#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া
#পর্ব_১৮
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
—⚠️— বাসর রাত স্পেশাল! রোমান্টিক পার্ট❤️🔥, চাইলে স্কিপ করতে পারেন।—
শৈলীর ভীষণ পানি পিপাসা পেয়েছে। এই মুহুর্তে তার মনে হলো কেও এক জগ ঠান্ডা পানি তার সামনে ধরে রাখলে, নির্দ্বিধায় সেটা এক পলকে শৈলীর পেটে চলে যাবে। এর আগে নিশানের ঘরে অনেকবার এসেছে শৈলী, উঁকি দিয়েছে অগণিতবার। তবে আজকে একটু নয়, বরং পুরোটাই ভিন্নরকম। কারন, রিমি, মিমি আর আকাশ মিলে নিশানের সাদামাটা সুন্দর ঘরটাকে ফুলের সমাহারে সজ্জিত করে সাজিয়ে তুলেছে আকর্ষণীয় করে। আলো জ্বালানো নেই ঘরে। তার বদলে রয়েছে ডিম লাইটের ন্যায় কিছু ক্ষীণ আলো, যা পুরোপুরি আলোকিত না করলেও একটা সুন্দর আবেদনময়ী পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এসব না হয় কোনোমতে কষ্ট করে মেনে নেয়া যায়, কিন্তু নিশানের নরম তুলতুলে বিছানাটাতে যে এতগুলো গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। এসবের আবার কি দরকার ছিল? এটা দেখে আরো বেশি ভয় লাগছে শৈলীর। অজানা পরিচিত আতঙ্কে ঠোঁট কাঁমড়ে ধরছে বারংবার। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখল, ঘড়ির কাঁটা বারোটার কাছাকাছি। আশ্চর্য! লোকটা এখনও ঘরে এলো না কেনো। সেই যে রাতের খাবারের পর সাজগোজ উঠিয়ে রিমি তাকে নিশানের ঘরের বিছানায় একদম মাঝখানে বসিয়ে ঘোমটা দিয়ে চলে গেলো, তখন থেকে শৈলী এভাবেই বসে রয়েছে।
শৈলীর ভাবনার মাঝেই তাকে চমকে দিয়ে খট করে দরজায় শব্দ হলো। দরজার হ্যান্ডেলের শব্দে শৈলীর বুক ধক করে উঠলো। নিঃশব্দে গিলে ফেলল ঢোক। ঠোঁটের কোণা কামড়ে হাতজোড়া শক্ত করে বসে রইল আগের অবস্থানেই। গলার কাছটা শুকিয়ে গেছে তার। পানির কথা যেন মনে পড়ে গেল আবার। কিন্তু সেই পিপাসার থেকেও ভয়টা যেন এখন বড় হয়ে উঠেছে।
ধীরে দরজা খুলে গেল। শৈলী তো জানেই কে এসেছে! তবুও লোভী চোখজোড়া আড়চোখে দেখে নিল মেরুন রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত নিশানকে। হালকা হলুদ আলোয় ঝাপসা হয়ে দেখা গেল তাকে। তবে তার হাতে পানির বোতল, অন্য হাতে একটা ছোট ট্রে, তাতে দুইটা গ্লাস আর ছোট্ট এক পাত্রে কিছু খেজুর রাখা। হাতের জিনিসপত্র টেবিলে রাখলো সে।
নিশান চোখ তুলে তাকাল, তার নতুন বউ ঠিক যেমন ছিল, তেমনই বসে আছে, ঘোমটা নামানো, চোখ নামিয়ে। যেন চোখ তুলে তাকালেই সব কিছু বদলে যাবে। নরম পায়েই কাছে এসে দাঁড়াল সে। শৈলী এবার বিছানা থেকে ধীরে সুস্থে নেমে নিশানের পা ছুঁয়ে সালাম করতে চাইলো, আটকালো নিশান। হাত জোড়া ধরে দাঁড় করালো সন্তপর্ণে। মুখে বলল, লাগবেনা। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক হাত উঠিয়ে শৈলীর মাথায় রাখলো, শৈলী বুঝলো না নিশানের অভিব্যক্তি। তবে মানুষটাকে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করতে দেখা গেলো। কোনো সূরা পড়ছে মনে হয়। সূরা পড়তে পড়তেই একটা খেঁজুর শৈলীর হাতে দিয়ে খেতে বলল, শৈলী কোনোমতে চোখ উঠিয়ে চোখ বুঁজে বিড়বিড় করতে থাকা নিশানকে দেখল, আর খেঁজুরটা খেলো। লোকটাকে মন ভরে দেখলো! মেরুনরঙা পাঞ্জাবি তে মানুষটাকে যে কত সুন্দর লাগছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মত না। ফর্সা গায়ে কি সুন্দর করে এঁটে আছে পাঞ্জাবি টা। মানিয়েছে বেশ! শৈলীর মনে হলো মেরুন রঙটা নিশানের জন্যই তৈরী। নইলে এত মানানসই হবে কেনো? অন্য কাওকে তো তার কাছে এত মানানসই মনে হয়না!
এর মধ্যেই থমকালো শৈলী। কারন নিশান ইতোমধ্যে ওর হাত ধরেছে। এরপর কি হলো কে জানে! নিশান শৈলীর হাত ধরে টেনে বিছানার কাছে এসে বসালো। শৈলীও যন্ত্রের ন্যয় আসলো। এ পর্যায়ে সময় নিল নিশান। ঘোমটা তুলে দিল শৈলীর মুখ থেকে। লজ্জায় মাথা তুলল না শৈলী। নখ দিয়ে খুটতে থাকলো বিছানার চাদরের উপরে ছড়িয়ে থাকা গোলাপের পাপড়িগুলো। মুচকি হাসলো নিশান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মুখে বলল,
—" আশ্চর্য! এমন ভাবে লজ্জা পাচ্ছিস, যেন আগে কখনো আমায় দেখিস নি! "
অভিমানী চোখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো শৈলী। সাংঘাতিক ব্যাপার তো! নিশান তালুকদার বাসর ঘরেও এমন ভারিক্কি গলায় তার সাথে কথা বলছে। মনে মনে ভেঙচি কাটলো শৈলী, আবার মাথা নামিয়ে গোলাপের পাপড়ি খুটতে থাকলো। হুহ! একটু মিষ্টি করে কথা বললে কি জাত যায় নাকি!
শৈলীর এমন মুখ দেখে নিশান আবারো হাসলো। এক কদম এগিয়ে বসে দুহাত রাখলো শৈলীর দুগালে। এ পর্যায়ে টানটান হয়ে বসলো শৈলী। শিরদাঁড়া খাড়া হলো সহসা। এদিকে নিশানের দুহাতের চাপে কিছুটা ফুলে উঠলো শৈলীর গাল। সে নিশানের দিকে চোখ পিটপিট করে তাকালো। আজব তো! এত জোরে কেও দুগাল দুহাতের মাঝে নিয়ে চেপে ধরে! কি মুশকিল!
শৈলী ভেবেছিল নিশান কিছু বলবে। তবে অবাক হলো মুগ্ধ নয়নে নিশানের দৃষ্টিতে। নিশান অনেকটা কাছে এসে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলো শৈলীকে। এক পলকেই সবকিছু পড়ে নিল। কবি- র ভাষায় বলা ডাগর ডাগর চোখদুটো, খাঁড়া ছোট নাক, লাল হয়ে যাওয়া গাল, কপালে বিন্দু বিন্দু জমে থাকা ঘাম, সবটুকু নখদর্পনে নিল নিশান। এরপরে সময় নিয়ে দৃষ্টি তাক করল তিড়তিড় করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটদুটোর দিকে। কিন্তু এ পর্যায়ে পুরোপুরি ভ্রু কুঁচকে তাকালো নিশান, মুগ্ধতার রেশ কেটে গিয়ে কিছুটা ধমকে ভারি গলায় বলে উঠলো,
—" লিপস্টিক দিতে নিষেধ করেছিলাম!"
এতক্ষণ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ছিল শৈলী। এই সময়ে নিশানের এমন রাগান্বিত অভিব্যক্তির কথা কর্ণকুহরে পৌঁছালে নিশানের ভারি হাতের চাপে দেবে যাওয়া গাল নিয়ে মিনমিন করে বলল,
—" দিইনি তো। অল্প করে দিয়েছি।"
নিশান চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল শৈলীর দিকে, যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর গালের ওপর হাতের চাপটা একটু কমিয়ে দিলো। তবু হাত ছাড়লো না। ঠোঁটের কোণায় হালকা হাসি ফুটিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
—"তুই জানিস না, অল্প করে দিলেও সেটা আমার কাছে অনেক? আমি এখন আদর করব কোথায়?'
শেষ কথাটা শুনে কান গরম হলো, শৈলী মুখ নামিয়ে ফেলল। লজ্জায় নয়, কিছুটা অভিমানে। এক হাতে গাল থেকে নিশানের হাতটা আলতো করে সরিয়ে রেখে মাটির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
—" আপনি সবসময় রাগ করেন... আজকেও। আজ না হয় একটু সুন্দর হতে চাইলাম আপনার জন্যই, সেটাও খারাপ লাগলো আপনার?"
নিশান এবার সত্যি সত্যি বোকা বনে গেল। কিছুটা সময় লাগল বুঝে নিতে,এই মেয়েটা তাকে জন্যই সাজে, অথচ এতটুকু প্রশংসাও শোনে না! বরং ধমক খায়! নিজের ভেতরেই রাগ হলো নিজের ওপর। নিশান নিশ্বাস টেনে নিয়ে একটানে শৈলীকে কাছে টেনে আনল,এতটা কাছে, যেখান থেকে মিথ্যে বলা সম্ভব না। গলার স্বর কোমল করে বলল,
—"তুই এমনিতেই এত সুন্দর... কিচ্ছু লাগেনা তোর মুখে। আমি তো তোকে এই মুখেই দেখতে চেয়েছিলাম। ঘোমটার নিচে লুকানো সেই চোখ দুটো, অল্প কাঁপা ঠোঁট... এত কিছুই যদি নিখুঁত হয়, তাতে আর রং লাগানোর দরকার কী বল?"
শৈলী এবার চুপচাপ থাকলো। ঠোঁটে একটুখানি হাসি খেললো ঠিকই, তবে চোখে জলও টলমল করলো একসাথে। নিশান এবার সত্যিই কোমল হলো। হাত বাড়িয়ে শৈলীর চিবুকে আঙুল রাখলো, ধীরে মুখ তুলে ধরল নিজের দিকে। চোখে চোখ রেখে বলল,
—"আমার আর কিছু দরকার নেই। শুধু এই চোখ দুটো... এভাবেই যেন আমার দিকে চেয়ে থাকে সারাজীবন।"
শৈলী এবার আস্তে করে বলল,
—"আর রাগ করবেন না তো?"
