ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ নীল চিঠি

১১তম পর্ব

লেখক: Sayma Noor
#নিষিদ্ধ_নীল_চিঠি 
#পর্ব_১১
#সায়মা_নূর
গরমের দিনের ক্লান্তি মুছে যায় সন্ধ্যার কোমল ছোঁয়ায়,রোদ্দুরের দহন হারিয়ে গিয়ে আকাশ জুড়ে মেলে নরম শীতল বাতাস।কমলা, সোনালি আর বেগুনির মিশ্রনে আঁকা হয় নীরব এক ছবি,যেন প্রকৃতি নিজেই থেমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে ধীর হয়ে।হালকা বাতাস এসে ছুঁয়ে দেয় অবসন্ন পৃথিবী,গাছের পাতায় পাতায় বাজে নীরবতার মিষ্টি সুর।
দূরের পাখিরা ডানা গুটিয়ে ফিরে যায় আপন নীরে,তাদের গুঞ্জনে যেন লুকিয়ে থাকে দিনের শেষ গান।মাটির উষ্ণ গন্ধে মিশে থাকে দিনের হাজারো গল্প,আর আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মন খুঁজে পায় অচেনা এক শান্তি।গরমের এই সন্ধ্যা—নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরে, ক্লান্ত হৃদয়ে বুনে দেয় প্রশান্তির স্বপ্ন।একটু পরেই মাগরিবের আজান পরবে, রুবিনা বেগম পিতলের বদনা হাতে পুকুরপাড় থেকে ওযু করে গুজা পিঠ নিয়ে ধীরো পায়ে হেঁটে বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই দেখলো তার নাতনি মন্জুর মুখখানি।
সে দ্রুত কাঁপা হাতে বদনাটা মাটিতে রেখে এগুলো কয়েক কদম ততক্ষণে মন্জু খাতুনও এগিয়ে এসে দাদিকে জড়িয়ে ধরেছে। 
মন্জু : আসাসালামুয়ালাইকুম বু কিরুম আছুইন ?
রুবিনা : ওয়ালাইকুমুস সালাম ভালাই আছি, সূয দেহি পশ্চিমবা উঠছে! কিভা আ‌ইলি তুই ঐ কালিমুহি তোরে আইবার দিলো?
মন্জু : ধীরে কও বু আমার লগে আমার হোওরিও (শাশুড়ি) আইছে! 
রুবিনা : হায় হায় ঐ মা গি রে আনছোস কা তাদের কথার মাঝে মীর হাজির হয়। 
মীর : বড়মা আমিও আইছি লগে আন্নের বৌমাও আছে।মীর কথাটি বলে মায়া কে ইশারা করে মায়া এগিয়ে গিয়ে।রুবিনা বেগম এর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। মায়া কে দেখে রুবিনা বেগম অবাক হয়ে বলে।
রুবিনা : ও মাইয়া মাইয়া গো এইডা তো দেহি চান্দের টুকরা, আব্বাজান এই চান ক‌ইতনে আনলা মীর মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে, সত্যিই তার বউটা চান্দের টুকরা।
রাতের আকাশটা মেঘলা, যেকোনো সময়ে মুষলধারায় বৃষ্টি নামবে নামবে ভাব, দূরে আকাশে গুর গুর বজ্রপাতে শব্দ হচ্ছে।মীরের নানা বাড়ি বড় মাটির এল(L)আকারের একটাই দালান, সামনে পেছনে বড় বারান্দা দুই পাশে দুটো দুটো চারটা দরজা।মীরের চার মামা সবাই আলাদা, নিজেদের আলাদা বাড়িতে থাকে,এই বাড়িতে মীরের নানা -নানী,বড়মা আর বড়মার সঙ্গী হিসেবে মীরের মামা তো বোন আরফা থাকে।
আরফা বিধবা, তার জামাইয়ের অকাল মৃ ত্যু র পর থেকেই সে দাদীর সাথেই থাকে। রাজিয়া বেগম এই বাড়ি আসার পর থেকেই কেমন গাল ফুলিয়ে চুপ হয়ে আছে। মন্জু খাতুন শাশুড়ির ভয়ে, বাপের বাড়িও মন খুলে কথা বলতে পারছে না।
ওদিকে মীরের নানী রুফেজানেসা, তাদের গ্রামের প্রথা অনুযায়ী, মীর-মায়া কে বরণ করার জন্য বরণ ডালা সাজাচ্ছে। তা দেখে রাজিয়া বেগম তার বেয়ান রুফেজানেসা কে ঢেকে বলে। 
