ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্র শেষে শ্রাবণধারা

২০তম পর্ব

লেখক: চিন্ময়ী নূর

২০ (প্রথমাংশ)

চারপাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা, কেবল বৃষ্টির একটানা শব্দটাই জানান দেয় যে প্রকৃতি আজ কতটা উত্তাল। রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর ছুঁইছুঁই।ঘরের এক কোণে রাখা কুপিটা মিটিমিটি করে জ্বলছে। সেই ক্ষীণ হলদেটে আলোয় ঘরের ভেতরে ছায়ারা দেয়ালে নাচানাচি করে। চৈতি একপাশে ফিরে বেঘোর ঘুমে মগ্ন ঘুমের ঘোরে তার মুখটা একদম নিষ্পাপ শিশুদের মতো দেখায়।কিন্তু তুরাগের চোখে আজ ঘুম নেই। সে পাশ ফিরে শুয়ে একদৃষ্টিতে চৈতির পিঠের দিকে তাকিয়ে আছে। কুপির টিমটিমে আলোয় চৈতির অবয়বটা অনেকটা ভুতুড়ে লাগছে। তুরাগ আলতো করে নিজের হাতটা বাড়িয়েও মাঝপথে থামিয়ে দেয়। পাছে চৈতির ঘুম ভেঙে যায়! কিন্তু আজ তুরাগের অস্থির মনটা এই সামান্য দূরত্বটুকুও সহ্য করতে পারছে না। মন কিছু একটা চাচ্ছে। সে খুব আলতো করে, ফিসফিসিয়ে চৈতিকে ডাকে,

"ও রাজকন্যা...!"

চৈতি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। দুই-তিনবার ডাকার পর সে একটু নড়েচড়ে ওঠে। তারপর অতি কষ্টে ঘুম-ঘুম চোখে তুরাগের দিকে ফিরে তাকায়। চৈতি ফিরতেই তুরাগ তার দিকে একটু ঝুঁকে আসে। কুপির টিমটিমে আলোয় তুরাগের চোখ দুটো আজ বড্ড অন্যরকম দেখায়— কেমন যেন আকুলতায় ভরা। সে খুব নিচু স্বরে বলে,

"ও বউ, আপনার বুকে একটু জায়গা দিবেন?"

চৈতি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে তুরাগের দিকে। ঘুমের ঘোরটা মুহূর্তেই ছুটে যায়। লোকটা কি আজ নেশাপানি করেছে? লোকটা মাঝরাতে এসব কী উল্টোপাল্টা বকছে! চৈতি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বিরক্ত আর বিস্ময় মিশিয়ে বলে,

"কী খেয়েছেন আপনি এই রাতে?"

তুরাগ এবার চৈতির দিকে আরও একটু ঝুঁকে আসে, কিন্তু তার শরীরের সাথে চৈতির শরীর একটুও লাগে না। সে খুব সন্তর্পণে নিজের সীমা বজায় রেখেই এক অদ্ভুত আবদার করে বসে।

"দেন না গো একটু জায়গা। ঘুম আসছে না তো আপনার বুক ছাড়া।"

চৈতির বুকের ধুকপুকানি ঢাকের শব্দের মতো নিজের কানেই বাজে। সে মুখ দিয়ে কিছু বলতে চায়, কিন্তু গলার কাছে শব্দগুলো দলা পাকিয়ে আটকে থাকে। অবশ অনুভূতি আর এক অজানা আবেশে সে কাঁপাকাঁপা হাত তুরাগের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

