#আমি_তরুলতা (৩১)
#সোফিয়া_সাফা
(ধামাকা পর্ব-The Rewind)
সাবিনা কি বলবেন খুঁজে পাচ্ছেননা। সেও আর কিছু না বলেই নিজের রুমে চলে যায়। নীলাভ কাদছে, তার খুব কষ্ট হচ্ছে। আজকে অনেক গুলো বছর পরে সে কাদছে। সে জানেনা কি করলে তার কষ্ট কমবে। এদিকে তরু রুমে এসে স্মোক করতে লাগলো।
“ও আমাকে ঘৃনা করতে পারছেনা দেখে কষ্ট পাচ্ছে? আর আমি কিনা ওর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ম'রে যাচ্ছি? বাহঃ বাহঃ কি ভাগ্য আমার, আমি যাকে ভালোবাসি সেও আমাকেই ভালোবাসে। কিন্তু সে আমাকে ভালোবেসে ভালো নেই। সে তো আমাকে ভালোবাসতেই চায়না। ঘৃনা করতে না পেরে ভালোবাসে। হায়রে কপাল। আমার বোধহয় ম'রে যাওয়াই ভালো ছিলো। এতদিন ওর ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করে গেছি৷ কিন্তু ও যেখানে আমাকে আগে থেকেই ভালোবাসে সেখানে আর কিভাবে ওর ভালোবাসা পেতাম আমি? হাহ আমি তো আগে থেকেই জিতে আছি। ও আমাকে আগে থেকেই ভালোবাসে। হা হা হা। Congratulation Torulota fu*king Ehsaan. এবার খুশি তো তুই? ভেবেছিলি ভালোবাসা পেয়ে গেলেই ধন্য হয়ে যাবে তোর জীবন। জিতে যাবি তুই। তুই বড্ড বোকা রে। বড্ড বোকা তুই। কেনো এতো বোকা হলি? হা হা হা এখন ওকে ভালো রাখতে চাইলে হয় প্রমাণ দিতে হবে যে আমি নির্দোষ নয়তো ওকে একদম মুক্ত করে দিয়ে ওর থেকে বহুদূরে চলে যেতে হবে। আমি কি করবো এবার?”
তরু কিছুই ভাবতে পারলোনা। তার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। ভেবেছিলো নীলাভ যেদিন তাকে ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে সেদিন সে সবচাইতে সুখী হবে। আজ নীলাভ তাকে ভালোবাসার কথা স্বীকার তো করলো কিন্তু সে আজকে নিজেকে সবচাইতে দুঃখী বলে মনে করছে। তরু কয়েক মিনিট মেঝেতেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো তারপর উঠে বসে বললো।
“আমি প্রমাণ করে দেবো যে নেহা খানকে আমি খু'ন করিনি। তারপর আর নীলাভ জাহির খান আমাকে ভালোবাসার কারণে নিজেকে ঘৃনা করবেনা। তবে সেদিন আর ভালোবাসার জন্য আমাকে সে পাবেনা। আমাকে যদি প্রমাণই করতে হয় যে আমি খু'ন করিনি, তাহলে নীলাভ জাহির খান আমাকে কিইবা ভালোবাসলো? আমি কতোবার বলেছিলাম যে আমি খু'ন করিনি। তবুও সে আমাকে বিশ্বাস করলোনা। যেখানে বিশ্বাসই নেই সেখানে আবার কিভাবে ভালোবাসা থাকতে পারে? আপনার ভালোবাসা আপনার মতোই নড়বড়ে নীলাভ জাহির খান। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে সবাই তো আর তরুলতা এহসানের মতো ভালোবাসতে পারবেনা তাইনা। আপনাকে ভালোবেসে আমি কি-ই করিনি বলতে পারবেন? নিজেকে বেহায়া আর নির্লজ্জের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছি। আত্মসম্মান বলতেও কিছুই রাখিনি। তবে আজকে আপনার কাছ থেকে আমি নতুন করে ভালোবাসতে শিখলাম। ধন্যবাদ আপনাকে নীলাভ জাহির খান। তরুলতা এতোদিন ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আজকে তার চোখ খুলে দিলেন আপনি। এবার আমি আপনাকে শেখাবো ভালোবাসা কাকে বলে। শেখাবো কি করে ভালোবাসাকে বিশ্বাস করতে হয় সাপোর্ট করতে হয়। ভালোবাসার জন্য সমস্ত সীমা অতিক্রম করতে হয় জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ। হা হা হা। সেই দিন টা খুব দূরে নয় যেইদিন আপনি আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ছটফট করবেন। কিন্তু আমি তরুলতা আপনার দিকে ফিরেও তাকাবোনা। কারণ এটা আপনিই আমাকে শিখিয়েছেন।”
তরু কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে তারপর হাতমুখ ধুয়ে ডিনার রেডি করতে চলে যায়। সে প্রতিদিনের মতো আজকেও নীলাভের জন্য আলাদা করে খাবার বেড়ে রাখে আর সেটায় সিক্রেট মেডিসিন মিলিয়ে রাখে। সবার খাওয়া শেষ হলে যে যার রুমে ঘুমাতে চলে যায়।
সবাই ঘুমিয়ে গেলে তরু নীলাভের রুমে আসে। আজকে সে শেষবারের মতো নীলাভের সাথে ঘনিষ্ঠ হলো।
রাত ৩ টা নীলাভ তরুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে কিন্তু তরু ঘুমায়নি। সে আজকে মন ভরে নীলাভকে দেখে নেবে। কারণ সকাল হতেই সবকিছু চেইঞ্জ হতে চলেছে।
“আপনার কাছ থেকে আমি কঠোর হতে শিখেছি মিস্টার খান। আর সেটা আপনার উপরেই প্রয়োগ করবো। তরুর ব্রাইট সাইড টাই দেখেছেন এবার থেকে তরুর ডার্ক সাইড টাও দেখবেন।”
সকাল ৮ টা বাজতেই নীলাভের ঘুম হাল্কা হয়ে আসে। বুকের ওপর ভারী কিছু অনুভব হতেই সে চোখ মেলে তাকায়। চোখ মেলে তাকিয়ে ত্রানাকে নিজের বুকের উপর দেখেই যেনো ভূত দেখার মতো চমকে গেলো নীলাভ। তড়িৎ গতিতে ত্রানাকে সরিয়ে দিলো। তরু ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়েছিলো। হঠাৎ এমন হওয়াতে সে চোখ মেলে তাকায়। তারপর হঠাৎ করেই নীলাভকে জড়িয়ে ধরে বলে।
“কি হয়েছে লাভ? বিরক্ত করছো কেনো? সারারাত ঘুমাতে দেওনি। এখন আমাকে ঘুমাতে দেও প্লিজ।”
নীলাভ ঝাড়া মেরে তরুর হাত সরিয়ে দিয়ে রাগী কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“আপনি? আপনি আমার রুমে আমার সাথে এক বিছানায় কি করছেন?”
তরু ঘাড় কাত করে নিজের লিপস বাইট করে বলে।
“নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে যে আমি তোমার রুমে কি করছি।”
নীলাভ নিজের দিকে তাকালো। গত কয়েকদিন ধরেই তার এই অবস্থাই হয়। কিন্তু আজকে ত্রানা তার পাশে কি করছে?
“সোজাসুজি বলুন যে আপনি কি করেছেন আমার সাথে?”
“অনেক কিছু করেছি। আর শোনো এসব ফালতু কথা বলার টাইম আমার হাতে নেই। আমাকে অফিসে যেতে হবে।”
তরু উঠে চলে যেতে নিলে নীলাভ তরুর হাত টেনে ধরে। তরু হাত ছাড়িয়ে বলে,
“এখন আমি ইন্টারেস্টেড নই। আমার হাত ছাড়ো।”
নীলাভ তরুর হাত না ছাড়লে। তরু জোর করে হাত ছাড়িয়ে নেয়।
“আপনি কেনো আমার সাথে এমনটা করেছেন?”
“কেমনটা করেছি? লিসেন আমার অধিকার আমি বুঝে নিয়েছি। ভবিষ্যতেও নেবো। আর আমি কি করবো না করবো তার কৈফিয়ত কাউকেই দেবোনা।”
বলেই তরু দরজা খুলে নিজের রুমে চলে যায়। তরুকে নীলাভের রুম থেকে বের হতে দেখে জারা অবাক চোখে চেয়ে থাকে। তরুর এলোমেলো শাড়ি আর চুল দেখেই জারা বুঝতে পারে যে তরু সারারাত নীলাভের রুমেই ছিলো। জারা সঙ্গে সঙ্গেই কথাটা সাবিনাকে বলতে চলে যায়। সাবিনা তো জারার কথা শুনে খুশিই হয়। সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন,
“যাক আস্তে আস্তে সবকিছু ঠিক হয়ে যাচ্ছে। নীলাভ ও ত্রানাকে মেনে নিচ্ছে।”
এদিকে নীলাভ যেনো হতবিহ্বল হয়ে গেছে।
“তারমানে এতোদিন ত্রানা আমার সাথে নাইট স্পেন্ড করেছে? কিন্তু কেনো? কেনো সে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে জোর করে এমনটা করলো?”
নীলাভ উঠে ফ্রেশ হয়ে তরুর রুমে চলে গেলো। তরু ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলো। তরুর ভেজা চুল দেখেই নীলাভ বুঝতে পারলো যে তরু সবেমাত্র শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে। নীলাভকে রুমে ঢুকে পড়তে দেখে। তরু গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“কারো রুমে ঢোকার আগে পারমিশন নিতে হয়। মিস্টার খান, ম্যানার্স কোথায়? নাকি সবকিছুর মতো ম্যানার্সেও কমতি আছে?”
তরুর কথায় নীলাভ রেগেমেগে তরুর বাহু চেপে ধরে।
“আমার রুমে পারমিশন ছাড়া ঢোকার সময় তোমার ম্যানার্স কোথায় ছিলো? তুমি আমার সাথে কি করেছো হ্যাঁ?”
তরু নীলাভের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে বলে।
“যা একজন স্ত্রীর তার স্বামীর সাথে করা উচিৎ সেটাই করেছি। আপনি পাথর হতে পারেন। আমি তো আর পাথর নই। আপনার চাহিদা নাই থাকতে পারে কিন্তু আমার তো আছে তাইনা? বিয়ে করেছি কি আলাদা থাকার জন্য? আর আপনি আমাকে যেহেতু স্ত্রী হিসেবে মানেনই না সেহেতু আমার রুমে ঢুকতে হলে আপনাকে আমার পারমিশন নিতে হবে।”
নীলাভ রেগেমেগে বললো, “ইউ আর রিয়েলি আ গিরগিটি। এতোদিন বিভিন্ন রঙ ধারণ করে থাকলেও এখন আসল ফর্মে ফিরে এসেছেন।”
“আমি শুধু গিরগিটিই নই। আমি আরও বেশি কিছু যা আপনার কল্পনার বাইরে।”
কথাটা বলেই তরু হনহন করে বেরিয়ে গেলো। নীলাভ অবাক নয়নে তরুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। এটা কি সেই ত্রানা যাকে সে এতোদিন ধরে দেখে এসেছে। এক রাতেই এতোটা চেইঞ্জ কি করে হতে পারে?
কেটে যায় বেশ কিছুদিন,
এর মাঝে নীলাভ আর তরুর মাঝে কোনো কথাই হয়নি। তরু পুরোপুরি ভাবে নীলাভ কে ইগনোর করছে। তবে বাড়ির সবার দিকেই তরু খেয়াল রাখে। এরই মাঝে নীলাভের পুরোপুরি সেই রাতগুলোর কথা মনে পড়ে গেছে। কিন্তু সে এই ব্যাপারে কাউকেই কিছু বলতে পারেনা। কারণ ত্রানা তার স্ত্রী হয়। সে তার সাথে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে রাত কাটালেও সেটা কেউই দোষ হিসাবে দেখবেনা। আর নীলাভ নিজেও ত্রানার ওপর রাগ করতে পারেনা। কারণ তাকে দেখলেই তরুর কথা মনে পরে যায়। তার মনে হতে থাকে তার উপর ত্রানার অধিকার আছে। সেটা থেকেই এরকম টা করেছে তার সাথে। এসব ভেবেই সে ত্রানাকেও কিছুই বলতে পারেনা।
অবশ্য সে বলার সুযোগ টুকুও পায়না। তরু আজকে অফিসে না গিয়ে উলফ স্কোয়াড প্যালেসে আসে। সেখানে আগে থেকেই বিভান, আভিক আর লিজা ছিলো। তরু সেখানে যেতেই বিভান ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে। “এতো দেরি হলো কেনো?”
“শ্বশুর বাড়িতে থাকি মামা বাড়িতে নয়, যে যখন তখন চলে আসতে পারবো।”
আভিক বলল, “তুই রেগে আছিস?”
“নাহ,”
লিজা বলল, “আজকে থেকেই তো তোর কাজ শুরু। আজকেই তো আলফা আমাদের বলে দেবেন যে কিভাবে কি করতে হবে।”
“ইয়াহ ইউ আর রাইট। আজকে তোদের সাথে অনেক কথা আছে। সেই সাথে আজকে তোদের সব প্রশ্নের উত্তর ও তোরা পেয়ে যাবি।”
তরু সোফায় বসেই ডেকে ওঠে, “ড্যাড, তোমরা এসো।”
রাফিজ চৌধুরী, তার দুজন ম্যানেজারকে নিয়ে বড় লিভিং রুম টায় প্রবেশ করে। বিভান, আভিক আর লিজা তাদের দেখে চমকে যায়। বিভানের বাবার নাম হারুন শিকদার, আর আভিকের বাবার নাম আফজাল সিদ্দিক। তারা দুজন রাফিজ চৌধুরীর ম্যানেজার। তবে এই সম্পর্কে বাইরের কেউ জানেনা। বাইরের লোকেদের চোখে তারা আলাদা আলাদা ব্যাবসায়ী। তবে তারা গোপনে একত্রে কাজ করেন। তারা এসেই সোফায় বসে পড়লেন,
রাফিজ বললেন, “আজকে তোমাদেরকে এমন কিছু বলবো যা তোমাদের কল্পনাতীত।”
রাফিজের কথা শুনে সবাই নড়ে চড়ে বসলো।
ফ্ল্যাশব্যাক স্টার্ট…
“আজ থেকে ২৬ বছর আগে আমি বিয়ে করেছিলাম রাহনুমা নাজনীনকে। আমাদের বিয়েটা ছিলো লাভ ম্যারেজ। খুব ভালোই কাটছিলো আমাদের দিনগুলো। আমার বাবা, হারুন আর আফজালের বাবার সাথে মিলে একটা বিজন্যাস প্রজেক্টে ইনভেস্ট করেছিলো। সেই বিজন্যাসের সূত্র ধরেই আমরা পরিচিত হই, একটা সময় পর আমাদের মাঝে খুব ভালো বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়েছিলো। এরই মাঝে আমার বড় মামার ছেলে জমশেদ হায়দার আমাদের সাথে বিজনেসে ইনভেস্ট করার ইচ্ছা পোষণ করে। কিন্তু ততদিনে আমাদের বিজন্যাস বেশ ভালোই একটা পজিশনে পৌঁছে গিয়েছিলো। তবুও আমরা তাকে আমাদের সাথে কাজ করার সুযোগ দেই দুবছর পরেই আমার মেয়ে ত্রানা জন্ম নেয়। হয়তো আমার মেয়ের সৌভাগ্যেই আমাদের ছোট্ট বিজনেস টা পুরো বাংলাদেশে বেশ সুপরিচিতি লাভ করে। আমাদের বিজন্যাস টা ছিলো মূলত মূল্যবান মেটাল যেমন ডায়মন্ড, গোল্ড, রুবি অন্যান্য দেশ থেকে সংগ্রহ করে বাংলাদেশে এনে সরবরাহ করার। আমার মেয়ের যখন ১২ বছর বয়স হয়৷ তখন অবধি আমরা পুরো দেশে ৪০ টারও বেশি শোরুম ওপেন করে ফেলেছিলাম তার পাশাপাশি আমাদের পারিবারিক বিজন্যাস টাও বেশ ভালোই চলছিলো।
হঠাৎ করেই জমশেদ নিজের ইনভেস্ট কৃত অর্থ লাভ সহ ফেরত চাইতে শুরু করলো। আমি একসময় বাধ্য হয়ে তাকে সব বুঝিয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু সে সেসব নিয়েও সন্তুষ্ট ছিলোনা। এরই জের ধরে আমাদের মাঝে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এরই মাঝে একদিন জমশেদ আমাকে কল দিয়ে বলে।”
“তোমার স্ত্রী আর তোমার মেয়ে আমার আন্ডারে আছে। তাদের ফেরত পেতে চাইলে এক্ষুনি মিড নাইট ব্রিজের উপর দেখা করো।”
“তার কথা শুনে আমি পাগলপ্রায় হয়ে যাই। আমি তখন সাভার টাউনেই থাকতাম। আমি, আফজাল আর হারুন সহ ২ জন বডিগার্ড নিয়ে মিড নাইট ব্রিজের উপর আসতেই আমরা নদীতে একটি জাহাজ দেখতে পাই। হঠাৎ করেই কয়েকজন লোক মিলে আমাদেরকে জাহাজে উঠিয়ে নেয়। জাহাজে উঠতেই আমাদের হাত পা বেধে ফেলে জমশেদের লোকেরা।”
“বাহ ভালোই করেছিস হারুন আর আফজাল কেও নিয়ে এসেছিস। ওদের বউয়েরাও আমার আন্ডারেই আছে।”
জমশেদের কথাটা শুনে রাফিজ চমকে তাকালেন,
“কি চাস তুই আমাদের কাছে?”
“বেশি কিছুনা তোদের ভাগের সমস্ত ইনভেস্ট মেন্ট তোরা নিজেদের ইচ্ছায় আমার নামে দিয়ে দিবি।”
“তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?”
জমশেদ বিভিন্ন ভাবে তাদেরকে ভয় দেখাতে শুরু করলো। উপায়ন্তর না পেয়ে রাফিজ সহ বাকি ২ জনও তাদের সব ইনভেস্টমেন্ট জমশেদের নামে দিয়ে দিলো কিন্তু তার পরেও জমশেদ কাউকেই ছাড়লো না। সবকিছু নিজের নামে করে নিয়ে জমশেদ তার ডান হাত সাফেদ শাহরিয়ারকে নিয়ে রাতের আধারে জাহাজ থেকে অন্যত্র পালিয়ে যায়। আর তাদের লোককে বলে যায় সবাইকে মে'রে ফেলতে। বিভান আর আভিক সেই সমনে লন্ডনে ছিলো পড়াশোনার জন্য। তাই এইসব ব্যাপারে তারা কিছুই জানেনা। সেদিন রাফিজ, হারুন আর আফজালের চোখের সামনেই তাদের স্ত্রীদের ধ*র্ষ/ণ করে খু'ন করা হয়েছিলো আর ত্রানাকে খুবই নির্মম ভাবে গু'লি করে খু'ন করা হয়েছিলো তারপর পরিচয় লুকাতে প্রত্যেকের চেহারা পাথর দিয়ে থে*লতে দিয়েছিলো, রাতের আধারে লাশগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছিলো সাভার নদীতে। তারা ৩ জন কোনো রকমে জাহাজে থাকা একটি ছোটো বোটে চড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো সেদিন।
পরেরদিন তারা সাভার নদীতে লা'শের জন্য খোঁজ করতে গেলে চারটি বডি উদ্ধার করে। তরুকে গু'লিবিদ্ধ অবস্থায় তারা সেদিন উদ্ধার করেছিলো। কিন্তু ত্রানার লা'শ তারা কোথাও খুজে পায়না। তরু তখনও জীবিত ছিলো। তারা তরুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার জানায়। তরুর হৃদপিন্ড ডান দিকে হওয়ায় তরুকে বাচানো সম্ভব হয়েছে তবে সারারাত পানিতে থাকার কারণে তার ফুসফুসে পানি জমেছে। যদিও তাদের সার্জারী সফল হয়েছিলো কিন্তু তরু কোমাতে চলে গিয়েছিলো। অন্যদিকে ৭ দিন খোজাখুজির পর পুলিশের লোকেরা সাভার নদীর মধ্যবর্তী অংশ থেকে ত্রানার লা*শ উদ্ধার করে। আর কেইসটা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সেটাকেই তরুর লা*শ বলে চালিয়ে দিতে চায় কিন্তু সাফোয়ান এহসান কিছুতেই লা*শটাকে নিজের মেয়ে বলে কনফার্ম করেনা। ১৫ দিন পর তরুর জ্ঞান ফিরলেও তরু কারো সাথেই কোনো কথা বলতোনা। অবশেষে ২ দিন পর তারা তরুর থেকে তার ব্যাপারে সবকিছুই জানতে পারে। এসব কিছু জানার পর তারা সাফোয়ান এহসানের সাথে গোপনে যোগাযোগ করে তরুকে তার হাতে তুলে দেয়। আর তরুকে পাওয়ার পর সাফোয়ান ত্রানার লা*শকেই নিজের মেয়ের লা*শ বলে কনফার্ম করে। আর সেই সাথে অনেক গুলো টাকা দিয়ে ব্যাপারটা সেখানেই শেষ করে দেয়।
কিন্তু সাফোয়ান এহসান তরুকে নিজের সাথেও রাখতে পারছিলেন না। এরই মাঝে রাফিজের তরুর প্রতি আলাদাই একটা টান সৃষ্টি হয়েছিলো। সে মাঝে মাঝেই সাফোয়ানকে কল করে তরুর ব্যাপারে খোঁজ নিতেন। এভাবেই তাদের মাঝে একটা ভালো বন্ডিং হয়। রাফিজ অবশ্য ত্রানার মৃ*ত্যুর ব্যাপারে সত্যিটা সাফোয়ানকে বলেন নি। শুধু বলেছিলেন তার মেয়ে এক্সিডেন্টে মা*রা গেছে। তেমন বিশস্ত কেউ না থাকার কারণে সাফোয়ান প্রথমে রাফিজের সাথে আলোচনা করে তরুকে ত্রানার পরিচয়ে বড় করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাফিজ এক কথাতেই রাজি হয়ে যায়। তরুকে তার মেয়ে হিসেবে দরকার। তরুকেই সে অস্ত্র হিসাবে গড়ে তুলবে। রাফিজ অবশ্য পরে জানতে পারে যে তার মেয়ের লা*শ তরুর লা*শ হিসাবে তরুদের পারিবারিক কবরস্থানেই দাফন করা হয়েছে। তরুকে ত্রানার পরিচয়েও দেশে রাখাটা সেইফ ছিলোনা সেই জন্যই পরবর্তীতে তরুকে লন্ডনে তাজিমের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।
এদিকে সব ইনভেস্ট মেন্ট হারিয়ে রাফিজ, হারুন আর আফজাল যখন দিশেহারা হয়ে পড়লেন। তখন যে যার পারিবারিক বিজন্যাসের দিকেই ফোকাস করতে শুরু করলেন। আর এভাবেই ৫ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তারা আবারও তাদের আগের অবস্থানে পৌছাতে সক্ষম হয়। বলতে গেলে রাফিজ এই ১২ বছরে আগের চেয়েও বেশি ক্ষমতাশালী আর দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ বিজনেসম্যানের মধ্যে এসে পৌছেছেন। বলে রাখা ভালো লিজার বাবা মা নেই তরুর ড্যাড লিজাকে তরুর এসিস্ট্যান্ট হিসেবেই রেখেছিলেন। তার কাজ ছিলো নীলাভের উপরে নজর রাখা। আর এই কাজের মধ্যে দিয়েই লিজা অনেক বিশ্বাসী হয়ে ওঠে আর তাকেও উলফ স্কোয়াডে শামিল করা হয়। বিভান আর আভিককে এই ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি কখনো। তারা তো জানতো তাদের মা এক্সিডেন্টে মা'রা গেছে, যদিও তরুর ত্রানা হওয়ার ঘটনাটা তাদের জানা ছিলো।
ফ্ল্যাশব্যাক এন্ড...
আভিক উঠে দাড়িয়ে বলে, “এতোবড় একটা ঘটনা তোমরা আমাদের থেকে লুকিয়ে রেখেছিলে কেনো?”
হারুন বললেন, “তরু মামনির জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমরা।”
বিভান বলল, “তরুর জন্য? বাবা কাম অন আফটার অল ও একটা মেয়ে।”
কথাটা শুনে তরু আড়চোখে বিভানের দিকে তাকায়।
রাফিজ বলে ওঠেন, “ও আমার মেয়ে, আমার ত্রানা। ওর হাত ধরেই আমার জীবনে সফলতা এসেছে। আমার অবর্তমানে আমার সবকিছু ওরই।”
কথাটা শুনে বিভান চুপ হয়ে যায়। সে তরুকে আলাদা ভেবে কোনো কিছুই বলেনি।
“আংকেল আপনি ভুল ভাবছেন আমি ওকে পর ভেবে কথাটা বলিনি। আমি বলতে চাইছি লড়াই টা তো আমাদের। জমশেদ হায়দার আমাদের মাকে নির্মম ভাবে হ'ত্যা করেছে। সেখানে ত্রানাকে না জড়ানোই তো ভালো।”
রাফিজ বললেন, “তোমরা তরু সম্পর্কে পুরোটা জানোনা তাই এসব বলছো। তোমরা জানো? তরুকে যেই খু'নের দায়ে ফা*সির রায় দেওয়া হয়েছিলো সেই খু*নটা কে করেছিলো?”
কথাটা শুনে সবাই চমকে তাকায়।
আভিক বলে, “কে?”
তরু বলে উঠলো, “জমশেদ হায়দারের একমাত্র ছেলে জসিম হায়দার। ওই সেদিন নেহাকে খু'ন করেছিলো।”
বিভান বলল, “কি বলছিস? কেনো?”
ফ্ল্যাশব্যাক স্টার্ট…
“নেহার সাথে তার রিলেশন ছিলো। এই ব্যাপারে কেউই কিছু জানতো না। নেহা ছেলেটাকে ভালোবাসতো। জসিম ছেলেটা ভালো ছিলোনা। আমি যখন স্কুলে যাওয়া আসা করতাম তখন দেখতাম রাস্তার পাশে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের ই’ভটি’জিং করতো৷ জসিমের নানা বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে ৫ মিনিট দূরে ছিলো। জসিম সেখানে থেকেই পড়াশোনা করতো। নেহা আপু আর জসিম একই কলেজে পড়তো। আমি একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে নেহাকে আর জসিমকে একসাথে দেখে ফেলি। আমি তো ছোটো ছিলাম বুঝতে পারিনি আমি গিয়ে নেহার মা মানে আমার শাশুড়ীকে বলে দিয়েছিলাম। নেহার মা নেহাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে নেহা সোজা না করে দেয়। আর উল্টো আমার উপরেই ক্ষেপে যায়। এমনকি নেহা সেদিন আমার গায়েও হাত তুলেছিলো। তারপর থেকে আমি আর এই বিষয়ে কিছুই বলতাম না। একদিন আমি স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরছিলাম দেখলাম নেহা আর জসিমের মাঝে কোনো একটা বিষয় নিয়ে তর্ক হচ্ছে। আমি দেখেও না দেখার ভান করে চলে গিয়েছিলাম। আমি নীলাভকেও এই ব্যাপারে বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু ভয় পেয়ে বলিনি যদি নেহার মতো সেও রাগ করে। এমনিতেও নীলাভ সবসময় আমার উপর বেশিই রাগ করতো।
অবশ্য কারণ ছিলো আয়ু। আয়ু কোনো না কোনো ভাবে আমাকে নীলাভের চোখে খারাপ বানিয়ে দিতো। একদিন আমি নীলাভদের বাগানে বসে ছিলাম তখনই বাগানের পাশ থেকে কারো চিৎকার শুনতে পেয়ে সেদিকে গিয়ে দেখি কয়েকজন মুখোশ পরা লোক নেহাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। আর হঠাৎ করেই একজন নেহার পেটে ছু*রি ঢুকিয়ে দেয়। আমি চিৎকার করে সেদিকে ছুটে যাই। আমার চিৎকার শুনে লোকগুলো পালিয়ে যায়। আয়ু তখন নীলাভদের বাড়িতেই ঢুকছিল চিৎকার শুনে সে সেদিকে তাকিয়ে দেখে নেহার পেট থেকে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আমি নেহা আপুর কাছে যেতেই নেহা আপু লোকগুলোর যাওয়ার দিকে ইশারা করে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে”
“তরু জসি,,,জসিম,”
“আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম লোকগুলো ততক্ষণে দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে গেছে। নীলাভ টিউশনে যাবে বলে বের হচ্ছিলো আয়ু নীলাভের হাত ধরে টেনে নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। আমি তো নেহা আপুর ওই অবস্থা দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিছু না ভেবেই নেহা আপুর পেট থেকে ছু*রিটা টান দিয়ে বের করি। আর ঠিক সেই মূহুর্তেই নীলাভ আমাদেরকে দেখে ফেলে। ব্যাস যা হবার তাই হলো। সবাই ভেবে নিলো আমিই রাগের বশে আপুকে খু'ন করে ফেলেছি। লোকগুলোর হাতে গ্লাভস থাকায় ছু*রি থেকে শুধুমাত্র আমার হাতের ছাপই পাওয়া গেলো। আমার কথা কেউ শুনলো পর্যন্ত না। এমনকি আমার নিজের বাবাও তখন অবিশ্বাস করেছিলো আমাকে। অবশ্য পরে আমার মৃ*ত্যুর খবর পেয়ে সে নিজের ভুল বুঝতে পারে। যতই হোক জন্মদাতা হিসেবে আমাকে ফেলে দিতে পারেননি।”
ফ্ল্যাশব্যাক এন্ড...
তরুর কথা শুনে সবকিছুই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো সবার কাছে। তাদের কথার মাঝেই একজন কাজের লোক এসে দুপুরের খাবার দিয়ে যায়। তারা খেয়ে দেয়ে আবারও সোফায় এসে বসলো। এখন শুধু আলফা তাদের দিকনির্দেশনা দিলেই কিছুক্ষণ পর সবাই যার যার গন্তব্যে চলে যাবে।
রাফিজ বললেন, “আজকে তোমাদের আলফার পরিচয়ও জানাবো।”
আভিক খুশি হলো, “তাই নাকি? আমার অনেক দিনের শখ আলফাকে দেখার।”
তরু বাকা হেসে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললো।
“নে যতো ইচ্ছা দেখে নে।”
তারা ৩ জনই চমকে গেলো।
রাফিজ বললেন, “আমাদের আসল আলফা হচ্ছে ত্রানা।”
আভিক বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়, “কিহ?”
বিভান বলে, “এটা কিভাবে সম্ভব? তরু তো এতোদিন বিদেশে ছিলো তাহলে তরু আলফা হলো কিভাবে?”
রাফিজ বললেন, “আজ থেকে ৬ বছর আগে তোমাদের বাবা আর আমি মিলে এই উলফ স্কোয়াড গ্যাং গঠন করার চিন্তা করি। যাতে আমাদের মতো পরিস্থিতিতে কেউ পড়লে আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি। সেই হিসেবেই ত্রানাকে লন্ডনে রেখে সেখানে থাকা গ্যাংস্টারদের সাথে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। ত্রানার ১৮ বছর হওয়ার পরেই দেশে ফিরে আসার কথা ছিলো কিন্তু আলফা হওয়ার জন্যই সে বাড়তি ৬ বছর সেখানে থেকেই ট্রেনিং নিয়েছে। আর এতদিন যে আলফা সেজে ছিলো সে নিতান্তই একজন ওয়ার্কার্স, যে সবসময় ত্রানার কথা মতোই কাজ করে গেছে।”
তারা ৩ জন চুপ হয়ে রইলো ব্যাপারটা হজম করতে একটু টাইম লাগবে। তবে তাদের জেনে ভালো লেগেছে যে তরুই হচ্ছে আলফা। যে বয়সে তাদের থেকে ছোটো, মানে তাদের ভুল হলেও সে তাদেরকে বকাবকি করতে পারবেনা। তার উপর তরু তাদের বেস্ট ফ্রেন্ড।
সব কথা শেষে তরু তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আর রাফিজ তার ম্যানেজারদেরকে নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
চলবে,