! "

-------------------

সকাল বেলা আকাশসহ নিশান আর শৈলী বাড়িতে পা রাখতেই হতবাক হয়ে গেলো। সবচেয়ে বেশি অবাক হলো নিশান। কারন তালুকদার নীড় আবারো সাজানো হয়েছে, কয়েকজন আত্মীয় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় কথা কাজী এসে বসে আছে ড্রয়িং রুমে।

এসব দেখে মাথা ঘুরতে শুরু করল নিশান আর শৈলীর। একে অপরের দিকে অবাক হয়ে তাকাতেই নাসিরুল তালুকদার হুংকার ছুঁড়লেন,

—" তোমাদের একেকজনের নাটক দেখে আমি ক্লান্ত। সত্যি বেশ ক্লান্ত! তালুকদার বাড়ির ছেলে-মেয়েরা এত নাটক করে কেনো! কোথ থেকে শিখেছে এখনো ভেবে পাইনা আমি। একজন এক্সিডেন্ট করে হসপিটালে পড়ে থাকে, আরেকজন রাগ করে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। আরেকজন আবার তাকে ফিরিয়ে আনতে রাত-বেরাতে ছুটে যায়। এগুলো আর নিতে পারছিনা! তাই তোমরা এই মুহুর্তে বিয়ে করবে। যত ভন্ডামি করার বিয়ের পর একসাথে করো। তোমাদের চিন্তা আমরা আর নিতে পারছিনা!"

সহমত পোষণ করল বাড়ির প্রত্যেক সদস্য। মাথা উপর-নিচ করে বোঝালো তারা আসলেই এসব নিতে পারছেনা। নিশান ভ্রু কুঁচকে শৈলীর দিকে তাকালে সে কাঁধ উঁচিয়ে বোঝায় সে কিছুই জানেনা। তবে মনে মনে সন্তুষ্ট হলো নিশান। ওরা ব্যবস্থা না করলেও নিশান আজকের মধ্যেই বিয়ের কাজ সেড়ে ফেলতো। সবাই আগে থেকে আয়োজন করে ওর কাজ এগিয়েই দিল বরং।

আকাশের আনন্দ দেখে কে! সবাই যে যার মত আয়োজন করতে শুরু করে দিল। রিমি আর মিমি এসে শৈলীর হাত টেনে ধরল,

—" চল বোইন, একটু সাজিয়ে দিই তোকে! "

শৈলী চোখ বড় করে তাকালো। নিশান এবার রিমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

—" আমার ঘরের আলমারিতে একটা সাদা রঙের শপিং ব্যাগ আছে। মেরুন রঙের একটা শাড়ি পাবি ওখানে। ওটা পড়িয়ে দিস। আর সাজগোজ বেশি করাস না!"

রিমি আর মিমি ফিক করে হাসলো একসাথে। তারপর মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলল। শৈলীর হাত টেনে নিয়ে গেলো উপরে। কিছু বলার সুযোগটাও পেলো না বেচারি শৈলী। এদিকে খাদিজা তালুকদার নিশানকে বললেন,

—" তোদের ভুল বোঝাবুঝি মিটেছে?"

নিশান মাথা নেড়ে বলল,

—" হুম, তা তো মিটেছে। কিন্তু তোমার ভাগ্নী সীমা কে আমি একটু টাইট দেব মা। ওই মেয়ে কিন্তু কাজটা ঠিক করেনি। পুরো ঘটনা শুনলাম আকাশের কাছে। এসব আসলেই আশাজনক নয়!"

খাদিজা তালুকদার ঠোঁট কামড়ে একটা রাগী হাসি দিলেন, বললেন,

—"সীমা তোকে ওর মতো করেই বিচার করেছিল। তবে তোর আর শৈলীর সম্পর্কটা দেখে এখন আর কিছু বলার সাহস পাবে না। টাইট দিতে হলে আগে আমাকে বলিস, আমি পাশে থাকব।"

নিশান হেসে বলল,

—"না মা, সীমার দরকার একটু শিক্ষা। তবে সেটা আমি তোমার বাড়ির মেয়ে হিসেবে না, একজন মানুষ হিসেবে দেব। অহংকার আর কূটচাল খারাপ, সে ভুলে গিয়েছিল। মনে করিয়ে দিতেই হবে।"

খাদিজা এবার ভ্রু কুঁচকে বললেন,

—"তোর গলায় বেশি নরম সুর বাজছে না নিশান? এটা কি শৈলীর প্রভাব নাকি?"

নিশান এবার মুচকি হাসল,

—"তুমি বলো মা, এ অবস্থায় মানুষ নরম না হয়ে কী হয়? তবে ভয় নেই, তালুকদার বংশের গরম রক্ত ঠিকই আছে। শুধু শৈলী ছাড়া আর কারো সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে মন চায় না। স্পেশালি মেয়ে!"

এদিকে রিমি আর মিমি শৈলীকে সাজাতে ব্যস্ত। রিমি ব্যাগ থেকে শাড়ি বের করে চমকে উঠল,

—"বাপরে! কত্ত সুন্দর রঙ! শৈলী, তোর জন্য যে শাড়ি আগে থেকেই রেডি ছিল! বুঝতেই পারিস, কত্তটা সিরিয়াস ছিল নিশান ভাই!"

