#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_২৬
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
" যা বলবে তাড়াতাড়ি বলো রাজিব। আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না।"
" যেটা বললাম সেটাই মনে রেখো।"
রামিসা এইবার চেঁতে উঠে বলল,
"অসম্ভব রাজিব!! এইটা একদমই সম্ভব নয়! মম, ড্যাড তো দূরের কথা! ভাইয়াই আমাকে কখনো অ্যালাউ করবে না!"
রাজিবের এইবার রামিসার গলাটা টি'পে ধরতে ইচ্ছা করলো। মেয়েটা খুব বেশি পরিবারপ্রেমী! কিন্তু এটা সোনার ডিম পারা মুরগি! কোনোভাবে হাতছাড়া করা যাবে না! রেগে গেল তো হেরে গেল! এক রাতের জন্য হলেও একে তার চাই! বন্ধুদের সাথে পার্টির কথা বলে রাজিব কাল রাতে রামিসাকে ঢাকার একটু বাইরে নিয়ে যেতে চাচ্ছে! কিন্তু রামিসা ঢাকার বাইরে ওতো রাতে যেতে নারাজ! তবে রাজিবকে যেভাবেই হোক তাকে নিয়ে যেতেই হবে। সে তার বন্ধুদের অনেক বড় মুখ করে বলে এসেছে।এইসব ভেবে রাজিব চোখ বন্ধ করে নিজের রাগটা কন্ট্রোল করলো। আর শান্ত ও আদুরে কন্ঠে বলল,
"জান......এমন করচ্ছো কেনো? একটা রাতেরই তো ব্যাপার! তুমি কি আমায় ভালোবাসো না? আমার ওপর ভরসা নেই তোমার?"
রামিসা বিরক্তি নিয়ে বলল,
" বিষয়টা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নয় রাজিব! কথা টা বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ। আমাকে একা একা কোনোভাবেই শহর থেকে এতো দূরে যেতে দেবে না। তার উপর আবার রাত থাকতে হবে! আরে ভাইয়া কখনো আমার সন্ধ্যার পরেই বাড়ির বাইরে থাকা অ্যালাউ করে নি! সেখানে ঢাকার বাইরে যাওয়া নিয়ে ভাবাটা জাস্ট বোকামি!!!"
রাজিব এইবার ঢং করে বলল,
" বুঝেছি। তুমি আমায় ভালোবাসো না। আমার ওপর বিশ্বাস নেই তোমার! এই কারনে এমন করচ্ছো। থাক! কী আর কথার! আমারই দোষ! তোমায় ভালোবাসতে পারিনি! বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি !"
রামিসা এইবার কোনো উপায় না পেয়ে বলল,
"আচ্ছা !!!ওকে ওকে ফাইন!! আমি চেষ্টা করবো।"
রাজিব খুশি হয়ে বলল, "সত্যিই????????"
"হুম।দেখা যাক!!!! চেষ্টা করবো।" বলেই রামিসা মুখ গোমড়া করে বসে পড়লো বেঞ্চে। রাজিব ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে মনে মনে বলল,
" মুরগি ফাঁদে পা দিয়েছে!!!!"
_________________
রামিসা যখন ক্লাস সিক্সে পড়তো,তখন থেকেই তার একটা প্রানের বান্ধবী আছে, নাম হলো মণি। আজ এতবছর পরেও তারা একে অপরের খুব ভালো বন্ধু। তাদের সম্পর্কটা বেস্ট ফ্রেন্ড বললেও কম হয়ে যাবে। অনেকে তো বলে তারা মনে হয় আগের জন্মে জমজ বোন ছিলো! তাদের বন্ধুত্ব রক্ষার্থে কখনোই তারা আলাদা হতে চায়নি। এই কারনে এসএসসি পাশের পর একই কলেজে ভর্তি হয়। তবে রাজিবের সাথে রামিসার রিলেশনটা মণিও মেনে নিতে পারে না! প্রথম থেকেই মণি রাজিবকে দুচোখে সহ্য করতে পারে না। মণির মতে রাজিব একটা লেজ কাটা কু'কু'র! এই কারণে রাজিবের বিষয়ে কোন কথা রামিসা মণিকে বলতে পারে না। কিন্তু আজ সে বাধ্য হয়ে মণিকে কল করলো। কিন্তু কল ধরার সাথে সাথে রামিসা একটা ঝড়ের সম্মুখীন হলো!
" আবে এইইই! এই হা'রা'মি! বা* আজ কলেজে আসিস নি কেন বলতো? জানিস তোর জন্য সিট ধরে রাখতে রাখতে আমার জানটাই চলে যাচ্ছিলো! আসবিনা আগে বলিসনি কেন! হুদাই আমার এনার্জি লস হলো! "
রামিসা একটু আমতা আমতা করে বলল,
"আসলে একটু কাজ ছিলো তো......... আচ্ছা শুন একটা কথা ছিলো তোর সাথে।"
___________________________
আয়ান একটু আগেভাগেই আজ অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে আসলো। কারণ,আজ সে আদ্রিকা কে নিয়ে শপিং করতে যাওয়ার কথা দিয়েছে। আদ্রিকার কিছু কসমেটিক্স কিনতে হবে। আদ্রিকাও সুন্দর একটা শাড়ি পরে তৈরি হয়ে নিয়েছে। আয়ান নিচ থেকে হাঁক ছুঁড়লো।
" কী হলো বউউ ??? কী করচ্ছো এতক্ষণ ধরে? তাড়াতাড়ি এসো। তুমি এমনিতেই অনেক সুন্দর। ওতো সাজগোজ করতে লাগবেনা।"
আদ্রিকা শাড়ির কুচি ঠিক করচ্ছিলো। আয়ানের এমন আদুরে ডাক শুনে সে ভ্রু কুচকে বিড়বিড় করে বলল,
" লোকটা দিনদিন অ'শ'ভ্য হয়ে যাচ্ছে! বাড়িতে মা আছে, বাবা আছে, তাও কোনো সংকোচ নেই। অ'শ'ভ্য পুরুষ! এখন মনে হচ্ছে আগের আয়ানই ভালো ছিলো! অন্তত ভদ্র তো ছিলো!!"
আদ্রিকা কুচি ঠিক করতে করতেই ঘর থেকে বের হয়ে এলো। বলা যায় না! বেশি দেরি করলে এই লোক কখন আবার জান, সোনা বলে ডাকা শুরু করে দেয়!! আদ্রিকা কে নিচে নামতে দেখে আয়ান এক হাত বুকের বাম পাশে রেখে ক্রাশ খাওয়ার মতো ভাব করে বলল,
" হায়য় ! মার ডালা!"
এটা দেখে আদ্রিকা মুখ কুচকে বলল,
"আপনি আজকাল খুব বেশি ঢং করচ্ছেন ! এত ঢং কই থেকে আসচ্ছে আপনার বলুন তো ?"
আয়ান বুকের বাম দিকেই হাত রেখে বলল,
" এখান থেকে বেবি ।"
আদ্রিকা মুখ ভেংচালো।
____________________
রামিসা ভয়ে ঢোক গিলল। এতক্ষন ধরে সে ফোনে গড়গড় করে মণিকে রাজিবের সব কথা বলে দিয়েছে। মণির সামনে গিয়ে এসব বললে সে নির্ঘাত এলোপাথাড়ি থাপ্পড় খেতো। তাই ফোনে বলাটাই সে নিরাপদ মনে করেছে। কিন্তু এখন ফোনেই মণির রাগে ফোসফোস করাটা শুনতে পাচ্ছে রামিসা, যেটা তার ভয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২ মিনিট হয়েছে সে বলা শেষ করে কানে ফোন ধরে আছে। কিন্তু মণি তখন থেকেই চুপ করে আছে। মণির এই নীরবতা যে আগাম ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস সেটা খুব ভালো করেই টের পাচ্ছে রামিসা। তৃতীয় বারের মতো ঢোক গিলে রামিসা আস্তে করে বলল,
"হ্যালো ম...মণি! কিছু বলছিস না কেনো?"
মণি শান্ত স্বরে খোঁচা দিয়ে বলল,
"হাহ্! আমার কিছু বলার নেই। আমার কথা তুই গত এক বছর ধরেই শুনছিস না। ঐ কু'ত্তার কাছেই যা তুই! আমার কথা শুনে করবি কী? যা খুশি তাই কর! Go to the hell !!" বলেই ফট করে কল কেটে দিলো মণি। রামিসা হ্যালো বলতে গিয়েও পারলো না।
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রামিসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে মণির এমন ঠান্ডা রিয়েকশনে সে অবাক হয়ে গিয়েছে। সে তো ভেবেছিলো যে মণি ফোনের মধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোষনা দিয়ে দেবে! যাইহোক, এখন তাকে কালকে রাতের জন্য প্লান করতে হবে। যেহেতু তার শেষ ভরসা মণি কোনো সাহায্য করলো না, সেহেতু তাকে এখন সেটাই করতে হবে যেটা সে করতে চাচ্ছিলো না। হ্যাঁ! তাকে কাল রাতে বাড়ি থেকে পালিয়েই রাজিবের সাথে যেতে হবে! এটা ছাড়া উপায় নেই!
____________________
" উফ্ফফফফ!! আপনি কী শুরু করেছেন বলুনতো? যা পাচ্ছেন তাই তুলে নিচ্ছেন! হচ্ছে টা কী?" আদ্রিকার বলার মধ্যেই আয়ান একটা লাল রংয়ের গাউন হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে নিয়ে নিলো।
আদ্রিকা আবারো বলে উঠলো,
" আবার লাল! একটু আগেই না ঐখানের সারি থেকে একটা লাল রংয়ের টপস্ নিলেন! "
আদ্রিকার বকবকানি পাত্তা না দিয়ে আয়ান ইউটার্ন মেরে আবার শাড়ির সাইডে গেলো। শপিংমলে ঢোকার পর থেকে আদ্রিকার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে আয়ান! সে রীতিমতো শপিংমলের ফিমেইল সাইডে এসে যা পাচ্ছি সব তুলে নিচ্ছে! শাড়ি, টপস, গাউন কিচ্ছু বাদ রাখিনি সে! আদ্রিকাকেও কথা বলতে দিচ্ছে না! আরে আদ্রিকা তো কসমেটিক্স কিনতে এসেছে! সে যদি জানতো এই লোক এখানে এসে এমন পাগলামো শুরু করবে তাহলে সে একাই আসতো! আদ্রিকা অবাক হয়ে যাচ্ছে তার এমন ভাব দেখে! এতগুলো জামাকাপড় কে পড়বে ভাই? আয়ান কে তখন থেকে থামানোর চেষ্টা করছে আদ্রিকা! কিন্তু সে বরাবরই ব্যর্থ! আয়ানের মতে লেটেস্ট সব জামাকাপড় সে আদ্রিকার জন্য নেবে। তাদের পছন্দ হওয়া জামাকাপড় বহন করতে করতে শপিংমলের কর্মচারীরাও রীতিমতো বিরক্ত হয়ে গেছে! আয়ানের পিছু পিছু ঘোরা কয়েকজন ফিমেইল স্টাফ ক্লান্ত হয়ে আদ্রিকার দিকে অসহায় চোখে তাকালে আদ্রিকা একটা মেকি হাসি দেয়!
আয়ান যখন আদ্রিকার জন্য ৪র্থ বারের মতো শাড়ি পছন্দ করতে ব্যস্ত তখন আদ্রিকা আয়ানের পাশে এসে বলে,
" আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলুন তো। আপনি কি ফুটপাতে বসে জামা কাপড়ের দোকান দেয়ার কথা ভাবচ্ছেন? এতগুলো কাপড় কাকে পড়াবেন আপনি?"
আয়ান এমনভাবে তাকালো যেন আদ্রিকা তার কাছে তার জানটা চেয়ে নিয়েছে! অবাক হয়ে বলল,
" কে আবার পড়বে? তুমি পড়বে। শোনো, আমি আমার বউকে একেকদিন একেক রূপে দেখতে চাই! তুমি এইসব পড়ে আমার সামনে ঘুরঘুর করবে! আর বারবার ম'রে যাব সেই মুগ্ধতায়।"
আদ্রিকা তো মনে মনে বলল,
"হ্যাঁ হয়েছে!!!! আমার ঠ্যাকা পরেছে না!! যে আমি এইসব জামাকাপড় পরে সেজে আপনার সামনে ঘুরঘুর করব আর আপনি পাগল হয়ে গত পরশুর মতো আমাকে তুলে বিছানায় আছাড় মারবেন! নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মতো এমন বোকামি আমি জীবনে আর করবোনা!"
কিন্তু আয়ানের সামনে অসহায় কন্ঠে সে বলল,
"তাই বলে এতো! গোটা শপিংমলই তো উঠিয়ে নিয়ে যাবেন মনে হচ্ছে! আপনি কি এই বছরে আর শপিং করবেন না বলে পণ করেছেন? টাকা বেশি হয়ে গেছে আপনার?"
আদ্রিকার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একটু বাম পাশে সারি করে সাজিয়ে রাখা রঙ বেরঙের নাইটিগুলোর দিকে তাকিয়ে আয়ান আদ্রিকার কানের কাছে গিয়ে বলল,
" উহুম!!! ইয়ে বউ! তোমার জন্য একটা না'ই'টি নেবে নাকি?"
আদ্রিকা চোখ বড় করে তাকাতেই আয়ান বলল,
"না মানে ,,দেখতাম আর কি! ওটা পড়ে তোমায় কতটা হ'ট লাগে। যদিও তোমায় টপস্ পড়লেই অনেক হ'ট লাগে..তাও একটু......
এইবার আদ্রিকা অগ্নিঝরা চোখে কটমট করে তাকালো আয়ানের দিকে। সেটা তোয়াক্কা না করেই আয়ান উৎফুল্ল কন্ঠে আবারো বলে উঠলো,
" তবে হ্যাঁ বউ, তুমি যখন গোসল শেষে তোয়ালে পরে বের হও, তখন তোমাকে অনেক বেশি হ'ট লাগে! এতটাই হ'ট লাগে যে আমার ইচ্ছে করে তোমার আবার গোসলের বোন্দাবস্ত করে......"
এইবার আদ্রিকা আর নিতে না পেরে হুড়মুড় করে বাম হাত আয়ানের ঘাড়ে রেখে ভর দিয়ে ডান হাতে আয়ানের মুখ চেপে ধরে চাপা স্বরে বলে উঠে,
" চুপ করুন অ'শ'ভ্য নি'র্ল'জ্জ ঠোঁটকাটা মানব! একদম চুপ! এই পাব্লিক প্লেসে আর একটা লাগামছাড়া কথা বললে আমি আপনার মুখে করলার রস ঢেলে ঠোঁটে কেরোসিন দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেবো বলে দিলাম!"
চলবে..........................
⭕Note: আগামী পর্বে হিমেল-রামিসা জুটির এক ধামাকা আসতে চলেছে.....👀এখন থেকে আয়ান-আদ্রিকার অংশ একটু কম থাকবে।🙆♀️ হিমেল আর রামিসার কাহিনী টা এগিয়ে নিই😌