#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[৮]
" হাতটা দেখি। "
রাত্রি বেড়েছে। ঘরময় নীরবতার চাদর জড়িয়ে। সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে রয়েছে মানুষটি। একহাত কপালের ওপর রাখা। আরেক হাত পড়ে রয়েছে সোফার পাশ ঘেঁষে মেঝেতে। সহসা কানে পৌঁছালো সে-ই নিঝুম কণ্ঠস্বর। কপাল হতে হাত সরিয়ে তানসীভ তাকালো স্ত্রীর দিকে।
" কি? "
অনুচ্চ স্বরে অবুঝ প্রশ্ন যেন।
" হাতটা দিন আপনার। "
তানসীভ নিজের আহত হাতটার দিকে তাকালো। আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল কপালে তৈরি হওয়া ভাঁজ। বোধগম্য হলো বিষয়টা। কি থেকে কি ভেবে যেন সে বাড়িয়ে দিলো হাতটা। লাজুক সোফার পাশে মেঝেতে বসা। কোলের ওপর রাখা ফার্স্ট এইড বক্স। হালকা কাঁপছে হাত। আস্তে ধীরে সযত্নে নরম হাতের তালুতে, পুরুষালি রূক্ষ হাতটা তুলে নিলো সে। কণ্ঠনালী কিছুটা কেঁপে উঠলো। আঙ্গুল নড়ছে সামান্য। হৃদস্পন্দন দিশেহারা। নিজেকে কোনোমতে ধাতস্থ করে নিলো লাজুক। ধীরে ধীরে আলতো স্পর্শে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে লাগলো। দেখতে পেল হাতের তালুতে সরু এক কাটা দাগ। শুকনো র"ক্তের ছাপ। মেয়েটার হৃদয় কেমন অজানা আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়লো। সেই শঙ্কিত মুখশ্রীতে তানসীভ নির্নিমেষ তাকিয়ে। মেয়েটার অবনত মুখ। আঙ্গুলের হালকা কম্পন। মাঝেমধ্যে আলতো করে কামড়ে ধরা ঠোঁট। গালের কাছে পড়ে থাকা একগাছি ছোট চুল। ধীরে ধীরে সবটাই আত্মস্থ করে নিলো। তাকিয়ে রইলো অপলক। বুকের ভেতর গহীন তৃষ্ণা। লাজুক যত্ন সহকারে স্বামী মানুষটির হাতের তালুতে থাকা ক্ষততে অ্যান্টিসেপ্টিক লাগিয়ে দিলো। ব্যান্ডেজ করে দিলো। মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
" ব্যথা.. করছে? "
" না। "
ভাবলেশহীন কণ্ঠস্বর। উত্তর জানা ছিল। তবুও জানতে ইচ্ছে হলো লাজুক মেয়েটার। ক্ষতস্থানের পরিচর্যা শেষে হাতটা সরিয়ে দিতে উদ্যত হলো সে। মুহুর্তের মধ্যে থমকে গেল শ্বাস। রূক্ষ, শুষ্ক হাতটা আলতো করে ধরে রেখেছে ওর হাত। লাজুক চোখ তুলে তাকালো। চোখে চোখ মিললো দু'জনার। মেয়েটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে লাগলো ওই সুগভীর কালো গহ্বরে। শ্যাম সুদর্শন অবয়ব। কপালে পড়ে থাকা কিছু চুল। চাপদাঁড়ি আবৃত চোয়াল। নাকের নিচে থাকা বিন্দু বিন্দু পানি। সিগারেটে ইষৎ কালচে ঠোঁট। গলায় পড়ে থাকা চিকন জ্বলজ্বলে চেইন। পৌরুষদীপ্ত রূপের সবটুকু ঘিরে চোখ জোড়া ঘুরে বেড়ালো। ধীরে ধীরে হৃদকম্পন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এলোমেলো ভাবনারা ছুটে বেড়াচ্ছে শিরায় উপশিরায়। তপ্ত হয়ে উঠলো গাল। লজ্জারুণ আভা ছড়িয়ে পড়লো চেহারায়। জোরপূর্বক দৃষ্টি নত করলো লাজুক। গাল দু'টো তখন গাঢ় লাল আভায় ছেয়ে গিয়েছে। উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে অঙ্গে। আস্তে করে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো সে। ফার্স্ট এইড বক্স হাতে উঠে দাঁড়ালো। দ্রুত পায়ে সরে গেল সেখান থেকে। তানসীভ তখনো নিমেষহারা তাকিয়ে স্ত্রীর পালিয়ে যাওয়া অবয়বে। ঠোঁট সামান্য একটুখানি ছড়িয়ে।
•
রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল। আশপাশ হতে ভেসে আসছে পাখপাখালির কলতান। বেলকনিতে ফ্লোর বেডে দেয়াল ঘেঁষে বসে রয়েছে লাজুক। হাতে মোবাইল। ভিডিও কলে যুক্ত সে। ফোনের অপর প্রান্তে ভিন্ন চিত্র। বিছানায় বসে রয়েছে আফসানা। বালিশে হেলান দিয়ে রাখা মোবাইল। ধোয়া-শুকনো কাপড়চোপড় ভাঁজ করতে করতে বোনের সঙ্গে কথা বলছে সে। প্রশ্ন করলো,
" সকালে কি খেলি আজ? "
" রুটি, ভাজি খেয়েছি। তুমি কি খেয়েছো? "
" আজকে পাতলা খিচুড়ি করেছিলাম। দুপুরে তা-ই খাবো। রাতের চিন্তা পরে। "
" বাহ্। খিচুড়ি হলে তোমার আর কি লাগে! "
আফসানা হেসে উঠলো,
" তুই বলছিস একথা? খিচুড়ি পাগল বেশি কে? তুই না আমি? "
লাজুক আয়েশি ভঙ্গিতে বসা। নিঃশব্দে হেসে উঠলো। বললো,
" এখন লোভ লাগিয়ো না তো আপু। নাহলে কিন্তু সোজা তোমার বাসায় হানা দেবো। "
" তো আয় না একদিন। কতদিন হলো আসিস না। বিয়ের পর তো... "
এতটুকু বলে থেমে গেল আফসানা। ব্যস্ত হাত থামিয়ে তাকালো বোনের দিকে। বোঝার চেষ্টা করছে আদরের ছোট বোনের অভিব্যক্তি। লাজুক স্বাভাবিক। হাসিমুখে বললো,
" ইনশাআল্লাহ্ আসবো একদিন। তুমি জলদি জলদি সুসংবাদ শোনাও তো। পুচু কবে কিক মা'রবে আপু? ও কিক মা'রলে আমি ঠিক-ক পৌঁছে যাবো। একটুও দেরি করবো না। সত্যি বলছি কিন্তু। "
আফসানা বোনের কথায় ফিক করে হেসে উঠলো।
" পা'গল মেয়ে। ১৮-২৪ সপ্তাহের মধ্যে বাবু কিক দেবে ইনশাআল্লাহ্। এখনো তো সময় বাকি আছে। এত অস্থির হলে চলে? "
" ইশ্! যেভাবে অস্থির শব্দটাকে হাইলাইট করছো যেন আমি ছাড়া আরো কতজন অস্থির! "
" সে তো বটেই। "
বিড়বিড় করে উঠলো আফসানা। গালে লজ্জার ছোঁয়া। দৃশ্যটা ঠিক লক্ষ্য করেছে লাজুক। দুষ্টু হেসে বললো,
" বুঝি বুঝি। সবই বুঝি। বিড়বিড় করে লাভ নেই আপু। "
" হ্যাঁ, তুমি তো এখন সবই বোঝো। বেশ পেকে গেছো না!"
" আপুউউ। "
বোনকে লজ্জা দিতে গিয়ে নিজেই লজ্জার কবলে পড়ে গেল মেয়েটা। আফসানা হাসতে হাসতে ভাঁজ করে রাখা কাপড়গুলো ওয়্যারড্রবে রাখলো। বিছানা থেকে হাতে নিলো মোবাইলটা। হাঁটতে হাঁটতে বললো,
" আমার কথা ছাড়। তোর কি অবস্থা বল। মায়ের সাথে কথা হয়েছে শীঘ্র? "
লাজুক একটুখানি চুপ করে রইলো। এরপর বললো,
" আলহামদুলিল্লাহ্ আমি বেশ আছি। হ্যাঁ, মায়ের সাথে কথা হয়েছে দুই তিনদিন আগে। তোমার সাথে কথা হয়? "
" হ্যাঁ। কাল সন্ধ্যায় কথা হয়েছে। মাথা ব্যথা করছিল, বলছিলো। "
" ওহ্। যা গরম পড়েছে। নিজের ঠিকমতো যত্ন নেয় না মা। পরে শরীর খারাপ করে। "
" হুম। তুই পারলে একবার কল দিস। মা খুশি হবে। "
ইতিবাচক মাথা নাড়লো লাজুক। আফসানা তখন ডাইনিং এরিয়ায় এসে চেয়ারে বসেছে। গ্লাসে পানি ঢেলে নিলো। পানি পান করা শেষে কথা বলতে লাগলো দুই বোন।
•
" কিহ্! এসব কি বলছো তোমরা? "
রায়হান হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে! এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না, মাত্র যা শুনলো তা কি সত্যি? বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা ইফরাত ও তন্বী মুখ চেপে হাসছে। তন্বী কোনোমতে গালের ভেতরে হাসিটা গিলে নিলো। বললো,
" হ্যাঁ ভাইয়া। আজ রাতে আমরা তিনজন একসাথে থাকবো। তুমি আর ছোট ভাইয়া আউট। "
কথাটা মোটেও পছন্দ হলো না রায়হানের। সে অসন্তোষজনক স্বরে বলে উঠলো,
" ওয়ে। দিন নেই রাত নেই। যখন সময় পাস ফুসুরফুসুর করতে থাকিস তোরা। এখন রাতে ঘুমানোর সময় কিসের এত যাত্রাপালা? যা, ঘুমা গিয়ে। আমার বউ আমাকে ফেরত দে। যা ভাগ। "
স্বামীর এমন সোজাসাপ্টা-ঠোঁটকাটা কথায় রীতিমতো চমকেছে ইফরাত! তন্বী বড় বড় চোখ করে হেসে উঠলো। ভাবীর দিকে একপলক তাকিয়ে, দৃষ্টিপাত করলো এই ভদ্র-সভ্য মামাতো ভাইয়ের দিকে। টেনে টেনে দুষ্টুমির ছলে বলে উঠলো,
" ভাইয়াআআ...! এসব কি শুনছিইই? আমার সিধা সাদা ভদ্র ভাইটা এমন বউ পাগলু হলো কবে থে? হু? হু? "
" ভদ্র ছিলাম। এখনো আছি। এখন যা তো। ঘুমা। গুড নাইট। "
সোজাসাপ্টা জবাব। শুভ রাত্রি জানিয়ে চটাপট বউয়ের হাতটা পাকড়াও করতে উদ্যত হলো রায়হান। তবে একদম শেষমুহূর্তে মীর জাফরের ন্যায় বিশ্বাসঘা'তকতা করলো ইফরাত। পিছিয়ে গেল এক পা পেছনে। ধরতে দিলো না হাত। রায়হান আহত চোখে তাকিয়ে। ইফরাত চঞ্চলা হেসে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। নাটকীয় কণ্ঠে থেমে থেমে বললো,
" গুড নাইট মিস্টার হাসবেন্ড। আপনার আজকের ঘুমটা জমজমাট হোক। "
" রাত! "
রায়হানের চোখে অবিশ্বাস! হালকা ফাঁক হয়ে গিয়েছে মুখ। এ কি বে''ইমানি দৃশ্যের সম্মুখীন হচ্ছে সে! জীবনে এমন দিন দেখা লাগবে কখনো ভেবেছিল সে? ভাবেনি তো। শেষমেষ এই দৃশ্য সহ্য করতে হচ্ছে? ইন্না লিল্লাহ! ইফরাত ও তন্বী হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো ইফরাত,
" শুভ রাত। "
মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। বিড়বিড়িয়ে কিছু ভদ্র গালি দিলো রায়হান। অসহায় চোখে একবার তাকালো দরজায়। পরপর তাকালো আশপাশে। রাতবিরেতে তার এমন অসহায়ত্ব দেখে নেয়নি তো কেউ? আফটার অল মির্জা বংশধর সে। মানসম্মান বলে কিছু আছে তো। রায়হান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ভাগ্যিস কেউ নেই করিডোরে। নাহলে এতক্ষণে মানসম্মানের করুণ জলাঞ্জলি হতো বুড়িগঙ্গার পানিতে। ভাগ্য ভালো কেউ নেই। বুক ফুলিয়ে দম নিলো সে। টি-শার্টের কলার ঠিক করতে করতে চলে গেল সেখান থেকে। এখানে আর অপেক্ষা করা বৃথা যে।
.
বন্ধ দরজার ওপাড়ে একযোগে হেসে উঠলো তিন কন্যা। হাসতে হাসতে বিছানায় গড়িয়ে পড়লো তন্বী। হাসির তোপে বিছানায় বসে থাকা লাজুকের দেহ কেঁপে উঠলো। ইফরাতের মুখে হাসি। অন্তরে লাজ। কি একটা লজ্জাজনক অবস্থা। ইশ্!
-
ওয়াশ রুম হতে ফ্রেশ হয়ে বের হলো তানসীভ। দেহের উর্ধাংশ উন্মুক্ত। বুকে চিকচিক করছে বিন্দু বিন্দু পানি। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিচ্ছে। সহসা থমকে গেল হৃদয়। সুমিষ্ট হাসির ঝলকানি প্রবেশ করলো কানে। মুখ হতে তোয়ালে সরিয়ে তাকালো ঘরের দরজায়। নিচু আওয়াজে হাসতে হাসতে ভেতরে প্রবেশ করেছে মিসেস। কিছুটা উঁচু গলায় ঘরের বাইরে থাকা তন্বীকে উদ্দেশ্য করে বলছে,
" হ্যাঁ, তুমি তো একেবারে গুড গার্ল। দাঁড়াও, আসছি আমি। "
লাজুক হাস্যোজ্জ্বল মুখে ভেতরে এলো। হাসতে হাসতে দৃষ্টি আটকালো স্বামীর দিকে। মানুষটির কৌতূহলী চাহনি। উদোম বুক। ত্বকে লেগে থাকা পানি। রমণীর বেহায়া চোখ দুটো আরো অবাধ্য হয়ে গেল। নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে রইলো স্বামীর সুঠামদেহে। তন্মধ্যে কখন যে মুখ হতে মুছে গেল হাসি, জানা নেই তার। নষ্ট চোখ দু'টো আরো নিম্নগামী হবার আগেই দ্রুত দৃষ্টি নত করে নিলো সে। ঘন শ্বাস ফেললো। লজ্জার পরশে আগুনের ন্যায় গরম হয়ে উঠেছে গাল, কান। মানুষটার পাশ কাটিয়ে বেড সাইড টেবিলের কাছে গেল লাজুক। হাতে নিলো মোবাইল। আলতো ছোঁয়ায় কানের পেছনে গুঁজে নিলো চুল। মোবাইল হাতে স্বামীর পাশ কাটিয়ে চপল পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তানসীভ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে। হাসিমুখে ঘরে আসা। তাকে দেখেই মুখটা বেজার করে ফেলা। সবটাই লক্ষ্য করেছে সে। আর বিষয়টা মোটেও পছন্দ হয়নি তার। একদমই নয়।
-
তিন রমণী গা ঘেঁষে বসে রয়েছে বিছানায়। দৃষ্টি নিবদ্ধ দেয়ালে লাগানো টিভির পর্দায়। ' বনলতা এক্সপ্রেস ' সিনেমাটা দেখতে বসেছে তারা। ব্যবসাসফল এই সিনেমাটা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত হয়েছে। কৌতূহল জন্মেছে তাদের। তাই তো আজ সুযোগ পেয়ে, হাতছাড়া করতে চাইলো না ওরা। তিনজন সিনেমায় মগ্ন। সহসা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। মুভি টাইমে ব্যাঘাত ঘটলো। তন্বী চোখমুখ কুঁচকে ফেললো।
" এখন আবার কে এলো? "
" আমি দেখছি। "
লাজুক বিছানা ছেড়ে নেমে এলো। পা বাড়ালো দরজায়। দ্বিতীয়বার কড়া নাড়তেই দরজা খুলে ফেললো সে। ওপাশে দাঁড়িয়ে রায়হান। লাজুক মুখ চেপে হাসলো।
" কিছু লাগবে ভাইয়া? "
" হ্যাঁ হ্যাঁ। "
লাজুক দরজা খোলায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো রায়হান। স্বাভাবিক ভাবেই এই ছোট ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে কথাবার্তা তেমন হয়নি। মেয়েটা চুপচাপ। গায়রে মাহরাম মেনে চলার চেষ্টা করে। তাই সে-ও কখনো সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করেনি। আগ বাড়িয়ে খাতির জমাতে চায়নি। মেয়েটির অনুভূতিকে সম্মান দেখিয়েছে। এখন এভাবে প্রশ্ন করায় রায়হান কেমন খেই হারিয়ে ফেললো। আমতা আমতা করে বললো,
" রাতকে একটু ডেকে দেবে? আমার... হ্যাঁ চার্জারটা পাচ্ছি না। "
" জ্বি ভাইয়া। "
লাজুক ভেতরে ফিরে এলো। ইফরাত নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে। লাজুক ঠোঁট টিপে হাসলো। দুষ্টু কণ্ঠে বললো,
" ডাক পড়েছে আপনার। "
ইফরাত বড় শ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নেমে এলো।
" কি চাই তোমার? "
বলতে বলতে স্বামীর দিকে এগিয়ে গেল সে। লাজুক এবং তন্বী হাই ফাইভ করলো একত্রে। মুখে দুষ্টুমির ছাপ।
" রাত একটু আসো না। আমার চার্জারটা খুঁজে পাচ্ছি না।"
" চার্জার তো জায়গামতোই আছে। "
" আরে ল্যাপটপের চার্জার। আসো তো। "
অধৈর্য হয়ে বউয়ের হাতটা চট করে ধরে ফেললো রায়হান। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বউকে নিয়ে চপাৎ। উধাও। তন্বী ও লাজুক হতভম্ব হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো।
' এটা কি হলো? '
-
এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বেডরুমের দরজায় এসে দাঁড়ালো তানসীভ। উঁকি দিলো ঘরের বাইরে। করিডোরে। মেয়েটার হাবভাব আজ সুবিধার ঠেকছে না। কেমন এড়িয়ে এড়িয়ে চলছে। ডিনার টাইমেও হালকা ছন্নছাড়া ভাব লক্ষ্য করেছে। তিন রমণী বসে বসে নিজেদের মধ্যে কিসব ফুসুরফুসুর গুজুরগুজুর করছিল। কি চলছে এদের মধ্যে? কোনো খিচুড়ি তো নিশ্চয়ই পাকাচ্ছে। কপালে হালকা চুলকে নিলো মানুষটা। খাওয়া-দাওয়া পর্ব সমাপ্ত হয়েছে সে-ই কখন। প্রায় একঘন্টা হয়ে গিয়েছে। মেয়েটা এখনো ঘরে ফিরছে না কেন? আছে কোথায় এখন অবধি? ঘুমানোর ইচ্ছে নেই নাকি! তানসীভ অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে মোবাইলে সময়টা দেখে নিলো। রাত দশটা বেজে পঁচিশ মিনিট। এত রাত করে মেয়েটা কোথায় কোথায় ঘুরছে আল্লাহ্ মালুম। তানসীভ বিরক্তি সহকারে ঘরে ফিরেই যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখা মিললো একজনের। দাঁড়িয়ে পড়লো সে।
করিডোর ধরে বিড়বিড় করে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছিল পলি। হঠাৎই আঁতকে উঠলো আত্মা। কানে পৌঁছালো দা'নবের ভ'য়ঙ্কর ডাক,
" পলি! "
' ও আল্লাহ্ গো। মোরে আবার ডাকে ক্যা? '
ডানে বামে মুখ ফেরালো। আল্লাহ্ আল্লাহ্ বিড়বিড় করে, কাঁদো কাঁদো মুখটা নিয়ে এদিকে তাকালো পলি। তানসীভ দাঁড়িয়ে। ভীত পায়ে এগিয়ে এলো মেয়েটা।
" জ্বে ভাইজান। "
" ভাবী কোথায়? "
" কোন ভাবী? " অবুঝ বালিকা যেন।
" রাতদুপুরে স্টুপিডের মতো প্রশ্ন করবি না। "
দাঁতে দাঁত পিষে ফেলছে মানুষটা। পলি শুকনো ঢোক গিলে কোনোরূপ সাহস সঞ্চয় করে বললো,
" ভাবী তো অহন দুইখান। আমনে কারে চান? "
তানসীভ এমন দৃষ্টিতে তাকালো তৎক্ষণাৎ খাড়ার ওপর ভস্ম হয়ে গেল পলি। তড়িঘড়ি করে আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো,
" ওহ্ ছোডো ভাবী? ভাবী? হেরা হগলে তো তন্বী আপামণির ঘরে। আমি অহন যাই? "
আর একটা কথাও না বলে দৌড়ে পালালো পলি। ছেঁড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, অবস্থা মেয়েটার। তানসীভ বিভ্রান্ত মুখে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে।
-
ঘড়ির কাঁটা তখন বারোর কাছাকাছি। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ভিন্ন এক অযুহাতে দরজায় হাজির রায়হান। কি যে এক মুসিবতে পড়েছে সে! বউয়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে এমন বদভ্যাস তৈরি হয়েছে, এখন বউ ছাড়া থাকা মুশকিল। এজন্য বউকে ঘনঘন বাবার বাড়ি থাকতেও দেয় না সে। সকালে যাবে, সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসা চাই। বউ ছাড়া তার আবার ঘুম হয়না ঠিকঠাক। রাত পেরিয়ে যায় এপাশ ওপাশ করতে করতে। ভালো যন্ত্রনা তো। রায়হান ভাবতে লাগলো এখন নতুন কোন বাহানা দেয়া যায়। মেয়েগুলো বেশ বিচ্ছু হয়েছে বটে। নাটের গুরু ওই সিঙ্গেল তন্বীটা। শীঘ্রই ওকে সুপাত্রে তুলে দেয়া উচিত। সিঙ্গেল হয়ে মিঙ্গেলদের জীবনে বেশ সমস্যা সৃষ্টি করছে মেয়েটা। যত জ্বালা হয়েছে তার একার। ছোট ভাইটা তো দিব্যি আছে। সে একাই ভিটামিন বউয়ের অভাবে ভুগছে। ধুর। রায়হান বন্ধ দরজায় ইতিউতি করে কড়া নাড়তে যাচ্ছিল। হঠাৎ চমকালো বেশ! আগন্তুক মানুষটাও কিছুটা চমকেছে বটে! অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে ভেতরে ভেতরে। তবে বাহ্যিকভাবে মোটেও বুঝতে দিলো না। রায়হান আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
" ত্ তুই এখানে? "
" হু। "
" কিছু লাগবে? "
ডান হাতটা ঘাড়ে ঘঁষে অস্বস্তিকর কণ্ঠে বললো তানসীভ,
" না। "
" ওহ্। "
তানসীভ ফিরে যেতে উদ্যত হলো, তখনই পিছু ডেকে উঠলো বড় ভাই রায়হান,
" ওরা এখানেই আছে। নাইট স্টে করবে তিনজন। "
আলতো করে ইতিবাচক মাথা নাড়লো তানসীভ। দু'জনেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অপ্রস্তুত হয়ে কথা হাতড়ে বেড়াচ্ছে অন্তরে। এমন মুখোমুখি আলাপচারিতায় সচরাচর অভ্যস্ত নয় যে। রায়হান কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। তানসীভ লক্ষ্য করলো তা। তবে কিছু বললো না। দু'জনে নীরবে পা বাড়ালো বিপরীত দিকে। নিজ নিজ ঘরের উদ্দেশ্যে। বাতাসে তখন ভেসে বেড়াচ্ছে অস্বস্তি, না বলা কথারা এবং শিরোনামহীন দূরত্ব।
•
রান্নাঘরের জানালা খোলা। ভেতরে ছড়িয়ে রয়েছে সূর্যের আলোকজ্জ্বল উত্তাপ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মুখরোচক খাবারের সুগন্ধ। চুলায় একপাশে গরুর মাংস প্রায় হয়ে এসেছে। অপরপাশে সবে বসানো হয়েছে ফিরনি। দ্বৈত সুবাসে প্রাণ ভরে যাচ্ছে যেন। জিভে চলে আসছে পানি। লাজুক ব্যস্ত হাতে রান্নার দিকটা সামলাচ্ছে। আজকে রান্নাবান্নার দায়িত্ব তার ওপর দেয়া হয়েছে। দিয়েছেন ফুফু শাশুড়ি লতা বেগম। সে-ই নির্দেশনা মোতাবেক, দক্ষতার সঙ্গে রান্না করতে লাগলো মেয়েটা। শালীনতার সহিত ওড়নায় আবৃত দেহের উর্ধাংশ। কপালে, গালে, নাকের নিচে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। গরমের তীব্রতায় লালিমায় রেঙেছে ফর্সা মুখ। পলি কিছুটা দূরত্বে। মেঝেতে একটা মোড়ায় বসা সে। সালাদের জন্য শসা, টমেটো, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ কেটে রেডি করে রাখছে। খাওয়ার আগে আগে সালাদ তৈরি করবে ছোট ভাবী।
-
রান্নাবান্না পর্ব সমাপ্ত হয়েছে প্রায় আধঘন্টা হয়েছে। ধীরে ধীরে ডাইনিং এরিয়ায় উপস্থিত হলো পুরুষ সদস্যরা। জুম্মার দিন আজ। নামাজ শেষে একসাথে খেতে বসেছে তারা। জহুরুল সাহেব, রায়হান, তানসীভ, তুহিন। সাথে রয়েছেন লতা বেগম। লাজুক যত্ন সহকারে খাবার পরিবেশন করতে লাগলো। একে একে সকলের প্লেটে দিলো চিংড়ি মাছ ভুনা। আজকের আয়োজনে রয়েছে পোলাও, চিংড়ি মাছ ভুনা, ইলিশ মাছ ভাজা, চিকেন রেজালা, গরুর মাংস, ফিরনি এবং সালাদ। পোলাও, চিংড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে খেতে আরম্ভ করলো সকলে। লাজুক অস্থির হৃদয়ে দাঁড়িয়ে। ওর দু'পাশে দাঁড়িয়ে ইফরাত, তন্বী। মা'কে খাইয়ে পরে ওরা মেয়েরা একসাথে খাবে। তাই তো দাঁড়িয়ে রয়েছে আজকের রাঁধুনি ' লাজুক নূরাইন ' এর সঙ্গে। আজই প্রথমবার পুরো রান্নার দায়িত্ব একা হাতে সামলেছে মেয়েটা। স্বাভাবিক ভাবেই বেশ উদ্বিগ্নতা কাজ করছে। ইফরাত আলতো করে ছোট জায়ের হাতটা চেপে ধরলো। আশ্বাস দিলো নীরবে। আস্তে করে মাথা নাড়লো লাজুক। ইফরাত ইলিশ মাছ ভাজা দিলো ফুফুর পাতে। লাজুক স্বামীর প্লেটে দিলো চিকেন রেজালা। কালো পাঞ্জাবী পড়ুয়া মানুষটি খেতে ব্যস্ত। আজ তাকে দেখে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে! আজকের এই সৌষ্ঠব বেশভূষায় একটু বেশিই আপন আপন, হৃদয়ের কাছাকাছি লাগছে। আলতো করে চোখের পলক ঝাপটালো লাজুক। সরে গেল একটুখানি পাশে। যে যার যার প্রয়োজনমাফিক নিয়ে খেতে লাগলো। খেতে খেতে তুহিন সর্বপ্রথম মন্তব্য করলো,
" ভাবী, খাবারগুলো একদম ইয়াম্মি হয়েছে! সো ডেলিসিয়াস! "
প্রথম মন্তব্য। ইতিবাচক প্রশংসা। মুচকি হেসে উঠলো মেয়েটা। মৃদু কন্ঠে বললো,
" থ্যাংক ইয়্যু ভাইয়া। গরুর মাংস আরেকটু দিই? "
" আমি নিয়ে নিচ্ছি ভাবী। আপনারাও সাথে বসতেন। "
" আপনারা খান ভাইয়া। আমরা পরে খাবো। "
" ওকে। "
খেতে লাগলো বাকিরা। রায়হান তৃপ্তি করে খাচ্ছে। খেতে খেতে মন্তব্য করলো এবার,
" বেশ ভালো রান্না করেছো লাজুক। খাবারটা তৃপ্তিকর ছিল। "
লাজুক খুশি হলো। লতা বেগম পাশ থেকে গুরুগম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,
" খারাপ না। "
এমন রাশভারী মানুষের থেকে দুই শব্দের ফিডব্যাক। এতটুকুই অনেক মূল্যবান যে। মনে মনে খুশি হলো লাজুক। খেতে লাগলো সকলে। জহুরুল সাহেব ভালোমন্দ কোনো মন্তব্য করলেন না। চুপচাপ খেলেন। অবশেষে খাওয়া-দাওয়া পর্ব সমাপ্ত হলো। একে একে চলে গেল সকলে। তন্বী এবং ইফরাত গর্বিত হাসি উপহার দিলো লাজুককে। প্রশংসা করতে লাগলো ওর। এসবের ভীড়ে লাজুকের অন্তরে ক্ষীণ আঁচড় কাটলো যেন। সবাই কম-বেশি মন্তব্য করলো। প্রশংসা করলো। শুধু তার মানুষটাই চুপচাপ রইলো। খেয়েদেয়ে চলে গেল রুমে। খাবারটা কি তার পছন্দ হয়নি? রান্নায় কোনো ত্রুটি ছিল! আনমনে ব্যথিত নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলো মেয়েটা। ভার ভার লাগছে মন। বৃথা লাগছে এত এত আয়োজন।
•
বিকেলের আদুরে রৌদ্র ছড়িয়ে রয়েছে অন্দরমহলে। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে লাজুক। হঠাৎই কানে পৌঁছালো কিছু রাশভারী শব্দ। স্বয়ংক্রিয়ভাবে পা দু'টো থেমে গেল। বাম পাশে তাকালো সে। স্টাডি রুমের দরজা আধখোলা। শ্বশুর জহুরুল সাহেবের স্টাডিরুম এটি। অনুমতি ব্যতিত কারো প্রবেশ নিষেধ। লাজুক কৌতুহল দমিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। তখন কানে পৌঁছালো আব্বার কণ্ঠস্বর,
" পেপার্স তাড়াতাড়ি ঠিকঠাক করে ফেল। ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের চাল চালতে হবে। "
ফোনে ব্যস্ত তিনি। ওপাশ হতে কি বললো জানা নেই লাজুকের। তবে একটু পর শুনতে পেল,
" ওদিকে ছেলেপুলে রেডি আছে তো? "
" .... "
" গুড। আমি বলা মাত্রই অ্যাকশন শুরু করবি। এর আগে... একদম চুউপ। "
লাজুক নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। মনের মধ্যে নানারকম প্রশ্ন। কোন কাজের কথা বলছিলেন উনি? কিসের জন্য ছেলেপুলে রেডি? নতুন কোনো অনৈতিক কাজ? এতসব প্রশ্নের কোনো উত্তর মিললো না। স্রেফ এক টুকরো সন্দেহ নীরবে প্রবেশ করলো মনে। কপালে সৃষ্টি হলো চিন্তার বলিরেখা।
চলবে।