#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_২০
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
সকালের আলো মৃদু করে বাড়ির ভেতরে প্রবাহিত হচ্ছে, আর আয়ানের চোখে সূর্যের প্রথম কিরণ পড়ছে। রাতের গভীরতা এবং প্রেমের অমৃত পটভূমি এখনও তার মনে তাজা। আয়ান ধীরে ধীরে ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং পাশে ঘুমন্ত আদ্রিকার দিকে তাকায়। আদ্রিকার মুখে গভীর প্রশান্তি আর কোমলতা। মুখে রোদ পড়ায় চিকচিক করছে! রাতের প্রেমের মুহূর্তগুলো এখনও তাদের স্নেহের আভায় পরিপূর্ণ। রাতের কথা মনে পড়তেই আয়ান মৃদু হাসলো! কাল মেয়েটাকে সে তো ঘুমোতেই দেয় নি! তবে সেও কি কম নাকি! আয়ানের পুরো পিঠ খাঁমচে খাঁমচে শেষ করে দিয়েছে! আচ্ছা দিক! এটাও ভালোবাসার চিহ্ন!
আয়ান হালকা করে আদ্রিকার চুলের টুকরো সরিয়ে তার মুখের দিকে তাকায়। আদ্রিকা তার উন্মুক্ত বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে, আর মৃদু করে নিশ্বাস নিচ্ছে, যা আয়ানের বুকে ঘূর্ণিঝড় আনতে সক্ষম। মেয়েটা কাল রাতে কি না লজ্জা পেয়েছিলো, আর এখনো তার বুকে মাথা রেখে আরামসে ঘুমোচ্ছে। আয়ান বিছানার পাশে এলোমেলোভাবে অবহেলায় পরে থাকা টি-শার্ট টা হাতে নিলো। আদ্রিকা কে খুব সাবধানে টি-শার্ট টা পরিয়ে দিলো। সে তো জানেই ঘুম থেকে উঠে যখন দেখবে যে তার গায়ে একটা সুতোও নেই, তখন লজ্জায় লাল,নীল,হলুদ,সবুজ সর্বোপরি রঙিন হয়ে যাবে!!! যেটাতে আয়ান মুগ্ধ হলেও আপাতত মেয়েটাকে লজ্জা না দেয়াই ভালো! নাহয় দেখা যাবে আগামী কয়েকদিন আর তার সামনেই আসবে না।
আয়ান ফিসফিস করে ডাকলো,
" আদ্রিকা....আমার প্রিয়তমা! চোখ খোলো। "
আদ্রিকা একটু নড়েচড়ে আরেকটু শক্ত করে লেপ্টে গেলো আয়ানের বুকে। আয়ান বিড়বিড় করে বলল,
" মেয়ে তুমি বড্ড অদ্ভুত! ঘুমের ঘোরে আমার বুকে বিড়ালের ছানার মতো লেপ্টে থাকো! অথচ জাগ্রত অবস্থায় আমার কাছেও আসো না। এ তো ভারি অন্যায়!
আয়ান আবারো ডাকলো,
" বউ উঠে পড়ো ......সকাল হয়ে গেছে!"
আদ্রিকা ঘুমের ঘোরে বলল,
" উমম....না.. এখন ঘুমাই...পরে..."
আয়ান একটু বাঁকা হেসে আদ্রিকার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
“রাত গড়িয়ে সকাল হয়ে গেল, আর তুমি এখনও এই সুখের ঘুমে ডুবে আছো। রাতের কথা মনে পড়ে, আর এখন তোমার গালগুলো এমনভাবে লাল হয়ে উঠেছে, যেন সকালে সূর্যও তোমার লজ্জার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। আমার কিন্তু আবারো মুড আসচ্ছে।”
আদ্রিকার চোখ ফটাফট খুলে যায়। কীসের ঘুম? কোথাকার ঘুম? কেমন ঘুম? কোনো ঘুম নেই ! এমন লাগামছাড়া কথা শোনার পর তার ঘুম "টাটা বাই বাই" দিয়ে শশুড় বাড়ি চলে গেলো!
নাক কুচকে বলল,
" আপনি আবার শুরু করলেন! সারারাত ঘুমোতে দেননি। "
আয়ান ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে বলল,
" সেকি! এত বড় অপবাদ! আমি কী করলাম? আমার পিঠ দেখেছো একবার? তুমিই তো আমার পিঠ চেপে.........."
আদ্রিকা ধড়ফড় করে বলে উঠলো,
"চু.....পপপপ! থাক! হয়েছে! আর এগোতে হবে না! থেমে যান। লাগাম টানুন।"
আয়ান তার হাত দিয়ে আদ্রিকার কপাল স্পর্শ করে, এবং এক ভুতুড়ে দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলে,
"আচ্ছা লাগাম টানলাম। কিন্তু তাই বলে তো সব মিথ্যে হয়ে যাবে না আদ্রিকা। তাই না?"
আদ্রিকা অসহায় কন্ঠে বলল,
" আপনি আগেই ভালো ছিলেন। "
আয়ান ফিক করে হেসে ফেলল।
পরক্ষণেই আদ্রিকাকে আরেকটু পর্যবেক্ষণ করলো। কপালে মিষ্টি ঘাম এবং চোখের কোণে একটু লালচে ভাব দেখা যায়। তার গালগুলো লাল হয়ে গেছে, আর লজ্জার অজানা হালকা হাসি তার মুখে ফুটে ওঠে।
আয়ান মোহময় কন্ঠে বলে,
'সকালের প্রথম আলো তোমার মায়াবী মুখে পড়েছে, আর তোমার লজ্জার হাসি এই সকালে এক নতুন সৌন্দর্য এনে দিয়েছে,” বলেই তার হাত দিয়ে আদ্রিকার চুলের কয়েকটি লোচন ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ পর আবারো আয়ান দুষ্টুমি করে বলে উঠে,
" By the way, আমার টি-শার্ট পরে তোমায় অনেক বেশি হ......উহুম আই মিন সুন্দর লাগচ্ছে।"
এতক্ষণে আদ্রিকার চোখ গেলো নিজের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে বলে উঠে, " আমার শাড়ি!!!"
বলেই আশেপাশে হাতাতে থাকে , তবে শাড়ি পায় না!
" আমার শাড়ি কই ?"
আয়ান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,
" কী জানি কোথায় উড়িয়ে দিয়েছি!"
আদ্রিকা হা করে তাকিয়ে থাকে।
"উড়িয়ে দিয়েছেন মানে?"
" ঐ সময় কি আর নিজের মধ্যে ছিলাম নাকি! কোনদিকে যে উড়িয়ে দিলাম কে জানে!" বলে নিজেও আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলো আয়ান।
আদ্রিকাকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আয়ান একটু সিরিয়াস ভঙ্গিতে আবারো বলল,
" শোনো আদ্রিকা, কাল রাতে তো আমার প্রথম বাসর হলো। তাই না? তো এই জন্য ঘরে একটা বাসর বাসর ভাইব আনতে হবে না? একটা ফিলিংস আনতে হবে তো! তাই তোমার সব কাপড় ছুঁড়ে ফেলেছি "
আদ্রিকা অবাকের রেশ কাটাতে না পেরে ওভাবেই বলল,
"ভাইব আনার সাথে আমার জামা কাপড় উড়িয়ে দেয়ার কী সম্পর্ক?"
" ওসব তুমি বুঝবে না! ছোটো মানুষ তো! এখন ভদ্র মেয়ের মতো উঠে গোসলটা সেড়ে নাও তো। আজ তো তোমাকে নিয়ে বের হবো। ক্যালিফোর্নিয়ার অনেক কিছু দেখাবো তোমায়!"
আদ্রিকা এবার চোখ পিটপিট করে তাকালো আয়ানের দিকে। এটা কে ভাই! এ কে? একে সে চেনে না! সে তো এই আয়ানকে আগে কখনো দেখেইনি! সে তো ভদ্র, সভ্য, রাগী আয়ানকে ভালোবেসেছিলো!!! এই রূপ কোথা থেকে বের হলো তার?
নিঃশব্দে আর নিস্তব্ধতায়, তাদের দুজনের মাঝে এই প্রভাতের আবেগময় মুহূর্ত এক নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে। তাদের প্রেমের গভীরতা এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি, এই সকালে আরও পরিস্কার হয়ে ওঠে।
_________________
এইদিকে, কাল রাতে জবোরদস্ত একটা ঘুম দিয়ে হিমেল উঠে ব্রাশ করতে বাড়ির বাইরে গেলো। সকালের শান্ত পরিবেশে রামিসাও বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করছিল, তার মেজাজ টা খুব খারাপ। কারন সে একটু আগে ঘুমের ঘোরে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। মাথা টা ডলতে ডলতে রামিসা ব্রাশ করচ্ছে আর হাঁটাহাটি করচ্ছে। হঠাৎ করেই, বাড়ির অন্য দিক থেকে হিমেলও ব্রাশ করতে করতে এগিয়ে আসছিল। দুজনেই একে অপরকে দেখতে পায়নি, আর আচমকাই তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়! হিমেল খাম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেও বেচারি রামিসা পড়ে যায়।
রামিসা একটু আগেই দেয়ালের সাথে একটা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে, তাই এইবার আবারো ধাক্কা খেয়ে সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল,
" কে বে কে! সব পিলার গুলো আমার সামনে এনে দিচ্ছে কোন উগান্ডার হা'রা'মি?"
মাটি থেকে উঠে হিমেলকে দেখে আবারো জ্বলে উঠলো নিভে যাওয়া রাগটা! এমনিতেই তার কোমড়ের অবস্থা নাজেহাল! রামিসা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলো,
“এখানে কী করচ্ছেন? দেখে চলতে পারেন না? কেমন মানুষ আপনি! চোখ কি বাংলাদেশে বাথরুমে ঝুলিয়ে রেখে এসেছেন?"
হিমেলও কম যায় না, এমনিতেই রামিসা কে পরতে দেখে অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখেছিলো। একটু হেসে বলল,
“তুমিই তো শুয়ে আছো ভুল জায়গায়! আসলে আমেরিকা এসেই তোমার দৃষ্টি শক্তি কমে গেছে! তোমার তো বাড়ির ভেতরে দাঁত মাজার মতো শিক্ষা নেই, তাই না?”
রামিসাও কোনো ছাড় দিল না,
“শিক্ষা? আপনি কি ভাবছেন, এখানে কেউ আপনার মতো চেহারা দেখে ব্রাশ করবে? ভাগ্যিস আমি আপনাকে দেখে ভয়ে ব্রাশ ফেলে দিইনি!”
হিমেল রাগে গজগজ করে,
“তোমার মতো বেয়াদবের সাথে এই সকালে কথা বলা উচিতই না। নিজের রুমেই থাকতে পারতে!”
রামিসা ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
“আপনার জায়গায় থাকলে আমি নিজে কিছুক্ষণ আয়নায় তাকিয়ে নিজের এই বুদ্ধির জন্য গালাগালি করতাম। কিন্তু আপনি তো সেটা বোঝেন না, তাই দোষ আপনার না?”
হিমেল ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“তোমার কথায় কোনোদিনই যুক্তি থাকে না। পটলের নানি! তুমি বরং নিজের কাজ করো, আর আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও!”
রামিসা একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে বলল,
“আমি তো আপনার সামনে দাঁড়িয়ে মডেলিং করচ্ছি তাই না! ঘুম থেকে উঠেই আপনার চেহারা দেখতে হলো! আপনি আজকে আমার দিনটাই খারাপ করে দিলেন!"
হিমেল ধমক দিয়ে বলল,
“তোমার মতো মানুষের জন্য দিন খারাপ করার সময় আমার নেই! চুপচাপ নিজের রাস্তা দেখো, আর আমাকে বিরক্ত করো না।”
দুজনেই একে অপরের দিকে কটাক্ষের দৃষ্টিতে তাকায়, তারপর একেবারে উপেক্ষা করে নিজের কাজে ফিরে যায়, যেন কিছুই ঘটেনি। ঝগড়াটা হয়ত শেষ হয়নি, তবে আজকের সকালে দুজনেই একে অপরকে আরও একটু অপছন্দ করে ফেলল।
__________________
সকালে সবাই নাস্তা শেষে ড্রয়িং রুমে সোফায় গোল হয়ে বসেছে। আলোচনার বিষয়বস্তু- নয়নতারার বিয়ের কেনাকাটা! বিয়েটা এখানে আমেরিকায় হলেও তারা যথাসম্ভব বাঙালি রীতি তে বিয়ের অনুষ্ঠান করবে। মেহেদী হবে, গায়ে হলুদ হবে, কাজী আসবেন, উকিল আসবে, কবুল বলে বিয়ে হবে- এসব ভাবতেই নয়নতারা লাফিয়ে বলে উঠলো ! আদ্রিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
" জানো ভাবি! আমি কখনোই বাঙালী রীতিতে বিয়ে দেখিনি! ভাবতেই মজা লাগচ্ছে যে আমার বন্ধুরা সবাই এক নতুন পদ্ধতি বিয়ে দেখবে। তাও আবার আমার!"
আদ্রিকা হেসে বলল,
" অবশ্যই ! ইউনিক বিয়ে হতে হবে তোমার!"
তাদের আলোচনার মধ্যেই রামিসা গুরুতর ভঙ্গিতে এসে আদ্রিকাকে বলল,
" ভাবি একটু সাইডে এসো তো ! কথা আছে!"
নয়নতারা ভ্রু কুচকে বলল,
" এইযে ! ও হ্যালো! মিস রামিসা, This is my vabi. যা বলার সামনাসামনি বলো। ওসব সাইডে যাওয়া হবে না!"
রামিসা চেঁতে গিয়ে বলল,
" Excuse me! ভাবি আমার! তোমার না। আজকে আমি তোমার থেকে বয়সে ৩ মাসের ছোট দেখে কিছু বললামনা।"
আদ্রিকা বলল,
" আরে! কী হচ্ছে? সকাল সকাল কী শুরু করেছো? ঝগড়া করো না তো রামিসা। কনের সাথে এমন করে কথা বলতে নেই। নয়নতারার বিয়ে তো !"
রামিসা করুণ কন্ঠে বলল,
" ভাবি একটু এসো না প্লিজ!"
আদ্রিকা সোফা ছেড়ে উঠে বলল," চলো আসছি।"
______________
" একি! রামিসা ! তোমার কোমড় এমন লাল হয়ে আছে কেনো?"
আদ্রিকা কে নিজের ঘরে ডেকে এনে রামিসা তার টপস্ উঠিয়ে তার কোমড় দেখালো। ঐ সময় সে হিমেলের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে খুব বেশি ব্যাথা পেয়েছে। এই কারনে পুরো জায়গাটা লাল হয়ে একটু ফুলে গেছে!
আদ্রিকা আবারো করুন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
" কী হলো রামিসা? তুমি কি আছাড় খেয়েছো? কীভাবে হলো এটা ?"
রামিসা বাচ্চাদের মতো করে বলল,
" পড়ে গিয়েছিলাম ভাবি। সকালবেলা একটা বড়সড় খাম্বা টাইপ পিলারের সাথে ধাক্কা খেয়েছি!"
আদ্রিকা ঔষধের বক্স থেকে মলম বের করতে করতে বলল,
" তুমি যে কী করোনো রামিসা! সারাদিন এভাবে লাফিয়ে বেড়ালে তো আছাড় খাবেই! একটু সাবধানে তো থাকতে পারো। এসো বিছানায় শুয়ে পড়ো। আমি মলম মালিশ করে দিচ্ছি।"
রামিসা ভদ্র মেয়ের মতো বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো।
আদ্রিকা মলম নিয়ে মালিশ করতে থাকলো।
রামিসা হঠাৎ বলে উঠলো,
"ভাবি!"
" হুম বলো।"
" ঐ লোকটাকে তোমরা কেনো এনেছো বলোতো?"
আদ্রিকা বুঝতে না পেরে বলল,
" কোন লোক?"
" ঐ যে চিকার বাপ, হিমেল!"
আদ্রিকা অবাক হয়ে বলল,
"ছিঃ রামিসা! ও তো বয়সে বড় তোমার! এভাবে কেউ বলে? আর আমরা তো আনিনি ওকে। মামনী আনতে বলেছে। এমনিতেও ও কি বাইরের কেউ নাকি!"
রামিসা ওমনি মুখ ফুলালো।
এমন সময় অনিমা চৌধূরী হাঁক ছুঁড়লেন।
"আয়ান, আদ্রিকা, রামিসা !! কই রে তোরা? নিচে আয় জলদি। দেখ কে এসেছে!"
আদ্রিকা আর রামিসা একে অপরের দিকে তাকালো। আদ্রিকা বলল,
" চলো তো দেখি, মামনী কেনো ডাকচ্ছে !"
রামিসা বলল, "হুম চলো ভাবি।"
চলবে......................