#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[১২]
" এলাকা দখল কইরা নিজেরে রাজা ভাবস? "
আকাশের বুক জুড়ে জমাট বেঁধেছে ঘন কালো মেঘ। মাঝেমধ্যে সেকেন্ডের জন্য জমিনে চিকচিক করে উঠছে বিদ্যুৎ চমকানোর আলো। পরক্ষণেই ঘন আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে। শহরের বাইরে কোলাহল হতে মুক্ত এ স্থান। শিল্পাঞ্চল এরিয়া। একদা এখানে গুদামঘর ছিল। আজ প্রায় অর্ধেক পরিত্যক্ত। অদূরে ভাঙা টিন, মরিচা ধরা কন্টেইনার। কাদামাখা রাস্তার দু'পাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে বিশালাকার গাছপালা। বৃষ্টিভেজা এই অন্ধকার রাতে শুনশান রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েকটি কালো রঙা গাড়ি। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে। ভেজা রাস্তায় দৃশ্যমান হেডলাইটের ফ্যাকাশে প্রতিফলন। সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই পক্ষ। একপাশে মির্জা বাহিনী। অপরপাশে মজিদ বেপারী ও দলবল। সদর্পে তানসীভ শাহ্ দাঁড়িয়ে। কালো শার্ট লেপ্টে রয়েছে ভেজা শরীরের সঙ্গে। কপাল বেয়ে নামছে পানি। দৃষ্টি স্থির। অস্বাভাবিক স্থির। ইস্পাতকঠিন অঙ্গভঙ্গি। মানুষটির পেছনে দাঁড়িয়ে তার দলবল। কারো হাতে লোহার রড। কারো কোমরে গুঁজে রাখা অ স্ত্র। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে সবাই। তারা জানে। আজকের রাতটা আর পাঁচটা রাতের মতো শান্ত, স্বাভাবিক নয়। আজকের রাত হিসাব বরাবর করার রাত। তাদের বিপরীতে যে মজিদ বেপারী দাঁড়িয়ে। পঞ্চাশোর্ধ মানুষটার চোখে পুরনো সে-ই অভিজ্ঞ ধূর্ততা। পান খাওয়া লালচে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে কিছু স শ স্ত্র লোক। বৃষ্টিভেজা শরীরে ধীরজ, শান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে তানসীভ। পদতলে চাপা পড়ে প্যাঁচ প্যাঁচে কাদা।
" এসব কেন করলি? "
তার কণ্ঠস্বর নিচু। ঠাণ্ডা। মজিদ বেপারী হেসে ওঠে। বড় বিদঘুটে সে হাসি। মুখ হতে পানের পিক টা ফেলে বাম পাশের কাদা মাখা রাস্তায়। তানসীভ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।
" কেন করছি জানোস না তুই? এলাকা দখল কইরা নিজেরে রাজা ভাবস? "
বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘকায় মানুষটির দৃষ্টি আরো শীতল হয়। ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
" এই এলাকা আমার ছিল। এত বছর আমি একচেটিয়া রাজত্ব করছি। বন্দরের চালান আমার ছেলেরা সামলাইছে। এই যে দুই হাত দেখস? এই দুই হাতে কোটি কোটি টাকা উড়াইছি। "
দুই হাতে টাকা ওড়ানোর ভঙ্গিমা করতে থাকে সে। হঠাৎই ক্রু'দ্ধ হয়ে যায় কণ্ঠ,
" কিন্তু তুই! দুই দিনের ছোকড়া। আমার রুজিতে লাথ মা'রবি? পারবি না। তোর বাপের-ও বাপ আমি। এই মজিদ বেপারী। "
চাপদাঁড়িতে আবৃত চোয়ালে হাত বুলিয়ে ত্যাছড়া হেসে ওঠে তানসীভ। ঘাড় বাঁকিয়ে বিদ্রুপাত্মক বাক্যে বলে,
" মির্জা তানসীভ শাহ্ এর এমন-ও দুর্দিন আসেনি যে তোর মতো আধম'রা বুড়োর রুজি মা'রতে হবে। দেড় পা কবরে চলে গেছে বুড়ো। হার মানতে শেখ। "
মজিদ বেপারী লালচে দাঁত বের করে হেসে ওঠে। মাত্র বর্ষসেরা জোকস্ শুনলো যেন।
" কবরের ভয় দেখাস না ছোকড়া। কে কার আগে কবরে যায়, সময়ের ব্যাপার মাত্র। "
ব্যঙ্গাত্মক রূপটা আস্তে ধীরে মিলিয়ে যায়। গাঢ় হয় চাহনি। কর্কশ শব্দে জিজ্ঞেস করে ওঠে তানসীভ,
" কত দিয়ে কিনলি জানো**টাকে? "
মজিদ বেপারী কেমন হাস্যরসে মেতে ওঠেন। অবুঝ কণ্ঠে জানতে চান,
" কে? কার কথা বলছিস বাবু? "
তানসীভ সূচালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। কপাল গড়িয়ে পড়তে থাকে বৃষ্টির পানি। চোখের মণিতে যেন গূঢ় কৃষ্ণকালো ধোঁয়াশা। হঠাৎই আবহাওয়া বদলে যায়। চোখের পলকে মজিদ বেপারীর বাম পাশে থাকা ছেলেটা বন্দী হয়ে যায়, মির্জা তানসীভ শাহ্ এর অদম্য এক থাবায়। ঘাড়টা মুষ্টিবদ্ধ করে চেপে ধরা। মটমট করছে হাড়। মুখটা জোরপূর্বক নিজ মুখের খুব কাছাকাছি টেনে ধরা। ভীত মুখটার দিকে অনমনীয় মনোভাবের সহিত তাকিয়ে রয়েছে তানসীভ। থেমে থেমে ধারালো স্বরে জিজ্ঞেস করে,
" কত পেয়েছিস? হু? কি পেয়েছিস? বিশ্বাস, স্নেহের চেয়েও দামী? "
নাবিল ছেলেটা যন্ত্রনা কাতর চোখে তাকিয়ে থাকে। ঘাম ও বৃষ্টির পানি মিলেমিশে গড়িয়ে পড়তে থাকে কপাল বেয়ে গালে। নির্বাক সে। পাঁচটা বছর এই মানুষটার সঙ্গ দিয়েছে। আর্থিক, শারীরিক নিরাপত্তা লাভ করেছে। বিপদের মুহূর্তে পাশে থেকেছে। আজ সে-ই দাঁড়িয়ে রয়েছে সবচেয়ে বড় বিপদের সঙ্গ রূপে। নাবিল দৃষ্টি নত করতে চায়। পারে না। ঘাড়টা শক্ত করে চেপে ধরা তানসীভ। ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
" আরো একবার প্রমাণ করে দিলি। বিশ্বাস, ভালোবাসা এ পৃথিবীর জন্য নয়। এ পৃথিবী শুধুই অসত্যের। "
মজিদ বেপারী কড়কড় করে ওঠে,
" এই ছাড় ছাড়। আমার ছেলেটাকে ছাড়। কত দামে কিনেছি ওকে! দামী ছেলে আমার। "
বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটের কোণে। ঠাস করে ঘাড়টা আছড়ে ফেলে তানসীভ। অসচেতনভাবে কয়েক পা পেছনে পিছলে যায় নাবিল। পড়তে গিয়েও পড়ে না সে। মজিদ বেপারী হেসে ওঠে,
" জানিস ই তো। টাকা সকলের বাপ। "
আঙ্গুলের নড়াচড়ায় টাকা গোনার ভঙ্গিমা দেখায় সে। নাবিল বিড়বিড়িয়ে বলতে চায়,
" ভাই! বাধ্য ছিলাম আমি। আমি.. "
" পাঁচ লাখে কেনা আমার সোনার টুকরো ছেলেটা। "
মজিদ বেপারী গদগদ স্নেহের ছলে আগুনে ঘি ঢেলে দেন। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকে তানসীভ। খুব আস্তে করে একবার মাথা নাড়ে।
" চিপ! "
অতি নিচু স্বরে উচ্চারিত শব্দটা অবহেলায় মিশে গেল বাতাসে। তবুও শুনতে পেল নাবিল। আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলতে চাইলো। আকস্মিক অন্ধকার চিরে ভ'য়ঙ্কর আগ্রাসী তীরের ন্যায় ছুটে আসে গু-লি। তানসীভ তৎক্ষণাৎ মাথাটা ছিটকে সরিয়ে নেয় ডানে। তার পাশ কাটিয়ে গু-লিটা আঘাত হানে অদূরে। তাদের কালো এক গাড়ির কাঁচ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে পড়ে। মুহুর্তের মধ্যেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শুনশান, নীরব জায়গাটা। বৃষ্টির তাল কেটে গিয়েছে ইতিমধ্যে। আর্তনাদ, রডের একাধারে আঘাত, কাদার ছমছম শব্দ। মিলেমিশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। চা-পাতি হাতে একজন ঝাঁপিয়ে পড়ে তানসীভের ওপর। তানসীভ লোকটার কবজি চেপে মোচড়ে দেয়। সশব্দে কড়মড় করে ওঠে হাড়। আর্তনাদ করে ওঠে লোকটা। তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে তানসীভ নি"ষ্ঠুর গতিতে মাথাটা আছড়ে দেয় গাড়ির বনেটে। ভেজা বনেট গড়িয়ে পড়তে থাকে র-ক্তলাল তরল।
পেছন থেকে আরেকজন আঘাত করতে উদ্যত হয়। তানসীভের কনুই আঘাত হানে গলায়। দমবন্ধকর অবস্থায় লোকটা গড়িয়ে পড়ে জমিনে। র'ক্তিম দৃষ্টি জোড়া এবার নিবদ্ধ হয় নাবিলে। ভয়ে ভয়ে মজিদ বেপারীকে নিয়ে কেটে পড়তে চাইছে সে। কঠিন হলো চোয়াল। পেছন থেকে হঠাৎই এক লা'থ। বেকায়দায় ছিটকে কাদা মাখা রাস্তায় পড়ে যায় নাবিল। কাঁপা শরীরটা হামাগুড়ি দিয়ে সোজা হয়ে বসে। এগিয়ে আসছে তানসীভ। পদভঙ্গী মোটেও স্বাভাবিক নয়। চোখের তারায় আগুন। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পিছু হটতে চায় নাবিল। হঠাৎই পিচঢালা পথে চাপা পড়ে পা। শক্তপোক্ত জুতো চেপে বসেছে ওর পায়ে। অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে ওঠে নাবিল। ফিসফিসিয়ে বলতে লাগলো,
" ভাই! ভাই ক্ষমা কইরা দেন। ভুল হইয়া গেছে ভাইইই। "
আরেকটা চিৎকার। আরো জোরে চেপে বসে জুতো। নিজ হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে তানসীভ। অনম্র কণ্ঠে থেমে থেমে বলে,
" ভুল? দু'বছর আগে তোর মায়ের অপারেশনের জন্য এক লাখ টাকা দেয়াটা তো ভুল ছিল না। গতবছর তোর বোনের বিয়ের জন্য আশি হাজার দেয়া। তোকে বিশ্বাস করা। এসব তো ভুল ছিল না। তাহলে? এত এত বিশ্বাস, স্নেহের প্রতিদান আজ ভুল হয়ে গেল? ভু ল? "
" ভা-ইইই! "
হাউমাউ করে ওঠে নাবিল। তবে আজ আর ছাড় দিতে নারাজ মির্জা তানসীভ শাহ্। বে'ইমানির শা'স্তি খুবই কঠিন। বুক বরাবর প্রচণ্ড এক লা'থ। ভেজা মাটিতে ছিটকে পড়ে নাবিল। তানসীভ ঝুঁকে পড়ে। টেনে ধরে কলার। মুখটা আরো কাছাকাছি আনে। নিচু, ভ'য়ঙ্কর কণ্ঠে বলে,
" এই মির্জা তানসীভ শাহ্ ঘোর শত্রুকে কনসিডার করতে পারে। কোনো.. বে'ইমানকে নয়। "
আরো একটা আঘাত। সদ্য বৃষ্টিস্নাত-পরিত্যক্ত এই জায়গাটা ধ্বং""সাবশেষের রূপ ধারণ করেছে ইতিমধ্যে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যায়। ছেলেপুলের কড়া নিরাপত্তায় গাড়িতে করে পালাতে বাধ্য হয় মজিদ বেপারী। মাথা তুলে তাকায় তানসীভ। কপাল গড়িয়ে পড়ে ঘামে ভেজা বৃষ্টি কণা। হাতের মুঠো শক্ত। আঙ্গুলের গাঁটে লেপ্টে রয়েছে শুকনো র ক্ত। কঠোর তার চোয়াল। ভাঙা, শীতল কণ্ঠে নিজেকে নিজেই জানান দেয়,
' পালাতে পারবি না কেউ। '
•
রাত অনেক গভীর। দ্বিতীয় দফা বৃষ্টির আলোড়ন থেমে গিয়েছে কিছুক্ষণ পূর্বে। বাতাসে এখনো ভেজা এক সুবাস। ছাদ হতে পানি গড়িয়ে পড়ছে টুপটাপ। বাড়ি জুড়ে নীরবতা। ঘুমে বিভোর সকলে। নীরব সে-ই পরিবেশে পরপর দু'টো হাঁচির শব্দ ভেসে আসে বেলকনি হতে। সেখানে দাঁড়িয়ে তানসীভ শাহ্। শরীরে ঢিলেঢিলা এক স্লিভলেস টিশার্ট। স্বল্প ভেজা চুল। ঠিকঠাক মোছার মেলেনি সুযোগ। ঠাণ্ডায় নাকের ডগা লাল। চোখের সাদা অংশ-ও রক্তাভ। চেহারায় ক্লান্তি, মানসিক আঘাতের ছাপ। একের পর এক ফোনকলে ব্যস্ত সে।
' সোজা কথা একবারে কানে ঢোকে না? কি বলেছিলাম আমি? '
' ... '
' এতকিছুর পরেও বন্দরে চালান ঢুকলো কিভাবে? ওই মজিদ বেপারীর এতবড় বুকের পাটা! মির্জাদের সঙ্গে ডাবল গেইম খেলে? '
' ... '
' কু*র বাচ্চাটাকে আরো খাতিরযত্ন কর। কোনো খামতি যেন না থাকে। '
দাঁতে দাঁত পিষে কথা সমাপ্ত করে সে। আরো এক হাঁচি। কপালটা চেপে ধরে যন্ত্রনায়। শরীরের অসুস্থতা ছাপিয়ে জেঁকে বসেছে রাগ। চাপা সং"ঘর্ষ চলমান অন্দরে।
ঘরজুড়ে পায়চারি করে চলেছে লাজুক। অস্থির মনটা। মাঝেমধ্যে পিছু ঘুরে বেলকনিতে তাকাচ্ছে। ঘুম পালিয়েছে সে-ই কোন ক্ষণে। মানুষটা স্বাভাবিক নেই। সে ভেবেছিল সাধারণ কোনো ব্যবসায়িক ঝামেলা। তাই ভ্রুক্ষেপ করতে চায় নি। তবে রাত বাড়ছে, বাড়ছে তার অস্থিরতা। উপলব্ধি করতে পারে, এসব কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক ঝামেলার প্রতিক্রিয়া নয়। তার চেয়েও গাঢ়, ভ'য়ঙ্কর কিছু। একেকটা ফোনকলে মানুষটার কণ্ঠ বদলে যাচ্ছে। ভেতরকার হিং-স্র সত্তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এটাই যেন মির্জা তানসীভ শাহ্ এর প্রকৃত সত্তা। আসল রূপ। যা অতীব ভ'য়ানক, ভীতি সৃষ্টিকর। অস্থির মনটা কেমন ছন্নছাড়া বোধ করছে। পায়চারি জারি রাখে লাজুক। প্রায় আধ ঘন্টার মতো সময় পেরিয়ে যায়। সোফায় হেলান দিয়ে বসা মেয়েটা। বেলকনি হতে এখন আর কোনো শব্দ ভেসে আসছে না। ভারী নীরবতা। মাঝেমধ্যে শুধু খুশখুশে কাশি। লাজুক আর স্থির বসে থাকতে পারে না। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় বেলকনিতে। সেখানে গিয়ে থমকে যায় ভীত চাহনি। মেঝেতে বিছানো ফ্লোর বেডে লম্বালম্বিভাবে শুয়ে রয়েছে মানুষটা। এক হাত চোখের ওপর চাপা। অন্য হাতটা পাশেই ফেলে রাখা। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো। শরীর জুড়ে ক্লান্তির ছাপ অধিক দৃশ্যমান। হঠাৎ করেই যেন ভ'য়ঙ্কর রূপটা পালিয়ে গিয়েছে। পুরোপুরি বিধ্ব'স্ত লাগছে। যেন বহুক্ষণ ধরে নিজের সঙ্গে নিজে লড়তে লড়তে ক্লান্ত।
কিছুটা সময় স্থির দাঁড়িয়ে থাকে লাজুক। উদ্বেগের সহিত ধীরপায়ে এগিয়ে যায় স্বামীর নিকটে। আস্তে করে বসে পাশে। ম্যাট্রেস সামান্য ডেবে যায়। অনুভব করতে পারে মানুষটা। শ্বাসের গতি কিছুটা বদলে যায়। ইতস্তত করছে লাজুক। হাতটা বাড়িয়ে দিয়েও ফিরিয়ে নেয় আবার। মানুষটার এই অচেনা রূপ ভয় পাইয়ে দিচ্ছে তাকে। পরক্ষণেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। অদ্ভুত এক টান অন্তরে। কম্পিত হাতটা শেষমেষ আস্তে করে গলিয়ে দেয় স্বামীর চুলে। খুব ধীরে। সাবধানে। চুলে আঙ্গুল বুলাতে থাকে। এক মুহুর্তের জন্য স্থির হয়ে যায় মানুষটির নিশ্বাস। পর মুহূর্তে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। একমনে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে লাজুক। হঠাৎই আশ্চর্য হয়ে যায়! মোটেও আশা করেনি সে। তানসীভ ধীরে ধীরে মাথাটা এনে রাখে সহধর্মিণীর কোলে। একদম নিঃশব্দে। যেন বহুদিনের ক্লান্ত মানুষটা আজ একটুখানি শান্তির খোঁজে। আশ্রয়ের খোঁজে। অন্তঃস্থল কেঁপে ওঠে লাজুকের। কয়েকঘণ্টা আগেও ধ্বং-সযজ্ঞ চালানো মানুষটা এখন সঙ্গিনীর সান্নিধ্যে প্রশান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে! তানসীভ আলতো করে লাজুকের হাতটা ধরে। শিরশির করে উঠে মেয়েটার বুক। থেমে যাওয়া আঙ্গুলগুলো সে গলিয়ে দেয় নিজ চুলে। নিঃশব্দ ইঙ্গিত। হাত বুলানো চালিয়ে যাওয়ার নীরব অনুরোধ। সে অনুরোধ ফেলতে পারে না লাজুক। মেয়েটির আঙ্গুল ধীরে ধীরে চুলের মাঝে বিলি কাটতে থাকে। হালকা শীতল হাওয়া বাইরে থেকে আসছে। ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর। দু'জনের মধ্যে বিদ্যমান নীরবতা।
চোখ বন্ধ করে রাখা তানসীভের। দীর্ঘদিন পর সে নিরাপদ বোধ করছে। অনুভব করছে আপন কারোর সান্নিধ্য। নিজের দুর্বলতা আজীবন গোপনে লুকিয়ে এসেছে সে। কখনো কারো সামনে খোলেনি অন্তরে বদ্ধ অনুভূতির দরজা। দুর্বল হতে শেখেনি সে। এই জগতে দুর্বলতা মানেই মৃ ত্যু। বিশ্বাস মানেই বে'ইমানি। আজ রাতেই সে সাক্ষী হয়েছে বে'ইমানির আরো এক সস্তা রূপের। নাবিল ছেলেটা। ওর সঙ্গেই কাটিয়েছে পাঁচটা বছর। আজ সে-ই বি''শ্বাসঘাতক রূপটা দেখিয়ে দিলো। হাত মেলালো মজিদ বেপারীর সঙ্গে। মির্জাদের গোপন কিছু অনৈতিক কাজের মধ্যে অন্যতম এক কাজের শ'ত্রু হলো মজিদ বেপারী। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে অবৈধ মেডিক্যাল কেমিক্যাল এবং নিষিদ্ধ ড্রা-গ, গোপনে দেশের মাটিতে আসছিল। এ শহরে এই অবৈধ ব্যবসা চালাতে অনুমতি লাগে মির্জাদের। বড় অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। অনৈতিক কর্মকাণ্ডে গোপন সহায়তা করতে হয়। এমনই নিয়ম চলছিল বিগত দু'বছর। এবার হঠাৎই ভিন্ন কিছু হলো। গোপনে এক সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মেলালো মজিদ বেপারী। মির্জা তানসীভ শাহ্ এর অনুমতি ব্যতিরেকে বন্দর থেকে চালান খালাস করলো। প্রবেশাধিকার দিলো এই শহরে। চুপিসারে ছক কষতে লাগলো ওদের বিরুদ্ধে। এজন্য ব্যবহার করলো টাকার লোভ। ঘৃণ্য লোভের ফাঁ'দে পা দিলো ওদেরই একজন, নাবিল। টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেল। হাত মেলালো বেপারীর সঙ্গে। আর আজ রাতে সমঝোতার নামে ম-রণঘাতী ফাঁ'দ পাতলো। তবে শেষরক্ষা হলো না। মির্জা তানসীভ শাহ্'কে হারানো এতটাই সহজ নাকি? অর্ধাঙ্গিনীর নরম স্পর্শে তানসীভ শাহ্ এর ভেতরকার হিং'স্র সত্তায়, অদ্ভুতভাবে একটুখানি ফাটল ধরে। ক্ষি'প্র মানুষটা কেমন শান্ত রূপে পড়ে থাকে স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে। কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়। মৃদু কন্ঠে বলে ওঠে লাজুক,
" যে কাজের জন্য জীবনের সুখশান্তি নষ্ট হয়। সে কাজ.. কেন করেন? "
তানসীভের শরীরটা কঠিন হলো। চুলে বিলি কাটতে থাকা আঙ্গুল গুলো থেমে গেল। হালকা কেঁপে ওঠে লাজুক। মানুষটা এখুনি বি'শ্রী কোনো রিয়েকশন না দিয়ে বসে! তবে তেমন কিছু হলো না আজ। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকে তানসীভ। অতঃপর ধীর লয়ে বলে,
" এটাই আমার জীবন। "
কণ্ঠে এক ক্ষীণ শূন্যতার আভাস। লাজুক স্বামীর মুখপানে তাকায়। বোঝানোর চেষ্টা করে,
" এটাকে জীবন বলে না। চারদিকে শুধু অন্যায়, অপরাধ। অশুভ মানুষের হাতছানি। র-ক্তারক্তি। এসব... অন্যায়। আল্লাহ্ এগুলো করার বিধান দেননি। "
খাপছাড়া হেসে ওঠে তানসীভ। সে হাসিতে লুকিয়ে তিক্ততা। থেমে থেমে বলে,
" এই অশুভ হাতছানি ই বাঁচিয়ে রাখে আমায়। "
" এসব কি বলছেন আপনি? এগুলো স্পষ্ট... "
কথাটা শেষ করতে দেয় না তানসীভ। চোখ মেলে তাকায়। আস্তে করে আঙ্গুল ঠেকায় স্ত্রীর পেলব ঠোঁটে।
' শশ্... '
শিহরিত মনটা কেঁপে ওঠে। অদমনীয় স্পন্দন। চোখের পলক ঝাপটালো লাজুক। দৃষ্টি সরিয়ে নেয় স্বামীর মুখ হতে। শব্দহীন এক অনুরোধ ভেসে বেড়াচ্ছে মানুষটির চোখে। আজ আর নয়। অনেকটা ক্লান্ত সে। একটুখানি শান্তি দরকার। চুপ হয়ে যায় লাজুক। তানসীভ পুনরায় হাতটা স্পর্শ করে। বিলি কাটতে ইশারা করে। মেয়েটা সে-ই মোতাবেক চুলে আঙ্গুল চালাতে থাকে। চোখ বন্ধ করে নেয় তানসীভ। লাজুক আজ অনুধাবন করতে পারলো। মানুষটা বাইরে যতখানি ক্ষমতাধর, বি-ষাক্ত। ভেতরে ঠিক ততখানি ই ক্লান্ত। ক্ষ'তবিক্ষত। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, এই অন্ধকার জগৎ পুরোপুরি গ্রাস করে নেবে তাকে। একজন স্ত্রী হিসেবে তা কখনোই তার কাম্য নয়। কিন্তু কিভাবে সে ফেরাবে এই পা'গলা ঘোড়াকে?
•
নিস্তব্ধ এই সকাল। জানালার ফাঁক গলিয়ে ঘরে প্রবেশ করছে আলো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল মুছে চলেছে রায়হান। ইফরাত বিছানায় স্বামীর জন্য শার্ট, প্যান্ট গুছিয়ে রাখছে। ফাইল রাখে একপাশে। ঘড়ি, ওয়ালেট রাখে ড্রেসিং টেবিলের ওপর। রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থাকে। শেষমেষ জিজ্ঞেস করেই বসে,
" কাল কখন ফিরেছে? "
ইফরাত চোখ তুলে তাকায়। সে বুঝতে পারছে রায়হান কার কথা বলছে। স্বামীর হাত থেকে তোয়ালেটা নেয় সে। ভেজা চুলগুলো যত্ন সহকারে মুছে দিতে থাকে। বলে,
" বারোটার পর। "
উত্তরে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট হয় রায়হান।
" আবার কি শুরু করেছে ও? রাত করে ফেরা। দলের ছেলেদের সঙ্গে হাউকাউ। মজিদ বেপারী নাকি কিসব গণ্ডগোল পাকিয়েছে! এসব হচ্ছেটা কি? "
তার কণ্ঠে বিরক্তির ছদ্মবেশে দুশ্চিন্তা। ছোট ভাইয়ের জন্য। ইফরাত এক মুহুর্ত হাত থামায়। আবার চুল মুছতে থাকে। রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থাকে। নিচু গলায় বলে,
" ওর এখন বোঝা উচিত। বিয়ে হয়েছে। সংসার হয়েছে। বউ আছে। ওর জীবনে আপন কেউ একজন রয়েছে। আমরা নাহয় পর। ওর বোঝা উচিত। "
একটু থেমে আরো শান্ত স্বরে,
" শুধরানো উচিত। "
নিজ কণ্ঠ নিজের কাছেই কেমন ঠেকলো। বিশ্বাসযোগ্য লাগলো না। কারণ সে জানে। মির্জা তানসীভ শাহ্ এর জেদ জানে। জানে মানুষটা অন্ধকার জগতে ঠিক কতখানি তলিয়ে গিয়েছে। সে জগত থেকে আদৌও ফেরা সম্ভব? স্বামীকে শার্ট পড়তে সহায়তা করে ইফরাত। কণ্ঠ নম্র। কিন্তু সোজা অন্তরে বিঁধে।
" ভাইটা তোমার। "
শার্ট পড়তে পড়তে রায়হান ঘুরে তাকায়।
" এ বিষয়ে তুমিই সবচেয়ে ভালো জানো। "
স্থির হয়ে গেল রায়হান। ইফরাত আরো নিচু গলায় বলে,
" বড়ভাই হিসেবে এবার অন্তত কিছু করো। নাহলে চোখের সামনে ছোট ভাইয়ের সর্বনাশ দেখতে হবে। "
সবচেয়ে দুর্বলতম পয়েন্টে আঘাত হানে কথাগুলো। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে রায়হান। এখানেই তো তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। দুর্বলতা। কিভাবে সবটা ঠিক করবে সে? আদৌও কোনো উপায় আছে কি? জানা নেই তার। আস্তে করে দৃষ্টি নত করে নেয় মানুষটা। সে ভয় পাচ্ছে। ছোট ভাইকে হারানোর তীব্র ভয়।
চলবে।