ফন্ট সাইজ:
থিম:
পাতাবাহার

১৫তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া আফরোজ

গল্পের নাম: #পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)

পর্ব :(১৫)

লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ

•

•

•

আজ রাইয়ানের এংগেইজমেন্ট সেই উপলক্ষেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আযান তিতির আর আনিতা শেখকে হলের ভেতরে নিয়ে যায়। রাইয়ানের মা রেবেকা সুলতানা আনিতা শেখকে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেছে। পাক্কা পাঁচ মিনিট দু'জন দু'জনকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের পরিচয় আজকালের নয় বরং আযানের বয়স যখন পাঁচ তখন থেকেই পরিচয়।

রাইয়ান দাঁড়িয়ে আছে আযানের পাশে,আযান রাইয়ানকে পারছেনা মেরে ভুত করে দিতে।আযান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, মুখ ফসকে যদি কথাটা বলে দিতি তাহলে সত্যি তোকে আজ ন্যাড়া করে দিতাম। শুকরিয়া আদায় কর,কোনো রকম বেঁচে গেছিস।

রাইয়ান কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো, আমি কি করবো!সরি,মাফ করে দে দোস্ত।

আযান বিরক্ত হয়ে বলল, বাদ দে তো। তবে তোর এই অভ্যাসের কারণে তুই বউএর হাতে রোজ মার খাবি দেখিস।

রাইয়ান কিছু বলতে নিবে তার আগেই রাইয়ানের মা রেবেকা সুলতানা রাইয়ানকে চোখ পাকিয়ে বলল, আনিতা ভাবী যে আসবে তুই আগে বললি না কেন? বেয়াদব ছেলে এংগেইজমেন্টের দিনও মার খেতে চাইছিস?

রাইয়ান অসহায় দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে করুন কন্ঠে বলল,, সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম মা!

তিতির মুখ টিপে হাসছে।আজ এইটা বুঝতে পেরেছে মায়েদের কাছে ছেলেরা কখনো বড় হয় না, বুড়ো বয়সেও বাচ্চা থাকে, ঠিক যেমনটা মেয়েরা বাবার কাছে।

আযান আড় চোখে তিতিরের দিকে তাকিয়ে তিতিরকে দেখছে।

আনিতা শেখ ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ সরিয়ে নিল।

রেবেকা সুলতানা তিতিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, তোমাকেতো চিনলাম না মা?

রেবেকা সুলতানার প্রশ্নে তিতির হকচকিয়ে গেল। কি বলবে বুঝতে পারছেনা। নার্ভাস ফিল করছে সাথে একরাশ দ্বিধা নিয়ে শাড়ির আঁচলে আঙ্গুল পেঁচাচ্ছে।

রেবেকা সুলতানা তিতিরের থুতনিতে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল, কি হয়েছে মা?

তিতির একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে আযানের দিকে তাকালো। আযান এতক্ষণ খেয়াল না করলেও তিতিরের তাকানোতে সামনে এগিয়ে গেল। আনিতা শেখ পেছন থেকে তিতিরের কাঁধে হাত রেখে আযানকে ইশারা করলো। আযান মুচকি হেসে রেবেকা সুলতানাকে বললো,, আহ আন্টি এই পুচকিকে কি জিজ্ঞেস করছো! বরং আমিই বলছি তোমাকে।

রেবেকা সুলতানা আযানের কান টেনে বললো,, কি ভেবেছিস!আমি বুঝি না? তুই মেয়েটকে এইভাবে পুঁচকি বলে জ্বালাবি?আদুরে মেয়েটাকে একদম জ্বালাবি না।

আযান কানে হাত দিয়ে কান ডলতে ডলতে বললো, ব্যাথ্যা লাগে তো।আগে বলতে দাও আমাকে।

তিতির অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওদের কান্ড দেখছে।আনিতা শেখ আর রাইয়ান হাসছে।

আযান রাইয়ানের দিকে চোখ রাঙানি দিতেই রাইয়ান চুপ হয়ে গেল।

আযান রেবেকা সুলতানার কাঁধ জড়িয়ে ধরে মুচকি হেসে বলল,আন্টি ওর নাম তিতির বিনতে তাওহিদ তুমি তিতির বলেই ডাকো। আম্মুর বোনের মেয়ে মানে আমার খালার মেয়ে।আর হ্যা আমার পিচ্চি বান্ধবীও বটে।

