ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

১৭তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[১৭]

' খু নের দায়ে অভিযুক্ত মির্জা তানসীভ শাহ্। '

রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। ভারী হয়ে আছে ঢাকার বাতাস। সন্ধ্যা হতেই বৃষ্টি। আধঘন্টার মতো হবে বৃষ্টির ঝাপটা থেমেছে। দূরে কোথাও বজ্রপাত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ঘরের ভেতরে হুমড়ি খেয়ে প্রবেশ করছে ভ'য়ঙ্কর আলো। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসা শাহেদ রেজা। হাতে রিমোট। দৃষ্টি নিবদ্ধ টিভির পর্দায়। দিনভর টিভিতে একটাই গরমাগরম খবর। মির্জা তানসীভ শাহ্ এর খবর। আর কোনো খবর নেই যেন। একটাই নাম। একটাই আতঙ্ক শহরজুড়ে। কনিষ্ঠ মির্জা উত্তরসূরী। টিভির পর্দায় তখনো অবিরাম ঘুরে বেড়াচ্ছে লেখাগুলো

' খু নের দায়ে অভিযুক্ত মির্জা তানসীভ শাহ্। '

' পারভেজ হাওলাদার হ ত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন তিনি। '

টিভিতে পারভেজ হাওলাদারের মৃ"তদেহ প্রদর্শিত হচ্ছে। দেখানো হচ্ছে আজকের ফুটেজ। হোমিসাইড বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে কালো জিপ গাড়িটা। গম্ভীর মুখে জিপ হতে নেমে আসছে তানসীভ। সাংবাদিকদের পাশ কাটিয়ে বড় বড় কদম ফেলে ভেতরে প্রবেশ করলো সে। সঙ্গে দু'জন বিশ্বস্ত সঙ্গী। শাহেদ নিউজে মগ্ন। হাতে থাকা রিমোট স্থির। চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ। আস্তে করে টিভির ভলিউম কমিয়ে দেয় সে। শূন্য চোখে তাকায় বেডরুমের দরজায়। ঘুমিয়ে পড়েছে আফসানা। গতকাল থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ঠাণ্ডা লেগেছে। সর্দি, কাশি ভাব। ক্লান্ত শরীরে আর পারছিল না। সন্ধ্যার পর ঘুমিয়েছে। ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে সে। আজ সারাদিন টিভি, মোবাইল থেকে যথাসম্ভব দূরে রেখেছে। আফসানা এখনো জানে না এ বিষয়ে। বোনের জীবনে এতবড় দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। জানতে পারলে মারাত্মক উৎকণ্ঠায় ভুগবে। আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। যা মা ও অনাগত সন্তানের জন্য কল্যাণকর নয়। তাই তো যথাসম্ভব সবটা লুকানোর চেষ্টা করছে সে। জানা নেই কতক্ষণ সফল হবে। আকস্মিক কটাক্ষের কণ্ঠস্বর পৌঁছায় কানে।

" বিয়ার দিন দেইখাই বুঝছিলাম ছেলেডা ভালো না। "

শাহেদ টিভির ভলিউম মিউট করে দেয়।‌ পাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করে মা দাঁড়িয়ে। টিভির পর্দায় তাকিয়ে উপরোক্ত মন্তব্য করেছেন।

" বিয়ার দিন কেমন ভাব নিয়া ছিল। অভদ্র ভাবছিলাম। খু নি কল্পনাও করি নাই। ভিতরে ভিতরে শেষমেষ এই ছিল? "

" তুমি এসব কি বলছো, মা? "

" ঠিকই তো কইছি। বেয়াই মশাই কি দেইখা এই পোলার লগে তোর শালির বিয়া দিলো, আল্লাহ্ জানে। টাকার লোভ তো বেয়াইয়ের নাই। তাইলে? "

সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় শাহেদ। নিচু স্বরে বলে,

" একটু আস্তে কথা বলো তুমি। আফসানা শুনে ফেলবে।"

শাহেদ অনুরোধ করে। মা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,

" তো শুনবো না? কয়দিন লুকাইবি তুই? এই পোলা দেখিস জেল খাটবো শেষমেষ। তোর শালির কপালে দুঃখ আছে। "

শাহেদ বিস্মিত মায়ের এমন নেতিবাচক মন্তব্যে! মা একাকী আফশোস প্রকাশ করলেন,

" আহা রে! মাইয়াডা কত ভালা। ভদ্র, সভ্য। ওর কপালে শেষমেষ এমন শ-য়তান পোলা আছিল? সবই ওপর ওয়ালার ইচ্ছা। "

" এখনো কিন্তু কিছু প্রমাণ হয়নি। আগেই এমন নেগেটিভ কমেন্ট করো না তো। "

" প্রমাণের বাকি আছে কি? টিভিতে সব জায়গায় এক কথা। পুলিশ কি মিছা কইছে? দেখ গিয়া ওই পোলাই খু ন করছে। বড়লোকের উচ্ছন্নে যাওয়া পোলা। ছ্যাঁ! "

শাহেদ ভাবনায় পড়ে যায়। বিয়ের দিন মাত্র একবার দেখেছিল তানসীভ নামক পুরুষটিকে। যথেষ্ট গম্ভীর, ঔ'দ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। তার দ্বারা কি সত্যিই খু-নের মতো গর্হিত, নৃ"শংস কাজ সম্ভব?

•

গভীর রাত্রি। গুলবাহার মঞ্জিলের অন্দরমহলে নিস্তব্ধতা। মৃদু আলো জ্বলছে করিডোরে। পুরো বাড়ি জুড়ে থমথমে আতঙ্কের রেশ। দোতলার একটি রুমে তখন ক্ষীণ আলো জ্বলছে। ঘরের দরজা ভিড়িয়ে রাখা। ভেতরে নামাজে মগ্ন এক রমণী। তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে চলেছে। সিজদায় লুটিয়ে রয়েছে লাজুক। হালকা কাঁপছে শরীর। অবিরত রবের নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করে চলেছে সে। কান্নায় ভিজে যাচ্ছে জায়নামাজ। সিজদা থেকে উঠে বসে মেয়েটা। শেষ বৈঠকের দোয়া পাঠ করে। নামাজ থেকে মোনাজাতে দু হাত তুলে রবের নিকটে। অশ্রুভেজা চোখ। লালচে মুখ। কাঁপছে ঠোঁট। নিঃশব্দে ডেকে চলেছে স্রষ্টাকে,

" ইয়া আল্লাহ্! আমার স্বামীকে আপনি হেফাজত করুন। উনি যদি নির্দোষ হন, দয়া করে সত্যিটা সামনে আনুন। ওনাকে রক্ষা করুন আল্লাহ্। এই বিপদের সময় আপনিই আমার একমাত্র সাহায্যকারী। হেফাজতকারী। আমাকে ও আমার পরিবারকে দয়া করে রক্ষা করুন। "

একাধারে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে চলেছে মেয়েটা। কান্না আটকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। শেষ রাত এখন। মানুষটা বাড়ি ফেরেনি। কোথায় রয়েছে, কি করছে জানা নেই ওর।‌ মানুষটা আদৌও ঠিক আছে তো? এই অন্ধকার জগতের পদে পদে যে বি"ষাক্ত কাঁটা। কখন কোন কাঁটা শরীরে বিঁধে যায়, টের পাওয়া মুশকিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোনাজাত সমাপ্ত করে লাজুক। ঝাপসা চোখে দেয়াল ঘড়িতে তাকায়। রাত তিনটা বেজে চল্লিশ মিনিট। শূন্য এই ঘর। অনুপস্থিত ঘরের মানুষটি। চোখ বন্ধ হয়ে আসে। গাল বেয়ে পড়ে অশ্রু। লাজুক এখনো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চাইছে। তানসীভ খু-নি নয়। সে হয়তো পা'ষাণ, দা'ম্ভিক, রূঢ়ভাষী। র-ক্তাক্ত পৃথিবীতে বেড়ে ওঠা মানব। তবে ঘাতক নয়। এতটা পা'শবিক নয়।

' ইয়া রাব্বে কারীম! ওনাকে হেফাজতে রাখুন। '

•

জরাজীর্ণ সে গ্যারেজ। মেশিন অয়েল, মরিচা ধরা লোহার গন্ধে ভারী বাতাস। ভেতরে আধো অন্ধকার। ছাদের ফাঁক গলিয়ে সূর্যের আলো সরু রেখা হয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। আধভাঙা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষটি। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেড়োচ্ছে বি"ষাক্ত ধোঁয়া। আধপোড়া সিগারেট আঙ্গুলের ফাঁকে। চোখের সাদা অংশ লাল। রাত জেগে থাকার স্পষ্ট চিহ্ন। তবুও ক্লান্তির ছাপ অনুপস্থিত। অস্বাভাবিক স্থিরতা মুখভঙ্গিতে। দৃষ্টি নিবদ্ধ বাইরে। মনের ভেতর নানাবিধ হিসাব কষে চলেছে। গ্যারেজের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে দলের ছেলেরা। ভাইয়ের সঙ্গে রাত জেগেছে তারা। সঙ্গ দিয়েছে। বুদ্ধি দেয়ার বৃথা চেষ্টা করেছে। এখন অবধি সব প্রমাণ যে ভাইয়ের বিরুদ্ধে। ছেলেগুলো এখন ঘুমিয়ে। হঠাৎ শোনা গেল সাইরেন। আরো নিকটবর্তী শব্দ। ধড়ফড় করে উঠে পড়লো ছেলেগুলো। বাপ্পী চোখ কচলে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললো,

" কিয়ের আওয়াজ রে? "

" পুলিশ আইছে মিয়া। "

তড়াক করে পালালো ঘুম। বাপ্পী দ্রুত পায়ে ছুটে গেল তানসীভের কাছে।

" ভাই! পুলিশ আইছে। অর্ডার দেন খালি। সব কয়ডারে হোয়াই দিমু। "

তানসীভের কোনো বিকার নেই। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সে। বাপ্পী আরো কিছু বলার আগেই দৃশ্যপট বদলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলো সশস্ত্র পুলিশ। আধপোড়া সিগারেট জমিনে ফেলে দেয়। পা দিয়ে পিষে ফেলে তানসীভ। মুখমণ্ডলে ভয় নেই। নেই কোনো বিস্ময়।

" মির্জা তানসীভ শাহ্। আপনার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে। "

তানসীভ জানালা বরাবর স্থির দাঁড়িয়ে। বাপ্পী উত্তেজিত হয়ে যায়।

" আপনি এইসব কি কইতাছেন স্যার? আমগো ভাই কোনো খু"নখারাবি করে নাই। হ্যায় মানুষ মা"রে না।

দলের একটা ছেলে অ স্ত্র তাক করতে উদ্যত হয়। অতি গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠলো তানসীভ,

" রতন! "

রতন ছেলেটা তৎক্ষণাৎ দমে যায়। প্যান্টে গুঁজে নেয় অ স্ত্র। বাকিরা থমকে যায় নিজ স্থানে। তানসীভ পিছু ঘুরে দাঁড়ায়। অসম্ভব স্থিরতা সে চাহনিতে। ধীরপায়ে এগিয়ে আসে পুলিশের সামনে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই পক্ষ। তানসীভের দৃষ্টি শীতল। সূর্যের আলো ফ্যাকাশে রূপে লেপ্টে রয়েছে চেহারায়। দলের ছেলেগুলো ঘাবড়ে যায় আগত পরিস্থিতির আশঙ্কা করে। এসব যে এখন আর শহরতলীর সাধারণ মামলা নয়। খুব গুরুতর কিছু ঘটতে চলেছে আগামীতে। কি আছে তাদের ভাইয়ের ভবিষ্যতে!

•

প্রকাণ্ড রাগের শিকার হয়ে খুলে গেল মূল দরজা। কানে ফোন ঠেকিয়ে রাখা। দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন জহুরুল সাহেব। রাগে শক্ত মুখশ্রী। চক্ষু লাল। উচ্চস্বরে ফোনে কথা বলছেন তিনি,

" আই ডোন্ট কেয়ার হু সাইনড্ দ্য ওয়ারেন্ট। "

" ... "

" কমিশনার কোথায়? এখুনি তার সঙ্গে আমার কথা বলিয়ে দিন। উনি এসব সার্কাস কি করে অ্যালাও করছেন? "

কণ্ঠস্বর আরো চড়া হয়ে যায়। ভীত হয়ে পড়ে সেখানে উপস্থিত কর্মরত স্টাফরা। লাজুক এবং ইফরাত কৌতূহলী হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। উপস্থিত হয় লিভিংরুমে। জহুরুল সাহেব তখনও ফোনে রাগে ফুঁসছেন,

" আপনারা আমার ছেলেকে টাচ করার সাহস পেলেন কোথা থেকে? "

" ... "

" আই সেইড রিলিজ হিম ইমেডিয়েটলি। "

স্থির দাঁড়িয়ে লাজুক। ধড়ফড় করে চলেছে বুক। কিছু একটা হয়েছে। হাহাকার করছে মনের মাঝে। শুকিয়ে আসছে গলা। ইফরাত ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে ওকে,

" আব্বা এমন রেগে আছেন কেন? "

উত্তর জানা নেই লাজুকের। উদ্বিগ্ন হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটা। জহুরুল সাহেব রাগারাগী করে ফোনটা কেটে দেন। অত্যধিক রাগে কাঁপছে ওনার শরীর। উপস্থিত স্টাফদের দেখে আরো রেগে যান। চেঁচিয়ে ওঠেন,

" দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সার্কাস দেখছো তোমরা? যাও। "

ভীতসন্ত্রস্ত স্টাফরা দ্রুত পায়ে চলে যায় সেখান থেকে। ইফরাত, লাজুক ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। চলে যাবে কিনা দ্বিধায় ভুগছে। জহুরুল সাহেব আস্তে ধীরে ওদের লক্ষ্য করলেন। কড়া কণ্ঠে কিছু বলতে গিয়েও দমিয়ে রাখলেন নিজেকে। ওদের চোখেমুখে দৃশ্যমান অসংখ্য প্রশ্ন। উনি উপলব্ধি করতে পারলেন। কয়েক মিনিট নীরবতা। মৃদু কন্ঠে জানালেন উনি,

" তানসীভকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। "

মুহুর্তের মধ্যেই বলশূন্য হয়ে পড়ে লাজুকের শরীরটা। স্তব্ধকর চাহনি। আটকে আসে নিশ্বাস। আশেপাশে থাকা সকল কিছু যেন বোধশক্তির বাইরে। ব্যথা আরম্ভ হয় বুকের ভেতরে। ইফরাত হতবাক! লাজুকের আঙ্গুল কেঁপে ওঠে। কেঁপে ওঠে ঠোঁট জোড়া। গাল বেয়ে টুপ করে ঝড়ে অশ্রু কণা। নির্বাক দাঁড়িয়ে মেয়েটা। মস্তিষ্কে বাজেভাবে প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে মন ও মস্তিষ্কে। তানসীভ বড় বিপদে।

•

রাত্রি তখন এগারোটা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের হোমিসাইড ডিভিশন। ষষ্ঠ তলার করিডোর প্রায় নিঃশব্দ। নিজ কেবিনে বসে রয়েছেন এসিপি সাদমান সিদ্দিকী। বত্রিশ বছর বয়স। কিন্তু দক্ষতা এবং বুদ্ধিমত্তায় অন্যদের থেকে যথেষ্ট এগিয়ে। কেবিনে মৃদু আলো বিরাজমান। ডেস্কের ওপর হলদেটে ল্যাম্প। ল্যাম্পের আলোয় দৃশ্যমান টেবিলের ওপর রাখা বেশকিছু ফাইল। ফরেনসিক রিপোর্ট, ক্রাইম সিনের ফটো। কল রেকর্ড। সিসিটিভি স্টিল ফ্রেম। রূপা মা"র্ডার কেস ফাইল। পারভেজ হাওলাদার মা"র্ডার কেস ফাইল। ফাইলগুলো নেড়েচেড়ে আরো একবার দেখে নিলেন উনি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তপ্ত শ্বাস ফেললেন। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন দেয়ালের দিকে। দেয়ালে টাঙানো সাদা বোর্ডজুড়ে লাল মার্কারে আঁকা টাইমলাইন। দু'টো নাম বড় করে গোল করা। পারভেজ হাওলাদার এবং রূপা। নাম দু'টোর মাঝখানে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সাদমান সিদ্দিকী মনোযোগ দিয়ে একটা ছবি দেখছিলেন। পারভেজ হাওলাদারের মৃ"তদেহের। র-ক্তাক্ত হাতের মধ্যে গোলাপ ফুল। ওনার দৃষ্টি পাশের ছবিতে সরে গেল। রূপার নিথর দেহের হাতে গুঁজে রাখা একটা গোলাপ। একই রঙের গোলাপ। একই ভঙ্গিমায় গুঁজে রাখা। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে এসিপির। সে মুহূর্তে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

" কাম ইন। "

অনুমতি পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো জুনিয়র অফিসার। হাতে নতুন প্রিন্ট করা কয়েকটা রিপোর্ট। স্যারের কাছে এগিয়ে এলো সে।

" স্যার! ফরেনসিক আপডেট এসেছে। "

সাদমান সিদ্দিকী সাদা বোর্ডের টাইমলাইনে তাকিয়ে। সে ভঙ্গিতে বললেন,

" গো এহেড।‌ "

জুনিয়র অফিসার ফাইল খুলে দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টালো। বলতে লাগলো,

" পারভেজ হাওলাদারের শরীরে যে ধা'রালো ক্ষত পাওয়া গেছে.. সেটার ডেপ্টথ্ আর অ্যাঙ্গেল রূপা মা"র্ডার কেসের সঙ্গে অলমোস্ট আইডেনটিক্যাল। "

সাদমান সিদ্দিকী চোখ তুলে তাকালেন।

" আইডেনটিক্যাল? "

" জ্বি স্যার। একই ধরনের ব্লেড উইথ (width)। একই প্রেসার প্যাটার্ন। এমনকি কাট ডাইরেকশন-ও সেইম। "

কয়েক মিনিট নীরবে অতিবাহিত হয়। সাদমান সিদ্দিকী সাদা বোর্ডে তাকিয়ে। রূপা হ-ত্যাকাণ্ড। তার ঠিক এক মাস পর পারভেজ হাওলাদার। উনি ধীর গলায় বললেন,

" দুইটা মা'র্ডার সিন এতটা ম্যাচ! এটা নরমাল না। ভিকটিম রূপা মা'র্ডারের আগে রে'পের শিকার হয়েছিল।"

জুনিয়র প্রশ্ন করে,

" স্যার, তাহলে কি এটা কপি ক্যাট কিলার? "

সাদমান সিদ্দিকী মাথা নাড়লেন,

" না। কপি করলে ভুল করার সম্ভাবনা থাকে। মানুষ প্যাটার্ন ইমিটেট করতে পারে। কিন্তু অবসেশন ইমিটেট করা সম্ভব নয়। "

এসিপি বোর্ড থেকে দুইটা ছবি খুললেন। পাশাপাশি রাখলেন ডেস্কের ওপর। একটা ছবি রূপা হ"ত্যার ক্রাইম সিনের ক্লোজ শটের। লা"শের ডান হাতের কব্জিতে অদ্ভুত এক কাটা চিহ্ন। এবার পারভেজ হাওলাদারের ছবিটা ইঙ্গিত করে দেখালেন। একই কাটা চিহ্ন। একই কোণে। একই গভীরতায়। জুনিয়র অফিসার আস্তে করে জানতে চাইলেন,

" স্যার! এটা কি সিরিয়াল সিগনেচার? "

উনি জবাব দিলেন না। ডেস্কের ওপর রাখা একটা ফাইল তুলে নিলেন। হসপিটালের সিসিটিভি ব্ল্যাক আউট রিপোর্ট। পড়লেন আরো একবার।

" ব্যাকআপ সার্ভার আনটাচড্। জেনারেটর ঠিকঠাক। কিন্তু সাত মিনিটের ফুটেজ উধাও। "

" প্রফেশনাল হ্যাকিং? "

জানালার কাছে এগিয়ে গেলেন সাদমান সিদ্দিকী। রাতের শহরে দৃষ্টি রাখলেন।

" পারভেজ হাওলাদারকে খু-ন করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু হসপিটালে ঢুকে সিসিটিভি ডিসঅ্যাবল করা। একজন হাই প্রোফাইল বিজনেসম্যানকে গুম করা। এরপর এক মাস আগের একটা মা-র্ডার প্যাটার্ন রি-ক্রিয়েট করা। এটা.. সাধারণ রাগের বশবর্তী কোনো খু-ন নয়। "

জুনিয়র অফিসার ইতস্তত করছে,

" কিন্তু স্যার। সব প্রমাণ তো এখন অবধি মির্জা তানসীভ শাহ্ এর বিরুদ্ধে। "

" এক্সাক্টলি। আর এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।"

নিস্তব্ধ হয়ে যায় কেবিন। সাদমান সিদ্দিকী ডেস্কের কাছে ফিরে এলেন। ল্যাপটপে ভিডিও প্লে করলেন। রাতের শুনশান হাইওয়ে। রাস্তার একপাশে পারভেজ হাওলাদারকে মা-রছে একজন। রাগে উন্মত্ত। হিং'স্র। এসিপি ভিডিও পজ করলেন। বললেন,

" মির্জা তানসীভ শাহ্। এ বান্দা ধুমধাম মা'রপিটে ওস্তাদ। মানুষ মা'রতেই পারে। কিন্তু ক্রাইম সিন স্টেজিং! ব্লিচ ব্যবহার, ডিজিটাল ব্ল্যাক আউট। সিম্বোলিক সিগনেচার। একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না? সাধারণ এক গু'ণ্ডা, চাঁদাবাজ এতকিছু করতে পারে? "

জুনিয়র অফিসার দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে বললেন,

" তাহলে তানসীভ শাহ্? "

সাদমান সিদ্দিকী চেয়ারে আয়েশ করে বসলেন। থুতনি ছুঁয়ে ভাবুক কণ্ঠে বললেন,

" আমরা হয়তো ভুল মানুষকে তাড়া করে বেড়াচ্ছি। কিংবা কেউ খুব নিখুঁতভাবে আমাদের ভুল পথে চালিত করছে। "

•

ঘড়ির কাঁটা নির্দেশ করছে সকাল সাতটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। গুলবাহার মঞ্জিলের অভ্যন্তরে চাপা আতঙ্ক বিরাজমান। গতকালের আতঙ্ক যেন আজো পথ ছাড়েনি। অস্বাভাবিক এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে সর্বত্র। স্টাফরা মাঝেমধ্যে নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে চলছে। পুরো বাড়িতে একটাই গরমাগরম খবর। ' মির্জা তানসীভ শাহ্ গ্ৰেফতার '। সিঁড়ি বেয়ে ধীরপায়ে নেমে আসে লাজুক। চেহারা ম্লান। চোখের নিচে কালচে ছাপ। ক্লান্ত শরীর।‌ বিধ্বস্ত মন। হাতে থাকা মোবাইলে আস্তে করে দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। যদি কোনো সুখবর মেলে! কিন্তু তা হয় না। মনটা পুনরায় ভেঙে যায়। নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকে। নিচে নেমে আসে মেয়েটা। লিভিংরুম ফাঁকা। কেমন ভূতুড়ে নীরবতা চারপাশে। শূন্যতা সর্বত্র। লাজুক করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ কলিংবেল। এত সকালে! অজান্তেই লাজুকের মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। দুরন্ত পায়ে দরজায় ছুটে যায় সে। দরজা খুলতেই অবাক হয়ে যায়।

" বাবা! "

পরিপাটি অফিসিয়াল পোশাকে দাঁড়িয়ে আমিরুল সাহেব। লাজুকের বাবা।

" আসসালামু আ'লাইকুম। "

মৃদু কন্ঠে সালাম দেয় লাজুক। দরজা হতে সরে দাঁড়ায়।

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। "

ভেতরে প্রবেশ করে সালামের উত্তর দিলেন তিনি। লাজুক দৃষ্টি নত করে নেয়। মৃদু কন্ঠে জানতে চায়,

" তুমি এখানে? "

" স্যার ডেকে পাঠিয়েছেন। "

আর কথা বাড়ালেন না তিনি। অভ্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন সিঁড়ির দিকে। গন্তব্য দোতলায় জহুরুল সাহেবের স্টাডি রুম। লাজুক হতাশ চোখে বাবার গমন পথে তাকিয়ে রইলো। বুকের ভেতর ভারী যন্ত্রণা। গতকালের রেশ এখনো কাটেনি। তন্মধ্যে জন্মদাতা পিতাকে দেখে আশার আলো খুঁজে পেয়েছিল। হয়তো আপনজনের নিকটে একটুখানি সহমর্মিতা চাচ্ছিল। কিন্তু তেমন কিছু হলো না। বাবা মৃদুভাষী মানুষ। তাই বলে সন্তানের দুর্দিনে দু'টো আশাজনক কথাও বলতে ব্যর্থ হলেন! নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন! কান্না পায় মেয়েটার। নিজেকে শক্ত রাখার দৃঢ় প্রয়াস চালায়। একাকী ভেজা কণ্ঠে বিড়বিড় করে ওঠে,

' কেমন আছেন আপনি? '

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন