ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

১৮তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[১৮]

" আফসানা সাবধানে। একটু শান্ত হও। "

শান্ত হতে ব্যর্থ সে নারী। ভাবনাতীত অস্থিরতায় কাঁপছে দেহমন।

.

সকাল গড়িয়ে প্রায় বিকেল। গুলবাহার মঞ্জিলের অভ্যন্তরে তখনো গুমোট ভাব। দিনের আলো সত্ত্বেও যেন অন্ধকারে তলিয়ে পুরো বাড়ি। সোফায় দেহ এলিয়ে দেয়া লাজুকের। মাথা ঠেকিয়ে রাখা সোফায়। নিষ্প্রাণ চাহনি স্থির সিলিংয়ে। হাতে অবহেলিত রিমোট। টিভির পর্দায় খবর চলছে। সে-ই একই দুঃসংবাদ। কোনো আশার বাণী নেই। এ বাড়ির ওপর কু শক্তির ধ্বং'সাত্মক দৃষ্টি পড়েছে যেন। কিংবা হয়তো অতীতের কোনো অকল্পনীয় কর্মফল। এক বিপদে নড়েচড়ে গিয়েছে গোটা মির্জা স্তম্ভ। বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্র এখন হাজতে বন্দী। না জানি আগামীতে কি অপেক্ষায়। এ বাড়ির একজন সদস্য হিসেবে ভয়াবহ গোলক ধাঁধায় পড়ে গিয়েছে লাজুক। বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব আজ প্রশ্নবিদ্ধ। চারদিকে ধূ ধূ ধোঁয়াশা। নেই কোনো আশার আলো।

ইফরাত এসে ছোট জায়ের পাশে বসলো। কোনো অতিরিক্ত শব্দ ব্যয় করলো না। করুণা দেখালো না। শুধু কাঁধে ভরসাযোগ্য হাতটা রাখলো। আপন সে স্পর্শে লাজুকের চোখের পাতা ভিজে গেল। রুদ্ধ হলো শ্বাস। বড় অসহায় লাগছে নিজেকে। পথভ্রষ্ট লাগছে। না জানি কোথায় এর অন্ত! রবের সহায়তা প্রার্থনা করতে লাগলো মেয়েটা। ইফরাত ভারাক্রান্ত। ভ'য়ঙ্কর আশঙ্কায় পুড়ছে মন। কলিংবেল বেজে উঠলো সে মুহূর্তে। তড়াক করে সোজা হয়ে উঠে বসলো লাজুক। কাঁপা কাঁপা স্বরে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো,

" ক্ কে এসেছে? "

" আমি দেখছি। রিল্যাক্স। "

ইফরাত সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। দ্বিতীয়বারের মতো কলিংবেল বেজে উঠলো। অশান্ত কেউ দাঁড়িয়ে দরজার ওপাড়ে। কে? লাজুক এক বুক আশা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। আকুল হয়ে তাকিয়ে আগন্তুক কে, জানার জন্য। ইফরাত দরজা খুলে দিলো। চমকালো আগত অতিথিদের দেখে!

" লাজুক! আমার.. আমার বোন কোথায়? "

কোনো সালাম নেই। নেই কোনো সৌজন্যতা। প্রথমবারের মতো এ বাড়িতে আগমন। তা-ও এমন বিরূপ পরিস্থিতিতে। অস্থির হয়ে প্রশ্ন করলো আফসানা। স্বামী শাহেদ উদ্বিগ্ন হয়ে সাথে দাঁড়িয়ে। স্ত্রীকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা করে চলেছে।

" আসসালামু আ'লাইকুম। ভেতরে আসুন আপু। "

ইফরাত সাদরে স্বাগত জানালো অতিথিদের। অনুমতি পেয়ে দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো আফসানা। এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। হঠাৎ খেয়াল করলো লিভিংরুমে ভেজা চোখে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বোনকে।

" লা জু ক! "

আফসানা একপ্রকার ছুটে এলো বোনের কাছে। এলোমেলো নিঃশ্বাস। ভারী শরীরটা কাঁপছে। আতঙ্কিত, সিক্ত চোখ জোড়া। ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল।

" আফসানা সাবধানে। একটু শান্ত হও। "

শাহেদ পিছুপিছু এগোতে চাইলো। তবে শান্ত হতে ব্যর্থ সে নারী। ভাবনাতীত অস্থিরতায় কাঁপছে দেহমন। লাজুক বেশ ভেঙে পড়লো আকস্মিক বোনকে দেখে। তবে অন্তরে চলমান ঝড় সামলানোর অবিরাম চেষ্টা করতে লাগলো। ঢোক গিলে নিলো রমণী। কণ্ঠনালী কাঁপছে। তবুও জোরপূর্বক মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললো। আপুর শারীরিক, মানসিক অবস্থা আগে সামলানো প্রয়োজন।

" আরে আপু তুমি? এসো। বসো। "

একদম স্বাভাবিক থাকার ভান করলো লাজুক। বোনকে ধরে আস্তে করে সোফায় বসিয়ে দিলো। পূর্ণ দৃষ্টিতে ছোট বোনের দিকে তাকালো আফসানা। মেয়েটার এ কি দুরবস্থা! রাতারাতি চোখের নিচে কালশিটে ছোপ। বয়স হুড়মুড়িয়ে বেড়ে গিয়েছে যেন। চোখের কিনারে এখনো নোনা জলের অস্তিত্ব। আফসানা অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,

" এসব কি শুনছি আমি? "

লাজুক মাথা নত করে নিলো। তার ধারণা সঠিক। আপু সবটা জানতে পেরেই এভাবে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে। নিজের পরিস্থিতি একটুও বিবেচনা করেনি। আফসানা কিছু বলবার পূর্বে টিভির শব্দ দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ঘাড় ঘুরিয়ে টিভিতে তাকালো সে। বিজ্ঞাপন চলছে। নিচে ছোট আকারে শিরোনামের ঘরে ছুটে বেড়াচ্ছে মির্জা বংশধরের কু কীর্তি। লাজুক দ্রুত রিমোট নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিলো। ইফরাত এসেছে এতক্ষণে। টেবিলের ওপর ট্রে রাখলো। নাস্তা, পানি। লাজুক পানির গ্লাসটা বোনের দিকে এগিয়ে দিলো।

" নাও। "

নিলো না আফসানা। ভেজা কণ্ঠে বলতে লাগলো,

" তুই কি বলেছিলি? উনি অমন নন। উনি ভালো। তুই.. তুই কাকে ভালো বলছিলি লাজুক? এ তো আস্ত এক খু নি। এরা কি করে ভালো মানুষ হতে পারে? এরা তো পশুর চেয়েও অধম। খু নির দল সব কয়টা। "

লাজুক চোখ বন্ধ করে নেয়। গাল বেয়ে টপ করে পানি পড়ে। ভয় নাকি অপমানে! বোঝা দুষ্কর। বিপরীত দিকের সোফায় বসা শাহেদ। স্ত্রীকে বলে উঠলো,

" আফসানা আস্তে। ভাষা ঠিক করো তোমার। "

তেঁতে উঠলো আফসানা,

" ভাষা? তুমি আমাকে ভাষা শুধরাতে বলছো? এ পরিস্থিতিতে আমার কি করা উচিত একটু বলবে? আমার বোনের স্বামী একজন খু"নি। সিরিয়াল কি'লার সাসপেক্ট। তার নামে জয়ধ্বনি দেবো? ফুলের মালা গাঁথবো? "

রাগ মিলিয়ে গেল। গুমড়ে কেঁদে উঠলো আফসানা। শাহেদ স্ত্রীর অবস্থা বুঝতে পারলো। নরম স্বরে বললো,

" শান্ত হও একটু। শরীর কাঁপছে তোমার। "

ইফরাত নীরবতা ভেঙে কথা বললো এবার,

" আপু একটু শান্ত হন। দয়া করে এভাবে বলবেন না। এখনো তো কিছু প্রমাণ হয়নি। পুলিশ তদন্ত করছে। আপনি এভাবে বললে লাজুক কষ্ট পাবে। আমাদের খারাপ লাগবে। "

" কষ্ট? আমার বোনটা তো কষ্ট পাবেই। বিনা অপরাধে একটা খু-নীর বউ ট্যাগ পেয়ে গেল যে। ও.. ওর কি অপরাধ বলতে পারেন? এই খু"নাখুনি, র"ক্তারক্তি, থানা পুলিশ। এসব তো আমাদের দুনিয়া নয়। আমরা কখনো এসব ফেস করিনি। আজ বিয়ে করে এই দিন দেখতে হচ্ছে? "

আফসানার কণ্ঠে ঝড়ে পড়ছে একাধিক অভিযোগ। যা অমূলক নয়। ইফরাত জানে। তবুও কিইবা করার? পরিস্থিতি যে হাতের নাগালের বাইরে। শাহেদ ফোন কলের অযুহাতে সরে গেল সেখান থেকে। বিপদগ্রস্ত তিন রমণীর আলাপচারিতায় নিজেকে কেমন বহিরাগত লাগছিল। ওদের নিজস্ব স্পেস দিতে বাড়ির বাইরে চলে গেল সে। আফসানা চুপটি করে বসা। বুকের ভেতর এখনো ভীতি। লাজুক আস্তে করে বললো,

" আপু। একটু ভরসা রাখো। আল্লাহ্ সব ঠিক করে দেবেন। উনি.. উনি খু-নি নন। "

" আমাকে বুঝ দিচ্ছিস? নাকি নিজেকে? "

লাজুক চুপ। জবাব যে বড় বিভ্রান্তিকর। ভয় এবং বিশ্বাস একত্রে যু"দ্ধরত। আফসানা ডুকরে কেঁদে উঠলো। কাঁপা গলায় বললো,

" এসব কি হয়ে গেল বোন? এমনটা তো কল্পনাও করিনি কখনো। আল্লাহ্ এ কি বিপদে ফেললেন আমাদের? "

ভয়ে খণ্ডবিখণ্ড অন্তর। তবুও নিজের সামলানোর হাজার চেষ্টা চলমান। ভেঙে পড়বে না সে। ভেঙে পড়ার সময় নয় এখন। লাজুক চোখের পানি মুছে নিলো। বোনের কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিলো। আশাবাদ ব্যক্ত করলো,

" বিপদ যখন সারা জাহানের মালিক দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ্ উনিই আবার উদ্ধার করবেন। নিজেকে সামলাও তুমি। অসুস্থ হয়ে পড়ছো। "

" আমি ঠিক আছি। কিন্তু তুই? তুই তো ঠিক নেই। ভালো নেই এখানে। "

আফসানা হঠাৎ কি থেকে কি ভেবে নিলো। চট করে বলে উঠলো,

" বোন! তুই.. তুই চল আমাদের সঙ্গে। তোর এখানে থাকার কোনো দরকার নেই। তুই চল। "

ইফরাত হতবাক হয়ে গেল একথা শুনে,

" এসব কি বলছেন আপু? লাজুক কোথায় যাবে? ও.. ও এ বাড়ির বউ। "

" সেটাই তো ওর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাজুক তুই চল আমার সঙ্গে। আপু বলছি তো। "

পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করতে হবে। আলতো করে আপুর হাতটা আঁকড়ে ধরলো লাজুক। চোখে চোখ রেখে শান্ত ভঙ্গিতে বললো,

" আপু! কোথাও যাচ্ছি না আমি। আমাকে এখানে বড় প্রয়োজন। "

আফসানা হতাশা, যন্ত্রনার চোখে তাকিয়ে রইলো। লাজুক শুধু একটাই কথা বললো,

" ভরসা রাখো। ইনশাআল্লাহ্ সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি এভাবে হেরে যেতে পারি না। "

এ কথার পৃষ্ঠে যুক্তিসঙ্গত কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না আফসানা। একজন সৎ স্ত্রীর বিশ্বাস এভাবে কি হেরে যেতে পারে? এমনভাবে ভাগ্য তাকে ঠকাতে পারে? সময়ই বলে দেবে সকল উত্তর।

•

নতুন এক দিনের সূচনা। অন্তরে নতুন করে আশার আলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল তখন। কেমন ভূতুড়ে আঁধার চারপাশে। লম্বা করিডোর ধরে হেঁটে চলেছে লাজুক। কাঁধে থাকা ব্যাগে আঙ্গুল চেপে বসেছে কঠিন হয়ে। চোখে ভীরুতা। অন্তরে কাঁপুনি। বাতাসে যেন অনৈতিকতার আর্তনাদ। আশেপাশে নানারকম অপরাধীদের উপস্থিতি। তাদের উৎসুক, বি'শ্রী চাহনি। বি"ষাক্ত এক অনুভূতি মনে কড়া নেড়ে চলেছে। ধীরে ধীরে শ্বাস নেয় লাজুক। নিজেকে শান্ত করতে চায়। এই পথ যেন শেষ হবার নয়। অনন্তকালের যাত্রা শেষে লাজুক এসে পৌঁছালো নির্দিষ্ট গন্তব্যে। কনস্টেবল এবং সে থামলো একটা সেলের সামনে।

" পাঁচ মিনিট। "

অত্যন্ত নি"ষ্ঠুর, কর্কশ সে সতর্কবার্তা। লাজুক দৃষ্টি নত করে ইতিবাচক মাথা নাড়লো। চলে গেল কনস্টেবল। মেয়েটা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। এসে তো পড়েছে গন্তব্যে। কিন্তু সামনের দৃশ্য অবলোকন করার মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই যে। সমস্ত শক্তি চলতি পথে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। আছে শুধু এক চিমটি আস্থা। হাত-পা কাঁপতে লাগলো। দ্রুতগতির হৃদস্পন্দনের শব্দ আশেপাশে ছড়িয়ে না পড়ে। ভয়ে, আশায় এগিয়ে যায় সে। শিকের নিকটে স্থির হয় পদযুগল। ভেতরে আধো অন্ধকার। স্রেফ একজন। আকাঙ্ক্ষিত সেই জনের উপস্থিতি। দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসা সেই রহস্যময় পুরুষ। মাথা নিচু। এক পা লম্বা করে মেঝেতে ছড়িয়ে রাখা। অপর পা হাঁটু ভাঁজ করে দাঁড় করিয়ে রাখা। হাঁটুর ওপর অবহেলিত এক হাত। আঙ্গুলের ফাঁকে জ্বলছে সিগারেট। গোলাকার রূপে বি'ষধর ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। ওর উপস্থিতি টের পেয়েছে সে। তবুও এমন নিরুদ্বেগ। লাজুক তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। দীর্ঘ পাঁচদিন বাদে আজ মানুষটিকে স্বচক্ষে দেখছে সে। পাঁচটা দিন। অজস্র যন্ত্রনা, সীমাহীন অপেক্ষার প্রহর, না বলা অভ্যন্তরীণ যু'দ্ধ। একদম শান্ত, স্থির রূপে বসা মানুষটা। চোখেমুখে নির্ঘুমতার ছাপ। অন্ধকারাচ্ছন্ন সেলে স্পষ্ট দৃশ্যমান নয় সে। ঠিকঠাক মিটছে না মনতৃষ্ণা। পীড়াদায়ক যন্ত্রনা হচ্ছে বুকের মাঝে। ঝাপসা চোখে কিছুটা সময় তাকিয়েই রইলো লাজুক। কম্পমান স্বরে বলে উঠলো,

" কথা বলবেন না? রেগে আছেন? "

নিরুত্তাপ মানুষটা। লাজুক ঠোঁট কামড়ে কান্না দমায়। ক্ষীণ শব্দ ভেসে বেড়ায় বাতাসে,

" আমি এসেছি তো। "

ক্ষুদ্র এক বার্তা। আস্তে আস্তে চোখ তুলে তাকালো মানুষটা। চোখে চোখ মিললো। গূঢ় অর্থপূর্ণ সে চাহনি! অতল গভীরতা অবধি শুধুই রহস্যের মায়াজাল। লাজুক সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। ডুবে গেল সেই অতল গহ্বরে। কখন যে মানুষটা লোহার শিক সংলগ্ন দাঁড়িয়েছে ওর জানা নেই। হঠাৎই সিগারেটের বিদঘুটে গন্ধটা নাকে ঠেকলো। পদতলে পিষ্ট হচ্ছে সিগারেট। কিন্তু ওর দিকেই বিদ্ধ সে চাহনি। ঘোর কেটে গেল মেয়েটার। চোখের পাতা ঝাপটালো। কয়েক সেকেন্ড নীরবে কেটে গেল। মৃদু কন্ঠে বলে উঠলো লাজুক,

" দিনরাত নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে ক্লান্ত আমি। সত্য, মিথ্যার এই দুর্ভেদ্যতা আমার জন্য বড় জটিল। এসব আমার জন্য নতুন। ভীতিকর। "

দম নিলো মেয়েটা। কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরলো। ঠোঁটের মৃদু কাঁপুনিতে দৃষ্টি স্থির মানবের।

" আমি জানি না সত্য কি। মিথ্যা কোনটা। শুধু এতটুকু জানি, বিশ্বাস করি। আপনি আর যাই হোক না কেন নরঘা'তক হতে পারেন না। "

অপ্রত্যাশিত, মূল্যবান এক স্বীকারোক্তি। গুপ্ত কোনো অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো বক্ষপিঞ্জরে। লাজুক চোখ তুলে তাকালো। স্বামীর মুখপানে তাকিয়ে সাহসী মন্তব্যটুকু পেশ করলো,

" ইনশাআল্লাহ্ আমার এই বিশ্বাসে আপনি আঘাত হানবেন না। "

এতটা বিশ্বাস! এমন সাহসিকতা! কবে উদয় হলো এসব? বিপদের সময় তবে কি এভাবেই চেনা যায় কে আপন আর কে পর! আপনজনের মূল্য বুঝি স্রেফ বিপদের সময়গুলো নির্ধারণ করে দেয়!

" ডেঞ্জারাস.. কখনো কখনো খু নি নয়। "

এতখানি সময় বাদে অবশেষে কাটলো কালো মেঘ। নিস্তরজ কণ্ঠে বলে উঠলো মানুষটি। রহস্যঘেরা, দুর্বোধ্য সে শব্দমালা। লাজুক জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে।

" যে তাকে খু-নি বানায়। "

চমকে ওঠে লাজুক! কথাটা মস্তিষ্ক ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারলো না। তবে এর গভীরতা অনেক। এতটুকু ঠিক বুঝতে পারলো সে। চোখেমুখে তার অধিক কৌতূহল। মানুষটা স্থির ভঙ্গিতে বলল,

" যে খেলাটা শুরু হয়েছে। এর শেষটা আরো ধামাকাদার চাই। "

লাজুক অস্থির হয়ে পড়লো,

" আপনি এসব কি বলছেন? কেউ.. কেউ কি আপনাকে ফাঁ'সাচ্ছে? আপনি চেনেন তাদের? বলুন। "

পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো মানুষটা। গূঢ় স্বরে বললো,

" বাড়ি যাও। "

লাজুক কিছু বলবার পূর্বে শোনা গেল সর্বশেষ কথাটা,

" বি কেয়ারফুল। "

বুকের ভেতর কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কেঁপে উঠলো ঠোঁট। বিভ্রান্ত পথিকের ন্যায় দাঁড়িয়ে লাজুক। তবে কি তার অনুমান ই সঠিক? কেউ সুচতুর ভঙ্গিতে মির্জা তানসীভ শাহ্ এর নামটাকে কলুষিত করছে? ফাঁ'সাচ্ছে অভেদ্য এক জালে?

" সময় শেষ। "

হঠাৎই পুরুষালি এক কণ্ঠস্বর। কেঁপে উঠলো লাজুক। স্বল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে কনস্টেবল। অদ্ভুত তার চাহনি।

" জ্বি জ্বি। ধন্যবাদ আপনাকে। আমি এখুনি যাচ্ছি। "

তড়িঘড়ি করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো লাজুক। কনস্টেবল চলে গেল সেখান থেকে। লাজুক তাকালো স্বামীর অবয়বে। লম্বাটে, ক্ষমতাধর মানুষটার আজ এ কি হাল! ওদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে সে। বিদায়বেলায় একটুখানি তাকাবে না? ভালোমন্দ কিছু অন্তত বলুক।

" আসছি আমি। ইনশাআল্লাহ্ আবার আসবো। "

লাজুকের কথাটা শেষ হবার আগেই ওপাশ থেকে গাম্ভীর্যের সহিত নিষেধাজ্ঞা জারি হলো,

" প্রয়োজন নেই। "

উদাসী মনটা কেমন ভেঙে গেল। মাথা নত করে নিলো লাজুক। ক্ষীণ শব্দে সালাম দিলো। নিরুত্তাপ মানুষটা। কোনো উষ্ণতা নেই। হিমশীতল এক ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে যেন। লাজুক আশাহত মনটা নিয়ে বিদায়ী চোখে তাকালো। অতঃপর ভঙ্গুর পায়ে চলে গেল সেখান থেকে। তখনো স্থির দাঁড়িয়ে নিষ্প্রতিভ সে পুরুষ।

•

গুলবাহার মঞ্জিলের লিভিংরুমে তখন গোপন হিসাবনিকাশ বিরাজমান। ঝাড়বাতির আলোয় ঘরের মধ্যকার অস্বস্তি বৃদ্ধি পেয়েছে কিছুটা। সোফায় বসা জহুরুল সাহেব। টেবিলের ওপর রাখা বেশকিছু পেপার্স। তীক্ষ্ণ চোখে হাতে থাকা একটা পেপারে দৃষ্টি বুলিয়ে চলেছেন উনি। পাশ্ববর্তী সোফায় বাধ্যগত ভঙ্গিতে বসা আমিরুল সাহেব। জহুরুল সাহেব হাতে থাকা কাগজটা ঠাস করে টেবিলে রাখলেন। বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছে চোখেমুখে।

" মিডিয়া খুব অ্যাগ্ৰেসিভ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন পর গসিপের টপিক মিলেছে। ফায়দা লুটে নিচ্ছে মনমতো। "

আমিরুল সাহেব মৃদু কন্ঠে বললেন,

" আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। আমাদের ছেলেরা সবটা সামলে নিয়েছে। আপাতত কিছুদিন চুপচাপ থাকাই ভালো। "

" চিন্তা করবো না বলছো? চিন্তা চলে আসছে অটোমেটিক। কতবার ছেলেটাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে তো বুঝতে নারাজ। ওর কোনো ধারণা আছে এক পারভেজ হাওলাদারের গায়ে হাত তুলে ও ভ'য়ঙ্কর মৌমাছির চাকে ঢিল ছুঁড়েছে! "

আমিরুল সাহেব কিছু বললেন না। মাথা নত। চুপ তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জহুরুল সাহেব।

" তোমার কি মনে হয় আমিরুল? এসব কে করছে? "

" স্যার, আমার ধারণা যদি ভুল না হয় তাহলে ঘটনা পুরোপুরিই ভিন্ন কিছু। আমরা দেখছি এক। কিন্তু ভেতরের ঘটনা সম্পূর্ণ আরেক। "

জহুরুল সাহেব চুপটি করে ভাবনায় বিভোর হলেন। আমিরুল ভুল কিছু বলেনি। আগত বিপদ সংকেত উনি নিজেও টের পাচ্ছেন। বেয়াড়া ছেলেটার জন্য আজ ওনার সুবিশাল সাম্রাজ্য নড়বড়ে। কি করে এসব সামলাবেন উনি? উত্তরসূরী দু'জন তো ভিন্ন দুই পথের পথিক। ঝড়ঝাপ্টা সবটা ওনার বয়স্ক শরীরের ওপর দিয়ে যাচ্ছে।

" লইয়ারের সঙ্গে কথা হয়েছে? "

" জ্বি। "

" কি বললো? "

" চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে। এভিডেন্স খুঁজছে। "

জহুরুল সাহেব অসন্তোষের স্বরে বলে উঠলেন,

" ছেলেটা যেচে পড়ে কি এক বিপদ ডেকে আনলো! চারদিকে তো অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। "

" দুশ্চিন্তা করবেন না স্যার। সবটা সামলে নেবো আমরা।"

ভরসার বাণী মনটা শান্ত করতে ব্যর্থ। অজানা বিপদের হাতছানি ক্ষণে ক্ষণে দুর্বল করে তুলছে তাকে। আজ ভীত হয়ে পড়ছে ক্ষমতাধর মির্জা জহুরুল শাহ্। কিভাবে এই কণ্টক বিছানো পথ পাড়ি দেবেন উনি? ভরসাযোগ্য ছেলেটা যে অন্ধকার লোহার শিকে বন্দী।

দোতলায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে লাজুক। চোখেমুখে মলিনতা। জিজ্ঞাসু ভাব। তার অগোচরে আর কি কি সত্য লুকায়িত? কোন গোপন আশঙ্কায় এমন মুষড়ে পড়েছেন আব্বা? আর বাবা? মেয়ের দুর্দিনে উনি কি করে এতটা নির্বিকার? সাধারণ আর পাঁচটা ব্যবসায়িক ডিলের মতো করে এই বিপদটাও সামলানোর আশ্বাস দিচ্ছেন। বিপদের মুহূর্তে এই দুই পিতার ভূমিকা যে তাকে ক্ষণে ক্ষণে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। লাজুকের ভেতরে ভয়ের ঠাণ্ডা এক স্রোত বয়ে যায়। ঘেমে ওঠে মুখ। ভ'য়ঙ্কর, অবিশ্বাস্য এক প্রশ্ন জেগে ওঠে মনে,

" বাবা কি খুব গোপন কিছু লুকোচ্ছেন? যা আমার অজানা! "

•

গভীর রাত। ভীতিকর, নিস্তব্ধ পরিবেশ। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সকলে। ব্যতিক্রম একটা সেল। দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসা মানুষটা। চোখ বন্ধ। ঘুমিয়ে নয়। বরং মাথার ভেতর চলমান নিরবিচ্ছিন্ন হিসাব। ভূতুড়ে এ পরিবেশে অতি সতর্কতার সহিত এগিয়ে আসছেন একজন। সাবধানী দৃষ্টি বুলিয়ে নিচ্ছে আশেপাশে। কচ্ছপ গতিতে এসে দাঁড়ালো সেলের বাইরে। ক্ষীণ এক টোকা লোহার শিকে। গোপন সিগন্যাল। তানসীভ শাহ্ নির্বিকার। পূর্বের ভঙ্গিতে বসা। তর্জনী নাড়িয়ে ক্ষুদ্র এক ইশারা। ইশারাটুকু বুঝতে পেরে দ্রুত কাজ সারলো সে আগন্তুক। আশপাশে চোরা দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা হাত বাড়িয়ে সেলের ভেতর রাখলো। অতঃপর রক্ষকের রঙিন পোশাক পরিহিত ব্যক্তি সাবধানী ভঙ্গিমায় প্রস্থান করলো সেখান থেকে। তানসীভ একটুখানি চোখ তুলে তাকালো। চোখের তারায় দৃশ্যমান হলো প্রয়োজনীয় বস্তু। অবোধ্য সে চাহনিতে ঘন আঁধার নেমে এলো। স্ফুলিঙ্গ জ্বলছে শিরায় উপশিরায়।

•

" ভাইজির স্ক্যান্ডাল লুকাতে আমার বোনটাকে কেন বলি দিলে, মা? "

অসহায় সে মেয়েটি। বুকের ভেতর অভিযোগের পাহাড়। কেন এমনটা হলো? এ তো হওয়ার কথা নয়।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন