#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব-৪
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
প্রথম থেকে সমস্ত ঘটনা মিশাতকে খুলে বলার পর মিশাত আমার দিকে অবাক হয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। এরপরে আমাকে বলল,
"তুই আর বদলালি না। অন্যের জন্য নিজের জীবন বলি দেওয়াটা তোর জন্মগত অভ্যাস। এটা আমি ছোট থেকেই দেখেছি।"
আমি কিঞ্চিত হাসলাম। তারপর বললাম,
"কিন্তু এখন যে অন্য একটা ভাবনা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে রে।"
"কী?"
"কালকে শপিং করে বাসায় ফেরার পথে ফারজানাকে দেখলাম একটা ছেলের সাথে................"
_________________________________________
"আশ্চর্য! আপনার কাজের গতি দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।একটা প্রজেক্ট শেষ করতে এতোদিন সময় লাগে নাকি? শুনুন আপনি ২ দিনের মধ্যে এই কাজ শেষ করে সাবমিট করবেন। Now, you can go."
অফিসের এক কর্মচারীর কাজের গাফিলতির কারণে আয়ান অনেক রেগে আছে। আয়ান বরাবরই কাজ নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। কেউ কাজের একটু হেরফের করলেই আয়ান পুরো অফিস মাথায় তুলে। আয়ানের কাজের প্রতি এই পসেসিভনেসের জন্য তার বাবা বেশ সন্তুষ্ট হলেও অফিসের সব কর্মচারীরা সারাক্ষণ আয়ানের ভয়ে কাজ করে।
" I am really sorry sir. আমি ২ দিনের মধ্যেই প্রজেক্ট সাবমিট করে দেব । "
"এখন সময় নষ্ট না করে কাজ করুন প্লিজ।"
"Sure sir."
এই বলে কর্মচারী চলে যায়। একটু পর আয়ানের Assistant নিলয় আয়ানের কেবিনে নক করে।
"Come in."
"স্যার মি. হিমেল এসেছেন। আপনার সাথে দেখা করতে চান।"
"ভেতরে আসতে বলো।"
একটু পর হুরমুর করে আয়ানের কেবিনে ঢুকেই হিমেল আয়ানের কলার চেপে ধরে বলে,
"শালা হারামি!! তুই নাকি বিয়ে করেছিস?বিয়ে করে নিলি আর বললিও না। হে আল্লাহ্, উপর থেকে দড়ি পাঠিয়ে তুলে নাও আমায়!! এই দিন দেখার জন্য আমি বেঁচে ছিলাম।"
আয়ান মনে মনে বলল," এটারই অভাব ছিলো"
হিমেল হলো আয়ানের জিগরি দোস্ত। বেস্ট ফ্রেন্ড এর থেকেও যদি বেশি ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থেকে থাকে তাহলে হিমেল আর আয়ানের মধ্যে সেটাই বিদ্যমান। ছোট থেকেই একে অপরের কাছের বন্ধু।
আয়ান কলার ছাড়িয়ে নিয়ে একটু রুক্ষ কন্ঠে বলল,
"তোকে আবার কুন উগান্ডার হারামজাদা খবর দিলো?"
"কেন বে কেন? লুকায় লুকায় পিরিত করতে খুব মজা না?"
"হিমেল আস্তে, অফিস এটা। অফিসের মধ্যে চেঁচাস না। দেখ, I can explain. সব শুনার পর রিয়েক্ট করিস ।"
"শালা ঠাডা পরে মর তুই। আমি কিছু শুনব না। অভিশাপ দিলাম এ জন্মে তোর বিয়ে হবে না! ওহ শিট! তোর তো বিয়ে হয়ে গেছে!! অন্য কিছু দিতে হবে। হ্যাঁ, পাইছি। শালা তোর নাতি নাতনির বিয়ে হবে না! তোর বংশ নির্বংশ হয়ে যাক!!!"
_______________________________________________
"ও মাই গড! এতো দেখি দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা মাঝি!"
"সেটাই তো মনে হয়। ঐদিন রাস্তায় দেখছি। তাই ভিডিও করে নিলাম।"
মিশাতকে ফারজানার বিষয়টা খুলে বললাম এবং ভিডিও টাও দেখালাম। মিশাত অনেক মনোযোগ দিয়ে ভিডিও টা দেখে আবারো বলল,
"ভাইরে ভাই, বেডি তো দেখি একেবারে খাটাশ মার্কা। আমি 100% সিউর যে এর চরিত্রে বেশ ভালোই বেশি জং ধরেছে। এদের লুতুপুতু দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে এরা বিএফ-জিএফ"
আমি অন্যমনষ্ক হয়ে বললাম, "হুম।"
"শালা ভালোই হারামি,চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আয়ান চৌধূরী কেমনে এই বেডিরে পছন্দ করে রে ভাই!"
আমি আবারো আগের মতোই বললাম, "হুম।"
মিশাত বিরক্ত হয়ে বলল,
"কী বে তখন থেকে হুম হুম করে যাচ্ছিস!!!"
"ভাবছি............"
"কী ভাবতেছিস?"
"আমাদের ধারনা সত্যি হলে উনাকে ঠকিয়ে ফারজানার কী লাভ? মানে টাইম পাস করার মানে কী?"
"গাধী তোর শাশুড়ি তোকে এতকিছু বলার পরেও বুঝলি না"
" বুঝেছি কিন্তু......."
"কোনো কিন্ত নাই। এখন মাল টাকে সরাতে হবে ব্যস ! আর সবাইকে তোর মতো ইনোসেন্ট ভাবিস না তো! এখন জাস্ট ভাব কী করবি ?"
" আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না যে আমি কি করবো? আমি এখন মাকেও এসব বলতে পারছি না কারণ এসব বললে উনি আবারও ভেঙ্গে পড়বেন।"
মিশাত তখন ২ সেকেন্ড ভেবে আমার দিকে তাকালো। আমিও ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। তারপরে আমাকে বলল,
" মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে হবে বুঝলি। ঐ বেডির আসল রূপ টা তোর বর দেখতে পেলেই কাজ হবে।"
আমি বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। অপলক দৃষ্টিতে মেঝেতে তাকিয়ে রইলাম।
মিশাত বিরক্ত হয়ে বলল,
" আবার কী হইলো তোর?"
আমি চিন্তিত কন্ঠে বললাম,
"না মানে....... উনি সহ্য করতে পারবে না। এতদিনে যা বুঝলাম। উনি ফারজানা কে অনেক ভালোবাসে। আর উনার ভালোবাসা টা সত্যি। উনি মেনে নিতে পারবে কি?সত্যিটা জানতে পারলে উনি অনেক কষ্ট পাবে রে। অনেক বেশি কষ্ট পাবে।"
__________________________________________________
"What !!!!!!!"
"চেঁচাস না তো হিমেল। মেজাজ এমনিতেই খারাপ আছে।"
" না না wait wait তুই আমাকে বুঝা ভাই! ঐ বারো ভাতারি বেডির জন্য তুই তোর বউ রে মানে নিস নাই!!!! আমি তো ভাবলাম যে এইবার অবশেষে ঐ বারো ভাতারিকে তুই চিনতে পারছোস।"
আয়ান রেগে টেবিলে থাবা মেরে বলল,
"হিমেল, খবরদার! তোকে অনেকবার বলেছি যে ফারজানাকে নিয়ে একটা বাজে কথা বলবি না। শুধু শুধু তুই কেন ওকে নিয়ে এত বাজে বকিস বল তো !!!"
হিমেল এইবার একটু গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"আমি কোনো বাজে কথা বলি না বুঝেছিস। তুই মানুষ চিনতে ভুল করছিস। তুই তো চোখ বন্ধ করে ঐ ফালতু বেডি রে বিশ্বাস করোস। আমি তোরে সেই প্রথম থেকেই বলি যে বেডির চরিত্রে সমস্যা আছে। আমার কথা তো এক কান দিয়ে ঢুকায় অন্য কান দিয়ে বের করোস। তোর বাপ-মাও একই কথা বলল। তাও তোর এগুলা বাজে কথা মনে হয়। সত্য কখনো ঢাকা থাকে না। যেদিন সত্যি টা জানবি সেদিন এই হিমেলের পায়ের ধুলা নিয়ে যাস।"
এটা বলেই হিমেল রেগেমেগে আয়ানের কেবিন থেকে বেরিয়ে পরল।
_________________________________________________
হিমেল আয়ানের অফিস থেকে বেরিয়ে আয়ানের মা রাবেয়া বেগম কে ফোন করল।
" হ্যাঁ হিমেল বাবা, কেমন আছো?"
" কেমন আর থাকব আন্টি! আপনার ছেলের কর্মকান্ডে তো আমার নিজেরই কচু গাছে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করচ্ছে।"
রাবেয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
" ওর সাথে দেখা করলে? "
"জ্বী আন্টি।"
" তোমাকে কে খবর দিলো বাবা ?"
"খবর তো হাওয়ার থেকেও দ্রুত গতিতে চলে আন্টি। আচ্ছা আন্টি, শুনলাম ভাবী নাকি সব জেনে শুনেই আয়ানকে বিয়ে করেছে!"
" হ্যাঁ রে। আদ্রিকাকে সব বিয়ের আগেই বলেছিলাম।"
" আন্টি একটা কথা। আসলে আমি একটু ভাবীর সাথে দেখা করতে চাই।"
" অবশ্যই। কালকেই না হয় বাড়িতে এসো। এমনিতেও স্বাভাবিক ভাবে বিয়ে টা হলে তোমাদের পুরো বন্ধুমহল কেই বাড়িতে আনতাম।"
"না আন্টি বাড়িতে যাব না। আয়ান জেনে যাবে। আমাকে একটু ভাবীর নাম্বার টা দিয়ে দিয়েন আর ভাবীকে আমার কথা বলিয়েন।"
" আচ্ছা বাবা। তোমার যেটা ইচ্ছা।"
________________________________________________
দুপুরের খাওয়া শেষে মিশাত আর আমি বারান্দাতে বসে আছি। গুনে গুনে ২৬ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড মিশাত আমাকে ওর সামনে বসিয়ে রেখেছে, তাও আবার কোনো কারণ ছাড়া। আমি আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলাম,
"তোর প্রবলেম টা কী বলতো মিশাত? সেই তখন থেকে চুপ করে আছিস। না আমাকে কথা বলতে দিচ্ছিস আর না নিজে বলছিস।"
"........."
"আজব! এখনো চুপ করে আছিস !!!!"
"হাঁসের মতো প্যাক প্যাক করিস না তো আদ্রিকা।"
"আমি আর কথাই বলব না "
আরো ১০ মিনিট চুপ করে থাকার পর অবশেষে মহারাণী মুখ খুললো।
"মেয়েটা একসাথে দুটো জিনিসই পেতে চায়, রাইট? এখন ফারজানা যদি ওই ছেলেটার সাথে রিলেশনে থেকে থাকে, তাহলে এটা আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট। কারণ ওর এই দুর্বলতাকে আমরা সুযোগ করে তুলতে পারব।"
" অ্যাঁ ! "
"অ্যাঁ না বইন হ্যাঁ। শুন আমি এখন যা বলব তুই তাই করবি।"
কোনো কিছু আগামাথা না বুঝেই আমি মিশাতের কথায় সম্মতি দিলাম। কারণ মিশাত ছোট থেকেই আমাকে এত ভালো ভালো পরিকল্পনা দেয় যে, সেই পরিকল্পনা কখনো বিফলে যায় না। মাঝে মাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই এটা ভেবে যে, এই গর্দভের মাথায় এতো ভালো ভালো প্লান কেমনে আসে !!!!!
মিশাত আমাকে আবার বলল,
" আমাদের এখন থেকে ফারজানার ওপর নজর রাখতে হবে বুঝলি। ও কোথায় যায়? কার সাথে যায়? কী করে? আয়ান চৌধূরী ছাড়া আর কার কার সাথে দেখা করে? এইসব কিছুর খবর নিতে হবে। আর তুই মাঝে মাঝে আয়ান চৌধূরীর ফোনের ওপর নজর রাখবি। ঐ ফোন থেকে আমরা আরো তথ্য পাবো। বুঝলি?"
___________________________________________________
বিকেলের মিটিং শেষ করে আয়ান ফারজানাকে কল করল।
" হাই বেবি! কী অবস্থা?"
"এইতো। এইমাত্র মিটিং শেষ হলো। তুমি কোথায় ফারজানা?"
" কোথায় আবার ? হোস্টেলে শুয়ে আছি। আজকে আমার রুমমেট ঘুরতে গেছে।"
" ওও।"
" ওও কী আয়ান ? কতদিন হলো আমরা কোথাও ঘুরতে যাই না। চলো না কোথাও একটু ঘুরতে যাই।আর এমনিতেও আমাকে একটু শপিং মলে যাওয়া দরকার। কিছু কেনাকাটা আছে।"
" ঠিক আছে। কিন্তু আমি তো তোমাকে গত সপ্তাহে ২০ হাজার টাকার কেনাকাটা করে দিলাম। এখন আবার কীসের শপিং?"
" উফ্ বেব। তুমিও না ! তুমি এ কথা বলতে পারলে ! তুমি যদি আমাকে শপিং এ নিয়ে না যাও তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে। আমি তোমার সাথে কোনো কথা বলব না।"
" আরে আজব! আমি তো না করিনি। আচ্ছা কালকে বিকেলের দিকে বের হবো।"
" ওকে বেবি। লাভ ইউ। বাই।"
(⚠️Don't Copy Please!!!⚠️)
চলবে......?
⚠️বি:দ্র: প্রিয় পাঠকগন,আমার কোচিংয়ে পরীক্ষা থাকায় কাল রাতে হয়তো গল্প দিতে পারব না। তবে পরশু দিন এর পরিবর্তে বড়সড় একটা পর্ব দিব ইনশাআল্লাহ্ 🥰