আযানের মুখে "খালার মেয়ে" কথাটা শুনে তিতির হকচকিয়ে গেল।

রেবেকা সুলতানা আযানের বাহুতে চাপড় মেরে বলল, একদম পিচ্ছি বলে ক্ষেপাবি না।

রেবেকা সুলতানা তিতিরের দুগালে হাত রেখে বলল,দেখো কেমন ঘাবড়ে গেছে!একদম ঘাবড়ানোর কিছু নেই, এইখানে সবাই আছে সবার সাথে পরিচিত হও গল্প করো দেখবে ভালো লাগবে।

তিতির মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে বললো, ঠিক আছে আন্টি।

আযান পকেটে হাত গুঁজে তিতিরের দিকে তাকিয়ে আছে। পাশ থেকে রাইয়ান ধাক্কা মেরে বললো,কুচ তো শারাম কার বেশারাম! এই ভাবে তাকালে নজর লেগে যাবে।

আযান মুচকি হেসে বলল, ফালতু না বকে তোর বউয়ের কাছে যা।

রাইয়ান কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, এখন থেকেই পর করে দিচ্ছিস!যা যা আজ থেকে তোকে আর চিনবো না।

আযান বিরক্ত হয়ে রাইয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, আজ থেকে এমনিতেও চিনবি না।

রাইয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।

তিতির এতক্ষণ ধরে সব কথা না শুনলেও আযানের শেষের কথাটা ঠিকই শুনতে পেয়েছে,যার দরুন দৃষ্টি ঘুরিয়ে হাঁসি আড়াল করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

আযান রাইয়ান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তিতিরের দিকে তাকিয়ে দেখে, তিতির ঠোঁট টিপে হাসছে।

আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,দু বেনী ওয়ালী পিচ্চি পরী! তুমি হাসছো কেন?

তিতির হকচকিয়ে গিয়ে বললো, চেনা না চেনার গল্প শুনে।

রাইয়ান কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো, দেখলে কেমন বেয়াদব ছেলে!এর সাথে মোটেও বন্ধুত্ব করবে না।

আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, ইমিডিয়েট এইখান থেকে সর। তা না হলে তোর না হওয়া বউয়ের কাছে তোর সব লুকানো প্রেম প্রচেষ্টার কথা ফাস করে দিবো, তখন দেখবি তোর না হওয়া বউ কখনোই তোর বউ হবে না।

তিতির ড্যাবড্যাব করে আযানের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনছে।

এই দিকে রাইয়ান পারছে না কেঁদে পুরো কনভেনশন হলের ফ্লোর ভাসিয়ে দিতে।

এক পর্যায়ে রাইয়ান মানে মানে কেটে পড়লো।

আযান তিতিরের দিকে তাকাতেই তিতির ফিক করে হেসে উঠলো। আযান মাথা চুলকে মিন মিন করে বলে উঠলো, খুব কি প্রয়োজন ছিল মুগ্ধতা জড়ানো আদলে স্নিগ্ধ হাসির? এই হাসিটা খুব বেশি জ্বালাতন করছে আমায়।

তিতির হাসি থামিয়ে বললো,, এইযে সিসি ক্যামেরা! বন্ধুকে এইভাবে কেউ বলে? বেচারা এখনই কেঁদে ভাসিয়ে দিতো।

আযান এক হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বললো, সে কথা বাদ,মনে হচ্ছে তুমি নতুন করে নাম দিচ্ছো?

তিতির শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বললো, উঁহু! আমিতো আমাকে পুচকি বলা লোক থেকে রিভেঞ্জ নিচ্ছি।

তিতিরের কথায় আযান কোমরে হাত দিয়ে বললো, তবেরে!দু বেনী ওয়ালী স্কুল বালিকা বেনী দুটো কেটে দিবো।

তিতির ভাব ধরে বললো, আন্টিকে বললে এখনই আপনার জন্য খুন্তি নিয়ে আসবে।

মায়ের কথা মনে হতেই আযান আশপাশে তাকিয়ে দেখে মা আর আন্টি কেউ নেই।

আযান তিতিরকে জিজ্ঞেস করলো, মা কোথায়?

তিতির চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বললো, আমি জানি না। নতুন আন্টি আমাকে এইখানে সবার সাথে পরিচিত হতে বলে উনি আন্টিকে নিয়ে স্টেজের দিকটায় গেলো।

আযান চারপাশটায় নজর বুলোতে বুলোতে বললো,চলো আমরাও ওই দিকটায় বসি।

হলে দু পক্ষের লোকজনের কারনে কেউ কেউ একদম গা ঘেঁষে হাঁটছে। যার ফলে তিতির অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। তিতির আযানের কোন ঘেঁষে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে দেখে তিতির কেমন জানি গুটিয়ে গেছে।আযান আশেপাশের দিকে তাকিয়ে দেখে যেই দিকটায় যাচ্ছে ওই দিকটায় প্রায় সবাই পুরুষ।আযানের নিজের উপর খুব বেশি রাগ হচ্ছে।আযান তিতিরের হাত ধরে এক পাশে সরে আসলো।

আযানের হাতের স্পর্শে তিতির প্রথমে চমকে উঠলেও পরক্ষনে লক্ষ্য করলো আযান তাকে এক পাশে সরিয়ে আনার জন্যই হাত ধরেছে। তিতির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো, সামনে যাবো না, অনেক মানুষ ওখানে।

আযান তিতিরের হাত ছেড়ে দিয়ে বললো, যেতে হবে না, তুমি এইখানে দাঁড়াও আমি বরং এইখানে দুটো চেয়ার নিয়ে আসি।

তিতির মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। আযান চেয়ার আনার জন্য সামনে এগিয়ে গেল।

তিতির স্টেজে বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে । যার পরনে সাদা স্টোন ওয়ার্কের একটা গাউন,মেয়েটাকে খুব সুন্দর লাগছে ,তার সৌন্দর্য ফুটে উঠার কারণটাই হচ্ছে তার লজ্জা মাখা হাঁসি। তিতির মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মেয়েটার অনুভূতি এখন কেমন হবে! আচ্ছা ওর কি খারাপ লাগছে?নাকি নতুন একজনের সাথে পথ চলার জন্য নিজের মনকে গুছিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছে? তিতির মুচকি হেসে বিরবির করে বলে উঠলো, হয়তো মিশ্র অনুভূতি হবে।

তিতিরের ভাবনার ছেদ পড়ল কারো কন্ঠস্বর শুনে,তিতির চমকে উঠে তাকালো । হ্যা এইটাই সেই লোক যাকে তিতির একসময় চাচ্চু বলে ডাকতো।যাকে বাবার অবর্তমানে বাবার কাছে করা আবদার গুলো তার কাছে করতো। তিতিরের দুচোখ অশ্রু জলে সিক্ত হয়ে উঠলো। চোখের পলক ঝাপটে সেই অশ্রু জল আটকানোর বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তিটার নাম নিয়াজ। মিস্টার নিয়াজ হাতের গ্লাসটা ওয়েটারের হাতে দিয়ে তিতিরের সামনে এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠে বললো,, আরেহ তুই এইখানে?তিন মাস পর দেখলাম তিন মাস কম সময় নয়। কোথায় ছিলি এতো দিন?কাউকে ফাঁসিয়ে এসেছিস নাকি? তোর চাচি ঠিকই বলতো, মরবি না বরং কাউকে পটিয়ে তার ঘরে থেকে যাবি।তুই পারবিও বটে গায়ে ঢলে পড়া মেয়েরা সব পারে।তারা অন্যের উপবস্ত্র হতেও দ্বিদ্ধা বোধ করে না।

নিজের চাচার মুখে এমন কথা তিতিরের সয্য হলো না। দুচোখের জল বাঁধ ভেঙ্গে গড়িয়ে পড়লো। নিজেকে সত্যি আজ নোংরা মনে হচ্ছে।

তিতিরের চোখের জল দেখে তিতিরের চাচা নিয়াজের এতো টুকু ফারাক পড়লো না বরং আরো তিক্ত কিছু শুনিয়ে দিতে বললো, ন্যাকা কান্না কাঁদবি না একদম।

তিতির চোখের জল মুছে তাকাতেই চোখ পড়লো আযানের দিকে। আযান তিতিরের চাচা নিয়াজের ঠিক পেছনে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দেখে বুঝা যাচ্ছে আযান রাগে ফেটে পড়ছে।

তিতির আযানের দিক থেকে চোখ সরিয়ে মেঝেতে দৃষ্টি আবদ্ধ করলো। তিতির নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছে।

নিয়াজ আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই আযান তিতিরের সামনে এসে দাড়িয়ে মিস্টার নিয়াজের চোখে চোখ রেখে বললো,,,যার সাথে কথা বলছেন তার সাথে কথা বলতে হলে আগে আমার পারমিশন নিতে হয়। আর আপনি তো কথা বলার পারমিশনও চাইলেন না বরং তার চোখের জল ফেলার মত অপরাধ করে ফেলেছেন! এমন অপরাধের কি শাস্তি দেওয়া যায়?

চলবে,,,,

(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। এই দুইদিন গল্প না দিতে পারার জন্য দুঃখিত)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন