#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[৫]
ঘন আঁধারে আচ্ছাদিত রাত। খোলা জানালা দিয়ে ঘরে ফুরফুরিয়ে প্রবেশ করছে বাতাস। দেহমন শীতল হয়ে যাওয়ার মতো বাতাস। কিন্তু লাজুক নিজেকে শান্ত, তৃপ্ত করতে ব্যর্থ। ঘরজুড়ে ছটফটে পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে মেয়েটা। আল্লাহ্ প্রদত্ত প্রাকৃতিক ছুটির আজ দ্বিতীয় দিন। গতকাল থেকেই অস্বস্তি, ব্যথা ব্যথা ভাব। শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছিল সন্ধ্যা হতেই। তাই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমালে যদি একটুখানি স্বস্তি মেলে। সকাল হতে যদিওবা একটুখানি স্বস্তিবোধ করেছিল। সহনীয় মাত্রা। তবে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই শরীরটা বড় খারাপ লাগছে। ব্যথায় পেটের ভেতর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে যেন। লাজুক চোখমুখ কুঁচকে পেট আঁকড়ে ধরলো। দোয়া পড়তে পড়তে ঘরজুড়ে হাঁটতে লাগলো মেয়েটা। সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগলো রবের নিকটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্বলতায় যেন ভেঙে আসছে হাত-পা। চোখের কোলে অশ্রু জমা হলো। গলায় জমাট বাঁধা কষ্ট। দুর্বলতায় আচ্ছন্ন শরীরটা নিয়ে সোফায় বসে পড়লো লাজুক। মাথা হতে কিছুটা সরে গেল ওড়না। অভ্যন্তরীণ যন্ত্রনা স্পষ্ট তার অভিব্যক্তিতে। পেট চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো সে। আস্তে আস্তে দোয়া পড়ে চলেছে। আল্লাহ্, আল্লাহ্। রবের স্মরণে ব্যস্ত অন্তর। এক আল্লাহ্ ই পারেন ওকে এই সাময়িক যন্ত্রনা হতে মুক্তি দিতে। মেয়েটা আস্তে ধীরে সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিলো। আর পারছে না শরীর। হার মেনে নিতে চাইছে বারংবার। লাজুক চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। আস্তে করে ডান চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুবিন্দু। গুমড়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। যন্ত্রনা, ক্লান্তি, দুর্বলতা সহ্য করতে করতে একসময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো।
বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো। ব্যস্ত পায়ে ঘরে প্রবেশ করলো তানসীভ শাহ্। দরকারি একটা ফাইল নিতে অবেলায় রুমে আগমন তার। এদিক ওদিক না তাকিয়ে সোজা কাবার্ডের কাছে গেল সে। ঠাস করে খুলে ফেললো পাল্লা। কাঙ্ক্ষিত ফাইলটা খুঁজে বের করলো। সশব্দে আটকে দিলো কাবার্ড। ফাইল হাতে পিছু ঘুরে তাকাতেই চমকে উঠলো হৃদয়! সোফায় এলোমেলো ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে তার ঘরণী। দু হাতে চেপে ধরা তলপেট। ব্যথাতুর রঙে ছেয়ে গিয়েছে মুখশ্রী। যন্ত্রনার ছাপ দৃশ্যমান মুখ জুড়ে। আনমনে সম্মোহিতের ন্যায় সেদিকে পদযুগল অগ্রসর হলো। একটু একটু করে এগোচ্ছে। আরো ভালো করে দৃষ্টি নিবদ্ধ হচ্ছে মেয়েটির অবয়বে। এতদিনের সীমারেখা অতিক্রম করে আজ... বেশ সন্নিকটে এসে দাঁড়ালো তানসীভ। কাছ থেকে লক্ষ্য করলো গালে লেপ্টে থাকা শুকনো অশ্রুর দাগ। ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠলো। ডান হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ঘঁষে নিলো কপালের একাংশ। জোরপূর্বক দৃষ্টি হটিয়ে নিলো মেয়েটির অবয়ব হতে। বাম দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। কপালে আরেকবার তর্জনী এবং বৃদ্ধাঙ্গুল ঘঁষে মেয়েটির দিকে ঘুরে তাকালো। ভেতরকার অনুভূতিরা চাপা রয়েছে অভেদ্য এক দেয়ালের অন্তরালে। পকেট থেকে ফট করে মোবাইল বের করলো তানসীভ। গুগলে স্ক্রল করতে করতে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল রুম হতে। ঘুমন্ত লাজুক এতসব সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর। মগ্ন ঘুমের ঘোরে। তার অজান্তেই আজ, এবেলায় লুকায়িত যন্ত্রনা ছুঁয়ে গেল কি আরেকটি হৃদয়....!
...
বেলকনিতে ফ্লোর বেডে শুয়ে রয়েছে লাজুক। ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে দেহ। শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার দরুণ ঘরের মানুষটিকে বিরক্ত করতে চায়নি সে। তাই তো ছোটোখাটো ঘুম থেকে উঠে আস্তে ধীরে চলে এলো বেলকনিতে। শয্যা গ্রহণ করলো ফ্লোর বেডে। শোয়া মাত্র ব্যথায় কুঁচকে গেল মুখ। কুশনে মাথা রেখে চুপটি করে শুয়ে রইলো। রাতের খাবার খেয়েছিল নামমাত্র। ব্যথায় কিছু খেতেই ইচ্ছে করছিল না। তবুও খেয়েছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে কেউ যেন তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে না পারে। কাউকে অহেতুক বিব্রত করতে ইচ্ছুক নয় সে। ইনশাআল্লাহ্ কালকের মধ্যে ব্যথা ঠিক কমে যাবে। থেমে থেমে তিনদিন কখনোবা দুই দিন কষ্ট দেয় এই ব্যথা। এরপর কমে যায়, আলহামদুলিল্লাহ্। আনমনে এসব ভেবে চলছিল মেয়েটা। আকস্মিক চোখের সামনে কিছু একটা উদয় হতেই ঘাবড়ে গেল সে। চোখ মেলে তাকাতে চোখের তারায় ধরা দিলো স্বামী মানুষটার লম্বা অবয়ব। লাজুক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তানসীভ পুরুষালি ভারী কণ্ঠে মেকি বিরক্তি দেখিয়ে বললো,
" টেইক ইট। "
মানুষটার হাতে হট ওয়াটার ব্যাগ। লাজুক দ্বৈত অনুভূতিতে ফেঁ'সে গিয়েছে যেন। একদিকে মানুষটার অপ্রত্যাশিত এই সহায়তায় পুলকিত হয়েছে মন। অপরদিকে সে এসব টের পেল কি করে, সেই চিন্তাও উদয় হয়েছে মনে। তানসীভ হটব্যাগটা আরেকবার নাড়াতেই লাজুক আস্তে করে ব্যাগটা নিলো। মৃদু কন্ঠে বললো,
" থ্যাংক ইয়্যু। "
তানসীভ কিছু বললো না। যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল রুমে। লাজুক অপ্রসন্ন চেহারায় হটব্যাগটা চেপে ধরলো তলপেটে। কাউকে ধন্যবাদ জানালে এমন রিয়েকশন দেয়া যায়, জানা ছিল না তার। অবশ্য এই ঘরের ঘরণী হয়ে নিত্য কত কিছুই তো জানছে। দেখতে পারছে। ভারী অদ্ভুত! লাজুক হটব্যাগটা পেয়ে বেশ উপকৃত হলো। তলপেটে, যথাসম্ভব পিঠে আস্তে আস্তে করে ব্যাগটা চেপে ধরলো। এতে বেশ উপকার রয়েছে। জরায়ুর পেশি শিথিল হয় এবং ব্যথা দ্রুত কমে যায়। লাজুক বেশ আরাম পাচ্ছে। নতুন জায়গায় এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। বাবার বাড়ির কথা বড্ড মনে পড়ছিল। নিজের যত্ন নিতে ভুলেই গিয়েছিল যেন মেয়েটা। তবে....
হঠাৎ বিষা"ক্ত ধোঁয়ায় কেশে উঠলো লাজুক। সিগারেটে ধোঁয়া ফুঁকতে ফুঁকতে বেলকনিতে ফিরে এসেছে মানুষটা। ওর পাশেই রেখেছে গরম আদা চা। তানসীভ দাঁড়ালো বেলকনির রেলিং সংলগ্ন। রহস্যময় দৃষ্টি যুগল নিবদ্ধ রাতের ঢাকা শহরে। এ শহরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে শত-সহস্র রহস্য আর রহস্য। নিত্য কত কি ঘটে চলেছে এই শহরের বুকে। তার খবর জানে কয়জনে?
লাজুক আদা চা দেখে নাকমুখ কুঁচকে নিলো। চা সে তেমন একটা খায় না। এর ওপর আদা চা! দূর থেকেই কেমন আদা আদা ঘ্রাণ আসছে। ইয়াক! এসব সে খেতে পারবে না। তাই তো ফট করে বলেই ফেললো,
" আমি আদা চা খাই না। "
" শখে দেয়া হয়নি। "
ভারিক্কি সে কণ্ঠস্বর সোজা বুকে আঘাত হানে। মেয়েটা আমতা আমতা করে বলে,
" ধন্যবাদ! কিন্তু আমি খাই না। আদার স্মেল আমার ভালো লাগে না। আমি... "
আর বলা হলো না মেয়েটির।
" কথা কম! একদম চুউউপ। হুঁ? "
নিজ ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে চুপ থাকতে আদেশ দিলো মির্জা সাহেব। ওর দিকেই কেমন হিমশীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে। অকথ্য সে চাহনি। ধক করে উঠলো অন্তর। দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলো লাজুক। মেয়েটা সত্যিই স্তব্ধ! জীবনে কখনো কাউকে এভাবে যেচে পড়ে হু'মকি ধামকি দিয়ে উপকার করতে দেখেনি সে। এইই প্রথম। অদ্ভুত!
•
রোদেলা সকালের মিষ্টি আলিঙ্গনে আচ্ছাদিত ঘর। ডাইনিং এরিয়ায় চেয়ারে বসে চা পান করছে শাহেদ। পড়নে তার কালো রঙা শার্ট। প্যান্ট। গলায় বাঁধা টাই। অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত সে। চায়ে চুমুক দিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে ডেকে উঠলো অর্ধাঙ্গিনীকে,
" আফসানা। রান্নাঘরে এখনো কি করছো বলো তো। এদিকে এসো না। "
" হ্যাঁ আসছি। তোমার খাওয়া হয়েছে? "
এতক্ষণে স্বামীর জন্য টিফিন বক্স গুছিয়ে নিয়েছে আফসানা। ধীরপায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখলো বক্সটা। স্বামী শাহেদের দিকে তাকাতেই চমকালো!
" এ কি! তুমি এখনো খাওয়া শুরু করোনি কেন? দেরি হয়ে যাবে তো। "
" সেজন্যই তো তোমাকে সে-ই কখন থেকে ডেকে চলেছি। কিন্তু রাণী সাহেবা তো খুউব ব্যস্ত। এই অধমের জন্য একটুও সময় আছে কি? "
আফসানা ফিক করে হেসে উঠলো। আদুরে কণ্ঠে বললো,
" দিনকে দিন তুমি বড্ড নাটকবাজ হয়ে যাচ্ছো। সে কি জানো? "
শাহেদ বুকে আঘাত পাওয়ার ভঙ্গিতে হতাশ হয়ে বললো,
" শেষমেষ এই অধমের অনুভূতিকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন, রাণী সাহেবা? ভালো না বাসুন। অন্তত অবজ্ঞা করবেন না। "
আফসানা শব্দহীন হেসে উঠলো। চোখে চোখ পড়লো দু'জনার। আস্তে করে কাছে এগিয়ে গেল সে। শাহেদ চেয়ার টেনে দিতেই আফসানা বসলো স্বামীর ডান পাশের চেয়ারে। ব্যস্ত হাতে রুটি ছিঁড়ে সবজি মেখে নিলো। স্বামীর দিকে বাড়িয়ে দিতে শাহেদ মুচকি হেসে হা করলো। তাকে রুটি খাইয়ে দিতে লাগলো আফসানা। ফাঁকে ফাঁকে শাহেদ-ও রুটি ছিঁড়ে ডিম, সবজি দিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে স্ত্রীকে। দু'জনে টুকটাক কথা বলতে বলতে একে অপরকে খাইয়ে দিলো। খাওয়া শেষে পানি পান করে শাহেদ জিজ্ঞেস করলো,
" বুয়া আসবে কয়টায়? "
" সাড়ে এগারোটায়। "
" আচ্ছা ঠিক আছে। ততক্ষণ অবধি তুমি রেস্ট নাও। একটুও তিড়িং বিড়িং করবে না কিন্তু। আমি গেলে দরজা আটকে সোজা বিছানায় যাবে। "
" আচ্ছা মশাই। আপনি বরং এবার রওনা দিন। দেরি হয়ে যাচ্ছে তো। "
" হ্যাঁ, যাচ্ছি যাচ্ছি। কেমন পা'ষাণ বউ আমার। স্বামীকে তাড়িয়ে দিতে পারলেই ওনার শান্তি। "
আফসানা মুচকি হেসে স্বামীর সন্নিকটে দাঁড়ালো। টাই'টা ঠিক করে দিয়ে আদরমাখা কণ্ঠে বললো,
" দুপুরে সময়মতো খেয়ে নিয়ো কিন্তু। "
শাহেদ আলতো চুমু এঁকে দিলো স্ত্রীর কপালে। আবেশে আফসানা মিশে গেল স্বামীর আলিঙ্গনে। গালে ঠোঁট ছুঁয়ে মানুষটা নরম কণ্ঠে বললো,
" নিজের এবং আমাদের ছানার খেয়াল রেখো। খেয়ে নিয়ো সময়মতো। "
" হুম। তুমিও সাবধানে যেয়ো। পৌঁছে কল দিয়ো কিন্তু। "
শাহেদ মুচকি হাসলো,
" যথা আজ্ঞা রাণী সাহেবা। "
আফসানা লাজুক হেসে বললো,
" আল্লাহ্ হাফিজ। "
" আল্লাহ্ হাফিজ। আসসালামু আ'লাইকুম। "
" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। "
কাঁধে অফিস ব্যাগ নিয়ে দরজার দিকে অগ্রসর হলো শাহেদ। আফসানা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেল। মানুষটা মুচকি হেসে হাত নেড়ে বিদায় জানালো স্ত্রীকে। বিপরীতে আফসানা-ও হাত নেড়ে বিদায় জানালো। যতক্ষণ পর্যন্ত স্বামীর অবয়ব চোখে পড়ে, দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো আফসানা। অতঃপর শাহেদ চলে গেল। দরজা আটকে দিলো মেয়েটা। ধীরপায়ে এগোতে লাগলো ডাইনিং এরিয়ায়।
•
গোধূলির আঁধারে ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে শহরতলী। পাখপাখালির দলবল ফিরে যাচ্ছে আপন নীড়ে। লালচে কমলা রঙ তুলির আঁচড়ে দিগন্তে সে এক মোহনীয় আভা! এমনই মুহূর্তে বড় বড় কদম ফেলে বাড়িতে প্রবেশ করলো তানসীভ শাহ্। ধপ করে বসলো সোফায়। ঘামে ভেজা শার্টের ওপরের দু'টো বোতাম খুলে ফেললো গরমে অতিষ্ঠ হয়ে। মোবাইল হাতে, উঁচু গুরুগম্ভীর গলায় ডেকে উঠলো গৃহকর্মী পলি'কে।
" পলি। পানি দে। "
রান্নাঘরে কর্মরত বছর সতেরোর পলি ঘাবড়ে গেল অবেলায় এমন হুড়ুমগুড়ুম ডাকে।
" এই রে। এই সাঝ সন্ধাডা বেলায় ছোড ভাইজান আইলো কোন থে? জলদি দৌড়াই। নইলে এই গাইল খাইলাম বইল্লা। "
দ্রুত পায়ে ফ্রিজ হতে ঠাণ্ডা পানির বোতলটা বের করলো পলি। কাঁপা কাঁপা হাতে কাঁচের গ্লাসে ঢেলে নিলো পানি। এরপর বড় করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে হলরুমে অগ্রসর হলো। গায়ে মাথায় ওড়না ঠিকঠাক না থাকলে বড় ভাবী যে শাসন করে। পলি এসে দাঁড়ালো সোফার সামনে। কাঁপা হাতে পানির গ্লাসটা রাখলো টেবিলের ওপর। তানসীভ বিলম্ব না করে গ্লাসটা হাতে নিলো। ঢকঢক করে পান করলো পুরো এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি। খালি গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে দিতেই পলি দ্রুত গ্লাসটা নিলো। যথাসম্ভব দ্রুত সরে যেতে চাইলো এখান থেকে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো এক। ডেকে উঠলো তানসীভ। ভীত মুখে পিছু ঘুরে দাঁড়ালো সে। তানসীভ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ইতিমধ্যে। ওর পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে কেমন অন্যরকম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
" ফল.... খাইয়েছিলি? "
" ফল? " বিস্ময়সূচক কণ্ঠে তাকিয়ে পলি!
তানসীভ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে।
" কারে ফল খাওয়ামু আমি? "
বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি মেয়েটার। ওর এমন প্রতিক্রিয়ায় বেশ অসন্তুষ্ট হলো তানসীভ। যা স্পষ্ট ভেসে উঠলো চোখেমুখে। তানসীভের এমন দৃষ্টি দেখে হকচকিয়ে গেল পলি। পুরো মস্তিষ্ক দ্রুত স্ক্যান করতে লাগলো। ফল, ফল, ফল! কাকে খাওয়ানোর কথা ছিল ফল। ওহ্ হ্যাঁ। তানসীভ তখনো বিরক্তির চোখে তাকিয়ে। দু ভ্রুয়ের মাঝে ভাঁজ। যেন সোজাসাপ্টা বলতেও পারছে না নামটা। কিন্তু পলি তৎক্ষণাৎ বলে ফেললো,
" ওহ্। ছোডো ভাবীরে? হয়। সকালে কোনোমতে খাইছিল। অ্যারপর আর খায় নাই। "
" কেন? "
মেকি উদাসীন ভঙ্গিতে বললো তানসীভ। দৃষ্টি নিবদ্ধ হাতে থাকা মোবাইলে। কিন্তু কান দু'টো যথেষ্ট সজাগ।
" অ্যারপর খাইবো ক্যামনে? হ্যায় তো বাড়িত নাই। "
ভ্রু কুঁচকে তাকালো মানুষটা। চোখের দৃষ্টি জানতে চাইছে যেন, কোথায় গিয়েছে মেয়েটা। সে তো অজ্ঞাত এ বিষয়ে। পলি নিজের মতো করে বলে গেল,
" ভাবী বাপের বাড়ি গ্যাছে। বিকালেই গ্যাছে। এই লেইগ্গা ফল খাওয়াইতে পারি নাই আর। ফেরত আইলে নাহয় আবার খাওয়ামু নে। "
তানসীভ আর দাঁড়ালো না। অন্যমনস্ক হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো দোতলায়। মস্তিস্কে কড়া নেড়ে চলেছে একটাই কথা। মেয়েটা নেই। চলে গিয়েছে বাবার বাড়ি। এভাবে তাকে না জানিয়ে কি করে চলে গেল? অভাবনীয় দুঃসাহস! অথচ হৃদয়ের এক কিনারে তখনো ঝাপসা ভেসে ভেসে উঠছে গতকালের সে-ই যন্ত্রনামাখা মুখশ্রী।
•
রাতের প্রহর। ঘড়ির কাঁটা তখন নয়ের কাছাকাছি। লাজুক তার পিতৃ নিবাসে। রান্নাঘরের মিটসেফ থেকে খাবার সামগ্রী এনে এনে রাখছে ডাইনিং টেবিলের ওপর। সবগুলো গ্লাস, প্লেট ঠিকঠাক করে রাখলো। পুরোটা সময় জুড়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মা সুমনা বেগম। তিনি আস্তে করে বললেন,
" একা এলি যে? জামাইকে সঙ্গে নিয়ে আসতি। "
লাজুক এদিকের কাজকর্ম সেরে বসলো গিয়ে সোফায়। সুমনা বেগমও তাই করলেন। বসলেন মেয়ের থেকে স্বল্প দূরত্বে। লাজুক স্বল্প শব্দে জবাব দিলো,
" উনি ব্যস্ত। "
সুমনা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন যেন। বরং জিজ্ঞেস করলেন থেমে থেমে,
" তুই... ভালো আছিস তো... মা? "
লাজুক মায়ের দিকে তাকালো। অতঃপর দৃষ্টি সরিয়ে বললো,
" আল্লাহ্ যেমন রেখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ্। "
" জীবন সবসময় আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক চলে না রে মা। কখনো কখনো আমরা ভাবি এক। হয় আরেক। "
" হুম। আল্লাহ্'র ফয়সালাই আমার ফয়সালা। এ নিয়ে আমি আপত্তি জানাই না। কিন্তু...! সে যাই হোক। বাবা চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আমি.. রুমে যাচ্ছি। একসাথে ডিনার করবো ইনশাআল্লাহ্। "
থেমে থেমে ধীর কণ্ঠে বললো লাজুক। এরপর উঠে দাঁড়ালো সোফা ছেড়ে। চলে গেল নিজ রুমে। সুমনা বেগম শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে।
•
ঘড়ির কাঁটা তখন বারোর কাছাকাছি। খোলা বেলকনির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তানসীভ। দেহের উপরিভাগ উন্মুক্ত। কোমরের কাছে বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে রয়েছে ট্রাউজার। উত্তপ্ত বাতাস ছুঁয়ে চলেছে উন্মুক্ত ত্বক। ঠোঁটের ফাঁকে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে সিগারেট। সে ধোঁয়ায় ক্ষণিকের জন্য ঝাপসা হয়ে আসছে সম্মুখের দৃশ্যপট। সে-ই ভাসা ভাসা ঝাপসা ধোঁয়ায় ভেসে উঠছে কোমল এক মুখশ্রী। যন্ত্রনায় কাতর। পেটে চেপে ধরা হাত। গালে লেপ্টে থাকা শুকনো অশ্রুবিন্দু। বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে উঠলো মানুষটার। খিচে বন্ধ করে নিলো দু চোখের পাতা। ঠোঁটের ভাজে তখনো সিগারেট। বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠলো এবার সদ্য স্নাত এক রমণী। আলতো ভঙ্গিমায় তার ভেজা চুল মুছে নেয়ার শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য। ফট করে চোখ খুলে ফেললো তানসীভ। সিগারেটে সুখটান দিলো লম্বা করে। ধোঁয়াটা মিশে গেল বাতাসে। বেলকনি জুড়ে অশান্ত, ক্লান্ত রূপে পায়চারি করতে লাগলো সে। বারবার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে পায়ের কাছে থাকা ফ্লোর বেডে। এখানেই তো বসে ছিল গতকাল। সে-ই হটব্যাগ আঁকড়ে ধরা। চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার আবেশ। আদা চা দেখে কেমন নাক ছিটকানো। সিগারেটে আবার টান দিলো তানসীভ। ধোঁয়াটা কেমন বিদঘুটে ভঙ্গিতে গলায় আটকে গেল। দম বন্ধ হয়ে আসছে বুঝি। কেশে উঠলো মানুষটা। এই ঘর, এই শূন্যতা, এই অস্থিরতা বড় পোড়াচ্ছে আজ। দূর হতে ভেসে এলো পথ কুকুরের ডাক। তানসীভ লম্বা শরীরটা এলিয়ে দিলো ফ্লোর বেডে। সিগারেট নিভে গিয়েছে এতক্ষণে। ছাইচাপা অংশটুকু পড়ে আছে পায়ের কাছে। অর্থহীন দৃষ্টি নিবদ্ধ সিলিংয়ে। বিড়বিড় করে উঠলো সে,
" শা-লা! নারী মন বোঝা মুশকিল। "
' মেয়েদের মন বোঝা, নয় রে নয় সোজা ' সাউন্ডট্র্যাক বেজে চলেছে যেন মন ও মস্তিষ্কে। বিরক্তি ও উৎকণ্ঠার ছাপ মির্জা তানসীভ শাহ্ এর চোখেমুখে। জোরপূর্বক চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো সে। ঘুম। ঘুমের বড় প্রয়োজন এই সমস্ত ছাইপাশ এড়াতে। যন্ত্রনায় যেন দপদপ করছে মাথা। অসহ্যকর!
•
স্টাডি রুমে গভীর নীরবতা। দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দটা কানে লাগছে বেশ। ভারী পর্দার ফাঁক হতে রৌদ্র গলিয়ে পড়েছে ঘরটায়। আলো অন্ধকারে সে এক রহস্যময় পরিবেশ। মির্জা জহুরুল শাহ্ বসে আছেন টেবিলের অপর প্রান্তে। চশমার ফাঁক গলিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জোড়া নিবদ্ধ ফাইলের পাতায়।
' ঠক ঠক '
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
" এসো। "
ফাইল থেকে চোখ তুললেন না জহুরুল সাহেব। ওভাবেই গম্ভীর স্বরে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন। ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো তানসীভ। দাঁড়ালো বাবার বিপরীত দিকটায়। চেয়ারে বসলো না সে। দাঁড়িয়ে রইলো। জহুরুল সাহেব ফাইলে দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলেন,
" গুলশানের প্লটটার কি আপডেট? "
" কাজ শুরু হয়েছে। "
সংক্ষিপ্ত উত্তর তানসীভের। জহুরুল সাহেব চোখ তুলে তাকালেন। চোখেমুখে কেমন অবিশ্বাসের ছাপ।
" এত দ্রুত? "
" হু। "
" কিভাবে করলে শুনি? "
বাবার কণ্ঠে স্পষ্ট তাচ্ছিল্যের আভাস। ভেতরকার হিং-স্র সত্তা দমিয়ে রেখে ত্যাছড়া জবাব দিলো তানসীভ,
" দু'টো পিকআপ নেয়া হয়েছে। লোক বসানো হয়েছে। ঘিরে ফেলা হয়েছে পুরো প্লট। "
জহুরুল সাহেব আস্তে করে ফাইলটা বন্ধ করলেন। দেহ এলিয়ে দিলেন আরামদায়ক চেয়ারে। জিজ্ঞেস করলেন,
" পেপার্স? "
" হয়ে যাবে শীঘ্রই। "
" পরের জন্য কাজ জমিয়ে রাখা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়। এখনকার কাজ এখুনি করতে শেখো। "
চোখ দুটো বন্ধ করে বড় শ্বাস ফেললো তানসীভ। ঠাণ্ডা গলায় বললো,
" প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যয় করার মতো ফ্রি টাইম নেই আমার। সময়মতো হয়ে যাবে সব। "
" হলেই ভালো। না পারলে বলে দাও। অন্য কাউকে দিয়ে না হয় কাজটা... "
তানসীভ পিছু ঘুরে দাঁড়ালো। বাঁ কাঁধে মুখটা এনে গমগমে স্বরে বললো,
" কাজটা আমাকে আপনি দিয়েছিলেন। এখন আমার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে নিজের দূরদর্শিতাকে হেয় করা। আপনি নিশ্চয়ই সেটা করতে ইচ্ছুক নন? হুঁ? "
জহুরুল সাহেব অসন্তোষের দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ভেতরকার অবস্থা বোঝা দুষ্কর। তানসীভ আর কথা বাড়ালো না। বড় বড় কদম ফেলে বেরিয়ে গেল স্টাডি রুম থেকে। যাওয়ার পূর্বে ঠাস করে বন্ধ হলো দরজা। একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে মির্জা জহুরুল শাহ্।
চলবে।