#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_১০
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
ডিভোর্স পেপার নিয়ে করা ভাবনার মধ্যেই হুট করে আমার মাথায় একটা প্রশ্ন আসলো। আয়ান চৌধূরী! উনি হঠাৎ এভাবে ড্রিংকস করে এসে বারবার ফারজানার নাম বলছে কেন? উনার কথাবার্তা তো ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।ব্যাপারটা কী? অনেক চিন্তা ভাবনা করার পর আমার ঐ ঈশান-ফারজানার ভিডিও টার কথা মাথায় আসলো!! কিন্তু ভিডিও ক্লিপ টা তো মিশাতের কাছে। ঐ টা তো আমি নিজেও দেখিনি! তাহলে কি মিশাত..........না না না ! ও এমন করবে না রাইট! না! এটা হবে না!
এতো টেনশন আর নিতে না পেরে আমি মিশাত কে কল করলাম।
"হ্যাঁ আদু! বল!"
আমি একটা ঢোক গিলে বললাম,
"মিশাত...তুই....মানে ঐ ভিডিও টা কোথায়?"
মিশাত টেনে টেনে বলল,
"কোনটা?ফারজানার ঐ রো*মান্টি*ক ভিডিও টা?"
আমি চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললাম, "হ্যাঁ,, কোথায় ওটা?"
"আমার কাছেই। "
"মিশাত .....শোন.....উনি একটু আগে ড্রিংকস করে বাড়িতে ফিরে এসেছেন আর ফারজানাকে উদ্দেশ্য করে কী কী জানি বলছেন!!আমার মনে হয় উনি হয়তো......."
আমাকে শেষ করতে না দিয়েই মিশাত বলল,
" বাহ্ জোস তো!! মেডিসিন কাজ করেছে তাহলে!!"
আমি চমকে গিয়ে বললাম,
" মানে? কী বলছিস তুই এইসব?"
মিশাত একদম গা ছাড়া ভাবে বলল,
" কিছু না...Forget it !!!"
আমি চেঁচিয়ে বললাম,
" No I can't forget. কী করেছিস তুই? সত্যি করে বল মিশাত !!! What did you do??????"
আমি এইবার কেঁদেই ফেললাম। আর কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
" কী করেছিস তুই হ্যাঁ?? কী করেছিস বোন? সত্যি করে বল না! ঐ বদরাগী লোকটা ওমন করে কেন ঐসব বলছিলো? কেনো ঐ মানুষটা এমন ছন্নছাড়া হয়ে বাড়িতে এসেছে আজ? কেনো উনি.........."
আমি এইবার খুব জোরেই কেঁদে দিলাম।
মিশাত রেগে বলল,
" কাঁদছিস কেনো তুই আজব? কান্না বন্ধ কর আদু। তোর কান্না আমি এমনিতেই সহ্য করতে পারি না। সামনে থাকলে কানের নিচে দিতাম দুটো"
আমি চোখের পানি মুছে বললাম,
"মিশাত, প্লিজ সত্যি করে বল। কী করেছিস? আমি নিশ্চিত যে তুই কিছু করেছিস।"
মিশাত ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
" আচ্ছা শোন, ফারজানার ওই ভিডিওটা আয়ান চৌধূরীর কাছে সযত্নে পাঠিয়ে দিয়েছি। ব্যাস এটুকুই।"
এটা শুনে আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলি।
চিৎকার দিয়ে বললাম,
" কীহহহহহহহহহহহ?????? কী করেছিস তুই এটা? কী করেছিস? পাগল হয়ে গেছিস তুই?? তুই কি আমায় মেরে ফেলতে চাস? তোকে আমি এটা করতে মানা করছিলাম মিশাত। তোকে আমি বারবার মানা করেছিলাম!!!"
" প্লিজ আদ্রিকা, অনেক হয়েছে! Its enough! আর না!!!! আমি তোর কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না। এসব নাটকের একটা বিহিত প্রয়োজন ছিলো। আর তাছাড়াও একদিন না একদিন উনি তো.........."
"কীসের বিহিত? কিচ্ছু প্রয়োজন ছিলো না! কিচ্ছু না! আমি তোকে বলেছিলাম যে উনি সহ্য করতে পারবে না! ভেঙে পরবে! এটা করে আমার কী লাভ হলো? বল!! কী লাভ হলো আমার! কোনো লাভ নেই !তুই বরং উল্টো ওনাকে কষ্ট দিলি! উনাকে একদম ভেঙেচুড়ে চুড়মাড় করে দিলি! যেটা একদম ঠিক করিস নি মিশাত! আমি....আমি আজকে থেকে তোর সাথে আর কথা বলবো না। তুই আমাকে আর কল করবি না! বাই।"
মিশাতকে কিছু বলতে না দিয়ে অনেক রেগে মেগে ফোনটা কেটে দিয়ে বিছানায় ছুড়ে ফেললাম। আমি এখন কী করব? হায় আল্লাহ্! মিশাত সত্যিই ঠিক করে নি!!
হঠাৎ কেউ পেছন থেকে ডেকে উঠল, " ভাবি!!"
পিছনে ঘুরে দেখলাম রামিসা দাঁড়িয়ে আছে।
ভয় পেয়ে মনে মনে ভাবলাম, "তাহলে কি রামিসা সব শুনে ফেলল? ও কি আমায় ভুল বুঝবে!"
আমি চোখের পানি মুছে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম,
" আরে রামিসা! কী হয়েছে? ঘরে এসো।"
"ভাবি, তোমার বন্ধু ভাইয়ার সাথে কী করেছে?"
আমি একটু থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম আর ভাবলাম লুকিয়ে কোনো লাভ নেই ! তারপরে রামিসাকে বললাম,
" আসলে...হয়তো ফারজানার সব কুকীর্তি তোমার ভাই জানতে পেরে গেছে!কারন একটা সেরকমই ভিডিও আমার বন্ধু তোমার ভাই কে পাঠিয়েছে। তাই......... আর এই কারনে তোমার ভাই ওমন ভাবে বাড়িতে ফিরেছে।"
ভেবেছিলাম রামিসা হয়তো কষ্ট পাবে অথবা উনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমার উপর রাগ করবে! কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে রামিসা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আর খুশিতে লাফিয়ে বলল,
" ভাবি!!! আমার কিউট ভাবি! অনেক ধন্যবাদ! এতদিনে একটা ভালো কাজ করতে পেরেছো। I am proud of you..অনেক খুশি আজকে আমি।"
আমি আগে রামিসার দিকে তাকিয়ে দুবার চোখের পলক ফেললাম। এরপর বললাম,
" এসব কী বলছো তুমি রামিসা? তোমার ভাই কষ্ট পেয়েছে। আর সে আমার জন্যই..... আর তুমি আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছো!!!"
রামিসা আমাকে ছেড়ে দিয়ে একটু এগিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
"ভাবি, তুমি জানো না তুমি কী করেছো? যেটা মম আর বাপ্পি দুই বছরে করতে পারে নি, সেটা তুমি চোখের পলকে করে ফেলেছো। হয়তো তুমি ভাবছো যে, এই কাজের জন্য আমি তোমাকে কেন বকলাম না? ভাইয়াকে কষ্ট দেওয়ার জন্যও না! কারণ ভাবি, একটু ভেবে দেখো তো, এখন যেটা ভাইয়া জানতে পেরেছে, সেটা যদি ভাইয়া ভুলটা করার পরে জানতে পারতো! তাহলে কি হতো?"
" মানে ??"
" আমি বলতে চাচ্ছি, ভাইয়া যদি ওকে বিয়ে করতো আর এরপর ভাইয়া যদি জানতে পারতো যে ফারজানা এইসব কুকীর্তি করে। আর ভাইয়ার সাথে বিয়ের পর সব সম্পত্তি নিয়ে পালিয়ে যেতো, প্রতারনা করতো ,তাহলে সহ্য করতে পারত?"
আমি ভাবলাম আসলেই রামিসা ভুল বলে নি। পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেলে কিছু করেও কিচ্ছু হতো না।
রামিসা আবার বলল,
"ভাইয়া এখন যে কষ্টটা পাচ্ছে সেই কষ্টটা তখন তো আরো হাজার গুণ বেড়ে যেত! তখন আফসোস করেও কোনো উপায় থাকতো না ভাবি। কিন্তু এখন যেটা হয়েছে, সেটা খুব বেশিই ভালো হয়েছে।"
আমি অনেকটাই অবাক হলাম। রামিসা আমার থেকে খুব বেশি হলে ৩ থেকে ৪ বছরের ছোট। তাতেই মেয়েটা এত সুন্দর করে বিষয়টা বুঝতে পারলো। এটা আমাকে সত্যিই অনেঈ মুগ্ধ করল।
আমি একটু মজার ছলে বললাম,
"ননদ আমার হঠাৎ করেই বড়দের মতো কথা বলছে যে!"
রামিসা চোখ পাকিয়ে মুখ ফুলালো। আমি ফিক করে হেসে এগিয়ে গিয়ে ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে বললাম,
"তুমি অনেক বুদ্ধিমতী জানো।আর আমি এটাও বুঝতে পারছি যে তুমি তোমার ভাইকে কতটা ভালোবাসো! সত্যিই আমি অনেক ভাগ্যবতী তোমার মত একজন ননদ পেয়েছি।"
কথাটা শোনা মাত্র রামিসা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো।
আমি বুঝতে পেরে জিভ কেটে বললাম,
"না মানে তোমার মত একটা বোন পেয়েছি।"
রামিসা মাথা ঝাঁকালো যার অর্থ "হুম এবার ঠিক আছে "
হঠাৎ কিছু মনে হতেই আমি বললাম,
" রামিসা শোনো....একটা কাহিনী হয়ে গেছে !!!
" কী ?"
আমি ফিসফিসিয়ে বললাম,
" তোমার ভাই ড্রিংক করেছে।"
রামিসা চেঁচিয়ে বলল,
"কীঈঈঈঈঈ????"
" হুশশ..আস্তে......আর এই জন্যই তোমার ভাইয়াকে ওমন লাগছিলো।"
"সে কী ভাবি? মম আর বাপ্পি জানতে পারলে ভাইয়া কে ঝাটা পিটা করবে তো।"
"আমি জানি....তাই বিষয় টা ধামা চাপা দিতে হবে বুঝলে। আমার তোমার Help প্রয়োজন। "
"কী করতে হবে ভাবি বলো?"
আমি একটু অসস্তি নিয়ে বললাম,
" তোমার ভাইয়ার গায়ের শার্ট টা শুধু খুলে দিতে হবে। শার্ট থেকে অ্যালকোহলের গন্ধ আসছে। তুমি শার্ট টা চেন্জ করে দিলে আমি ওটা ধুয়ে দিতাম। "
রামিসা ভ্রু কুচকে বলল,
" এই কাজ তো তুমি নিজেও করতে পারো ভাবি"
আমি খুক খুক করে কেশে উঠলাম আর মনে মনে ভাবলাম, "এই মেয়েকে আমি কেমনে বুঝাবো যে আমি আবারো হার্ট অ্যাটার্ক এর সম্মুখীন হতে চাচ্ছি না। ঐবার উনাকে উদাম হয়ে খালি গায়ে দেখে মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছি আমি।আমার বাবা বাঁচার অনেক শখ! নাতি নাতনির মুখ দেখা বাকি"
এসব মনে মনে ভাবলেও মুখে বললাম,
" না মানে.......তোমার ভাই দুপুরে খেয়েছে কি না কে জানে! আমার মনে হয় খান নি । তুমি শার্ট চেঞ্জ করে দাও। আমি বরং খাবার রেডি করি। " এটা বলেই আমি ভোঁ দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
রামিসা চেঁচিয়ে বলল," কিন্তু ভাবি ভাইয়া তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। খাবে কীভাবে?"
আমিও সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে জোরে বললাম,
"লেবু পানি খাইয়ে বমি করাবো তোমার ভাই কে। তাহলে জ্ঞান ফিরবে।"
___________________________________________
আমি উনার শার্ট টা ভালো করে ধুয়ে ছাদে মেলে দিচ্ছি। আর রামিসা চিলেকোঠার দরজায় দাঁড়িয়ে বকবক করচ্ছে। তার মতে,তার ভাইকে আজকে জাগানো যাবে না, নতুবা সে রেগে যাবে। আজ বিশ্রাম নিক।একদম কাল সকালে উঠুক।
আমি ৩য় বারের মতো বললাম,
" আরে বাবা, উনি তো দুপুরে খান নি। ২ বেলা না খেয়ে থাকবে কীভাবে? খেয়ে দেয়ে আবার ঘুমোবে। সমস্যা কী?"
আমাদের কথার মধ্যেই আমার ফোন টা বেজে উঠলো।রামিসা ছাদ থেকে নেমে চিল্লিয়ে বলল,
" ভাবি তোমার ফোন......"
"কে??"
" আননোন নাম্বার।"
" তুমি ধরো।"
" আচ্ছা ভাবি।"
আমি ছাদে থাকা গাছে পানি দেয়া শুরু করলাম। রামিসা ছাদে উঠতে উঠতে কল টা ধরলো।
" হ্যালো কে?"
" আসসালামুআলাইকুম ভাবি!"
রামিসার যেন অপর প্রান্তের লোকটির "ভাবি" বলাটা পছন্দ হলো না। রেগে বলল,
" কে বে তুই? আমার ভাবিকে ভাবি বলোস! সাহস তো কম না রে !"
হিমেল কপাল সংকুচিত হয়ে গেল। এই পটল কেন কল ধরেছে!!!!
"এই মেয়ে! ভদ্রতা শিখোনি?? আমি ভাবি কে কল করেছি। তোমায় না। অন্যের কল ধরো কেনো? আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর বউকে আমি হাজার বার ভাবি বলবো! এটা আমার জন্মগত অধিকার! তাতে তোমার কী? পটলের নানি!!"
"পটলের নানি " শব্দটা শুনে রামিসা বুঝতে পারলো যে এইটা কে! তাই বলল,
" অ্যাই! এই ফালতু লোক! আপনি আমার ভাবি কে কেন কল করেছেন হ্যাঁ? আমার ভাইয়ের মাথা টা খেয়ে হজম হয় নি! এখন আমার ভাবির পিছনে লেগেছেন!!!"
এর মধ্যেই আমি ছাদ থেকে নেমে আসলাম । আর রামিসা আমাকে বলল,
" ভাবি!! এইসব চিকা-ফিকা তোমাকে কল করেছে কেন? দেখো তো!"
বলেই আমার হাতে ফোন দিয়ে রামিসা চলে গেল।
আমি ফোন টা কানে ধরে বললাম,
"হ্যালো!"
হিমেল এইবার অশভ্য মুড থেকে খুব ভদ্রতে রুপান্তর হয়ে বলল,
" আসসালামুআলাইকুম ভাবি! আমি হিমেল"
আমাকে মা আগেই উনার কথা বলেছিলেন। তাই চিনতে পেরে আমি বললাম,
" ওও আপনি! জ্বী ওয়াআলাইকুমসালাম! কেমন আছেন?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভাবি! আপনি কেমন আছেন?"
"আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি"
" ভাবি ফ্রি আছেন? আসলে একটু কথা ছিলো।"
___________________________________________
"হ্যাঁ হ্যালো ফারজানা বলো!"
" ঈশান কোথায় তুমি?"
"এইতো বাসায় আছি। কিছু হয়েছে?"
"না কিছু হয়নি। আসলে দুপুরে আয়ানের সাথে ঝগড়া করেছি। প্লান অনুযায়ী বিয়ের জন্য চাপ দিয়েছি।"
ভিডিও সম্পর্কিত কোনো কিছুই ফারজানা জানে না। ফারজানার সাথে ঝগড়া করে অফিস যাওয়ার পথে আয়ান ভিডিও টা পেয়েছে। তাই ফারজানা এখনো আসন্ন ঝড় সম্পর্কে অবগত নয়।
" তারপর? ও কী বলল?"
" আমার ওপর রাগ দেখিয়েছে। তবে আজকে অযুহাত দেখিয়ে ৩ লাখ টাকা নিতে পেরেছি।"
"বাহ্ খুব ভালো।"
"হুম। তুমি কালকে সকালে আমার সাথে রেসটুরেন্টে দেখা করো। তখন বাকি কথা হবে।
"আচ্ছা।"
চলবে.....................
(লেখিকার নাম ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
⚠️ বি:দ্র: আজ একটু তাড়াতাড়ি দিলাম☺ পরবর্তী পর্বেই ফারজানার কাহিনীর The End করবো ইনশাআল্লাহ্ 🙃👍🏻 আর আয়ান-আদ্রিকার Chemistry শুরু করব🙈🙂