ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[৬]

কিছুক্ষণ পূর্বে সমাপ্ত হয়েছে আজকের শেষ ক্লাস। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ডিপার্টমেন্ট বিল্ডিং হতে বেরিয়ে এলো লাজুক। শেষ দুপুরের রৌদ্র তখন ছড়িয়ে ক্যাম্পাসে। আশপাশে ছেলে-মেয়েদের কোলাহল। লাজুক এবং বিথী পাশাপাশি হেঁটে চলেছে। কথোপকথন চলছে দু'জনের।

" শোন না। বাসায় গিয়ে একটু কষ্ট করে আগেরদিনের নোটস্ এর ফটো পাঠিয়ে দিস তো।‌ একদিন আসলাম না। এরমধ্যে কতকিছু দিয়ে ফেললো। ধুর! "

বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে বিথীর চোখেমুখে। লাজুক মুচকি হেসে উঠলো,

" প্যারা নিস না। আমি পাঠিয়ে দেবো নে। "

" থ্যাংক ইয়্যু রে। তুই না থাকলে আমার কি যে হতোওওও। "

কণ্ঠে নাটকীয়তার ছাপ। লাজুক হেসে ওর বাহু চাপড়ে দিলো।

" ড্রামাবাজ! "

দু'জন হাস্যোজ্জ্বল মুখে বেরিয়ে এলো ক্যাম্পাস প্রাঙ্গন হতে। গেটের বাইরে দাঁড়ালো তারা। অপেক্ষায় রিকশার জন্য। আশেপাশে নজর বুলাতে বুলাতে হঠাৎ হকচকিয়ে গেল বিথী! বাহুতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বিহ্বল কণ্ঠে ডেকে উঠলো বান্ধবীকে,

" দোস্ত দেখ দেখ। "

" কি? "

লাজুক প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। বিথী ইশারা করলো রাস্তার ওপাড়ে তাকাতে। ওর কথামতো তাদের বিপরীত দিকে রাস্তার ওপাড়ে তাকালো লাজুক। মুহুর্তের মধ্যেই স্তব্ধ হয়ে গেল সে! অবিশ্বাসের ছোঁয়া চোখেমুখে। রাস্তার ওপাড়ে দাঁড়িয়ে কালো কুচকুচে গাড়িটা। গাড়ির সঙ্গে অলস ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মির্জা তানসীভ শাহ্। পড়নে তার কালো রঙের শার্ট। স্লিভ গুটিয়ে রাখা কনুইয়ে। হাতের শিরা ঔ'দ্ধত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে দৃশ্যমান। চোখে রোদচশমা। মুখে চিকচিক করে চলেছে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। হালকা এলোমেলো মসৃণ চুল। রোদচশমার আড়ালে লুকায়িত চক্ষু জোড়া নিবদ্ধ, হাতে থাকা মোবাইলে। লাজুক অবাক চোখে তাকিয়ে! চোখের তারায় দৃশ্যমান চিত্র আদৌও কি সত্য? নাকি নিছকই এক দিবাস্বপ্ন! বিথী ওর কানের কাছে দুষ্টুমির ছলে ফিসফিসিয়ে উঠলো,

" কিরে সখী! সোয়ামি আজ নিতে আসবে, আগে বলিস নি তো। "

লাজুক অবাকতার রেশ কাটিয়ে নিচু কণ্ঠে বললো,

" ওনার তো এখানে আসার কথা নয়। "

বিথী হেসে উঠলো খলখলিয়ে,

" ওহ্ হো! সারপ্রাইজ? বুঝি বুঝি। "

লাজুক বান্ধবীর দুষ্টুমিতে মন না দিয়ে তাকিয়ে রইলো রাস্তার ওপাড়ে। আজ, এ মুহূর্তে উনি কি করছেন এখানে? ওনার তো আসার কথা নয়। এমন কোনো কথাই হয়নি। এমনকি উনি আগে কখনো আসেননি এখানে। বরং আজ বাবার বাড়ি থেকে এখানে এসেছিল লাজুক। ক্লাস শেষে সরাসরি ফিরে যেতো শ্বশুরবাড়ি। তন্মধ্যে এসব কি?!

" কিরে! এই রোদের মধ্যে কতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখবি সাহেবকে? যা তাড়াতাড়ি। "

সখীকে তাড়া দিলো বিথী।

" টা টা। এনজয়। "

থাম্বস আপ দেখিয়ে চোখ মা'রলো প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটা। হাসিমুখে একটা খালি রিকশা পেয়ে চড়ে বসলো তাতে। হাত নেড়ে বিদায় জানালো ওকে। লাজুক বড় শ্বাস ফেললো। তাকালো রাস্তার ওপাড়ে। এতখানি দূরত্ব সত্ত্বেও চোখে চোখ পড়লো দু'জনার। রোদচশমার আড়ালে লুকায়িত চক্ষু জোড়া নিবদ্ধ হলো ওর অবয়বে। অন্তঃস্থলে কেমন শিরশিরে অনুভূতি হলো। মধ্যখান দিয়ে চলাচলরত গাড়িঘোড়া ওদের মধ্যকার অস্থিরতা দমাতে ব্যর্থ। লাজুক সাবধানী, সচেতন ভঙ্গিতে রাস্তা পাড় হয়ে গেল ওপাড়ে। মোবাইলটা পকেটে রেখে তানসীভ দাঁড়ালো শিরদাঁড়া সোজা রেখে। মুখোমুখি হলো দু'জনে। তানসীভ অপলক তাকিয়ে। একটু একটু করে যেন পড়ে নিচ্ছে বিপরীতে দণ্ডায়মান মেয়েটির অভ্যন্তরীণ সত্ত্বা। মিটিয়ে নিচ্ছে অপরিমেয় চক্ষু তৃষ্ণা। লাজুক সে ভয়ঙ্কর-তৃষ্ণার্ত দৃষ্টির প্রখরতায় আস্তে করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। নম্র কণ্ঠে সালাম দিলো,

" আসসালামু আ'লাইকুম। "

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। "

বিড়বিড়িয়ে জবাব দিলো মানুষটা। চোখেমুখে সে-ই চিরচেনা গাম্ভীর্য। তবুও আজ বাতাসে যেন একটুখানি ভিন্নতার আভাস। লাজুক বলার মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে পেল না। কিংবা হয়তো অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে এমন আড়ষ্টতা। তানসীভ নীরবে এক দায়িত্ববান স্বামীর মতো গাড়ির দরজা খুলে দিলো ওর জন্য। লাজুক একপলক স্বামীর দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। বসলো গাড়ির ভেতরে। দরজাটা বন্ধ করে দিলো তানসীভ। ঘামে ভেজা চুলে একবার হাত বুলিয়ে গাড়ির ওপাশে গেল। ড্রাইভিং সিট দখল করে ঠাস করে বন্ধ করলো দরজা। দ্রুততার সহিত গাড়িটা এগিয়ে গেল। চলে গেল দৃষ্টি সীমার বাইরে। এতক্ষণ যাবত চাপা এক উত্তেজনা বিরাজ করছিল ক্যাম্পাস প্রাঙ্গনে। যা এই মুহুর্তে আকস্মিক বি-স্ফোরিত হলো যেন।

' এই মেয়েটাই তাহলে মির্জা তানসীভ শাহ্ এর বউ? '

' এই সিধা সাদা মেয়েটা কিনা এমন কাণ্ড করে বড়লোক ফাঁ'সিয়ে বিয়ে করলো? '

' পুরুষ মানুষের চরিত্র বোঝা সত্যিই মুশকিল। '

' মেয়েটাকে তো ভালো বলেই জানতাম। নম্র ভদ্র । '

' দেখে তো বেশ শালীন মনে হয় মেয়েটাকে। অথচ ভেতরে ভেতরে এমন অশালীনতা? ছিঃ! '

' এই মেয়েটা কোন ইয়ারে পড়ে রে? '

' নাম মনে হয় লাজুক। '

' ছিঃ! লাজুকের কিনা লাজ শরম নেই। '

' আস্ত এক ** '

বিভ্রান্তিকর, অশালীন বিভিন্ন কথাবার্তায় মজে উঠলো ক্যাম্পাস প্রাঙ্গন। একেকজন একেক ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পেশ করে চলেছে। বাতাসে ভেসে চলেছে ঘৃণা, তাচ্ছিল্যের মিশ্রণ। যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ রইলো মিস্টার অ্যান্ড মিসেস মির্জা।

•

রাত। খোলা জানালা। হালকা হাওয়ায় নৃত্যরত জানালার পর্দা। ডিম লাইটের মৃদু আলোয় ঘরজুড়ে বিরাজমান এক নীরব, নিস্তব্ধ, নান্দনিক সৌন্দর্য! বেডের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে রায়হান। সামনে বালিশের ওপর রাখা ল্যাপটপ। মুখে ক্ষীণ এক রহস্যজনক হাসি। হাতে থাকা ট্রে বিছানায় রাখলো ইফরাত। ট্রেতে রাখা পপকর্ন এবং সফট ড্রিংকস। স্বামীর পাশে বসলো সে। পাশাপাশি, দেহে দেহ ছুঁয়ে বসলো। রায়হান মুভিটা শুরু করলো। কোরিয়ান মুভি। জোম্বির। ইফরাত শুকনো ঢোক গিলে নিলো। আড়চোখে তা খেয়াল করলো মানুষটা। ভেতরে জেগে উঠলো কুটিলতা। মুভি চলছে আপন গতিতে। ইফরাত আড়ষ্টতার সহিত বসলো, স্বামীর সঙ্গে আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে। মুখে পপকর্ন নিয়ে অপ্রসন্ন কণ্ঠে বললো,

" কতদিন পর মুভি নাইটের সুযোগ পেলাম। কোথায় রোমান্টিক কোনো মুভি দেখবে। তা না। ভূতপ্রেতের মুভি শুরু করেছো। "

" বাব্বাহ্! রোমান্টিক মুভির কথা বলছো তুমি? গতবার কি হয়েছিল মনে আছে? অ্যানিম্যাল মুভি দেখতে গিয়ে যা কাণ্ড করলে। "

" ধ্যাৎ। অ্যানিম্যাল কোনো রোমান্টিক মুভি হলো নাকি? খালি নৃ-শংসতা। এর ওপর মুভির প্লট পছন্দ হয়নি আমার। তোমার তো আবার কো-পাকুপি, খু-নাখুনি এসব ছাইপাশ ভাল্লাগে। "

রায়হান নিঃশব্দে হাসলো,

" তা বটে। আই লাভ অ্যাকশন। "

" হুহ্। আই লাভ অ্যাকশন। এখন রাতবিরেতে শুরু করেছো আবার জোম্বি লাভ। "

বিদ্রুপের আভাস মেয়েটির কণ্ঠে। রায়হান হেসে উঠলো। ওকে আশ্বস্ত করতে বললো,

" আরে দেখোই না মুভিটা। পরে ঠিক এনজয় করবে। তুমিও। আমিও। "

শেষের কথাটুকু ফিসফিসিয়ে মিশে গেল হাওয়ায়। খেয়াল করলো না ইফরাত। বেজার মুখে পপকর্ন খেতে খেতে মুভিটা দেখতে লাগলো। ভালোই সময় কাটছিল ভয়ে ভয়ে। আকস্মিক এক ভ'য়ঙ্কর রূপী জোম্বি উপস্থিত হলো পর্দায়। ছ্যাৎ করে উঠলো অন্তর। আঁতকে দ্রুত গতিতে স্বামীর বাহুবন্ধনে বন্দি হলো মেয়েটা। ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে চেহারা। বিরবির করে উঠলো,

" আল্লাহ্ মাফ করেন। "

রায়হান তৎক্ষণাৎ কেমন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। স্ত্রীকে আরো গাঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়ে বললো,

" কি হয়েছে? তুমি ঠিক আছো তো? ভয় লাগছে। "

" হু। "

ক্ষীণ কণ্ঠ মেয়েটির। রায়হান আলতো করে স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। নরম সে স্পর্শ ভেতরকার ভয়টুকু গ্রাস করে নিতে লাগলো। একটু একটু করে চুলে হাত বুলিয়ে চলেছে। আরাম পাচ্ছে মন। আবেশে বুজে আসছে চক্ষু। কিছু সময় বাদে শান্ত হলো ইফরাত। অনিচ্ছুক মনে আস্তে করে সরে যেতে চাইলো স্বামীর বাহুবন্ধন থেকে। তবে চট করে বাঁধা দিলো অপর মানুষটা। ওকে ভালোমতো জড়িয়ে ধরে বললো,

" এভাবেই থাকো। আরেকটা জোম্বি আসবে একটু পর। ভয় পেয়ে যাবে তো। "

ইফরাত ভ্রু কুঁচকে ফেললো। স্বামীর থেকে সরতে গিয়েও সরলো না আর। বরং চুপটি করে মিশে রইলো বুকে। দেখতে লাগলো মুভি। অপেক্ষায় মানুষটার পরবর্তী পদক্ষেপের। সময় গড়াতে লাগলো। একের পর এক দলবেঁধে আসছে জোম্বি। আর গাঢ় থেকে গাঢ় হচ্ছে স্পর্শ। বিভিন্ন বাহানায় ছুঁয়ে চলেছে মানুষটা। ভয় কাটানোর ছল করে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে ঘনিষ্ঠতা। রাত বাড়লো। বাড়লো আবেশ। অবহেলায় বন্ধ হলো ল্যাপটপের স্ক্রিন। পড়ে রইলো বিছানার এক পাশে। আদরে সোহাগে মাখো মাখো এক মুহূর্তে ইফরাত আগলে নিলো স্বামীকে। কপালে চুমু এঁকে মোহিত কণ্ঠে বললো,

" ধান্দাবাজিটা ভালোই রপ্ত করে নিয়েছো। "

চমৎকার হাসলো রায়হান। চোখে চোখ রেখে আরেকটু কাছে এলো। নাকের ডগায় ঠোঁট ছুঁয়ে মৃদু কন্ঠে বললো,

" ধান্দায় নেমে ফলাফল যদি এত তৃপ্তিকর মেলে, তাহলে তা-ই হোক। আমি রাজি। চিরকালের জন্য। "

সুখের ঝলকানি দু'জনের চোখেমুখে। মেয়েটির মুখ হতে ধীরে ধীরে মুছে গেল হাসি। ঠাঁই পেল আরো গভীর, গাঢ় উ'ন্মাদনার ছাপ। দু'টো হৃদয়ের ছায়া তখন আছড়ে পড়ছে ঘরের একাংশে।

•

গভীর, নিস্তব্ধ রাত। ঘরে হালকা আলোর উপস্থিতি। পাশাপাশি শুয়ে রয়েছে দু'জনে। একজনের হাতে বই... অপরজন মগ্ন মোবাইলে। বইয়ের অর্ধেক পাতা সমাপ্ত হলো। মনটা আরো আনচান করে চলেছে আরো পৃষ্ঠা পড়ার জন্য। কাহিনীর সমাপ্তি পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু না। আজকের জন্য এতটুকু যথেষ্ট। দেয়াল ঘড়িতে তাকালো লাজুক। রাত তখন বারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। উঁহু। আর নয়। এবার ঘুমানো উচিত। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বইয়ের সঙ্গত্যাগ করলো সে। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বইটা গিয়ে রাখলো যথাস্থানে। এরপর পা বাড়ালো ওয়াশ রুমে। ফ্রেশ হয়ে, অযু করে ঘরে ফিরে এলো। মুখ মুছে দাঁড়ালো আয়নার সামনে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা সিরাম, ময়েশ্চারাইজার হাতের নাগালে রাখলো। বসলো চেয়ার টেনে। ঘুমের আগে রাত্রিকালীন ত্বকের পরিচর্যা করতে লাগলো মেয়েটা। মাঝেমধ্যে একজোড়া চোখ নিগূঢ়তম উঁকি দিয়ে চলেছে এদিকে। যা অনুধাবন করতে পেরে কেমন শিউরে শিউরে উঠছে অন্তর। কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো। ত্বকের পরিচর্যা সমাপ্ত করে উঠে দাঁড়ালো লাজুক। সিরাম, ময়েশ্চারাইজার যথাস্থানে রেখে দিলো। বড় করে শ্বাস ছাড়লো সে। ঘরের স্বল্প আলোটা নিভিয়ে দিলো এবার। আলো বলতে এখন শুধুমাত্র ডিম লাইট উপস্থিত। লাজুক বিছানায় এগিয়ে গেল। বালিশটা ঠিকঠাক করে শুয়ে পড়লো নিজের জায়গায়। কিছুক্ষণ বাদে তানসীভ এবার মোবাইলটাকে ছুটি দিলো। বিছানা ছেড়ে নেমে এলো সে। পড়নের টিশার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেললো সোফায়। উদোম দেহে ওয়াশ রুমে গেল। লাজুক এমন কাণ্ডে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট হলো। ঘরের এদিক ওদিক এলোমেলো জিনিসপত্র মোটেও পছন্দ নয় তার। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সঙ্গী জুটেছে ঠিক এমনই একজন। শ্বাস ছাড়লো মেয়েটা। সোজা হয়ে শুলো।

কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো তানসীভ। তোয়ালেতে মুখ মুছে সেটাও নামমাত্র ঝুলিয়ে রাখলো ড্রেসিং টেবিলের সামনে থাকা চেয়ারে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্বল্প ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে নিলো। দেহ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে একবার দেখে নিলো আয়নায়। পেশিবহুল পেটানো শরীর তার। শ্যামবর্ণ ত্বক। মাসল ফুলেফেঁপে টনটন করছে। বুকের ওপর কয়েক ফোঁটা পানি জ্বলজ্বল করছে। গালে চমৎকার রূপে ছাঁটাই করা চাপদাড়ি। চোখের তারায় সুগভীর কৃষ্ণগহ্বর। সন্তোষজনক বাঁকা হাসি ছড়িয়ে পড়লো মুখে। নিজ সৌন্দর্যে যথেষ্ট সন্তুষ্ট সে। তানসীভ বিছানায় গিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়লো। যথেষ্ট ডেবে গেল বিছানার ওপাশ। লাজুকের নাকের পাটা ক্ষণে ক্ষণে ফুলেফেঁপে উঠছে। রাতদুপুরে জনৈক ব্যক্তি এ কি নাটক শুরু করেছে? আশ্চর্য!

•

ঘড়ির কাঁটা একের কাছাকাছি। গরুর মাংসের ঝাল ঝাল মশলার ঘ্রাণ ছড়িয়ে রয়েছে রান্নাঘরে। মুরগির রোস্ট তখন প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছে চুলায়। পাশাপাশি রান্নায় ব্যস্ত দুই জা। ইফরাত এবং লাজুক। গৃহকর্মী পলি এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে।

" ভাবী, মাশাআল্লাহ্ কি যে রানতাছেন না আইজ! ঘ্রাণে তো টেহা মুশকিল। "

লাজুক এবং ইফরাত মুচকি হেসে উঠলো। ইফরাত হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,

" সত্যি বলছিস? সবার পছন্দ হবে তো? "

" হইবো মানে? সব্বাই আঙ্গুল চাইটা পুইটা খাইবো দেইহেন। বড় ভাইজান গোপনে চুম্মা না দিয়া বহে। হি হি।"

নিজের মতো করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো পলি। ইফরাত চোখ পাকিয়ে তাকালো।

" চুপ। বেশি বকছিস কিন্তু এবার। "

" বেশি কই কইলাম ভাবী? হাছাই তো কইলাম। তাই না ছোডো ভাবী? "

লাজুক শব্দহীন হেসে দুষ্টু কণ্ঠে বললো,

" পলি, ভাবীকে আর জ্বালাতন করো না তো। দেখো না ভাবী অলরেডি লজ্জায় লাল। ভাইয়া যখন সত্যিই... "

আর বলতে পারলো না লাজুক। ইফরাত থামিয়ে দিলো তৎক্ষণাৎ,

" লাজুক তুমিও? থামবে তোমরা? "

একসাথে হেসে উঠলো লাজুক ও পলি। লজ্জায় লাল টুকটুকে ইফরাত। কোনোমতে বলতে সক্ষম হলো,

" হাসছো তো। হাসো। সময় আমার-ও আসবে। তখন ঠিক শোধ তুলবো। "

কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে থমকে গেল লাজুক। তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মুখ হতে মিলিয়ে গেল হাসি। দ্রুততর হলো শ্বাস প্রশ্বাস। মাংসের পাত্রে কম্পিত হাতে চামচ নাড়ালো একবার। ইফরাত প্রসন্ন হাসলো। ভালো জব্দ হয়েছে দেবর পত্নী। এবার ঠিক আছে।‌ হিসাব বরাবর।

রান্নাবান্না করতে করতে কখন যে ঘড়ির কাঁটা দুই ছুঁইছুঁই হলো, টের পেল না ব্যস্ত রমণীরা। হঠাৎ নীরবতা ভেদ করে কলিংবেল বেজে উঠলো। আঁতকে উঠলো পলি।

" এই রে। এত জলদি আইয়া পড়ছে! "

বিড়বিড় করে চলেছে মেয়েটা। ইফরাত এবং লাজুক একে অপরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে বেরিয়ে এলো রান্নাঘর হতে। ইফরাত এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। লাজুক দুরুদুরু বুকে দাঁড়িয়ে লিভিংরুমে। দরজা খুলে গেল। দেখা মিললো আগত তিন অতিথির।

" আসসালামু আ'লাইকুম। "

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। " ভারিক্কি সে মহিলা কণ্ঠস্বর।

" আসুন ফুফু। কেমন আছেন আপনারা সবাই? আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো? "

তন্বী চঞ্চল কণ্ঠে বলে উঠলো,

" আমরা ভালো আছি ভাবী। আসতে তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। তোমরা কেমন আছো? নতুন ভাবী কোথায়? বাড়িতে নেই? "

তন্বী আরো কিছু বলার আগেই থতমত খেল মায়ের তীর্যক চাহনিতে। মিইয়ে গেল মেয়েটা। ইফরাত তাদের সাদরে স্বাগত জানালো। লিভিংরুমে লাজুক নম্র কণ্ঠে সালাম দিলো আগত অতিথিদের,

" আসসালামু আ'লাইকুম। কেমন আছেন ফুফু? "

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। ভালো আছি। তুমি? "

" জ্বি আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি ফুফু। আপনারা বসুন না। আমি আসছি। "

দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল লাজুক। ইফরাত বসতে দিলো অতিথিদের। লতা বেগম অভিজ্ঞ, তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে নতুন বউ লাজুকের প্রস্থান পথে। একটুখানি সময় বাদেই লাজুক ফিরে এলো। সাথে পলি। দুজনের হাতে ট্রে। তাতে অতিথিদের জন্য নাস্তা, ঠাণ্ডা শরবত, পানি। দু'জনে ট্রে রাখলো টেবিলের ওপর। পলি লম্বা এক সালাম দিলো। তুহিন হালকা হেসে উঠলো,

" বাব্বাহ! এ তো দেখছি বিশাল আয়োজন। এত কষ্ট করার প্রয়োজন ছিল না ভাবী'স। "

ইফরাত হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,

" ভাই সাহেব, বিশাল আয়োজনের এ তো সামান্য টিজার মাত্র। পিকচার আভি বাকি হ্যায়। "

ইফরাতের কথাটা শেষের দিকে নিষ্প্রাণ হয়ে এলো, গম্ভীর লতা বেগমের দৃষ্টিতে নতজানু হয়ে। তিনি এক গ্লাস পানি খেলেন শুধু। জিজ্ঞেস করলেন,

" বাকিরা কোথায়? ভাইজান? "

ইফরাত ও লাজুক দৃষ্টি বিনিময় করলো। লাজুক আস্তে করে বললো,

" সবাই কাজে ব্যস্ত ফুফু। ইনশাআল্লাহ্ সন্ধ্যার মধ্যে চলে আসবে। "

" দাওয়াত করে এনে এভাবে ছোট করার প্রয়োজন ছিল না। "

লতা বেগমের কণ্ঠে অসন্তোষের ছোঁয়া। ইফরাত তড়িঘড়ি করে বললো,

" আব্বা বিকেলের মধ্যেই চলে আসবেন। আপনি চলুন ফুফু। ফ্রেশ হয়ে নিন। এরপর আমরা সবাই ইনশাআল্লাহ্ একসাথে লাঞ্চ করবো। "

সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন লতা বেগম। রাশভারী কণ্ঠে জানতে চাইলেন,

" রুমটা ঠিকমতো গোছানো হয়েছে তো? "

" জ্বি ফুফু। "

" রুমে যাচ্ছি আমি। ফিরে এসে তার সাথে দেখা করবো।"

ইফরাত আস্তে করে ইতিবাচক মাথা নাড়লো। উনি এবার ছেলে-মেয়ের দিকে তাকালেন। মায়ের নীরব ভাষা বুঝে নিলো ওরা। তন্বী দ্রুত বলে উঠলো,

" হ্যাঁ আম্মু। আমরাও যাচ্ছি। ভাইয়া, চলো। "

লতা বেগমের পিছুপিছু সেখান থেকে বিদায় নিলো তুহিন এবং তন্বী। দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল তারা। পলি মুখটা ভেংচি কেটে দিলো। লাজুক এবং ইফরাত একে অপরের দিকে তাকিয়ে। গোপনে লুকায়িত নিঃশ্বাসটা অবশেষে বেরিয়ে এলো। ঘরের তাপমাত্রা ইতিমধ্যে উর্দ্ধমুখী। কেমন গুমোট ভাব ছড়িয়ে অন্দরমহলে।

•

বিকেলের আলোটা আজ বড় আদুরে। রৌদ্র ও ছায়ার মাঝামাঝি এক মিষ্টি প্রহর। শহরের কোলাহল তখন প্রায় নির্জীব। ছাদের একপাশে সারি সারি টব। মানিপ্ল্যান্ট, গোলাপ, জবা, তুলসী, নয়নতারা। কোথাও ছোট ছোট চারা, কোথাও ফুল ফোটা ডাল। ছাদের অপরপাশ জুড়ে রয়েছে বেশকিছু মাঝারি আকৃতির ড্রাম। তাতে রয়েছে লাউ, পেয়ারা, আতা, কাঁচামরিচ, তেঁতুল, ড্রাগন ফল প্রমুখ গাছ। পানির ঝাঁঝরি হাতে দাঁড়িয়ে লাজুক। একে একে আদরে, যত্নে পানি দিচ্ছে গাছপালায়। ধুয়ে দিচ্ছে ধুলোবালি। শুষে নিচ্ছে রৌদ্রপ্ত যন্ত্রনা। তন্বী ঘুরে ঘুরে ছাদটা দেখছে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে উঠলো,

" ভাবী তোমাদের ছাদটা কিন্তু জাস্ট ওয়াও! কত সুন্দর গাছপালা! খোলামেলা স্পেস। আমার তো বেশ লাগছে। "

লাজুক মুচকি হাসলো প্রশংসায়। ইফরাত পাশেই রয়েছে। মুখে হাসি। তন্বী বলে চলেছে,

" গতবার যখন এসেছিলাম গাছগুলো প্রায় ম রে গিয়েছিল। কেমন প্রাণহীন লাগছিল। এখন দেখতে বেশ লাগছে। "

" অল ক্রেডিট গো'স টু লাজুক। ও যেভাবে গাছগুলোর যত্ন নেয় যেন এরা সব ছোট বাচ্চা। এত আদরযত্ন পেলে গাছগুলো ঠিকমতো বেড়ে উঠবে না তো আর যাবে কোথায়, বলো। "

লাজুক নরম স্বরে বললো,

" আমি তো উছিলা মাত্র ভাবী। সবই পরম করুণাময় আল্লাহ্'র দান। "

" তা বটে। "

কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেল। হঠাৎ তন্বী কিচিরমিচির করে উঠলো,

" এই ভাবীরা। কাল কিন্তু তোমরা কোনো টাইট স্ক্যাজিউল রাখবে না। একসাথে বের হবো আমরা। ঘুরতে যাবো। "

ইফরাত উৎসুক হয়ে উঠলো।

" তাই? তা কোথায় যাবে বলো তো। "

গাছে পানি দেয়া সমাপ্ত হয়েছে। ছাদের একাংশে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তিন রমণী। নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। এই হাসি, এই নির্ভার বিকেলের মোহ হতে কিছুটা দূরত্বে ভিন্ন এক দৃশ্যপট। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে একটা কালো রঙের গাড়ি। গাড়ির কাঁচ কিছুটা নামানো। ভেতরে বসে রয়েছে এক ব্যক্তি। মুখটা পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। ছায়ায় ঢাকা। দৃষ্টি তার তীক্ষ্ণ, স্থির। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ' গুলবাহার মঞ্জিল ' এর ছাদে। আলাপচারিতায় ব্যস্ত তিন ললনার মধ্যে তার দৃষ্টি স্থির শুধু একজনাতে। লাজুকের লজ্জালু হাসি, তন্বীর চঞ্চলতা নাকি ইফরাতের উপস্থিতি! কার ওপর নিবদ্ধ এই অজ্ঞাত দৃষ্টি! জানা মুশকিল। লোকটির চোখে দুর্বোধ্য অন্ধকার। কেঁপে কেঁপে উঠছে কালচে ঠোঁট। অচেনা সে দৃষ্টির কারাগারে বন্দিনী তিন ললনা। বেখবর এসব সম্পর্কে। বাতাসে ধীরে ধীরে নেমে এলো শীতলতা। মনের মধ্যে কেমন অনুভূতি হচ্ছে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে ভিন্ন কিছুর। লাজুক আড্ডা থেকে মনোযোগ সরিয়ে আশপাশে তাকালো। এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করে সন্দেহজনক কিছু মিললো না। দূরের রাস্তা, পথচারীদের কোলাহল সবটাই পূর্বের ন্যায়। আস্তে করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। মনোনিবেশ করলো আড্ডায়। তবে ধীরস্থির ভঙ্গিতে আগের জায়গা থেকে সরে গিয়ে কিছুটা অন্যপাশে দাঁড়ালো। অদূরে বাড়ির বাইরে থাকা গাড়িটা তখনো দাঁড়িয়ে। তাকিয়ে এ বাড়ির ছাদে। অপেক্ষায় দুর্লভ কিছু দখল করার।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন