#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[১০]
" শু ন ছে ন? "
চকিতে এক পশলা উত্তাপ ছুঁয়ে গেল শরীর মন। সন্নিকটে একদম অতি সন্নিকটে দাঁড়িয়ে মানুষটা। দেহ প্রায় ছুঁই ছুঁই। চোখে চোখ মিললো দু'জনার। মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের জ্বলজ্বলে আলোয় স্পষ্ট দৃশ্যমান হলো দু'টো মুখ। তানসীভ ডান হাতে ধরা মোবাইলটা। তার আলোয় আরো কাছ থেকে দেখতে লাগলো সঙ্গিনীর মুখখানি। আরো কাছ থেকে পড়ে নিতে থাকলো তাকে। শুষে নিতে লাগলো ভয়ভীতি। নিস্তব্ধ এই অন্ধকারে মেয়েটা যেন বড় এক সাহারা পেল। অজান্তেই আঁকড়ে ধরলো স্বামীর পেশিবহুল-ফোলা বাম হাত। অপ্রত্যাশিত এই স্পর্শ। অভাবনীয় এই নৈকট্য। বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো আরো তীব্র অধীরতা। তানসীভ আস্তে করে একবার তাকালো। দেখে নিলো তার বাহুতে চমৎকার রূপে জড়িয়ে থাকা হাতটা। এই হাতটা এখানেই সুন্দর মানানসই। এখানেই পারফেক্ট। ধীরস্থির চোখ তুলে তাকালো সে। চাহনি আরো গাঢ় হলো। চোখের তারায় ভেসে উঠলো আরো ব্যগ্ৰতা। একটু একটু করে আগের চেয়েও বেশি কাছে এলো তারা। দু জোড়া ঠোঁট অতি নিকটে। সমস্ত সীমানা পেরিয়ে আরো কাছে। উষ্ণ নিশ্বাস আছড়ে পড়ে অপরজনের মুখে। লাজুকের নিঃশ্বাসের গতিবেগ দিশেহারা। চোখে নামহীন মোহাচ্ছন্নতা। গোপন এক প্রশ্রয়। নিষ্পলক চেয়ে রইলো মানুষটা। মধ্যকার দূরত্ব হটিয়ে একদম হৃদয়ের কাছাকাছি চলে এলো। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ছুঁই ছুঁই দূরত্বটুকু ঘুচেই যাচ্ছিল। সহসা লাজে রক্তিম মুখখানি ঘুরিয়ে নিলো মেয়েটা। সিগারেটে পোড়া ঠোঁট ছুঁলো সঙ্গিনীর কানের নিচে। নরম, সংবেদনশীল ত্বক। আবেশে বুজে গেল চোখ। নখ গেঁথে গেল ফোলা বাহুতে। শ্বাস গাঢ় হলো মেয়েটির। পুরু ঠোঁট জোড়া একটু একটু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ত্বকে। অন্বেষণ করতে চাইছে পুরোটা তাকে। উন্মাদনার চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছে মস্তিষ্ক। ঠিক বেঠিকের বাইরে। ঘামে ভেজা ত্বকে তখন সঙ্গীটির বিচরণ। দু'জন মানুষ একে অপরের অন্তরঙ্গতায় মত্ত। হঠাৎ জ্বলে উঠলো আলো। বিদ্যুতের এই আকস্মিক ফিরে আসাটা ঘোর ভেঙ্গে দিলো মেয়েটির। ফট করে খুলে গেল চোখ। দ্রুতগামী শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবেগ। দিশেহারা বোধশক্তি। হঠাৎই শক্তপোক্ত বন্ধন হতে সরে গেল লাজুক। ঘন শ্বাস ফেলতে লাগলো। ইতিউতি না ভেবে দ্রুত পায়ে চলে গেল ঘরের ভেতরে। প্রায় পালিয়ে গেল অপ্রতিরোধ্য এই অন্তরঙ্গতার বেড়াজাল হতে। একাকী বেলকনিতে দাঁড়িয়ে মানুষটা। মোবাইল পড়ে রয়েছে ফ্লোর বেডে। নিশ্বাসের ওঠানামা অস্থির। বাঁ হাতটা ঠেসে ধরলো দেয়ালে। নিজের সবটুকু ভর ছেড়ে দিলো সেথায়। মাথা নিচু। বুকের ওঠানামা দ্রুততম। এলোমেলো হৃদস্পন্দন। নাকের ডগায় লালচে ছাপ। তিরতিরিয়ে কেঁপে চলেছে ঠোঁট। দিশেহারা, অদম্য নিজেকে সামলাতে মগ্ন হয়ে পড়লো সে।
