ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

১৯তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[১৯]

" এমনটা কেন করলে মা? আমার বোনটা যে ভালো নেই।"

রাত্রি নেমেছে শহরের বুকে। খোলা জানালা। বেডের হেডবোর্ডে বালিশে হেলান দিয়ে বসা আফসানা। হাতে মোবাইল। ভিডিও কলে সংযুক্ত মায়ের সঙ্গে। মেয়েটার চোখ ভেজা। চরম অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে অঙ্গভঙ্গিতে।

" এমন করে বলিস না মা। আমরা কি কখনো তোদের খারাপ চেয়েছি, বল? যা করেছি তোদের ভালোর জন্যই করেছি। "

" ভালো? এ কেমন ভালো মা? তোমার ছোট মেয়ে জামাই জেলে বন্দী। দুই দুইটা খু-নের সাসপেক্ট সে। তুমি কি বুঝতে পারছো? তার ফাঁ-সি কিংবা যাবজ্জীবন অবধি হতে পারে। "

করুণ সে কণ্ঠস্বর। সুমনা বেগম দৃষ্টি নত করে নিলেন। আফসানা বলে চলেছে,

" আজ যদি ওই লোকটার সাজা হয়ে যায় তখন লাজুক? লাজুকের কি হবে? অল্প বয়সে বিধবা কিংবা স্বামীহারা হবে আমার বোন? আজীবন স্বামীর মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনবে? কিংবা.. কোনোমতে যদি ওই লোক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেরিয়ে আসে। তখন কি হবে? লাজুক জেনেশুনে আজীবন এক খু-নির ঘর করবে? সবটা এত সহজ? "

অনম্র হলো কণ্ঠ। সুমনা বেগম নীরবতা বেছে নিয়েছেন। কিছু বললেন না।

" জীবনটা সিনেমা নয় মা। বাস্তব জীবনে কোনো গু'ণ্ডা, বদমাশ, খু'নির সংসার করা আর.. বেঁচে থেকেও মৃ'ত লা'শ হওয়া একই কথা। "

" তুই.. তুই আগেই কেন এত নেগেটিভ ভাবছিস? লাজুক তো বলেছে। ওর বিশ্বাস... "

" ওহ্ আচ্ছা। বিয়ের সময় যে-ই লাজুকের মতামতের ঠিকমতো গুরুত্ব দাওনি। আজ বিপদের সময় সে-ই লাজুকের কথা এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল? লাজুক কি বলবে আর? হা? স্বামী হয় ওর। কোন স্ত্রী যেচে পড়ে স্বামীর কুকীর্তি ফাঁ'স করতে চাইবে? ও তো চাইবেই স্বামীর জীবনটা বেঁচে যাক। সবটা ঠিক হয়ে যাক। কিন্তু এতটা সহজ কি? "

" সব দোষ এখন আমাদের? আমরা কি তোদের শত্রু? বল? মা-বাবা হই তোদের। "

" মা-বাবা বলেই যে তোমরা সবসময় সঠিক হবে, এমনটা নয় কিন্তু। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। স্বীকার করে নাও অন্তত।"

" আফসানা আমি এখন রাখছি। তোর শরীর ভালো নয়। এসব ছাড় এখন। তোর বাবা সবটা দেখে নেবে। "

সুমনা বেগম বিষয়টা এড়ানোর চেষ্টা করলেন। তবে আফসানা তা মানতে নারাজ। ভ্রু কুঁচকে বললো,

" বাবা? বাবা কি করবে? বসের বিরুদ্ধে যাবে বুঝি? জীবনে কখনো যা হয়নি, আজ তা হবে? "

কষ্টের মাঝে বিদ্রুপাত্মক হাসলো মেয়েটা। সুমনা বেগম চোখ রাঙিয়ে তাকালেন,

" আফসানা! মুখ সামলে কথা বল। তোদের বাবা হন উনি। "

" এখানেই তো ভেতরটা পুড়ছে মা। তোমরা বাবা-মা হয়ে যদি সন্তানের কষ্টটা না বোঝো, তাহলে কে বুঝবে আমাদের? বলো। বলো না মা। "

চরম অসহায়ত্বে ডুকরে কেঁদে উঠলো আফসানা। গাল বেয়ে পড়লো অশ্রু কণা। সুমনা বেগম দৃষ্টি লুকানোর চেষ্টা করলেন। আস্তে করে বললেন,

" যা করেছি তোদের ভালোর জন্য ই করেছি। আজ না হোক কাল বুঝবি। মা হ। বুঝতে পারবি মায়েদের কত জ্বালা। "

" মেয়ের ভালো চেয়েছো তুমি? এতটাই ভালো চেয়েছো যে ভাইজির স্ক্যান্ডাল লুকাতে আমার বোনকে ইউজ করেছো। অন্যকিছু করতে। কিন্তু তা না করে, তোমার আদরের ভাইজির স্ক্যান্ডাল লুকাতে আমার বোনটাকে কেন বলি দিলে, মা? "

অসহায় সে মেয়েটি। বুকের ভেতর একাধিক অভিযোগের পাহাড়। কেন এমনটা হলো? এ তো হওয়ার কথা নয়। এমন গুরুতর অভিযোগে সাব্যস্ত হয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন সুমনা বেগম।

" মুখ সামলে কথা বলো আফসানা। মা হই তোমার। বান্ধবী নই যে যা খুশি তাই বলে যাবে। "

অত্যধিক রাগে মেয়েকে 'তুমি' সম্বোধন করলেন উনি। আফসানা মলিন ভেজা চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। চেনা মায়ের আজ এ কি অচেনা রূপ দেখতে হচ্ছে? চেনা মানুষগুলোর বদলে যাওয়ার পথটুকু বড় যন্ত্রণাদায়ক যে! মেয়ের করুণ চাহনি আর সহ্য করতে পারলেন না সুমনা বেগম।

" এখন রেস্ট নাও। নিজের খেয়াল রেখো। রাখছি। "

একপ্রকার তড়িঘড়ি করে ফোন কেটে দিলেন সুমনা বেগম। আফসানার হাত আলগা হলো। ফসকে মোবাইলটা পড়লো কোলের ওপর। দু'চোখ বেয়ে ঝর্নার ন্যায় পানি গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম। অন্তরে ভয়ের পাহাড়। দুশ্চিন্তায় কাঁপছে শরীর। কাঁপছে কণ্ঠনালী। ঝাপসা দৃষ্টি। কি হতে চলেছে আগামীতে? সবটা ঠিক হয়ে যাবে তো?

' মির্জা তানসীভ শাহ্ সত্যিই খু নি? '

•

শান্ত সে ক্যাফে। বৃষ্টিতে ভেজা শহর। কাঁচের ওপাড়ে পৃথিবীটা অন্ধকারে তলিয়ে। মাঝেমধ্যে মেঘ ডাকার গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। ক্যাফের ভেতর গুটিকয়েক মানুষ। কিনারে একটা টেবিল। মুখোমুখি বসে রায়হান এবং কালো পোশাকধারী এক ব্যক্তি। পেশায় সে ব্যারিস্টার। ব্যারিস্টার আশফাক আহমদ। মাঝবয়সী মানুষটির চোখে আলাদাই এক দ্যুতি। চোখে পাওয়ার গ্লাস। অঙ্গভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস। টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। কিছু ডকুমেন্টস্। দুশ্চিন্তা কাতর রায়হান। নিষ্প্রাণ চাহনি। আস্তে করে বলে উঠলো,

" সব প্রমাণ তো ভাইয়ের বিপক্ষে। মিডিয়া অলরেডি ওকে মা'র্ডারার ভার্ডিক্ট দিয়ে দিয়েছে। "

আশফাক আহমদ শান্ত ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিলেন। বললেন,

" মিডিয়া জাজ করার কেউ নয়। ওদের কাজই হলো গসিপ পেলে মাতামাতি করা। এ দফায় জাজমেন্টের দায়িত্ব না হয় আদালতের ওপর ছেড়ে দিন। "

" স্যার, আমি না কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। এসব কিভাবে হয়ে গেল? তানসীভ যে জগতে বাস করে সেখানে ওর শত্রুর অভাব নেই। সেদিন পার্টির রাতে আমি, আমার ওয়াইফ-ও ছিলাম সেখানে। আমরা নিজের চোখে সবটা দেখেছি। হ্যাঁ মানছি তানসীভ সেদিন মাত্রাতিরিক্ত লাগাম ছাড়া ছিল। বেড়ধক মে'রেছিল। হুমকি দিয়েছিল। তাই বলে খু'ন? না স্যার। কখনো কারোর প্রাণ নেয়নি আমার ভাই। এখন অবধি ওর মধ্যে অন্তত এতটুকু এথিক্স অবশিষ্ট রয়েছে। "

" কাম ডাউন মিস্টার মির্জা। "

রায়হান দৃষ্টি হটিয়ে নিলো। মৃদু শ্বাস ছাড়লো। শান্ত হতে ব্যর্থ সে। পরিস্থিতি যে দিনকে দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে। কিভাবে ছোট ভাইকে মুক্ত করবে সে? কেউ যে দিবারাত্রি ওর ফেরার অপেক্ষায়।

" এই কেসটা শুরু থেকেই একটু ভিন্নতার পরিচয় দিচ্ছে। কিভাবে জানেন? "

আশফাক আহমদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রায়হান। সে জানে না। জানতে ইচ্ছুক। ব্যারিস্টার মানুষটি আঙ্গুলের ভাঁজে আঙ্গুল গলিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন।

" এক্সট্রিমলি পারফেক্ট এভিডেন্স। শুরু থেকেই যা যা এভিডেন্স পাওয়া গিয়েছে সবটা পারফেক্ট। মানুষ মাত্রই ভুল ত্রুটি। সেখানে ডাবল মা'র্ডার কেস। কোথাও না কোথাও বিন্দুমাত্র মিসম্যাচ থাকবে। কিন্তু এই কেসে তা হয়নি। উল্টো সবটা পারফেক্ট প্লেসে। "

রায়হান বিস্ময়কর চোখে তাকিয়ে! আশার আলো জেগে উঠলো মনে। তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো,

" তাহলে আপনি বলছেন যে আমরা ভুল নই? তানসীভ নির্দোষ? "

বৃষ্টিভেজা কাঁচের গ্লাসে দৃষ্টি রাখলেন আশফাক আহমদ। টিপ টিপ বৃষ্টি চুয়ে পড়ছে গ্লাস বেয়ে। বাইরের দুনিয়া ধোঁয়াশা আচ্ছন্ন। মৃদু স্বরে বলে উঠলেন তিনি,

" প্রতিপক্ষ খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলছে। লেটস্ স্যি। হু উইন্স দ্য রেস। "

•

সকাল সাড়ে দশটা। আদালতের বাইরে তখন উপচে পড়া ভীড়। সাংবাদিকদের ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। লাইভ নিউজ চলছে। কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মগ্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই নাম,

' মির্জা তানসীভ শাহ্! '

আদালত ভবনের ভেতরে চাপা এক উত্তেজনা। করিডোর ধরে হেঁটে চলেছে কয়েকজন আইনজীবী। একপাশে দাঁড়িয়ে লাজুক, ইফরাত। উৎকণ্ঠায় লাজুকের অবস্থা নাজেহাল। চোখ মুখ শুকিয়ে একটুখানি। শুষ্ক ঠোঁট। অসহায় চোখদুটো অপেক্ষায় আকাঙ্ক্ষিত মানুষটির। এক পশলা স্বস্তির। ইফরাত আস্তে করে ওর হাতটা চেপে ধরলো। আশ্বাস দিলো ক্ষীণ স্বরে,

" ইনশাআল্লাহ্ সব ঠিক হয়ে যাবে। "

ক্ষণিকের মধ্যে দৃশ্যমান হলো রায়হান, শাহেদ। ব্যারিস্টার আশফাক আহমদের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত তারা। কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে। আকস্মিক থমকে গেল আদালত চত্বর। সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো অকল্পনীয় সে-ই দৃশ্যটি। পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসছে। তাদের পরিবেষ্টনে মির্জা উত্তরসূরী। ঢিলেঢালা কালো রঙের শার্ট পড়নে। কালো প্যান্ট। হাতে রূপালী হাতকড়া। হাঁটার ভঙ্গিতে অটল দৃঢ়তা। আশপাশের সকল কাঠিন্যতা তাকে দমাতে ব্যর্থ। ইস্পাতকঠিন সে-ই অঙ্গভঙ্গি। চোখে অতল গূঢ় ভাব। মুচড়ে উঠলো লাজুকের অন্তর। ভিজে গেল চোখ। মনে মনে স্মরণ করলো মহা পরাক্রমশালী রবকে। ঐশ্বরিক সাহায্য প্রার্থনা করলো। লাজুক, ইফরাতের সামনে দিয়েই চলে গেল বহর। একপলকের জন্যও দৃষ্টি মিললো না দু'জনার। চলে গেল সামনে থেকে।

-

আদালত কক্ষ। ভেতরে গমগম করছে মানুষজন। পেছনের সারিতে সাংবাদিকরা। মধ্যখানে লাজুক, ইফরাত, রায়হান, শাহেদ। জহুরুল সাহেব, আমিরুল সাহেব-ও রয়েছেন। এছাড়া দুই ভিক্টিমের পরিবারের গুটিকয়েক সদস্য। সামনের সারিতে আইনজীবীদের টিম। এসিপি সাদমান সিদ্দিকী একপাশে দাঁড়িয়ে পুলিশদের সঙ্গে। কোর্টরুমে প্রবেশ করলেন বিচারক। উপস্থিত সকলে দাঁড়িয়ে গেল। বিচারক নিজ আসন গ্রহণ করলেন। বসে পড়লো উপস্থিত সকলে। কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তানসীভ শাহ্ কে। লাজুক অস্থির ভঙ্গিতে বসা। অন্তরে অবিরাম চলছে দোয়া ইউনুস। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। চোখে চশমা। হাতে ফাইল। কণ্ঠে দৃঢ়তা।

" ইয়্যর অনার। এখন অবধি সমস্ত এভিডেন্স আসামি মির্জা তানসীভ শাহ্ এর বিরুদ্ধে। "

একে একে সকল এভিডেন্স ডকুমেন্ট পেশ করলেন সামনে। বিচারক পড়তে লাগলেন ডকুমেন্টস। আইনজীবী বলতে লাগলেন,

" মৃ'ত পারভেজ হাওলাদারের সঙ্গে মির্জা তানসীভ শাহ্ এর পূর্ব শত্রুতা ছিল। ব্যবসায়ীক প্রতিদ্বন্দী তারা। গত -- তারিখ রাতে গুলশানে এক পার্টিতে ভিক্টিমের সঙ্গে মিস্টার মির্জার খুব ঝামেলা হয়। ভিক্টিমকে বেড়ধক মা'রেন তিনি। পার্টিতে উপস্থিত সকলের সামনে প্রাণনাশের হুমকি দেন। সাক্ষীদের বক্তব্য আপনার সামনে পেশ করা হয়েছে ইয়্যর অনার। "

লাজুক উদ্বিগ্ন চোখে স্বামীর দিকে তাকালো। তানসীভ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। অনুভূতিহীন। কিছুই যেন হয়নি। জীবনের এমন কঠিন সময়ে এতটা নির্বিকার থাকা কি করে সম্ভব? এজন্য ঠিক কতখানি নির্দয় হতে হয়? জানা নেই তার।

" পার্টির ঘটনার পর ঠিক সেদিন রাতেই হাইওয়েতে পারভেজ হাওলাদারকে বেড়ধক মা'রেন অ্যাকিউসড্। ভেতরকার হিং-স্র সত্তা বেরিয়ে আসে। "

একটুখানি নীরবতা। একটা ফাইলে চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন,

" ঘটনার সময় অ্যাকিউসড্ এর মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ক্রাইম জোনের আশপাশে ডিটেক্ট হয়েছে। এছাড়া হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজও সন্দেহজনক ভাবে মিসিং। ইয়্যর অনার এখানে আরো বেশকিছু এভিডেন্স রয়েছে। "

অ্যাডভোকেট খন্দকার আরো কিছু ডকুমেন্ট পেশ করলেন। সকলের উদ্দেশ্যে ভিডিও প্লে করলেন একটা। যান্ত্রিক পর্দায় প্রদর্শিত হচ্ছে পারভেজ হাওলাদারের মৃ'তদেহ। হাতে গুঁজে থাকা রহস্যময় গোলাপ। ক্রা'ইম সিন। চাপা গুঞ্জন শোনা গেল কোর্টরুমে। বিচারক সকলকে নীরব থাকার নির্দেশ দিলেন।

" অ্যাকিউসড্ শুধু ভায়োলেন্ট নয়। হাইলি ডেঞ্জারাস। "

অ্যাডভোকেট খন্দকার নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশ করলেন। লাজুকের হাত-পা ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। সবকিছু হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইয়া আল্লাহ্! নিজস্ব বক্তব্য পেশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিজ সিটে বসলেন। এবার উঠে দাঁড়ালেন ব্যারিস্টার আশফাক আহমদ। আসামি পক্ষের আইনজীবী। স্থির তার চাহনি। একঝলক আসামি তানসীভের দিকে তাকালেন তিনি। তানসীভ স্থিরপ্রজ্ঞ দাঁড়িয়ে। তবুও তার মৌন উপস্থিতি এড়ানো দুষ্কর। অঙ্গভঙ্গিতে এক অনন্য, অপ্রতিরোধ্য জৌলুশ।

" ইয়্যর অনার। রাষ্ট্রপক্ষের উকিল মহাশয় যা বলছেন তা আংশিক সত্য। "

কোর্টরুমে উপস্থিত মানুষগুলো কৌতূহলী হয়ে উঠলো। আশফাক আহমদ ধীরে ধীরে একটা ফাইল খুললেন। বলতে লাগলেন,

" এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এভিডেন্স রিল্যাবয়িলিটি (reliability)। "

একটা ডকুমেন্ট বিচারকের নিকটে পেশ করলেন তিনি।

" এটা ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিকম অ্যানালাইসিস রিপোর্ট। "

বিচারক ডকুমেন্ট হাতে নিলেন। চোখ বুলিয়ে নিলেন। আশফাক আহমদ ব্যাখ্যা করতে লাগলেন,

" অপনেন্ট লইয়ার দাবী করছেন, আমার মক্কেলের টাওয়ার সিগন্যাল ঘটনাস্থলের কাছে পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এই রিপোর্ট বলছে, একই সময়ে ডুপ্লিকেট অথেনটিকেশন ডিটেক্ট হয়েছে। "

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানালেন,

" অবজেকশন ইয়্যর অনার। "

বিচারক ওনাকে থামতে নির্দেশ দিলেন। অগত্যা বসে পড়লেন তিনি। আশফাক আহমদ বক্তব্য জারি রাখলেন,

" সহজ ভাষায় বলছি ইয়্যর অনার। একই সময়ে একই ফোনের দুই ধরনের সিগন্যাল ডিটেক্ট হয়েছে। যা টেকনিক্যালি অ্যাবনরমাল। "

বিচারক জানতে চান,

" আপনি বলতে চাচ্ছেন সিগন্যাল ম্যানিপুলেশন হয়েছে?"

" জ্বি হ্যাঁ। এই সম্ভবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। "

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কেমন অস্বস্তিতে পড়ে যান। উজ্জ্বল হয়ে উঠলো লাজুকের মুখশ্রী। আশাবাদী চোখজোড়া স্বামীর দিকে স্থির হলো। কাঁপছে ঠোঁট। আশফাক আহমদ দ্বিতীয় ফাইলটা হাতে নিলেন। ওনার কণ্ঠে এবার আরো দৃঢ়তা।

" এবার কথা বলছি আরো গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে। "

তিনি বিচারকের উদ্দেশ্যে একটা সিলড্ ড্রাইভ পেশ করলেন।

" হসপিটালের সিসিটিভি ব্যাকআপ ফুটেজ। "

আদালতের যান্ত্রিক পর্দায় সিসিটিভি ফুটেজ চালু হলো। অধীর আগ্রহে সকলে দেখলো ফুটেজ। মনে জমলো বেশকিছু প্রশ্ন। যার জবাব দিলেন আশফাক আহমদ।

" অফিসিয়াল ফুটেজে সাত মিনিট মিসিং। "

" মিসিং? "

" জ্বি ইয়্যর অনার। আর এই সাত মিনিটের র-ব্যাকআপ থেকে দেখা যাচ্ছে.. "

উপস্থিত মানুষগুলো কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে। বাকিটা জানতে ইচ্ছুক তারা। আশফাক আহমদ চলমান ভিডিও পজ করলেন একটা দৃশ্যে। সেটা দেখিয়ে বললেন,

" একজন আনআইডেন্টিফাইড পার্সন পারভেজ হাওলাদারের কেবিনে প্রবেশ করছে। এটা র-ব্যাকআপ ফুটেজে এসেছে ইয়্যর অনার। কিন্তু অরিজিনাল ফুটেজে মিসিং। আর যেমনটা দেখতে পাচ্ছেন এই অজ্ঞাত ব্যক্তির হাইট, ওয়েট কোনোভাবে আমার মক্কেলের সঙ্গে ম্যাচ করছে না। দু'জনের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য। "

বিপক্ষ আইনজীবী উঠে দাঁড়ালেন। জোর গলায় বললেন,

" এই ফুটেজ ভেরিফাইড নয় ইয়্যর অনার। আর অ্যাকিউজড্ এর সঙ্গে হাইট, ওয়েট ম্যাচ করছে না তো কি হয়েছে? হতেই পারে মিস্টার মির্জা নিজে কি"ডন্যাপ করেননি। কাউকে দিয়ে করিয়েছেন। "

আশফাক আহমদ শান্ত ভঙ্গিতে বললেন,

" ফরেনসিক হ্যাশ ভেরিফাইড (Forensic hash verified), ইয়্যর অনার। ফুটেজ অল্টার করা হয়নি। "

বিচারক মনোযোগ সহকারে সদ্য প্রাপ্ত এভিডেন্সগুলো পরখ করে দেখতে লাগলেন। নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে গোটা কোর্টরুমে। ধুকপুক করে চলেছে লাজুকের বুকের ভেতর। অশান্ত অঙ্গভঙ্গি। কাঠগড়ায় স্থির দাঁড়িয়ে তানসীভ। চোখেমুখে আবেগ অনুপস্থিত। পেশির সুক্ষ্ম উন্মাদনা। বুঝিয়ে দিচ্ছে সে-ও অপেক্ষায়।

" পার্টিতে সকলের সামনে পারভেজ হাওলাদারকে মে'রেছিলেন আমার মক্কেল। ভেতরের ক্ষোভ পুরোপুরি মেটেনি। তাই ওই দিন রাতেই বাড়ি ফেরার পথে পারভেজ হাওলাদারের ওপর দ্বিতীয় দফা আক্রমণ করেন। মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কোনো এক পথচারী ঘটনাটা দেখতে পান। ভিডিও করেন। সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় পরবর্তীতে ভাইরাল হয়ে যায়। "

সকলে চুপচাপ শুনছে। জহুরুল সাহেব অসন্তুষ্ট এই দ্বিতীয় দফা আক্রমণের কথা জানতে পেরে। এসিপি সাদমান সিদ্দিকী তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে তানসীভের দিকে। আশফাক আহমদ বলে চলেছেন,

" ইয়্যর অনার, এখানেই কিন্তু অনেক বড় একটা প্রশ্ন জাগে। আমার মক্কেল রেগে ছিলেন। স্ত্রীর সাথে ঘটা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। তাই দুই দফা পেটালেন পারভেজ হাওলাদারকে। আমার মক্কেল যদি সত্যিই খু"ন করতে চাইতো তাহলে সে দ্বিতীয় দফায় শুনশান হাইওয়েতে খু"নটা করতে পারতো। তা না করে এত নাটকীয়তা কেন? প্রথমে হসপিটাল থেকে কি'ডন্যাপ। এরপর নৃ-শংসভাবে খু''ন। রূপা মা'র্ডার কেসের মতো সেম টু সেম ক্রাইম সিন স্টেজিং। এতকিছু কেন? সবটা একটু বেশিই ঘোলাটে নয় কি? "

উপস্থিত জনতা চুপ। আসলেই তো। এভাবে তো তারা ভেবে দেখেনি। মূল ঘটনা তো অনেকেরই অনেকাংশ অজানা ছিল।

" ইয়্যর অনার। আমি বলছি না যে ইনভেস্টিগেশনে গড়বড় রয়েছে। আমি শুধু বলছি ইনভেস্টিগেশন ইনকমপ্লিট। এভিডেন্স কনট্যামিনেশনের যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। "

বিচার সভায় ছড়িয়ে পড়লো দ্বিধাদ্বন্দ্বের লড়াই। আশফাক আহমদ তানসীভের দিকে এক নজর তাকালেন। অতঃপর বলতে লাগলেন,

" আমার মক্কেল মির্জা তানসীভ শাহ্ ইনভেস্টিগেশনে হেল্প করতে প্রস্তুত ইয়্যর অনার। তিনি পালিয়ে যাননি। কোনো সিন ক্রিয়েট করেননি। আইনের হাতে সারেন্ডার করেছেন। আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তাই আমি.. শর্তসাপেক্ষে ওনার বেইল প্রার্থনা করছি। "

উপস্থিত মানুষগুলো চমকে উঠলো! আশাবাদী হলো মির্জা পরিবার। দুরুদুরু বুকে বসে লাজুক। হাঁসফাঁস অবস্থা তার। চোখ দু'টো বড় জ্বালা করে চলেছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শেষ এক চেষ্টা করলেন,

" ইয়্যর অনার। অ্যাকিউজড্ ইনফ্লুয়েন্সিয়াল। উইটনেস ইনটিমিডেশনের আশঙ্কা রয়েছে। "

বিচারক শান্ত দৃষ্টিতে তাকালেন নির্বিকার মির্জা তানসীভ শাহ্ এর দিকে। অতঃপর উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,

" কোর্ট এভিডেন্সের রিল্যাবয়িলিটি নিয়ে প্রশ্ন উপেক্ষা করতে পারে না। "

ফাইলপত্র বন্ধ করলেন বিচারক। উপস্থিত মানুষগুলো অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়। লাজুক উৎকণ্ঠায় ভুগছে। চোখে এক সমুদ্র আশা। অন্তরে রবের স্মরণ। বিচারক ডকুমেন্টগুলো পুনরায় পরখ করে নিলেন। অতঃপর স্পষ্ট কণ্ঠে রায় দিলেন,

" সকল এভিডেন্স বিবেচনা করে, আসামি মির্জা তানসীভ শাহ্ কে শর্তসাপেক্ষে জামিন প্রদান করা হলো। "

কাঠের কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান মানুষটির সুক্ষ্ম এক আঙ্গুলের টোকা পড়লো। ঠোঁটের কোণে উদিত হলো ছায়াময় এক ঝিলিক। আলো আঁধারির মতো অস্পষ্ট। রহস্যময়। বিচারক কিছু শর্ত প্রদান করলেন জামিনের বিপরীতে। সকলে শুনলো তা। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হতাশ হয়ে ফাইলপত্র গুছিয়ে নিলেন। আজকের মতো শুনানি সমাপ্ত ঘোষণা করা হলো। সমাপ্ত হলো বিচারকের মুখনিঃসৃত জামিনের শব্দগুলো। তা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই লাজুকের বুকের ভেতর জমে থাকা উৎকণ্ঠার পাথরটা যেন এক নিমেষে গলে গেল। এতক্ষণের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা, চোখের কোণে জমায়িত এক সমুদ্র আশা। রবের প্রতি আকুল প্রার্থনা। সবটা একত্রে অশ্রুবিন্দু হয়ে ঝড়ে পড়লো। ঠোঁট জোড়া অবশ হয়ে কাঁপছে। বুকের ভেতরটা হালকা হওয়ার এক তীব্র সুখে দুলছে। ঝাপসা চোখে সে তাকালো স্বামীর দিকে। মনে হলো এক প্র'লয়ঙ্কারী ঝড়ের শেষে তার চেনা পৃথিবী শান্ত হয়েছে। রবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নীরবে-নিভৃতে অন্তর নত হলো। স্বস্তির এক তুমুল ঝড় তার পুরো অস্তিত্ব নাড়িয়ে দিলো।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন