#নিষিদ্ধ_নীল_চিঠি
#পর্ব_১২
#সায়মা_নূর
দুপুরের ভ্যাপসা গরমে বাতাসও যেন হাঁপিয়ে ওঠেছে রোদে ঝলসে যায়। পথে ছায়াটাও লুকিয়েছে কোথাও।ঘামের ভিজে একাকার মাঠের কৃষকের পুরো শরীরে সময়টাও চলছে ধীরে।গরমে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আরশাদ আলীর অবস্থা একেবারে নাজেহাল রোদে পুড়ে শরীর ক্লান্ত, ঘামে ভিজে গেছে জামা আর গাল।
ঘাম থেকে শরীরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, নিজের শরীরের গন্ধ নিজের কাছেই অসহ্য লাগছে। বাড়ি ফিরে দ্রুত গোসল নেওয়া দরকার। আরশাদ আলী হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির বারান্দায় এসে একটু ছায়ার খোঁজে দাঁড়ালেন।
কিন্তু বাড়িতে এসে দেখতে পেল,আবহাওয়ার চেয়েও গরম তার বাড়ির পরিবেশ,কি হয়েছে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন। মন্জু খাতুন ছেলের ভয়ে আর কথা লুকালো না। যা যা ঘটেছে সব বলে দিলো।
আরশাদ আলী এই ঘটনায় প্রচুর বিরক্ত তার আম্মা রাজিয়া বেগম এর উপরে। দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। আরশাদ আলী মা ভক্ত ছেলে তাই বেশি দূর মায়ের সাথে তর্কে জড়ায় না। ঠান্ডা মাথায় বুঝালো।
রাজিয়া বেগম নিজেও ছেলেকে অনেক কিছু বললো। যা শুনে আরশাদ আলী নিজেই অনেক চিন্তায় পরে গেলো। তার মা যা বলছে তা ভুল মনে হচ্ছে না আরশাদ আলীর। সে যাই হোক তবে এমন কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হয়নি।
রাজিয়া বেগমের তবে আরশাদ আলী এটাও মানে তার আম্মার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না।রাজিয়া বেগম যে মায়া কে পছন্দ করে না এমনটা না। সবাই জানে সে নাত বৌ কে আদর করে কিন্তু তার চিন্তা অনেক গভীরে যা সে সরাসরি বলতে পারল না।
মীর তখন মায়া কে কুলে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। সে অসম্ভব রেগে আছে তবে বরাবরই মীরের রাগ শান্ত ধাঁচের অতিরিক্ত রাগলে মৌনব্রত(কথা বলা বন্ধ )করে সে তার এমন রাগ ভয়ংকর বাড়ির সবাই ভয় পায়।
মন্জু খাতুন ভয়ে ভয়ে মায়ার কাপড় বদলে দিয়ে খাবার এনে খায়িয়ে দিয়ে যায়।মেয়েটি ভরপেট খেয়েই ঘুমিয়ে পরেছে। মীর পাশেই তার কাঠের জানালা খুলে বসে বিড়ি টানছে আর দাদির বলা কথা গুলো ভাবছে তার প্রত্যেকটা কথা মীরের হৃদয়ে সুচের মতো বিঁধছে।
যতো যাই হক দাদির তার বউর মৃ ত্যু কামনা করা। সে কিছুতেই মানতে পারছে না।বিড়িতে শেষ টান দিয়ে মীর মায়ার পাশে শুয়ে পরে। এই প্রথম তার বউ তার বিছানায় তাও আবার অসুস্থ।
মীর মায়ার দুই গালে বিসমিল্লাহ বলে চুমু খায় কয়েকটি সে খুব ক্লান্ত তার ইদানিং শান্তির ঘুম হয়না। আর গত দুইরাত তো দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি বউর চিন্তায় তাই। মায়া কে কাছে পেয়ে মীর জড়িয়ে ধরে আলতো ভাবে, তারপর চোখ বুজে আর কিছু সময়ের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে।
রাজিয়া বেগম মীরের বারান্দায় বসে আছেন পুরো দিন।কারন মীর এর ঘরে মায়া সেই দুপুর ১২ টা থেকে নাতির রাগি চেহারা দেখে কিছু তো বলতে পারছে না। তাই এভাবেই বসে পাহারা দিচ্ছে,সে এই বাড়ির মুরুব্বী বাড়ির মঙ্গল অমঙ্গল তো তাকেই খেয়াল রাখতে হবে।
অউপযুক্ত বৌ এর সাথে শারীরিক সম্পর্ক অমঙ্গল তা সে হতে দেওয়ার মহিলা না।আসরের আযান পরেছে মায়ার ঘুমটা ছুটে গেলো। মীর দুপুরে খায়নি সকালেও না সে এক ভাবেই মায়ার পাশেই শুয়ে ঘুমাচ্ছিল।
মায়া চোখ খুলে দেখলো মীরকে যে এখন তার হাতের পাঁচটা আঙ্গুল নিজের হাতের আঙ্গুলের দ্বারা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। মায়া মীরকে দেখে অবাক হলো না তার মনে আছে পুকুর পাড়ে মীর তার মাথায় পানি ঢেলেছিলো আর বারবার জিগ্গেস করছিল,,,
কি খাওয়াইছে তোমারে বউ কও কিন্তু মায়া জানেনা কিসের রস খেয়েছে। সে তো দাদি যানে।মায়া উঠে বসলো মীরের হাতে টান পড়তেই মীর চোখ খোলে তাকায় মায়ার দিকে। মায়ার সহজ সরল ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটিয়ে বলে।
মায়া : আমার খুব খিদা লাগছে! মীরের হৃদয় শীতল হলো। শোয়া থেকে উঠে বসে বললো,,
মীর : আমারোও বউ তুমি কি আমায় ভাত বাইড়া দিবার পারবা ?
মায়া : হ হ পারমু তো!
মীর : তয় চলো আইজ একলগে খাই।
মায়া দ্রুত বিছানা থেকে নামতে গেলেই। মীর বাঁধা দিলো তার শক্ত দুহাতের বাঁধনে জড়িয়ে ধরলো ছোট শরীরটা।
মীর : থামো বউ একটু আদর করি পরে যাও কেমন।
মায়া : আচ্ছা! সম্মতি পেয়ে প্রতিবারের ন্যায় বিসমিল্লাহ বলেই মীর চুমু খায় কয়েকটা।তবে আজ তার মন অশান্ত। মীর অশান্ত মনে আবদার করে বসলো।
মীর : বউ আমি যদি আইজ তোমার শরীর ছুঁইয়া দেহি তুমি কি কিছু কইবা?মায়া বুঝতে পারলো না বললো।
মায়া : কেমনে ছুঁইবেন?
মীর শাড়ির আঁচল কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে বলে।
মীর : দেখবাই তো দুক্কু দিতাম না যদি পাও সহ্য করো। চোখ বন্ধ রাহো মায়া সত্যিই চোখে বন্ধ করে নিলো। মীর ঠোঁট রাখলাম মায়ার গলায়,হালকা কামড় দিয়ে চুমু খেলো।তার হাত দুটোও ততক্ষণে বেসামাল হয়ে উঠেছে।
মায়া : আহহহহ্ দুক্কু পাই!
মীর জ: অভ্যাস করো সোনা।
আনন্দপুরে মায়ার বাপের বাড়িতে নিজের চালে ফুটা রেখে অন্যের চালে কয়টা ফোটা সেটা গুনতে যাওয়া হচ্ছে গ্রামের মানুষের কাজ। নিজেদের এতো এতো সমস্যা রেখে অন্যর ঘরে কি ঘটেছে সেসব নিয়েই যেন তাদের বেশি আগ্রহ ।
সকাল সকাল পাশের বাড়ির খাইরুল এলো আদরচাঁন বেগম এর কাছে। কোলে তার ৭ মাসের নাতি ছেলে এসেই প্রথম কথা হলো।
খাইরুল : কি গো চাচি মায়ার কি এহনো আবু দুবাই( বাচ্চা কাচ্চা) হয় নাই।দেহুন আমার মনিরার পোলা এইডা আমার নাতি। মায়ার তনে এক বছরের ছুডো আমার মাইয়া মনিরা বিয়াও দিলাম পরে।
তয় মা হইলো মায়ার আগে চাচি মায়ার কি কুনো রুগ আছিল নাহি।রুগের কতা না কইয়াই কি বিয়া দিছুইন?হায় হায় কি কমডা করছুইন!এতোটুকুই কথা তাতেই যেন গরম শীসা ঢালার মতো কাজ হলো। আদরচাঁন বেগম আগে থেকেই বিচলিত ছিল।
আশেপাশের মানুষ এতদিন দূর থেকে এসব কথা বলেছে। তবে আজ প্রকাশ্যে বাড়ি বয়ে এসে বলল। এভাবে চললে পুরা গ্রাম কথা শোনাবে। মায়া কে অপয়া অলক্ষী বলবে শরীরে দোষ আছে বলবে। আদরচাঁন বেগম অস্থির হল বউ আরিজাকে ডেকে বলল।
আদরচাঁন বেগম : কি লো বউ মায়ার ১৪ বছরের হইতে আর কয় দিন আছে।
আরিজা : আম্মা ৬ দিন আছে!
আদরচাঁন : শইলেরডা (মা সি ক) হইলো কি না জানো নি কিছু?
আরিজা : কেমনে জানুম ওয় তো হোর (শশুর) বাইত। এইনো থাকলে বুঝতাম জানতাম।
আদরচাঁন : তয় বাদশারে কও ওরে আনবার যাইতে। আহুক কয়ডা দিন থাইহা যাক বিয়া দিছি ১৪ বছর হইবো এখনো শইলেরডা হয় না কে। আরিজা চুপ করে ভাবে সত্যিই তো বিয়া হইছে তিন বছর এখন (মা সি ক) হওয়া উচিত।বেডা মানুষ এমনেই বসাইয়া খাওয়াবো কয়দিন। বেডা মানুষ শরীরেরও চাওয়া পাওয়া আছে। পুরুষেকে খুশি করার তো ঐ একটা জায়গাই।
খাবার খাওয়ার পর মায়া আবার ঘুমিয়ে গেছে মীরের ঘরেই। তার শরীর দুর্বল খুব যা এবার রাজিয়া বেগমের সহ্য হচ্ছে না। খানিকটা রেগে গেলো উনি মাগরিবের আজান পড়বে কিছুক্ষণ পর, এবার উনি নিজে ঘরের বারান্দায় বসে আছে।
মীর বিড়ি টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে কোনো দিকে না তাকিয়েই পশ্চিমের দিকে হাঁটা ধরলো। রাজিয়া বেগম ভাবলো পায়খানায় যাচ্ছে। এই সুযোগ মায়াকে ঐ ঘর থেকে বের করে আনার।
যেমন ভাবা তেমন কাজ রাজিয়া বেগম দ্রুত মীরের ঘরে ঢুকে। তবে মায়াকে ডাকে না ডাকলে যদি মীর শুনে ফেলে। তাই কাছে গিয়ে ঘুমন্ত মায়ার দিকে হাত বাড়ালো হাত ধরে টেনে তোলার জন্য। ঠিক তখনই পেছন থেকে।
মীর : খবরদার বু হাতখান সরাও কইতাছি। রাজিয়া বেগম চমকালও একটু তবে মুখমন্ডল গম্ভীর করেই পেছনে ফিরে তাকালো।
রাজিয়া : হাইঞ্জা হইছে এহন এই ঘরে ওয় থাকবার পারতো না।
মীর : আমার বউ আমার লগেই থাকবো। রাজিয়া বেগম হঠাৎ আরো রেগে গেল। মেজাজ দেখিয়ে বললো।
রাজিয়া : এতো বউ বউ করছ কা,বউএ কি মধু খাওয়াইছে যে বউ ছাড়া চলে না ! মীরও রাজিয়া বেগমের মতো করেই বললো।
মীর : হ খাওয়াইছে তো মেলা মজার মধু যেই মধু খাইয়া আমি পাগল হইছি এহন বউরে ছাড়া চলতাছেই না।
রাজিয়া : সাওয়ার পেচাল পারিস না, মধু খাওয়ানের মতো মধু আছেনি এই ছেমড়ির ! বুড়ি দামরি হইতাছে এহনো আবুদুব (বাচ্চা) হওয়ার লায়েক না এই মা গি।
মীর : ওর মধু নাই তোমার তো আছে এতোই যহন তোমার আমার আবু দুবাই এর শখ তাইলে আও তোমারে দেই আবুদুব।রাজিয়া বেগম বুঝতে পারলো। নাতির রাগ সে তর্ক না করে বোঝানোর সুরে বলল।
রাজিয়া : বিশ্বাস কর ভাই আমি বুঝবার পাইনাই যে এমন জটিল হইবো ঘটনা। আমি তো চাইছি যেন তোর জীবনের জটিলতা কমে।
মীর : তা যাই হোক বু আমার বউ ম ই রা যাইবার পারতো ওয় ছোডো মানুষ তুমি কেমনে ওরে না খাওয়াইয়া রাখলা পুরা দিন। কেমনেই বা ওর ম র ন কাম্য করলা। যা করছো ভালা করো নাই।
মুরুব্বি দেইহা আমি কিছু কই নাই । তয় এমন কিছু যানি আর না হয়। রাজিয়া বেগমের সহ্য হলো না নাতির এমন বউ এর পক্ষপাতিত্ব করা। এই জীবনে কখনো তার ছেলে। ছেলের বউ এর পক্ষপাতিত্ব করে নাই তার উপর দিয়ে। কিন্তু নাতি করছে যেটা তার কল্পনার বাহিরে।
রাজিয়া : এতো যে দরদ লাগতাছে। যদি কোনো দিন এই মাইয়া উপযুক্ত না হয় তহন কি করবি তুই?
মীর : পরের চিন্তা পরে অগ্রিম চিন্তা করমু কা।
রাজিয়া : কিছু ক্ষেত্রে অগ্রিম চিন্তা করা লাগে।
জীবন কি তোর অপেক্ষায় যাইবো নি। দরকার হইলে আরেকখান বিয়া দিমু ওরে বিদায় করমু মনে রাহিছ। মীর নিজেও খুব চিন্তিত এই বিষয়ে এতো দিন সব ঠিক থাকলেও এখন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের মানুষের কানাঘুষা তার কানেও আসে।
দোকানে দুইটা কর্মচারী বাচ্চা হয়েছে সেদিন দোকানে মিষ্টি বিতরণ করেছে তার ইচ্ছা করে। তাদের বিয়েও তার বিয়ের পরে হয়েছে।বাচ্চাটা হওয়া মূল চিন্তার বিষয় না মূল বিষয় হচ্ছে মায়া এখনো অউপযুক্ত তার বউ অউপযুক্ত থাকলে পারিবারিকভাবে- সামাজিকভাবে তার ওপর অনেক ধরনের চাপ পরবে।
তা সামাল দেওয়াটা খুব সহজ হবে না। এমন অবস্থায় কঠিন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হতে পারে তার উপর। এসব চিন্তায় মীরের মাথা কাজ করছে না। তার মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করাই ভুল ছিল।না বিয়ে হতো আর না মায়ার প্রতি সে এমন দুর্বল হতো।
মীর ভেবে নিয়েছে মায়া কে নিয়ে সে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার এর কাছে যাবে। এখন আর অপেক্ষা করার সময় নেই।রাজিয়া বেগম নিজের মতো করে বকবক করেই যাচ্ছে। ততক্ষণে মায়ার ঘুম ভেঙে গেছে।
সে উঠে বসেছে মীর দেখেনি মায়া উঠে গেছে দাদীর টক কথা শুনতে ভালো লাগছে না। দাদীর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। মীরের তাই দাদীকে থামাতে মুখ ফসকে বলে দেয়।
মীর : বিয়া করার দরকার পরলে করমু নে।এহন তুমি এহেন তনে যাও।
রাজিয়া বেগম তো এটাই শুনতে চেয়েছিলো। মূলত উনি সব সময় চায় পরিবারের সবাই তার কথা মেনে চলুক সে যা বলবে তাই সঠিক ভাবুক।
রাজিয়া : আচ্ছা আচ্ছা যাইতাছি গা ওরে উডাইয়া দে আজান পইরা যাইবো। কথাটি বলেই সে চলে যায়।
মায়া আগে পরে কিছু না শুনলেও বিয়ের কথাটি শুনেছে। তবে সে এই প্রসঙ্গে কোন কথা বলেনি। চুপচাপ বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে হাঁটা ধরলো। কারণ সন্ধার পরে এই ঘরে আশা তার জন্য নিষেধ। এই নিষেধ সে তিন বছর ধরে মানছে। শুধু যে রাজিয়া বেগম বলেছে এমনটা না। মায়র দাদীও এই একই নিষেধ দিয়ে রেখেছে।
অউপযুক্ত মেয়ের রাতে স্বামীর সাথে থাকা অমঙ্গল। এমনটাই সমাজে চলে এসেছে আর এটা সবাই চোখেই সাধারণ। তাই মায়াও মানে মায়া দরজা পার হতে নিলেই পেছন থেকে মীর ডেকে বললো।
মীর : বউ দাদী উল্টাপাল্টা কিছু খাইবার দিলে খাইয়ো না। আর হনো কাইল সহালে ঘুমতে উইঠাই তৈরি হইবা। তোমারে লইয়া একখানে যামু,ঠিক আছে।
মায়া : আচ্ছা।
পরদিন সকালে মীর বাড়ির সবাইকে বলে। তার দোকানের কর্মচারীর বাচ্চার আকিকায় মায়া আর তার দাওয়াত আছে। তাই আজ তারা পুরো দিন বাড়িতে থাকবেনা। ফিরতে সন্ধ্যা অথবা রাত হতে পারে। আরশাদ আলী কিছু বলল না।
তবে রাজিয়া বেগম তা শুনেই বকবক করেই যাচ্ছে অগোচরে। মীর তা শুনেও না শোনার ভান করলো।মন্জু খাতুন সুন্দর করে মায়া কে সবুজ রঙের একটা শাড়ি পরিয়ে। সাজিয়ে গুছিয়ে দিলো।মীর রওনা হল তার বউকে নিয়ে ভ্যানে চড়ে। মায়া মহা খুশি মীর আরে আরে হাসিখুশি মায়া কে দেখছে। কি সুন্দর লাগছে তার বউকে চোখ ফেরানো মুশকিল।
মীর : বউ আইজ তোমারে মেলা সুনদর লাগতাছে। এক্কেরে অন্য ধাঁচের সুনদর। মীর পড়েছে কালো শার্ট সাদা লুঙ্গি এই কালো সাদা মিলে মীরকে বরাবরই মায়ার চোখে চমৎকার সুন্দর লাগে।
মায়া : আন্নেরেও বহুত ভালা লাগতাছে।কালা জামায় নায়ক নায়ক দেহায় আন্নেরে।মীর তা শুনে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো বলল।
মীর : আমি নায়ক আর তুমি আমার নায়িকা!বউ তুমি কি কোন দিন সিনেমা দেখছো?
মায়া : না কইতে দেহুম তয় দাদীর মুহে হুনছি অনেক সওদাগরের কিচ্ছা-কাহিনীরাজা-বাদশার কিচ্ছা-কাহিনী।
মীর : ও আচ্ছা।
মায়া : তয় আমগোর মইধ্যেও কাহিনীর মতো কোনো শ য় তা ন নাই ঠিক না। মীর মায়ার কথা শুনে (মনে মনে)বলে। কেডাই কইলো নাই। রাজিয়া বেগমের মতো ছিনাইল্লা বুড়ি থাকতে শ য় তা ন লাগে নি।
মীর : বিবি শ য় তা ন তো আছেই। শয়তানের শয়তানি শুরু হইবার আগে জলদি উপযুক্ত হইয়া যাও।হঠাৎ মায়ার মনে পড়ে যায়। রাজিয়া বেগমের মীর কে বলা দ্বিতীয় বিয়ের কথা। যা মনে পরতেই মায়া একেবারে চুপ হয়ে যায়।
মীর সত্যিই মায়াকে নিয়ে তার কর্মচারীর বাড়িতে যায় বাচ্চাকে দেখতে। তবে বেশি একটা সময় সেখানে থাকে না। কারণ মীরের আসল গন্তব্য এটা না।মীর তার পরিচিত একজন বড় ভাইয়ের মাধ্যমে মায়াকে নিয়ে গাইনী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যায়।
সেখানে গিয়ে মীর জানতে পারে।১৬ বছর বয়সেও মা সি ক _ শুরু না হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রাইমারি অ্যামেনোরিয়া’ বলা হয়। এটি চিন্তার বিষয় হতে পারে, তবে ভয়ের কারণ নেই। এর মূল কারণ হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, পুষ্টিহীনতা, অতিরিক্ত শারীরিক ব্যায়াম বা যৌ ব নে র লক্ষণ দেরিতে আসা। যদি স্ত নে র বিকাশ বা বয়ঃসন্ধিকালের অন্যান্য লক্ষণ না দেখা দেয়।
তবে তা চিন্তার বিষয়।কিন্তু রেবেকার ক্ষেত্রে শারীরিক গঠন সব ঠিক আছে,আর মীরের ভাষ্যমতে তার বিবির যৌ ব নে র লক্ষণও ঠিকঠাকই আছে। যেটার প্রমাণ সে গত দুপুরেই পেয়েছে। যখন সে অতিরিক্ত আবেগের বেশে মায়া কে গভীরভাবে ছুঁয়ে ছিলো।
তখন মায়ার প্রতিক্রিয়া তাকে সন্তুষ্ট করেছে অনেক যা তার চিন্তার বাইরে ছিল।সব শুনে ডাক্তার মীর কে চিন্তা করতে না করে। এবং কিছু সাধারণ,হরমোনাল ঔষধ এবং ভিটামিন দেয়। সাথে অনেক পরামর্শ এইসময় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং ওজন স্বাভাবিক রাখতে হবে।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা স্ট্রেস থেকে বিরত রাখতে হবে।ফেরার সময় মীরকে প্রচুর খুশি দেখা যায়। যতটা দুশ্চিন্তা নিয়ে বাড়ি থেকে মায়া সহ বের হয়েছিল।ফেরার সময় তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেলো না তার মধ্যে।উল্টো বউকে নিয়ে শাপলা বিলে ঘুরতে গেছে নৌকায় চড়েছে। দু টাকা দামের নারিকেলেই আইসক্রিম খাইয়েছে।সঙ্গে কিনে এনেছে চানাচুর,বিস্কিট, কেক, নিমকি, বাতাসা, নতুন লিপস্টিক, চুরি, আলতা,চুল বাঁধার জন্য নানা রকম ফিতা-ব্যান্ড।
মায়ার খুশি তখন দেখার মতো ঈদের চেয়েও বেশি খুশি সে।পুরোটা সময় মীরের হাত ধরেই ছিলো সে।মাগরিবের সময় ফিরে আসে দুজন ,বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই রাজিয়া বেগমকে দেখা যায়। যেন সে তাদের অপেক্ষাতেই ছিল। রাজিয়া বেগম মায়াকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মীর মায়াকে বলে।
মীর : বউ আগে আমার ঘরে আও তোমার লাইগা যা যা কিনা আনছি হেডি গুছাই রাহো। মায়া তাই করলো। ঘরে ঢুকে কিনে আনা খাবার সহ প্রত্যেকটা জিনিস জায়গা মত গুছিয়ে রাখল।সব কাজ শেষ করে যখন ঘর থেকে বের হতে যাবে তখন মীর বাঁধা দেয়।
বিছানায় বসে দুই হাতে মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে। মুখ গুঁজে দেয় মায়ার বুকের মধ্যখানে সেখানে মুখ রেখেই জোরে শ্বাস টানে মীর।মীরের এ কাজে কেঁপে উঠে মায়া।
তবে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে নড়ে না একটুও মীর অনুভব করে মায়ার হৃদয়ের কম্পন। মীর মুখ তুলে তাকায় তার মুখের দিকে। মেয়েটা ঘেমে গেছে কপালে নাকে ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
হারিকেনের হুলদে আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে দেখতে। মীর তার হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের মাধ্যমে মায়ার নাকের ডগায় ঘাম মুছে দেয় বলে।
মীর : বুক এতো লাফায় কেন বউ আমারে মা র বা র চাও হুম!
মায়া : ছাড়ুইন বু কাইজ্জা করবো!
মীর : ছাইড়া দিলে কি খুশি হইবা ?
মায়া : তা কহন কইছি!
মীর : তয় বুর বাহানা দিলা কেন?
মায়া : আচ্ছা আর দিমুনা কন কি করুন লাগবো ।
মীর কিছু সময় তাকিয়ে থাকে মায়ার মুখের দিকে হঠাৎই বিসমিল্লাহ বলে মায়ার ঠোঁটে চুমু খায় উম্মাহ উম্মাহ উম্মাহ!
মীর : কিছু করন লাগতো না। তয় আমার কই কই গেছি তা কাউরেই কইবা না। হেডি তোমার আমার গোপন কথা।আর এই বরি (ওষুধ)গুলা টিকমাইয়া (লুকিয়ে)এই ঘরে আইয়া খাইবামনে থাকবো বউ।
মায়া : হ হ মনে রাহুম।
মীর : আচ্ছা যাও এহন। মায়া চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ করে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। পেছনে তাকিয়ে মীরকে উদ্দেশ্য করে বলে।
মায়া : আমি উপযুক্ত না হইলে কি। সত্যিই আন্নে আর এক খান বিয়া করবেন ? কথাটি শোনা মাত্রই মীরের অন্তরে অদ্ভুত রকম এক অনুভূতি হলো। এই ভয়টাই তো কালকে সন্ধ্যা থেকে পাচ্ছিল মীর।
মায়া যে এই কথা শুনেছে তার ধারণা একটু একটু ছিল মীরের। মীর আর বিছানায় বসে থাকে না। এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে মায়া কে জড়িয়ে ধরে।
মীর : হেই কতা মনের কতা না সোনা মুহের কতা। আমার বউ একটাই থাকবো বুঝছো।আর তুমি উপযুক্ত হইবা আমার বিশ্বাস আছে। আমার বুকে তুমিই থাকবা।বুঝছো তুমি হুম মীর এত জোরে জড়িয়ে ধরেছে মায়া নিঃশ্বাস ছাড়তে পারছে না সে হাঁসফাঁস করে বলে।
মায়া : হ হ বুঝছি।
জালাল মিয়া এসে হাজির হলো উছমাপুরে মীরের বাড়িতে মায়া কে নিতে। মায়ার এখন ১৪ বছর ৩ দিন বাড়ি যাবে। খুশিতে মায়া লাফালাফি শুরু করলো। তবে মীরের মুখমণ্ডল গম্ভীর। তার ইচ্ছা নাই মায়াকে যেতে দেওয়ার।
কিন্তু মুখে বলতে পারছে না। আরশাদ আলী অনুমতি দিলো মিলন অবাক হলো এবার তার দাদি মায়াকে আটকালো না অন্য অন্য বারের মতো!উল্ট বলে দিলো যতোদিন ইচ্ছা থাকুন। মীরের খুব রাগ হচ্ছে। আশ্চর্য বউ কি তার বাপ-দাদির নাকি তাদের কামাই খায়।
যার বউ তাকে কেউ জিগ্গেস করছে না কিছু। সব কিছুই তাদের সিদ্ধান্তে হচ্ছে।যাওয়ার সময় মায়া মীরের ঘরে এলো। সাজগোজের জিনিসগুলো নিতে মীরে তখন মুখ ভার করে বিছানায় বসে।
মায়া কে দেখেই দৃষ্টি স্থির হল তার ওপর তার দেওয়া লাল-কালো সংমিশ্রণের শাড়ি পড়েছে। লম্বা চুলের মাঝখানে লম্বা সিথি তুলে বেনুনি বাঁধা। শহর থেকে যে জুতা জোড়া কিনে এনে দিলো তা পায়ে। দারুন লাগছে তার বউকে। আন মনেই মীরের মুখ থেকে বের হয়ে এলো "মাশাআল্লাহ"।ততক্ষণে মায়া তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
মায়া :একটা কতা আছিল!
মীর : কি কতা।
মায়া : ওই সাজন পাতিগুলা আমি সঙ্গে লইয়া যাই।
মীর : কেন ঐইনো কারে সাইজ্জা দেহাইবা।হুনো বউ তোমার সাজগোজ সব আমার লাইগা হওয়া উচিত।
মায়া : আন্নেরে তো দেহনইঐ,বাড়িত যাইয়া একটু সাজলাম নেই না।
মীর : না ঐ বাড়ির সাজা যাইবোনা। কোনো জায়গাতেই যাইবো না। সাজা ছাড়া না থাকবার পাইলে যাইয়ো না এনেই থাহো। ইচ্ছামত সাজো আমারে দেখাও আমি দেহি। আসলে মায়া চলে যাচ্ছে মীরের সহ্য হচ্ছে না।
তাই এসব বলছে তাছাড়া সে চায়না মায়া অন্য কারো সামনে পরি পার্টি হয়ে সেজেগুজে ঘুরে বেড়াক। অবশ্যই আনন্দপুরে বেডা ছেলেরা আছে। এগুলো ভাবতেই তার রাগ লাগছে। মীরের ভাবনা মাঝেই মায়ার বড় বাবা বাদশা মিয়ার ডাক ভেসে আসলো।
উনি মায়াকে ডাকছে বড় বাবার ডাকে মায়া দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। একটা বারের জন্যেও পেছনে তাকালো না। মীর অস্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল দরজা দিয়ে মায়ার বের হয়ে যাওয়া।যখন তার ধ্যান ভাঙ্গে যে তার বউ চলে যাচ্ছে।
দ্রুত মীর ঘর থেকে বের হয়ে আসে। ততক্ষণের বাদশা মিয়া মায়া সহ ভ্যানে চড়ে অনেকটা পথ চলে গেছে। মীর বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে দেখল তার বউর চলে যাওয়া। বিষয়টা খুবই অদ্ভুত লাগছে।
মীরের আশ্চর্য হচ্ছে সে প্রতিবারের মতো এবার আর তার চাচা শশুর বাদশা মিয়া ফিরে যাওয়ার সময় তাকে কিছু বলে গেলো না একটাবার ডাকলো পর্যন্ত না। কেন?
চলবে...........
ভুল ত্রুঠি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। এবং সবাই রেসপন্স করবেন 🥀🥀🥀