•
কালো মেঘে ছেয়ে গিয়েছে আকাশ। সূর্য মামা লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। বাতাসের মৃদু ঝাপটা ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। ভার্সিটি শেষে একসাথে বেরিয়েছে লাজুক, বিথী। কাঁধে ব্যাগ জড়িয়ে দু'জনে হেঁটে চলেছে রাস্তার পাশ ধরে।
" আকাশ কিভাবে কালো হয়ে গেছে! বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।"
আবহাওয়া অবলোকন করতে করতে চিন্তিত কণ্ঠে বললো বিথী।
" হলে আলহামদুলিল্লাহ্ ভালোই হয়। কি যে গরম পড়েছে। টেকা মুশকিল। "
" তুমি তো আপা বড়লোক মানুষ। এসির নিচে ঘুমাও। তোমার আবার কিসের প্যারা? যত জ্বালা তো আমাদের মিডল ক্লাসের। "
" অবেলায় বাজে বকিস না তো। "
মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের এই অহেতুক পার্থক্য পছন্দ হলো না তার।
" কেন? সত্যিই তো বললাম। "
ভ্রু নাচিয়ে বললো বিথী। লাজুক মুচকি হেসে উঠলো ওর ভ্রু দ্বয়ের দুষ্টু নৃত্য দেখে। মেয়েটা ভারী মিষ্টি যে!
" সত্যমিথ্যার আখ্যান ছাড় তো এবার। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। "
ফট করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল বিথী। অবাক কণ্ঠে জানতে চাইলো,
" সে কি রে! ফুচকা খাবি না? "
লাজুক হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো পাশে। বললো,
" না। "
" বাহ্! মিঙ্গেল মানুষ তুমি। এই সিঙ্গেলকে ফুচকা খাওয়ানোর স্বপ্ন দেখিয়ে এখন ফাঁকিবাজি করছো! ভার্সিটি ছুটি হতেই ভেগে যাচ্ছো স্বামীর কাছে। কেয়া বাত হ্যায়! আজ একটা স্বামী নেই বলে আমিও এমন ফাঁকিবাজি করতে পারলুম না রে। "
নেকু কণ্ঠে বলে উঠলো বিথী। প্রায় কেঁদে দেবার মতো অঙ্গভঙ্গি। লাজুক নিঃশব্দে হেসে উঠলো।
" তুই কি পরিমান ড্রামাবাজ রে! আবহাওয়া দেখেছিস? এখন ফুচকা খেতে গেলে নির্ঘাত ভিজে পুড়ে বাড়ি ফিরতে হবে। ঠাণ্ডা লেগে যাবে। "
" তো? গরম করার জন্য... আছে তো একজন। "
চোখ টিপে দিলো বিথী। লাজুক হতভম্ব চোখে তাকিয়ে! দিনদুপুরে মেয়েটা বেলাজের মতো এসব কি বলছে? ছিঃ! লাজুকের এই অবাক চাহনিতে বিথী ভারাক্রান্ত ভঙ্গিতে বুকে হাত চেপে ধরলো। মেঘাচ্ছন্ন আসমানে তাকিয়ে করুণ কণ্ঠে বলতে লাগলো,
" ইয়া আল্লাহ্! এই সিঙ্গেলের ডাকে একটু সাড়া দিন। আর কতকাল একাকী বৃষ্টিতে ভিজবো? এবার তো কেউ আসুক। "
হাসিমুখে বান্ধবীর বাহুতে চাপড় মে রে দিলো লাজুক। তাড়া দিলো,
" চল। বৃষ্টি নেমে যাবে। "
ভার্সিটি হতে কিছুটা দূরে অটো স্ট্যান্ডের কাছাকাছি দাঁড়ালো দু'জনে। খালি রিকশার অপেক্ষায়। বিগত কয়েকদিন ধরে রিকশা কিংবা অটোতে চলাচল করছে লাজুক। বাড়ির গাড়ি সার্ভিসিংয়ে। এতে বেশ প্রসন্ন হয়েছে সে। বড় ভাবীর কাছে অনুরোধ করেছে আপাতত কয়টা দিন অন্য কোনো গাড়ির ব্যবস্থা না করে দিতে। গাড়িতে কেমন পর পর অনুভুত হয়। নিজেকে ঠিক চিনতে পারে না সে। রিকশা, অটোতেই তার আসল পরিচয়। প্রকৃত সম্মান।
" অ্যাই খালি। "
হাত বাড়িয়ে একটা রিকশা ডাকলো বিথী। রিকশাওয়ালা সাড়া দিলো না। চলে গেল ওদের সামনে দিয়েই।
" কাণ্ড দেখেছিস? বৃষ্টি নামার আগেই কাকুদের ভাব বেড়ে গেছে। এখন যেন চোখে পড়েই না আমাদের। "
বিথীর কণ্ঠে অসন্তোষ। ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো লাজুক। হালকা বাতাস শুরু হয়েছে। পথেঘাটে লোকজন নিজ কর্মে ব্যস্ত। কেউবা ফিরে যাচ্ছে ঘরে। দু'টো মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলো রিকশার অপেক্ষায়। হঠাৎই কানে এলো অপরিচিত এক নরম কণ্ঠস্বর।
" আপা! "
লাজুক, বিথী তাকালো ডানপাশে। কিশোরী এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। জীর্ণশীর্ণ এক ফ্রক পড়া। শ্যামলা চোখেমুখে মলিনতা। হাতে একগুচ্ছ ফুল। ফুল বিক্রেতা নাকি? এতটুকু বয়সে জীবিকা নির্বাহের জন্য এমন পথ বেছে নিতে হয়েছে। লাজুকের মনটা ভারাক্রান্ত হলো। বিথীর পাশ কাটিয়ে সে কাছে গেল। কিশোরীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো,
" হ্যাঁ বলো। আমাদের ডাকছিলে? "
" হ আপা। এই ফুলগুলা নেন। আমনের। "
বিথী কিছুটা অবাক হলো! লাজুক কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে বললো,
" আমাদের? কিন্তু আমাদের তো এখন ফুল লাগবে না। "
বিথীর দিকে ঘুরে তাকালো সে। ইশারায় জানতে চাইলো তার লাগবে কিনা। বিথী নেতিবাচক মাথা নাড়লো।
" না রে। "
লাজুক কিশোরীর দিকে তাকালো। এমন করুণ আবহাওয়া। এরমধ্যে ছোট একটা মেয়ে রিজিক অন্বেষণে ব্যস্ত। খারাপ লাগলো ওর। তাই সিদ্ধান্ত বদলে ফেললো। মেয়েটির মাথায় হালকা করে হাত বুলিয়ে বললো,
" আচ্ছা ঠিক আছে। আমাকে দাও। আমি নিয়ে নিচ্ছি। কত দাম? "
" টাকা লাগবো না তো আপা। "
বিথী কৌতূহলী কণ্ঠে বললো,
" কেন? টাকা লাগবে না কেন? রেইনি অফার চলছে নাকি? "
শেষের কথাটা ঠিক বুঝলো না কিশোরী। সে একগাল হেসে বললো,
" এই ফুলগুলা তো সুন্দরী আপার গিফট। এক ভাই দিছে আপারে। "
বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো যেন সেখানে। লাজুক এবং বিথী অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকালো! হঠাৎই ত্যাছড়া হেসে উঠলো বিথী। সংগীতশিল্পীর ন্যায় হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বেসুরো গলায় গেয়ে উঠলো,
' আজি বাদলমুখোর এই দিনেএএএ... সখী তোমারে পুষ্প ভেজিল কোন মানবে...? ওওওও '
লাজুক হতবাক! হিসাব মেলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। বিথী তখনো গেয়ে চলেছে,
' বলো। বলো না তুমি। বলো গোওওওও। '
" থাম না ভাই। এসব ছাইপাশ কি গাচ্ছিস? গানের আগামাথা খেয়ে দিচ্ছিস একদম। "
লাজুকের কণ্ঠে কেমন বিরক্তি। সে কিশোরীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। মেয়েটা চুপচাপ ফুল হাতে দাঁড়িয়ে। লাজুক মৃদু কন্ঠে বললো,
" ফুলটা আমাকে দিয়েছে? কে দিয়েছে? তুমি চেনো তাকে? "
" এক ভাই কিইন্না দিছে। গাড়িত ছিল। আমি তো চিনি না। "
বিথী দুষ্টু হেসে বাহুতে ধাক্কা দিলো একটুখানি। বললো,
" ওয়ে! তোমার সাহেব কিনে দেয়নি তো আবার? বাদলা দিনে মনটা চায় কিছুমিছু। হুম? হুম? "
" ধ্যাৎ। উনি দেননি। উনি এভাবে... "
হিসাব কোনোমতে মিলছে না। তাই তো বললো,
" সম্ভব নয়। "
" আরে সম্ভব সম্ভব। পেয়ার অর জাং মে সাব কুচ হোতা হ্যায়। "
আশ্বাস দিলো বিথী। তবে লাজুক তা মানতে নারাজ। সে নিশ্চিত। শতভাগ নিশ্চিত এই ফুল মির্জা তানসীভ শাহ্ এর পক্ষ থেকে আসেনি। ঘটনা অন্যকিছু। সে মেয়েটির কাছে নরম গলায় জানতে চাইলো,
" আচ্ছা সে-ই লোকটা কোথায়? আমাকে দেখিয়ে দেবে?"
" হ্যায় তো চইলা গেছে গা। ফুলডা আপনারে দিতে কইলো। "
লাজুক এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হলো। মির্জা তানসীভ শাহ্ এমন লুকোচুরি খেলার মানুষ নন। তিনি যা করেন বীরদর্পে করেন। শিরদাঁড়া উঁচু করে।
" এক কাজ করো। এই টাকাটা রাখো তুমি। আমি ফুলের দাম দিয়ে দিচ্ছি। "
লাজুক ব্যাগ হতে টাকা বের করতে করতে বললো। মেয়েটা অবাক হয়ে বললো,
" হেই ভাই তো টাকা দিছে। আপনেও দিবেন আবার? "
" হ্যাঁ। আমি তো সে-ই মানুষটাকে চিনি না। তাই এভাবে ফুলগুলো নিতে পারছি না। আবার নষ্ট-ও করতে পারছি না। তাই টাকাটা রাখো তুমি। আমি ফুলটা কিনে নিলাম। "
মেয়েটাকে অহেতুক বিড়ম্বনায় না ফেলার জন্য, ফুলগুলো কিনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো লাজুক। ছোট মেয়ে। অত প্যাঁচ বোঝে না সে। একগুচ্ছ ফুলের বিনিময়ে ডাবল টাকা পেয়ে যারপরনাই খুশি সে।
" আপনে অনেক ভালো আপা। সুন্দর আপা। "
লজ্জার হাসি দিয়ে মেয়েটা এক দৌড়ে চলে গেল সেখান থেকে। লাজুকের হাতে একগুচ্ছ ফুল। সাদা গোলাপ এবং বেলির দ্বৈত শুভ্রতা। সম্মোহনী সুগন্ধ। লাজুকের পছন্দের। মেয়েটা বিভ্রান্ত, কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইলো ফুলের দিকে। বান্ধবীর প্রতিক্রিয়া দেখে বিথী উপলব্ধি করতে পারলো, বিষয়টা মোটেও সহজ নয়। কিছু তো রয়েছে। এদিকে লাজুকের মনে চলতে থাকে অজানা এক খচখচানি। অজ্ঞাত কোন ব্যক্তি, কোন গোপন উদ্দেশ্যে পাঠালো এই ফুল?
•
আধো অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছে ধরিত্রী। সন্ধ্যা নেমেছে আপন গতিতে। মিনারা বেগমের ঘরে বিরাজমান ভারী নীরবতা। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় বসে আছেন তিনি। চোখের নিচে কালি। ঠোঁট ফ্যাকাশে। মাথার পাশে বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা কিছু ওষুধের স্ট্রিপ। পানির গ্লাস। শরীরটা আজ ভালো নেই। সে-ই সকাল থেকে অস্থির লাগছে। বুকের ভেতর যেন চেপে বসেছে ভারী পাথর। খাটের পাশে একটা টুল। সেটাতে বসে রয়েছেন লতা বেগম। মুখে গম্ভীর ভাব। চোখে চিন্তার রেখা।
" প্রেশার মেপেছেন আজ? "
" সকা-লে। বেড়েছে। "
আধো শব্দে জবাব দিলেন অসুস্থ বয়স্কা নারী।
" এখন অন্তত নিজের যত্ন নিতে শিখুন ভাবী। আজীবন তো অযত্ন ই করে গেলেন। " কণ্ঠে স্পষ্ট দীর্ঘশ্বাস।
" হা? যত্ন? "
ফ্যাকাশে মুখে কেমন হাসি ছড়িয়ে পড়লো। স্বাভাবিক নয় সে-ই হাসি। বড় অদ্ভুত। লতা বেগম চুপ রইলেন। কানে আসছে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ। সন্ধ্যা ছয়টা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। কিছু সময় পাড় হলো। নীরবতা ভেদ করে উনি উদ্বেগের কণ্ঠে বললেন,
" তানসীভের জন্য বড় চিন্তা হয় ভাবী। ওর জীবনটা স্বাভাবিক নয়। "
" আমার ছেলেটা.. শেষ হয়ে যাবে আ পা। ওকে বাঁ-চান।"
আকুল সে মায়ের কণ্ঠস্বর। চোখ বুঁজে চুপ করে পড়ে রইলেন বিছানায়। থেমে থেমে হতাশার কথা ব্যক্ত করলেন ননদ। দৃষ্টি নিবদ্ধ দেয়ালে থাকা এক ন্যাচারাল পেইন্টিংয়ে।
" নিজের অজান্তেই ছেলেটা মস্তবড় এক চোরাবালিতে হারিয়ে গিয়েছে। এখুনি না ফিরতে পারলে ধ্বংস অনিবার্য। "
মিনারা বেগমের গাল বেয়ে পড়লো অশ্রু। মা হয়ে সন্তানের ধ্বংসের অগ্রীম বার্তা, কেমন করে সইবেন উনি? এ কি সওয়া যায়?
" ওরা দুই ভাই। দু'জন দুই দুনিয়ার। ওদের মধ্যকার সম্পর্কটা দেখলে খারাপ লাগে। মেনে নিতে কষ্ট হয়। কখনো কি সবটা ঠিক হবে না ভাবী? এর সমাধান কোথায়? "
লতা বেগমের কণ্ঠে ক্লান্তি, যন্ত্রনার ছাপ। মিনারা বেগম নীরবে অশ্রু ঝড়িয়ে চলেছেন। এ কথার পৃষ্ঠে কি বলবেন উনি? কিছু বলার আছে কি?
" দুই ভাইয়ের এই দূরত্ব দিনশেষে খারাপ ছাড়া ভালো কিছুই বয়ে আনবে না। "
" মা আসবো? "
ঘরের দরজায় অন্য কারোর উপস্থিতি। তৎক্ষণাৎ গম্ভীরতার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে নেন লতা বেগম। দরজায় দাঁড়িয়ে লাজুক। হাতে ট্রে। মায়ের জন্য নাস্তা এনেছে সে। বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে মেয়েটা। কানে ভেসে চলেছে,
' দুই ভাইয়ের এই দূরত্ব দিনশেষে খারাপ ছাড়া ভালো কিছুই বয়ে আনবে না। '
" ওহ্ তুমি? এসো। "
লতা বেগম অনুমতি দিলেন। ভেতরে প্রবেশ করলো লাজুক। উপরে উপরে স্বাভাবিক তার অভিব্যক্তি। তবে অন্তরে বেশকিছু অজানা প্রশ্নের কিলবিল। দুই ভাইয়ের মধ্যকার শীতলতা বেশ আগেই টের পেয়েছে সে। কিন্তু এর পেছনের কারণ জানতে পারেনি কখনো। সবটাই ধোঁয়াশায় ঘেরা।
" শরীরের এখন কি অবস্থা মা? "
" ভা লো। "
নড়বড়ে কণ্ঠে জবাব দিলেন মিনারা বেগম। পুত্রবধূকে দেখে মিথ্যা হাসার চেষ্টা করে চলেছেন। লাজুক বুঝতে পারে। অনুভব করতে পারে তার হঠাৎ আগমনে বাতাসে বদলে গিয়েছে কোনো পুরনো গোপন সূত্র। কিছু রাখঢাক করার জোরদার চেষ্টা চলমান।
" খাইয়ে দাও তুমি। আমি আবার পরে আসবো। ভাবী! আসছি। "
লাজুকের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে ভাবীর দিকে তাকালেন লতা বেগম। চোখে চোখে কিছু কথা হলো বোধহয়। নীরবে সেখান থেকে চলে গেলেন উনি। অস্থিরতার সহিত বেশকিছু প্রশ্ন নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো লাজুক নূরাইন।
•
জুম্মা বার আজ। ছুটির দিন। সকাল থেকেই বাড়িতে কেমন উৎসবের আমেজ। লিভিংরুমে চঞ্চল পাখির ন্যায় ছুটে বেড়াচ্ছে তন্বী। রায়হান সোফায় বসা। কোলে ল্যাপটপ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বোনের কাণ্ড দেখে মুচকি হাসছে সে। ইফরাত হাসিমুখে স্বামীর পাশে এসে বসে। এগিয়ে দেয় এক কাপ চা। রায়হান কাপটা হাতে নেয়। একটুখানি দূরে সোফায় বসে রয়েছে তুহিন। কফির কাপে চুমুক দিয়ে বোনের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে সে,
" ওই চুলবুলি! উড়াউড়ি বন্ধ করে এবার তো একটু দম নে। "
সোফায় ধপাস করে বসে পড়লো তন্বী। একগাল হাসি উপহার দিলো। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,
" আজ আমার মনটা খুব ভালো আছে ভাইয়া। যা পারো বলে নেও। আমি কিছু বলবো না। সব মা ফ। "
" ওলে বাবা লে! তোমায় যেন কত ভয় পাই আমি! "
তুহিনের কণ্ঠে ব্যঙ্গ। তাতে বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে, জিভ বের করে ভাইকে ভেংচি কাটলো তন্বী। ভাই ছোট ছোট চোখ করে তাকালো। লাজুক সে মুহূর্তে এলো এখানে। বসলো তন্বীর পাশে। তন্বীর দেখাদেখি সে-ও হাসির সংক্রমণে সংক্রমিত হলো। হালকা হেসে উঠলো।
" এই ভাইয়া! আমরা কখন বের হবো? "
তন্বী একগাদা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো রায়হানকে। কিবোর্ডে আঙ্গুল চালাতে চালাতে রায়হান জবাব দিলো,
" এই সাড়ে তিনটা, চারটা নাগাদ। "
" আরেকটু আগে গেলে হয় না? "
" তুই কি এবার সকাল সকাল গিয়ে দোকানের ফার্স্ট শাটার খুলবি? "
তুহিন খেপিয়ে দিলো বোনকে। তন্বী মেজাজ গরম করে রায়হানের কাছে বিচার দিলো,
" ভাইয়া! কিছু বলো ওকে। ও যদি এমন করে আমি কিন্তু নেবো না ওকে। "
" হাহ্! আমি যেন নিজ পায়ে চলতে পারি না। দুগ্ধ পোষ্য শিশু! "
" ভাইয়া! "
চেঁচিয়ে উঠলো তন্বী। রায়হান চোখ গরম করে তাকালো ভাইয়ের দিকে।
" তুহিন এবার কিন্তু বেশি বেশি হচ্ছে। ওর পেছনে কেন লাগছিস? "
" পেছনে কোথায় লাগলাম? আমি তো বামে। "
একাকী বিড়বিড় করে উঠলো তুহিন। চুমুক দিলো কফির কাপে। মনে মনে সন্তুষ্ট হলো তন্বী। আচ্ছা হয়েছে। বেশ হয়েছে। লাজুক ও ইফরাত একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। হঠাৎ কিছু মনে করার ভঙ্গিতে সচেতন হয়ে বসলো তন্বী। জানতে চাইলো,
" এক মিনিট। ছোট ভাইয়া যাবে না? "
উপস্থিত মানুষগুলো সচেতন ভঙ্গিতে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। ইফরাত জিজ্ঞেস করলো লাজুককে,
" সাহেব যাবে? "
লাজুকের মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে, যাওয়ার সম্ভাবনা অতীব ক্ষীণ।
" এটা কোনো কথা? আমরা সবাই মিলে যাবো। ঘুরবো ফিরবো। কত এনজয় করবো। ছোট ভাইয়া গেলে খুব ভালো হতো। "
তন্বী সন্তোষ প্রকাশ করতে ব্যর্থ। তুহিন টেবিলের ওপর কফির কাপটা রেখে বললো,
" গেলে তো খুব ভালো হতো। এখন কথা হচ্ছে যে, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? "
মূল সমস্যা তো এখানেই। সবাই চুপ হয়ে গেল। রায়হান ল্যাপটপে কাজে ব্যস্ত। বাকি সকলে ভাবতে লাগলো কিভাবে কি করা যায়। সে মুহূর্তে ফোনে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো তানসীভ। উপস্থিত মানুষগুলোর দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তার দিকে। তন্বী সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ইশারায় বুঝালো কিছু বলতে চায় সে। হাতের তালু দেখিয়ে থামতে ইশারা করলো তানসীভ। এসে দাঁড়ালো ওদের এখানে। অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলো তন্বী। লাজুক উঠে দাঁড়ালো ননদের পাশে। ফোনে কি সব দরকারি কথা শেষ হলো। বোনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো তানসীভ। জিন্সের পকেটে মোবাইল ঢুকাতে ঢুকাতে চোখের ইশারায় বলার অনুমতি দিলো ওকে। তন্বী শুকনো ঢোক গিলে ইফরাত ও লাজুকের দিকে তাকালো। ইফরাত চোখের ইশারায় বলতে বললো। তন্বী জোরপূর্বক হাসি দিয়ে বললো,
" ভাইয়া! আমরা সবাই না আজ.. ঘুরতে যাচ্ছি। বিকেলবেলা। ছোট ভাবীও যাচ্ছে। "
শেষের কথাটায় লাজুক কেমন মিইয়ে গেল। স্পষ্ট অনুভব করতে পারলো, কয়েক সেকেন্ডের জন্য মানুষটার প্রগাঢ় দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে তার অবয়বে।
" তাই আমরা ভাবছিলাম.. আমরা সবাই আর কি। তুমিও যদি আমাদের সঙ্গে জয়েন করতে.. খুব ভালো হতো। তাই না গাইজ? "
হড়বড়িয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললো তন্বী। তুহিন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বোনের সঙ্গে সম্মতি জানালো,
" হ্যাঁ ভাইয়া। তুমিও চলো। "
আঙ্গুলের স্পর্শে চুলে হালকা ব্যাকব্র্যাশ করে তানসীভ নিজস্ব মত জানালো। নিষ্প্রাণ সে কণ্ঠস্বর,
" টাইম নেই। তোরা যা। "
তানসীভ আর দাঁড়ালো না। বিবির দিকে একঝলক তাকিয়ে হাঁটা আরম্ভ করলো দরজার দিকে। বাইরে বেড়োচ্ছে সে। ইফরাত এবং তন্বী ইশারায় বারবার কিছু একটা বলার তাগাদা দিতে লাগলো লাজুককে। লাজুক অসহায় চোখে তাকিয়ে। সে কি বলবে? মানুষটা তার কথা আদৌও শুনবে কি? কিছু বলার অধিকার রয়েছে কি তার? নেই তো। এখন একথা অন্যদের কি করে বোঝাবে সে? ঘরের খবর বাইরে প্রকাশ করা সমীচিন হবে কি? ইফরাত চোখ গরম করে তাকালো। কিছু বলতে বললো। শেষমেষ বাধ্য হয়ে লাজুকের মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো মৃদু স্বর,
" চলুন না। ভালো... লাগবে। "
দরজার অতি সন্নিকটে হঠাৎই থেমে গেল পদ যুগল। স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়লো তানসীভ। পেছনে চার ব্যক্তি যেন নিশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে। হাতঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো মানুষটা। হিসেব কষে নিলো মনে মনে। অতঃপর উদাসীন ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
" স্রেফ এক ঘন্টা। এর বেশি অসম্ভব। "
বড় বড় কদম ফেলে দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল মানুষটি। বিয়ের পর প্রথমবারের মতো বউ কোনো আবদার করেছে। তা ফিরিয়ে দেয়ার মতো এতটাও পা'ষাণ হয়ে উঠতে পারেনি সে। মনুষ্যত্ব আজো টিকে রয়েছে যে। তানসীভ তো চলে গেল। হাওয়ায় ভাসতে লাগলো তার শেষোক্ত কথাটা। প্রথমে কেউ বুঝতে পারলো না। হঠাৎই আনন্দে উল্লাস করে উঠলো তন্বী।
" ইয়েএএ... ভাইয়া যাবে। "
লাজুক অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে দরজায়। মানুষটির গমন পথে। তন্বী একপাশ হতে আলিঙ্গন করে উঠলো ওকে।
" থ্যাংকস ভাবী। তুমি পেরেছো। "
হাসিমুখে ফাজলামি করে উঠলো তুহিন,
" শেষমেষ বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা ভাবীই পড়ালেন! হা হা হা। "
ইফরাত, তুহিন, তন্বী একযোগে হেসে উঠলো। রায়হানের অভিব্যক্তি বোঝা দুষ্কর। লাজে রক্তিম হলো লাজুকের মুখখানি। মানুষটা আসলেই তার এককথায় রাজি হয়ে গেল? তার সামান্য কথায় এতখানি গুরুত্ব? সত্যিই...! অজান্তেই কিছু একটা যেন বদলে গেল। তবে কি সম্পর্কে পরিবর্তন আসার এ-ই শুরুয়াত?
চলবে।