তুরাগ এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করতে চায় না। চৈতির সম্মতির আভাস পেতেই সে এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকে। চৈতির গায়ের ঘ্রাণ আর ওমটুকু না পাওয়া পর্যন্ত তার অস্থিরতা কাটে না। মিনিট খানেক নিবিড়ভাবে চৈতির বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে তুরাগ।এরপর ধীরে ধীরে মাথা তোলে , কুপির টিমটিমে হলদেটে আলোয় চৈতির মুখ ঘামে চিকচিক করছে। তুরাগ তৃষ্ণার্ত চোখে একবার চৈতির মুখের দিকে তাকায়, তারপর তার দৃষ্টি স্থির হয় চৈতির কণ্ঠনালিতে। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে তুরাগের, একবার সজোরে ঢোক গেলে সে। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। খুব ধীরলয়ে, অনেকটা সময় নিয়ে সে চৈতির কণ্ঠনালিতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়। চৈতি শিউরে ওঠে, বারবার কেঁপে ওঠে তার সারা শরীর। এক অজানা শিহরণে তার চোখ দুটো বুজে আসে।

তুরাগ আবারও মাথা তোলে। তার চোখেমুখে এখন এক বিচিত্র আকুতি,সে আর একটা আবদার করে বসে,

"কিছু মিছু করি? আপনে কি রাগ করবেন? কইরেন না রাগ, হুম? আপনে রাগ করলে আমি কার লগে কথা কমু কন? আমার তো কেউ নাই আপনে ছাড়া।"

চৈতি কোনো উত্তর দেয় না, শুধু তুরাগের পিঠে নিজের হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরে। বাইরে বৃষ্টির অঝোর ধারা আর ঝোড়ো হাওয়া আজ সাক্ষী হয়ে রয় এই একলা ঘরে, কুপির মিটিমিটি আলোয় একজোড়া অসম হৃদয়ের নিভৃত মিলনের।

~

বাড়ির কিনারা পর্যন্ত বিলের পানি থই থই করছে। চৈতি কৃষ্ণচূড়া গাছে ঝোলানো দোলনাটায় বসে আলগোছে দোল খাচ্ছে। সে যখনই সামনের দিকে এগিয়ে যায়, বিলের শীতল জল এসে তার পায়ের পাতা ছুঁয়ে দেয়। আকাশের মুখ ভার, আর একদিন এমন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হলে ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে পানি ভেতরে ঢুকে পড়বে। তুরাগ আজ ঘরকুনো হয়ে আছে। সকাল থেকেই সে রান্নাঘরের দখল নিয়েছে, চৈতিকে ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয় নি। মশলার সুবাস আর আগুনের তাপে ঘামতে ঘামতে সে নিজের হাতেই সব রান্না শেষ করে। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে তুরাগ গামছায় হাত মুছতে মুছতে চৈতিকে ডাক দিতে চায়। কিন্তু ডাকার আগমুহূর্তে তার চোখ আটকে যায়। সামনের দৃশ্যটা তুরাগের মতো মানুষের বুকেও অন্যরকম দোলা দিয়ে যায়। বিকেলের মরা আলো আর মেঘলা আকাশের ধূসরতা মিলে চৈতির অবয়বে মায়া মাখিয়ে দিয়েছে। তার অবিন্যস্ত চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে, আর পায়ের নিচে বিলের ঘোলা জলের সাথে তার এক নিবিড় খেলা চলছে। চৈতি উদাস চোখে বিলের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। তুরাগ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার রাজকন্যা'র দিকে। নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। তুরাগ পা টিপে টিপে চৈতির পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। অবাধ্য বাতাসে ওড়া চৈতির চুলগুলোর দিকে হাত বাড়ায় সে। অযত্নে আর অবহেলায় রেশমি চুলগুলো এখন বেশ রুক্ষ হয়ে গেছে। চৈতি একবার ঘাড় ফিরিয়ে তুরাগের দিকে তাকিয়ে একচিলতে মুচকি হাসি দেয়। তুরাগও হাসির প্রতিদান দিয়ে আরও একটু ঘেঁষে দাঁড়ায় চৈতির পিঠের দিকে।

"উডেন, খাইয়া লন। খাওয়ার পর আপনার মাথায় তেল দিয়া দিমু।"

তেলের কথা শুনেই চৈতির কপাল কুঁচকে যায়। বছরে মনে হয় না সে একবারও মাথায় তেল দেয়।তেলের চিটচিটে ভাব আর উৎকট গন্ধ তার দুচোখের বিষ। সে সপাটে উত্তর দেয়,

"আমি তেল দিব না। তেলের গন্ধ একদম সুন্দর না।"

তুরাগ এবার বয়স্কদের মতো বোঝাতে শুরু করে,

"বাদামের তেল, অনেক ভালো। দেখবেন আপনার রুক্ষ চুলগুলা কেমন সুন্দর হইয়া যাইবো।"

চৈতি এইবার তুরাগের মতো করে বলে,

"আপনে দেনগা, আমি দিতাম না!"

চৈতির মুখে নিজের মতো অশুদ্ধ আর গ্রাম্য টান শুনে তুরাগ হেসেই ফেলে। তারপর সুর নরম করে বলে,

"আইচ্ছা, দিয়েন না। এহন খাইতে আইয়েন তো দেহি।"

চৈতি এবার উঠে দাঁড়ায় এবং তুরাগের হাতটা শক্ত করে ধরে। তুরাগ তাকে টেনে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে মৃদু স্বরে বলে,

"আমি জীবনেও ভাবি নাই যে কোনো নারীর লাইগা আমি নিজের হাতে রাইন্ধা দিমু।"

চৈতি তার কথার রেশ ধরে রসিকতা করে বলে,

"কিন্তু আমি ঠিকই ভেবেছিলাম বিয়ের পর নিজের স্বামীকে দিয়ে প্রতিদিনই রান্না করাব!"

তুরাগ থামে। চৈতির দিকে একপলক আড়চোখে তাকিয়ে বলে,

"মীরজাফরের বংশধর! একদিন রাইন্ধা দিছি এইডাই শুকরিয়া আদায় করেন।"

চৈতি তৎক্ষণাৎ মুখ ভেংচিয়ে উত্তর দেয়,

"করতাম নট!"

তুরাগ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে বিড়বিড় করে ওঠে,

"একেবারে নাফরমান মহিলা!"

তুরাগ আজ রান্না করেছে খিচুড়ি আর লাল মরিচ দিয়ে ঝাল ঝাল কয়েক পদের ভর্তা। এই মেঘলা দিনে এমন খাবারের স্বাদই আলাদা। কিন্তু তৃপ্তি করে খাওয়ার সুযোগ তারা পায় না। খাবার শেষ হতে না হতেই আকাশ ভেঙে নামে তুমুল বর্ষণ। মাত্র আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বিলের পানি ফুলেফেঁপে বাড়ির উঠান পর্যন্ত চলে আসে। উঠানের ট শান্ত জল এখন রীতিমতো ঢেউ খেলছে। তুরাগ আর চৈতি তড়িঘড়ি করে ঘরের ছোটখাটো জিনিসগুলো উঁচু মাচায় তুলে রাখতে শুরু করে। পরিস্থিতি সুবিধের নয় আর কয়েক ঘণ্টা এমন বর্ষণ হলে ঘরের ভেতর পানি ঢুকে যাবে। তখন এই ভিটে ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে চৈতি নিজের ব্যাগের ভেতর হাত রাখে। হঠাৎ তার আঙুলে একটি পুরনো ছবি ঠেকে। হাতে নিয়ে দেখে তার বাবা-মায়ের সাথে তোলা একটি ছবি। কী সুন্দর করে তিনজন হাসছে! মুহূর্তেই চৈতির বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। আজ কেউ তার পাশে নেই। একজন পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন, আর অন্যজনের কোনো খবরই তার জানা নেই। বৃষ্টির ঝাপটার মতোই চৈতির চোখের জল বাধ মানে না। তুরাগ বালিশ আর কিছু প্রয়োজনীয় কাপড় গুছাতে গুছাতে একবার চৈতির দিকে তাকায়। চৈতিকে কাঁদতে দেখে সে বিচলিত হয়ে তড়িঘড়ি কাছে এগিয়ে আসে। হাতের কাজ ফেলে ব্যাকুল স্বরে জিজ্ঞেস করে,

"কী হইলো? কাঁদছেন ক্যারে?"

চৈতি কোনো কথা বলতে পারে না, শুধু ভেজা চোখে ছবিটা তুরাগের দিকে বাড়িয়ে দেয়। তুরাগ ছবিটা হাতে নিয়ে দেখে পনেরো-ষোলো বছরের এক কিশোরীর সাথে এক সৌম্যদর্শন নারী ও পুরুষ। তুরাগ এক পলক দেখেই বুঝে নেয় এরা কারা। চৈতির কিশোরী বয়সের অবয়বের সাথে এখনকার এই রাজকন্যা'র তফাত করতে তার একদমই কষ্ট হয় না। তুরাগ চৈতিকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নেয়। চৈতির কান্না যেন থামছেই না। তুরাগ তার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলতে থাকে,

"কাইন্দেন না রাজকন্যা, কাইন্দেন না।আমি যতদিন আপনার লগে আছি ততদিন নিজেরে একলা মনে কইরা কাঁদবেন না।"

চৈতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তুরাগ তাকে ওভাবেই আগলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে নিজের উষ্ণ ঠোঁটের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল চৈতির মাথায়।

চলবে….

(১২০০ শব্দ জানি ছোট কিন্তু ঘুমের জন্য লিখতে পারছি না।তাই ২০ নাম্বার পর্বটা দুইভাগ হয়ে গেছে।দোষ কিন্তু আমার না আমার ঘুমের কফি পর্যন্ত খেয়েছি তাও ঘুম যায়না।)#চৈত্র_শেষে_শ্রাবণধারা

#চিন্ময়ী_নূর

২০ (শেষাংশ)

একেকটা দানবীয় ঢেউ মাটির কুটিরের গায়ে আছড়ে পড়ছে, হুড়মুড় করে একেকটা মাটির দেয়াল খসে বিলের ঘোলা জলে মিশে যাচ্ছে।চোখের সামনে নিজের তিল তিল করে গড়া শেষ আশ্রয়টুকু এভাবে ধূলিসাৎ হতে দেখে তুরাগ আর চৈতি দুজনেই স্তব্ধ হয়ে যায়। তুরাগ নিপুণ হাতে কোনোমতে নৌকাটা ধরে রেখেছে, যাতে উত্তাল ঢেউয়ের ঝাপটায় সেটা দূরে ভেসে না যায়। চৈতি নৌকায় বসে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই বাড়িটার দিকে, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও তাদের খুনসুটি আর মান-অভিমানের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এখন সেখানে কেবলই মাটির স্তূপ আর হাহাকার। তুরাগ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৈঠাটা শক্ত করে ধরে রুক্ষ গলায় চৈতিকে উদ্দেশ্য করে বলে,

"সুন্দরী বেডি বিয়া কইরা একটা কুফা ঘরে তুলছি।"

তুরাগের এই অপ্রত্যাশিত কথাগুলো কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই চৈতি তার সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে জ্বলে ওঠে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে শুধায়,

"আপনি কাকে কুফা বললেন?"

তুরাগ একমনে বৈঠা চালাতে চালাতে নির্লিপ্ত স্বরে বলে,

"আর কারে? আপনারেই কইছি। বাপ-দাদার চৌদ্দগুষ্ঠির ভিটা ছাইড়া দেওয়া লাগছে আপনারে ঘরে তোলার পর। সারাজীবনের তিল তিল করা কামাই দিয়া যে ঘর তুলছিলাম, হেইডাও তো আইজ পানির তলে শেষ। জীবনে কোনোদিন কোনো কাজে লস খাই নাই, তয় এইবার যা ধান লাগাইছিলাম সব পইচা শ্যাষ! কুফা ছাড়া আপনারে আর কি কমু?"

চৈতি এবার অপমানে গজগজ করতে করতে বলে,

"আমি কুফা? বৃষ্টির জন্য বাড়ি ভেঙেছে, ধান পচেছে! এতে আমার কী দোষ? আমি কি আকাশ থেকে পানি নামিয়েছি আপনার ঘরে?"

"আপনে কুফা না হইলে কি আর আমার এই সোনার সংসার শ্যাষ হয়? এখন এই মাঝ দরিয়ায় আপনারে লইয়া কই যামু, কোন কূলে যিয়া উঠমু হেই চিন্তায় তো আমার কলিজা শুকাইয়া যাইতাছে।"

চৈতি ফুস করে উঠে দাঁড়ায়। রাগে আর অপমানে তার পুরো শরীর কাঁপছে। লোকটা এক নিমেষে তার জীবনের সব দুর্ভাগ্য আর প্রকৃতির এই তাণ্ডবের দায়ভার চৈতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিল! চৈতির চোখ দিয়ে রাগের জল গড়িয়ে পড়ছে। সে চিৎকার করে কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু তার আগেই তুরাগ দাঁত চিবিয়ে বলে ওঠে,

"দাঁড়ায়ছেন ক্যারে? মরার ইচ্ছা হইছে নাকি পানিতে পইড়া?"

চৈতি তুরাগের কথার কোনো জবাব দেওয়ার সুযোগই পায় না। মুহূর্তের মধ্যে পুরো আকাশ চিরে ভয়ংকর তীব্র আলোয় চারপাশ সাদা হয়ে যায়। এক পলকের জন্য মনে হয় পৃথিবীটা থমকে গেছে। তারপরেই কানে তালা লাগানো প্রচণ্ড শব্দে আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হয়। বিধ্বংসী আগুনের গোল্লাটা সরাসরি এসে আছড়ে পড়ে নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা চৈতির মাথায়। তুরাগ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখে তার চোখের সামনে এক নিমেষে সবকিছু ছাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম। বিলের উত্তাল জলরাশি আর অন্ধকারের মাঝে তুরাগের সেই আর্তনাদ বৃষ্টির শব্দকেও ছাপিয়ে যায়,

"রাজকন্যা...!"

নিজের গলার চিৎকারে তুরাগের হুঁশ ফেরে। বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার শব্দ হচ্ছে, যেন কলিজাটা এখনই ফেটে যাবে। অবশ হয়ে আসা শরীরটা নাড়াতে গিয়ে তুরাগ টের পায় চৈতি এখনও তার বুকেই মিশে আছে, একদম সুস্থ এবং জীবন্ত। তুরাগের সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। সে বড় বড় শ্বাস নিয়ে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করল। এ কেমন অলৌকিক কাণ্ড! পর পর তিনবার সে চৈতিকে হারিয়ে ফেলার বিভ্রম দেখল। তুরাগ আর নিজেকে সামলাতে পারে না। এক অজানা আতঙ্কে সে চৈতিকে এতটাই জোরে জাপটে ধরে যে চৈতির মনে হয় তার হাড়গোড় বুঝি এখনই মটমট করে ভেঙে যাবে। চৈতি তুরাগের এই আকস্মিক পাগলামিতে থতমত খেয়ে যায়। সে তুরাগকে হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তুরাগের লোহার মতো শক্ত হাত দুটো আজ ছাড়ার জন্য নয়। চৈতি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে,

"ওরে হাতির রে! মইরা যাইতাছি রে! ছাইড়া দে ভাই আমারে!"

চৈতির মুখে ভাই ডাক শুনে তুরাগের ঘোরের চটকা ভাঙে। কিন্তু সে চৈতিকে ছাড়ে না, বরং আরও একটু নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

"ওরে হাতির বউরে! আমি তোর জামাই রে, ভাই না রে!"

চৈতি তুরাগের বুক থেকে মাথা তুলে তাকায়। সে লম্বায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি, আর তুরাগ পাঁচ ফুট আট। মাত্র চার ইঞ্চির তফাত হওয়া সত্ত্বেও তুরাগের চওড়া আর পুরুষালি শরীরের কাছে চৈতির ছিপছিপে গড়নটা একদমই ছোট আর অসহায় দেখায়। চৈতি তুরাগের বুকের ওপর নিজের থুতনি ঠেকিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে শুধায়,

"কী হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন?"

তুরাগের চৈতির কপালে থাকা কয়েকটা অবিন্যস্ত চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলে,

"আমারে কখনো ছাইড়া যাইবেন না তো? কন?"

চৈতি ভ্রু কুঁচকে একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলে,

"অদ্ভুত কথা তো! আমি কোথায় যাব আমার সংসার ফেলে?"

তুরাগ চৈতির গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলে,

"আমার অন্ধকার জীবনের এক মাত্র আলো আপনে।আমার তৃষ্ণা মেটানোর এক ফোঁটা পানি আপনে।আমার অসুখের ঔষধ আপনে।"

চৈতি তুরাগ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে,

"অনেক হয়েছে, এইবার বের হোন এখান থেকে। সামনে তাকিয়ে দেখুন পানি কই এসে পড়েছে!"

চৈতির কথায় তুরাগের ঘোরের ঘোরটা পুরোপুরি কেটে যায়। সে দেখে বৃষ্টির পানি দরজার চৌকাঠ ছুঁইছুঁই করছে। মায়াবী মুহূর্তটা এভাবে ভেঙে যাওয়ায় তুরাগ বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলে,

"গাধী হাতি! মনডা চাইতাছে গাছের লগে উল্টা ঝুলাইয়া রাইখা দেই। একদম রসকষ নাই।"

কথাটা বলেই সে কাজের মানুষের মতো চটপটে হয়ে ওঠে। প্রয়োজনীয় ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে চৈতির হাত শক্ত করে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। যত্ন করে ঘরটা তালা মারে, যদিও এই ঘর কতক্ষণ টিকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুজনে মিলে নৌকাতে গিয়ে বসে। চারপাশটা কেমন অথৈ জলরাশি হয়ে গেছে, অন্ধকারে বিলের সীমানা চেনা দায়। চৈতি এবার একটু চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করে,

"কোথায় যাবো আমরা?"

তুরাগ বৈঠাটা হাতে নিয়ে জোরালো এক টান দিয়ে নৌকাটাকে বিলের দিকে নিয়ে যায়। ঝটপট উত্তর দেয়,

"দাদার বাড়িতে। দাদা-দাদি দুইজনে একাই থাহে। এই বিলের ঐ পাড়েই বাড়ি। আমি বিয়ের আগে হেনেই থাকতাম বেশি।"

চৈতি শুধু ছোট করে বলে,

"ওহহ।"

~

সূর্য ডুবুডুবু, ভুঁইয়া বাড়ির বিশাল ছাদের এক কোণায় পাশাপাশি বসে আছে কিয়াম আর কুহু। আকাশজুড়ে আবিরের ছড়াছড়ি, আর হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। অন্যদিন কুহু কিয়ামের মনোযোগ কাড়তে একটু পরিপাটি হয়ে, সাজগোজ করে সামনে আসত কিন্তু আজ সে একদমই অন্যরকম। পরনে তার সাধারণ একটা সবুজ রঙের সুতির থ্রি-পিস, ওড়নাটা খুব সুন্দর করে গায়ে জড়ানো। কিয়াম আড়চোখে একবার কুহুর দিকে তাকায়। সচরাচর কুহু তাকে দেখার জন্য যে ব্যাকুলতা দেখায়, আজ তার ছিটেফোঁটাও নেই। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দিগন্তের ওই লাল আভার দিকে। বাতাসের ঝাপটায় কুহুর ওড়নার এক কোণা বারবার উড়ে কিয়ামের হাতে এসে লাগে, কিন্তু কুহু সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করছে না। কিয়াম একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নিস্তব্ধতা ভাঙে। নিচু স্বরে বলে,

"আজ চুপ করে আছিস কেন?"

কিয়ামের কণ্ঠস্বর কুহুর কানে যেতেই সে একবার জোরে ঢোক গিলে। কতদিন, কতগুলো নির্ঘুম রাত পার করে সে এই চেনা মানুষটার কণ্ঠ শুনছে! কুহু ধীরে ধীরে কিয়ামের দিকে তাকায়। তার সামনে বসে থাকা এই মানুষটা কি কিয়াম? বড্ড অগোছালো দেখাচ্ছে তাকে। সুশৃঙ্খল কিয়ামের চোখের নিচে আজ কালচে কালি জমেছে, গালের হাড়গুলো একটু যেন বেরিয়ে এসেছে। কুহু বেশ কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে খুব মলিন কণ্ঠে শুধায়,

"ঘুমাও না কেন?"

কিয়াম হাসে। অনেক দিন পর কুহুর কোনো কথায় তার ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,

"একপক্ষিক ভালোবেসেও বলছো ঘুমাই না কেন? তুমি কি জানো না, এই দহনে ঘুম আসে না?"

কুহু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

"কারও দহন কি কেউ আসলে বুঝতে পারে?"

কিয়াম পাগলের মতো মাথা নেড়ে বলে ওঠে,

"দহনের ধরন এক হলে না বোঝার কী আছে?"

কুহু কিয়ামকে আজ এখানে ডেকেছিল অন্য কিছু বলতে। আসার আগে হাজার বার নিজেকে বুঝিয়েছিল, আজ সে কোনোভাবেই কিয়ামের প্রতি তার দুর্বলতা বা ভালোবাসা প্রকাশ করবে না। নিজেকে শক্ত রাখবে। কিন্তু সামনাসামনি হতেই সে নিজের আবেগের কাছে হেরে যায়। আর্তনাদ করে সে বলে ওঠে,

"তাহলে আমার ব্যথাটা বুঝলে না কেন তুমি?"

কিয়াম কুহুর প্রশ্নের কোনো জবাব দেয় না। সে শুধু উদাস চোখে দূরে তাকিয়ে থাকে। কুহুও আর উত্তরের জন্য জোরাজুরি করে না। মানুষের মন ঋতুর মতো বদলায় আর কুহুর মনের বসন্তটাও বোধহয় শেষ হয়ে এসেছে। সে নিজেকে ভিন্ন এক ঋতুতে মানিয়ে নিতে রাজি করিয়েছে। কুহু খুব শান্ত আর মলিন মুখে বলে,

"আমি চলে যাচ্ছি...!"

কুহুর চলে যাওয়ার কথা শুনেও কিয়ামের ভেতরে কোনো হেলদোল দেখা যায় না। সে শুধু মুচকি হেসে শান্ত গলায় বলে,

"দেরিতে হলেও তুমি বুঝতে পেরেছো। বিষের বোতলে এতদিন তুমি বৃথাই ঔষধ খুঁজেছো।"

কুহু আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না। চোখের জল আড়াল করতে সে দ্রুত পা চালিয়ে ছাদ থেকে নেমে যেতে থাকে। যেতে যেতে তার ভীষণ ইচ্ছে হয় কিয়ামকে পেছন থেকে ডেকে বলতে সে জানত ওই বোতলে বিষ আছে, তবুও সে সেই বিষকেই মধু মনে করে হাসিমুখে গ্রহণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বলা হয় না। কিছু কথা বুকের গহীন কোণেই রয়ে যায়।তার টাও না হয় থাকলো।

জানি চলতো না

(🎤 এই লন মাইক ছোট পর্ব দিছি গণহারে দুই লাইন গালি দেন।আমি কিছু মনে করব না। গালি দিতে দিতে আপনাদের গলা শুকিয়ে গেলে পানির ব্যবস্থা করে দিবো।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন