#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[১৫]
জীবনের প্রথম কোনো বিরূপ স্মৃতি। মস্তিষ্কে বাজেভাবে প্রভাব সৃষ্টি করেছে। নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারছে না লাজুক। দমবন্ধকর কান্নায় ভেঙে পড়ে। ফুসফুসে আটকে আসে বাতাস। প্রতি ফোঁটা অশ্রুতে মিশে রয়েছে ভয়, আতঙ্ক, অপমান। সে মুহূর্তে হঠাৎ কানে ভেসে এলো পুরুষালি গাঢ় কণ্ঠস্বর,
' শশশ্! '
অশ্রুতে ঝাপসা চোখ তুলে তাকায় লাজুক। ওর বিপরীতে খুবই কাছে হাঁটু গেড়ে বসা মানুষটা। এতগুলো সময় বাদে আপন মানুষটার দেখা পেয়ে ঠোঁট ভেঙে আসে কান্নায়। চোখমুখের অবস্থা জবাফুলের ন্যায় র'ক্তলাল। তানসীভ ধীরস্থির চাহনিতে সঙ্গিনীর পুরো মুখে দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। পড়ে নেয় যন্ত্রনার প্রতিটি লাইন। অতঃপর অনভ্যস্ত হাতটা এগিয়ে দেয়। সযত্নে মুছে দেয় প্রতি ফোঁটা অশ্রু। কান্নাভেজা অস্ফুট স্বরে আওড়ে ওঠে লাজুক,
" আ আমাকে ছুঁ য়েছে। "
চোখ হতে গড়িয়ে পড়া অমূল্য অশ্রু কণা মুছে নেয় রূক্ষ হাতটা। মুখের ওপর পড়ে থাকা ভেজা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে তুলনামূলক নরম স্বরে আশ্বস্ত করে,
" কিছু হয়নি। অল ওকে। "
" লোকটা নোংরা। আমাকে.. আ.. "
গালের ওপর স্থির হয় বৃদ্ধাঙ্গুল। বাকি চারটে কানের পেছনে। গালের পেলব ত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে দেয় তানসীভ। আলতো ভঙ্গিমায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিতে থাকে। তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক। কাজ হয় এতে। লাজুকের এলোমেলো যন্ত্রনাপ্রদ কথাগুলো থেমে যায়। মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। সে কি মায়াবী, অপলক চাহনি! তানসীভ নিরাবেগ কণ্ঠে থেমে থেমে বলতে থাকে,
" সমাজটা কীটে ভরা। সবখানে ওরা। ওদের ভয়ে গুমড়ে কাঁদতে নেই। ফাইট! "
চোখে চোখ স্থির হয়। সূচালো সে চাহনি। ধীরলয়ে বলে তানসীভ,
" এমনভাবে পি'ষবে। ছ'মাস নড়ার শক্তি থাকবে না। "
লাজুক লাজ ভুলে স্বামীর চোখে চোখ রেখে অনেকটা সময় তাকিয়ে রইলো। তার ভেতরকার প্রতিবাদী, নির্ভীক সত্ত্বাটা পড়তে চাইলো। পুরোপুরি সফল হলো না। গালে বুলাতে থাকা বৃদ্ধাঙ্গুল ক্ষণিকের জন্য থামলো। মায়াজালে বিভোর করে নিলো শব্দগুলো,
" মির্জা তানসীভ শাহ্ এর সম্মান তুমি। এই ভঙ্গুর রূপ তোমার জন্য নয়। ওঠো মেয়ে। লড়ো। ঘুরে দাঁড়াও। বাঁচো। ম'রবে তো ওই **। "
কঠোর হয়ে ওঠে চোয়াল। অন্ধকারে ছেয়ে যায় চোখের তারা। লাজুক ভেজা চোখে বশীভূত হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে। যন্ত্রনার একেকটা ক্ষতে অমূল্য মলমের প্রলেপ লাগলো বুঝি! কারো দুঃখকষ্ট এভাবে শুষে নেয়া যায়? না ছুঁয়েই স্বস্তি দেয়া যায়! জানা নেই ওর। আবেগের আতিশয্যে কান্নার আলোড়ন সৃষ্টি হয় পুনরায়। নিজের দুঃখগুলো লুকানোর চেষ্টা করে লাজুক। অবনত হয় দৃষ্টি। তাকিয়ে থাকে হাতের লালচে ত্বকে। আস্তে আস্তে তানসীভের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্ত্রীর লালচে ফ্যাকাশে ত্বক। চোখের মণি নিকষ কালো হয়ে যায়। টানটান হয় কপাল। অতি নাজুক, সতর্ক ভঙ্গিতে মেয়েটার হাত স্পর্শ করে সে। কেঁপে ওঠে লাজুক। কান্নার মাঝে চোখেমুখে বিভ্রান্তির ছাপ। হাতটা আস্তে করে নিজ হাতের মুঠোয় তুলে নেয় মানুষটা। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে। ছোটোখাটো নরম কোমল একটা হাত। কব্জি বরাবর পুরুষালি পাঁচ আঙ্গুলের নোং'রা স্পর্শের ছাপ। ঘষতে ঘষতে আরো র'ক্তিম হয়েছে ফর্সা চামড়া। তানসীভের অন্তঃস্থিত হিং'স্র সত্তা বি"ধ্বংসী হয়ে ওঠে। চোখ বন্ধ করে নেয় সে। নাক মুখ হতে বেড়োয় উত্তপ্ত শ্বাস। নিজেকে শান্ত করার যথাসম্ভব চেষ্টা করে সে। চোখ মেলে তাকাতে আঁতকে ওঠে লাজুক। চোখের ভেতরটা ভূতুড়ে লাল। অন্তঃস্থলে বুনো পশুর ন্যায় ক্ষি'প্রতা। মুঠোয় বন্দি হাতটা ধীরে ধীরে মুখের কাছে আনে তানসীভ। আলতো, খুবই নরম পরশ বুলিয়ে দেয় নোং'রা সে স্পর্শের দাগে। অকল্পনীয় সে স্পর্শে নির্বাক লাজুক! পরপর কয়েকবার ঠোঁটের ছোঁয়া এঁকে দেয় মানুষটা। হাতের ব্যথা স্থানগুলোতে নিজ শুদ্ধতার জানান দেয়। কব্জি হতে কনুই। আদর ছুঁয়ে যায়। নিজ স্পর্শে মুছে দিতে চায় বি"ষাক্ত সে দাগ। যন্ত্রনা, শিহরণ, আবেশে লাজুকের অবস্থা তখন অচৈতন্য। কব্জির পাতলা ত্বকে ঠোঁট রেখে অতি ক্ষীণ কণ্ঠে আওড়ে ওঠে মানুষটা,
" মুছে দিয়েছি সব। "
অত্যন্ত নিচু স্বরে উচ্চারিত শব্দগুলো বাতাসে মিশে যায়। তবুও শুনতে পায় লাজুক। অজান্তেই ডুকরে কেঁদে ওঠে। ক্ষণিকের মধ্যে শক্তপোক্ত বুকটায় আছড়ে পড়ে সে। মানুষটা ওকে এক টানে ত্রস্ত হাতে নিজ বুকে ঠাঁই দিলো। সযত্নে মুছে দিলো প্রতিটি অশ্রুবিন্দু। একে অপরের আকাঙ্ক্ষিত সান্নিধ্যে একটু একটু করে শান্ত হলো দু'জনে। গালে পড়ে থাকা অশ্রুভেজা চুলগুলো সস্নেহে সরিয়ে দিলো তানসীভ। নি'ষ্ঠুর হাতের তালু বুলাতে লাগলো মাথায়। আজ সে স্পর্শে নি"ষ্ঠুরতা নেই। আছে শুধুই যত্ন, সহমর্মিতা এবং নামহীন এক আবেশ। কপালে ঠোঁটের ক্ষুদ্র এক পরশ বুলিয়ে দিলো পুরুষটি। শিরোনামহীন এক প্রতিশ্রুতি। আমি আছি তো। পিঠের ওপর এক হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছে অপর হাত। পুরোদস্তুর আরামে মুড়িয়ে নিলো সঙ্গিনীকে। ইতিপূর্বে তার মানসিক শান্তির উৎস ছিল এ নারী। আজ তবে ভিন্ন কিছু হয়ে যাক। ধীরে ধীরে শান্ত নদীর ন্যায় স্থির হয়ে যায় লাজুক। চুপটি করে মিশে থাকে স্বামীর বুকে। তার অস্পষ্ট, অদম্য ধুকপুকানি শুনতে থাকে। একসময় বন্ধ হয়ে যায় চোখ। এই মানুষটি, এই বাহুবন্ধন কবে এতটা আপন হয়ে উঠলো! কবে মিললো এমন নিরাপদ অনুভূতি!
•
গভীর রাত। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে রয়েছে পুরো বাড়ি। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ স্পষ্ট কানে আসছে। দূর হতে মাঝেমধ্যে অস্পষ্ট ভেসে আসছে গাড়ির যান্ত্রিক শব্দ। বিছানায় সোজা হয়ে শোয়া রায়হান। চোখ দুটো খোলা। নিবদ্ধ সিলিংয়ে। কিন্তু মন অন্যত্র। বারবার ঘুরেফিরে যাচ্ছে আজকের পার্টির সে-ই লো'মহর্ষক দৃশ্যে। মির্জা তানসীভ শাহ্। তার সে-ই ক্রু'দ্ধ চাহনি। দা'নবীয় সত্তা। সে-ই অদমনীয় হিং'স্রতা। রায়হানের বুকের ভেতর ধীরে ধীরে চাপা উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। তানসীভ তার ছোট ভাই। ভাইকে সে জানে। যতটুকু চেনে, জানে তা যথেষ্ট। এটা বোঝার জন্য যথেষ্ট যে তানসীভ দমে যাওয়ার মানুষ নয়। সে চুপ আছে মানে আরো ভ'য়ঙ্কর কিছু অপেক্ষায়। রায়হান ঘনঘন শ্বাস ফেলে। মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ করছে। যন্ত্রনা হচ্ছে। আস্তে ধীরে স্ত্রীর দিকে পাশ ফিরে শোয় সে। ইফরাত ওদিকে কাত হয়ে শোয়া। তার পিঠে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। কিছু সময় নীরবতা। আস্তে করে বলে রায়হান,
" ঘুমাওনি? "
" আসছে না। "
কয়েক মিনিট অতিবাহিত হয়। ইফরাত এদিকে ঘুরে শোয়। মুখোমুখি শোয়া দু'জনে। কিছুক্ষণ নীরবে কাটে। ইফরাত ম্লান কণ্ঠে বলে,
" ওকে একা রেখে গিয়ে আমি খুব ভুল করেছি, তাই না? লাজুক। ও.. ও তো অমন পরিবেশে অভ্যস্ত নয়। আমি কেন ওকে একা রেখে গেলাম? "
" বিপদ বলে কয়ে আসে না, রাত। "
" না, আসে না। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হয়। ছোট ভাইয়ার বউ হয় ও। এই বাড়ির পুত্রবধূ। ওর সম্মান এখন আমাদের সম্মান। আজ যদি ভাইয়া সময়মতো না পৌঁছাতেন তাহলে.. আমি.. আমি ভাবতে পারছি না। ভেতরটা শিউরে উঠছে। "
অসহায় শব্দগুলো। একেকটি বাক্যে লুকিয়ে ব্যথা। রায়হান স্ত্রীর অনুভূতি বুঝতে পারছে। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ে তা-ও আবার ছোটবোন সমতুল্য জা। কষ্ট সে-ও পেয়েছে। এখনো পাচ্ছে।
" ও আমাকে এতটা ভরসা করে। আর আমি..? সে ভরসার যোগ্য নই। "
ইফরাত চোখ বন্ধ করে নেয়। অশ্রু গড়িয়ে পড়ে বন্ধ চোখ বেয়ে। রায়হান আলতো করে স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
" শান্ত হও তুমি। সব ঠিক আছে এখন। "
রায়হান মুখে বলে একথা। কিন্তু অন্তরের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য কথা। সত্যিই কি সব ঠিক আছে? মির্জা তানসীভ শাহ্ থেমে গিয়েছে? নাকি প্র'লয়ঙ্কারী ঝড় এখনো বাকি?
•
জহুরুল সাহেবের স্টাডিরুম। ভারী কাঠের বুকশেলফে সাজানো বিভিন্ন ধরনের নামীদামী বই। গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পত্র গুছিয়ে রাখা মাঝারি আকারের কাঠের কাবার্ডে। সকালের মিঠে আলো জানালার ফাঁক গলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। স্টাডি টেবিলের ওপাশে রাজকীয়, ভারী চেয়ারে বসা জহুরুল সাহেব। মুখভঙ্গি গম্ভীর। কপালে সরু ভাঁজ। বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে তানসীভ শাহ্। কালো শার্ট পড়নে। নিরাবেগ মুখশ্রী। দৃষ্টি স্থির। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে চাপা উত্তেজনায়। জহুরুল সাহেব ধীরে বলে ওঠেন,
" কাল যা হলো। ভালো হলো না। "
তানসীভ চুপ।
" পার্টিতে নামিদামি দেশবরেণ্য অনেক লোকজন ছিল। আমাদের ক্লায়েন্ট, বিজনেস রাইভাল-ও ছিল। মিডিয়া এখন আলোচনায় মেতেছে। তাদের তো ঠুনকো কোনো গসিপ চাই। "
একটুখানি থেমে,
" সামান্য একটা বিষয় নিয়ে কি দরকার ছিল এত তামাশা করার? নিজেকে সংযত করতে শেখো। এমন সামান্য সামান্য বিষয়ে যদি... "
আর বলতে পারলেন না তিনি। তানসীভের চোয়াল শক্ত। শান্ত সে। অস্বাভাবিক শান্ত।
" সামান্য ছিল না। "
স্বল্প শব্দ। গম্ভীর কণ্ঠস্বর। জহুরুল সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে।
" পারভেজ হাওলাদার কি না কি বলেছে এজন্য তুমি... "
বাবার কথা কেটে দিলো তানসীভ,
" ছুঁয়েছে। "
ঘরে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। চোখের মণি ঠাণ্ডা। তার আড়ালে লুকায়িত বিপদজ্জনক কোন ঝড়।
" আমার স্ত্রীকে ছুঁয়েছে। "
দাঁত পিষে বেরোয় শব্দগুলো। জহুরুল সাহেব থমকে যান। ছেলেকে তিনি চেনেন। উনিই তো গড়ে তুলেছেন এই রূপে। দা'ম্ভিক, নির্দয়, নি'ষ্ঠুর। কিন্তু চেনা ছেলেটির অভিব্যক্তিতে আজ সুক্ষ্ম অচেনা কিছুর আভাস। অদ্ভুতুড়ে অধিকারবোধ।
" যা করেছি কমই করেছি। "
স্বল্প শব্দে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে দা'ম্ভিক মানুষটা। জহুরুল সাহেব অবাক চোখে তাকিয়ে! তানসীভ আর শব্দ ব্যয় করে না। অগ্রসর হয় স্টাডি রুমের দরজায়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে থেমে যায় এক মুহুর্ত। পিছু ঘুরে তাকায় না। কাট কাট ধারালো স্বরে ওই ভঙ্গিমায় বলে,
" মির্জা তানসীভ শাহ্ এর সম্মানে হাত দিলে.. জ্যা'ন্ত পুঁ-তে দেবো। "
বেরিয়ে যায় তানসীভ। জহুরুল সাহেব হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে! অনেকটা সময় জুড়ে নীরবে বসে থাকেন। এই ছেলেকে তিনি চেনেন না। এ যে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস!
•
মধ্যরাত। নিস্তব্ধ এ হাসপাতাল। লম্বা করিডোরে হালকা পাওয়ারের আলো। চারপাশে জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ। অদূরে মনিটরের বিপ বিপ অস্পষ্ট শব্দ কানে আসছে। হাই প্রোফাইল কেবিনটির বাইরে ফাঁকা। দু'জন নিরাপত্তারক্ষী থাকার কথা সেখানে। অথচ তারা অনুপস্থিত। অস্বাভাবিক ফাঁকা গোটা করিডোর। করিডোরের একপাশে সিসি ক্যামেরা। লাল আলোটা বন্ধ। নিস্ক্রিয় ক্যামেরা। ধীরপায়ে শুনসান ফাঁকা করিডোর ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষটি। কালো পোশাকে আবৃত আপাদমস্তক। মুখমণ্ডল ঢাকা। হাঁটছে শব্দহীন। নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে। মানুষটা এসে পৌঁছায় হাই প্রোফাইল কেবিনের দরজায়। মধ্যবয়স্ক গণ্যমান্য ব্যবসায়ী পারভেজ হাওলাদারের কেবিন। ভেতরে মৃদু আলোর উপস্থিতি। নিঃশব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে মানুষটা। সাদা রঙের বিছানায় শায়িত পারভেজ হাওলাদার। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। হাতে ক্যানোলার সূচ ফোটানো। শরীরের অবস্থা বিপর্যস্ত। জায়গায় জায়গায় শুভ্র রঙা ব্যান্ডেজ। কোনো জায়গা অক্ষত রয়েছে কি? চেহারা ফুলে বিকৃত হয়েছে। ঘুমের ওষুধে অচেতন সে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। নিঃশব্দে আটকে দেয় কেবিনের দরজা। ধীরপায়ে এগিয়ে যায় অচেতন পারভেজের দিকে। মনিটরে সবুজ রেখা নিয়মিত ওঠানামা করে চলেছে। বিপ বিপ শব্দটা কানে আঘাত হানে। অজ্ঞাত ব্যক্তি মাথাটা নিচু করে। পারভেজের কাছাকাছি মুখটা নামায়। ফিসফিসিয়ে ওঠে,
" ইটস্ পেইনিং? "
কোনো জবাব আসে না। অচেতন মানুষটা। অজ্ঞাত ব্যক্তি শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অস্বাভাবিক স্থির। অতঃপর ধীরে ধীরে গ্লোভস পড়া হাতটা এগিয়ে দেয় রোগীর দিকে। ঘনিয়ে আসে অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।
•
পার্টির সে-ই ভ'য়াবহতার পর তিনদিন কেটে গিয়েছে। শান্ত এক বিকেল। বাড়ির লনে পারগোলার নিচে বসে রয়েছে লাজুক। বাতাসে ফুলের সুঘ্রাণ। আশেপাশে পাখিদের কলতান। চেহারার ওপর পড়ছে টুকটুকে নরম আলো। বিগত ক'দিনে আলহামদুলিল্লাহ্ ধীরে ধীরে নিজেকে সামলাতে পেরেছে সে। সে-ই রাতের আতঙ্ক পুরোপুরি মুছে যায়নি এখনো। হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় নোংরা, গা ঘিনঘিনে স্পর্শ। কখনোবা লোকটার সেই লো'লুপ দৃষ্টি। ভয় হয় তখন। কেঁপে ওঠে বুকের ভেতর। তবুও মহান রবের কৃপায় নিজেকে শান্ত করতে পেরেছে সে। গত দিনগুলো তার কাছে কেমন অচেনা ছিল। অদ্ভুত শান্তির। অন্যরকম আপন। স্বামী মানুষটা এই তিন দিনে আরো অপাঠ্য হয়ে গিয়েছে যেন। মানুষটা খুব কম কথা বলে। বেছে বেছে শব্দ নির্ধারণ করে যেন। চোখের চাহনি তো মারাত্মক। ওই চাহনির তীব্রতায় বড় বড় আগামাথা শিউরে ওঠে। মির্জা তানসীভ শাহ্ অনুভূতি প্রকাশে বড় অপটু। নিজেকে প্রকাশ করতে জানে না সে। সে রাতে ওকে প্রথমবারের মতো সান্ত্বনা দিলো। বেছে বেছে খুবই অল্প কিছু শব্দ বললো। সে অল্প শব্দের ভারে ওর ভেতরটা শান্ত হতে বাধ্য হলো। যন্ত্রনায় উপশম হলো গম্ভীর শব্দগুলো। মানুষটা এমন কেন? এতটা অকল্পনীয়! ভাবনাতীত। গত তিনদিন সে নিঃশব্দে পাশে থেকেছে। গদগদ ভঙ্গিতে তার আদরযত্ন করেনি। খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়নি। বরং নীরবে নিবিড় খেয়াল রেখেছে। তার ভালোমন্দ অনুভূতি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। রাতে শান্তির ঘুমটুকু পেতে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়েছে। মুখে বলেনি। কিন্তু তার আচার ব্যবহার ক্ষণে ক্ষণে বুঝিয়ে দিয়েছে। ভয় পেয়ো না মেয়ে। আমি আছি তো। নিঃশব্দ, নিবিড় এই যত্ন লাজুকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কোমল হয়ে আসে অন্তঃস্থল। অজান্তেই ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে পা'ষাণ পুরুষটার প্রতি।
' ম্যাডাম! '
আকস্মিক পুরুষালি এক ডাকে ধ্যান ভঙ্গ হয় লাজুকের। সামনে তাকায় সে। ওয়াচম্যান দাঁড়িয়ে। হাতে একটা বক্স। এগিয়ে দেয় বক্সটা।
" আপনার নামে আসছে। "
লাজুক ওড়না ঠিক করে উঠে দাঁড়ায়। চমকিত কণ্ঠে বলে,
" আমার নামে? কিন্তু আমি তো কিছু অর্ডার করিনি। "
" সে তো জানি না ম্যাডাম। ডেলিভারি ছেলেটা দিয়া গেল।"
" কিন্তু পেমেন্ট? "
" জানি না। বললো টাকা দেওয়া হইছে। "
" ওহ্। "
লাজুক বিভ্রান্ত। ওয়াচম্যান গোলাকার টেবিলের ওপর পার্সেল বক্সটা রেখে চলে গেল। লাজুক দ্বিধায় পড়ে যায়। বসে পড়ে সোফায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। ভাবে। শেষমেষ পার্সেল খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। হাতে নেয় বক্সটা। প্রাপকের স্থানে ওর পুরো নাম, ঠিকানা দেয়া। কিন্তু প্রেরকের ঘরটা খালি। অদ্ভুত! কে এই অজ্ঞাত প্রেরক? ওর নামে লুকোচুরি করে উপহার পাঠাচ্ছে। কোনো ভাবে মির্জা তানসীভ শাহ্ নয় তো? সে-ই সন্ধ্যার গাউনের মতো? উঁহু। রোজ রোজ তো আর চমক মিলবে না। ঘটনা অন্যকিছু। দেখা যাক কি। ধীরে ধীরে বক্সটা খুলে লাজুক। থমকে যায় ভেতরে তাকিয়ে! বক্সের ভেতর খুব সুন্দরভাবে মোড়ানো একগুচ্ছ গোলাপ। সাদা গোলাপ। শুভ্রতায় মোড়ানো। ঠিক সেদিনের মতো। সেদিন ছিল রাস্তায়। আজ সরাসরি বাড়িতে। এভাবে বাক্সবন্দী করে কে ফুল পাঠায়! লাজুক চিন্তায় পড়ে যায়। মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না। ক'দিন আগে ঘটলো এক কাণ্ড। এখন আবার এসব। কে রয়েছে এসবের পেছনে? হঠাৎ মেয়েটার ভাবনায় ছেদ পড়ে। খেয়াল করে গোলাপ ব্যতীত ছোট এক চিরকুট বক্সের ভেতর। কৌতূহলী হয়ে চিরকুট হাতে নেয়। ছাপা অক্ষরে কালো কালিতে লেখা শব্দগুলো,
' I am the shadow that
glides beside you,
The whisper that follows
where you go. '
লাজুক স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে! এই লাইনগুলো। এই কথাগুলো। এগুলোর গভীরতা তার ভাবনার বাইরে। সে কি তবে এই বিষয়টা এতদিন ছেলেখেলা ভেবে ভুল করেছে? বিষয়টা মোটেও মজার নয়। বরং ভিন্ন কিছু! ইংরেজি এই লাইনগুলো লাজুকের অচেনা। অজানা। আগে পড়েনি কোথাও। কিংবা কোনো চিরকুটে লেখা পায়নি। কিন্তু এর গভীরতা ঠিক উপলব্ধি করতে পারছে সে। সে কি আরো দেরি হবার আগেই বিষয়টা তানসীভকে জানাবে? তানসীভ কি বিশ্বাস করবে ওকে? শুনবে পুরোটা? জানা নেই ওর। গভীর দুশ্চিন্তায় ডুবে যায় মেয়েটা।
•
পাখিদের মৃদু কিচিরমিচির শব্দ মুখরিত করে তুলেছে প্রকৃতি। জানালার বাইরে মনোরম এক পরিবেশ। আলো অন্ধকারে ছেয়ে আছে ভোরের আকাশ। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তানসীভ। উপুড় হয়ে শোয়া। ঘুমের মধ্যেও চোখেমুখে কেমন চিন্তার ছায়া।
' শুনছেন? '
খুব ধীর কণ্ঠে কেউ ডেকে চলেছে। মায়াভরা মেয়েলি কণ্ঠস্বর। কিছু সময় অতিবাহিত হয় মস্তিষ্ক সচল হতে। বিরক্তি ফুটে ওঠে মানুষটির চেহারায়। বালিশে মুখ গুঁজে অস্ফুট শব্দ করে,
" উহ্! "
" উঠুন না। ওয়াক্ত পেরিয়ে যাচ্ছে। "
ঘুমে বিভোর মানুষটা। সাতসকালে এত ডাকাডাকি মোটেও ভালো লাগছে না।
" একটু উঠুন। নামাজ পড়বেন। এরপর আবার ঘুম দিয়েন। "
সাড়াশব্দ নেই। আবার ডেকে ওঠে মেয়েটা,
" আমি জানি আপনি সজাগ। ঘুম ভেঙে গিয়েছে। উঠুন না। আল্লাহ্ পাপ দেবেন তো। শুনছেন? "
" কিহ্? "
নাকমুখ কুঁচকে শেষমেষ চোখ মেলে তাকাতে বাধ্য হলো তানসীভ শাহ্। আধো ঘুমের চোখে তাকালো। দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো স্ত্রীর কোমলমতি অবয়বে। ধীরে ধীরে বিরক্তি কেটে গেল। সেখানে জায়গা করে নিলো অপরিসীম মুগ্ধতা! ডিম লাইটের মৃদু আলোয় দাঁড়িয়ে সে রমণী। হিজাবে আবৃত। চোখেমুখে কয়েক ফোঁটা অযুর পানি। সতেজতার ছাপ। চাহনিতে মায়াভরা অনুরোধ। আগে পরে দুই একবার সালাতের জন্য তাগাদা দিয়েছে মেয়েটা। তবে সফল হয়নি। কথা রাখেনি তানসীভ। সে শুধু জুমা বারের মুসল্লি। অন্যদিন রবের দরবারে হাজিরা দেয়া হয় না। বিগত সাতদিন ধরে লাগাতার হাত-পা ধুয়ে পেছনে পড়েছে মেয়েটা। নামাজের জন্য খালি ঘ্যান ঘ্যান করে। সুযোগ পেলেই দুই একটা দ্বীনি ডায়লগ ছাড়ে। ভয়ডর হারিয়ে গিয়েছে নাকি? গত তিনদিন অবশ্য ভিন্ন ছিল। নিজ জগতে ডুবে ছিল মেয়েটা। ওকে দ্বীনের ডাক দেয়ার ফুরসৎ মেলেনি। আজ আবার পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছে। অসহ্যকর! তানসীভ বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খেল। ওর কাণ্ড দেখে মনটা খারাপ হলো লাজুকের। দেয়াল ঘড়িতে তাকালো সে। আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকি। ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে। আজ-ও উঠবে না তাহলে! উদাস মনে বেড থেকে সরে যেতে উদ্যত হয় সে। হঠাৎই মেঝেতে কারো পদধ্বনি। কৌতূহলী হয়ে লাজুক পিছু ঘুরে তাকায়। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে! বিছানা ছেড়ে নেমে এসেছে দীর্ঘকায় মানুষটা। উদোম দেহে এগিয়ে যাচ্ছে ওয়াশ রুমের দিকে। ঘুম জড়ানো ভারী কণ্ঠে বলে ওঠে,
" টুপি মিসিং। "
লাজুক অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে। ঠোঁট কেঁপে ওঠে। ভিজে যায় চোখ। মানুষটা আজ সত্যিই উঠেছে! অযু করতে যাচ্ছে? প্রশান্তি বয়ে যায় অন্তরে। চোখ মুছে নেয় মেয়েটা। দ্রুত পায়ে কাবার্ডের কাছে এগিয়ে যায়। স্বামীর জন্য সাদা পাঞ্জাবি, টুপি গুছিয়ে রাখতে। চোখেমুখে আলাদাই এক উজ্জ্বলতা। আশার আলো জেগে উঠছে ধীরলয়ে। ইনশাআল্লাহ্ সুদিন ফিরবে।
-
নতুন এক দিনের সূচনা। ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে উঠছে বসূধা। পাখিদের মিষ্টি কলতান। প্রকৃতির মোহনীয় সুবাস। বাড়ির লনে পারগোলার নিচে বসা তানসীভ। সোফায় দেহ এলিয়ে দেয়া। বন্ধ চোখ। দীর্ঘদিন পর আজ ফজর ওয়াক্তে ওঠা হয়েছে। সালাত আদায় হয়েছে। ঘুমটা ভেঙে গিয়েছে। ঠিক কতদিন, কত মাস কিংবা কত বছর পর এবেলায় ঘুম ভাঙলো তার? স্মরণে আসছে না ঠিকঠাক। শান্ত মনে চুপটি করে বসে রইলো সে। কিছু সময় নীরবে অতিবাহিত হলো। সেখানে উপস্থিত হলো লাজুক। পাশের সোফায় কাছাকাছি বসলো। ইতস্তত বোধ করছে মেয়েটা। হাত কচলে নিচ্ছে। তিরতির করে কাঁপে চোখের পাতা। ঠোঁটজোড়া কিছু বলতে গিয়েও ব্যর্থ হয়। মানুষটা চোখ বুজে বসা। তবুও ওর দ্বিধাগ্রস্ত মনটা পড়তে পারে। অস্ফুট স্বরে আওড়ে ওঠে,
" হু? "
একটুখানি ভরসা পায় লাজুক। মনে মনে শব্দগুলো গুছিয়ে নেয়। জিভে ভিজিয়ে নেয় ঠোঁট। মৃদু কন্ঠে বলে ওঠে,
" আমাকে আপনি বিশ্বাস করেন? "
নীরবতা। কোনো জবাব নেই। শঙ্কিত হয় মেয়েটা। সোফার হাতল শক্ত করে চেপে ধরে। থেমে থেমে আকুল স্বরে বলে,
" আ আমি যদি আপনাকে এমন কিছু বলি। যা হয়তো বিস্ময়কর। বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও কি আপনি আমার ওপর আস্থা রাখবেন? ভুল বুঝবেন না তো? "
কয়েক সেকেন্ড কিংবা মিনিট কেটে যায়। গম্ভীর গলায় বলে ওঠে মানুষটা,
" পয়েন্টে এসো। "
দিশেহারা হয়ে পড়ে লাজুক। এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করে। গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে ওঠে শেষমেষ,
" আমাকে কেউ স্টক (stalk) করছে। "
চলবে।