#আমি_তরুলতা (১৩)
#সোফিয়া_সাফা
"আপনি না খেয়ে যাবেন? খেয়ে যান না। আমি কষ্ট করে রান্না করেছি।"
নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকায়।
"এসবের কোনো প্রয়োজন ছিলো না মিস চৌধুরী,
আমার হাতে একদমই সময় নেই, ন্যাঞ্চি নামের যেই মেয়েটাকে আমরা গত রাতে উদ্ধার করেছিলাম, সেই মেয়েটা কাউকে কিছু না বলেই পালিয়ে গেছে। আই হ্যাভ টু গো নাউ."
কথাটা শুনে তরুর প্রচণ্ড রাগ ওঠে, সেই সাথে মেয়েটা পালিয়ে গেছে শোনার পর যেনো রাগটা আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে, কিন্তু নীলাভের সামনে সে রেগে যেতে পারবে না। নীলাভ মেইন ডোরের কাছে আসতেই তরু পেছন থেকে বলে ওঠে:
"আপনার গাড়ি রিফিউল করা হয়েছে। সকালে আমার এক ফ্রেন্ডকে দিয়ে রিফিউল করিয়ে এনেছি। তাই আপনাকে কষ্ট করে আর বাসে করে যেতে হবেনা। হ্যাভ আ সেইফ জার্নি। গুড বায়"
নীলাভ তরুর দিকে তাকিয়ে বলে:
"Thanks Miss Trana and bye."
বলেই নীলাভ বেরিয়ে যায়। নীলাভ বের হতেই তরু গিয়ে টেবিলের ওপরে থাকা খাবারগুলো ছুড়ে ফেলে দেয়। শব্দ শুনে লিজা, বিভান, আভিক বেরিয়ে আসে। রাতে দেরিতে ঘুমানোর কারণে তাদেরও উঠতে দেরি হয়েছে। লিজা, বিভান, আভিক সেখানে এলেও কেউ কোনো কথা বলেনা, শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তরু চেয়ারে বসে বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর তরু বলে ওঠে:
"ন্যাঞ্চি পালিয়ে গেছে।"
কথাটা শুনে সবাই চমকে যায়।
"কি বলিস? কিন্তু কেনো? আর ও পালিয়ে কোথায় গেলো?"
তরু গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে:
"হয়তো সাফেদের লোকেরা ওকে কোনোভাবে ভয় দেখিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।"
নীলাভ অফিসে এসেছে ১০ মিনিটের মতো হয়েছে, তখনই মিস রহমান সেখানে উপস্থিত হয়।
"স্যরি স্যার আই'ম এক্সট্রিমলি স্যরি। আপনি আমাকে একটা কাজ দিয়েছিলেন সেটাও আমি ঠিকমতো করতে পারলাম না।"
"মেয়েটা কখন বেরিয়েছিলো আর একা বেরিয়েছে নাকি কেউ নিয়ে গেছে সেটা জানেন?"
"জ্বি স্যার আমি সিসিটিভি ফুটেজ চেক করেছিলাম। ভোর ৫টা নাগাদ মেয়েটা একাই বেরিয়ে গিয়েছিলো।"
তাদের কথার মাঝেই মিনার এসে বলে।
"স্যার সাফেদ শাহরিয়ার আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।"
"তাকে আসতে বলো।"
সাফেদ এসে নীলাভের সামনের চেয়ারে বসে।
"এএসপি সাহেব আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন। কি ব্যাপার?"
"জ্বি, আপনার কি খবর? আর কোনো এট্যাক হয়েছিলো?"
"না, সেদিনের পর থেকে আমার সাথে বাড়তি গার্ডস রেখেছি। তারপর আর এট্যাক হয়নি।"
"আপনি সেদিন বলেছিলেন আপনার অনেক শত্রু আছে। আপনি তাদের একটা লিস্ট বানাতে মাহিরকে হেল্প করুন।"
নীলাভ ইন্সপেক্টর মাহিরকে ডেকে বলে।
"ওনার থেকে সমস্ত ইনফরমেশন কালেক্ট করো।"
"জ্বি স্যার। আপনি আমার সাথে আসুন।"
সাফেদ কি বলবে বুঝলোনা তখন কথার কথা বলে দিয়েছিলো। আসলে সে তো জানে কে তার শত্রু আর কে তাকে মারার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেটা বললে সে নিজেও ফেসে যেতে পারে। সাফেদকে বসে থাকতে দেখে নীলাভ ঘাড় কাত করে বলে।
"কি হলো মিস্টার শাহরিয়ার? Anything wrong?"
"নো, মিষ্টার নীলাভ জাহির খান। আসলে আমি ভাবছি আমার যাদের শত্রু বলে মনে হয় তারা সবাই তো আর আমাকে মা*রতে চাইছে না। তাই আমি তাদের নাম বললে আর এটা তারা জানতে পারলে ব্যাপারটা ভালো হবেনা।"
নীলাভ বাকা হেসে বললো,
"Don’t worry। আপনি যাদের নাম বলবেন তারা কেউই এই ব্যাপারে জানতে পারবেনা। এরপরেও নিশ্চয়ই নাম বলতে অসুবিধা নেই।"
"না, ব্যাপারটা সিক্রেট থাকলে আর কি সমস্যা? আমি সব ডিটেইলস দিচ্ছি।"
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তরু এহসান মঞ্জিলে প্রবেশ করা মাত্রই জহুরা পেছন থেকে বলে ওঠে,
"এটা কারো মামার বাড়ি নয় যে যখন ইচ্ছা তখন আসবে। এই বাড়ির ও কিছু নিয়ম শৃঙ্খলা রয়েছে। সেগুলো মেনে চলতে না পারলে একেবারে অন্য কোথাও গিয়ে থাকলেই হয়।"
তরু কখনোই জহুরার সাথে ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করেনা, তবে আজকে তার মাথাটা এমনিতেই গরম ছিলো। তার ওপর এমন বাজে কথা কার শুনতে ভাল্লাগে। তরু ঘুরে এসে জহুরার সামনে দাঁড়িয়ে বলে।
"ইয়াহ ইউ আর রাইট। এটা আমার মামার বাড়ি নয় কারণ এটা আমার নিজের বাড়ি। আর নিয়ম শৃঙ্খলা আমি মেনে চলবো না। উল্টো এই বাড়ির সব নিয়ম শৃঙ্খলা আমি তৈরি করবো।"
কথাটা শুনে জহুরা রেগে যায়।
"যতবড় মুখ নয় ততবড় কথা। অবশ্য খু*নির কাছ থেকে এর চাইতে ভালো ব্যবহার আশা করা তো বিলাসিতা।"
"হাহ! এখনই চুপ না করলে পরের খু*নটা আমি আপনাকেই করবো।"
কথাটা শুনে জহুরা রেগেমেগে তরুকে চড় মারার জন্য হাত উঠাতেই তরু হাতটা মুচড়ে ধরে। তরুর মুখের হাসিই বলে দিচ্ছে সে বর্তমানে কতোটা রেগে আছে। শক্তভাবে মুচড়ে ধরায় জহুরার হাত ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম।
"ছেড়ে দে আমার হাত। আহহ"
জহুরার চিৎকার শুনে সাফোয়ান সেখানে আসে। সে তরুর চেহারা দেখেই বুঝতে পারে সে ভীষণ রেগে আছে। সাফোয়ান তরুর হাত থেকে জহুরার হাত ছাড়াতে উদ্যত হয়
"তরু হাতটা ছেড়ে দে, কি করছিস? পা'গল হয়ে গেলি নাকি?
কথাটা শুনেই তরু হাতটা ছেড়ে দেয়। একহাতে নিজের চুলগুলো টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলে ওঠে "আমি পা'গল তাই পা'গলের মতো করাটাই স্বাভাবিক নয়কি? সেটা জেনেও কেনো আমাকে পা'গলামি করতে বাধ্য করেছে এই মহিলা? আমার সাথে কথা বলতে বারণ করে দিচ্ছি আমি, নয়তো পরেরবার এর চাইতেও খারাপ কিছু হবে মাইন্ড ইট।"
বলেই তরু সামনে থাকা কাচের টি টেবিলটা উল্টে ফেলে দিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। তরু যেতেই জহুরা বলে ওঠে, "এতো শক্তি কোথায় থেকে পায় মেয়েটা? সারাদিন তো না খেয়েই থাকে দেখি। তারপরেও এতো শক্তি আর একটু হলে তো আমার হাতটাই ভেঙ্গে ফেলতো, কি সাংঘাতিক মেয়ে হয়েছে। এই মেয়েকে এই বাড়িতে রাখা আর দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা একই ব্যাপার।"
"তুমি চুপ করবে? জানোতো মেয়েটা কেমন উগ্র হয়ে গেছে, তারপরেও কেনো ওকে আজেবাজে কথা বলতে যাও। ও কিন্তু আর ছোটো নেই যে তোমাকে ভয় পাবে। দেখলে তো একটু আগে হাতটাই ভেঙ্গে ফেলতে নিয়েছিলো। তাই ভবিষ্যতে নিজের হাত, পা অক্ষত রাখতে চাইলে চুপ করে থাকতে শেখো।"
বলেই সাফোয়ান বাড়ির কাজের লোককে ডেকে ছড়িয়ে থাকা কাচগুলো তুলে ফেলতে বলে নিজের রুমে চলে যায়।
সন্ধ্যার পরে নীলাভ বাড়িতে ফেরে। সারাটাদিন তার অফিসেই কেটেছে। শত চেষ্টা করেও ন্যাঞ্চি নামের মেয়েটার সম্পর্কে কোনো ডিটেইলস পাওয়া যায়নি। নীলাভ একটা হট শাওয়ার নিয়ে একটা ট্রাউজার আর টি-শার্ট পড়ে ড্রইং রুমে এসে বসে। তাকে বসতে দেখে সাবিনা এগিয়ে যায় তার দিকে।
"কিরে নীলাভ তোর খবর কি? বাড়িতে কখন আসিস আর কখন বের হোস কিছুই তো জানিনা। গত রাতে কোথায় ছিলি?"
"মা, গতকাল রাতে আমি আমার এক ফ্রেন্ডের বাড়িতে গিয়েছিলাম আর বৃষ্টির জন্য বাড়িতে ফিরতে পারিনি। তারপর সকালে অফিসে চলে গিয়েছিলাম। আজকে অফিসে অনেক কাজ ছিলো। তাই দুপুরেও আসতে পারিনি।"
নীলাভের কথা শুনে সাবিনা এই ব্যাপারে আর কিছুই বললেন না,
"আচ্ছা তুই বোস, আমি তোকে খেতে দিচ্ছি।"
সাবিনা টেবিলে খাবার বেড়ে নীলাভকে ডাক দেয়। নীলাভও খেতে চলে যায়। জারা কাজের লোকেদের সাহায্যে রাতের রান্না শেষ করার পর ড্রইংরুমের সোফায় এসে বসে পড়ে। তখনই তার ফোনে জহুরার কল আসে। জারা কল রিসিভ করে কানের কাছে নেয়।
"হ্যালো মা বলো।"
"কেমন আছিস তুই? সারাদিন কি করিস হুম? ঐ বাড়ির সবাই কি তোকে দিয়েই সব কাজ করায় নাকি? আজকাল আমাকে ফোন দেওয়ারও একটু টাইম পাসনা।"
"না মা তেমন কিছুই না। আমি ভালোই আছি, তোমরা সবাই কেমন আছো?"
"আমরা তো ভালোই আছি।" (গলার স্বর একটু নিচু করে) "তোর পাশে কেউ আছে?"
"না, কিছু কি বলবে?"
"দেখ জারা, তরু যে ফিরে এসেছে তাতো তুই জানিসই। একটু সাবধানে থাকিস।"
কথাটা শুনে জারা উপরে নিজের রুমে চলে যায় তারপর দরজা আটকে দিয়ে বলে—
"আপু এসেছে এটা তো ভালো কথা, আমাকে সাবধানে থাকতে কেনো বলছো? আমি তো এটাই বুঝতে পারছিনা, আপুর পরিচয় সবাইকে জানালে কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে?"
"সারাক্ষণ খালি আপু আর আপু। দেখ জারা নিজের ভালো চাইলে ওর নাম ঘুনাক্ষরে কারো সামনে মুখে নিবিনা। তোর বাবার কথা ভুলে যাসনি নিশ্চয়ই?"
জারা একটা শ্বাস ছেড়ে বললো,
"ভুলিনি মনে আছে, রাখি এখন প্রতিদিন এক কথা ভালো লাগেনা।"
"শোন তরুর সাথে কোনো কথা বলবিনা। আর ও যদি ওই বাড়িতে যায় সাথে সাথে আমাকে জানাবি।"
"আচ্ছা রাখি।"
এদিকে নীলাভ খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। সাবিনা লক্ষ্য করে দেখলো নীলাভ একটুও খাচ্ছেনা। সে নীলাভের দিকে তাকিয়ে বললো,
"কি হয়েছে তোর নীলাভ? খাচ্ছিস না কেনো? তুই কি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তায় আছিস?"
নীলাভ কথা না ঘুরিয়ে বললো,
"মা গত ৩ দিন ধরে আয়ুর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা। এমনকি আমার সাথে যোগাযোগ করাও বন্ধ করে দিয়েছে।"
কথাটা শুনে সাবিনা ভ্রু কুচকে তাকায়,
"কি বলিস? তোর সাথে কোনো ঝামেলা হয়নি তো?"
"না মা সব ঠিকই ছিলো। ও আমাকে প্রমিস ও করেছিলো যে ও যতদিন দেশে আছে রেগুলার আমার সাথে দেখা করবে কিন্তু এখন ফোনটাই বন্ধ করে রেখে দিয়েছে।"
সাবিনা একটা শ্বাস ছেড়ে বললো,
"দেখ নীলাভ, নিজের বোনের মেয়ে বলে আমি সব বিষয় উপেক্ষা করে যাবার লোক নই। তুই কেনো বুঝতে পারছিস না যে আয়ু তোর জন্য পার্ফেক্ট নয়?"
"কেউই পার্ফেক্ট থাকেনা মা, পার্ফেক্ট করে নিতে হয়।"
"কিন্তু অপর মানুষ টা যদি না চায়?"
নীলাভ নিশ্চুপ, সাবিনা এই সুযোগে বলে ওঠে,
"কেনো জেদ করছিস নীলাভ? তোর এক ভাই প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেই পরাজিত হলো। তুইও সেই একই ভুল করিসনা। কিশোর বয়সে কি নাকি প্রতিজ্ঞা করে বসেছিলি সেটা কেনো সারাজীবন বয়ে বেড়াবি? বিয়ে ভালোবাসা কোনটাই ছেলেখেলা বা লোক দেখানোর জিনিস নয়। সেদিন রাগের বশে...
সাবিনা আর কিছু বলতে যাবে তার আগেই নীলাভ তার দিকে তাকালো। নীলাভের চোখে চোখ পড়তেই সাবিনা থেমে যায়। সুযোগ পেয়ে একটু বেশিই হয়তো বলে ফেলেছে সে। নীলাভ তার দিকে তাকিয়ে আছে। অবশ্য নীলাভের চাহনিতে রাগ বা ক্ষোভ ছিলোনা। তবে এমন কিছু ছিলো যা সাবিনাকে থেমে যেতে বাধ্য করেছে। সাবিনা কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। নীলাভ খাবারটুকু খেয়ে নিজের রুমে চলে গেলো।
নীলাভ বিছানায় শুয়ে ফোন ঘাটতে শুরু করলো তখনই তার সেদিন ক্লাবে পাওয়া ফোনটার কথা মনে পড়লো। নীলাভ বিছানার থেকে উঠে গিয়ে আলমারি থেকে ফোন টা বের করে দেখলো ফোনটার চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। নীলাভ ফোনটা চার্জে লাগিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেলো। ইদানীং তার কিছুই ভালো লাগেনা। তবে আজকে একটু বেশিই খারাপ লাগছে। কেনো লাগছে সে হয়তো জানে, তার মায়ের বলা কথাগুলোই বারবার কানে বাজছে। না চাইতেও পুরোনো কিছু স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। নীলাভ ব্যালকনিতে এসে আকাশের দিকে তাকালো।
আকাশটা আজ বেশ পরিষ্কার, পূর্ণ থালার মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। সে আশেপাশে তাকালো। তাদের বাড়ির তিনপাশে বাগান করা হয়েছে, বাগানে বিভিন্ন জাতের ফুল, ফলসহ সবজির চাষ করা হয়। তাদের বাড়িটা মূলত সাভার টাউনের শেষের প্রান্তে। এদিকের বাড়িগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী বানানো হয়। প্রত্যেকটা বাড়ি একে অপরের থেকে নির্দিষ্ট দূরে নির্মাণ করা হয়েছে। নীলাভ আশেপাশে দেখতে ব্যস্ত কিন্তু কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি চোখ যে তাকে দেখতে ব্যস্ত সে সেটা খেয়ালই করলোনা। তরু কালো হুডি পরে গাছপালার আড়াল থেকে নীলাভকে দেখছে। অবশ্য দেশে আসার পর থেকে সে প্রায়ই এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু দু-একদিন ছাড়া নীলাভ কখনোই ব্যালকনিতে আসেনা। চাঁদের আলোয় তরু পরিষ্কারভাবে নীলাভকে দেখতে পেলেও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তরুকে নীলাভ দেখতে পেলোনা। নীলাভের মলিন মুখটা দেখে তরু মনে মনে বললো—
"তোমার আবার কি হলো লাভ? আমার কথা তো তোমার মনে পড়ার কথা না, তাহলে কার কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছো? নিশ্চয়ই আয়ুর কথা ভেবে তাইনা? সেই ক্ষেত্রে আমার যে কিছুই করার নেই। তোমার আয়ু তো ওইদিকে বেশ ভালোই মাস্তিতে আছে, তুমি শুধু শুধু এখানে বসে কষ্ট কেনো পাচ্ছো বলোতো? বোকা প্রেমপাখি আমার। এই যে তুমি কষ্ট পাচ্ছো তাও ওই ফালতু মেয়েটার জন্য, আমার এখন কি করতে ইচ্ছা করছে জানো?"
তরু ঘাড় কাত করে নীলাভের দিকে তাকালো,
"তোমাকে আর ওই মেয়েটাকে একজায়গায় বসিয়ে একদম শ্যুট করে দিতে। কিন্তু সেটাও করতে পারছিনা। কারণ শ্যুট করে দিলে তুমি ওই মেয়েটার আসল রূপ দেখবে কিভাবে? আমাকে ভালোবাসবে কিভাবে? আমার জন্য এভাবে কষ্ট পাবে কিভাবে? জীবন তো একটাই তাইনা। আর এই একটা জীবনেই তো তোমাকে আমার হতে হবে। তবে পুনর্জন্ম বলে যদি সত্যিই কিছু থাকতো,,,নিঃসন্দেহে এই জন্মের শেষ খু'নটা আমি তোমাকেই করতাম লাভ। সবাই বলে আমার ধৈর্য্য কম, উফস! তারা যদি একবার আমার এই সাইডটা সম্পর্কে জানতো, যে কতোটা ধৈর্য্য নিয়ে তোমার পেছনে পড়ে আছি, তাহলে বিনা শর্তে আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধৈর্য্যবতী উপাধিতে ভূষিত করতো।"
তরুর ভাবনার মাঝেই নীলাভ নিজের রুমে চলে যায়। আর তরুও ফিরে আসতে নেয়, তখনই তার ফোনে একটা ম্যাসেজ আসে। তরু চেক করে দেখে আভিক ম্যাসেজ দিয়েছে।
ম্যাসেজ: কিরে তরু, কই তুই? ২ ঘন্টা যাবত তোর জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু তোর আসার খবর নেই। তোর কি আদৌ ন্যাঞ্চিকে নিয়ে চিন্তা-টিন্তা হয় নাকি রে? আলফার মতো তুইও সেলফিশ হোস না।
ম্যাসেজটা দেখে তরুর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে আর সেলফিশ? হাস্যকর ব্যাপার, সে তো সেদিকেই যাচ্ছিলো কিন্তু নীলাভকে একবার না দেখে গেলে কি সে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে পারবে? পারবেনা তো। কিন্তু এটা বাকিদের কিভাবে বোঝাবে? তরু চলে গেলো তার গন্তব্যে। নীলাভ বিছানার ওপর বসতেই তার চোখ গেলো দেয়ালে টাঙানো তার আর আয়ুর ছবিটার দিকে।
"কোথায় আছো তুমি আয়ু? এভাবে কেনো আমাকে কিছু না বলে চলে গেলে? আমার জানামতে কোনো কিছুতেই তো আমি কমতি রাখি নি, তারপরেও কেনো হারিয়ে গেলে? আমি যে তোমার প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, একবারও আমার কথা ভাবলে না? তুমি হয়তো সত্যিই আমাকে কখনো ভালোবাসো নি।"
নীলাভ একটা শ্বাস ত্যাগ করে ফোনটা হাতে নিয়ে মনে করার চেষ্টা করতে লাগলো যে এটা কবেকার ছবি। এই কয়েকদিন ব্যস্ততায় সে ফোনটার কথা ভুলেই গিয়েছিলো। তবে এই ফোনটা ত্রানার না হলে আর কার হতে পারে, আর তার ছবিটাই কেনো ওয়ালপেপার বানানো? নীলাভ শত চেষ্টা করেও ছবিটার কথা মনে করতে পারলোনা। এভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে নীলাভ কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে যায়।
সাবিনা, নাজমুল, নাহিদ আর জারা একসাথে ডিনার করতে বসেছে, তখনই সাবিনা বলে ওঠে,
"তুমি জানো আয়ু নিখোঁজ হয়ে গেছে?"
সাবিনার কথা শুনে নাজমুল খাবার খাওয়ার গতি কমিয়ে সাবিনার দিকে তাকায়। নাহিদ বলে ওঠে,
"মানে? আয়ুর তো ২ সপ্তাহ পর বিদেশে যাওয়ার কথা ছিলো, এখনই কোথায় চলে গেলো?"
"যেখানে গেছে ভালোই হয়েছে, সেদিন ওই ঘটনাতে মেয়েটার তেমন তো ইতিবাচক কোনো ভূমিকা ছিলোনা, তাহলে কেনো নীলাভ মেয়েটাকে বিয়ে করার প্রতিজ্ঞা করেছিলো সেটাই আমি বুঝতে পারিনা। প্রচন্ড জেদি আর একরোখা হয়েছে ছেলেদুটো। যা বলবে তাই করে ছাড়বে। বাবা মায়ের কথারও দাম দেবেনা।"
বাবার মুখ থেকে কথাটা শুনে নাহিদ আড়চোখে বাবার দিকে তাকায়। সবসময় ছোট ভাইবোন বকা খেলে বড় ভাইবোনকেও কেনো টেনে আনা হয় সেটাই সে বোঝেনা। সে হাল্কা কেশে বলে উঠলো,
"যাক ভালোই হলো, এখন আর আন্টিকে ভয় দেখিয়ে বিয়েটা পিছিয়ে রাখতে হবেনা।"
কথাটা শুনে জারা আর সাবিনা অবাক চোখে নাহিদের দিকে তাকায়।
"তার মানে তুমি আন্টিকে ভয় দেখিয়ে বিয়েটা পিছিয়ে রাখতে?"
"হ্যাঁ, আর এটা আমার না, বাবার প্ল্যান ছিলো। তবে এবার কি হলো বুঝলাম না। আমরা তো আন্টিকে ব্ল্যাকমেইল করতাম। তবে এবারের ব্যাপারের সাথে আমরা জড়িত নই।"
সাবিনা ভ্রু কুঁচকে বললো,
"তোমরা বাপ ছেলে ঠিক কি করতে চাইছো বলবে? ছেলেটাকে কি সারাজীবন বিয়ে না করিয়ে রাখার প্ল্যান করছো নাকি? তাহলে দেখো, সেই প্ল্যানে কিন্তু আমি রাজি নই।"
নাজমুল বললেন,
"আরে চিন্তা কোরোনা, তোমার ছেলেকে আমরা সারাজীবন আইবুড়ো রাখবোনা। ওর যোগ্য কাউকে পাওয়া মাত্রই বিয়ে দিয়ে দেবো।"
"যোগ্য বলতে কি বোঝাতে চাইছো?"
"যোগ্য বলতে বোঝাতে চাইছি যে এমন একটা মেয়ে যে আমাদের ছেলেটাকে সত্যিকারের ভালোবাসবে। আমাদের ছেলেটাকে সুখে রাখবে, ভালো রাখবে। আমাদের জেদি একরোখা ছেলেটাকে আগের মতো হাসতে শেখাবে। যেই মেয়েটা আমাদের ছেলের পাশাপাশি আমাদেরও খেয়াল রাখবে।"
সাবিনা একটু মন খারাপ করে বললেন,
"ছেলেটা তো আমার প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে যে আয়ুকেই বিয়ে করবে। সেখানে এমন মেয়ে পেয়ে গেলেও—ছেলে বিয়ে করতে রাজি হবেতো?"
নাজমুল একটু হেসেই বললো,
"আগে তেমন মেয়েটাকে খুঁজে নেই, তারপর বিয়ে করানোর ব্যাপারটা দেখা যাবে।"
চলবে,,,