ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

১১তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[১১]

" গাইজ! এটা আবার কি হয়ে গেল? "

শেষ দুপুরের হালকা রোদ্দুর বিছিয়ে রয়েছে জমিনে। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে সাদা রঙের গাড়িটি। গাড়ির পাশে দাঁড়ানো তরুণ সদস্যরা। তন্বী দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে উপরোক্ত প্রশ্নটা ছুড়ে দিলো বাকিদের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে চারজন বসার মতো যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। কিন্তু লোকসংখ্যা তো চারের অধিক। লাজুক বসবে কোথায়? লাজুক বিষয়টা বুঝতে পারে। মনটা খারাপ হয়ে যায় মেয়ের। নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎই তুহিনের মস্তিষ্কে ফট করে আলো জ্বলে উঠলো যেন।

" আরে এত প্যারা নিচ্ছিস কেন বেহনা? ভাইয়া তো আছেই। ভাবী নাহয় ভাইয়ার সঙ্গে যাবে। "

ইফরাত ও তন্বী একে অপরের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। অভাবনীয় এমন প্রস্তাবে লাজুক তো হতবাক! তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো সে,

" না না। আমি ঠিক আছি। আপনারা যান। আমি নাহয় পরে একসময় যাবো। "

" আরে নাহ্! কি যে বলো না ভাবী। দাঁড়াও আমি দেখছি।"

তন্বী বিষয়টি নিজ কাঁধে তুলে নেয়। এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। হঠাৎ চোখে পড়ে ছোট ভাইয়া মির্জা তানসীভ শাহ্। গ্যারেজ হতে ধূলো উড়িয়ে গর্জন করে বের হলো কালো জিপ গাড়িটা। দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং সামলাচ্ছে মানুষটা। গাড়িটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। ওদের ঠিক সামনের পথ ধরে বের হবে ' গুলবাহার মঞ্জিল ' থেকে। গাড়িটা যেই ওদের সন্নিকটে এলো। ওমনি উঁচু গলায় ডেকে উঠলো তন্বী।

" ছোট ভাইয়া! "

সশব্দে গাড়ির টায়ার থেমে গেল জমিনে। রোদচশমার আড়ালে থাকা চোখ জোড়া এদিকে ভিড়লো। তন্বী সঙ্গীদের দিকে ঘুরে তাকালো। ইফরাত চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করলো। বুকভরা সাহস নিয়ে জিপের কাছে এগিয়ে গেল তন্বী। হাত নেড়ে নেড়ে বুঝানোর ভঙ্গিতে বলতে লাগলো,

" ভাইয়া একটা প্রবলেম হয়ে গেছে। গাড়িতে এনাফ সিট নেই। আমরা পাঁচজন। কিন্তু সিট চারটা। এখন ভাবি বলছে... "

তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আকর্ষণ করলো মেয়েটির ঘর্মাক্ত মুখশ্রী। সু-চতুর ভঙ্গিতে নিজেকে সামলে নিলো তানসীভ। তাকালো বোনের দিকে। তন্বী আড়চোখে ভাইয়ের কাণ্ড ঠিক লক্ষ্য করেছে। তবুও বলে চলেছে,

" ভাবী বলছে সে নাকি যাবে না। অন্যসময় যাবে। এটা কোনো কথা হলো, বলো? ভাইয়া পরে আইডিয়া দিলো। তোমার গাড়িতে যাওয়ার। এটা খুব ভালো আইডিয়া। তাই না? ব লো। "

বলতে বলতে কণ্ঠস্বর কেমন ফিসফিসানিতে রূপান্তরিত হলো। সে ভীত। ভাইয়া মানুষটা কখন যে কোন মুডে ট্রান্সফার হয়, অগ্রীম জানা মুশকিল। এখুনি আবার রেগেমেগে প্ল্যান ক্যান্সেল না করে ফেলে। শুকনো ঢোক গিললো তন্বী। তানসীভ মাথা নিচু করে আলতো হাতে কপালের পাশে রগটা ডলে নিলো। বিরক্তি ঝড়ানো কণ্ঠে বললো,

" আর কিছু? বারবার না জ্বালিয়ে একবারে শেষ কর। "

তন্বী মিনতি করে উঠলো,

" ভাইয়া প্লিজ। "

তন্বীর এমন আকুতি এবং মানুষটির কণ্ঠে বিদ্যমান বিরক্তি ঠিক টের পেল লাজুক। এতে যথেষ্ট মনোক্ষুণ্ন হলো তার। তার জন্য কখনো কারো বিরক্তির কারণ সৃষ্টি হোক, সে মোটেও চায় না। সে যাবে না। অন্যরা যাচ্ছে যাক। নিজে কারো বোঝা বাড়াতে যাবে না সে। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল লাজুক। তন্বীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। অনুভব করতে পারলো নিজের ওপর নিবদ্ধ শীতল চাহনি। তা সত্ত্বেও নিচু কণ্ঠে বলতে লাগলো ননদকে,

" তন্বী। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না বোন। তোমরা গিয়ে ঘুরে এসো। আমি পরে একদিন যাবো। কেমন? "

মেকি হাসলো লাজুক। আজকের ঘোরাঘুরি নিয়ে যথেষ্ট উৎসুক ছিল সে। সবটা এখন কেমন বিষাদ ঠেকছে। ননদকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে ফিরেই যাচ্ছিল। তখুনি পেছনে শোনা গেল সে-ই অনুষ্ণ কণ্ঠস্বর,

" আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করার স্পর্ধা দেখাস না তন্বী। যা বলেছিস চুপচাপ কর। ওঠ। "

ভারী ভারী একেকটা শব্দ বাতাসে ছুটে বেড়াতে লাগলো। অদূরে দাঁড়িয়ে পড়েছে লাজুক। কথাগুলো তন্বীর নামে ছোড়া হয়েছে। তবে আসল শিকার তো সে। এতটুকু বুঝতে মোটেও কষ্ট হলো না তার। তবুও সে যাবে না। মনঃস্থির করে ফেলেছে যখন, সে যাবে না। লাজুক চলে যাওয়ার জন্য পুনরায় পা বাড়ালো। পেছনে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলো নামটা,

" ত ন্বী! "

তন্বী এবং উপস্থিত জনতা পড়েছে মহা মুশকিলে। ঝামেলা মিয়া বিবির। মধ্যখানে মধ্যস্ততা করতে গিয়ে আচ্ছামতো ফেঁসেছে স্বয়ং তন্বী। কি জ্বালা রে ভাই। তন্বী অসহায় চোখে বড় ভাই, ভাবীর দিকে তাকালো। ইফরাত ইশারায় বুঝিয়ে দিলো, সে নিরূপায়। কিছু করার নেই। কাঁদো কাঁদো মুখ করে তন্বী গিয়ে দাঁড়ালো লাজুকের পাশে। অসহায় কণ্ঠে ডেকে উঠলো,

" ভাবী! "

তপ্ত শ্বাস ফেললো লাজুক। হাসি হাসি মুখ করে তাকালো তন্বীর দিকে। এই অবেলায় এতগুলো মানুষের উপস্থিতিতে আর বিন্দুমাত্র সিন ক্রিয়েট করতে রাজি নয় সে। অগত্যা ভেতরকার অনুভূতিটুকু সযত্নে গোপন করে নিলো। পিছু ঘুরে দাঁড়ালো। ধীরপায়ে এগোতে লাগলো জিপ গাড়িটির দিকে। ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো তুহিন, তন্বী ভাই-বোন। তারা গিয়ে দ্রুত বসে পড়লো সাদা গাড়িটায়। ইতিমধ্যে অনেকটা বিলম্ব হয়েছে।

জিপ গাড়িটায় চালকের আসনে অভিজাত ভঙ্গিতে বসা মানুষটা। হাতের শক্ত থাবা স্টিয়ারিংয়ে। শিথিল চোয়াল। পাশের সিটের দরজাটা খোলা। ওড়না সামলিয়ে লাজুক উঠে বসে সাবধানে। খোলা দরজা আটকে দেয় নীরবে। চুপটি করে বসে সে। দৃষ্টি সরাসরি সামনে নিবদ্ধ। পাশের মানুষটার দিকে মোটেও মনোযোগ দিতে ইচ্ছুক নয় সে। নাকের ডগায় সুক্ষ্ম রাগের ঝিলিক। বাঁকা চোখে তা ঠিক লক্ষ্য করলো মির্জা সাহেব। সশব্দে ইঞ্জিন গর্জে উঠলো। চালু হলো কালো রঙা জিপ। চলতে লাগলো গন্তব্যের দিকে।

-

সময়টা তখন সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে। দিগন্ত ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে কমলাটে বেগুনি রঙে। ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত এই জায়গাটি। ৩০০ ফিট রোড নামে পরিচিত। রাস্তার একপাশে এসে দাঁড়ালো পরপর দু'টো গাড়ি। আশেপাশে বহু মানুষের কোলাহল। গাড়ির হেডলাইট আড়ছে পড়ে রাস্তায়। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে বেশকিছু বাইক। লোকজনের কলতানে উচ্ছ্বসিত পরিবেশ। গাড়ি হতে বেরিয়ে আসে ওরা ছয়জন। লাজুক উৎসুক চোখে আশেপাশে তাকায়। হরেক রকমের লোকজন, তাদের উচ্ছ্বাস দেখতে পায়। ছোট পরিবার, বন্ধুদের গ্রুপ, কাপল। কারা নেই এখানে? কম-বেশি সকল শ্রেণীর মানুষের আগমন হয়েছে। তন্বী খুশিতে আত্মহারা। ওরা আশপাশটা ঘুরে দেখতে লাগলো। তানসীভ পকেটে দু হাত গুঁজে রাখা। দেহরক্ষীর ন্যায় অবস্থান করছে। হাঁটছে রাগান্বিত বউটার ঠিক পাশাপাশি। লাজুক স্বামীকে অদেখা করে নিজের মতো উপভোগ করতে ব্যস্ত। দেখছে চারিপাশের দৃশ্যাবলী। আশপাশে কিছু মানুষ সেলফি তুলতে ব্যস্ত। কেউ রিকশা কিংবা সিএনজি হতে নেমে আসছে। কেউবা হাঁটতে হাঁটতে হাসাহাসিতে মত্ত।

-

আলতো ভঙ্গিমায় দরজাটা খুলে দেয় তানসীভ। তার পিছুপিছু রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে পরিবারের বাকি সদস্যরা। রায়হান হাতের ইশারায় একপাশের ফাঁকা টেবিলটা দেখিয়ে দেয়,

" চলো ওখানে বসি। "

বড় টেবিলটা ঘিরে বসে পড়ে ওরা ছয়জন। তন্বী আয়েশ করে বসে। পার্স থেকে বের করে মোবাইল। বিভিন্ন রকম পোজ দিয়ে দিয়ে ফটাফট কয়েকটি সেলফি তুলে নেয়। তুহিন মুখ বাঁকিয়ে তাকায়। তানসীভ পকেট হতে মোবাইল বের করতে করতে উদাসীন ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে ইশারায় ডেকে ওঠে। ওয়েটার এসে পাশে দাঁড়ায়। তানসীভ মেনু কার্ড এড়িয়ে দেয়। ভাইবোনদের ইশারায় অর্ডার প্লেস করতে বলে। মেনু কার্ড দেখে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা করতে থাকে দুই রমণী। ইফরাত, তন্বী। লাজুক তাদের সাথে থেকেও স্বভাব বশত চুপচাপ। শুধু মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে।

" দু'টো বড় পিজ্জা। চিকেন শাসলিক, চিকেন নাগেটস। চারটা লেমন জ্যুস। আর.. দু কাপ কফি। "

নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা করে অর্ডার প্লেস করে তন্বী। তুহিন বিড়বিড় করে ওঠে,

" পেটুক রাণী। "

মুখ বাঁকিয়ে তাকায় তন্বী। তখনই শোনা যায় ভারী কন্ঠস্বর,

" একটা লাচ্ছি। "

ইফরাত ও তন্বী ছোট ছোট চোখ করে তাকায়। ইফরাত ভাবনায় পড়ে গেল, দেবর মশাই লাচ্ছি খাচ্ছে কবে থেকে? সে তো এসব ছুঁয়েও দেখে না। যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে বাইরের খাবার। সেখানে আজ হঠাৎ লাচ্ছি খাওয়ার মনোবাসনা? এ কি করে সম্ভব? লাজুক ভাবুক ভঙ্গিতে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পূর্বে সে-ই মেনু কার্ডে বারবার তাকাচ্ছিল, লাচ্ছি আইটেম লেখাটায়। অনেকদিন হয় লাচ্ছি খাওয়া হয়নি। তবে আজ এতগুলো মানুষের উপস্থিতিতে নিজস্ব বাসনা প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করলো সে। তাই আর কিছু বললো না। চুপটি করে রইলো। কিন্তু এখন? মানুষটি কি লক্ষ্য করেছে তার দ্বিধান্বিত রূপটা? তাই ওর হয়ে লাচ্ছি অর্ডার দিল? নাকি এটা শুধুই ওর ভ্রম? লাজুক জানে না। এতশত সে জানে না। জানে শুধু তার অন্তরে রাগের ছদ্মবেশে থাকা অভিমান কিছুটা লাঘব হয়েছে। চুপিচুপি অজান্তেই বদলে যাচ্ছে অনুভূতিগুলো।

অর্ডার চলে এলে ওরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে মুখরোচক বিভিন্ন খাবারে। খাবারের লোভনীয় সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে। নীরবে মানুষটা লাচ্ছির গ্লাস এগিয়ে দেয় স্ত্রীর দিকে। লাজুক মোহিত চোখে তাকিয়ে থাকে স্বামীর বাড়িয়ে দেয়া হাতে। পশমে আবৃত পুরুষালি হাতটা ওকে লাজে র'ক্তিম করে তোলে। আস্তে করে দৃষ্টি নত করে নেয় সে। ইফরাত এবং রায়হান একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে হাসে।

-

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরোলে কিছুটা দূরেই খোলামেলা এক জায়গা। সেখানে এক জলাশয়। হাঁটতে হাঁটতে ওরা চলে যায় সেখানে। এখানে লোকজনের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। স্বস্তিতে নিশ্বাস ফেলে মেয়েরা। ইফরাত, লাজুক, তন্বী গিয়ে দাঁড়ায় জলাশয়ের কাছে। নিজেদের মতো খুঁটিনাটি আলাপে মেতে ওঠে। চাঁদের আলো ঝিলমিল করে চলেছে পানিতে। ওরা পাশেই ফাঁকা স্থানে দাঁড়ায়। কথার তালে হাসি ফুটে ওঠে লাজুকের ঠোঁটে। অভিমান ভুলে সময় কাটাতে লাগলো সে। স্বল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে তানসীভ। কানে ঠেকিয়ে রাখা ফোন। মোবাইলে কথা বলছে সে। দৃষ্টি নিবদ্ধ জলাশয়ের পানিতে। পানিতে ভাসমান এক নিষ্কলুষ রমণীর প্রতিচ্ছবিতে। রমণীর স্বভাবে সরলতা। কণ্ঠে নমনীয়তা। চোখেমুখে এক অভেদ্য মায়াজাল। এ মায়াজালে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে সে। ফেঁ'সে যাচ্ছে অদম্য এক টানে। এই মায়া, এই টান, এই বিচলতা। কোথায় এর সমাপ্তি? কি হতে চলেছে এর পরিণাম? জানা নেই তার। সে শুধু জানে। জেনেশুনেই এই মায়াজালের পথে পা বাড়িয়েছে। দেখা যাক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এর পরিণতি। কিছুক্ষণের মধ্যে পানিতে ভেসে উঠলো সেলফিতে মত্ত তিন রমণীর হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী। মৃদু শ্বাস ফেলে তানসীভ দৃষ্টি হটিয়ে নেয়। কথা শেষে মোবাইলটা রেখে দেয় পকেটে। প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে সে তাকিয়ে থাকে হালকা হাওয়ায় ঝমঝমিয়ে মাতোয়ারা পানিতে। কপালে চিন্তার বলিরেখা।

•

রাত্রি বেলা। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে টুলে বসা লাজুক। রাতের ত্বক পরিচর্যায় ব্যস্ত সে। ঠোঁটের কোণে লজ্জাময় হাসির ছোঁয়া। চোখেমুখে উজ্জ্বলতা। ভেবে চলেছে আজকের বিকেলটা। সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে সে-ই গোপন যত্ন, ৩০০ ফিটে জমানো বেশকিছু অমূল্য স্মৃতি। ভাগ্যিস সে গিয়েছিল। অভিমানের তোপে বাতিল করেনি পরিকল্পনা।‌ নাহলে এই মুহুর্তগুলো যে কখনো তৈরি হতে পারে, সে কল্পনাও করতে পারতো না। ভাগ্যিস তন্বী আবদার করেছিল। মেয়েটার চমৎকার এক ট্রিট পাওনা রইলো। তার জন্যই তো আজ যাওয়া। এত সুন্দর স্মৃতিগুলো কুড়ানো হলো। একমনে এসব ভেবে চলছিল লাজুক। চেহারায় খুশির ছোঁয়া। তখনই খুলে গেল ওয়াশ রুমের দরজা। উদোম দেহে বেরিয়ে এলো মানুষটা। তোয়ালেতে মুখ মুছে সেটা ছুঁড়ে ফেললো বিছানার একপ্রান্তে। লাজুক আজ আর রাগ করলো না। এই সময়টা রাগের নয়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার। স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টস্ যথাস্থানে রেখে লাজুক উঠে দাঁড়ালো। তানসীভ তখন ক্লান্ত দেহটা নিয়ে ধপাস করে আছড়ে পড়েছে বিছানার মাঝ বরাবর। উদোম, পেশিবহুল শরীরের ভারে কিছুটা ডেবে গেল বিছানা। উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে সে। লাজুক এসে দাঁড়ালো বেডের পাশে। তোয়ালে হাতে নিলো। বেলকনিতে গিয়ে সুন্দরভাবে মেলে দিলো। ফিরে এলো ঘরে। বেডের পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলো। ভেতরে ভেতরে উশখুশ করতে লাগলো। চোখ বুজে শুয়ে রয়েছে মানুষটা। ঘুমিয়ে না পড়ে আবার। তার দ্রুত বলা উচিত। হাত কচলে লাজুক খুশখুশে কাশি দিলো। দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। হালকা নড়ে উঠলো মানুষটা। কান সজাগ। সে শুনছে। লাজুক রিনরিনে কণ্ঠে বলেই ফেললো অবশেষে,

" থ্যাংক ইয়্যু। আজ আসার জন্য। "

কানের পেছনে আলতো ভাবে চুল গুঁজে নিলো মেয়েটা। নত মুখে কোমল কণ্ঠে বললো,

" সময়টা খুব ভালো কেটেছে। থ্যাংকস অ্যাগেইন। "

" হু। "

অস্ফুট এক কণ্ঠস্বর শোনা গেল। লাজুক দ্বিধার চোখে তাকিয়ে। মানুষটা কি আদৌও শুনেছে? নাকি ঘুমের ঘোরে হু হা করলো? বোধগম্য হলো না তার। আর কোনো সাড়া না পেয়ে লাজুক চলে গেল বেলকনিতে। কিছুটা সময় একাকী কাটানোর জন্য। বিছানার একপাশে তখন মোবাইলটা একাধারে ভাইব্রেট করে চলেছে। অসহ্য ভঙ্গিতে এদিকে ঘুরে তাকালো তানসীভ। হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশে থাকা মোবাইলটা হাতে নিলো। স্ক্রিনে কলার আইডির নাম স্পষ্ট জ্বলজ্বল করে চলেছে,

' নয়ন। '

ঘড়ির কাঁটা নির্দেশ করছে রাত্রি তখন এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট। আর মোবাইলটা তার বউয়ের। রাতবিরেতে কোনো নয়নের অযাচিত কলে মির্জা তানসীভ শাহ্ মোটেও খুশি হতে পারলো না। ফুলে উঠলো নাকের ডগা। দাঁতের পিষণে পড়লো নিচের ঠোঁট। অন্তরে অজানা এক জ্বলন। ঠাস করে মোবাইলটা বালিশের পাশে ছুঁড়ে ফেললো সে। মুখটা দাবিয়ে দিলো নরম বিছানায়। মুষ্টিবদ্ধ হলো হাত।

•

ঘন আঁধারে নিমজ্জিত রুমটা। ঘরের ভেতরকার অবস্থা ভূতুড়ে অন্ধকারে ছেয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র নীলচে সাদা আলো ভেসে আসছে মোবাইলের যান্ত্রিক পর্দা হতে। সে আলোর উৎসে তাকিয়ে রয়েছে একজোড়া চোখ। স্থির। তীক্ষ্ণ। অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। আঙ্গুলের ছোঁয়ায় একের পর এক ছবি বদলাচ্ছে স্ক্রিনে। লাজুকের ছবি। কোনো ছবিতে জলাশয়ের পাশে মুচকি হাসিতে দাঁড়িয়ে সে। কোনো ছবিতে তার উৎসুক দৃষ্টি, আশপাশে তাকিয়ে দেখছে দৃশ্যপট। কোথাও আবার সঙ্গী মানুষটির খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সে। প্রতিটি ছবিতে এক অদ্ভুত ছাপ। লাজুক একাকী ছবিগুলোতে। তার পাশ থেকে অন্যদের খুব চতুর ভঙ্গিতে ক্রপ করা। মির্জা তানসীভ শাহ্ এর অস্তিত্ব নেইই যেন কোনো ছবিতে। যেন সে কখনো ছিলই না লাজুকের জীবনে। লোকটার আঙ্গুল ধীরে ধীরে বুলিয়ে যায় স্ক্রিনে। অনুভব করতে চায় লাজুককে। চোখের তারায় ভেসে বেড়াচ্ছে আজকের প্রতিটি দৃশ্য। প্রতিটি মুহূর্ত বন্দী হয়েছে দৃষ্টিতে। ৩০০ ফিট রাস্তা। পাশাপাশি হাঁটতে থাকা লাজুক, তানসীভ যুগল। মুচকি হাসিতে মাতোয়ারা লাজুকের দিকে তানসীভের মুগ্ধ চাহনি। জিপে ওঠার সময় লাজুকের ওড়নাটা আলতো ভাবে সামলে দেয়া। সবটাই দেখেছে সে। অস্থির হৃদয়ে শুধু দেখেই গিয়েছে। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে লোকটার। অন্ধকারে ভারী নিঃশ্বাস। মোবাইলের ওপর আঙ্গুলের গাঁট শক্ত হয়ে ডেবে যায়। চোখদুটো ধীরে ধীরে র'ক্তিম হয়ে ওঠে। সেখানে ঈর্ষা নেই। আছে শুধু এক বিপজ্জনক অধিকারবোধ। অসুস্থ-দমবন্ধ করা এক আবেশ। তানসীভের ছায়াটুকুও বরদাস্ত করতে রাজি নয় সে। না লাজুকের দিকে ওর মুগ্ধ চাহনি, না ওর পাশে দাঁড়ানো। না ওর হাসিতে ভাগ বসানো। কিচ্ছু সহ্য হচ্ছে না তার। ছবি বদলাতে বদলাতে হঠাৎ অভিব্যক্তি বদলে যায় লোকটার। স্ক্রিনে একটা ছবি। লাজুকের চোখেমুখে উজ্জ্বলতা। একদম পাশেই তানসীভ দাঁড়িয়ে। গ্রুপ সেলফি তোলার সময় কাঁধে কাঁধ ছুঁয়ে যায় দু'জনের। ক্রপ করা ছবিতে এখনো লাজুকের কাঁধে লেগে রয়েছে তানসীভ শাহ্ এর স্পর্শ। অন্তরে লুকায়িত দা'নবটা যেন জেগে ওঠে। হন্তদন্ত ভঙ্গিতে মোবাইলে আঙ্গুল চালাতে থাকে সে। সেকেন্ডের মধ্যে ছবিটা আবারো ক্রপ হয়ে যায়। এবার লাজুক একা। তার পাশে কোনো অযাচিত পুরুষের বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই। লাজুক সম্পূর্ণ একা। লোকটার ঠোঁট ধীরে ধীরে বাঁকা হয়। সে হাসিতে নেই উষ্ণতা। আছে শুধুই হিমশীতল বিকার। অন্ধকার ঘরটায় নিচু, কর্কশ স্বরে ফিসফিসিয়ে ওঠে সে,

' তুমি শুধু আ মা র। '

অন্ধকার সেই ঘরে বারংবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে শব্দগুলো।

' তু-মি শু-ধু আ মা র। '

•

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঘরজুড়ে নীরবতা। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে রয়েছে আফসানা। ওড়নায় আবৃত দেহের উপরিভাগ। হাতে ইসলামীক একটা বই। মনোযোগ সহকারে বইটা পড়ছে সে। কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়। সশব্দে বেজে ওঠে কলিংবেল। বই হতে দৃষ্টি সরে যায়।

" এখন আবার কে এলো? "

বইটা বন্ধ করে পাশে রেখে দেয়। ভারী শরীরটা নিয়ে সাবধানে বিছানা হতে নেমে আসে আফসানা। বেডরুম থেকে বেরিয়ে যায় ধীরপায়ে। অগ্রসর হয় দরজার দিকে। দরজা খুলতেই থমকে যায় চোখজোড়া। পরক্ষণেই একগাল হেসে ওঠে।

" ইয়া আল্লাহ্! লাজুক তুইইই! "

" আসসালামু আ'লাইকুম আপু। "

হাস্যোজ্জ্বল মুখে সালাম দেয় লাজুক। আলতো, সাবধানী ভঙ্গিমায় জড়িয়ে ধরে বোনকে।

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। তুইই! আয় আয় ভেতরে আয়। "

ভেতরে প্রবেশ করে লাজুক। দরজা আটকে দেয় সে। আফসানা খুশিতে আত্মহারা।

" আল্লাহ্ আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। শেষমেষ তুই এলি! "

" বলেছিলাম না? একদিন হুট করে এসে চমকে দেবো? "

" সত্যিই আমি খুব চমকেছি বোন। আয় বস বস। "

লাজুক বোনকে সোফায় বসিয়ে নিজে বসে তার পাশে। আলতো করে হাতটা ধরে। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

" কেমন আছো আপু? "

" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি রে। তুই এসেছিস না? এখন আরো ভালো আছি। "

বোনের গালে হাত রেখে মমতাময়ী কণ্ঠে জানতে চায় আফসানা,

" তুই কেমন আছিস বোন? কোনো অসুবিধা নেই তো? "

মুচকি হেসে উঠলো লাজুক,

" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি আপু। আল্লাহ্ যেমন রেখেছেন অনেক ভালো রেখেছেন। "

" আলহামদুলিল্লাহ্। ওহ হো। তুই বস একটু। আমি আসছি। এই কি খাবি তুই? শরবত করবো! নাকি ফল কাটবো? দাঁড়া। শরবত করি আগে। এরপর ফল কেটে দিই। যা গরম পড়েছে না! "

ব্যস্ত ভঙ্গিতে কতগুলো কথা বলতে বলতে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে উদ্যত হয় আফসানা। তৎক্ষণাৎ হাত ধরে থামিয়ে দেয় লাজুক।

" আপু। রিল্যাক্স। আমি কোনো মেহমান নই। তোমার বনু। আমার সঙ্গে এমন আজিব আচরণ করো না তো। কেমন পর পর লাগছে। "

" কি যে বলিস না তুই! এতদিন পর আমার বাসায় এলি। কিছু খাবি না? "

" সে পরে খাবো নে। এখন বসো তো। "

" এটা কোনো কথা? "

" আরে তুমি বসো না। "

অগত্যা চুপটি করে বসে আফসানা। লাজুক জিজ্ঞেস করে,

" ভাইয়া কেমন আছেন? "

" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছে। অফিসে। নয়টার দিকে চলে আসবে। এসে যদি জানতে পারে না, হুটহাট তুই চলে এসেছিস। এসে আবার কিছুই খাসনি। খুব বকবে কিন্তু আমায়। "

" ঢপ মেরো না তো। ভাইয়া কিছুই বলবেন না। আমি জানি। "

" হুহ্। "

বোনের কথায় প্রসন্ন হতে পারলো না সে। লাজুক মুচকি হাসলো।

" তোমার শরীরের কি অবস্থা বলো। বাবু ঠিকমতো রেসপন্স করে তো? "

" আলহামদুলিল্লাহ্ ঠিকঠাক আছে সব। "

লাজুক উদগ্রীব হয়ে ওঠে। শিশুসুলভ কণ্ঠে জানতে চায়,

" এই আপু। বাবু যখন কিক দেয় তখন কেমন ফিল হয়? স্পষ্ট টের পাও? পুরো হিউম্যান কিকের মতো? "

" না রে পাগলী। এখন তো নতুন নতুন রেসপন্স করছে। খুব হালকা টের পাই। কেমন প্রজাপতি ওড়ার মতো হালকা ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সামনে ইনশাআল্লাহ্ আরো ভালোমতো রেসপন্স করবে। "

" আল্লাহ্'র সৃষ্টি কি সুন্দর! কিভাবে এক মানবদেহের মধ্যে আরেকজনের অস্তিত্ব। আল্লাহ্! ভাবতে গেলেই মাথা কেমন হ্যাং হয়ে যায়। "

" হুম। "

কিছুটা সময় নীরবতা। আফসানা জিজ্ঞেস করে ওঠে,

" তোর শ্বশুরবাড়ির সবাই কেমন আছে? "

" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছে। "

" কোনো সমস্যা নেই তো? কেউ.. খারাপ ব্যবহার করে না তো? "

লাজুক মাথা নাড়লো,

" না। "

" না হলেই ভালো। "

" তোমার শাশুড়ি কেমন আছেন? "

" আছে আলহামদুলিল্লাহ্। "

" তোমার শরীরের এই অবস্থা। উনি আসবেন না? "

" জানিস ই তো ওনার শরীরটা ভালো নেই। এরপর শহরে ওনার পরাণ টেকে না। আসলে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। বলেছেন পরে আসবেন। "

" সবই অযুহাত। "

" ছাড় তো ওসব। "

" হুম। ওহ হ্যাঁ, ভুলেই গিয়েছিলাম। "

হঠাৎ কিছু মনে পড়লো লাজুকের। আফসানা কৌতূহলী কণ্ঠে জানতে চাইলো,

" কি? "

" দাঁড়াও এক মিনিট। "

লাজুক সোফার পাশে রাখা ছোট ব্যাগটা হাতে নিলো। ব্যাগ থেকে বের করলো হটপট।

" তুই আবার কি এনেছিস? "

" টান টানা। "

বক্সটা খুলতেই সুগন্ধি ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে। আফসানা অবাক!

" বিফ খিচুড়ি রান্না করে এনেছি। তোমার পছন্দের। "

" তুই রান্না করেছিস? "

বিস্ময়সূচক কণ্ঠে বললো আফসানা! লাজুক মুচকি হেসে ইতিবাচক মাথা নাড়লো। আপ্লুত হয়ে পড়লো আফসানা। বোনের গালে আলতো করে হাতটা বুলিয়ে নিলো।

" অনেক বড় হয়ে গেছিস, না? "

হাস্যোজ্জ্বল মুখে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো লাজুক। খিচুড়ির বক্সটা বন্ধ করে সেন্টার টেবিলের উপর রাখলো। আরেকটা ছোট বক্স বের করলো। সেটা এগিয়ে দিয়ে বললো,

" এতে আচার আছে। আমের আচার। বড় ভাবী তোমার জন্য পাঠালেন। "

" থ্যাংক ইয়্যু রে। আমার তরফ থেকে তোর জা'কে ধন্যবাদ জানিয়ে দিস। "

" আচ্ছা। "

আচারের বক্সটা টেবিলের ওপর রাখলো লাজুক। আফসানা খুশিমনে বললেন,

" তা তুই একা এলি কেন? সাথে তোর জা'কেও নিয়ে আসতি। "

" ইনশাআল্লাহ্ পরে একসময় সময় করে আনবো নে। "

" তোর বড় জা টা কেমন রে? ভালো? "

" আপু, উনি আলহামদুলিল্লাহ্ খুউব ভালো। একদম বোনের মতো আগলে রাখেন আমাকে। ওখানে যেন আমি একা নই। সবসময় যেকোনো প্রয়োজনে ভাবীকে পাশে পাই। আল্লাহ্'র কাছে অনেক অনেক শুকরিয়া। "

ছোট বোনের কথায় স্বস্তিবোধ করলো আফসানা। ধীরে ধীরে দুই বোনের আলাপচারিতা জমে উঠলো। একথা, সেকথা জমানো কত কথা যে বলতে লাগলো! এতগুলো দিন বাদে দেখা। জমানো সব কথা প্রকাশ করতে হবে না? দুই বোনের উষ্ণ কথাবার্তা, হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়লো ফ্লাটের অভ্যন্তরে। বিকেলটা হয়ে উঠলো আরো মধুর।

•

ধরনীর বুকে ধীরে ধীরে নামছে সন্ধ্যা। শেষ বিকেলের আলোটা গাছের ফাঁক গলিয়ে পড়ছে জমিনে। লালচে কমলা রঙের আঁচড় আকাশে। কিন্তু গাছপালায় ঘেরা এই সড়কে ইতিমধ্যে নেমে এসেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভাব। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে কালো জিপ গাড়িটা। ইঞ্জিন বন্ধ। তবুও এক চাপা গর্জন ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। জিপের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষটা। এক হাত পকেটে। অন্য হাতে কানে ঠেকিয়ে রাখা মোবাইল। অদূরে স্ট্রিটলাইটের আলোয় স্পষ্ট কঠিন চোয়াল। ফোনের ওপাশ থেকে কিছু একটা বলে চলেছে। প্রতিটি কথায় রঙবদল হচ্ছে মানুষটির চেহারায়। চোখের দৃষ্টি স্থির। কাঁধের পেশিগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে। আঙুলের গাঁট টনটন করে ফুলে ওঠে ফোনের চারপাশে। বাতাসে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে ভারী চাপ। যেন প্র'লয়ঙ্কারী ঝড় নামার পূর্বাভাস। ওপারের মানুষটা নিচু স্বরে শেষ কথাটুকু জানান দেয়। মাথা তুলে তাকায় মির্জা তানসীভ শাহ্। তার দু চোখে তখন অনুপস্থিত আবেগীয় অনুভূতি। দৃশ্যমান জমাট বাঁধা এক আগুন। সবটুকু পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিতে প্রস্তুত। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে মানুষটার। ধীরে ধীরে অতিরিক্ত শীতল কণ্ঠে জানান দেয় সে,

' আসছি। '

ছোট এক বাক্য। দু'পাশের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বং-সের আগমনী বার্তা। কিছু মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে তানসীভ। অতঃপর জিপের দরজা খুলে এক লাফে উঠে বসে নিজ আসনে। মুহুর্তের মধ্যেই আঁধারে তলিয়ে থাকা সড়কে গর্জে ওঠে ইঞ্জিন। চলতে শুরু করে ক্ষিপ্র গতিতে। পথে আছড়ে আছড়ে পড়ে হেডলাইটের সরু আলো। একসময় সন্ধ্যার বুক চিরে জিপটা চলে যায় দৃষ্টি সীমার বাইরে।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন