#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[৭]
সন্ধ্যার নরম আলো জানালার ফাঁক গলিয়ে প্রবেশ করছে ঘরে। হালকা ওষুধের গন্ধ এবং অবিরাম ক্লান্তি ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরের আনাচে কানাচে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছেন মিনারা বেগম। দুর্বল শরীর, চলাফেরার শক্তি ক্ষীণ। অসুস্থতার ছাপ বসে গিয়েছে চোখেমুখে। নিষ্প্রাণ চোখের মণি। তবুও এক নিঃস্বার্থ মমতার ছোঁয়া চোখেমুখে। কিছুক্ষণ বাদে দরজায় হালকা কড়া নাড়ার শব্দ। ভেতরে প্রবেশ করলো লাজুক। হাতে ট্রে। তাতে গরমাগরম স্যুপ, চামচ, পানির গ্লাস। মিনারা বেগমের উল্টো পাশে বসলো মেয়েটা। নম্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
" কেমন আছেন মা? "
" ভা লো। "
থেমে থেমে ভেসে এলো শব্দটি। কথারা যেন জড়িয়ে যাচ্ছে কণ্ঠনালী। লাজুক মায়াবী চোখে তাকিয়ে রইলো। শাশুড়ি মায়ের এমন দুরবস্থা যতবার দেখে ততবার ই রবের নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করে। মায়ের এমন অবস্থা সহ্য করার মতো নয় যে। এভাবে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়, জানা নেই ওর। লাজুক স্যুপের বাটিতে তাকিয়ে বললো,
" আপনার জন্য স্যুপ এনেছি মা। "
" বড় বৌ-মা কোথা-য়? "
ক্ষীণ কণ্ঠে সামান্য এক প্রশ্ন। তবুও এর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারলো লাজুক। এই ছোট-বড় দায়িত্বগুলো এতকাল তো বড় ভাবীই সামলে এসেছে। আজ নাহয় ভিন্ন কিছু হোক।
" আপনি অনুমতি দিলে আমি.. খাইয়ে দিই মা? "
আকুল হয়ে তাকিয়ে লাজুক। মিনারা বেগম একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ধীরে ধীরে চোখে এসে জমলো অশ্রু। আল্লাহ্ জীবদ্দশায় আর কত পরনির্ভরশীল করবেন তাকে? এই পরনির্ভরশীলতার বোঝা দিনকে দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে যে। এতকিছুর ঋণ কি করে শোধ করবেন উনি! শাশুড়ি মায়ের দ্বিধান্বিত অবস্থাটা ঠিক বুঝতে পারলো লাজুক। তাই তো একদম স্বাভাবিক, চঞ্চল কণ্ঠে বলে উঠলো,
" স্যুপ ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে মা। হা করুন তো। আমি খাইয়ে দিচ্ছি। "
ট্রে টা পাশে রেখে মা'কে আস্তে করে ধরলো লাজুক। সাবধানী, সচেতন ভঙ্গিতে ওনাকে সোজা হয়ে বসতে সাহায্য করলো। পিঠের পেছনে লম্বা করে দিয়ে দিলো বালিশ। মিনারা বেগম আরাম করে বসেছেন এটা নিশ্চিত করে, ওনার বিপরীত দিকে বসলো লাজুক। ট্রে রাখলো কোলের ওপর। চামচে স্যুপ নিয়ে হালকা ফুঁ দিলো। সহনীয় তাপমাত্রায় এলে স্যুপের চামচ এগিয়ে দিলো সামনে। মিনারা বেগম কেমন কুণ্ঠিত হয়ে বসে আছেন। অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে মনে। তবে লাজুক একদম স্বাভাবিক। যেন এই দায়িত্ব বহুকাল ধরে সে-ই পালন করে এসেছে। মেয়ে হয়ে যত্ন নিয়েছে মায়ের। লাজুক ইশারায় হা করতে বললো। শাশুড়ি মা হা করলেন। স্যুপ খাইয়ে দিলো মেয়েটা। গরম স্যুপ খাইয়ে দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে ঘরের হালচাল বলতে লাগলো। দেশে চলমান অবস্থা বলতে লাগলো। মা যেন আর একঘেয়ে অবস্থায় না থাকেন সেজন্য সামান্য চেষ্টা করতে লাগলো। মিনারা বেগম অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এই মেয়েটাই ওনার পাগলাটে, জেদী ছেলেটার বউ? দু'জনের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক। আগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেমন শিউরে উঠলেন উনি। চোখের কোণে জমলো অশ্রু। লাজুক তা লক্ষ্য করলো। ওড়নার কোণ দিয়ে আলতো হাতে মুছে দিলো অশ্রুবিন্দু। আশ্বাসের কণ্ঠে বললো,
" ইনশাআল্লাহ্ আপনি ঠিক হয়ে যাবেন, মা। আল্লাহ্ আছেন তো। "
ইতিবাচক চোখের পলক ফেললেন তিনি। আরো একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। সযত্নে তা মুছে দিলো লাজুক। খাইয়ে দিতে লাগলো স্যুপ। লাজুকের আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ, মমতা ওনাকে ছুঁয়ে গেল হৃদয়ের গহীন অবধি। মা'কে খাওয়ানো শেষে পানি খাইয়ে দিলো লাজুক। মুখ মুছিয়ে দিলো ছোট মোলায়েম রুমালে। ট্রে টা রাখলো একপাশে।
" আপনি কি শোবেন মা? নাকি আরেকটু বসবেন? "
কিছুটা সময় অতিবাহিত হলো। মায়া মায়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন মিনারা বেগম। লাজুক শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ধীরে ধীরে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠলেন উনি,
" কাল আ-সবে তু মি...? "
ছোট্ট এক প্রশ্ন। শিশুসুলভ মায়াবী আবদার যেন। কে জানে কি হলো। হঠাৎই চোখের কিনারে অশ্রু হাজির হলো মেয়েটার। চোখে অশ্রু, ঠোঁটে হাসি। ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো সে। মিনারা বেগম দুর্বল হাসি উপহার দিলেন। তাদের অগোচরে দরজায় তখন দাঁড়িয়ে লতা বেগম। তাকিয়ে শাশুড়ি-বৌমা যুগলের দিকে। অভিব্যক্তি বোঝা দুস্কর।
•
পড়ন্ত বিকেলের আলোয় কোলাহলে মুখরিত টিএসসি চত্বর। চারপাশে রঙিন ভীড়। ছেলে-মেয়েদের হাসি, আড্ডা, খুনসুটিতে মেতে রয়েছে টিএসসি। হরেক রকমের খাবারের দোকানে উপচেপড়া ভীড়। লোভনীয়, মুখরোচক ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। লাজুক, ইফরাত, তন্বী তিন ললনা বসে রয়েছে একটা খাবারের স্টলে। কাঠের বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে তারা। হাতে গরম গরম চিকেন মোমোর হাফপ্লেট। তন্বী লোভনীয় ভঙ্গিতে মোমো খাচ্ছে আর মুখ দিয়ে তৃপ্তিকর বিভিন্ন শব্দ করছে।
" উম্! কি মজা! "
লাজুক এবং ইফরাত একে অপরের দিকে তাকিয়ে শব্দহীন হেসে উঠলো।
" ভাবী আরেক প্লেট অর্ডার দাও না। এই মোমো ওয়ালা মামার মোমো জাস্ট ওয়াও। "
ডান হাতে উড়ন্ত চুমুর ভঙ্গিমা করলো সে। লাজুক মুচকি হেসে বললো,
" আস্তে ধীরে খাও তন্বী। মোমো পালিয়ে যাচ্ছে না তো। "
ইফরাত হেসে বললো,
" এক কেন? আরো তিন প্লেট অর্ডার দিচ্ছি। তুমি একা খাবে বুঝি? আমরাও সাথে আছি তো। "
" একদম। "
সহমত পোষণ করলো লাজুক। হাত বাড়িয়ে ডেকে উঠলো দোকানদারকে,
" মামা, আরো তিন প্লেট মোমো। "
" দিতাছি। " ব্যস্ত কণ্ঠে সাড়া দিলো দোকানদার।
কিছুক্ষণ বাদে আরো তিন প্লেট মোমো এলো। নিজেদের মতো করে মোমো ভোজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো তিন রমণী। খেতে খেতে ইফরাত বলে উঠলো,
" জলদি খাও ননদিনী তন্বী। শুনেছি এখানকার ফুচকা নাকি খুব টেস্টি। সেটাও ট্রাই করতে হবে তো। "
" হ্যাঁ হ্যাঁ। খাচ্ছি তো। "
মোমো পর্ব সমাপ্ত হয়েছে কিছুক্ষণ পূর্বে। পাশাপাশি কথা বলতে বলতে হেঁটে চলেছে তিনজন। লাজুক হালকা হেসে চারপাশে তাকাল। চা স্টল হতে আগত ধোঁয়া, ফুচকার টক ঝাল সুগন্ধ। এক তরুণের সুমধুর গিটার বাজানোর শব্দ। সব মিলিয়ে সে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। আজকের বিকেলটা নিজেদের মতো করে উপভোগ করতে লাগলো তিনজন। তারা ফুচকা খেল। ঝালমুড়ির তীব্র ঝালে চোখে পানি চলে আসার মতো অবস্থা হলো। ঝাল থেকে মুক্তি পেতে আইসক্রিম খেয়ে মুখ মাখো মাখো দুরবস্থা। ইফরাতের ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা আইসক্রিম দেখে হেসে উঠলো তন্বী। লাজুক মুচকি হেসে রুমাল এগিয়ে দিলো। রুমালটা হাতে নিলো ইফরাত।
" থ্যাংকস লাজুক। "
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো ইফরাত। আলতো করে মুছে নিলো ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা আইসক্রিম। খাওয়া-দাওয়া পর্ব সেরে তিনজন ঘুরে বেড়াতে লাগলো আশেপাশে। গাছতলায় ফাঁকা একটা জায়গা পেয়ে দ্রুত দখল করে নিলো ওরা। পড়ন্ত সে বিকেলের আহ্লাদী আলোয়, তন্বী বেশকিছু সেলফি তুলে নিলো। জমা হলো স্মৃতির পাতায়। তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে এক অচেনা ব্যক্তি। কালো পোশাকে আবৃত সম্পূর্ণ দেহ। ক্যাপ এবং রোদচশমার আড়ালে লুকায়িত মুখ। প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা হাত। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রয়েছে এদিকে। তিন ললনার মধ্যে একজনের ওপর স্থির সে চাহনি। দূর থেকেই সে তীক্ষ্ণতা যেন ঝ'লসে দিচ্ছে ললনার সুশ্রী অবয়ব। বাতাসে তখন ভেসে বেড়াচ্ছে অদ্ভুতুড়ে এক হিসাব।
•
সকালের মিঠে রোদ উঁকি দিচ্ছে জানালার ফাঁক দিয়ে। বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা ব্রেকফাস্ট শেষে ফিরে গিয়েছে ঘরে। এখন খেতে ব্যস্ত তরুণ প্রজন্ম। একে অপরের সাথে টুকিটাকি আলাপণে ব্যস্ত। শুধুমাত্র ব্যতিক্রম একজন। এঁটো হাতে টেবিল থেকে একটুখানি দূরে দাঁড়িয়ে সে। বাঁ হাতে কানে ঠেকিয়ে রাখা স্মার্টফোন। অপরদিকের মানুষটিকে সকাল সকাল আচ্ছা মতো ঝেড়ে চলেছে। কণ্ঠস্বর বেশ রূঢ়। লাজুক আড়চোখে একবার তাকালো সেদিকে। আস্তে ধীরে দৃষ্টি আটকে গেল মানুষটির সুদর্শন অবয়বে। পড়নে তার নেভি ব্লু ভার্টিক্যাল স্ট্রাইপ ক্যাজুয়াল শার্ট। বলিষ্ঠ দেহে সাদা স্ট্রাইপ ফুটে উঠেছে বেশ। শার্টের বোতামগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা। ভেতর হতে দৃশ্যমান স্লিভলেস সাদা টিশার্ট। শার্টের স্লিভ গুটিয়ে রাখা কনুইয়ে। রাগের বশে উন্মুক্ত ত্বকে দৃশ্যমান রগ। বুকের কাছে টিশার্টের ফাঁকে গুঁজে রাখা ক্লাসিক কালো ওয়েফেয়ারার। কপালে এসে আদুরে ভঙ্গিতে পড়ে রয়েছে কিছু ছোট চুল। বকাঝকার তালে অ্যাডমস অ্যাপল ওঠানামা করে চলেছে। রক্তিম রূপ ধারণ করছে মুখ। আনমনে সেথায় তাকিয়ে রইলো লাজুক। মানুষটার এই ক্রু'দ্ধ, পৌরুষদীপ্ত রূপটি অদ্ভুত এক মায়ায় জড়িয়ে নিলো তাকে। বুকের ভেতরে অবাধ্য ধুকপুকানির তীব্র ঝঙ্কার। আর'ক্ত গাল। মানুষটা ফোনে কথা বলতে বলতে একটুখানি এদিকে ফিরলো। তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে যাওয়ার তীব্র লজ্জা-ভয়ে, লাজুক মেয়েটা চুপিচুপি দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। সকলের অগোচরে।
তানসীভ কিছুক্ষণ পর গরম মেজাজে ফিরে এলো। বসলো তুহিনের পাশের চেয়ারে। ওকে দেখেই তুহিনের মুখ থেকে হাসিটা একটুখানি সরে গেল। সকাল সকাল অহেতুক ঝাড়ি খেতে ইচ্ছুক নয় সে।
সবাই যার যার মতো করে খাওয়া শেষ করলো। এসে পৌঁছালো লিভিংরুমে। সোফায় রাখা টোট ব্যাগে মোবাইলটা রাখলো লাজুক। আটকে নিলো চেইন। তুহিন বলে উঠলো,
" ভার্সিটি যাচ্ছেন ভাবী? "
" জ্বি ভাইয়া। "
কাঁধে ব্যাগ জড়িয়ে মিহি কণ্ঠে বললো লাজুক।
" আমিও বের হচ্ছি। ওদিকটায় যাবো। চলুন না। আপনাকে ড্রপ করে দিচ্ছি। "
অনাকাঙ্ক্ষিত এমন প্রস্তাবে কেমন মিইয়ে গেল মেয়েটা। ছেলে মানুষের সঙ্গ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকে সে। অভ্যস্ত নয়। এছাড়া তুহিন তার মাহরাম পুরুষ নয়। কেমন দ্বিধা হচ্ছে অন্তরে। কিন্তু নতুন অতিথি মানুষ। ভদ্রভাবে কিভাবে তাকে এড়ানো যায় এটাই ভাবছিল মেয়েটা। সহসা কানে এলো মেঘ-গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
" প্রয়োজন নেই। "
উপস্থিত তরুণ সদস্যরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে!
" ভাইয়া, আ মি... "
" যা। "
অনুষ্ণ সে কণ্ঠস্বরে বোকা হেসে উঠলো তুহিন,
" ওকেহ। আমি বাদ। টা টা। "
ইফরাত ঠোঁট চেপে হাসি লুকালো। রায়হান হাসির দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। তন্বী গোপনে থাম্বস আপ দেখালো ভাইকে। তুহিন বোকা হাসলো।
" চলো। "
একটামাত্র শব্দ। আর কোনো শব্দ ব্যয় করতে নারাজ সে। বড় বড় কদম ফেলে বাড়ি হতে বেরিয়ে গেল মির্জা তানসীভ শাহ্। লাজুক অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। গম্ভীর শব্দটি কাকে উদ্দেশ্য করে ছোঁড়া হয়েছে, বুঝতে অসুবিধা হলো না উপস্থিত কারোর। সে সহচরদের দিকে ফিরে তাকালো কোনোমতে। সবাই একযোগে হেসে উঠলো। লজ্জালু মেয়েটা কেমন কুঁকড়ে গেল। গুটিয়ে নিলো নিজেকে। এরপর এক মুহুর্ত-ও বিলম্ব না করে, দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল স্বামীর পিছুপিছু। কৌতুকময় হাসির রেশ তখনো বিদ্যমান এ ঘরে।
---
ব্যস্ত সড়ক। গাড়ি চলছে আপন গতিতে। লাজুকের দৃষ্টি নিবদ্ধ গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে। দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং সামলাচ্ছে মানুষটা। রাস্তার দু'পাশে পথচারীদের চলাচল, মাঝেমধ্যে ছোট-বড় গাড়ির দমবন্ধকর যানজট, কর্মজীবী ব্যক্তিদের তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে চড়া। জাগতিক সবকিছু ছাপিয়ে গাড়ির ভেতরে তখন নিরবতার ভারী আস্তরণ। রাস্তার ডান দিকে মোড় ঘুরিয়ে তানসীভ একটুখানি চোরা দৃষ্টিতে তাকালো বধূর দিকে। লাজুকের পড়নে সালোয়ার কামিজ। কামিজটি গাঢ় টিল ব্লু রঙের লন এর তৈরি। কামিজের গলার অংশ এবং সামনের প্যানেলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও রঙিন সুতোর এমব্রয়ডারি করা। যাতে দেখা যাচ্ছে লাল, গোলাপি এবং হলুদ রঙের ফ্লোরাল ও জ্যামিতিক নকশার আধিক্য। কামিজের স্লিভেও একই ধরনের এমব্রয়ডারির কাজ। কাঁধে জড়িয়ে রাখা পেস্ট প্রিন্টেড লন ওড়না। ওড়নাটিতে কামিজের এমব্রয়ডারির সাথে মিল রেখে উজ্জ্বল রঙের প্রিন্ট করা। পড়নে লেস লাগানো সাদা পালাজো। ম্যাচিং লং টিল ব্লু রঙা হিজাবে আবৃত দেহের উপরিভাগ। বরাবরের ন্যায় শালীন পোশাক আবৃত মেয়েটি। সূর্যের আলোয় চোখেমুখে হালকা ক্লান্তি। কপালে লেপ্টে থাকা বিন্দু বিন্দু চিকচিকে ঘাম। ঠোঁটের কিনারে রোদের তাপে ঝিলমিল করতে থাকা ঘাম বিন্দুটা বড় বেহায়া ভঙ্গিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছে। মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে পার্থিব সকল কিছু হতে। তানসীভ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। চালাতে থাকে গাড়ি। মনোযোগ দিতে চায় সামনের পিচঢালা পথে। কিন্তু শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। খানিক বাদে আবার একটুখানি ফিরে তাকায়। অবলোকন করতে থাকে এই সরল, শালীন, লুকায়িত সৌন্দর্য! যার ওপর একমাত্র অধিকার শুধুই তার। বুকের ভেতর অচেনা, অদম্য এক অনুভুতি কড়া নেড়ে ওঠে। বড় করে শ্বাস ছাড়ে মানুষটা। স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে বসে হাত। মস্তিস্ক তখন এলোমেলো প্রায়। অপরপাশের মানুষটার এই আকস্মিক অস্থিরতা টের পায় লাজুক। ব্যাগ হতে বের করে পানির বোতল। এগিয়ে দেয় ওর দিকে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
" আপনি ঠিক আছেন? "
তপ্ত শ্বাস ফেলে ইতিবাচক মাথা নাড়লো তানসীভ। হাতের মুঠো আরো কঠিন হলো। পানির বোতলটা নিলো না সে। লাজুক আস্তে করে এগিয়ে ধরা বোতলটা ফেরত নিলো। রাখলো ব্যাগের ভেতরে। দৃষ্টি পুনরায় নিবদ্ধ করলো গাড়ির বাইরে। অস্থির এক মিষ্টি যন্ত্রনা তাকেও যে কুপোকাত করে ফেলেছে। গরম হয়ে উঠছে গাল। কেঁপে কেঁপে উঠছে চোখের পাতা। জোরপূর্বক নিজেকে সামলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত সে। উহু। পাশাপাশি বসে থাকা দু'টো হৃদয় তখন ব্যস্ত, হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুরের মূর্ছনা দমাতে।
•
সন্ধ্যার ভূতুড়ে আঁধারে তলিয়ে সরু গলিটা। আধখোলা টিনের শাটার। ভেতরে একপাশে পুরনো গাড়ির বডি। অন্যপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যন্ত্রপাতি। মাঝ বরাবর একটা মাঝারি আকৃতির ক্যারাম বোর্ড। বোর্ডের ঠিক ওপর দিকে ঝুলছে এক ম্লান বাল্ব। বাল্বের হলদে আলোয় গুমোট উত্তেজনা বিরাজমান। ক্যারামের চারদিকে মগ্ন চারজন। সিগারেটের বিদঘুটে ধোঁয়া থমকে রয়েছে বাতাসে। কারো মুখে কথা নেই। মাঝেমধ্যে শুধু ভেসে আসছে ঠক করে স্ট্রাইকারে আঘাতের শব্দ। দাঁড়িশূন্য গালে হাত বুলিয়ে ত্রিশোর্ধ লোকটা অসন্তুষ্ট স্বরে বলে উঠলো,
" এলাকাটা আমাদের। "
স্ট্রাইকারের আঘাতে ফট করে ওপাশের গর্তে, কালো গুটিটা ফেলে দিলো তানসীভ। চোখ তুলে তাকালো লোকটির দিকে। লৌহ কঠিন সে চাহনি। মন্দ্রস্বরে বললো,
" ছিল। "
" তুই এভাবে দখল করতে পারিস না। "
চেয়ারে বাঁকাভাবে দেহটা আরেকটু আরাম করে এলিয়ে দিলো তানসীভ। সুঠাম দেহটা বড় আকর্ষক ভঙ্গিতে চেয়ারে জায়গা করে নিলো। ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেটের ধোঁয়া। মিশে গেল বাতাসে। বেপরোয়া স্বর জানান দিলো,
" সময়ের সঙ্গে সব বদলে যায় মোহন। দখলদার-ও। "
" সবটা এত সহজ না। "
তানসীভের ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসি। ধীরস্থির ভঙ্গিতে ঝুঁকে এলো ক্যারামের দিকে। গাঢ় টোকায় প্রতিপক্ষের গর্তে ফেলে দিলো আরেকটা গুটি। মোহন নামের লোকটা কুটিল হেসে উঠলো,
" খেলাটা ভালোই খেলিস তুই। "
ঠোঁটের কোণে এবার আক্রমণাত্মক ভাব।
" নতুন বিয়ে করেছিস। কোথায় খাবিদাবি, ঘুরবি ফিরবি। অমন সে* বউকে দিনরাত ***। তা না ত্... "
আর একটা বর্ণ-ও বের হলো না মুখ হতে। আকস্মিক কোথা থেকে ধেয়ে এলো বিধ্বংসী এক ঝড়। চোখের পলকে ক্যারাম বোর্ডে আছড়ে পড়লো মাথাটা। বিভৎস এক শব্দে মুখ হতে গলগলিয়ে বের হলো লাল র"ক্ত। কেঁপে উঠলো বোর্ড। এদিক ওদিক ছিটকে পড়লো সাদাকালো গুটি।
" কু** বাচ্চা। "
ভ'য়ঙ্কর এক দানব যেন ভর করেছে দেহে। চোখের মণিতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। মুহুর্তের মধ্যেই মাথাটা ধরে পুনরায় আছড়ে দিলো ক্যারামে। আটার গুঁড়ো, র"ক্তে মাখামাখি হলো ক্যারাম। তানসীভের চোখে তখন বিপজ্জনক উন্মত্ততা। চোয়াল শক্ত, চোখে র ক্ত পিপাসা।
" তোর এতবড় কলিজা তুই আমার... "
পেট বরাবর জোরসে এক লাথ। লোকটি ছিটকে পড়লো অদূরে। মুহুর্তের মধ্যেই পরিবেশ বদলে গেল। এতক্ষণের চাপা উত্তেজনা যেন এবার ধ্বং'সক রূপ ধারণ করলো। দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হলো আঘাত, পাল্টা আঘাত। ঘু'ষি, লা'থি, আর্তনাদ। গ্যারেজের নীরবতা ভেঙে চুরমার। তানসীভের এক ঘুষিতে একজন আছড়ে পড়লো জমিনে। আরেকজনের বুক বরাবর লাথ। মা'রামারি চলাকালীন পেছন হতে আকস্মিক কাপুরুষের ন্যায় আঘাত করে উঠলো একজন। তাকে প্রতিহত করতে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হলো ডান হাত। হাতটা ঝট করে ঝাড়া দিয়ে উঠলো তানসীভ। যন্ত্রনায় ক্ষীণ কেঁপে উঠলো ঠোঁট। তবুও চোখের তারায় ঘোর বিপদের হাতছানি। সপাটে আঘাত করলো সে লোকটিকে। একের পর এক আঘাত। পরিস্থিতি হাতের নাগালে চলে গেল। তা অনুধাবন করে জড়োসড়ো হলো প্রতিপক্ষ।
" দেখে নেবো তোদের। "
বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে হুমকি বার্তা। লোকগুলো এই বলে তৎক্ষণাৎ কেমন তড়িঘড়ি করে পালিয়ে গেল। তানসীভ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। হাতে আঘাতের ছাপ। চোখের কালো গহ্বরে আজ অগ্নিশিখা। তৃষ্ণার্ত শিকারীর চোখে তাকিয়ে লোকগুলোর গমন পথে। বুকের পাটা ফুঁসছে ব্যর্থ আ'ক্রোশে। হাতের মুঠো শিথিল। আশপাশের অবস্থা এলোমেলো। যেন ছোটোখাটো এক ধ্বং-সস্তূপ। দলের ছেলেগুলো ছুটে এলো তানসীভের কাছে। জানতে চাইলো তার হালচাল। তানসীভ জবাবে কিচ্ছুটি বললো না। শার্টের কলারটা হালকা ছড়িয়ে ফুসফুসে টেনে নিলো উত্তপ্ত বাতাস। ঘাড়টা ডানে বামে ঘুরিয়ে শান্ত করতে চাইলো নিজেকে। ছেলেগুলো ওর দিকে তাকিয়ে। বিনা বাক্যব্যয়ে তানসীভ এবার বেরিয়ে গেল গ্যারেজ হতে। চোখের পলকে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল লম্বাটে অবয়বটি।
•
গভীর হয়েছে রাত। খোলা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে লাজুক। হাতে মোবাইল। কানে গুঁজে রাখা ইয়ারফোন। সুমিষ্ট কণ্ঠে ' সূরা আর রহমান ' তেলাওয়াত শুনছে সে। অকারণেই মনটা আজ বড় উদাস। কিছুই ভালো লাগছে না। বইয়ের পাতাও আজ মনোযোগ কাড়তে ব্যর্থ। মেয়েটা একমনে তেলাওয়াত শুনছে। মাথা আবৃত ওড়নায়। মুখে আলতো করে পিছলে পড়ছে চাঁদের স্নিগ্ধ আলো। অবর্ণনীয় এক সৌন্দর্য সে-ই শান্ত, কোমল মুখশ্রীতে! দরজাটা ঠাস করে খুলে গেল। অজান্তেই পিছু ঘুরে তাকালো লাজুক। দৃষ্টি আটকালো স্বামীর অবয়বে। তানসীভ এদিকে একটিবার-ও তাকালো না। ব্যস্ত হাতে শার্টটা খুলে ফেললো। খুললো টিশার্ট। উদোম দেহে চলে গেল ওয়াশরুম। চলতি পথে হাতে নিলো তোয়ালে। পুরোটা দৃশ্য ভালোমতো লক্ষ্য করলো লাজুক। আস্তে করে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে ফেললো। বন্ধ করলো তেলাওয়াত। মোবাইল, ইয়ারফোন ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখলো। এগিয়ে এলো এদিকে। যত্ন সহকারে স্বামীর ঘামে ভেজা শার্ট, টিশার্ট রাখলো লন্ড্রি বিন এ। কাবার্ড খুলে বের করলো রাতের জন্য আরামদায়ক একটা স্লিভলেস গেঞ্জি। রাখলো বিছানায় একপাশে। বেড সাইড টেবিলের ওপর কাঁচের গ্লাসে পানি ঢেলে রাখলো। অপেক্ষা করতে লাগলো তার বেরিয়ে আসার। কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো তানসীভ। দেহের উর্ধাংশ ভেজা। মুখ মুছতে মুছতে সোফায় গিয়ে বসলো সে। তোয়ালেটা রাখলো পাশেই। লাজুক কাছে এলো। এগিয়ে দিলো পানির গ্লাস। চোখ তুলে তাকালো মানুষটা। তার র"ক্তচক্ষু দেখে লাজুক হালকা ভড়কালো! নিশ্চিত হলো কিছু একটা হয়েছে বটে।
" নিন। "
গ্লাসটা হাতে নিলো তানসীভ। ঢকঢক করে পুরোটা পানি পান করলো। যেন মেটালো চিরকালের তৃষ্ণা। লাজুক কিছুটা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। পানি পান শেষে গ্লাসটা ফেরত নিলো সে। গিয়ে রাখলো বেড সাইড টেবিলের ওপর। কাবার্ডের কাছে গিয়ে নীরবে কিছু একটা করতে লাগলো। সেদিকে আর অতটা ভ্রুক্ষেপ করলো না মানুষটা। ক্লান্ত শরীরে সে লম্বা টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। দীর্ঘকায় দেহটা কোনোমতে ঠাঁই পেল সোফায়। কয়েক মিনিট অতিবাহিত হলো। কানে পৌঁছালো নিঝুম কণ্ঠস্বর,
" হাতটা দেখি। "
চলবে।