নিশান হেসে মাথা নাড়ল,
—"তুই চুপ করে থাকলে করবো। বেশি মিষ্টি কথা বললে গলে যাবো।"
এ পর্যায়ে দুজনেই হেসে ফেললো। নিশান এবার শৈলীর মুখটা টেনে এনে কপালে লম্বা সময় নিয়ে চুমু খেলো। পুরো সময়টাই দম বন্ধ করে রইলো শৈলী। নাহ! এসব আর নেয়া যাচ্ছেনা! ধমকটাই ঠিক ছিল। তবে শৈলী আবিষ্কার করতে পারল, তার পিপাসা টা এবার মারাত্মক বেড়ে গিয়েছে। এতটাই বেড়েছে যে চাইলে এক জগ নয়, বরং এক সমুদ্র পানি গিলে ফেলতে পারবে এক নিমিষেই।
নিশান এবার সরে এলো। শৈলী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলো দুজন। তবে নিশান নিজের হাতের মুঠোয় শৈলীর কোমল হাতটা নিয়ে বাচ্চাদের মত নাড়িয়ে খেলতে থাকলো। চুপ করেই অনুভব করতে থাকলো মুহুর্তাটা। কিছু কিছু মুহুর্ত আসলেই নীরবেই সুন্দর। নিশান আজ সত্যি অনেক খুশি, তার হৃদয় প্রশান্তি তে বারবার সস্থির শ্বাস ছাড়ছে। কত ঝামেলা পেরিয়ে সে অবশেষে নিজের ঘরে হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া অনুভব করতে পারছে। চারপাশটা আজ একটু বেশি সুন্দর! আকাশটাও ঝলমলে!
নিশান এভাবে নীরবেই সারারাত পার করতে পারবে। তবে চঞ্চল চিত্তের শৈলীর পক্ষে তা সম্ভব নয়। সে এবার এক হাতে কানের পিছনে চুল গুঁজে দিয়ে ভীষণ লাজুক সুরে বলল,
—" পাঞ্জাবি বদলে শার্ট পড়বেন না নিশান ভাই? "
আজ যেন নিশানের মুখে লাগামের তালাটা কেও খুলে নিয়ে গেছে৷ সে নির্বিকার ভঙ্গিতে শৈলীর হাত ছুঁয়ে দিতে দিতেই বলল,
—" কেনো? শার্টের বোতাম খুলতে বেশি সুবিধা হয় তোর?"
এক মুহুর্তে কথাটার মানে ঠিক বুঝলো না শৈলী। কিন্তু দু সেকেন্ড সময় নিয়ে কথাটার গভীরতা ধরতে পেরেই খুকখুক করে কেশে উঠলো। এবার মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হলো বেচারির! এ কিসব বাজে কথা বলছে ভদ্র নিশান তালুকদার! ইনি নাকি ভদ্র-সভ্য মানুষ! শার্ট খোলা নিয়ে মোটেই চিন্তা করেনি শৈলী। সে তো সরল মনে বলেছে, ভেবেছে পাঞ্জাবি পড়ে গরম লাগতে পারে। শৈলীর অসস্তি বুঝে মুচকি হাসলো নিশান, গমগমে অপ্রস্তুত পরিস্থিতি টা মুছে ফেলতে হুট করেই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
—" আমার উপহার কোথায়?"
চমকালো শৈলী, বুঝতে না পেরে বলল,
—" হু? উপহার! কোন উপহার?"
নিশান ভ্রু কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
—" বাসর রাতে শার্ট খুলতে হয় জানিস, আর উপহার দিতে হয় জানিস না?"
শৈলী চোয়াল ঝুলিয়ে ফেলল। এ কি সর্বনাশ! তাকে তো কেও এ বিষয়ে বলেনি। আর শৈলীর জানামতে বাসর রাতে স্বামীরা উপহার দেয়। স্ত্রীদেরও দিতে হয় তবে! নিজের উপর রাগ হলো শৈলীর। ইশ! কী করে সে এমন একটা ভুল করতে পারল। মন খারাপ করে মাথা নিচু করল শৈলী। এমন একটা দিনে সে নিশান কে কিছু দিতে পারলনা? চুপ থেকেই বুঝিয়ে দিল নিজের অপারগতা। নিশান তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। শৈলীর নিচু করা মাথার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো, এরপর নিজের পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করল ছোট্ট একটা বাক্স।
শৈলী খেয়াল করেনি। নিশান ধীরভাবে শৈলীর হাতটা নিজের কোলের উপর টেনে এনে রাখলো। এরপর ছোট্ট বাক্সটা খুলে একেবারে নিঃশব্দে চিকচিক করতে থাকা হীরের আংটিটা বের করল। শৈলী প্রথমে বুঝতেই পারলো না কী হচ্ছে। বাক্সের দিকে তাকিয়ে একটু কপাল কুঁচকালো ঠিকই, কিন্তু চোখ বড় হয়ে গেলো তখনই, যখন নিশান নিঃশব্দে তার অনামিকায় সেই আংটিটা পরিয়ে দিল। শৈলী হতবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষন যেতেই শৈলী গুনতে পারছিল না আর! দম বন্ধ হয়ে এলো তার। তার চোখ বিস্ময়ে ছলছল করে উঠলো।
এ যে সেই আংটি! হুবহু সেই! যেটা সে সেদিন শপিং মলে এক ঝলক দেখেছিল। সেই কাঁচ ঘেরা জায়গাটার বাইরে থেকে চকচক করা আংটিটা দেখেই নিতে মন চেয়েছিল শৈলীর। তারপর সরে এসেছিল, কারণ আঙটিটা নিতে চাওয়া ভিত্তিহীন ছিল। অথচ সে তো নিশানকে বলেইনি কিছু..নিশান তো হয়তো দেখেওনি, তবে কীভাবে? তবে কি নিশান দূর থেকে লক্ষ্য করেছিল শৈলীর দৃষ্টি?
শৈলীর হতবাক হয়ে যাওয়া দেখে নিশান ঠোঁটের কোণে শান্ত এক চিলতে হাসি রেখে বলল,
—"তুই ভাবিস.....মুখে না বললে নিশান তালুকদার বোঝে না কিছু? আমি চোখে দেখি, মনে রাখি। কারণ তোর পছন্দটাই আমার প্রাধান্য। পছন্দ করেছিলি, আমায় মুখ ফুটে বলিসনি কেনো?"
শৈলী এবার সত্যিই চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। মাথা নিচু করে ফোঁটাফোঁটা জল ফেলতে লাগলো। মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু কাঁপতে থাকা কাঁধদুটো জানিয়ে দিল, ভেতরটা একেবারে গলে গিয়েছে তার। নিশান একটু সামনে ঝুঁকে কোমল গলায় বলল,
—" সেদিনই কিনে রেখেছিলাম। আজকে রাতের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার শৈলী একটা জিনিস পছন্দ করবে, আর সেটা তার হবেনা, তা তো হতে দেয়া যাবেনা। আমার সামর্থ্যের মধ্যে তোকে সবকিছু দেয়ার চেষ্টা থাকবে আজীবন। এটা দিয়ে প্রমাণ করে দিলাম... তোর দিকে আমি কেমন করে তাকাই, তোর কথা কতটা মনে রাখি, তুই আমার কাছে কী!"
শৈলী কাঁদতে কাঁদতেই মৃদু হেসে ফেলল। হাত দিয়ে চোখ মুছে বলল,
—"আমি তো কিছুই আনিনি... আমার গরীব, ফাঁকা হাত ছাড়া কিছুই নেই আপনার জন্য! কী দেব এখন আপনাকে?"
শৈলীর কন্ঠ ভীষন ভেজা শোনালো। সত্যি সে খুব অপরাধবোধে ভুগছে নিশানকে কিছু দিতে না পারার দুঃখে। নিশান এবার শৈলীর সেই হাতটা ধরে নিজের বুকে রাখলো। তারপর নিচু গলায় বলল,
—"এই হাতই তো চেয়েছি আমি... জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধরে রাখতে চাই শুধু এই হাতটাকেই। এর থেকে দামি আর কী হতে পারে?"
একটা নিঃশব্দ মুহূর্ত ছড়িয়ে গেলো ঘরে। ঘড়ির কাঁটার শব্দ, জানালার বাইরে থেকে ভেসে আসা নরম বাতাস, আর দুজন মানুষ, যারা এখন আর আলাদা নয়, এক হয়ে গেছে। শৈলী নিশানের এমন ভালোবাসা, এমন যত্ন টা সামলাতে পারল না৷ ভারি কাঁচের শাড়িটা কোনোমতে ঠেলে ঝাঁপিয়ে পড়লো নিশানের বুকের মাঝে। আজ আর বাকি দিনগুলোর মত দেরি করল না নিশান। সাথে সাথে দুহাতে আগলে ধরে জড়িয়ে ধরল স্ত্রীকে। মাথায় ঘোমটাটা একদম ফেলে দিয়ে খোপা করা চুলগুলো ছেড়ে দিল, মুখ ডোবালো ঘন চুলের মাঝে। দীর্ঘ নিঃশ্বাসে টেনে নিল চুলের ঘ্রাণ, আবেশে চোখ বুঁজে ফেলল। শৈলী নাক টেনে বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বলল,
—" এত ভালোবাসবেন না, নিশান ভাই। আমার সহ্য হবেনা তো। একটু কম করে ভালোবাসুন প্লিজ। হিসেব মতো ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে গেলে তো সমস্যা হবে। লেনদেনের বিষয়টা খুব বেশি জটিল হয়ে যাবে যে!"
নিশান নিঃশব্দে হেসে উঠল, একদম বুকের গভীর থেকে। শৈলীর চুলের ভেতরে মুখ লুকিয়ে থেকেও তার কণ্ঠস্বরে যেন একটা প্রশান্তি ঝরে পড়লো,
—"হিসেব করতে বসেছি নাকি আমরা, শৈলী? এই ভালোবাসায় কোনো হিসেব থাকে না। আমি তোকে ভালোবাসি, এই পর্যন্তই। এটা ফেরত চাওয়া কোনো চুক্তি না, এটা তো নিঃস্বার্থ এক সম্পূর্ণ দেওয়া। তুই শুধু থাকিস, এইটুকুই আমার পাওনা।"
শৈলী এবার একটু সরে এসে নিশানের মুখের দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই আবারও এক অদ্ভুত নরম ভাব এসে ছড়িয়ে পড়লো তাদের মাঝখানে। শৈলীর চোখে এখনও অশ্রু জমে, কিন্তু এবার আর সেটা কষ্টের নয় অভিভূতির। সে নিশানের গলায় হাত জড়িয়ে বলল,
—"আপনাকে যত ভালো ভেবেছিলাম, তত ভালো নন আপনি। আপনি একদম খারাপ! আমি তো কখনও কারো এমন ভালোবাসা পাইনি। জানেন? আমি তো ভাবতাম, আমার জন্য কেউ কখনো এমন ভাববে না, এমনভাবে দেখবে না। আমার জীবনে এসব হবেনা কখনো। আমি আপনাকেও ভালোবেসেছি, কিন্তু কাছে পাওয়ার স্বপ্ন দেখিনি!"
নিশান এবার শৈলীর কপালে হালকা চুমু দিয়ে বলল,
—"তাই নাকি? তা হলে এখন থেকে প্রতিটা মুহূর্তে তোকে বোঝাব, এসব তোর জন্যই লেখা ছিল। শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল, এই নিশান তালুকদারের আসার অপেক্ষা ছিল।"
শৈলী ফিক করে হেসে ফেলল। নিশান এবার বুড়ো আঙুলের সাহায্যেই মুছে দিল শৈলীর ঠোঁটে থাকা হালকা প্রলেপের লিপস্টিক টা। এবারে হিম ধরে গেলো শরীরে। নড়তে ভুলে গেলো শৈলী। আবেগে আপ্লূত হয়ে নিশানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এমন অবস্থানে আছে যে সরে আসতেও পারবেনা। তার কোঁমড় যে স্বয়ং নিশান চেপে ধরে আছে শক্ত করে।
শৈলী ভাবল নিশান বোধহয় এবার চুমু খাবে। তাই আগেভাগেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু অনেক সময় পেরিয়ে যাবার পরেও কিছু টের না পেলে শৈলী চোখ খুলল। খুলতেই আবারো আটকে গেলো নেশালো দৃষ্টির। আবারো মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে নিশান। শৈলী আড়ষ্ট হলো। ঠোঁট চেপে মিনমিন করে বলল,
—" কী দেখছেন এত? আগে তো এভাবে কখনো দেখতেন না!"
নিশান ধীরে হাত বাড়িয়ে ওর গালে একটুখানি ছুঁয়ে স্লাইড করে দিয়ে বলল,
—" কে বলেছে দেখতাম না! দেখতাম। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। শুধু ভয় পেতাম...যদি তোর চোখে পড়ে যায়, আর তুই ঘৃণা করিস সেই দৃষ্টিকে। আজ আর ভয় নেই...আজ থেকে তুই আমার, আর আমি তোর।"
শৈলীর চোখ টলটল করে উঠল। কিছু একটা বলার মতো করেও থেমে গেল। নিশান আবার বলল,
—" ম্যাডাম, আপনি যদি ক্লান্ত না হন, তাহলে একটু কথা বলি আপনার সাথে? এই নতুন জীবনের শুরুতে আপনাকে কিছু বলতে চাই... একেবারে হৃদয়ের ভিতর থেকে।"
শৈলী মাথা নাড়ল সম্মতির ইঙ্গিতে। নিশান ধীরে বসে পড়ল ওর পাশে। নতুন এক রাত শুরু হলো, ভালোবাসার, স্বপ্নের, আর অজানা ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ানোর। নিশান বসে শৈলীর হাত দুটো নিজের হাতে নিল। একেবারে হৃদয়ের গভীর থেকে উথলে আসা আবেগে মুখটা একটু নরম হয়ে উঠল। বাইরে রাত আরও গভীর, ঘরটা নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতায় নিশানের কণ্ঠ নরম কিন্তু দৃঢ় হয়ে উঠল,
—"শৈলী, আমরা দুজন আজ থেকে একসাথে চলবো। এই পথ শুধু আনন্দের হবে না। কষ্ট, ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, সবই থাকবে। আমি চাই, প্রতিটা ঝড় পেরিয়ে আমরা আবার একে অপরের কাছে ফিরে আসি। কখনও যদি আমার কোনো কথা তোর খারাপ লাগে, রাগ করে চুপ করে থাকবি না, প্লিজ।"
শৈলী চোখ তুলে তাকাল, তার চোখে জিজ্ঞাসা করল
—" আর আপনি? আপনি তো বেশি রাগ করেন!"
নিশান হালকা হাসলো।
—"আমি চুপ থাকবো না। আমি রেগে গেলে তুই মুখের উপর রাগ দেখাতে পারবি। আমি খুশি হলে তোকে আগলে রাখবো, দুঃখ পেলে তোকে বলে কাঁদবো। আমি এসব ভান করব না। কারণ আজ থেকে তুই আমার সবচেয়ে আপনজন, আমার সবচেয়ে আপন বন্ধু। আমি চাই, তুই শুধু আমার বউ না, আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হ।"
শৈলী মিষ্টি হাসলো,
—"আমি চেষ্টা করবো, সত্যি। কিন্তু যদি কোনোদিন আপনার কোনো প্রত্যাশা পূরণ না করতে পারি, যদি আপনার মন ভেঙে দিই অজান্তেই?"
নিশান তখন শৈলীর মাথায় হাত রেখে বলল,
—"তুই শুধু পাশে থাকিস। আমার হাত ধরে থাকিস। আমি বাকিটা সামলে নেব। তোর কাছ থেকে আমি নিখুঁত হওয়ার আশা করব না, আমি তোর সবকিছুই ভালোবাসব, ভুলগুলোসহ। তবে একটা জিনিস চাই, একটামাত্র জিনিস, আমার প্রতি বিশ্বাস।"
শৈলী এবার জোরে মাথা নাড়ল, চোখভরা অশ্রু নিয়েই বলল,
—"ভালোবাসা তো দিয়েছেনই, এখন আবার এভাবে বলেও দিচ্ছেন! আর কত ভালোবাসা নিতে পারি আমি, বলুন! কোথায় রাখবো এতটুকু অনুভব?"
নিশান মৃদু হাসলো, বলল,
—"তোর হৃদয়ের একটা ছোটখাটো ঘর আমার নামে রেখে দে। বাকি সব তুই যা খুশি করিস।"
দুজনেই হেসে উঠল। ঘর জুড়ে যেন আরও উষ্ণ একটা আবরণ ছড়িয়ে গেল। নিশান জানে, বাস্তবতা রূপকথা নয়, কিন্তু এই এক মুহূর্তের সত্যিকারের অনুভব, সত্যিকারের প্রতিজ্ঞা, এটাই তাদের আসল গল্পের শুরু।
শৈলীকে আরো কিছু কথা বলল নিশান। কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎ এগোবে এই নিয়ে। এরপর শৈলী ভারি শাড়িটা পাল্টে ফ্রেশ হয়ে একটা সুতির শাড়ি পড়ে নিল, নিশানও এর মধ্যে টি শার্ট পড়ে নিয়েছে। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—" আয়, ঘুমিয়ে পড়। "
চমকে থমকে হা হয়ে তাকালো শৈলী। যেন এমন অদ্ভুত কথা সে এ জীবনে শোনেনি! ঘুমিয়ে পড়বে মানে? ঘুমোবে মানে টা কী? আজ কি ঘুমোনোর রাত? রিমি-মিমি যে কিসব কথা বলে গেলো! নিজের হতবাক হওয়ার দৃষ্টি আড়াল করতে পারল না শৈলী। সেভাবেই মুখ ফঁসকে বেরিয়ে এলো,
—" আপনি ঘুমোবেন?"
নিশান ইচ্ছে করেই এই কাজটা করল। মুখে ঘুমোনোর কথা বললেও তার মাথাতেও দুষ্টুমি কম চলছে না। তবে একটু বাজিয়ে দেখতে চাইলো শৈলীকে। তাই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—" হ্যাঁ! তো এত রাতে না ঘুমিয়ে কী করতে চাইছিস, আজব!"
শৈলী এবার একদম থমকে গেল। চোখ কুঁচকে তাকাল নিশানের দিকে। এই লোকটা কি আসলেই মানুষ? নাকি কোনো সন্ন্যাসী! এমন একটা রাতে মানুষ ঘুমোয় নাকি! তারপর মুখটায় একরকম নখরা এনে একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
—" আপনি...আপনি সত্যিই ঘুমোবেন?"
নিশান মুখে অনবদ্য ভঙ্গিতে ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রেখে বলল,
—" অবশ্যই। সারাদিন কম ঝড়-ঝাপটা গেছে নাকি! ক্লান্ত আমি, ঘুমোবো। শুয়ে পড়, আলো নিভিয়ে দেব।"
শৈলী রাগে মুখ ফোলাল, গাল ফুলিয়ে বসে পড়ল একপাশে। মুখে বলল না কিছু, কিন্তু দুই চোখে স্পষ্ট অভিযোগ লেখা, রিমি-মিমি এত কিছু বুঝিয়ে দিল, সব কিছুই কি মিথ্যে ছিল তাহলে? নিশান এবার ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে শৈলীর পাশেই বসল। কাঁধে মাথা হেলিয়ে বলল,
—"আচ্ছা, একটা কথা বলি? আজ তোর এই অভিমানী মুখ, এই রাগ করা, এই লাজুক দৃষ্টি... সব কিছু দেখে আমার ইচ্ছা করছে শুধু তোকে দেখে যাই সারারাত। ঘুম না হয় কাল হবে। কিন্তু...
শৈলী হঠাৎ হাসল না, কাঁদল না, চুপ করে রইল। চোখে যেন বিস্ময়ের রেশ। কেমন লোক এ নিশান? এক মুহূর্তে মজা করে আবার পরের মুহূর্তে এমন কথা বলে দেয়, যেটা বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করে তুলে! নিশান এবার আস্তে করে বলল,
—" আচ্ছা, আজ না দেখলেও হবে৷ আয় ঘুমোই! কাল দেখব তোকে!"
বলে এবার সত্যি সত্যি সটান হয়ে শুয়ে পড়ল নিশান। ঠোঁটে লেগে থাকা দুষ্টুমির হাসিটা চোখে পড়লনা কারো। ধুপ করে ঘরের আবছা আলোটাও নিভিয়ে দিল সে। বিস্ময়ের রেশ কাটাতে না পেরেই ধীরে ধীরে শৈলীও শুয়ে পড়ল। তবে ভেতরে ভেতরে রাগ হলো একটু। আবার নিজের ভাবনার জন্য লজ্জাও লাগলো। কিসব উল্টোপাল্টা চিন্তা করেছিল সে! ছিঃ! শুধু শুধু আতঙ্কে ছিল। কিন্তু তাই বলে লোকটা একটা চুমুও খাবেনা। এটা অন্তত আশা করেছিল শৈলী। সব আশায় এক কেজি বালি ফেলে শৈলী ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। তবে মনে মনে নিশানের বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর লোভটা খুব কষ্টে সংবরণ করল।
-------------
অনেকক্ষণ কেটে গেছে। ঘর নিস্তব্ধ। শুধু দুইজন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে দুজন দুদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে, কিন্তু ঘুম কারোই আসছে না। নিশান অনেক বড় একটা মিথ্যে বলেছে। তার মোটেই ঘুম নেই, আর না আছে ক্লান্তি। শৈলী ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু চোখ বড় বড় করে খোলা। ভ্রু কুঁচকে কীসব যেন ভাবছে। রাগে গজগজ করছে ভেতরে ভেতরে। নিজের মনেই গুণগুণ করে বলছে,
—"লোকটা একদম পাথর! না রোমান্টিক, না আবেগী! বাসর রাতেও এমন উদাস? ইস্! রিমি-মিমিকে পাইলে এক থাপ্পড় মারতাম! একটাও কথা ঠিক হয়নি তাদের!"
ঠিক তখনই একটা হালকা টান পড়ল শৈলীর আঁচলে। শৈলী থমকে গেল। একটু পরেই আবার টান।
এইবার বুঝে গেল, কে আঁচল ধরে টানছে। শৈলী ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। ঘর অন্ধকার, কিন্তু চোখ একটু একটু অভ্যস্ত হয়ে গেছে। নিশান চুপচাপ শুয়ে আছে, কিন্তু তার ঠোঁটে সেই অদ্ভুত হাসি স্পষ্ট, দুষ্টু বাচ্চার মতো একদম! হাতে শৈলীর আঁচল শক্ত করে ধরে আছে, টানটা এখনো পড়ছে।
শৈলী এবার একটু রাগ মেশানো গলায় বলল,
—"কী? আঁচল ধরে টানাটানি করছেন কেনো? ঘুমানোর কথা ছিল না?
নিশান মুখে একেবারে নিরীহ ভাব এনে বলল,
—"ঘুমোচ্ছিলাম তো! তোর চুলের গন্ধে ঘুমটা একেবারে মিষ্টি হয়ে গেলো। তাই আঁচলটা একটু নিজের করে নিলাম!"
শৈলী চোখ রাঙিয়ে দিল,
—"আমার আঁচল আপনি ঘুমাতে ঘুমাতে খাচ্ছেন নাকি?"
নিশান এবার হেসে ফেলল। হালকা কণ্ঠে বলল,
—' না বিষয়টা সেটা না। আসলে একটা জিনিস ভেবে দেখলাম!"
শৈলী ওভাবে ঘাড় ফিরিয়েই ভ্রু কুঁচকে বলল,
— " কী?"
নিশান বেশ গুরুতর কন্ঠ নিয়ে বলে উঠলো,
—" হুট করে আদর করতে মন চাইলো। কাছে আয়, একটু আদর করে দিই। নইলে পরে আবার রাগ করবি, বাচ্চা মানুষ!"
শৈলী এবার লজ্জা পাওয়া ভুলে গিয়ে তালুকদার বাড়ির একমাত্র বংশধরের নাটক দেখে জোর গলায় বলল,
—" কোনো দরকার নাই! অসম্ভব! এখন কেনো? ঘুমোবো আমি। দূরে থাকুন!"
নিশান এবার শৈলীর বালিশে এসে মাথা রাখলো। পিলে চমকালো শৈলী। দূরে থেকে একটু সাহস নিয়ে বড় বড় কথা বললেও এত কাছে নিশান আসাতে এবার তারও মুখ অসহায়ের ছাপ নিয়ে রইলো। শৈলী এবার মিনমিন করে বলল,
—" আমি পুরো আঁচলটা দিয়ে দিচ্ছি, তবুও নিজের বালিশে মাথা রাখুন!"
নিশান আরেকটু কাছে ঘেঁষে বলল,
—"তোর আঁচল না, তোকে চাই... পুরোটা। শুধু আজ নয়, প্রতিদিন রাতে, প্রতিদিন সকালে, সারাজীবন। কিন্তু প্রথম দিনেই যদি সব চেয়ে নিই, তাহলে তো তুই ভাববি, আমি তোকে শুধু রাতের জন্য চেয়েছিলাম। আমি তো চাই সারাজীবনের জন্য। তাই ভাবছিলাম একটু একটু করে শুরু করি!"
শৈলীর মুখটা হালকা লাল হয়ে গেল। চুপ করে রইল। কোনো কথা খুঁজে পেল না। নিশান এবার ওর হাতটা নিজের দিকে টেনে এনে বলল,
—"তুই পাশে আছিস, এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর চুমু? ওটা তো চিরজীবনের জন্য বরাদ্দ, আজ না হোক কাল... আর কানে কানে কিছু বললে কেমন হয়?"
—"কি?"
শৈলী আধা ভয়ে, আধা কৌতুহলে জিজ্ঞেস করল।
নিশান শৈলীর কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব ধীরে বলল,
—"তোর ঠোঁটের লিপস্টিক কিন্তু এখনো পুরো মুছেনি..."
তারপর হালকা একটা চুমু খেলো শৈলীর গালের নিচে, চোয়ালের কোণে। নরম, ধীর, খুব আদরের এক চুমু পেয়েও শৈলী আর কিছু বলল না। এখনও একটু একটু রাগ লাগছে ওর। শুধু চোখ বন্ধ করে নিশানের বুকের দিকে একটু এগিয়ে এলো। নিশানও এবার এক হাতে ওকে আলতো জড়িয়ে নিল। দুজনে চুপচাপ শুয়ে থাকল। কোনো শব্দ নেই, শুধু বুকের ধুকপুক শব্দ। একটু পর নিশান শৈলীর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—" শার্ট পড়িনি দেখে রাগ করেছিস? বিশ্বাস কর, শার্টের থেকে এই টি-শার্ট খোলা বেশি সহজ। বোতাম খুলতে বহুত সময় লাগে।"
শৈলী লজ্জা পাওয়া ভুলে চোখ বড়বড় করে তাকাল। নিশ্চিত হতে চাইলো এই লোক সত্যি সত্যি কোনো জ্যান্ত গিরগিটি গিলে এসেছে কিনা। এত দ্রুত রূপ বদলানোর রহস্য টা কি? তার অবাক হওয়াকে পরোয়া না করে নিশান একটু ভেবে ঠোঁট ভিজিয়ে আবারো বলে,
—" ওহ, এটাও পছন্দ নয়? ঠিক আছে, নো প্রবলেম। সব কাজ তো তোকে করতে হবেনা, তোর কষ্ট করে খুলতেও হবেনা। খোলার কাজটা না হয় আমিই করে দেব!"
শৈলী এবার ভ্যাবাচেকা খেয়ে মোচড়ানো শুরু করলে নিশান এক টানে ঘুরিয়ে নিল শৈলীকে, টেনে আনলো নিজের দিকে। পায়ের কাছের কম্বলটা কোঁমড় পর্যন্ত টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—" লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে নে। কতক্ষণ দম বন্ধ করে থাকতে হবে, গ্যারান্টি দিতে পারবনা!"
শৈলী এবার কিছু বলার সুযোগই পেল না। নিষ্ঠুর নিশান লম্বা শ্বাসটা নেয়ার আগেই ফট করে আঁকড়ে ধরল শৈলীর কোমল ঠোঁটজোড়া। তিড়তিড় করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটসহ পুরো শরীর বরফের মত জমে গেলো শৈলীর।
ইতোমধ্যে ওর ঠোঁটে ঝড় তুফান সুনামি সব তুলে দিয়েছে নিশান তালুকদার। মনে হয় পণ করেছে আদর কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী, আজ হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেবে শৈলীকে। নিশানের এমন পাগলাটে স্বভাবটা অপরিচিত শৈলীর কাছে। প্রথমে তাল মেলাতে পারল না নিশানের সাথে। মুঁচড়ে সরে আসতে চাইলে নিশান এক হাতে কোঁমড় জোরে চেপে ধরে অন্য হাত শৈলীর উন্মুক্ত পেটে গলিয়ে দেয়। আবেশে এবার চোখজোড়া খিঁচে বন্ধ করে শৈলী। এ পর্যায়ে একটু একটু করে নিজেকে হারাতে শুরু করে নাজুক হয়ে পড়া মেয়েটা।
একটা মেয়ে যতটাই লাজুক হোক না কেনো, নিজের প্রিয় পুরুষের স্পর্শে সে হারিয়ে যেতে বাধ্য। স্বামীর এমন নাজুক ছোঁয়ায় নেশায় বুঁদ হয়ে গেলো শৈলী। নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল, যেন কোনো জাদুকরী নেশা ওকে আবৃত করে নিচ্ছে। একটা মেয়ের হৃদয় কীভাবে নরম হয়ে যায় ভালোবাসার উত্তাপে, কীভাবে সে ভেঙে পড়ে না, বরং গলে পড়ে তার ভালোবাসার মানুষটার হাতে, সেটা বোঝা যায় শৈলীর নিঃশব্দ সাড়া থেকে। কাঁপা হাতটা নিশানের গলার কাছে আনে শৈলী। সে নিজেও এবার নিশানের সাথে তাল মেলাতে ব্যস্ত, লোভে নিজেও স্বামীর শুষ্ক ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে দিচ্ছে আদরে। তীব্র ঘর্ষনে বৃষ্টির বর্ষণ হলো যেন।
চুমুর গভীরতা আরেকটু গভীর হলো। নিশানের লাগামছাড়া হাতদুটোর অবাধ্য বিচরণ শৈলীকে আরো পাগল করে তুলল। দিকবিদিকশুন্য হয়ে শৈলী খাঁমচে ধরল নিশানের টি-শার্ট। নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে কোঁমড় থেকে টি শার্টের কোণা ধরে একটু একটু করে উপরে উঠালো শৈলী। বুঝতে পেরে নিশানও সাহায্য করল। মুহুর্তের মধ্যে এক টানে নিশানের পেটানো গায়ের সাথে এঁটে থাকা টি শার্ট টা খুলে ছুঁড়ে ফেলল শৈলী। উন্মুক্ত হলো সুঠাম দেহ। নিশান এবার এক মুহুর্তের জন্য ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে শৈলীর কানের কাছে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—" লুক, বলেছিলাম না, টি-শার্ট খুলতে বেশি সুবিধা! আমাকে হেল্প করতেও হলো না!"
এই মুহুর্তে এমন একটা কথা কর্ণকুহরে পৌঁছালেও লজ্জা পেল না শৈলী। বরং অন্য জগতে হারিয়ে গিয়ে নিশানের মাথার পিছনের চুল সজোরে আঁকড়ে ধরে আরেকটু কাছে টেনে নিল। নিশানের কণ্ঠে ফিসফিস করে বলা কথা, ওর ত্বকে আলতো শ্বাসের উষ্ণতা, সব মিলিয়ে শৈলী যেন নিজের ভেতরের সমস্ত দেয়াল হারিয়ে ফেলছে। আর সেই দেয়ালের ফাঁকে, একটি মেয়ে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করছে ভালোবাসার কাছে। ঠিক যেমন কেউ গাঢ় সুগন্ধি, কোনো অ্যালকোহলের নেশায় ধীরে ধীরে বুঁদ হয়ে পড়ে, জানতে পারে এই নেশা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, তবু সে ফিরে আসতে চায় না।
শৈলী বুঝতেই পারেনি কখন যেন শরীর আর মনের মধ্যে সীমারেখাটা মুছে গেছে। নিশানের একেকটা স্পর্শ যেন ধীরে ধীরে তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গলিয়ে দিচ্ছে, কুয়াশার মতো। ঠিক যেন শরতের ভোরে কুয়াশায় ভেজা কোনো পাতার ওপর রোদের প্রথম আলোর মতো তার গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে নিশান।
নিশানের ঠোঁট যখন আরেকটু নিচে নামে, শৈলীর দম বন্ধ হয়ে আসে। সে চোখ বন্ধ করে নিশানের চুল আঁকড়ে ধরে টেনে আনে বুকের কাছাকাছি। তার মনে হয়, এই মানুষটার স্পর্শে যেন তার সত্ত্বা নেশার মতো বুঁদ হয়ে যাচ্ছে, চেতনা হারিয়ে শুধু অনুভূতির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সে, যেন স্বামীর ছোঁয়া কোনো সাধারণ অনুভব নয়, যেন একেকটা ঢেউ, যা শৈলীকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গভীর কোনো উত্তাল সমুদ্রের দিকে। শৈলীর গলা দিয়ে একফোঁটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, নরম, দমবন্ধ করা। তাতে তৃষ্ণার মতো ছুঁয়ে থাকে ভালোবাসা আর সেই অদ্ভুত অনুভব, যেটা কেবল সেই মেয়েরা বোঝে, যারা ভালোবেসে নিঃশেষ হয়ে যেতে চায় নিজের স্বামীর বাহুডোরে। শৈলী তখন আর 'শৈলী' থাকে না। সে হয়ে ওঠে নিশানের প্রতিটি ছোঁয়ার প্রতিধ্বনি, একটা অমোঘ আকর্ষণ যেখানে শরীর, মন, অনুভব সব মিলেমিশে একাকার।
চলবে..........
🙂 আমি নির্দোষ! মাফ চাই! দোয়াও চাই। বিলিভ মি, আমি এসব লেখিনি😞 কি জানি, ঘুম থেকে উঠে দেখি নোটপ্যাডে কে যেন লিখে দিয়েছে।
কেও অজ্ঞান হলে কতৃপক্ষ দায়ী নয়⚠️
( আর,,,দু-এক পর্বের মধ্যেই শেষ হবে এই যাত্রা🤌🏻)