রাজিয়া : বেয়াইন বরণ করতাছুইন ভালা কথা,তয় ঐ বিধবা মাইয়া যেন আমার নাতি-নাত বৌ এর কাছে না আহে, এডি অমঙ্গল যানুইন তো।তার ছোঁয়া কোন কিছু যেন আমার নাত বৌ এর আসেপাশে না থাহে।রুফেজানেসার খারাপ লাগলো কিন্তু এইসব গ্রামের সবাই মেনে চলছে বহু যুগ ধরে,তাই সে  মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
আরফার বিয়ের নয় মাসের মাথায় তার জামাই মাছ ধরতে গিয়ে,নৌকা সহ মধ্য নদীতে তলিয়ে যায়, তার লা শ ও পাওয়া যায় নি। তখন আরফার শ্বশুরবাড়ির মানুষরা তাকে অপয়া বলে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তার পরে আরফা তার বাপের বাড়ি উঠে, কিন্তু সেখানেও তাকে নিয়ে অনেক সমস্যা হয়।
আরফার বড় ভাইয়ের বৌ অন্তঃসত্ত্বা হ‌ওয়ায়,আরফা কে তার আসে পাশে রাখা অমঙ্গল হবে বলে সবাই। তখন সেই চিন্তা ভাবনা থেকেই আরফা কে তার দাদী রুবিনা বেগম এর কাছে রাখা হয়। আর এখন দুই বছর আরফা দাদীর সঙ্গী হয়ে আছে। রাজিয়া বেগমের কথা শুনে মায়া আবাক হয়ে। বিধবারা অমঙ্গল বয়ে আনে,এই কথা তার মনে দাগ কাটে ।
মীর আর মায়াকে বরণডালা সাজিয়ে মোটা রুপার চেইন পরিয়ে নানী রুবিনা বেগম  আর বড়মা রুফেজা বেগম বরণ করে ঘরে তুলে। আরফা দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে তা, বিধবা বলে শুধুই যে কাপুড়ের রং পরিবর্তন হয়নি।পরিবর্তন হয়েছে তার গোটা জীবনের রংটাও। 
অকাল বিধবা বলে ,কারো বিয়ে হলে তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, নতুন বাচ্চা হলে বাচ্চার মুখটাও দেখতে দেওয়া হয় না, এমনকি মৃ ত বাড়িতেও সাত দিন তার পায়ের ধুলা পড়া অমঙ্গল হয়ে গেছে।আরফার মাঝে মাঝে মনে পরে তার নয় মাসের সংসারের কথা, স্বামীর সোহাগ-আদর। কিন্তু ভাগ্য তার থেকে সব কেরে নিয়েছে।সত্যিই কি শুধু সব ভাগ্য কেড়ে নিয়েছে, নাকি সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার?
মায়ার আলতা পরা পায়ে দিকে তাকিয়ে থাকে আরফা,কি চমৎকার সুন্দর লাগছে।মাথা নামিয়ে নিজের পা জোড়া দেখে সে কি বিশ্রী দেখতে লাগছে ,জুতা ছাড়া,কাঁদা-মাটি লেগে আছে, অথচ দুইজনের গায়ের রং এক‌ই।!রাতের খাবার খাওয়া শেষ , মন্জু খাতুন আজ তার দাদী রুবিনা বেগম এর সাথে ঘুমাবে, মায়া কে ঘুমাতে দেওয়া হলো রাজিয়া বেগমের সাথেই। 
আরফা পেছনের বারান্দার ছোট ঘরের ছোট চৌকিতে রাতে থাকবে আজ। মীর তার নানা হাসান তরফদার এর সাথে আড্ডা দিচ্ছে বাহিরে। দুইজন বিড়ি টানছে আর সুখ দুঃখের আলাপে মজেছে, তাকে একা কোনার ঘরটায় থাকতে দেওয়া হয়েছে।
হাসান : দিনের ভাব ভালা না ভাই ল‌ও ঘরে যাইয়া হুইয়া পরি। মীর বিড়িতে টান দেয় জোরে,নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে বলে। 
মীর : দিনের মতোন আমার মনের ভাব‌ও ভালা না নানা। তোমার ঘরে বৌ আছে তুমি যাইয়া হুতো, আমার ঘর খাইলা(খালি) এতো তাড়া নাই। হাসান হো হো করে হাসে বলে। 
হাসান : তয় বেয়াইন ঘুমাইলে,ঘরে ব‌উ আইনা দেই। মীর হাসে, মজার ছলে বলে। 
মীর : আবাত্তি এহনো কাজের না। তুমি যাও হুইতা পরো। 
হাসান : তয় আইজ নতুন ডারে ল‌ইয়া হুতুম,তোর নানী বুড়া বেডি ঝুনা ঝুনা লাগে,আবাত্তি পাইলে ভালাই হয়।
মীর : ওই শালা বুইড়া ,ঝুনা ,বাত্তি তুমি নিজেই ,আবাত্তি সামালাইবার পারতা না,আর আমার বউরে তো নাই।
হাসান : চেষ্টা করুম নি!
 মীর : ঠ্যাং কাইটা হাতে ধারাই দিমু।কথাটি বলেই দুই জন একসঙ্গে হেসে উঠে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, হাসান তরফদার আর দাঁড়ালো না তার আবার যক্ষা রোগ ধরা পরছে। ঠান্ডা লাগলে সমস্যা তাই ঘরে ঢুকে গেল।
 মীর বারান্দায় কোনায় দাঁড়িয়ে।বারান্দার ছোট কামরার দরজা ভিড়ানো, আরফা দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে, এতো সময় তার দাদা আর মীরের সব কথা শুনেছে সে। যুবতী আরফা স্বামীর সঙ্গে কামনা করে প্রতি রাতেই। মায়া অউপযুক্ত শুনেছে সে,তারা আলাদা ঘরে থাকে এখনো।
এইসব রুফেজা আর রাজিয়া আলাপ করছিলো যখন রুফেজা নেসা মায়া কে মীরের ঘরে ঘুমাতে যেতে বলে।তখন থেকেই আরফার মাথায় মীরকে নিয়ে গোপন কামনার ইচ্ছা জেগেছে। তার স্বামী নাই আর মীর পুরুষমানুষ স্ত্রী সঙ্গ তো তার কামনা আছেই।
যুবতী আরফার হঠাৎ করেই বারান্দায় শেষ কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা মীরের পেছনে এসে দাঁড়ালো, বাহিরে ততক্ষণে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, জোরে বজ্রপাত হতেই আরফা মীরকে পেছন থেকে জাপটে ধরে, চমকে যায় মীর।
আরফা : মীর ভাই আন্নে চাইলে আইজ রাইতে আমার লগে হুতবার পারুন আমি কাওরেই ক‌ইতাম না।মীর কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পায়নি তার আগেই আরফা মাটিতে পরে যায়। মীর পেছনে ঘুরে দেখে, হাসান তরফদার আরফার চুলের গোছা ধরে টেনে দাঁড় করাচ্ছে।
হাসান : চু ত মা রা নী অলক্ষী মা গী, ভাতার খাইয়া পেট ভরে নাই, এখন বে শ্যা গীরি শুরু করছোস। তুই আমার নাতিরে ছোঁয়র সাহস পাইলি ক‌ই?!
কথাটি বলেই হাসান তরফদার আরফা কে মারতে থাকে। মীরের সব বুঝতে খানিকটা সময় লাগে। যখন সবটা বুঝতে পারে দ্রুত হাসানর হাত থেকে আরফা কে বাঁচায়। বৃষ্টির শব্দ ঘরের ভেতরে কেউ টের পায়নি এই সব। মায়া চৌকিতে(চার পায়া খাট) উঠছে না রাজিয়া বেগম ঘুমিয়ে নাক ঢাকছে। কিন্তু মায়া ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। 
বিধবার সাথে থাকে অমঙ্গল বারবার এই কথাই মাথায় ঘুরছে। রাজিয়া বেগম‌ও তো বিধবা।তাই সে উঠছে না বিছানায়। কিন্তু তার খুব ঘুম পাচ্ছে,ঘুমে টলছে এক প্রকার। তখনি মীর ঘরে ঢোকে হারিকেনের মৃদু আলোতে দেখা যাচ্ছে মায়া দাঁড়িয়ে আছে। অস্থির মীর কোনো দিকে তাকায় না, সোজা গিয়ে মায়া কে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। 
নিজের জন্য বরাদ্দ করা কামরায় না গিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই মায়া কে নিয়ে নেমে পরে উঠানে,কোনো দিকে না তাকিয়ে। উঠান পেরিয়ে বাড়ির বাহিরে পুকুর পাড়ে গিয়ে। মায়া কে কোলে নিয়েই দাঁড়ায়। একটু আগের অসহ্যকর একটা পরিস্থিতির মুখাবিলা করার পরে। বউ সঙ্গ ছাড়া এই মুহূর্তে কিছুই মাথায় নাই মীরের।
মায়া : আরে আরে কি করতাছুইন ভিজা যাইতাছি তো।
মীর : ভিজলে ভিজো, তোমার লাইগা মাইষে আমার ইজ্জতে হামলা দিছে এইডা তোমার শাস্তি বউ।কথাটি বলতে মীর বিসমিল্লাহ বলে মায়ার গালে, কামড়ে ধরে জোরে।
মায়া : ওহহহহ্ আল্লাগো কি করতাছুইন। 
মীর : কি করি!
মায়া : কামড়ান কেন?
 মীর : আমার ইচ্ছা! 
মায়া : এইডা কিরুম জাতের ইচ্ছা! 
মীর মায়ার অন্য পাশের গালে কামড়ে দিয়ে বলে।
মীর : এইডা মীরের ইচ্ছা বউ উপযুক্ত হ‌ও না কেন তুমি আর কতো দূরে থাহুম। মায়া শুকনো ঢোক গিলে এই কথা শুনে, উপযুক্ত হলেই তো এক ঘরে থাকতে হবে তখন নারগিসের বলা বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের মধ্যে স হ বা স হবে, কিন্তু মায়া তো ভয় পায়।
মায়া : যদি কুনো দিন না হ‌ই তহন? 
মীর : তহন কি আরেকটা বিয়া করুম, নতুন বউ আ‌ইবো তহন‌ তারে‌ই সব দিমু।
মীর মজা করে কথাটা বলে হাসে,মায়া কিছু বলেনা আর, মীর মায়ার পুরো মুখে ঠোঁট ছোঁয়ায়, ঠোঁটে গাঢ় চুমু আঁকে। মায়ার ভেজা ডান হাতটা আপনা আপনি চলে যায় মীরের গালে। তাতে মীর আরো শক্ত করে চেপে ধরে মায়া কে।
মীর বেশ কিছুক্ষন মায়া কে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ফিরে। মায়ার কাপড় পরিবর্তন করার সময়টুকু মীর বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে থাকে। আবেগের বসে বৃষ্টিতে ভিজে এখন মীর ভয় পাচ্ছে যদি তার বউর ঠান্ডা লেগে যায়। তাই নিজেই গামছা দিয়ে মায়ার লম্বা  চুল ততক্ষণ পর্যন্ত মছতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত সব চুল না শুকিয়ে যায়।
মায়া পুরোটা সময় চুপ থাকলো তার কেন যানি অসহ্য লাগছে সব। ইদানিং তাকে ঘিরে মজার কথা গুলোতে সে মজা অনুভব করেছে না আগের মতো। মীর মায়ার চুলে তেল লাগালো, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে বেনুনি বাঁধতে বাঁধতে বলে।
মীর : বউ ওমনে খাড়াইয়া আছিলা কেন না ঘুমাইয়া ভয় পাইতাছিলা নি?
মায়া : না 
মীর : তয়
মায়া : বিধবার ছোঁয় অমঙ্গল কয় সবাই তয় আমনের দাদীও তো বিধবা, আমি হের লগে আর থাকতাম না।
মীর : কি ! মায়া দ্রুত পেছনে ঘুরে আঁকড়ে ধরে মীরের বাহু ধরে আবদার করে বলে।
মায়া : হুনুইন না আমি আমার বাহের বাড়িত থাকবার চাই আমি আর বু য়ের গলে থাকতাম না।সব তো সহ্য করতে পারে মীর মায়ার চলে যাওয়ার কথা ছাড়া।
মীর : বউ তুমি বুঝনাই বিয়ার আঠারো মাসের ভিতরে বিধবা হ‌ওইলে অমঙ্গল কয় সবাই,দাদায়তো মরলো বুড়া হ‌ইয়া। তোমার বুঝার ভুল হ‌ইছে বউ।
মায়া : কিন্তু! 
মীর : কি?
মায়া : আন্নে আরেকটা বিয়া করবেন তয় আমি থাইহা কি কাম।এইকথা শুনেই মীর মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে কোলে বসায়। মায়ার গালে নাক মুখ ঘষে বলে।
মীর : হেরুম (তেমন) কিছু হ‌ইবো না বউ। আমি তোমার উপযুক্ত হওয়ার লাইগা প্রয়োজনে আরো তিন বছর অপেক্ষা করুম। খালি তুমি আমার সামনে থাকবা।
মায়া : আচ্ছা 
মীর : কি আচ্ছা 
মায়া : সামনে থাহুম মীর চুমু বসায় মায়ার ঠোঁটে, বুকে জড়িয়ে নেয়।কিছু সময় পর মায়া চুপচাপ রাজিয়া বেগমের পাশে এসে শুয়ে পড়ে।
সকাল থেকে আরফার আর দেখা মেলে না,সে ইচ্ছা করেই কারো সামনে আসে না আর, বাড়ীর কেউ তাকে খোঁজ‌ও করেনা।ফিরে আসার সময় মীর তার নানাকে বলেছিল আরফার দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার কথা। হাসান তরফদার নাকি পাত্রের খোঁজ করেছে অনেক কিন্তু বিধবাকে কেউ বিয়ে করতে রাজি হয়না।
 ভাদ্র মাসের শুরুর দিকে, প্রকৃতিতে বর্ষার বিদায় ও শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে হাজির। এ সময় সাধারণত ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্রতা খুব বেশি থাকে, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীতে কাশফুল, কখনো দু-এক পশলা বৃষ্টি, আবার কখনো কড়া রোদের খেলা চলে, মূলত রোদ-বৃষ্টি ও সবুজের সমারোহে মিশ্র এক প্রকৃতি দেখা যায়।ভাদ্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ভ্যাপসা বা "তাল পাকা"  দিনের বেলা কড়া রোদ থাকলেও, আকাশ নীল ও তাতে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়।এ সময়ে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বৃষ্টির দেখা কমে আসে।
তবে মাঝেমধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি বা ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে যায়। অনেকের কাছে প্রকৃতির এমন রূপ, প্রিয় হলেও রাজিয়া বেগমের কাছে বিরক্তিকর লাগে, এই বৃষ্টি এই রোদ তার পছন্দ না। তার ভাষ্যমতে হয়তো বৃষ্টি থাক,নয়তো রোদে থাক এমন অবস্থায় বারান্দায় বসে মনোযোগ দিয়ে তালপাতার পাখা বানাচ্ছে// ইদানিং রাজিয়া বেগম প্রচুর চিন্তিত, তার মাথা কাজ করতাছে না।
তিন বছর হয়ে গেলো বিয়ের তার নাত বৌ এখন নাবালিকা তার নাতি বুড়া হয়ে যাচ্ছে এখনো শারীরিক সুখ পেলোনা। এমন ঘটনা তো তাদের চৌদ্দ গোষ্ঠীর মধ্যেও ঘটেনি কোনোদিন।নারগিসও এখন গর্ভবতী,আর ভালো লাগছেনা। এইসব রাজিয়া বেগমের ,সে ভাবলো এবার আর চুপ বসা যাবেনা, কিছু তো করতেই হবে।
 সে নারগিসকে দিয়ে, তিনবাড়ির পরের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধা সরুফা খাতুন কে ডেকে পাঠালো। আপাতত এইটাই মোক্ষম সময় বাড়ি খালি। মীর দোকানে আর আরশাদ আলী স্কুলে। বৃদ্ধা সরুফা খাতুন গাছন্ত ঔষধ বানায়।
 নারী ঘটিত সমস্যার জন্য, গ্রামের মহিলারা তাকে খুব বিশ্বাস করে। লতাপাতার গাছের শিকড় নানান ধরনের মসলা দিয়ে তৈরি করা তার ওষুধ খেয়ে অনেক বন্ধ্যা মহিলারা মা হয়েছেন। অনেক নারীকে নাকি ছেলে হওয়ার জন্য আলাদা ওষুধ দিয়েছে, তাদের আবার সত্যিই ছেলে বাচ্চা হয়েছে। গ্রামে বহু বছর ধরে চলছে এমন ঘটনা। রাজিয়া বেগম সরুফা খাতুন এর কাছে মায়ার কথা খুলে বলে গোপনে।
সরুফা : ও মাইয়া মাইয়া গো কি ক‌ও এডি ,এ তো দেহি বর‌ই জটলা বেপার।
রাজিয়া : হে‌ইডাই তো বু ওহন কি করতাম,নাতি বিহা করাইছি ওহনো শ‌ইলের সুখ পাইলো না। আন্নের কাছে কি কিছু আছে যা খাইলে শ‌ইলেরডা হ‌ইবো।
সরুফা : হ আছে তয় তোমাগো বৌ পারবো নি হেইডাই দেহার বিষয়।
রাজিয়া : পারবো পারবো আন্নে দেন দেহি।
সরুফা : তাই আমি হাইনঞ্জা বেলা( সন্ধ্যা) টিক মাইরা লোইয়া আহুম,, বিয়াইন্নাকালে (ভোর সকালে) আইনন্দার থাকতে খালি পেঢে কমর হমান পানিত খারোইয়া ঔসুদের ছেইচ্চা রস খাইতে হ‌ইবো,হের পরে সারাবেইল(সারাদিন) কিছু খাইবার পারবো না,রাইতে লবন দিয়া ভাত খাইবো। তিনদিন মানুন লাগবো পারবো নি?
রাজিয়া : সারাবেলা না খাইয়া থাহুন লাগবো ?
সরুফা : হ এইতা ঔসুদ খাইলে দিনে খালি পেঢে থাহুন লাগবো।রাইত ছাড়া খাওয়া যাইতো না।
রাজিয়া বেগম চিন্তায় পড়ে যায়। সারাদিন না খেয়ে কিভাবে থাকবে। তাছাড়া ওষুধ সে গোপনে খাওয়াবে বাড়িতে কেউই জানলে সমস্যা হবে বিশেষ করে তার ছেলে আর নাতি , কিন্তু তারপরও রাজিয়া বেগম রাজি হলো।
রাজিয়া বেগম সত্যিই মায়া কে অন্ধকার থাকতেই টেনে ঘুম থেকে ওঠায়। সকালে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে এই ঠান্ডার মধ্যেই মায়া কে পুকুরের কোমর সমান পানিতে দাঁড় করিয়ে। অসম্ভব তিতা ঝাঁঝালো ওষুধের রস খেতে বাধ্য করে।সেই রস গলাদিয়ে যখন নামছিল মায়ার মনে হচ্ছিল যেন গলা পুড়ে যাচ্ছে। ছোট মায়ার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরছিল পুরোটা সময়। 
ঠান্ডা  পুরো শরীর থর থর করে কাঁপছিল। মায়া তখন পানি খেতে চাইলে রাজিয়া বেগম নিষেধ করে বলে কিছু খাওয়া যাবেনা সারাদিন,তা শুনে রমায়া আরো কান্না করে। এই বাড়িতে এতদিন ধরে আছে মাঝে মাঝে মায়ের জন্য খারাপ লাগতো মায়ার। কিন্তু কখনো কান্না আসেনি এখানে থাকতে খারাপ লাগেনি, দু-একবার মীরকে বলেছে বাড়ি যাওয়ার কথা। কিন্তু নারগিসের মত কান্নাকাটি করে ফিরে যেতে চাইনি কখনো, কিন্তু আজ মায়ের কাছে চলে যেতে ইচ্ছা করছে।
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে মীর একবারের জন্যও তার বউটাকে দেখেনি। প্রতিদিন তো রান্না ঘরে দেখতে পায় আজকে কি হলো। কোথাও কোনো শব্দ‌ও পাচ্ছে না।সকালের নাস্তার সময় মায়া বেরে খাওয়ায় মীর কে তবে আজ নারগিস  বেরে দিল তখনো মায়া নাই। নারগিস গর্ভবতী সবে মাত্র দুই মাস, খবরটি জানার পর আরশাদ আলী  গিয়ে মেয়েকে নিয়ে এসেছে। মীর নারগিস কে জিগ্গেস করলো। 
মীর : তোর ভাউ(ভাবি) ক‌ই?
নারগিস : হুইত্তা (শুয়ে) র‌ইছে।
 মীর : এতো বেলা কইরা কেন কি হ‌ইছে?
নারগিস : কি জানি আমি ক‌ইবার পারুম না।
মীর আর কিছু বলেনা,তবে তার দাদি রাজিয়া বেগম এর জন্য সে গিয়ে দেখতেও পারলো না কি সমস্যা।সারাদিন মীর দোকানে বসে ভাবলো তার বউর কথা। কি এমন হলো যে সকালে একটা বার তাকে দেখা দেওয়া গেল না। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মীর আজ আর মায়া কে উঠনে পায় না। প্রতিদিন তো থাকে ডিম সিদ্ধ খেয়েই ঘরে যায় তবে আজ ক‌ই,রাতে খেতে বসেও মীর দেখা পায়নি মায়ার, এবার তার বিরক্ত লাগছে খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছে,রাগ লাগছে, ঠিক ভাবে খেতে পারছে না কাউকে কিছু বলতেও পারছে না।তখনি আরশাদ আলী  বলে উঠলো।
 আরশাদ : বৌ ক‌ই? 
রাজিয়া : ও ঘুমায়!
 আরশাদ : আজ এতো আগেই , ভাত খাইছে।
রাজিয়া : হ হ খাইছে,খাইয়াই হুতলো।
মীর চুপচাপ শুনলো সব কথা। তার কেমন যানি  অস্থির লাগছে সব। খাওয়াটাও হলো না ঠিকঠাক ।
পরদিন এক‌ই ঘটনা ঘটে মীর দেখা পেলো না মায়ার, মন্জু খাতুন ইচ্ছা করে ছেলের সামনে আসলো না। এই ঘটনা সে কাল বিকালে টের পেয়েছে তবে শাশুড়ির সাথে মন্জু খাতুন কখনোই পারে না কথায়। মূলত প্রচুর সম্মান করে ভয় পায় । 
মীর মেজাজ খারাপ সে খাবার খেলো না ওভাবেই চলে যায় দোকানে।আর মায়ার শরীর সহ্য করতে পারেনা এই অমানবিক অত্যাচার। দুপুর থেকে একাধারে বমি করেই যাচ্ছে।এই অবস্থায় আর মন্জু খাতুন বসে থাকতে পারলো না। মায়া কে ধরে পুকুরে ঘাটে নিয়ে গেলেন উনি সাথে নারগিস।পেছন রাজিয়া খাতুন চিৎকার করে আসছে।
রাজিয়া : খবরদার বৌ ওরে পানি দিবা না, ঔসুদের ধাগ যাইবোগা,বমি করতে না করো সব ঔসুদ বাইরাই যাইতাছে।
মন্জু : আম্মা আন্নে দেখতাছেন না বৌ এর চোখ উল্ঢাই যাইতাছে।
রাজিয়া :যাক তাও খাওন দিবানা, গোসল করাইয়া বিসনাত হুতাইয়া দেও।
মন্জু : ছোঢো মানুষ আম্মা ম‌ ই রা যাইবো।
রাজিয়া : ম র লে ম রু ক ১৪ বছরের মাইয়া ছোঢো না বৌ,আর আমি কি খারাপ চাই নাকি শ‌ইলেরডা হয় না দেহাই তো। ম র লে আমাগো মীর কে আবার বিয়ে করামু।তারা কথায় এতটা ডুবে ছিল যে পেছনে মীর  দাঁড়িয়ে আছে কেউ দেখেনি।
মীর : কেডায় ম র বো বুবু ?
রাজিয়া বেগম চমকে যায় মন্জু খাতুন ভয় পায় আর নারগিস মায়া কে ফেলে দৌড়।মীর দেখে মায়া মাটিতে পরে আছে।  অর্ধেক শরীর ভেজা, জ্ঞান নেই মীরের বুকের ভেতর মুচড়ে উঠলো। খুব অস্থিরতায় ভুগছিলো। তাই দোকান কর্মচারীদের কাছে ফেলেই বাড়িতে চলে এসেছে। সকালে দোকানে যাওয়ার সময় দেখেছে মায়ার জন্য কিনে আনা কলাগুলো পচে আছে।
 মীর অবাক হয়েছিল তা দেখে ,যার মানে তার বউ দুইদিন ধরে একটাও কলা খায়নি এমন কি সে অনুভব করেছে দুইদিন ধরে তার ঘর অন্য কেউ গোছায়। এইসব ভাবনায় তার ভেতরের অস্থিরতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
 সে এক ছুরি কলা হাতে বাড়ি ফেরে ,আর এসেই শুনতে পারলো তার দাদি বলা প্রত্যেকটা কথা,যা তার হৃদয়ে সুঁচের মতো বিঁধেছে,মীরর হাতে বড় কলার ছুরি টা হাত ফুসকা মাটিতে পরে।
চলবে..........
ভুল ত্রুটি হলে সবাই, ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন