#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[২০]
প্রায় মাঝরাত তখন। ভূতুড়ে ময়দানের ন্যায় নিস্তব্ধ 'গুলবাহার মঞ্জিল'। ডিম লাইটের নীলাভ আলো ছড়িয়ে ঘরে। অপেক্ষার প্রহর গুনে চলেছে রমণী। ডুবে নিজ ভাবনায়। সহসা শব্দহীন খুলে গেল ঘরের দরজা। ভেতরে প্রবেশ করলো মানুষটি। দৃষ্টি পড়লো সোফায়। ধীরলয়ে আকাঙ্ক্ষিত মানুষটির উপস্থিতি টের পেল মন। ভেঙে গেল ভাবনা। এদিকে ঘুরে তাকালো রমণী। চোখে চোখ মিললো দু'জনার। দিনভর উৎকণ্ঠা, অশ্রুবিন্দুর ঝড়, চরম অসহায়ত্ব। অবসান ঘটলো তবে। দু সপ্তাহের এই অশান্ত দমকা হাওয়া নিংড়ে নিয়েছে শরীর ও মন। আস্তে ধীরে লাজুক সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বহুকালের তৃষ্ণার্ত, পীড়িত চোখে তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। সম্মুখে ওই তো একটুখানি দূরত্বে দাঁড়িয়ে মানুষটি। চাইলেই তাকে ছুঁয়ে দেয়া সম্ভব। আজ আর সে অদৃশ্য, অস্পৃশ্য নয়। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে। মানুষটার চোখেমুখে হাজতের ক্লান্তি। পড়নের পোশাকে ঝড়ের আভাস। চোখের তারায় সে-ই চিরচেনা গাম্ভীর্য। তীক্ষ্ণ চাহনি। আগের মতোই সে-ই শিহরণ জাগানিয়া নজর। দু সপ্তাহের এই কালবৈশাখীর ঝড় যেন নিছকই এক দুঃস্বপ্ন। সবটা সে-ই আগের মতোই রয়েছে। আবেগী লাজুক আপন ভাবনায় ডুবে ছিল। মানুষটা কখন যে সন্নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি সে।
হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ হলো। ভেজা চোখে তাকালো স্বামীর দিকে। অদ্ভুতুড়ে মায়া ছড়িয়ে পড়লো ঘরময়। মানুষটার পুরুষালি গাম্ভীর্য মুছে গিয়েছে এতক্ষণে। চোখের কালো মণি ভিন্ন অনুভূতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতদিনের জমানো ভয়, স্বামীকে হারানোর আতঙ্ক এক নিমেষে বাঁধ ভাঙলো। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টায় মত্ত মেয়েটি। দৃষ্টি লুকোতে চাইছে বারংবার। প্রখর চাহনিতে তাকিয়ে তানসীভ। অনুভব করতে পারছে পরিস্থিতি। আস্তে করে হাত বাড়িয়ে দিলো সে। ডান হাতটা রাখলো স্ত্রীর গালে। আকাঙ্ক্ষিত পুরুষের অপ্রত্যাশিত স্পর্শ। রমণীর গাল বেয়ে অশ্রু ঝড়লো। আলতো ছোঁয়ায় বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে জলকণা মুছে দিলো তানসীভ। সুতীক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে রইলো। দেখতে লাগলো অবাধ্য জলকণা কিরূপ ছুঁয়ে চলেছে ঠোঁটের কোণ। গালের লালিমা মাখা রূপ, তার জন্য ঝড়ে পড়া প্রতিটি অশ্রুবিন্দু, কম্পিত ঠোঁট জোড়া। ধীরে ধীরে বুকের গহীনে ধ্বং'সক প্রভাব ফেললো। শুকিয়ে গেল গলা। তীব্রভাবে শক্ত হলো মুক্ত হাতের মুঠো। আবেগাপ্লুত রমণী গালের ওপর স্থাপিত রূক্ষ হাতটা আঁকড়ে ধরলো। ভয়াল ঝড়ের মুখে নিস্তরঙ্গ নদীর একমাত্র খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো শক্ত, অদম্য সে বাঁধন। চোখের কোণ বেয়ে নোনাজল পড়লো। আদ্র, কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠলো লাজুক,
" আপনি ফিরে এসেছেন! আল্লাহ্ আমার.. আমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। দোয়া কবুল করেছেন। দেখবেন.. সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্। কিন্তু আমি না.. শান্ত হতে পারছি না। মনে হচ্ছে.. চোখ বুঝলেই আপনাকে আবার হারিয়ে ফেলবো। "
তানসীভ পাথরের ন্যায় স্থির দাঁড়িয়ে। চুপটি করে শুনে নিচ্ছে শান্ত স্ত্রীর বুকের গহীনে লুকানো অনুভূতি। আদিম, কঠোর হৃদয়ে লাজুকের মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ, এক একটি তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ছে যেন। লাজুক করুণ, আকুল স্বরে বলে উঠলো,
" রাতের এই আঁধার শেষে নতুন ভোর আসবে। আপনি.. আপনি তখন ভোরের আলোয় হারিয়ে যাবেন না তো? কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাবেন না তো আমার জীবন থেকে? আমি আপনাকে আর কোনো অবস্থাতেই হারাতে পারবো না। বিশ্বাস করুন, আপনি বিহীন এই দুনিয়ার বুকে একদম শেষ হয়ে যাবো আমি। ধূলোর মতো নিঃশেষ। "
তানসীভ দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলো লাজুকের সিক্ত চোখের দিকে। চোখের তারায় যেন এক মহাসমুদ্রের স্পষ্ট আর্তনাদ। প্রগাঢ় আকুলতা। সমস্ত কোলাহল ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। কপালে ঠেকে গেল কপাল। আবেশে বুজে গেল রমণীর চোখ। কিছু মুহূর্ত নিঃশব্দে কাটলো। একে অপরকে অনুভবে মত্ত তারা। সহসা অদ্ভুত, স্থিরচিত্তে প্রশ্ন করলো পা'ষাণ পুরুষটি,
" কে হই তোমার? "
আচমকা তিন শব্দের ধারালো এই প্রশ্ন, লাজুককে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল! অশ্রুসজল চোখে তাকালো স্বামীর দিকে। অতি নিকটবর্তী মুখখানি। তাকিয়ে ওর দিকেই। প্রশ্নটির গভীরতা ছুঁয়ে গেল হৃদয় গহ্বর। ঢোক গিললো রমণী। জবাবের অপেক্ষায় মানুষটি। আরো সন্নিকটে এলো। ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়লো তপ্ত নিঃশ্বাস। অনুচ্চ স্বরে জানতে চাইলো সে,
" হু? "
এক মুহুর্ত সময় নিলো লাজুক। বন্ধ হলো চোখের পাতা। মানুষটা অপেক্ষায়। গালের ত্বকে আলতো করে বুলিয়ে চলেছে বৃদ্ধাঙ্গুল। ধীরলয়ে বলতে লাগলো লাজুক। চোখ মেলে তাকালো।
" আমি.. মিথ্যা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি না। এই ক্ষুদ্র জীবনে অপছন্দের তালিকা থেকে কবে, কখন, কোন অলক্ষ্যে আপনি আমার সবচেয়ে বড় নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হয়ে উঠেছেন, তা সত্যি জানা নেই আমার। তবে আজ এই অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতে দাঁড়িয়ে এতটুকু জানি। আপনি আমার জীবনের সেই বিশ্বস্ত পুরুষ, যাকে চোখ বুজে ভরসা করা যায়। চরম বিপদের মুহূর্তেও যাকে নির্দ্বিধায়, নিঃশঙ্কচিত্তে নিজের পাশে পাওয়া যায়। লোকচক্ষুর আড়ালে, নীরবে-নিভৃতে যে মানুষটা ছায়ার মতো যত্ন নিতে জানে.. সে আর কেউ নয়। সে আপনি। "
একটুখানি থেমে প্রগাঢ় কণ্ঠে,
" ঘন আঁধারে নিমজ্জিত আপনার বুকের মাঝে, এক টুকরো ভোরের আলো এখনো বেঁচে আছে। দয়া করে নিজেকে আর অন্ধকারের খাঁচায় বন্দী করে রাখবেন না। আলোর দুনিয়ায় ফিরে আসুন। আপনার এই আলো ছোঁয়া পথের দীর্ঘযাত্রায় আমি তো আছিই। ইনশাআল্লাহ্ আমৃ'ত্যু আপনার ছায়া-সঙ্গিনীর বেশে। "
স্বল্প, অন্তর্মুখী শব্দগুলো। গভীর মমত্ববোধে জড়ানো। এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল তানসীভ! শান্ত রমণীর অন্তরে এতখানি বিশ্বাসের পাহাড় লুকিয়ে! ভাবতেও পারেনি সে। লাজুকের এই নিরেট-অকাট্য আত্মসমর্পণ, তানসীভের সমস্ত কাঠিন্যকে এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলো। অপার্থিব মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়লো বুকের ভেতর। প্রগাঢ় অনুভূতির আলোড়নে কাঁপলো চোখের মণি। অস্থির শ্বাস প্রশ্বাস। অনুভূতির এই প্রখরতায় ডুবে গেল বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীও। লজ্জারুণ চাহনি লুকোতে ব্যস্ত সে। তানসীভ কাছে এলো। বিপদজ্জনক সীমানা ভেঙে আরো কাছে। দু জোড়া ঠোঁট প্রায় ছুঁইছুঁই। তপ্ত শ্বাস ছুঁয়ে চলেছে একে অপরকে। সপ্তাহ দুইয়ের সমস্ত দূরত্ব, আকুলতা, অসহায়ত্ব ভুলে আজ এ মুহূর্তে অন্তরঙ্গ দু'জনে। প্রমত্ত চোখে তাকিয়ে তানসীভ। অপেক্ষায় সুপ্ত অনুমতির। চাহনির সে-ই প্রখর আকুলতায় তোলপাড় শুরু হলো রমণীর বক্ষপিঞ্জরে। কেঁপে উঠলো চোখের পাতা। গাল জুড়ে আর'ক্ত আভায় নীরব সম্মতির ছায়া খুঁজে পেল মানুষটি। আর বিলম্ব নয়। সহসা পুরুষালি সমস্ত সংযম ভেঙে চুরমার হলো। পরম আবেশে, তীব্র আকুলতায় ঠোঁটে ডুবে গেল ঠোঁট। অব্যক্ত সমস্ত অনুভূতি প্রকাশ পেল সে স্পর্শে। শিহরিত লাজুকের আঙ্গুল ডেবে গেল স্বামীর পেশিবহুল বাহুতে। আবেশে বুজে গেল চোখ। অপর হাতটা শক্ত করে খামচে ধরলো শার্টের কলার। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল গাঢ় স্পর্শের অতল গভীরতায়। দু'টো হৃদয়ে তখন বয়ে চলেছে তরঙ্গ। আবেশী উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো ঘরময়। ভয়, দুঃসহনীয় বিচ্ছেদের যন্ত্রনা ভুলে এক জোড়া কপোত-কপোতী ডুবে গেল সেই দীর্ঘস্থায়ী, উষ্ণ, গভীর চুম্বনে।
•
সন্ধ্যার হাতছানি নদীর তীরে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে জলধারার অতলে। পাখিদের মৃদু গুঞ্জন প্রবেশ করছে কানে। আকস্মিক ভেঙ্গে গেল সান্ধ্যকালীন গা হিম ধরানো নিস্তব্ধতা। যান্ত্রিক গর্জন তুলে বুড়িগঙ্গা থেকে কিছুটা দূরত্বে এসে থামলো কুচকুচে কালো Honda Rebel 300। নদীর পঁচা দুর্গন্ধ। ট্রলারের গুঞ্জন। এসবের ভীড়ে বাইক হতে নামলো এক ব্যক্তি। ভারী বুটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো জমিনে। উড়ে গেল দু'টো কাক। বাইকের হেডলাইটের আলোটা নিভে গেল। সন্ধ্যার ভ'য়ঙ্কর আঁধার গিলে নিলো তাকে। মানুষটির পুরো শরীর আবৃত এক অদ্ভুতুড়ে কালো রঙের ওভারকোটে। মাথায় জড়ানো হুডি অবিন্যস্ত কালো চুলগুলোকে আংশিক ঢেকে রেখেছে। হুডির কিনারে সুক্ষ্ম লালচে বর্ডার। বিপদের হাতছানি। মুখের নিম্নাংশ কালো কাপড়ের মাস্কে ঢাকা। শুধু চক্ষু জোড়া উন্মুক্ত। দুই হাতে কালো চামড়ার গ্লাভস। এলোমেলো চুলের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান চোখ জোড়া। নির্ভীক সেই চাহনিতে শিকারীর ন্যায় তীক্ষ্মতা। অঙ্গভঙ্গিতে এক অনন্য, অপ্রতিরোধ্য জৌলুশ।
ধীরপায়ে গন্তব্যে অগ্রসর হলো মানুষটা। ধরনী তখন আঁধারে তলিয়ে। অন্ধকার জগতের এক নির্দয় সম্রাট এগিয়ে চলেছে সমস্ত ধোঁয়াশা চিঁড়ে। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেল সে। মরচে পড়া লোহার দরজায় ঠক ঠক তিনবার শব্দ করলো। গোপন কোড। ভেতর হতে দরজা খুলে গেল। অন্দরে প্রবেশ করলো আগন্তুক ব্যক্তি। চেয়ারে বসে ল্যাপটপে কর্মরত নিজাম। দরজায় তাকালো বন্ধুর আগমনে। সহসা এমন ভয়ানক রুদ্রমূর্তি দেখে এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল! অনুভব করতে পারলো দিন বদলের হাওয়া। দীর্ঘকায় মানুষটা ধীরপায়ে গুপ্ত এই গুদামঘরের ডান পাশটায় অগ্রসর হলো। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো নিজাম। বন্ধুর পিছুপিছু পৌঁছালো জানালার কাছে। সেখানে এক ধাতব বিন। কালো পোশাকধারী ব্যক্তি ওভারকোটের পকেট হতে কিছু জিনিস বের করলো। স্মার্টফোন, বাংলালিংক সিম এবং কিছু ডকুমেন্ট। নির্দয়ভাবে সেগুলো ছুঁড়ে ফেললো বিন এ। নিজাম নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। কিছু সময়ের মধ্যেই লাইটার হতে জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে যেতে লাগলো বিনের ভেতরকার জিনিসপত্র। আগুনের পরশমণি ছুঁয়ে গেল ছদ্মবেশী আগন্তুকের মুখশ্রী। চোখের তারায় দাউদাউ করে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। কালো পোশাকধারী মানুষটি আস্তে করে মুখ হতে নামিয়ে নিলো মাস্ক। দৃশ্যমান হলো শ্যামবর্ণ পাথরপ্রতিম মুখশ্রী। চোখের মণিতে আগুনের ভয়াবহ হলুদাভ প্রতিচ্ছবি। নিজাম মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
" ছেলেগুলো? "
ভারিক্কি স্বরে জানান দিলো তানসীভ,
" আউট। "
" ভালো করেছিস ভাই। পরিস্থিতি দিনকে দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পারভেজ মার্ডার কেসের পর পুলিশ তোর লোকেশন, কল লিস্ট সব ট্র্যাক করে চলেছে। আঠার মতো পেছনে পড়েছে। যেভাবে পারছে কট করতে চাচ্ছে। আর মিডিয়ার কথা কি বলবো? একেকটা হারা*। "
লৌহ-কঠিন রূপে দাঁড়িয়ে পুরুষটি। তাকিয়ে জানালার বাইরে অন্ধকার দুনিয়ায়। থমথমে স্বরে বললো,
" শ্যাডো দিয়েছিস? "
" অলরেডি ডান। "
তানসীভ বিপরীতে কিছু বললো না। হঠাৎ কিছু মনে পড়তে নিজাম বলে উঠলো,
" ভাই, তুই যেমনটা বলেছিলি ব্যবস্থা করে ফেলেছি। আশুলিয়া। "
" পরশু অ্যারেঞ্জমেন্ট করে ফেল। "
" ওকে। "
একটুখানি থেমে,
" ভাবী জানে এ বিষয়ে? "
ঘন গাছপালায় ঘেরা সে এলাকা। রহস্যময় দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে তানসীভ। মৌন তার উপস্থিতি। নীরবতার মাঝে জবাব খুঁজে পেল নিজাম। আর কিছু বললো না। আসন্ন বড় ঝড়ের জন্য প্রস্তুত এই সহযো'দ্ধা।
•
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টির পূর্বাভাস। বেডরুমে নিজ কর্মে ব্যস্ত লাজুক। কাবার্ডে থাকা পোশাকগুলো গুছিয়ে রাখছে যথাস্থানে। হঠাৎ নিস্তব্ধ এই ঘরে বেজে উঠলো রিংটোন। বিছানায় পড়ে থাকা মোবাইলের যান্ত্রিক পর্দায় আলো জ্বলে উঠলো। ব্যস্ত হাত থেমে গেল। মোবাইলের দিকে একঝলক তাকালো। হাতে থাকা পোশাক কাবার্ডে গুছিয়ে রাখলো লাজুক। ভারী পাল্লা বন্ধ করে দিলো। এগিয়ে গেল বেডের কাছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে কিছুটা চমকালো! নামহীন, অজ্ঞাত এক নম্বর প্রদর্শিত হচ্ছে যান্ত্রিক পর্দায়। কে কল করছে? কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে রিসিভ করলো। কানের কাছে ঠেকালো।
" হ্যালো! আসসালামু আ'লাইকুম। "
ফোনের ওপাশ হতে কোনো কণ্ঠস্বর এলো না। কোনো শব্দ নেই। নেই কোনো কথা। শুধু এক ভ'য়ঙ্কর, ভারী, বিকারগ্রস্ত নিঃশ্বাস। কেউ একজন ফোনের অপর প্রান্তে ঠাণ্ডা মাথায় গভীর, তৃপ্ত শ্বাস নিচ্ছে। রমণীর বক্ষস্থল ধক করে উঠলো। বরফের মতো ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল শিরায় উপশিরায়। ঘাড়ের কাছে কে যেন রা'ক্ষুসে শ্বাস ফেলছে। রক্তিম-তৃষ্ণার্ত চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে। ভয়ে গা হীম হলো। কম্পিত চিত্তে বলে উঠলো লাজুক,
" এটা আপনিই। কে আপনি? কি চাই আমার কাছে? "
ওপাশে নিরুত্তর ব্যক্তিটি। লাজুক রুদ্ধশ্বাসে চেঁচিয়ে উঠলো,
" কেন করছেন এসব? পরিচয় দিন। সাহস থাকলে সামনে আসুন। কাপুরুষোচিত আচরণ করবেন না। "
অসহায় আর্তনাদে ওপাশে নিঃশ্বাসের গতিবেগ বাড়লো। লাজুকের এই অসহায়ত্ব, ভয় চরম উপভোগ করে চলেছে সে। পৈ"শাচিক আনন্দ পাচ্ছে। লাজুক আর সহ্য করতে পারলো না। ভয়, বিতৃষ্ণায় ফট করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো। থরথর করে কাঁপছে হাত। ঠাস করে মোবাইলটা আছড়ে পড়লো বিছানায়। চোখেমুখে তখন আতঙ্কের তীব্রতা।
•
গভীর রাত। বাইরে ঝুমবৃষ্টি। বিছানায় এলোমেলো রূপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশকিছু ফাইল। পারভেজ হাওলাদার মার্ডার কেসের পুলিশের ফাইল। হাসপাতালের হারিয়ে যাওয়া সিসিটিভি ফুটেজের গ্লিচ হওয়া প্রিন্টআউট। ফরেনসিক রিপোর্ট। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষটি। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতিতে। একের পর এক জট লেগেছে মস্তিষ্কে। হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজ পারফেক্টলি ডিলেট হওয়া। তার লোকেশন ক্লোন হওয়া। এগুলো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের আইটি মাস্টারমাইন্ডের কাজ। দিনের পর দিন কেউ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ল্যাবরেটরিতে বসে প্রমাণগুলো সাজিয়েছে। তবুও কোথাও না কোথাও ফাঁকফোকর রয়েছেই। মানুষ মাত্রই ভুল।
লাজুক চুপটি করে বিছানায় বসা। নীরবে দেখে চলেছে ফাইলগুলো। ধরে দেখছে না। কাছ থেকে যতটুকু সম্ভব কৌতূহলী হয়ে দেখছে। দেখতে দেখতে হঠাৎ তার দৃষ্টি স্থির হলো একটা ফটোতে। পারভেজ হাওলাদারের লা"শের ক্রাইম সিন ফটো। কৌতূহল দমাতে ব্যর্থ হলো লাজুক। অনুমতি বিহীন আস্তে করে ফটোটা হাতে নিলো। মনোযোগ সহকারে ছবিটা দেখতে লাগলো। হঠাৎ চমকালো বেশ! ছবিটা আরো ভালোমতো দেখে নিলো। নিশ্চিত হলো তার ধারণা ভুল নয়। ছবি হাতে বেড হতে নেমে এলো সে। স্বামীর দিকে এগিয়ে গেল। চিন্তা মগ্ন মানুষটিকে আস্তে করে ডেকে উঠলো,
" শুনছেন? "
মধুরতম সেই কণ্ঠস্বর। চিন্তা ভঙ্গ হলো। লাজুক ছবিটা দেখালো,
" দেখুন এটা। "
তানসীভ সূচালো দৃষ্টিতে তাকালো ছবিটার দিকে। বহুবার দেখেছে সে। তাকে ফাঁ'সানোর এক চমৎকার নাট্যমঞ্চ।
" ফুলটা দেখেছেন আপনি? "
" হু। "
" এটা একটা ভালো টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে কিন্তু। "
" সিম্পল রোজ। "
ভাবলেশহীন কণ্ঠস্বর। লাজুক তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানালো,
" না না। এটা সাধারণ কোনো গোলাপ ফুল নয়। আমি ফুল চিনি। অনলাইনে এসব ফলো করি। এই ফুলটা দেখুন। এটার পাপড়ির পুরুত্ব, ডাঁটার কাঁটার ধরণ। কুঁকড়ে যাওয়ার পরেও এর কালচে লাল আভাটা দেখুন। এটা সাধারণ দেশি বা থাই গোলাপ নয়। এটা 'ইকুয়েডরিয়ান রোজ'। খুব রেয়ার এবং এক্সপেনসিভ প্রজাতির ফুল। ঢাকার সাধারণ কোনো দোকানে বা ফুটপাতে এই ফুল কোটি টাকা দিলেও পাওয়ার কথা নয়। গুটি কয়েক হাই-প্রোফাইল ফ্লোরিস্ট এটা লাতিন আমেরিকা থেকে বিশেষ অর্ডারে ইম্পোর্ট করে থাকে। আমি কয়েক মাস আগেই একটা আর্টিকেল পড়েছি এই ফুল সম্পর্কে। "
লাজুকের কথাগুলো শুনে মানুষটির ক্ষুরধার অপরাধী মস্তিষ্ক মুহূর্তে শতভাগ সচল হয়ে উঠল। স্ত্রীর কথায় লুকানো ক্লু বিদ্যুতের ন্যায় প্রবাহিত হলো। খু নি শুধু আইটি এক্সপার্ট নয়। ফ্লাওয়ার লাভার। নিজের অজান্তেই দাবার বোর্ডে একটা চাল ফেলে গেছে। বাহ্! জানালার বাইরে স্থির দৃষ্টি। বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে বলে উঠলো মানুষটি,
" ইয়্যর চেকমেট ইজ কামিং, বাস* ! "
•
বাইরে তখন সূর্যের মৃদু উত্তাপ। ঘরে ব্যস্ত সময় পাড় করছে লাজুক। লাগেজে প্রয়োজনীয় পোশাকআশাক গুছিয়ে নিচ্ছে। নিজের, স্বামীর। দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দ। লাজুক কাজ থামিয়ে দরজায় এগিয়ে গেল। চাপিয়ে রাখা দরজা খুললো। ইফরাত দাঁড়িয়ে। ম্লান মুখশ্রী।
" আসুন ভাবী। "
লাজুক দরজা হতে সরে দাঁড়ালো। ভেতরে প্রবেশ করলো ইফরাত। ঘরে চোখ বুলিয়ে নিলো। নিশ্চিত হলো সকল প্রস্তুতি গ্রহণ শেষ। একদম শেষ মুহূর্তে জানানো হয়েছে সবটা। লাজুক বড় জায়ের অভিব্যক্তি পড়তে পারলো। তবে চুপ রইলো সে। কিইবা বলার রয়েছে এই বিরূপ পরিস্থিতিতে? এমনটা হবে কখনো কল্পনাও করেনি তো। তবে আজ হচ্ছে এসব। এটাই অভাবনীয় বাস্তব।
" সব গুছগাছ শেষ? "
লাজুক এসে দাঁড়ালো সম্মুখে। নিচু গলায় বললো,
" প্রায় শেষ। "
" সত্যিই চলে যাচ্ছো লাজুক? এতবড় বাড়ি। এই আমরা। সবটা পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছো? একটুও খারাপ লাগছে না? "
" ভাবী! "
" ছোট ভাইয়ার এই বিপদের দিনে তোমরা কি করে এভাবে চলে যেতে পারো? লাজুক, আমরা আছি তো পাশে। তোমরা একা নও। তাহলে কেন এভাবে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাচ্ছো? "
লাজুক বক্ষপিঞ্জরে সৃষ্ট ঝড় সামলাতে ব্যস্ত। প্রকৃত ঘটনা সে কি করে বলবে? মানুষটা তাকে খোলাসা করে কিছুই বলেনি। শুধু আদেশ দিয়েছে। তবে তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক উপলব্ধি করতে পেরেছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড়সড় কোনো কারণ রয়েছে। যা গোপন রাখাই শ্রেয়। লোক জানাজানি হওয়া মানে আরো বিপদ বৃদ্ধি।
" কিছু তো বলো লাজুক। আমি মানতেই পারছি না এসব। তোমরা কি করে.. ? বিয়ের পর গত পাঁচ মাস ধরে আমরা একসাথে আছি। আলহামদুলিল্লাহ্ দুই জা একসাথে খুব ভালো ছিলাম। বোনের মতো ছিলাম। কখনো কোনো ঝামেলা ফেস করতে হয়নি। আজ তুমি এভাবে চলে যাচ্ছো! আমার কেমন লাগছে, বলে বোঝাতে পারবো না।"
কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে ইফরাতের। কান্না পাচ্ছে বেশ। লাজুক আলতো করে জায়ের হাতটা মুঠোবন্দী করে নিলো। বোঝানোর ভঙ্গিতে বলতে লাগলো,
" ভাবী, দয়া করে কাঁদবেন না। আপনি না আমার স্ট্রোং ভাবী? কান্না আপনাকে মানায় না। একটু বোঝার চেষ্টা করুন। "
ইফরাত নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। লাজুক বলে চলেছে,
" ভুল বুঝবেন না ভাবী। আপনি তো জানেনই.. জামিন পেলেও ওনার ওপর পুলিশের কড়া নজরদারি রয়েছে। এই বাড়িতে থাকলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের কৌতূহলী চোখ, মিডিয়ার ক্যামেরা ওনাকে তাড়া করে বেড়ায়। চারপাশের গুঞ্জন ওনাকে আরো বেশি ক্ষি'প্ত করে তোলে। উনি এমনিতেই মানসিকভাবে বড্ড অশান্তিতে আছেন। ফ্যামিলি ডাক্তারের পরামর্শেই ওনাকে কিছুদিনের জন্য একদম কোলাহলমুক্ত, শান্ত পরিবেশে রাখা দরকার। যেখানে কোনো অতীত ওনাকে তাড়া করবে না। "
শান্ত স্বরে লাজুক অবশিষ্ট কথাটুকু সমাপ্ত করলো,
" আমাদের নিজেদের একটু স্পেস দরকার ভাবী। দেখবেন, একা থাকলে উনিও ইনশাআল্লাহ্ ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যাবেন। "
লাজুকের এই অকাট্য যুক্তির সামনে আর কোনো কথা খুঁজে পেল না ইফরাত। ছোট জা'কে জড়িয়ে ধরে নীরবে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ফেললো। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো লাজুক নিজেও। পাঁচ মাস একসাথে একই বাড়িতে কাটিয়েছে তারা। স্মৃতিগুলো পিছু ফেলে এগিয়ে যাওয়া কি এতটাই সহজ? তবে নতুন এক লড়াই যে তাদের অপেক্ষায়...
চলবে।