#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[১৬]
' তাহলে কি শহরে জেগে উঠেছে নতুন কোনো সিরিয়াল কি"লার? '
চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে লিভিংরুমে। পলি আতঙ্কে আহাজারি করে ওঠে,
" ও আল্লাহ গো! সিরিয়াল খু নি! মোরে মাইরা ফালাইবো গো! "
" চুপ কর তো। শুনতে দে আগে। "
ইফরাত ধমক দেয়। আতঙ্কে চুপ হয়ে যায় পলি।
-
" ভাবী! আজকে হোয়াইট সস পাস্তা বানাও না। সেদিন আমি মিস্ করে গেছি। খুব টেস্টি হয়েছিল নাকি! "
সন্ধ্যা নেমেছে শহরের বুকে। কৃত্রিম আলোয় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে জনবহুল পথঘাট। রান্নাঘরে লাজুক নাস্তা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওর পিছুপিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে ফুফাতো ননদ তন্বী। হোয়াইট সস পাস্তা খাওয়ার বায়না করছে মেয়েটা। লাজুক মুচকি হেসে উঠলো।
" আচ্ছা ঠিক আছে। আজ তাহলে পাস্তা বানাবো ইনশাআল্লাহ্। পুডিং ক্যান্সেল। "
" পুডিং! "
লোভে জিভে পানি চলে এলো তন্বীর। এ কি মুশকিলে পড়লো সে! পাস্তা না পুডিং! ঝাল ঝাল নাকি মিষ্টি আইটেম! কোনটা খাবে! ভাবনাচিন্তা শেষে তড়াক করে বুদ্ধির বাতি জ্বলে উঠলো। অমায়িক আহ্লাদে হাসি উপহার দিলো তন্বী। একদম মাখন লাগানো স্বরে ডেকে উঠলো,
" ভাবী! ও আমার মিষ্টি ভাবী। ছোট ভাবী শুনছো? "
পাস্তার প্যাকেট হাতে নিয়ে লাজুক সন্দিহান চোখে তাকালো,
" কি ব্যাপার বলো তো তন্বী? তোমার হাবভাব তো সুবিধার ঠেকছে না। "
তন্বী মুখটা কাঁচুমাচু করে বললো,
" এত বড় কথা বলতে পারলে? "
" হু। তোমার কথার মধ্যে এক্সট্রা মাখন টের পাচ্ছি। কি বলবে বলে ফেলো। "
" ভাইয়ার বাতাস লাগছে আস্তে আস্তে। একদম স্ট্রেট ফরোয়ার্ড! "
বিড়বিড় করে উঠলো তন্বী। লাজুক মিটিমিটি হাসছে,
" কি হলো বললে না? "
পয়েন্টে ফিরে এলো তন্বী। আবদারের সুরে বললো,
" ভাবী। ইফ ইয়্যু ডোন্ট মাইন্ড... পাস্তা, পুডিং দু'টো একসাথে সম্ভব? "
লাজুক মুখ টিপে হাসে।
" আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে এই আবদারের জন্য এত বাটারিং? "
দুষ্টুমি করার সুযোগ হাতছাড়া করলো না মেয়েটা। তন্বী বেজার হয়ে বললো,
" বাটারিং করছিলাম না। "
" ওকে ওকে। কোনো বাটারিং করছিলে না। "
" হুম। "
" আচ্ছা... পুডিং আর পাস্তা দুটোই টাইম লাগবে কিন্তু। আগে পাস্তা এরপর পুডিং। চলবে? "
" ইয়েসসস! চলবে মানে দৌড়াবে। লাভ ইয়্যু ভাবী। উম্মাহহহ! "
উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে দিয়ে দুরন্ত পায়ে রান্নাঘর হতে বেরিয়ে গেল তন্বী। সে কি উচ্ছ্বাস! লাজুক একাকী নিঃশব্দে হেসে উঠলো।
-
লিভিংরুমে নারী সদস্যগণ জমায়েত হয়েছে। সোফার আসনগুলো দখলে চারজনের। লাজুক, ইফরাত, তন্বী এবং পলি। পলি মেয়েটা পেশাগত দিক দিয়ে এ বাড়ির গৃহকর্মী। তবে ইফরাত, লাজুক ওকে ছোট বোনের মতো স্নেহ করে। প্রাপ্য সম্মান দেয়। আগে ইফরাত একা ছিল। এখন লাজুক, ইফরাত দু'জনের সঙ্গে বেশ জমেছে পলির। পলির সিধা সাদা দুষ্টুমিষ্টি কথাবার্তা ওরা দু'জন বেশ উপভোগ করে। ওর সঙ্গে অবসরে সময় কাটায়। এবেলায় পাস্তা খেতে খেতে চার রমণীর মধ্যে হাসাহাসি চলছিল। টিভিতে চলছিল একটা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে তখন আরম্ভ হয় রাত আটটার সংবাদ। ওরা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় মগ্ন। সংবাদে মনোযোগ নেই। হঠাৎই কানে ভেসে আসে,
- ' রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অর্ধগ'লিত এক ব্যক্তির ম"রদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। '
কথাটা কানে পৌঁছায়। লাজুকের হাসি ধীরে ধীরে থেমে যায়। তাকায় টিভির পর্দায়। টিভিতে প্রদর্শিত হচ্ছে অন্ধকার নদীর পাড়। পুলিশের রঙিন ফ্ল্যাশলাইট। লা"শের আশপাশে গোলাকার করে বাঁধা হলুদ রঙা ক্রাইম সিন টেপ। আশপাশে কৌতূহলী জনগণের ভীড়।
- ' দর্শকবৃন্দ। এই মুহূর্তে আমি অবস্থান করছি বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে। কয়েক ঘণ্টা আগে স্থানীয়রা এখানে বিদঘুটে পঁচা গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ এখানে আসে। ঝোপের ভেতর থেকে অর্ধগ'লিত এক ম"রদেহ উদ্ধার করে। '
উপস্থিত চার রমণী উদ্বিগ্ন, কৌতূহলী হয়ে নিউজে মগ্ন হয়। পলি ভয়ে ভয়ে বিড়বিড় করে ওঠে,
" আল্লাহ্ গো! আবার কোন মায়ের কোল খালি হইলো? "
টিভিতে দৃশ্যমান সাদা কাপড়ে আবৃত এক বিকৃত লা-শ। লা"শকে ঘিরে কর্মব্যস্ত ফরেনসিক টিম। দায়িত্বরত পুলিশ অফিসারের মুখ মাস্ক দিয়ে আবৃত।
- ' পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মৃ"ত্যুর অন্তত কয়েকদিন পর ম"রদেহটি এখানে ফেলে রাখা হয়েছে। মৃ"তদেহের শরীরে একাধিক ধারালো অ-স্ত্রের আঘাত পাওয়া গিয়েছে। '
লাজুকের বুকের ভেতর অকারণে অস্বস্তি জেগে ওঠে। ধুকপুক ধুকপুক করছে অন্তঃস্থল। বাকিরা ভীত।
- ' দর্শকবৃন্দ। কিছুক্ষণ আগে সবচেয়ে রহস্যজনক একটা বিষয় উদঘাটন করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। লা-শের পাশে পাওয়া গিয়েছে এক অদ্ভুত সাইন। একটা গোলাপ ফুল। যা গত মাসের আলোচিত রূপা হ-ত্যাকাণ্ডের ক্রাইম সিনের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। '
একজন পুলিশ এভিডেন্স ব্যাগের ভেতরে কোনো প্রমাণ সংরক্ষণ করছে। লাজুক শক্ত হয়ে বসে। কেমন একটা অনুভুতি হচ্ছে। ভালো ঠেকছে না এসব। এমন কেন লাগছে? টিভির পর্দায় তখন রূপা হ"ত্যাকাণ্ডের কিছু ঝাপসা সিন দেখাচ্ছে। স্ক্রিন বিভক্ত হয়ে যায় দুই ভাগে। একপাশে রূপার নিথর দেহের পাশে পাওয়া অদ্ভুদ সাইন। গোলাপ ফুল। অপরদিকে এই নতুন ম"রদেহের পাশেও ঠিক একই চিহ্ন। তন্বী বিভ্রান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
" এসব কি বলছে রিপোর্টার? রূপা মা"র্ডার কেসের সাথে এই কেসটাও জড়িত? তার মানে.. "
নিউজ রিপোর্টার তখনই বলে ওঠে,
- ' তাহলে কি শহরে জেগে উঠেছে নতুন কোনো সিরিয়াল কি"লার? নাকি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে রূপা হ"ত্যার প্যাটার্ন রি-ক্রিয়েট করছে? '
চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে লিভিংরুমে। পলি আতঙ্কে আহাজারি করে ওঠে,
" ও আল্লাহ গো! সিরিয়াল খু নি! মোরে মাইরা ফালাইবো গো! "
" চুপ কর তো। শুনতে দে আগে। "
ইফরাত ধমক দেয়। আতঙ্কে চুপ হয়ে যায় পলি। লাজুক একমনে শুনছে সবটা। কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে নিউজ। নিজেদের মধ্যে ফুসুরফুসুর করতে থাকে তন্বী, পলি। লাজুক চুপচাপ। উৎকণ্ঠায় ভুগছে। আরো কিছু সময় কেটে যায়। হঠাৎই রিপোর্টার জানান দেয়,
- ' দর্শকবৃন্দ! এই মুহূর্তে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মরদেহের পকেট থেকে তার মোবাইল ফোন পাওয়া গিয়েছে। সেখান থেকে পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। '
চার রমণী গভীর মনোযোগ সহকারে দেখতে থাকে নিউজ। লাজুক শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার।
- ' মৃ"ত ব্যক্তির পরিচয় উনি দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী পারভেজ হাওলাদার। গত দু'দিন আগে হাসপাতাল থেকে রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হন তিনি। আজ ওনার মৃ-তদেহ উদ্ধার হলো এই বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচে। '
মুহুর্তের মধ্যেই পুরো ঘরজুড়ে বি-স্ফোরণ হলো যেন। ইফরাত স্তব্ধ! লাজুকের হাত ফসকে পড়ে যায় কাঁটাচামচ। মেঝেতে পড়ে টুং শব্দ হয়। টিভির পর্দায় তখন ব্রেকিং নিউজ লেখাটা ঘুরে বেড়াচ্ছে। পারভেজ হাওলাদারের বিভিন্ন ছবি একাধারে প্রদর্শিত হচ্ছে। মধ্যবয়স্ক সেই ম'দ্যপ ব্যক্তি। তার লো'লুপ দৃষ্টি। নোংরা স্পর্শ। তানসীভের ক্ষি'প্ত রূপ। একে একে সবটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ইফরাত ফিসফিসিয়ে ওঠে,
" এই লোকটা তো... "
লাজুকের মস্তিষ্ক প্রায় অচল। মাথা ঝিমঝিম করছে। বোধশক্তি হারিয়ে পড়ে যাবে কি!
- ' পুলিশ ধারণা করছে এটি পরিকল্পিত হ-ত্যাকাণ্ড। রূপা মা'র্ডার কেসের সঙ্গে এর কোনো কানেকশন থাকতে পারে। '
লাজুকের বুকের ভেতর শীতলতা ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ে ফ্যাকাসে হয় চোখমুখ। খুবই নিচু গলায়, যেন নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করে,
" এসব কে করেছে? "
ইফরাত প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে। দু'জনের চোখে তখন একই প্রশ্ন। একই ভয়।
•
রাত প্রায় দেড়টা। গভীর ঘুমে তলিয়ে শহরবাসী। ঘরে ঘরে অধিকাংশ আলো নিভে গিয়েছে। কিছু কিছু বিল্ডিংয়ে মিটিমিটি জ্বলছে কৃত্রিম আলো। কেউ কেউ এখনো জেগে রয়েছে। নিজ কর্মে ব্যস্ত। আকাশে তুলোর ন্যায় মেঘ জমেছে। বাতাসে আগাম বৃষ্টির গন্ধ। ' গুলবাহার মঞ্জিল ' এর দোতলায় হলদে বাতিটা মিটিমিটি জ্বলছে। রেলিং সংলগ্ন উদোম দেহে দাঁড়িয়ে পেশিবহুল মানব। এক হাত পকেটে গুঁজে রাখা। অন্য হাতে ফোন ঠেকিয়ে রাখা কানে। কণ্ঠস্বর বেশ চাপা। তীক্ষ্ণ।
' না। '
' ... '
' বলুক। ভয় শব্দটা ডিকশনারিতে নেই। '
' ... '
' যা করার বুদ্ধিমত্তার সাথে করবে। সিঙ্গেল মিস্টেক। অল ওভার। '
আরো দুই একটা কথাবার্তা। অতঃপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মোবাইলের ঠাঁই হয় পকেটে। রেলিংয়ে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়ায় তানসীভ। মুখভঙ্গি কঠোর। চোখে অস্বাভাবিক স্থিরতা। আকাশে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। একঝলক আলো আছড়ে পড়ে গম্ভীর মুখশ্রীতে। তবুও সে নির্বিকার। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ধীরপায়ে পেছনে উপস্থিত হয় মেয়েটা। সে-ই সন্ধ্যা থেকেই চাপা আতঙ্কে ভুগছে সে। অন্তঃস্থল উদ্বিগ্ন। চোখমুখ ফ্যাকাশে। অবিরত রবের নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করে চলেছে। ঠোঁটে রয়েছে দোয়া ইউনুস। স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ায় মেয়েটা। নীরবে কিছু সময় কেটে যায়। ঠোঁট ভেজায় সে। এলোমেলো কথাগুলো গুছাতে ব্যর্থ হয়। উৎকণ্ঠায় ওড়নার প্রান্ত চেপে বসে আঙ্গুল। বাতাসে ভারী নীরবতা। দু'জনে যেন একই সুতোয় বোনা অস্বস্তিতে ভুগছে। অবশেষে লাজুক নিচু গলায় বলে ওঠে,
" নিউজ দেখেছেন? "
আস্তে করে তাকায় তানসীভ। ওর অন্তঃস্থ খবরাখবর পড়তে চায়। এ-ই নির্লিপ্ত চাহনিতে লাজুকের ঠোঁট কেঁপে ওঠে। ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। নত হয় মুখ। কয়েক সেকেন্ড স্থির। চোখ সরিয়ে নেয় তানসীভ। পূর্বের ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। লাজুক ভাঙা স্বরে বলে,
" পারভেজ হাওলাদার খু ন হয়েছে। সেই পার্টির লোকটা.."
বেলকনি জুড়ে ভ'য়ঙ্কর নীরবতা নেমে আসে। তানসীভ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি নিবদ্ধ শহরের বুকে। কোনো বিশেষ অভিব্যক্তি নেই। ঘৃণা, রাগ কিংবা বিস্ময়। অনুপস্থিত সব। মানুষটা একদম অভিব্যক্তিহীন। এই রূপটাই ভয় পাইয়ে দিচ্ছে লাজুককে। কেন এত নির্লিপ্ত সে? পার্টিতে জনসম্মুখে এতবড় হু'মকি দেয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে লোকটার এমন রহস্যজনক মৃ"ত্যু। লো'মহর্ষক ঘটনা। তবুও উনি কেন এত চুপ? লাজুকের চোখ গড়িয়ে দু ফোঁটা পানি ঝড়ে। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,
" আ আপনি নির্দোষ। তাই না? বলুন। "
কিছু বলে না তানসীভ। লাজুক অস্থির হয়ে পড়ে। ভাঙা ভাঙা এলোমেলো শব্দ বলতে থাকে,
" ওরা নিউজে আপনার.. নাম নিচ্ছে। অনেকে আপনাকে সন্দেহ.. ওই যে পার্টির জন্য। আমার জন্যই এসব.. হলো? তাই না? আমার যাওয়া উচিত হয়নি। লোকটা তো খারাপ। আমার যাওয়া ঠিক.. হয়নি। আপনি.. আপনি কিছু বলছেন না কেন? "
লাজুক ব্যাকুল হয়ে ওঠে কোনো আশাবাদী জবাবের জন্য। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম। তানসীভ নিশ্চুপ। চোখের সাদা অংশের রঙ বদল হয়ে চলেছে। কঠোর হয়ে ওঠে জ' লাইন। ভয়ে, দুশ্চিন্তায় লাজুক ভেঙে পড়ছে। পার্টির সে-ই হুমকি। সাক্ষী অতগুলো মানুষ। হুমকি দেয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এতবড় হ-ত্যাকাণ্ড। লোকেরা গসিপে মেতে উঠেছে। নিউজে রকমারী মশলাদার হেডলাইন হচ্ছে। অনেকে সাক্ষ্য দিচ্ছে টিভির পর্দায়। শত্রু মহল তো এসবের পূর্ণাঙ্গ সদ্ব্যবহার করে চলেছে। লাজুক এসব আর নিতে পারছে না। এই অন্ধকার জগতে অভ্যস্ত নয় সে। এত র-ক্তাক্ত জটিলতা তার জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। আকুল হয়ে লাজুক আরো একবার ভেজা কণ্ঠে বলে ওঠে,
" বলুন না। "
অবশেষে নীরবতা ভঙ্গ হয়। গম্ভীর, ঠাণ্ডা স্বরে বলে ওঠে মানুষটা,
" ঘুমাতে যাও। "
সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এই দুই শব্দের জবাবে লাজুক হতভম্ব! অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। তবে কি সে ভুল? ভুল তার সমস্ত ধারণা, গোপন অনুভূতি! মানুষটা শেষমেষ নোংরা র"ক্তে রাঙিয়ে নিলো নিজেকে? ধীরে ধীরে স্তব্ধ মেয়েটার পিঠ ঠেকে যায় দেয়ালে। জলস্রোতের ন্যায় চক্ষু গড়িয়ে অবিরাম পানি ঝড়ে। চাহনি শূন্য। বিশ্বাস, অবিশ্বাসের ফাঁকফোকরটুকু আজ বড় ক্ষীণ। দমবন্ধকর।
•
সময় তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। রান্নাঘরের ভেতর উত্তপ্ততা। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মাংসের সুগন্ধ। চুলায় মুরগির মাংস রান্না হচ্ছে। হাতা নাড়াচ্ছে আফসানা। কপালের পাশে ঘামে লেপ্টে রয়েছে কিছু চুল। ভারী শরীরটার ঊর্ধাংশ ওড়নায় আবৃত। চুপিসারে পাশে এসে দাঁড়ায় স্বামী মানুষটা। মুখে বিশ্বজয়ী হাসি।
" হয়ে গেছে। এই নাও। "
আফসানা হাতা'টা একপাশে রেখে দেয়। স্বামীর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। হাতে থাকা প্লেটে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ওঠে। শাহেদ মুখটা কাঁচুমাচু করে ফেলে।
" কি হয়েছে? এভাবে হাসছো কেন? "
" তোমাকে নিষেধ করেছিলাম। শুনলে না তো? "
শাহেদ হাতে থাকা প্লেটে তাকায়। টমেটো কাটা। এবড়োখেবড়ো আকৃতির। টমেটোর ভেতরকার মালমশলা জুস হয়ে গিয়েছে যেন। আফসানা মুখ টিপে হাসছে। শাহেদ বুঝেও না বোঝার ভান করলো,
" বাই এনি চান্স তুমি কি আমার স্টাইলিশ কাটিং দেখে হাসছো? "
" না মানে হ্যাঁ। আসলে কি বলো তো। ক্ষুদ্র এই জীবনে এত আকর্ষণীয়, স্টাইলিশ কাটিং দেখিনি আগে। "
শাহেদ গর্বে বুক ফুলিয়ে দম নিলো,
" দেখবে কি করে? ইটস্ কল্ড অ্যাবস্ট্র্যাক্ট কাটিং। ইনভেনটেড বাই মোঃ শাহেদ রেজা। "
নিঃশব্দে হেসে ওঠে আফসানা। শাহেদ টমেটো কাটা রেখে দেয় এক পাশে। স্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে চুলার কাছে যেতে যেতে মুগ্ধ কণ্ঠে বলে,
" দেখি সরো তো। মাশাআল্লাহ্! কি যে সুন্দর ঘ্রাণ বেরিয়েছে। মনে হচ্ছে এখুনি টুপ করে এক পিস মাংস মে'রে দিই। "
" হ্যাঁ। এরপর আধা কাঁচা মাংস খেয়ে পেট খারাপ করো। বাথরুমে কামিং আর গোয়িং। স্যালাইন নিয়ে দৌড়ঝাঁপ। "
" আসতাগফিরুল্লাহ্! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। তুমি কেমন বউ গো! জলজ্যান্ত সুস্থ স্বামীটাকে অসুস্থ বানিয়ে দিচ্ছো? "
নাটুকে কণ্ঠ শাহেদের। হেসে ওঠে আফসানা।
" তুমি থামবে? "
দুষ্টুমি থেমে যায়। দু'জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আফসানা রান্না করছে। টুকটাক হেল্প করছে শাহেদ। মাঝেমধ্যে বাহুতে বাহু ছুঁয়ে যায়। স্ত্রীর ঘামে ভেজা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেয় সে। চোখে চোখে আলাপণ সেরে নেয়। শিহরণ বয়ে যায় অন্তরে। মুচকি হেসে ওঠে মেয়েটা। শাহেদের ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে ওঠে। সুখের হাসি। কিছুটা সময় পেরিয়ে যায়। আফসানা আস্তে করে বলে,
" তুমি এখন যাও। আমার রান্নাঘরের অবস্থা দেখেছো? পুরো বেহাল। "
" আমি কিন্তু নির্দোষ। "
আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে শাহেদ। আফসানা চোখ পিটপিট করে তাকায়।
" হ্যাঁ আমিই সব করেছি। তোমার ওই অ্যাবস্ট্র্যাক্ট কাটিংয়ের মতো। "
সুক্ষ্ম খোঁচা। শাহেদ কিছু বলতে চায়। তখনই শোনা যায় মায়ের কণ্ঠস্বর,
" খোকা! তুই কই? "
" আসছি মা। "
আফসানা তাড়া দেয়,
" তাড়াতাড়ি যাও। মা ডাকছেন। "
" হুম যাচ্ছি। তুমি সাবধানে কাজগুলো করো। আমি এই গিয়ে এই আসছি। "
" আসতে হবে না। আমি পারবো। "
কে শোনে কার কথা? নিজস্ব মতামত জানিয়ে উধাও সাহেব। আফসানা আনমনে হেসে ওঠে।
•
অস্বাভাবিক এক থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে সে কক্ষে। ঝুলন্ত সাদা এলইডি লাইটের আলো সরাসরি পড়ছে ধাতব টেবিলের ওপর। ধূসর রঙের দেয়াল। মৃদু আলো। হোমিসাইড বিভাগের জিজ্ঞাসাবাদ ঘরটিকে আরো দমবন্ধকর করে তুলেছে। ঘরজুড়ে পিনপতন নীরবতা। টেবিলের একপাশে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বসা মির্জা তানসীভ শাহ্। কালো রঙের শার্ট। শার্টের হাতা গোটানো। কব্জির শিরা দৃশ্যমান। চেহারায় অস্বাভাবিক স্থিরতা। চোখের তারায় ভয়ডর অনুপস্থিত। বিপরীত দিকে বসা সাদমান সিদ্দিকী। টেবিলের ওপর উন্মুক্ত করে রাখা কিছু ফাইল। সেগুলোতে রয়েছে ক্রাইম সিন ফটো, ফরেনসিক রিপোর্ট, হসপিটালের সিসিটিভি স্টিল ফ্রেম। এই কেসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রমাণ। ফাইলগুলোর ঠিক মধ্যখানে রাখা একটা ফটো। পারভেজ হাওলাদারের বিকৃত ম"রদেহের ফটো। সাদমান সিদ্দিকী ছবিটায় আঙ্গুল ঠুকে জিজ্ঞেস করে,
" লোকটাকে আপনি পাবলিকলি থ্রেট দিয়েছিলেন? "
তানসীভ চুপ।
" আপনি পার্টিতে সবার সামনে পারভেজ হাওলাদারকে শেষ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন? "
" হু। "
খুবই ক্ষীণ, নির্বিকার সে কণ্ঠস্বর। ভ্রু কুঁচকে যায় এসিপি সাদমান সিদ্দিকীর। তিনি টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপে ভিডিও প্লে করেন একটা। ল্যাপটপ কিছুটা ঘুরিয়ে দেন তানসীভের উদ্দেশ্যে। অন্ধকার রাতে শুনশান হাইওয়ের একপাশে ধ্বং-সলীলা। অবিরাম মা"রপিটের ভ'য়ঙ্কর দৃশ্য।
" এই ভিডিও পুরো স্যোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাইরাল একদম। ভিডিওতে মা"রপিট করতে থাকা লোকটা আপনিই তো? "
তানসীভ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একঝলক তাকায় ল্যাপটপে। এরপর দৃষ্টি সরিয়ে নেয় বিতৃষ্ণা সহকারে। সাদমান সিদ্দিকী সবটা লক্ষ্য করেন।
" ভিডিওতে লোকটার মুখ স্পষ্ট নয়। দূর থেকে ক্যাপচার করা। কিন্তু বেশভূষা আর মা"রপিটের ভঙ্গি বলে দিচ্ছে এটা আপনিই। "
চেয়ারে আরামদায়ক ভঙ্গিতে দেহের ভর ছেড়ে দেয় তানসীভ। ধাতব টেবিলের ওপর আঙ্গুলে টুক টুক শব্দ করে। ঠাণ্ডা গলায় বলে সে,
" হয়তো। "
সাদমান সিদ্দিকী বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলেন না। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন,
" মিস্টার মির্জা! আপনি যদি ভালোয় ভালোয় আমাদের সঙ্গে কো অপারেট না করেন, তাহলে লসটা আপনার ই। "
স্থির তানসীভ। কোনো ব্যাখ্যা নেই। আত্মরক্ষার চেষ্টা নেই। এটাই বিভ্রান্ত করে তুলছে অপর দিকের মানুষটিকে। উনি ফরেনসিক রিপোর্টটা খুলে বললেন,
" পারভেজ হাওলাদারের নখের ভেতর আপনার শার্টের ফাইবার পাওয়া গিয়েছে। "
আরেকটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন,
" আপনার মোবাইল লোকেশন ক্রাইম সিনের আশেপাশে।"
আরেকটা রিপোর্ট দেখিয়ে,
" পারভেজ হাওলাদার নিখোঁজ হওয়ার রাতে, হসপিটালের সিসিটিভি ব্ল্যাকআউক হওয়ার ঠিক আগে আপনার ডিভাইস থেকে সাসপিসিয়াস ডিজিটাল পিং (ping) গেছে। "
একের পর এক প্রমাণ। সবটা তানসীভ শাহ্ এর বিরুদ্ধে। ঘরটিতে ছড়িয়ে পড়ে ভারী নীরবতা। সাদমান সিদ্দিকী স্পষ্ট বাক্যে বলেন,
" সব এভিডেন্স আপনার বিরুদ্ধে। সব। "
কিছু মুহূর্ত কেটে যায়। রিপোর্ট হতে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় তানসীভ। ধীর গলায় বলে,
" ডেকে এনে টাইম ওয়েস্ট করার কারণ? "
সাদমান সিদ্দিকী ঝুঁকে যান সম্মুখে। কাট কাট স্বরে বলেন,
" কনফেশন চাই আমার। "
" ভুল জায়গায় নক করছেন। "
সাদমান সিদ্দিকী বিরক্ত এবার,
" আপনার বিরুদ্ধে সিরিয়াল কি'লিং এর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টা আদৌও বুঝতে পারছেন আপনি? দু'টো মা-র্ডার সেম ওয়ে তে। একই প্যাটার্ন। "
ক্ষীণ তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে তানসীভের ঠোঁটের কোণে।
" লোকটা আপনার স্ত্রীকে হ্যারাস করেছিল। আপনি তাকে পাবলিকলি পেটালেন। হুমকি দিলেন। ওই একই রাতে আবার হাইওয়েতে দলবল নিয়ে পেটালেন। এরপর পারভেজ হাওলাদার রহস্যজনক ভাবে হসপিটাল থেকে উধাও। শেষমেষ ওনার লা-শ পাওয়া গেল বুড়িগঙ্গায়। "
সাদমান সিদ্দিকী নিচু গলায় বলে,
" আপনার ক্লিয়ার মোটিভ ছিল। "
" প্রতিটা জীব মোটিভ নিয়ে বাঁচে। "
ত্যাড়া উত্তর। সাদমান সিদ্দিকী টেবিলে আঙ্গুল ঠুকে জিজ্ঞেস করেন,
" সত্যিটা কি? হুয়াই পারভেজ হাওলাদার? আর রূপা? তার সঙ্গে আপনার কানেকশন কি? "
তানসীভ স্থির, সোজা হয়ে বসা। সাদমান সিদ্দিকী পুনরায় একই প্রশ্ন করেন,
" বলুন। সত্যিটা কি? "
" মিথ্যের অপজিট। "
" ধাঁধা শুনতে বসিনি আমি। "
" জীবনটাই আস্ত এক গোলক ধাঁধা। "
একের পর এক ইচ্ছাকৃত ত্যাছড়া জবাব। অফিসার যথেষ্ট অপ্রসন্ন। চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন উনি। একটুখানি হেসে বললেন,
" সবচেয়ে ডিস্টার্বিং বিষয়টা কি, জানেন? "
তানসীভ ঠাট্টায় অংশগ্রহণ করে না। অফিসার বলেন,
" আপনি মোটেও ভয় পাচ্ছেন না। "
তানসীভ বাঁকা হাসে। চেয়ারে দেহ এলিয়ে দেয়। আস্তে ধীরে চোখ বন্ধ করে নেয়। আঙ্গুলের স্পর্শে আলতো করে ঘষে নেয় কপাল। অভিযুক্ত অপরাধীর এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ হালচাল দেখে অফিসার সত্যিই বিস্মিত!
" নিজেকে খুব স্মার্ট ভাবছেন? ভাবতে থাকুন। সত্যিটা লুকাতে পারবেন না। "
সাদমান সিদ্দিকী ঝুঁকে আসে তানসীভের দিকে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে।
" লাস্ট টাইম আস্কিং। খু-নটা কেন করেছেন? "
কয়েক মিনিটের নীরবতা। চোখ বন্ধ তানসীভের। সে ভঙ্গিমায় বরফ শীতল কণ্ঠে জানান দেয়,
" খোঁজ নেয়াটা আপনার দায়িত্ব। আমার নয়। "
ঘরের তাপমাত্রা ভারী হয়ে ওঠে। সাদমান সিদ্দিকী অভিজ্ঞ, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে। তাকিয়ে দেখছেন এই অহংকারী পুরুষটিকে। দ্বৈত খু-নের অভিযোগ এর ওপর। তবুও এত নির্লিপ্ততা! কি করে সম্ভব? আসলেই কি সত্যির অপজিটে মিথ্যেটা লুকিয়ে? প্রকৃত ঘটনা কি? কে সে-ই রহস্যময় অজ্ঞাত ঘা"তক!
চলবে।