শৈলী চোখ পিটপিট করে তাকালো। শপিং করার পর কেনা শাড়িটা তাহলে নিশানের কাছে ছিল? আর এদিকে সে কোথায় খুঁজে পাচ্ছিল না।

আকাশ তখন ড্রয়িং রুমের কোণে বসে ঘাড় চুলকাচ্ছে, ফিসফিস করে বলল,

—"আমি কবে এই লাইন ক্রস করবো আল্লাহ্ জানে.. বিয়েটা আমারও করা দরকার, একটা মেয়ে দরকার, না না, রিমি-টিমি না, নতুন কাহিনি লাগবে।"

হঠাৎ পেছন থেকে মিমির ঠকঠক করে হেঁটে আসার শব্দে আকাশ সোজা হয়ে বসল। মিমি কড়া চোখে তাকিয়ে বলল,

—"আকাশ ভাই, আপনি আবার রিমির নামে কীসব বললেন, আমি কিন্তু শুনেছি!"

আকাশ মুখে হাত দিয়ে চুপ করে রইল, মনে মনে বলল, সর্বনাশ করেছে। অথচ মিমি মুচকি হেসে প্রস্থান নিল। এ পর্যায়ে ভয়ই পেলো আকাশ। তার মানে, রিমির সাথে রিলেশনের বিষয়টা মিমিও জানে? বিষয়টা তবে কী দাঁড়ালো, নিশান ছাড়া বাদ-বাকি মোটামুটি সবাই জানে। এখন নিশান জানলেই কেল্লাফতে! বিষয়টা নিয়ে বেশ চিন্তিত হলো আকাশ। ভালোয় ভালোয় নিশানের বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর এ বিষয়ে একটু কলকাঠি নাড়াবে সে।

বিকালের মধ্যে সমস্ত রীতিনীতি শেষ করে তিন কবুল বলার মাধ্যমে শেষ হলো বিয়ে। অবশেষে মিলন হলো নিশান-শৈলীর। পড়ন্ত বিকেলে কবুল করল একে অপরকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। লাইটের রোশনাইয়ে আলোকিত হয়ে উঠল পুরো বাড়ি। অতিথিদের আনাগোনা কমতে না কমতেই বর-কনের নতুন জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো একান্ত হয়ে উঠতে লাগল।

নিশান, শৈলীকে কিছুক্ষণ ড্রয়িং রুমে বসানোর ব্যবস্থা করা হলো। শৈলী বেশ নরম অথচ ক্লান্ত মুখে বসেছিল সোফার এক কোনায়। লাল শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে পিছলে পড়ছিল বারবার। ওড়নাটা সঠিকভাবে গুছিয়ে নিতে নিতে সে চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করছিল দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিশানকে। যাকে এই কিছুক্ষণ আগেই স্বামী বলে কবুল করেছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ও, মুখে কোনো কথা নেই,শুধু দু’চোখে চাপা এক বিস্ময় আর শ্রদ্ধার গাঢ় ছাপ।

নিশান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। ঠোঁটে কেবল একটুকু হাসি, চোখে এমন এক উষ্ণতা যা যেন বলে দেয়, এই মুহূর্তটা সে কতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করছে। সোফার সামনে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,

—" বউ বউ লাগছে তোকে!"

শৈলী ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা নামালো। তার নিজেরও সেটাই অনুভব হচ্ছে। নিশান এবার শৈলীর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—" আমার ঘরে আসার আগে সব সাজ উঠিয়ে ফেলবি। লিপস্টিক যেন ঠোঁটে না থাকে। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টেইস্ট লিপস্টিক। পারলে চকলেট ফ্লেভারের লিপবাম টা দিতে পারিস। ওটা আমার ফেভরেইট!"

শৈলী একটু কেশে উঠে চোখ নামিয়ে ফেলল। বাসর ঘরে ঢোকার আগেই নিশান তালুকদার ঠোঁটের লাগাম খুলে ফেলেছে! কি সর্বনাশ! এ তো বিপদের ২৩৩ নম্বর সংকেত! ভয়ানক সংকেত যে এটা! সামলাতে বেশ ভালোই বেগ পোহাতে হবে৷ তবে কি আজকের রাতটা সত্যি সত্যি বেশ বিভীষিকাময় যাবে? আতঙ্কে শুকনো ঢোক গিলে নিল শৈলী। তার যে বহুদিনের ইচ্ছে নিশানের সাথে বাসর রাতে সারারাত গল্প করা! বিষয়টা জানালে হয়তো নিশান তালুকদার বিবেক-বিবেচনা করতে পারে! কিন্তু সে সুযোগ দিলে তো!

চলবে.......

💀 খাপছাড়া পর্ব লিখেছি! আর লিখতে পারলাম না। বাসর রাতের পর্ব নেক্সটে🫶

⚠️ বাট..দয়া করিয়া ৭০+ বয়সের এর নিচে কেও পরবর্তী পর্ব পড়বেন না😞 পরে লজ্জায় কম্বলের তলায় ঢুকলে কতৃপক্ষে দায়ী নয়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন