#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[৩]
" আমাকে খামোখা জ্বালাতন না করলে তোমার শান্তি মেলে না, তাই না? "
" উঁহু। মাই ডিয়ার বিবি সাহেবা। "
.
সূর্যের আলো ধরনীর বুকে আলোকিত করে রেখেছে। ঘড়ির কাঁটা তখন আটের কাছাকাছি। কাবার্ডের সামনে বিভ্রান্ত চোখে দাঁড়িয়ে রায়হান। পড়নে তার সফেদ রঙা আরামদায়ক বাথরোব। সেকেন্ড কয়েক নিজ পোশাকের স্তূপে তাকিয়ে থেকে অতিবাহিত হলো। এরপরই জোর গলায় ডাকতে শুরু করলো সে,
" রাত! রাত! এদিকে এসো তো একটু। "
তড়িঘড়ি পায়ে ক্ষণিকের মধ্যে ঘরে ছুটে এলো ইফরাত। ব্যস্ত কণ্ঠে বললো,
" হ্যাঁ বলো। কি হয়েছে? "
রায়হান চমকানোর ভঙ্গিতে বললো,
" আরে রিল্যাক্স। তুমি এভাবে হাপাচ্ছো কেন? "
" আরে তোমার ব্রেকফাস্ট রেডি করছিলাম। এখন তাড়াতাড়ি বলো তো কি হয়েছে? এভাবে ডাকলে কেন? "
" আমার শার্ট। চুজ করে উঠতে পারছি না তো। " অসহায় কণ্ঠে বললো রায়হান।
ইফরাত চোখ পাকিয়ে বললো,
" তোমার শার্ট প্যান্ট সবকিছু বিছানায় রেখে গিয়েছি আমি। সেটা কি আদৌও দেখেছো? "
রায়হান বিছানায় তাকিয়ে এমন ভাব করলো যেন সে মাত্র ই লক্ষ্য করলো। অথচ আগেই দেখেছে কিন্তু।
" ওপস্। খেয়াল করিনি গো। "
" ইটস্ ওকে। রেডি হয়ে নাও তাড়াতাড়ি। আমি ব্রেকফাস্ট সার্ভ করছি। "
ইফরাত এই বলে চলে যেতে উদ্যত হয়। তখনই রায়হান পিছু ডেকে উঠলো,
" অ্যাই রাত। আমার ওয়ালেট, ওয়াচ, বেল্ট এগুলো দিয়ে যাও অন্তত। "
ইফরাত ছোট ছোট চোখ করে ঘরের ভেতরে এলো। বিছানায় থাকা বেল্ট হাতে নিয়ে দেখালো। এরপর ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ওয়ালেট, রিস্ট ওয়াচ হাতে নিয়ে দেখালো। বোকা বোকা হাসলো স্বামী মানুষটি। তপ্ত শ্বাস ফেলে ইফরাত চলে যেতে নেয় তখন আবার ডেকে ওঠে রায়হান,
" এই শোনো না, আমার ব্লু কালার ফাইলটা দিয়েছো তো?"
