ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

৪র্থ পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[ ৪ ]

" জোরজবরদস্তি করে জমি দখল করতে চাইছেন? সাহস তো কম নয় আপনাদের। "

" হুঁশ! চোওপ। "

.

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে তখন। পুরান ঢাকার সরু গলিগুলো আস্তে আস্তে আলোকজ্জ্বল আভা থেকে

হারিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বেশকিছু ছোটোখাটো দোকান অবস্থিত একটি গলির কাছে। চায়ের দোকানে বসে চা পান করছে কিছু ব্যক্তি। আলাপচারিতায় লিপ্ত। সহসা পথে ধূলো উড়িয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। সেথায় আগমন হলো কয়েকটি দা'নবীয় গাড়ির। সবার আগে দাঁড়িয়ে ছাদ খোলা জিপ গাড়িটি। পেছনে দু'টো পিকআপ ভ্যান। একটিতে লোহার দণ্ড, টিনের শিট। অন্যটিতে দড়ি, ব্যানার এবং দলবল। এক লাফে জিপ হতে বেরিয়ে এলো দীর্ঘকায়-পেশিবহুল দেহের অধিকারী পুরুষটি। পায়ের পিষণে উড়ে গেল ধূলোবালি। রোদচশমার আড়ালে থাকা চোখ দু'টো আশপাশে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে নিলো। উপস্থিত মানুষগুলো চমকে তাকিয়ে! তানসীভ এবং তার দলবল এগিয়ে গেল অদূরে অবস্থিত প্লটটির কাছে। প্লটের চারদিকে দেয়ালে ভাঙ্গন। ঘাসে আবৃত জমিন। তানসীভ পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে। স্রেফ ঘাড় নাড়ালো। শুরু করার নির্দেশ দিলো ওভাবেই। তৎক্ষণাৎ শুরু হলো কার্যকলাপ। দু'টো ছেলে জমিনে পুঁততে লাগলো লোহার দণ্ড। টং টং ধাতব শব্দে অবাক উপস্থিত মানুষগুলো! একজন লোক কৌতুহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

" এই যে ভাই। আপনারা কারা? কি করছেন এখানে? "

কোনো জবাব নেই। নিজ কর্মে ব্যস্ত তানসীভ বাহিনী। আরেকজন বললো,

" আপনারা এখানে কিসের ভিত্তিতে কাজ করছেন? কোনো কাগজ আছে আপনাদের? থাকলে দেখান। "

তানসীভের একজন চ্যা'লা নাবিল প্রশ্ন করলো,

" আব্বে ওই। তুই কে? জমির মালিক? "

লোকটা হকচকিয়ে গেল! ইতিউতি করে বললো,

" না। "

" তাইলে চল ফোট। "

ইশারায় দূর ছাই করে তাড়িয়ে দিলো নাবিল ছেলেটা। লোকটা অপমানিত বোধ করে পিছু হটে দাঁড়ালো। তানসীভের দলের দুইটা ছেলে জমির মাপজোখ শুরু করল। মাপা সমাপ্ত করে প্লটের সীমানা অঙ্কন করলো দড়ি টেনে। সগর্বে রঙিন ব্যানার টানানো হলো,

" মির্জা প্রপার্টিজ "

একজন লোক কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে প্রতিবাদী গলায় বলে উঠলো,

" জোরজবরদস্তি করে জমি দখল করতে চাইছেন? সাহস তো কম নয় আপনাদের। "

" হুঁশ! চোওপ। "

ঠোঁটের ওপর ঠেকিয়ে রাখা নিজ তর্জনী। চোখের তারায় আগুনের লাভা। তানসীভের ভ'য়ঙ্কর সে চাহনিতে মিইয়ে গেল লোকটা। পিছু হটতে বাধ্য হলো। উপস্থিত মানুষগুলো অসহায় হয়ে দেখে গেল। দুই দুইটা ঘন্টা অতিবাহিত হলো চোখের পলকে। জমির আসল মালিক ছুটে এসেছে বেশ আগেই। কিন্তু এসে লাভ হলো না। চরম অসহায় হয়ে পড়লো বয়স্ক মানুষটা। ওনার চোখের সামনেই জমিটা বেদখল হয়ে গেল। দুই ঘণ্টার মধ্যে পুরো জায়গাটা ঘিরে ফেলা হলো বাঁশ, টিন আর দড়ি দিয়ে। বাঁশের মাথায় লাল কাপড় বেঁধে দিল তানসীভের ছেলেরা। ধীরে ধীরে জমিটা পেল নতুন চেহারা। জমির প্রকৃত মালিক পুলিশে কল করেছেন ইতিমধ্যে। পুলিশ আসছে। আসছে, এই এক আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন বয়স্ক লোকটা। শরীরটা খারাপ লাগছে।

খোলামেলা স্থান। মৃদু বাতাস ছুঁয়ে চলেছে দেহ। প্লাস্টিকের এক চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে অহংকারী ভঙ্গিমায় বসে রয়েছে মির্জা তানসীভ শাহ্। একজন চ্যা'লা এগিয়ে এলো। তানসীভ হাতে নিলো গরমাগরম চায়ের কাপটা। তপ্ত চুমুকে পান করতে লাগলো চা। ক্ষণিক বাদে গলির মোড় হতে ভেসে এলো পুলিশের গাড়ির সাইরেন। উপস্থিত জনতার অন্তরে আশার আলো জেগে উঠলো। অথচ তানসীভ তখনো নির্বিকার। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অবলোকন করে চলেছে জমি দখলের প্রক্রিয়া। ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসি। দু'জন কনস্টেবল এবং একজন এসআই এর আগমন হলো ঘটনাস্থলে। এসআই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে একজন লোক হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলো ক্ষমতাধর মির্জা উত্তরসূরীকে। তানসীভ শাহ্ এর অবয়বে দৃষ্টি পড়তেই এসআই এর অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন এলো যেন। ধীরপায়ে এগিয়ে এলো সে। তানসীভের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো,

" এই জমির মালিক অন্য একজন। আপনারা কি করে এসব করতে পারেন? আপনাদের কাছে কোনো অথেনটিক পেপার্স আছে? "

তানসীভ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবলেশহীন বসে রয়েছে। পড়ন্ত বিকেলে তার চোখেমুখে ছড়িয়ে রয়েছে বিদায়ী সূর্যের আদরমাখা আলো। তানসীভের একজন চ্যা'লা বাপ্পি এগিয়ে এলো। ডাকলো এসআই কে,

" স্যার, একটু এদিকে আহেন তো। "

" কি হয়েছে? "

কেমন মেকি বিরক্তিমাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো এসআই। বাপ্পি আহ্লাদে হেসে উঠলো,

" আহেন না স্যার। "

এসআই এগিয়ে গেল ছেলেটার সঙ্গে একটু পাশে। বাপ্পি একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললো,

" এই যে স্যার। কাগজপত্তর। "

এসআই বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলে ফাইলটা খুললো। মুহুর্তের মধ্যেই তার চোখেমুখে প্রকাশ পেল মৃদু বিস্ময়! বাপ্পি একটুখানি মুখ এগিয়ে আনলো। দুষ্টু হেসে বললো,

" চলবো নাকি আরো পাঁচ লাগবো? "

এসআই আশেপাশে নজর বুলিয়ে আস্তে করে বললো,

" রাতের মধ্যে সব কাজ শেষ হয় যেন। আর কোনো বাড়াবাড়ি নয়। আমি.. আমি এদিকটা সামলে নেবো। "

বাপ্পি হাসলো। সন্তুষ্টির সে হাসি। এসআই টাকার বান্ডিলটা দ্রুত প্যান্টের পকেটে চালান করে ফেললো। অতঃপর সরে গেল। জনতার সামনে গিয়ে বড় গলায় বেশকিছু ভাষণ এবং মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে পুলিশের গাড়ির কাছে ফিরে গেল। হালকা মাথা ঘুরিয়ে তাকালো তানসীভের দিকে। তানসীভ তখন দাঁড়িয়ে ব্যানারের সামনে। চারপাশে ধুলা উড়ছে। টিন পোঁতার আওয়াজ। কারও কারও গলায় হু'ঙ্কার। কিন্তু তানসীভের মুখ শান্ত, দৃঢ়। দৃষ্টি নিবদ্ধ ব্যানারে। ডুবন্ত সূর্যের আলোয় সেখানে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে,

" মির্জা প্রপার্টিজ "

বিদ্রুপাত্মক হাসলো। মৃদু কন্ঠে বিড়বিড় করে উঠলো তানসীভ,

" শা লার দুনিয়া! টাকার কাছে সব মিসকিন। "

শেষ বিকেলের এই মুহুর্তটা যেন পুরান ঢাকার ইতিহাসে নিঃশব্দে লেখা হয়ে গেল। অসহায় এক ব্যক্তির জমি দিনদুপুরে হারিয়ে গেল। আর এক দখলদার জমিনের বুকে পুঁতে দিলো, নিজ রাজত্বের নতুন নিশানা।

•

নতুন এক দিনের সূচনা। সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলিয়ে ঘরে প্রবেশ করছে। স্বর্ণালী আভায় ছেয়ে গিয়েছে ঘরের অভ্যন্তর। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লাজুক। পড়নে মেরুন রঙা সালোয়ার কামিজ। ওড়না ঝুলে রয়েছে ডান কাঁধে। দীঘল কালো সিক্ত চুলে কামিজের পিঠের দিকের অংশ কিছুটা ভিজে গিয়েছে। বাম পাশে হালকা ঝুঁকে তোয়ালে দিয়ে চুল হতে প্রতিটি জলকণা শুষে নিচ্ছে মেয়েটি। সমস্ত ধ্যানজ্ঞান নিজ কর্মে। অপরদিকে দরজায় দাঁড়িয়ে এক স্তব্ধ হৃদয়! তানসীভ শাহ্। নিঃশব্দে, থমকে যাওয়া চাহনিতে দরজায় দাঁড়িয়ে সে। তার সুগভীর কালো দৃষ্টি আটকে গিয়েছে আয়নায় তার সঙ্গিনীর অবয়বে। তার উন্মুক্ত ভেজা চুলে। এমন রূপ, এমন মুহূর্তের আগে সাক্ষী হয়নি সে। সর্বদা ওকে দেখেছে খোঁপা কিংবা লম্বা বেনুনিতে। মেয়েটা শালীনতার সহিত আগলে রাখে নিজেকে। নিজের দেহ, চুল, সম্ভ্রম সবটুকু সযতনে আগলে রাখতে জানে। আজ যেন সে লাজুকের ভিন্ন, নতুন এক রূপের সাক্ষী হলো। লাজুকের আড়ালে এ যেন অন্য এক লাজুক। মেয়েটা নিজের মতো করেই সুন্দর। সাধারণের ভীড়ে অসাধারণ! আকস্মিক আয়নার কাঁচে দৃষ্টিপাত করে চমকে উঠলো লাজুক! আয়নায় তখন পাশাপাশি দু'টো মানুষের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। একজনের চোখে চমক, অন্যজনের মাঝে মুগ্ধতা! লাজুক ঘুরে দাঁড়ালো। চোখে চোখ পড়লো। সে আস্তে করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো ওই প্রগাঢ় দৃষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে। দাঁড়িয়ে রইলো চুপটি করে। তানসীভ ধীরপায়ে প্রবেশ করলো ঘরে। আজ প্রথমবারের মতো কেমন এক ভিন্ন অনুভূতিতে ছেয়ে গিয়েছে অন্তর। শান্ত মেয়েটার অন্তরে ছড়িয়ে পড়েছে অশান্ত দমকা হাওয়া। তানসীভ এসে দাঁড়ালো ওর মুখোমুখি। লাজুক অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে। আস্তে করে কানের পেছনে ভেজা চুল গুঁজে প্রশ্ন করলো স্বামীকে,

" কিছু লাগবে? "

" হু। " মোহাচ্ছন্ন মানুষটার কণ্ঠস্বর।

" জ্বি বলুন। "

এবার সতর্কতার সহিত নিজেকে সামলে নিলো তানসীভ।‌ নিরাবেগ কণ্ঠে বললো,

" গাড়ির চাবি। "

লাজুক একটিবার চোখ তুলে তাকালো। অতঃপর বেডের কাছে এগিয়ে গেল। বিছানায় পড়ে থাকা গাড়ির চাবি হাতে নিলো। তুলে দিলো ওর হাতে। তানসীভ চাবির রিং হাতে হনহনিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে গেল। লুকানোর চেষ্টা করলো নিজস্ব অনুভূতি। তবে সবটা লুকানো কি এতটাই সহজ? লাজুক কি পড়তে পারেনি তার প্রগাঢ় চাহনি? নাকি মোহাচ্ছন্ন ওই দু'টো চোখের উত্তপ্ততা ওর অন্তরে শিহরণ জাগায়নি?

•

রাতের নিরবতা বিরাজমান কক্ষ জুড়ে। মৃদু ঠান্ডা বাতাসে দুলছে জানালার পর্দা। লো পাওয়ারের লাইট জ্বলছে কক্ষে। মোনাজাতে দু হাত তুলে রবের ইবাদতে মগ্ন আফসানা। নিঃশব্দে নড়ছে ঠোঁট। সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করে চলেছে,

' রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বইয়্যিবাতান ইন্নাকা সামিউদ দুআ। '

অর্থ: "হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূতপবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা কবুলকারী"। (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ৩৮)

অনাগত সন্তানের জন্য মনটা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে ইদানিং। মা হবার পূর্বেই মাতৃত্বের পরম মমতায় ছেয়ে গিয়েছে অন্তর। প্রতিটি মুহূর্ত সন্তানের চিন্তায় কাটে। অনাগত প্রাণটির জন্য দোয়ায় ব্যস্ত থাকে অন্তর। নিজের সর্বস্ব দিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে চলে মেয়েটা। স্বামীর যত্ন, ভালোবাসা তো রয়েছেই বোনাস স্বরূপ। আলহামদুলিল্লাহ্ আলহামদুলিল্লাহ্। সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায় করে মোনাজাত সম্পন্ন করলো আফসানা। আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে। জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখলো যথাস্থানে। গর্ভাবস্থায় চতুর্থ মাস চলছে তার। এখন থেকেই বড্ড সচেতন সে। আর তার পা'গল স্বামী টা! আনমনে হেসে উঠলো আফসানা। চোখ বুলিয়ে নিলো দেয়াল ঘড়িতে। মানুষটা অফিস থেকে রওনা দিয়েছে। পৌঁছে যাবে ইনশাআল্লাহ্ আধ ঘন্টার মধ্যে।

আফসানা মুচকি হেসে স্বল্প উঁচু পেটে হাত বুলিয়ে নিলো। নামাজের হিজাব খুলে দেহে জড়িয়ে নিলো ওড়না। হাঁটতে হাঁটতে গেল ডাইনিং রুমে। ফ্রিজ খুলে ঠাণ্ডা পানির বোতল বের করলো। একটা চেয়ার টেনে বসলো। টেবিলে রাখা 'ইস্পি' এর বয়াম, চিনির বয়াম। কাঁচের গ্লাস নিয়ে শরবত তৈরি করতে লাগলো মেয়েটা। এটা তার নিত্যদিনের রুটিন। মানুষটা অফিস থেকে ফিরে তার হাতের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা শরবত খেতে বেশ পছন্দ করে। তৃপ্তি করে যখন সে শরবত পান করে। আফসানা তখন পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। গামছা দিয়ে মুছে দেয় স্বামীর সদ্য ভেজানো চুল। শাহেদ শরবতে শেষ চুমুক দিয়ে গ্লাসটা পাশে রেখে দেয়। প্রসন্ন দৃষ্টি মেলে তাকায় স্ত্রীর দিকে। সারাদিনের দূরত্ব, বিরহ শেষে স্বামী স্ত্রী যুগলের চোখেমুখে তখন তৃপ্তির হাসি। সুখের ঝলকানি। সেসব মনে করে আফসানা একাকী লজ্জা পেল। অনাগত প্রাণটিকে আলতো আদর করে উঠে দাঁড়ালো। ফ্রিজে ঢাকা দিয়ে রেখে দিলো শরবত। ঠাণ্ডা পানির বোতল রেখে দিলো যথাস্থানে। ফ্রিজ বন্ধ করে আরেকবার দেয়াল ঘড়িতে তাকালো। অপেক্ষার প্রহরেরা ফুরাতে চাইছে না যেন।

•

সকালবেলা। ব্যস্ততা ঘিরে রয়েছে ' গুলবাহার মঞ্জিল ' এর অন্দরমহলে। সোফায় আরাম করে দীর্ঘকায় শরীর এলিয়ে দেয়া। অলস ভঙ্গিতে বসে রয়েছে তানসীভ। হাতে রিমোট। টিভিতে মগ্ন সে। সিঁড়ি বেয়ে ধীরপায়ে নেমে এলো লাজুক। পড়নে স্কাই ব্লু রঙের সালোয়ার কামিজ। ম্যাচিং হিজাবে আবৃত চুল। শেষবারের মতো কাঁধে থাকা টোট ব্যাগের ভেতরটা চেক করতে করতে হলরুমে হাজির হলো মেয়েটা। ওকে দেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে এলো ইফরাত।

" ভার্সিটি যাচ্ছো? "

" জ্বি ভাবী। " মুচকি হেসে জবাব দিলো লাজুক।

" ওহ্ আচ্ছা। কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছে যে। "

কেমন চিন্তা মাখা কণ্ঠে বললো ইফরাত। লাজুক চিন্তিত হয়ে শুধালো,

" কি হয়েছে ভাবী? "

" কি হয়নি বলো তো। তুমি ভার্সিটি যাচ্ছো। এসময় এমনটা হওয়ার দরকার ছিল না তো। "

টিভিতে ব্যস্ত মানুষটা এত সমস্যার প্যানপ্যান শুনে সজাগ হলো কিছুটা। দৃষ্টি টিভির পর্দায় কিন্তু কান দু'টো অন্যত্র।

" আসলে কি হয়েছে বলো তো। তুমি যে ভার্সিটি যাবে। ড্রাইভার আঙ্কেল তো মাত্র ই বের হলেন। রায়হান ওনাকে অফিসে ডেকে পাঠিয়েছে কি যেন এক দরকারে। "

" ওহ্। "

মনে মনে স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল লাজুকের। আজ তাহলে গাড়িঘোড়ার কৃত্রিম আভিজাত্য বয়ে বেড়াতে হবে না। সে না হয় নিজের মতো করে রিকশায় যাবে। আহা! কতদিন পর খোলা আকাশের নিচে রিকশায় করে ভ্রমণ। লাজুক মনে মনে বেশ উত্তেজিত।

" তবে তুমি চিন্তা করো না লাজুক। "

লাজুক কিছু বলার আগেই ইফরাত যেন বো মা ফাটালো ঘরটায়।

" দেবর মশাই না হয় তোমাকে ড্রপ করে দেবে। "

লাজুক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে। তোতলাতে তোতলাতে বললো,

" ভ্- ভাবী আমি... "

তানসীভ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে টিভির পর্দায় তাকিয়ে! গম্ভীরতার চাদরে আরো গভীরভাবে নিজেকে মুড়িয়ে নিলো।

" এই যে দেবর মশাই। "

ইফরাতের ডাকে মনোযোগ ভঙ্গ হলো তানসীভের। সে অলস ভঙ্গিতে ঘাড়টা মৃদু মটকে নিলো। শীতল এক শব্দে জানালো,

" বিজি। "

" জ্বি না। তুমি কি যে বিজি আমি দেখতেই পাচ্ছি। এখন চটাপট উঠে পড়ো তো। বউকে ভার্সিটি পৌঁছে দিয়ে এসো। এরপর না হয় দিনভর টিভি দেখো। "

" ফ্রি টাইম নেই। "

ইফরাত আরো কিছু বলার আগেই লাজুক থামিয়ে দিলো তাকে।

" ভাবী। উনি ব্যস্ত। আমি চাই না আমার জন্য কোনো ব্যস্ত মানুষের মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাঘাত ঘটুক। আমি.. আমি যেতে পারবো। অভ্যাস আছে। "

তানসীভ নির্বিকার বসে টিভি দেখছে। ইফরাত কোনো জবাবদিহিতা দেয়ার আগেই লাজুক মৃদু স্বরে বললো,

" আসছি ভাবী। আসসালামু আ'লাইকুম। "

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। সাবধানে যেয়ো তাহলে। "

নরম স্বরে বললো ইফরাত। তার কণ্ঠে অসন্তোষ। দেবরের প্রতি। লাজুক ধীরপায়ে হেঁটে প্রস্থান করলো সেখান থেকে। ইফরাত দেবরের দিকে একনজর তাকিয়ে বেজাড় মুখে সেখান থেকে চলে গেল। তানসীভের দু ভ্রুয়ের মধ্যিখানে উদয় হলো এক ভাঁজ। অভিব্যক্তি বরাবরের ন্যায় লুকায়িত।

•

রাতের আঁধারে আচ্ছাদিত ধরনী। চারদিকে নীরবতার রেশ। অন্ধকার ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলেছে বাড়ির অভ্যন্তর। ঘড়ির কাঁটা তখন বারোর কাছাকাছি। মোবাইল স্ক্রল করতে করতে ঘরে প্রবেশ করলো মানুষটা। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগারেটের ধোঁয়া। তাতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে নির্লিপ্ত মুখশ্রী। বাঁ পায়ে ঠেলা দিয়ে ঘরের দরজাটা চাপিয়ে দিলো। মোবাইল ছুঁড়ে ফেললো বিছানায়। পরিহিত টিশার্ট খুলে ফেলতেই দৃশ্যমান হলো সুঠাম, উন্মুক্ত বুক। অনাদরে টিশার্টের জায়গা হলো সোফায়। সিগারেটে সর্বশেষ সুখটান দিয়ে তানসীভ দাঁড়ালো আয়নার সামনে। এলোমেলো হাত চালিয়ে চুলগুলো কিছুটা সেট করে নিলো। অতঃপর সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটুকু ফেলে দিলো বিন এ। পা বাড়ালো ওয়াশরুমের দিকে। কিছুক্ষণ বাদে ফিরে এলো ফ্রেশ হয়ে। তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে এসি রিমোট হাতে নিলো ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে। ঘরের তাপমাত্রা মাত্রাতিরিক্ত শীতল করে রিমোট রেখে দিলো। তোয়ালে ছুঁড়ে ফেললো সোফায়। ধীরপায়ে গিয়ে বসলো বিছানায় নিজ সাইডে। মোবাইল হাতে হেলান দিলো বেডে। কপালে সৃষ্টি হয়েছে সরু ভাঁজ। পাশেই যে ঘুমে কাতর রমণী। অন্যদিন তো এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না সে। বারান্দায় ঘুচুরঘুচুর করে বেড়ায় মধ্যরাত পর্যন্ত। বইটই কি কি যেন পড়ে। সে যত দেরি করেই ঘরে ফিরুক না কেন, মেয়েটিকে রোজ জাগ্রত অবস্থায় পায়। আজ তবে ব্যতিক্রম কেন? সব... ঠিক আছে তো? অফকোর্স ঠিক আছে। ঠিক থাকবে না কেন? না থাকার তো কোনো প্রশ্ন ই নেই। নিজেকে নিজে বুঝ দিলো মানুষটা। এরপর নিজ কর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মোবাইল চালালো রাত দেড়টা পর্যন্ত। ফাঁকে দুইবার অপরপাশে সামান্য একটুখানি উঁকি-ও দিলো। এরপর দেড়টা নাগাদ মোবাইলটাকে অবশেষে নিস্তার দিলো। শুয়ে পড়লো বিছানায়।‌ হাই তুলে বন্ধ করে নিলো চক্ষু জোড়া। অল্প সময়ের মধ্যেই তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। পাশাপাশি ঘুমে বিভোর দু'টো প্রাণ।

•

" শা-লা! নারী মন বোঝা মুশকিল। "

' মেয়েদের মন বোঝা, নয় রে নয় সোজা ' সাউন্ডট্র্যাক বেজে চলেছে যেন মন ও মস্তিষ্কে। বিরক্তি ও উৎকণ্ঠার ছাপ মির্জা তানসীভ শাহ্ এর চোখেমুখে।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন