বাতাসের বেগ একটু একটু করে বাড়ছে তুরাগ তড়িঘড়ি করে আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে আরও দুটো পাঁচ টাকা দামের আইসক্রিম কিনে নেয়। চৈতি তখন ঘাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।তুরাগ চৈতির পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। মান ভাঙানোর কোনো অভিজ্ঞতা তার নেই, তাই সে অনেকটা আনাড়ির মতোই একটা আইসক্রিম চৈতির চোখের সামনে ধরে। চৈতি নড়ে না, আইসক্রিমটা গ্রহণ করা তো দূরের কথা, সে তুরাগের দিকে ফিরেও তাকায় না। তুরাগ একটু ঝুঁকে এসে নরম গলায় শুধায়,
"রাগ করছেন?"
চৈতির পক্ষ হতে কোনো উত্তর আসে না। তুরাগ এবার আরেকটু জুকে পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
"অনেক বেশি রাগ করছেন?"
চৈতি এবারও নিরুত্তর। তুরাগ আবারও বলে,
"থাক আর রাগ কইরা থাইকেন না।আমি নায়র দিতাম না তো আপনারে।"
তুরাগ আবারও এগিয়ে দেয় আইসক্রিম টা চৈতি নেয়না কোনো কথাও বলেনা তাই তুরাগের এইবার একটা ছড়া মনে হয়,
"আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ
এত ডাকি তবু কথা কও না কেন বউ?"
চরম বিরত্তিতে চৈতি চিৎকার করে বলে ওঠে,
"শাট আপ!"
তুরাগ যেন আকাশ থেকে পড়ে। সে বড় বড় চোখে তাকিয়ে সে বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বলে,
"ওরে বাবা! কথায় কথায় দেখি ইংলিশ মারে! দেখমু আর কত বউয়ের ডং!"
তুরাগ আবারও আইসক্রিমটা চৈতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বিড়বিড় করতে থাকে। এই মেয়েটিকে বোঝা আসলেও তার সাধ্যের বাইরে। বিলের ঝোড়ো হাওয়ায় চৈতির অবিন্যস্ত চুলগুলো অবাধ্য হয়ে উড়ছে, আর তুরাগ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানিনীকে।আর মনে মনে ভাবে, তার কপালে কি এমন গাল-ফুলানো বউই লেখা ছিল? কিছু বললে রাগ, না বললেও রাগ ঘুমানোর আগে রাগ, ঘুম থেকে উঠে রাগ খেতে বসলে রাগ, খাওয়া শেষ করে রাগ! সারাদিন একটা মানুষ এত রাগ কীভাবে করতে পারে? তুরাগের তো এখন প্রবল সন্দেহ হয় যে সে কোনো রক্ত-মাংসের মেয়েকে নয়, বরং একটা জলজ্যান্ত রাগের ডিব্বাকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে।তুরাগ ফুস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পরিবেশ হালকা করার চেষ্টায় বলে,
"আম খাইবেন? কাঁচা আম?"
চৈতির মনের ভেতর লাড্ডু ফুটে। কাঁচা আমের কথা শুনে তার জিভে জল এলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। লোকটাকে আজ সে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেবে রাগানোর ফল কী তেতো হতে পারে! সে পাথরের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তুরাগ এবার অনেকটা জোর করেই আইসক্রিমটা চৈতির হাতে গুঁজে দিয়ে বলে,
"চলেন, দেরি হইলে মাছ পামু না।"
কথাটা বলেই তুরাগ চৈতির হাত শক্ত করে ধরে টানতে টানতে এগিয়ে যেতে থাকে। চৈতি বাধ্য হয়েই তার পিছু নেয়। তবে এবার আর রাগ ধরে রাখতে পারে না, আইসক্রিমে একটা বড় কামড় দিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করে,
"আমার আম...?"
তুরাগ নৌকায় বসতে বসতে চৈতির দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়,
"নৌকাতে আছে।"
চৈতি আর কোনো কথা বাড়িয়ে নিজের রাগকে পাতলা করতে চায় না। সে চুপচাপ নৌকার এক কোণায় বসে থাকে। তুরাগ নিচু হয়ে নৌকার তক্তার নিচ থেকে বড় বড় দুটো কাঁচা আম বের করে আনে। তারপর শার্টের পকেট থেকে একটা ঝিনুক বের করে, যার মাঝখানটা গোল করে ভাঙা। তুরাগ ঝিনুকটা দিয়ে নিখুঁতভাবে আমের খোসা ছাড়াতে থাকে। ঝিনুকের ধারালো অংশে আমের সবুজ ত্বক পেন্সিল শার্পনারের মতো গোল হয়ে উঠে আসছে।চৈতি আগে কখনো এভাবে ঝিনুক দিয়ে আম ছিলতে দেখেনি। সে বিস্ময় নিয়ে তুরাগের হাতের শৈলী দেখে। তুরাগ আমের খোসা ছাড়ানো শেষ করে আমটি ধুয়ে ঝিনুক দিয়ে কেটে পুরোটা চৈতির দিকে বাড়িয়ে দেয়। চৈতি আমটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"নৌকাতে আমও আসলো কিভাবে?"
তুরাগ নিপুণ হাতে বৈঠা চালাতে চালাতে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
"দাদারে কইছিলাম।"
চৈতি আমের টক-মিষ্টি স্বাদটা নিচ্ছে। তার মনের তিক্ততা কিছুটা হলেও ধুয়ে দিয়েছে। তুরাগ একমনে বৈঠা টানছে, পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। চৈতি আমের আঁটিটা চুষতে চুষতে তুরাগের দিকে তাকিয়ে বলে,
"শোনেন, আজকের পর থেকে আমারে আপনি তুমি করে বলবেন।"
তুরাগ বৈদেরি না করে সপাটে জবাব দেয়,
"পারতাম নেহি।"
চৈতি ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকায়। লোকটার মুখের ওপর না বলার অভ্যাসটা একটু বেশিই। সে বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
"কেন? সমস্যা কী? আমি আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট, সেই হিসাবে আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন।"
তুরাগ এবার বৈঠাটা একটু জোরে টেনে নৌকার গতি বাড়ায়। তারপর একই রকম একগুঁয়ে সুরে আবার বলে,
"কইছি তো একবার, পারতাম না।"
চৈতি এবার একটু জেদ ধরেই বসে। আমের খোসাটা পানিতে ফেলে দিয়ে সে তুরাগের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
"কিন্তু কেন পারবেন না? কারণটা কী?"
তুরাগ এবার বৈঠাটা আলগা করে দেয়।তারপর মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলে,
"তুমি করে বললে আমার কেমন জানি প্রেম প্রেম পায়।"
তুরাগের কারণ শুনে চৈতি হুট করে হেসেই ফেলে। খিলখিল করে হাসতে হাসতে সে প্রায় নৌকার তক্তায় গড়িয়ে পড়ার অবস্থা। এই কর্কশ আর রুক্ষ মানুষটারও নাকি লজ্জা আছে এই কথা তাকে শুনতে হবে তা সে জীবনেও ভাবেনি। হাসি থামিয়ে সে অবাক হয়ে ভাবে, একী অদ্ভুত কথা শুনতে হলো তাকে!
চৈতি হাসতে হাসতে চোখ মুছে,হাসির কারনে চোখে পানি চলে এসেছে,
"তার মানে আপনি আমাকে তুমি বলতে লজ্জা পান?"
তুরাগ বৈঠা থামিয়ে গম্ভীর মুখে পালটা প্রশ্ন করে,
"আমি কি একবারও কইছি আমি লজ্জা পাই? আমি কইছি আমার প্রেম প্রেম পায়। ব্যাপারটা বুঝেন নাই?"
তুরাগের সোজাসাপ্টা কথার মানে বুঝতে পেরে চৈতির হাসি উধাও হয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা কেমন জানি ধক করে ওঠে, মুখটা একদম চুপসে যা। এইবার তুরাগ হাসতে শুরু করে, ঠিক চৈতি যেভাবে একটু আগে তাকে নিয়ে হাসছিল। তুরাগ হাসতে হাসতেই খেয়াল করে, আকাশের রূপ হঠাৎ বদলে গেছে। এতক্ষণ যে হালকা মেঘের আনাগোনা ছিল, সেখানে এখন ঘন কালো মেঘের পাহাড় জমেছে। চারপাশ অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে। তারা দুইজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। তুরাগের এই ছোট ডিঙি নৌকার এত ঝোড়ো বাতাস সইবার ক্ষমতা নেই। মুহূর্তের মধ্যে ঢেউয়ের দোলায় আর বাতাসের ঝাপটায় নৌকাটি টালমাটাল হয়ে পড়ে। সবকিছু ওলটপালট হতে এক পলকও সময় লাগে না। একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা উল্টে যায়। তুরাগ জন্ম ইস্তক এই বিলের পানিতে বড় হয়েছে, তাই সে পরিস্থিতি দ্রুত সামলে নিয়ে ভেসে থাকতে পারে। কিন্তু চৈতি অপ্রস্তুত ছিল। সে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই উল্টে যাওয়া নৌকার নিচে তলিয়ে যায়।বিলের ঘোলা জল আর অন্ধকার আকাশের নিচে তুরাগ চিৎকার করে ওঠে,
"রাজকন্যা! কই আপনি?"
তুরাগের কণ্ঠস্বর বাতাসের গর্জনে মিশে যাচ্ছে। তার চিৎকারে এক বুক হাহাকার। চৈতির কোনো সাড়াশব্দ নেই, পানির ওপর কেবল উল্টে থাকা নৌকার কাঠটা ভেসে আছে। তুরাগ উন্মাদ হয়ে চারপাশের ঘোলা জলে হাতড়াতে থাকে। তার বলিষ্ঠ হাত দুটো কাঁপছে, বুক চিরে বেরিয়ে আসে আর্তনাদ,
"ও রাজকন্যা! আমার রাজকন্যা কই আপনে?"
বিলের উত্তাল ঢেউগুলো যেন তাকে উপহাস করছে। চারপাশের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে আসে। তুরাগের চোখের সামনে পৃথিবীটা হঠাৎ ঝাপসা হয়ে আসে। তার শরীরের সমস্ত শক্তি নিংড়ে নেয় এই হিমশীতল পানি।
"মাঝি! এই মাঝি! এই বয়রা মাঝি, কই হারিয়ে গেলেন?"
চৈতির চঞ্চল ডাকটা কানে আসতেই তুরাগের হুঁশ ফেরে। সে পিটপিট করে চোখ মেলে ব্যাকুল হয়ে চৈতির দিকে তাকায়। এই তো চৈতি একদম সুস্থ, তার সামনেই নৌকায় বসে আছে। তুরাগ দ্রুত চারপাশে তাকায় বিলের পানি শান্ত, আকাশও আগের মতোই হালকা মেঘলা। তাহলে কি সে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছিল? কিন্তু ভয়ংকর বাতাস, নৌকার উল্টে যাওয়া, আর চৈতিকে হারানোর হাহাকার সবকিছুই তো তার কাছে একদম জীবন্ত লেগেছে! মানুষের মন কি এত দ্রুত বিভ্রম তৈরি করতে পারে?চৈতি এবার তুরাগের কপালে ভাঁজ দেখে একটু উদ্বিগ্ন গলায় ডাকে,
"কী হয়েছে আপনার? অমন হাঁ করে তাকিয়ে কী দেখছেন?"
তুরাগ কয়েকটা বড় বড় শ্বাস নিয়ে ফুসফুসের বাতাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। সে এখনো আতঙ্কের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু নিজের দুর্বলতা ঢাকতে সে তড়িঘড়ি করে মুখে বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তোলে। চৈতির দিকে তাকিয়ে বলে,
"কিছু না। আপনার হাসি দেইখা মনে হয় কয়েক সেকেন্ডের লাইগা কোমায় গেছিলাম গা!"
চৈতি বিচ্ছিরি মুখভঙ্গি করে ভেংচি কাটে। তবে আজ সে আর নতুন করে মেজাজ খারাপ করতে চায় না। সে একটু নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
"একটা প্রশ্ন করি?"
তুরাগ আবার বৈঠাটা শক্ত করে হাতে নেয়। নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দটা আবার শুরু হয়। সে নির্লিপ্ত গলায় বলে,
"না করলেও তো কইবেন, কন হুনি কী কইবেন।"
চৈতি একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলে,
"আমাকে বিয়ে করেছেন কেন? মানে, এইভাবে গ্রামের মানুষ বিচার বসালো আর অমনি আপনি বিয়ে করে ফেললেন? কারণটা কী?"
চৈতির প্রশ্নটা শুনে তুরাগের খুব মজা লাগে। এতক্ষণে মেয়েটা একটা যুতসই প্রশ্ন করেছে। তুরাগ অনেক বড় কোনো আপসোসের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে এমন একটা ভঙ্গি করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
"আরে বুঝেন নাই ব্যাপারটা? আমি হইলাম কাইল্লা মানুষ। অহন আমার বউও যদি কাইল্লা হয়, তাইলে তো আমার যে পুনা গুলা আইবো, হেইগুলাও তো কুচকুচে কাইল্লা হইয়া জন্মাইবো! হেই বংশ রক্ষার চিন্তা কইরাই তো এই রিস্ক লইয়া লাইছি। লাইনে আপনারে...!"
তুরাগ কথাটা শেষ না করেই থেমে যায়। তার গলার কাছে কিছু একটা আটকে গেছে। তাকে এভাবে মাঝপথে থেমে যেতে দেখে চৈতির কৌতূহল বেড়ে যায়। সে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে,
"নাহলে আমি কী? থামলেন কেন?"
তুরাগ নিজের বত্রিশটা দাঁত বের করে এক গাল হাসি দিয়ে বলে,
"আপনে একটা সুন্দর জামাই পাইতেন, আর আমি একটা কাইল্লা বউ পাইতাম। কিন্তু কপাল আমার খারাপ, পাইলাম একটা রাগের ডিব্বা! এর বেশি আর কিছু কইতে চাই না, আমি একদম সত্তি কইতাছি!"
চৈতি বিড়বিড় করে বলে,
"বজ্জাত মাঝি।"
সে আস্তে বললেও তুরাগ ঠিকই শুনতে পায়,
"আপনারই মাঝি।"
চলবে….
(রেসপন্স করতে বললে অনেকে এমন ভাবে বলে যে তাদের ধন সম্প্রতি চেয়েছি আমি। কেউ কেউ তো অন্য লেখিকার সঙ্গে তুলনা করে বলে ওই লেখিকা দিনে ২ পর্ব দেয় মাঝেমধ্যে ৩-৪ পর্ব দেয় আর আমি সারাদিনে এতটুকু দিয়ে রেসপন্সের আশা করি কিভাবে? আপনাদের বুঝতে হবে আমি মানুষ কোনো রোবট না।আজকে তাড়াতাড়ি পর্ব দিবো বলে গতরাতে তিনটা পর্যন্ত আমি লিখেছি কারণ আজ আমার সময় নেই। রেগুলার গল্প দিয়েও যদি এত অভিযোগ থাকে তাহলে আমি সত্যি দুঃখিত এর থেকে বেশি পর্ব দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নিজের অনেক পার্সোনাল কাজ আছে। না ঘুমাতে পারলে আমার প্রেশার অনেক বেড়ে যায় মাঝেমধ্যে মনে হয় ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে যাবে তাও আমি রাত জেগে লিখি তাও আপনাদের মন পাচ্ছিনা।আমি আবারও দুঃখিত আমার কথায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে।)