বিনা বাক্য ব্যয়ে ঘুরে দাঁড়ায় ইফরাত। ওর চাহনি, অভিব্যক্তিতে থমকে যায় রায়হানের অন্তঃস্থল। ধীরজ পায়ে স্বামীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে মেয়েটি। রায়হান-ও একটু একটু করে পিছিয়ে যাচ্ছে। পেছাতে পেছাতে খাটের সঙ্গে পা আটকে যায় তার। থমকিত চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকে সে। ইফরাত এসে দাঁড়ায়। একদম দেহের সন্নিকটে দাঁড়ায়। রায়হান কিছু বলতে উদ্যত হয়। তখনই নরম কোমল দুই হাতে স্বামীর গলা আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নেয় ইফরাত। সুমিষ্ট কণ্ঠে থেমে থেমে বলে,
" আমাকে খামোখা জ্বালাতন না করলে তোমার শান্তি মেলে না, তাই না? "
রায়হান চমৎকার হাসলো। হাস্যোজ্জ্বল মুখে স্ত্রীর মুখ পানে এগিয়ে আনলো মুখ। নাকের সঙ্গে আলতো টোকা দিলো নাক। দুষ্টুমির স্বরে বললো,
" উঁহু। মাই ডিয়ার বিবি সাহেবা। "
" ডিয়ার? "
একটু চমকের ছলে বললো ইফরাত। রায়হান স্ত্রীর কপালের ঠিক মধ্যিখানে আলতো চুমু এঁকে বললো,
" হুম। দ্য লাভ অফ মাই লাইফ। মাই রাত। "
লজ্জা মিশ্রিত হেসে স্বামীর বুকে মাথা এলিয়ে দিতে যাচ্ছিল মেয়েটি। রায়হান-ও আবেশে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করতে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই ছিটকে দূরে সরে গেল ইফরাত। হতাশ কণ্ঠে বলে উঠলো,
" ইশ্ শি রে। তোমার চক্করে কত দেরি হয়ে গেল। ধূর! "
দ্রুত পায়ে রুম হতে বেরিয়ে গেল ইফরাত। চমকিত রায়হান আকস্মিক হেসে উঠলো। সশব্দে হেসে উঠলো সে। পা'গলী একটা!
•
তমসাচ্ছন্ন রাত্রি। রাত্রিকালীন সকল কর্ম সম্পাদন করে রুমে এলো লাজুক। এসে কিছুটা চমকালো! মানুষটা এ ঘরে অনুপস্থিত। কিছুক্ষণ আগে তো এদিকেই এলো। তবে গেল কোথায়? লাজুক আর বেশি কিছু ভাবলো না। নিজ মনে অগ্রসর হতে লাগলো বেলকনির উদ্দেশ্যে। বিয়ের পর এ বাড়িতে তার সবচেয়ে পছন্দের এবং নিরিবিলি স্থান এই বেলকনি। এখানে বিভিন্ন গাছের সান্নিধ্যে, পাখির কলরবে চমৎকার-শান্তিময় সময় কাটে তার। লাজুক বেলকনিতে পৌঁছাতেই খুক খুক করে কেশে উঠলো। বিদঘুটে গন্ধে ওড়নায় নাক চেপে ধরলো সে। সিগারেটের গন্ধে এখানে টেকা যে দায়। লাজুক ফ্লোর বেডে তাকাতেই চমকের শীর্ষে পৌঁছে গেল! সেথায় আধশোয়া হয়ে বসে রয়েছে মশাই। সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকতে ফুঁকতে বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে আছে হাতে থাকা বইটির দিকে। বইটি লাজুকের। বিগত তিন রাত ধরে ঘুমের পূর্বে এখানেই সময় কাটছিল তার। সমরেশ মজুমদারের ' কালপুরুষ ' এর সঙ্গে। আজো যথারীতি ঘুমের আগে এখানে এসেছিল বইটি পড়তে। এসেই এমন দৃশ্য দেখে চমকালো! তানসীভ ইতিউতি চোখে বইটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। হঠাৎই লাজুকের উপস্থিতিতে কিছুটা হকচকিয়ে গেল। যদিও তা গোপন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো তার গম্ভীর অঙ্গভঙ্গি। ঠাস করে বইটা পাশেই রেখে দিলো। কেমন অজানার সুরে গম্ভীরতার সহিত বললো,
" কার? "
লাজুক আস্তে করে বললো,
" আমার। "
তানসীভ সিগারেটে সুখটান দিয়ে আয়েশ করে শুয়ে পড়লো ফ্লোর বেডে। বিরক্তি সূচক কণ্ঠে বললো,
" ছাইপাশ না পড়লে ভালো হয়। "
" সবাই তো নিজের ভালোটা নিজে বোঝে না। কিংবা... বুঝতে চায় না। "
সামান্য একটি কথা। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝি মানুষটার হৃদয়ে সজোরে ধাক্কা দিলো। কপালে সৃষ্টি হলো হালকা সরু ভাঁজ। লাজুক আস্তে করে নিজের বইটি নিয়ে রুমে চলে গেল। একাকী সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রইলো তানসীভ শাহ্।
•
" কিরে! কি অবস্থা তোর? "
" এই তো আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আপু। তোমার কি খবর বলো? পুচু ঠিক আছে তো? "
মোবাইল স্ক্রিনে ভিডিও কলে সংযুক্ত দুই বোন। আফসানা এবং লাজুক। লাজুক বিছানায় হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। কোলে রাখা বালিশ। আফসানা নিজ ঘরে সোফায় বসে রয়েছে। হাতে পিরিচ ভর্তি ফল। আপেল খেতে খেতে বোনের সঙ্গে কথা বলছে গোলগাল চেহারার মেয়েটি। আফসানা খেতে খেতে বললো,
" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি রে। পুচুও আল্লাহ্'র রহমতে ঠিকঠাক আছে। "
লাজুক মুচকি হেসে বললো,
" হ্যাঁ। আল্লাহ্'র রহমতে তুমি ঠিক থাকলেই আমাদের পুচুও ঠিক থাকবে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করো তো? "
খাওয়ার কথা শুনে নাকমুখ কুঁচকে ফেললো আফসানা,
" আর বলিস না তো। তোর ভাইয়া আস্ত এক খারাপ লোক। "
" কেন? সভ্য শান্ত ভাইয়া আমার কি করেছেন? " অবাক ভঙ্গিতে শুধালো লাজুক।
আফসানা হাতে থাকা পিরিচ দেখিয়ে বললো,
" দেখতে পাচ্ছিস না? ইয়া বড় বড় দুইটা আপেল কেটে দিয়েছে আমাকে। সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে পুরোটা খেয়ে নিতে। যদি না খাই তাহলে রাতে ফিরে নাকি আরো দুইটা খাওয়াবে। কি এক যন্ত্রনা রে বুইন। উফ্! "
লাজুক হালকা হাসলো বোনের কাণ্ডে। এরপর বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো,
" আলহামদুলিল্লাহ্ তুমি অনেক লাকি আপু, যে ভাইয়ার মতো জীবনসঙ্গী পেয়েছো। তোমার মতো সবাই এই সেনসিটিভ টাইমে এতখানি যত্ন পায়না। সবার পার্টনার তার স্ত্রী, সন্তানের জন্য এতটুকু করেনা। তুমি ভাগ্যবতী তাই পাচ্ছো। "
কথাগুলো শুনে চুপ হয়ে গেল আফসানা। ঠোঁটের কোণে স্বস্তির ছোঁয়া। বললো,
" হ্যাঁ রে। আল্লাহ্'র কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। আল্লাহ্ যে না চাইতেও আমার ভাগ্যে এতখানি লিখে রেখেছেন, আমি সত্যিই ভাবিনি। "
লাজুক হাসলো। বোনের সুখে তৃপ্তির ছোঁয়া তার অন্তরে।
" আল্লাহ্'র কাছে সবসময় দোয়া করি। জীবনে তুমি অনেক অনেক সুখী হও। "
আফসানা ম্লান নয়নে বোনের মুখশ্রীতে তাকিয়ে রইলো। খানিক বাদে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,
" শ-য়তানটা তোর সঙ্গে কোন খারাপ ব্যবহার করে না তো লাজুক? সত্যি করে বল। কিছু লুকাবি না কিন্তু। "
লাজুক শান্ত হতে বললো বোনকে,
" শান্ত হও আপু। তুমি এক্সাইটেড হয়ে যাচ্ছো। কুল! "
" আমি ঠিক আছি। তোকে যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দে। একদম মিথ্যা বলবি না। "
" মিথ্যা বলার তো কোনো কারণ নেই। উনি.. উনি খারাপ আচরণ করেন না আমার সঙ্গে। উনি অমন নন। "
" উনি অমন নন! ইহ্! একটা গু-ণ্ডা ব'দমাশ যে কেমন হতে পারে আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। শোন বোন। ওই লোকটা যদি ভুলেও কক্ষনো তোর সঙ্গে খারাপ আচরণ করে কিংবা... তোকে কষ্ট দেয়। এক মুহুর্তও দেরি না করে আমাকে জানাবি। "
সচেতনতা সৃষ্টি করতে বললো আফসানা। অতঃপর স্নেহের স্বরে ছোট বোনকে বললো,
" আপু আছি তো। "
লাজুক মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো তার বড় বোনের দিকে। মায়ের পর বড় বোনই হয় সবচেয়ে আপন। শ্রদ্ধার। তার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। এই যে মাত্র আপু বললো ' আপু আছি তো '। এই সামান্য একটি কথায় কতখানি স্নেহ, আদর, উদ্বেগ লুকিয়ে রয়েছে তা প্রকাশ করার মতো নয়। মহান আল্লাহ্ আপুকে অনেক অনেক ভালো রাখুক। দীর্ঘজীবী করুন। অন্তর থেকে বোনের জন্য খাস দিলে দোয়া করলো মেয়েটা। ওদিকে আফসানা ওর সঙ্গে এটা ওটা কত কথা বলতে লাগলো। বড় বোনেরা বুঝি এমনই হয়? এতখানি আপন?
•
সময় তখন রাত আটটা বেজে বিশ মিনিট। কেবিনে জ্বলছে উজ্জ্বল আলো। স্টিলের আলমারি রাখা কেবিনের একপাশে। সেথায় রাখা সারি সারি রেজিস্টার, দলিল, সিলমোহর। ঘরটির ঠিক মাঝ বরাবর একটি কাঠের টেবিল। অফিস ঘরের এই টেবিলে কর্মরত আমিরুল সাহেব। মাঝ বয়স্ক মানুষটির পড়নে সাদামাটা শার্ট ও প্যান্ট। চোখে চশমা। মাথায় আধপাকা চুল। নিস্তব্ধ এই ঘরে এক মনে কাজ করে চলেছেন উনি। কিছুক্ষণ বাদে ঘরের দরজায় হাজির হলো অল্পবয়সী এক ছোকড়া। এসে ডাকলো,
" কাক্কু। স্যার ডাকে। "
থেমে গেল কলমের কালি। চোখ তুলে তাকালেন আমিরুল সাহেব। ভারী কণ্ঠে বললেন,
" যাও। আসছি আমি। "
" তাড়াতাড়ি কিন্তু। "
সময় স্বল্পতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে চলে গেল ছেলেটি। আমিরুল সাহেব ওনার হিসাবের খাতাটি সযত্নে বন্ধ করে কলমের নিব আটকে রাখলেন। উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে। বেরিয়ে গেলেন অফিস ঘর হতে। গন্তব্য বড় মালিকের কেবিন।
-
" আমিরুল! শ্যামপুরের ওই নামজারি কাগজটা রেডি হয়েছে? জমিটার চ্যাপ্টার কালকের মধ্যেই শেষ করতে হবে। "
রাজাসনের ন্যায় কালো রঙের চেয়ারে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বসে রয়েছেন জহুরুল সাহেব। চেয়ারে শরীরের ভর ছেড়ে দেয়া। ডান হাতটি রাখা চেয়ারের এক হাতলের ওপরে। জহুরুল সাহেবের কেবিনের মাঝ বরাবর বিশাল চকচকে ওয়ালনাট কাঠের ডেস্ক। ডেস্কের ডান পাশে কাঁচের পেপারওয়েট, সোনালী রঙের কলম সেট। রোলে রাখা দলিলের কাগজ। ডেস্কের বাম পাশে একটি ল্যান্ডফোন। ডেস্কের পেছনে অবস্থিত উঁচু কালো চামড়ার চেয়ার। রাজকীয় আসনের ন্যায়। তার বিপরীতে দুইটা ধূসর রঙের কিছুটা নিচু আকৃতির চেয়ার। আগত ব্যক্তিদের জন্য। যার একটিতে এই মুহূর্তে বসে রয়েছে আমিরুল সাহেব। দেয়ালের দুই পার্শ্বে ফাইল ক্যাবিনেট অবস্থিত। তাতে রয়েছে বহু ফাইল। কিছু ক্রিস্টাল বোতল, শোপিস-ও শোভা পাচ্ছে তাতে। দেয়ালের কয়েকটি অংশে দৃশ্যমান দামী পেইন্টিং। কেবিনের পর্দা আধখোলা। জানালার নিম্ন তাক এ দৃশ্যমান বনসাই গাছ।
আমিরুল সাহেব বাধ্যগত কণ্ঠে বললেন,
" জ্বি স্যার হয়েছে। শুধু সিগনেচার নিয়ে একটু সমস্যা। "
সমস্যা নামক শব্দটি পছন্দ হলো না জহুরুল সাহেবের। গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন,
" সমস্যা? সমস্যা শব্দটা তো আমি শুনতে চাই না আমিরুল। সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। "
আমিরুল সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
" জ্বি স্যার। আপনি চিন্তা করবেন না। কাল সকালের মধ্যেই বাকি কাজটা হয়ে যাবে। "
" কাল পর্যন্ত সামান্য একটা কাজ ঝুলিয়ে রাখা বোকামি। যা করার আজকের মধ্যেই করে ফেলো। "
" জ্বি। " ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন আমিরুল সাহেব।
" সিগনেচার এমনভাবে তৈরি করবে, কেউ যেন ভুলেও আন্দাজ করতে না পারে যে মালিকের সিগনেচার কপি করা হয়েছে। "
" আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন স্যার। আমাদের ছেলেরা এই কাজে বেশ পটু। ওরা ঠিক করে ফেলবে। "
" এতই যখন পটু তাহলে দেরি কিসের? দ্রুত কাজটা শেষ করো। "
" জ্বি। "
জহুরুল সাহেব ডেস্কের একটি ড্রয়ার খুলে ফাইল বের করলেন একটা। ফাইলটা আমিরুল সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
" এটার কাজ বুঝিয়ে দাও ছেলেদের। সবটা এমনভাবে করবে যেন কারোর বাপ বুঝতে না পারে যে জমির আসল মালিক অন্য কেউ। আমরা... "
আমিরুল সাহেব তৎক্ষণাৎ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন,
" হয়ে যাবে স্যার। "
সন্তুষ্ট হলেন জহুরুল সাহেব। আরাম করে চেয়ারে দেহ এলিয়ে চক্ষু বুজে ফেললেন উনি। বললেন,
" তোমাকে আমি ভরসা করি আমিরুল। যাও নিজের কাজে ফিরে যাও। "
বাধ্য কর্মীর ন্যায় উঠে দাঁড়ালেন আমিরুল সাহেব। স্যারকে সম্মানসূচক ভঙ্গিমা প্রদর্শন করে সালাম দিলেন,
" আসসালামু আ'লাইকুম স্যার। "
হাতের ইশারায় যেতে বললেন জহুরুল সাহেব। কেবিন থেকে বিদায় নিলেন আমিরুল। দু চোখ বুজে চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করতে লাগলেন মির্জা জহুরুল শাহ্।
•
রবির কিরণে আলোকিত ধরনী। বরাবরের ন্যায় নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে কলেজের এই লাইব্রেরী জুড়ে। কখনো কখনো কানে আসছে বই কিংবা নোট খাতার পাতা উল্টানোর খচখচ শব্দ। কলম চালানোর সুর। টেবিলে টেবিলে শিক্ষার্থীরা বসে। নীরবে নিজস্ব কর্ম সম্পাদন করে চলেছে। তাদের আশপাশে অবস্থিত বড় বড় আকারের কাঠের বুকশেলফ। লাজুক লাইব্রেরীর এক কোণের একটি টেবিল দখল করে রয়েছে। চেয়ারে বসে রয়েছে মেয়েটি। বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করা। মাঝেমধ্যে কিছু শব্দ, বাক্য টুকে নিচ্ছে খাতায়। একমনে লেখাপড়া করে যাচ্ছে সে। পড়নে তার নীলাভ রঙা সালোয়ার কামিজ। মানানসই হিজাবে মুড়ে রয়েছে চুল। শালীনতা প্রকাশ পাচ্ছে পোশাক এবং অঙ্গভঙ্গিতে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। হঠাৎই লাজুকের পাশের চেয়ারটা দখল করে বসলো কেউ একজন। বললো,
" হোয়াটস আপ বাডি ( buddy)? নোটস কালেক্ট করা ডান? "
লাজুক নোট খাতায় লিখে চলেছে। দৃষ্টি না তুলে জবাব দিলো স্বল্প শব্দে,
" চলমান। "
" উফফফ! কত পড়ালেখা করতে পারিস রে তুই! বোর হোস না কখনো? "
আগন্তুকের কণ্ঠে বিরক্তির উদ্রেক। তখনই শোনা গেল লাইব্রেরীয়ানের ভরাট কণ্ঠস্বর,
" সাইলেন্স। "
বিথী চমকে উঠলো সেকথা শুনে! লাজুক চোখ তুলে তাকালো বন্ধুর দিকে। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে হাসি। সরল হাসি। বিথী চোখমুখ কুঁচকে তাকালো। হাতের ইশারায় বললো,
" তাড়াতাড়ি কর তো। সুমন মামার দোকানে ফুচকা খেতে যাবো। খিদে পেয়েছে। "
পেটে হাত বুলাতে বুলাতে ক্ষুধা লাগার ভঙ্গিমা করে দেখাচ্ছে বিথী। লাজুক নিঃশব্দে হেসে উঠলো। বিথী হাতের ইশারায় দ্রুত হাত চালাতে বললো ওকে। লাজুক মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করলো,
" আচ্ছা। "
" তাত্তারি কর না ভাই। "
লাজুক একটু দ্রুততার সহিত লেখাটা সমাপ্ত করলো। বন্ধ করলো বই, নোট খাতা। কলমের নিব আটকে ব্যাগে খাতা, কলম ভরে নিলো। উঠে দাঁড়াতেই বিথী ওর হাত ধরে দিলো টান। দ্রুত পায়ে ওকে নিয়ে বের হয়ে গেল লাইব্রেরীর দম বন্ধকর পরিবেশ থেকে। লাজুক হাত নাড়িয়ে ওকে ধীরপায়ে চলতে বললো। কিন্তু কে শোনে কার কথা? এতক্ষণে দু'জনে লাইব্রেরীর বাইরে।
•
বসূধার বুকে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। ধোঁয়াটে লালচে আভা ছড়িয়ে আকাশে। গলির শেষে অবস্থিত গ্যারেজটি। গ্যারেজের বাইরে জ্বলছে হলদেটে আলো। চারদিকে আলো আঁধারির দুষ্টু খেলা। গ্যারেজের মাঝ বরাবর একটি কাঠের টেবিল। টেবিলকে কেন্দ্র করে কয়েকটি নড়বড়ে কাঠের চেয়ার। সেসব দখল করে বসে রয়েছে তানসীভ বাহিনীর চ্যালা'রা। টেবিলের মাঝখানে রাখা কয়েকটি চায়ের কাপ। সিগারেটের বি'শ্রী ধোঁয়া মিশে রয়েছে বাতাসে। তানসীভ টেবিলের এক কোণে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগারেট। আধবোজা চোখ। কানে ভেসে আসছে দূর হতে গাড়ির হর্ন। কুকুরের এলোমেলো ডাক। বাপ্পি নামের ছেলেটা বলে উঠলো,
" ভাই! ওই হালার পো হালারে আইজ এত সহজে ছাইড়া দেওয়া ঠিক হইলো নি? "
তমাল নামে একজন সমর্থন জানিয়ে বলে উঠলো,
" বাপ্পি ঠিকই বলছে ভাই। শা*লারে এমনে ছাড়া ঠিক হয় নাই। অয় তো মনে করলো তানসীভ ভাইয়ের ক্ষ্যামতা বুঝি কুইমা গেছে। ভাইয়ের আগুন তেজ ফুরাই গেছে। "
তানসীভ সিগারেটে টান দিয়ে হাসলো। ব্যঙ্গাত্মক সে হাসি। দরাজ কণ্ঠে থেমে থেমে বললো,
" আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কখনো নেভে না। সময়ের সঙ্গে বাড়ে, কমে। ছারখার করে দেয় আশপাশ। "
তে'জস্বী চোখে তাকালো দলের ছেলেটার দিকে। দা'ম্ভিকতার সহিত বললো,
" মনে রাখিস... এই মির্জা তানসীভ শাহ্ কোনো আগুনের ফুলকি নয়। বরং আস্ত এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত! "
সবাই নীরব। দূরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তানসীভ। হাতে থাকা নিভু নিভু সিগারেটের ঠাঁই হয় মেঝেতে। পা দিয়ে নি"ষ্ঠুরতার সহিত সিগারেটের শেষ অংশটুকু পি'ষ্ট করে সে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
" চুপ আছি এর মানে এই নয় যে এই আমিটা শেষ। অন্যের থেকে পরামর্শ ধার করতে হবে। কখন কি করতে হবে, কিভাবে করতে হবে সব এখানে সেট। "
মাথায় হাত ঠুকে দেখালো ওদেরকে। অতঃপর শেষ বাক্যটি বললো,
" কাল সময়মতো এসে পড়িস। দেখা হচ্ছে পুরান ঢাকা। "
ধীরপায়ে বেরিয়ে গেল মানুষটি। আস্তে আস্তে তার লম্বাটে ছায়া মিশে যায় মেঝেতে। দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায় তানসীভ শাহ্। তার উপস্থিতির উত্তপ্ততা এখনো যেন বিরাজমান এই গ্যারেজের অভ্যন্তরে।
•
নিস্তব্ধ এ রাত। জানালা গলিয়ে ঘরে প্রবেশ করছে চাঁদের আলো। নিদ্রায় শায়িত লাজুক। দেহে জড়ানো পাতলা কাঁথা। ওড়নায় আবৃত শরীরের উপরিভাগ। চুল ঢিলে বেনুনিতে বাঁধা। সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে রয়েছে তানসীভ। কোলে ল্যাপটপ। তাতে নেটফ্লিক্স হরর মুভি দেখছে সে। টানটান উত্তেজনার মুহূর্ত চলছে মুভিতে। অথচ নির্লিপ্ত তার অভিব্যক্তি। হরর মুভি যেন তাকে ভয় পাওয়াতে ব্যর্থ। কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো। হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ হলো মানুষটার। হালকা এক শীতল পরশ বয়ে গেল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চট করে ডানে ঘুরে তাকালো সে। ঘুমন্ত সঙ্গিনী ঘুমের ঘোরে ওর দিকে কাত হয়ে শুয়েছে। যে মেয়ে ঘুমের মধ্যেও বড্ড সচেতন। বেশি নড়াচড়া করে না। এদিক তেমন একটা ফেরেই না। সে-ই মেয়ে আজ এদিকে কাত হয়েছে। শুধু তাই নয়। মেয়েটির আঙ্গুলের নরম-কোমল ছোঁয়া পেয়েছে ওই শক্তপোক্ত, রূক্ষ হাতের একটুখানি অংশ। তাতেই যে বেসামাল অবস্থা মানুষটির। চিরকাল নারী সঙ্গ থেকে দূরে থাকা মানুষটি আজ একটুখানি পরশ পেল। তা-ও হালাল পরশ। জীবনসঙ্গিনীর ছোঁয়া। হরর মুভি ব্যর্থ হয়েছে। তবে লাজুকের সামান্য স্পর্শে লোমকূপ দাঁড়িয়ে গিয়েছে পা'ষাণ পুরুষটির। শিহরিত চোখে সে তাকিয়ে সঙ্গিনীর দিকে। কিছুটা মুহুর্ত এভাবে অতিবাহিত হলো। অল্প অল্প শিহরণী আবেশে। অতঃপর তানসীভের ভ্রু কুঁচকে গেল। গরম দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা লাজুকের মোবাইলে। মোবাইল সাইলেন্ট করা। রিং বেজে চলেছে। রাত্রি বাজে পৌনে বারোটা। এ অবেলায় কে ফোন করেছে মেয়েটিকে? বিষয়টা তানসীভের পছন্দ হলো না। যা তার মুখাবয়বের ভঙ্গি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে। নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে কলার এর নামটা আওড়ে নিলো তানসীভ,
" নয়ন! "
চলবে।