#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[৯]
" খুব ব্যথা করছে? "
" একটু। "
ক্ষীণ সে কণ্ঠস্বর। ক্লান্ত, দুর্বল। লাজুক বুঝতে পারে এই একটুর গাঢ়ত্ব ঠিক কতখানি।
..
রাতের আঁধারে নিমজ্জিত বসূধা। শরীরে ছুঁয়ে যাচ্ছে হালকা শীতল হাওয়া। বাড়ির আঙ্গিনার একপাশে অবস্থিত সাদা রঙের পারগোলা (Pergola)। বিশাল ছায়ার ন্যায় আগলে রেখেছে বসার পুরো জায়গাটি। পারগোলার ওপরে অবস্থিত সমান্তরাল স্লাটগুলোর ফাঁক দিয়ে জমিনে চুঁইয়ে পড়ছে চাঁদের আলো। পারগোলার নিচে বেতের কয়েকটি চেয়ার রাখা। চেয়ারে চেয়ারে রাখা নরম রঙিন কুশন। মধ্যখানে উজ্জ্বল কমলা রঙের সেন্টার টেবিল। রাতের পরিবেশটা আরো মায়াবী রূপ ধারণ করেছে কিছু লণ্ঠনের আলোয়। পারগোলার একপাশে ঝুলন্ত গোলাকার পেপার লণ্ঠন। মেঝের ওপর রাখা বড় বড় কয়েকটি বেতের লণ্ঠন (Lanterns)। যার ভেতরে আলো ছড়াচ্ছে মোমবাতির হলদে আলো। চাঁদের প্রাকৃতিক আলো এবং লণ্ঠনের কৃত্রিম সে আলো। মিলেমিশে পাথরের তৈরি মেঝে (Stone Pavers), এই পারগোলা... পুরো জায়গাটিকে দিয়েছে মনোরম-অভিজাত এক সৌন্দর্য! আর্কিটেক্ট মির্জা রায়হান শাহ্ এর পছন্দশৈলী অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে এই আরামদায়ক স্থানটি। তানসীভ পারগোলার নিচে বেতের একটা চেয়ারে বসা। পা আড়াআড়ি লম্বা করে ছড়িয়ে রাখা পাথরের মেঝেতে। মাথাটা চেয়ারের সাথে এলিয়ে রাখা। হেলে পড়েছে পেছনে। চোখ বন্ধ। চুলগুলো এলোমেলো। মুখে ঘামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা। চাঁদের আলোয় অমূল্য মুক্তোর ন্যায় জ্বলজ্বল করে চলেছে। ক্লান্তির ছাপ চোখেমুখে দৃশ্যমান। কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল। নিঃশব্দে কখন যে মেয়েটি পাশের একটা চেয়ারে এসে বসেছে, টের পায়নি তানসীভ। লাজুক হাতে থাকা চায়ের কাপ রাখলো সেন্টার টেবিলের ওপর। চুপটি করে বসলো। তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। মানুষটার এমন ক্লান্ত-শ্রান্ত রূপ অজানা ব্যথা দিচ্ছে তাকে। নিষ্পলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। অতঃপর নিচু আওয়াজে বললো,
" চা খেলে ভালো লাগবে। "
আস্তে করে চোখ দুটো খুলে গেল। হালকা ঘাড় বাঁকিয়ে তানসীভ তাকালো এদিকে। দৃষ্টি আকর্ষণ করলো স্ত্রীর কোমল অবয়ব। লাজুক চোখে চোখ রাখলো। লক্ষ্য করলো মানুষটার চোখের সাদা অংশ কেমন র'ক্তিম রূপ ধারণ করেছে। ঘামে ভেজা শ্যাম মুখটা চাঁদের আলোয় আরো বেশি চিত্তাকর্ষক! আরো বেশি হৃদয় হরণকারী! ওই সুগভীর দু চোখের গভীরতায় হারিয়ে যাওয়ার পূর্বে নিজেকে সামলে নিলো মেয়েটা। আস্তে করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। বাড়িয়ে দিলো চায়ের কাপ। বিনা বাক্যব্যয়ে তানসীভ কাপটা হাতে নিলো। কিছুটা সোজা হয়ে বসলো। চুমুক দিলো গরম চায়ের কাপে। কড়া লিকারের চা। তার পছন্দমাফিক তৈরি। আনমনে খুশির ছোঁয়া লাগলো অন্দরে। লাজুক কিছুটা রয়ে সয়ে বসা। দৃষ্টি লুকোচুরি করে মাঝেমধ্যে তাকাচ্ছে। মিহি কণ্ঠে জানতে চাইলো এবার,
" হাতের কি অবস্থা এখন? "
চায়ের কাপে চুমুক দিলো মানুষটা। এক শব্দে জবাব দিলো,
" ভালো। "
লাজুক চুপ করে রইলো। কি বলবে আর? কিভাবে বাড়াবে আলাপচারিতা? সে যে আরো কিছুক্ষণ সময় কাটাতে চাচ্ছে এখানে। কিছু বলতে চাচ্ছে। কিংবা শুনতে চাচ্ছে। কিছু একটা হোক। চায়ের কাপটা শব্দ করে টেবিলের ওপর রাখলো তানসীভ। লাজুক চোখ তুলে তাকালো। চা পান করা শেষে পূর্বের অবস্থানে চলে গেল মানুষটা। মাথাটা এলিয়ে দিলো চেয়ারে। বন্ধ করে নিলো দু'চোখ। ঠোঁট চেপে বসে রইলো মেয়েটা। বলার মতো আর কিছু খুঁজে পেল না। কয়েক মিনিট বাদে উঠে দাঁড়ালো। এভাবে একাকী যন্ত্রনার সাগরে ফেলে চলে যাচ্ছে মেয়েটা? ভালো। মনের অজান্তেই নাখুশ ছোঁয়া লাগলো ভেতরে। চুপটি করে একাকী যন্ত্রনা ভোগ করতে লাগলো সে। হঠাৎ বেড়ে গেল হৃদস্পন্দন। ছলাৎ করে উঠলো অন্তরাত্মা। কপালে নরম কোমল একটা হাতের ছোঁয়া। আলতো করে আঙ্গুল ছুঁয়ে যায় কপাল। সতর্ক, দ্বিধান্বিত সে স্পর্শ। তানসীভ ঠিক অনুভব করতে পারলো। তবে কোনো বাঁধা দিলো না। খুললো না চোখ। শুধু একটুখানি গভীর হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি। লাজুক তার পেছনে দাঁড়িয়ে। অতি নিকটে। দেহের খুব সান্নিধ্যে। আস্তে আস্তে করে যত্ন সহকারে কপালে ম্যাসাজ করে চলেছে। আশেপাশে নীরবতা। হালকা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে দু'টো দেহ। পার হয় কিছু মুহূর্ত। মোলায়েম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে লাজুক,
" খুব ব্যথা করছে? "
" একটু। "
ক্ষীণ সে কণ্ঠস্বর। ক্লান্ত, দুর্বল। লাজুক বুঝতে পারে এই একটুর গাঢ়ত্ব ঠিক কতখানি। কোমল হাতে সে ম্যাসাজ চালিয়ে যায়। অফুরান যত্ন মিশে রয়েছে প্রতিটি স্পর্শে। তানসীভের চোখ বন্ধ। তবে সক্রিয় ইন্দ্রিয়। নরম এ স্পর্শে একটু একটু করে গলে যেতে থাকে সে। কপালের টানটান ভাব কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। নাকের ওপরে আহ্লাদে ঠাঁই নেয় ওড়নার এক প্রান্ত। মেয়েলি, নে'শালো সুবাসে বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে আসে। মুষ্টিবদ্ধ হয় হাত। মেয়েটির উষ্ণ নিশ্বাস আছড়ে পড়ে তার চোখেমুখে। তিরতির করে কাঁপে চোখের পাতা। ফাঁক হয় দু ঠোঁট। কিছু বলতে গিয়েও হয় না বলা। ধীরে ধীরে আশেপাশে যেন অদ্ভুত এক শান্তি ছড়িয়ে পড়ে। আরো ভালো লাগছে এই যন্ত্রনা কাতর মুহুর্ত। আরো আপন লাগছে সঙ্গিনী মেয়েটি। দু'জনেই চুপ। মুখে কোনো কথা নেই। তবুও বাতাসে ছড়িয়ে যায় না বলা বহু কথা। এই কোমলতা, এই যত্ন, এই নৈকট্য অজান্তেই কমিয়ে দেয় অনেকখানি দূরত্ব।
•
দুষ্টুমিষ্টি এক সন্ধ্যা। বাড়ির লিভিংরুমে যেন যু''দ্ধের দামামা। রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি করে চলেছে দুই ভাই-বোন। মেকি শক্তি প্রয়োগ করে রিমোট কেড়ে নিতে চাইছে তুহিন।
" শা'কচুন্নী! রিমোটটা দে। আজ বাংলাদেশের খেলা আছে। "
" কচুর খেলা দেখে কোনো লাভ আছে নাকি? সে-ই তো হারবে। এরচেয়ে ভালো আমি দেখবো। দাও আমাকে। ইন্টারেস্টিং মুভি হবে একটা। "
তন্বী-ও রিমোট নিয়ে নাছোড়বান্দা। তুহিন ছোট ছোট চোখ করে তাকালো,
" সে তো মোবাইলেই দেখতে পারিস। টিভির কি দরকার?"
" সে তো তুমিও মোবাইলে খেলা দেখতে পারো। টিভির কি দরকার? "
" বড় পর্দা ছাড়া খেলা জমে না। "
তন্বী রিমোট বগলদাবা করে বললো,
" এক্সাক্টলি। বড় পর্দা ছাড়া মুভিও ঠিকঠাক জমে না। "
" তবে রে শা'কচুন্নী! "
পুনরায় হৈ হুল্লোড় বেঁধে গেল দুই ভাইবোনের। ইফরাত এখানে এসে হতবাক!
" আরে আরে! কি শুরু করলে তোমরা? বন্ধ করো এসব।"
তন্বী অসহায় বাচ্চার ন্যায় বিচার দিতে লাগলো,
" ভাবী দেখো না। ভাইয়া রিমোট দিচ্ছে না। "
" ভাবী, বাংলাদেশের খেলা আছে আজকে। আমি সে-ই বিকেল থেকে টিভির সামনে ঘুরঘুর করছি। "
" তো? আমি তো গতকাল রাত থেকেই প্লান করে রেখেছি। "
" আমি দুইদিন আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি। আজকে থেকে টি টোয়েন্টি সিরিজ শুরু। বাংলাদেশ ভার্সেস নিউজিল্যান্ড। দে তো রিমোটটা। "
রিমোট কেড়ে নিতে চাইলো তুহিন। তন্বীর কণ্ঠে জেদ,
" দেবো না। "
" দে বলছি। "
" না। "
ইফরাত পড়েছে মহা মুশকিলে। কেউই তার কথা শুনতে নারাজ। কথা বলতেই দিচ্ছে না। কি করবে এবার?
" দে না। "
" নাহ্! "
তুহিন জোরপূর্বক রিমোটটা কেড়ে নিয়ে চ্যানেল বদলাতে লাগলো। ঘ্যানঘ্যান করে উঠলো তন্বী। তুহিন চ্যানেল বদলাতে বদলাতে হঠাৎ ওকে থামিয়ে দিলো ইফরাত,
" ভাই থামো। আগের চ্যানেলটা দাও তো একটু। "
তুহিন দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে আগের চ্যানেলটায় ফিরে গেল। তিনজন মনোযোগ দিয়ে তাকালো টিভির বড় পর্দায়। স্ক্রিনে লাল রঙের ' ব্রেকিং নিউজ ' লেখাটা দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তাদের। নিচে ছোট আকারে শিরোনামের ঘরে দ্রুত গতিতে চলছে লেখাগুলো,
' রাজধানীতে তরুণীর ম-রদেহ উদ্ধার '
' ধ-র্ষণ ও হ-ত্যার আশঙ্কা '
' বুড়িগঙ্গা ব্রিজ ঘিরে তদন্ত চলছে '
উপস্থিত তিনজন একে অপরের দিকে কৌতূহলী হয়ে তাকালো। ইফরাত বিড়বিড় করে উঠলো,
" কখন ঘটলো এসব? "
সে মুহূর্তে লাজুক এসে পৌঁছালো সেখানে। হাতে সবজি পাকোড়ার হাফপ্লেট। মাত্র সবার জন্য পাকোড়া ভেজেছে সে। ব্যস্ত ছিল রান্নাঘরে। এতক্ষণ ধরে শুনেছে ওদের কিচিরমিচির। বেশ উপভোগ করছিল বিষয়টা। এখন এখানে এসে লক্ষ্য করলো আবহাওয়া কেমন গুমোট। কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কি? কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো লাজুক,
" কি হয়েছে? সবাই এত চুপচাপ যে? "
তন্বী টিভির দিকে হাত দিয়ে ইশারা করলো,
" ভাবী দেখো। "
লাজুক সোফায় বসলো ইফরাতের পাশে। তাকালো টিভির পর্দায়। সংবাদ পাঠক তখন বলে চলেছে,
- ' রাজধানী ঢাকায় চাঞ্চল্যকর এক হ-ত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। রূপা নামের এক তরুণীকে ধ-র্ষণের পর হ-ত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তিনদিন আগে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হয় সে... '
টিভির পর্দায় একপাশে দৃশ্যমান নিউজ রিপোর্টার। অপরপাশে ঘটনাস্থলের দৃশ্যপট। বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচে ক্রাইম সিন। পড়ন্ত বিকেলের আলো সেখানে পৌঁছাতে ব্যর্থ। হলুদ টেপ দিয়ে ঘেরা জায়গাটা। অদূরে পুলিশের গাড়ির রঙিন আলো ঘুরছে অবিরাম। ক্রাইম সিনের আশেপাশে কৌতূহলী বহু মানুষের ভিড়। পুলিশ তাদের ঘটনাস্থল থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখতে ব্যস্ত।
- ' দর্শকবৃন্দ। এই মুহূর্তে আমি বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচে অবস্থান করছি। আজ দুপুরের দিকে স্থানীয়রা এখানে একটি ম-রদেহ দেখতে পায়। পরে পুলিশ এসে সেটি উদ্ধার করে। '
পলিথিনে ঢাকা এক নিথর দেহ। ক্যামেরায় বন্দি হয়। একের পর এক ফুটেজ সংগ্রহ করছে মিডিয়ার লোকেরা। পুলিশ চারপাশে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে।
- ' পুলিশ জানিয়েছে, ম-রদেহটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তরুণীকে অন্য কোথাও নি-র্যাতনের পর এখানে ফেলে দেওয়া হয়েছে। '
লিভিংরুমে উপস্থিত মানুষগুলো শিউরে ওঠে এ নির্মম-নৃশংস সংবাদে। শুকিয়ে যায় গলা। অন্তরে জেগে ওঠে সমবেদনা। লাজুক অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে। বিড়বিড় করে উঠলো,
' ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। '
সংবাদ পাঠক বলতে লাগলেন,
- ' নিহত রূপা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিল। ঘটনার আগের দিন রাতে সে বাসায় ফেরেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়। '
টিভির পর্দায় প্রদর্শিত হয় এক তরুণীর ছবি। নাম রূপা। বয়স ২৬। সংবাদ পাঠক বলে চলেছেন,
- ' ম-রদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ঘটনাটি ঘিরে ইতিমধ্যে এলাকাজুড়ে আ-তঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। '
- ' এই নৃ-শংস ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ করছে পুলিশ। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজধানীর মতো ব্যস্ত শহরে, আজ কোথায় ঠিক কতটা নিরাপদ একজন নারী? '
টিভির পর্দায় নিহতের স্বজনদের আহাজারি ভেসে উঠছে। এক বৃদ্ধার সে কি আর্তনাদ! ইফরাত ফট করে টিভিটা বন্ধ করে দেয়। মাথা নিচু করে ফেলে লাজুক। আলতো করে মুছে নেয় অশ্রু। লাল হয়ে গিয়েছে চোখ। বড় বড় নিঃশ্বাস ছাড়ে সে। নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যায়। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে থেমে থেমে বলতে লাগলো,
" এদেশে নারী কোথায় নিরাপদ ভাবী? ঘরে থাকবে। সেখানেও নিরাপত্তা নেই। বাইরে যাবে? কাজকর্ম করবে? সেখানেও বিপদ। হায়েনার দল ঠিক কোথায় নেই? "
" সব জায়গায় আছে এরা। ঘরেবাইরে মেয়েরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। " ইফরাতের কণ্ঠে হতাশার ছাপ।
" ম-রে গিয়েও তো শান্তি নেই। কিছু জানো** তো ম-রদেহ অবধি ছাড়ে না। "
তন্বী বাজে শব্দে ভেতরকার রাগ উগলে দিতে চাইলো। তুহিন লজ্জিত, রাগান্বিত কণ্ঠে বললো,
" কিছু লম্পট, জানো** এর জন্য গোটা পুরুষ সমাজ আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। লজ্জিত।.. ছিঃ! এদের ধরে ধরে জাস্ট কেটে দেয়া উচিত। "
ইফরাত বললো,
" এদেশে কোনো বিচারব্যবস্থা আছে নাকি? অপরাধী যেই হোক না কেন। দু'দিন পর দেখবে ঠিক ছাড়া পেয়ে যাবে। ক্ষমতা, অর্থের কাছে সবাই দুগ্ধ পোষ্য শিশু যেন। "
লাজুক হতাশা প্রকাশ করলো,
" এবারো তাই হবে। অপরাধী তো ছাড়া পেয়ে যাবে। তবে আজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হলো এই মেয়েটার পরিবার। মেয়েটার কতই বা বয়স? গোটা জীবনটা পড়ে ছিল সামনে। এরমধ্যে সব শেষ। আল্লাহ্! "
দুঃখ, হতাশায় ছেয়ে গেল ঘরটা। বদলে গেল হাসিখুশিময় পরিবেশ। সবার মাথায় ঘুরছে কিছুক্ষণ আগের নি-র্মম সংবাদটা। কি থেকে কি হয়ে গেল। গুমোট পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লো ভয়, আ'তঙ্কের রেশ।
•
রাতের খাওয়া-দাওয়া মাত্র শেষ হলো। চেয়ারে বসে রয়েছে শাহেদ। গ্লাস হতে পানি পান করছে সে। ভারী শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো আফসানা। এঁটো থালা বাসন নিয়ে অগ্রসর হলো রান্নাঘরের দিকে। কিচেন সিঙ্কে সেগুলো আস্তে করে রাখলো। ছেড়ে দিলো কল। হালকা ভিজিয়ে নিলো নোংরা থালা বাসন। কলটা বন্ধ করে দিলো এবার। বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। ওড়নার কোণা দিয়ে মুছে নিলো গলায় থাকা ঘাম। শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। দম বন্ধ বন্ধ লাগছে কেমন। তবুও এই থালা বাসন ধোয়া বাকি। এগুলো সকালের জন্য নোংরা ফেলে রাখা যাবে না। এই বদভ্যাস নেই তার। সময়েরটা সময়ে করতে অভ্যস্ত সে। আফসানা চোখ বুঁজে শ্বাস ছাড়লো। লিকুয়েড ওয়াশ দিয়ে যেই একটা প্লেট ধুতে উদ্যত হলো হঠাৎই থেমে গেল হাত। পেছন হতে পুরুষালি এক বন্ধনে আবদ্ধ হলো ভারী শরীরটা। বৃদ্ধি পেল হৃদয়ের স্পন্দন। আস্তে আস্তে ডানে মুখটা ঘুরালো আফসানা। চোখের তারায় ধরা দিলো স্বামীর অবয়ব। মুচকি হেসে গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো মানুষটা। আদেশ জারি করলো,
" রুমে যাও। "
" এগুলো ধুয়ে তারপর যাচ্ছি। তুমি এখানে কেন? কিছু লাগবে? "
" হু। তোমাকে। "
লজ্জার ছোঁয়া লাগলো গালে। মুচকি হাসলো আফসানা। সে হাসি দু'চোখ জুড়িয়ে দেখলো শাহেদ। আরেকটু সান্নিধ্যে এলো। চিবুকে চুমু এঁকে বললো,
" ঘরে যাও সানা। তোমার কষ্ট হচ্ছে। "
" এগুলো.. "
আফসানা বিভ্রান্ত। শরীর সায় দিতে চাইছে না আর। আরাম চাইছে। আরাম।
" এগুলো আমি ধুয়ে দিচ্ছি। তুমি গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করো। খেয়েই ডিরেক্ট শুয়ে পড়বে না। ইটস্ অ্যা ব্যাড হ্যাবিট। "
" কিন্তু তুমি... "
" যাও। "
গম্ভীর আদেশ। বাধ্য হয়ে হাত ধুয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল আফসানা। রয়ে গেল শাহেদ। পটু হাতে এঁটো থালা বাসন ধুয়ে ফেলতে লাগলো। ধুয়ে ধুয়ে সেগুলো রাখলো যথাস্থানে। পানি ঝড়িয়ে পড়ার জন্য।
বেডরুমে আস্তে ধীরে হেঁটে চলেছে আফসানা। পেটের ওপর আলতো করে রাখা হাত। ঠোঁটের কোণে স্বস্তির ছাপ। মহান রবের নিকটে শতকোটি শুকরিয়া। এমন বুঝদার, যত্নশীল, দায়িত্ববান জীবনসঙ্গী পাঠানোর জন্য। গর্ভাবস্থায় তার শরীর মন দুটোই বড় নাজুক হয়ে গিয়েছে। শরীরটা অল্পতেই হাল ছেড়ে দেয়। দিনকে দিন দুর্বলতা আরো গ্রাস করে নিচ্ছে। রোজকার স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে গিয়েও হাঁপিয়ে ওঠে বারবার। এক কাজের মধ্যে কয়েকবার বিরতি নেয়। বসে পড়ে সোফায় কিংবা চেয়ারে। যথাযথ বিশ্রাম নিয়ে এরপর কাজটা ধাপে ধাপে সমাপ্ত করে। বুয়া রয়েছে। তবুও বেশিরভাগ সময় কাজের দায়িত্ব তুলে নেয় ওই মানুষটা। ঘরে থাকলে যথাসম্ভব তার কাজগুলো নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়। কাপড়চোপড় ধুয়ে রোদে শুকোতে দেয়া। এঁটো থালা বাসন ধোয়া। বাথরুম ধোয়া। বিছানা ঝাড় দেয়া। কখনো আবার ময়লা ফ্যানটাও মুছতে সহায়তা করা। মাঝেমধ্যে আবার হুটহাট রান্না করে চমকে দেয়া বউকে। স্বামীর ভাবনায় বিভোর রমণীর ঠোঁটে লাজে রাঙা হাসি ফুটে উঠলো। হাঁটা থামিয়ে আস্তে করে বিছানায় হেলান দিয়ে বসলো সে। কিছুক্ষণ বাদে ঘরে ফিরে এলো শাহেদ। অফিসের ফাইল নিয়ে বসলো স্ত্রীর পাশে।
" এখন আবার কাজ? "
" হুম। একটু বাকি আছে গো। এই হয়ে যাবে। "
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে,
" তুমি এখনো জেগে আছো কেন? ঘুমাও। আসো। কাছে আসো। "
যত্নের সহিত স্ত্রীকে কাছে টেনে নিলো শাহেদ। একহাতে জড়িয়ে নিলো নিজের সঙ্গে। মাথাটা আলতো করে রাখলো নিজের কাঁধে। গালে হালকা করে হাত বুলিয়ে দিলো। মুচকি হাসলো দু'জনে। স্ত্রীকে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে রেখে শাহেদ মগ্ন হলো অফিসিয়াল ফাইলে। অপরদিকে আফসানা বিভোর হয়ে রইলো স্বামীর যত্ন, ভালোবাসায়।
•
নিস্তব্ধ, অন্ধকার রাত। গরমে হাঁসফাঁস আবহাওয়া। বেলকনিতে ফ্লোর বেডে শুয়ে রয়েছে লাজুক। কারেন্ট চলে গিয়েছে। জেনারেটর চলছে এ বাড়িতে। আশেপাশে যতদূর চোখ যায় প্রায় সবটুকু আঁধারে তলিয়ে। চাঁদের ক্ষীণ আলো উঁকি দিচ্ছে মেঘের আড়াল হতে। আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি এলে খুব ভালো হতো। ধুয়েমুছে যেতো এই অতিষ্টকর গরম। গরমে লালচে রঙে ছেয়ে যাচ্ছে মেয়েটার ফর্সা মুখখানি। বিন্দু বিন্দু ঘাম কপালে, গলায় জমা হয়েছে। ওড়নাটা আরেকটু খোলামেলা করে দেহে জড়িয়ে রাখলো লাজুক। আকাশে মেঘ। কিন্তু বাতাসের দেখা নেই। গাছের একটা পাতাও নড়তে নারাজ। সবই তো রবের নির্দেশ। ঘরেও মন টিকছে না আজ। একে তো এমন উত্তপ্ত গরম। এর ওপর আজকের সে-ই নি-র্মম সংবাদ। মনটা ভার হয়ে আছে। কিছুই ভালো লাগছে না। বিষন্নতা চেপে বসেছে অন্তরে। আজ বইয়ের পাতাও মনটা ভালো করতে ব্যর্থ। দুনিয়ায় রোজ যে নৈতিক, অনৈতিক কত কি ঘটে! আল্লাহ্ কি করে সহ্য করেন এত এত অন্যায়? আমরা মানুষ হয়ে তো সামান্যতেই ধৈর্য্যহীন হয়ে যাই। রিয়েক্ট করে ফেলি। না জানি আমার রবের করুণা, ধৈর্য্য, দয়ার ব্যাপ্তি ঠিক কতখানি। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মহান। এলোমেলো বিভিন্ন ভাবনায় বিভোর হয়ে পড়লো মেয়েটা। খানিক বাদে খুলে গেল চাপিয়ে রাখা দরজাটা। বেলকনিতে প্রবেশ করলো লম্বাটে, পেশিবহুল মানুষটা। গায়ে জড়িয়ে রয়েছে স্লিভলেস কালো রঙের ওভারসাইজড এক ক্রপ-টপ। চুলগুলো উস্কো খুস্কো। ঠোঁট হতে সরিয়ে নিলো সিগারেটের শেষ সুখটান। অবশিষ্ট ছাইচাপা অংশটুকু ফেলে দিলো বেলকনি দিয়ে বাইরে। মানুষটির উপস্থিতিতে কিছুটা সচেতন হয়ে উঠলো লাজুক। দেহে আরেকটু ভালো করে জড়িয়ে নিলো ওড়না।
তানসীভ বেলকনির অর্ধ উন্মুক্ত রেলিংয়ে পিঠ এলিয়ে দিলো। দু হাতের কনুই ঠেকিয়ে রাখা রেলিংয়ে। উদাসীন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। চোখ দু'টো ধীরে সুস্থে তীরের ন্যায় লক্ষ্যবিদ্ধ হলো এদিকে। স্ত্রীর অবয়বে। ঠোঁট গোল করে ফাঁক হলো। বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো বিদঘুটে ধোঁয়া। সুতীক্ষ্ণ সে চাহনিতে কিছুটা অস্থির হয়ে পড়লো মেয়েটা। শোয়া হতে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। দেয়ালে এলিয়ে দিলো শরীর। পাশ থেকে দ্রুত হাতে নিলো বই। বুকমার্ক দেয়া পৃষ্ঠাটা খুললো। মনোযোগ দিতে চাইলো বইয়ের পাতায়। তবুও মন বসলো না বইয়ে। সে জানে। স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে ওই গভীর দৃষ্টির প্রখরতা। তাই তো অন্তরে বেজে চলেছে মধুরতম তরঙ্গ। উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে মুখে। কাঁপা কাঁপা হাতে বইয়ের পাতাটা উল্টে দিলো লাজুক। ঠোঁট নাড়িয়ে নিঃশব্দে পড়তে লাগলো। তানসীভ উন্মত্ত চোখে তাকিয়ে ওই নড়তে থাকা দু ঠোঁটে। ঠোঁটের ওপর বামদিকে ছোট্ট একটা তিল। কয়েক ফোঁটা ঘাম ঠোঁটের নিচে থুতনিতে। অপরিমেয় তৃষ্ণায় কাতর হলো মন। আলতো করে পড়লো চোখের পলক। শক্ত হয়ে যাচ্ছে চোয়াল। ধীরে ধীরে আরো বেহায়া হয়ে উঠছে চাহনি। হঠাৎই ছন্দপতন। ফট করে ঘন আঁধারে তলিয়ে গেল পুরো বাড়িটা। জেনারেটর সমস্যায় কাবু হলো চারিধার। চরম অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো মেয়েটা। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। অন্ধকারে যে বড় ভীতি তার। কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে। যেদিকে চোখ যায় ধূ ধূ ধোঁয়াশা। কালো অন্ধকার। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে উঠলো। দ্রুত ওঠানামা করছে বুক। মুহুর্তের মধ্যেই আরো ঘেমে গেল। মানুষটা কোথায় চলে গেল? ভয়ে কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে। চোখে জমছে আতঙ্ক। অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠলো সে,
" শু ন ছে ন? "
চকিতে এক পশলা উত্তাপ ছুঁয়ে গেল শরীর মন। সন্নিকটে একদম অতি সন্নিকটে দাঁড়িয়ে মানুষটা। দেহ প্রায় ছুঁই ছুঁই। চোখে চোখ মিললো দু'জনার। মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের জ্বলজ্বলে আলোয় স্পষ্ট দৃশ্যমান হলো দু'টো মুখ। তানসীভ ডান হাতে ধরা মোবাইলটা। তার আলোয় আরো কাছ থেকে দেখতে লাগলো সঙ্গিনীর মুখখানি। আরো কাছ থেকে পড়ে নিতে থাকলো তাকে। শুষে নিতে লাগলো ভয়ভীতি। নিস্তব্ধ এই অন্ধকারে মেয়েটা যেন বড় এক সাহারা পেল। অজান্তেই আঁকড়ে ধরলো স্বামীর পেশিবহুল-ফোলা বাম হাত। অপ্রত্যাশিত এই স্পর্শ। অভাবনীয় এই নৈকট্য। বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো আরো তীব্র অধীরতা। তানসীভ আস্তে করে একবার তাকালো। দেখে নিলো তার বাহুতে চমৎকার রূপে জড়িয়ে থাকা হাতটা। এই হাতটা এখানেই সুন্দর মানানসই। এখানেই পারফেক্ট। চোখ তুলে তাকালো সে। মানুষটার চাহনি আরো গাঢ় হলো। চোখের তারায় ভেসে উঠলো আরো ব্যগ্ৰতা। একটু একটু করে আগের চেয়েও বেশি কাছে এলো তারা। দু জোড়া ঠোঁট অতি নিকটে। সমস্ত সীমানা পেরিয়ে আরো কাছে। উষ্ণ নিশ্বাস আছড়ে পড়ে অপরজনের মুখে। লাজুকের নিঃশ্বাসের গতিবেগ দিশেহারা। চোখে নামহীন মোহাচ্ছন্নতা। গোপন এক প্রশ্রয়। নিষ্পলক চেয়ে রইলো মানুষটা। মধ্যকার দূরত্ব হটিয়ে একদম হৃদয়ের কাছাকাছি চলে এলো। ঠোঁটে ঠোঁট প্রায় ছুঁয়েই গেল। হঠাৎ...
চলবে।