ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

২১তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[২১]

ঘরের ভারী পর্দাগুলো স্বল্প চাপিয়ে রাখা। ক্ষীণ সে ফাঁক গলিয়ে ঘরে প্রবেশ করছে ছাইরঙা আবছা আলো। বিছানায় শয্যাশায়ী মিনারা বেগম। ভেজা চোখ। কালো মেঘে ছেয়ে আছে মুখশ্রী। ওনার বেডের পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসা লাজুক। মায়ের বিবর্ণ, কম্পিত হাতটা দুই হাতের মুঠোয়। চোখ বেয়ে দু ফোঁটা উষ্ণ অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়লো ওনার হাতে। মিনারা বেগম মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইলেন। বুকের ভেতর লুকায়িত সহস্র আর্তনাদ, ঠোঁটের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাইলেন। তবে ব্যর্থ হলেন। ঠোঁট জোড়া অবশ হয়ে কেঁপে উঠলো ওনার। ভাষাহীন এক হাহাকার তৈরি হলো। পাশে ম্লান, শুষ্ক মুখে দাঁড়িয়ে ইফরাত। লাল রঙ ধারণ করেছে চোখের সাদা অংশ। মির্জা পরিবারের এতবড় ভাঙন ঘটছে চোখের সামনে। তবে যথাযথ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ সে। লাজুক শাশুড়ি মায়ের হাতের ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো। পরম মমতায়, অনড় স্বরে বলে উঠলো,

" মা, আপনি দয়া করে ভেঙে পড়বেন না। আপনি যদি এভাবে ভেঙে পড়েন আমরা কি করে সহ্য করবো, বলুন? কাঁদবেন না মা। দয়া করে, নিজের খেয়াল রাখবেন। মনোবল শক্ত রাখবেন। আমি জানি, আপনার মনের ভেতর কতটা ছটফট করছে। কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আপনার ছেলের ওপর আমার ভরসা আছে মা। আমার রবের প্রতি ভরসা আছে। ইনশাআল্লাহ্ সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা খুব শীঘ্রই এই অন্ধকার কাটিয়ে উঠবো। ওনার গায়ে লেগে থাকা ক'লঙ্ক মুছে, আবার আপনার কোলে ফিরে আসব। ইনশাআল্লাহ্ এই কথার খেলাপ হবে না। আল্লাহ্'র ওপর একটু ভরসা রাখুন। কাঁদবেন না মা। "

ভরসাযোগ্য এই কথাগুলো মিনারা বেগমকে শান্ত করতে ব্যর্থ। ভেতরটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে ওনার। ছোট ছেলের এই আকস্মিক বিদায়, কি করে সহ্য করবেন উনি? কোনো উপায় তো জানা নেই। ইফরাত ধীরস্থির ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো। লাজুকের কাঁধে হাত রাখল। তার বুক ফাটানো দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত হলো নিস্তব্ধ এই ঘরে। চক্ষু গড়িয়ে পড়লো অশ্রু।

" এভাবে যেয়ো না লাজুক। ভাইয়া জেদ করছেন। ওনাকে একটু বোঝাও। "

লাজুক সযত্নে শাশুড়ি মায়ের চোখের পানি মুছে দিলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে সে। আত্মবিশ্বাসের সহিত বললো,

" কিছু জেদ ধ্বং'স নয় ভাবী। বরং কল্যাণ বয়ে আনে। দেখা যাক ওনার এই জেদের শেষটা কোন পর্যন্ত গড়ায়। ইনশাআল্লাহ্ যা হবে ভালোর জন্যই হবে। "

ইফরাত মলিন চোখে অবলোকন করে গেল এক স্ত্রীর চরম আত্মবিশ্বাস। স্বামীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। রমণীর কণ্ঠে বিদ্যমান দৃঢ়তা ওকে চুপ হতে বাধ্য করলো। আর কিছু বলতে পারলো না সে। লাজুক নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে মায়ের আবেগাপ্লুত চেহারায়। মৃদু কন্ঠে বলে উঠলো,

" মায়ের খেয়াল রাখবেন ভাবী। মায়ের আপনাকে খুব প্রয়োজন। "

•

আশুলিয়া। শহুরে যান্ত্রিক কোলাহল থেকে বহু দূরে এই শুনশান স্থান। প্রকৃতির খুব সন্নিকটে, খোলামেলা পরিবেশ। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে দোতলা এক বাড়ি। শব্দহীন খুলে গেল বাড়ির দরজা। একসঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করলো তারা দু'জন। অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা জমে রয়েছে। দুরুদুরু বুকে নতুন ঠিকানায় প্রবেশ করলো লাজুক। আগত পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত সে। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে চরম আশ্চর্য হলো! থমকে গেল চোখের পলক। এক পলকে মনের ভেতর জমায়েত সমস্ত ক্লান্তি, আতঙ্ক ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। অদ্ভুত প্রশান্তি, মুগ্ধতা ভর করলো চোখে। আশুলিয়ার এই কোলাহল মুক্ত নিরিবিলি পরিবেশে, এমন নান্দনিক জগৎ গড়ে তুলেছে মানুষটি! লাজুকের কল্পনার বাইরে। মেয়েটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। পুরো লিভিংরুম জুড়ে কাঠের এবং পাথরের মোহনীয় যুগলবন্দী। মেঝের মসৃণ কাঠের তক্তা থেকে একধরনের বুনো সুবাস ভেসে আসছে। ঘরের ডানদিকে ছিমছাম কাঠের সিঁড়ি। সোজা উঠে গেছে দোতলার দিকে। সিঁড়ির ঠিক নিচেই এক ধাপ ওপরে তৈরি করা হয়েছে একটি আরামদায়ক বসার কোণ। সেখানে ধূসর রঙের মোলায়েম আদুরে সোফা। এলোমেলো কয়েকটা কুশন। লাজুক ধীর পায়ে ঘরের মাঝখানটায় এগিয়ে গেল। মাঝখানে নিচু একটা ভারী কাঠের কফি টেবিল। তার ওপর অগোছালো কিছু ম্যাগাজিন। টেবিলের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা আরামদায়ক ডিভান সোফাগুলোর ওপর ছাইরঙা কাশ্মীরি চাদর বিছানো। চাদর কিছুটা ময়লা হয়েছে। ঘরের এক কোণায় প্রাচীন স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে ধূসর পাথরের এক বড় পিলার। যা আধুনিকতার মাঝেও পাহাড়ি গুহার ন্যায় আদিম-সুরক্ষিত অনুভূতি এনে দিচ্ছে। পিলারের পাশেই মাটির টবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ইনডোর প্ল্যান্টের মৃ'ত পাতা। দীর্ঘদিন অযত্নের ছাপ। যে জিনিসটা লাজুককে বিহ্বল করে তুললো, তা হলো ছাদ। লিভিংরুমের ছাদের একটা বড় অংশ খোলা। স্কাইলাইটের মতো। সেখান দিয়ে ওপরের তলার বারান্দা এবং বাইরের আকাশটা অদ্ভুতুড়ে, মায়াবী ফ্রেমে দেখা যাচ্ছে। খোলা অংশ বেয়ে নিচে ঝুলে রয়েছে একরাশ তাজা, ঘন গোলাপি রঙের বোগেনভিলিয়া বা বাগানবিলাস ফুল। ঠিক যেন এক টুকরো মেঘ এসে ঘরের ভেতর বাহারি রঙের বৃষ্টি নামিয়েছে। ওপরের কাঁচের জানালা গলে দুপুরের উষ্ণ, সোনালী রোদ এসে পড়ছে সেই ফুলের ওপর। রৌদ্রোজ্জ্বল আলো-ছায়ার মায়াবী জ্যামিতি খেলা করছে পুরো লিভিংরুমে। কাঠের মেঝেতে।

লাজুক আলতো করে একটা সোফার হাতল ছুঁয়ে দেখলো। উপলব্ধি করতে পারলো আজ, কালের মধ্যে খুব দ্রুততার সহিত পুরো বাড়িটা পরিষ্কার করানো হয়েছে। তবুও অযত্নের ছাপ যত্রতত্র ছড়িয়ে। দীর্ঘকাল নারী ছোঁয়া পায়নি এই বাড়িটি। ইনশাআল্লাহ্ এবার সবটা ঠিক হয়ে যাবে। ঘরের মালকিন যে এসে পড়েছে। মালকিন! শব্দটা নিজের কানেই কেমন ভিন্ন, অদ্ভুতুড়ে শোনালো। লাজুক ঘুরে দাঁড়ালো। তাকালো স্বামী মানুষটির দিকে। মানুষটা অদূরে দাঁড়িয়ে। নির্নিমেষ তাকিয়ে ওরই দিকে। চোখেমুখে স্বস্তির এক চিলতে ছোঁয়া। অর্ধাঙ্গিনীর মনমতো সবটা হয়েছে যে। লাজুক ধীরস্থির ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। দাঁড়ালো মুখোমুখি। চোখে চোখ পড়লো। মোহাবিষ্ট নজরে তাকিয়ে রইলো লাজুক। মানুষটা একহাত পকেটে গুঁজে রাখা। অপর হাতে আলতো টানে ওকে কাছে টেনে নিলো। শিহরিত স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ হারালো। কেঁপে উঠলো ঠোঁট। মায়াবী চোখে তাকিয়ে মেয়েটি। সে চাহনির মায়াজালে বিভোর হলো তানসীভ। ক্ষুদ্র এক ঠোঁটের পরশ বুলিয়ে দিলো স্ত্রীর কপালে। দু ভ্রুয়ের ঠিক মধ্যিখানে। অপার্থিব আবেশে বুজে গেল রমণীর চোখ। মুখের খুব কাছাকাছি মুখখানা। নরম, আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো মানুষটি,

" পছন্দ হয়েছে? "

মানুষটার হঠাৎ এই নৈকট্য। পুরুষালি সুগন্ধ। লম্বাটে নেশা'ক্ত অবয়ব। লাজে রক্তিম রমণীর দৃষ্টি নত হলো। মেঝেতে স্থির হলো চোখ। কম্পিত-লজ্জালু স্বরে জানালো,

" জ্বি। "

" লুক অ্যাট মি। "

গাম্ভীর্যে মোড়ানো একগুচ্ছ আদেশ। কণ্ঠের ভারিক্কি ভাবটা বুকের গহীন অবধি পৌঁছালো। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো লাজুক। নয়নে নয়নে মিলন হলো। এক ভ্রু উঁচু করে তুলে রাখা তানসীভের। লাজুক সম্মোহনী স্বরে বলে উঠলো,

" খুব পছন্দ হয়েছে। সবটা শান্ত, সুন্দর। প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। "

বাঁকা হাস্যরেখা ফুটে উঠলো ঠোঁটের কোণে। তানসীভ আলতো করে আঙ্গুলের টোকা দিলো স্ত্রীর ফুলো ফুলো আদুরে গালে। আরো একখান চুমু দেয়ার বাসনা গোপনে লুকিয়ে নিলো। স্বামীর এমন কাণ্ডে যথেষ্ট হকচকিয়ে গেল লাজুক! পকেট হতে মোবাইল বের করতে করতে তানসীভ এগিয়ে গেল ডিভানের দিকে। লাজুক ভাবনায় বিভোর হয়ে গেল। মাত্র এটা কি হলো? ঠোকাঠুকি খেলা!

•

ভরদুপুর। আশুলিয়ার দোতলা বাড়িতে ব্যস্ত সময় পাড় করছে লাজুক। এখানে আসার পর থেকেই নতুন নীড় সাজাতে ব্যস্ত সে। বাড়িটা মাশাআল্লাহ্ খুবই সুন্দর! তবে দীর্ঘদিন অযত্নের ছাপ দৃশ্যমান এখানে সেখানে। নারী ছোঁয়া বাড়িটা পায়নি কখনো। কোনো পুরুষ কেয়ারটেকার দেখভাল করেছে। কাজকর্মের নমুনা দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় ময়লার ছাপ। কোথাও কোথাও এলোমেলো জিনিসপত্র। এই এলোমেলো ভাব লাজুকের অপছন্দ। যথেষ্ট পরিপাটি থাকার চেষ্টা করে সে। অগোছালো কিছু দেখলেই হাত দু'টো কেমন নিশপিশ করে ওঠে। তাই তো জীবনসঙ্গী জুটেছে একজন। অগোছালো রাজ্যের রাজা। তপ্ত শ্বাস ফেলে লাজুক রান্নাঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে যথাস্থানে রাখতে লাগলো। হাতের নাগালে। সহসা সেখানে উপস্থিত হলেন জুনিয়র মির্জা সাহেব। উদোম দেহ। ট্রাউজার নামমাত্র ঝুলে রয়েছে কোমড়ে। ব্যস্ত চলনভঙ্গি। কাউকে ফোন করার উদ্দেশ্যে মোবাইল স্ক্রল করে চলেছে আঙ্গুল। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ এক আদেশ জারি করলো। কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর,

" ১০ মিনিট দিচ্ছি। গেট রেডি। "

" হা? এই ভরদুপুরে কোথায় যাচ্ছেন? "

লাজুক কাজকর্ম বন্ধ করে আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল! ঘুরে দাঁড়ালো স্বামীর দিকে।

" আমি নই। আমরা। ফাস্ট। "

আর এক দণ্ড দাঁড়ালেন না মহারাজা। যেমন ভঙ্গিতে এলেন। ঠিক সেভাবেই দাপটের সঙ্গে চলে গেলেন। মধ্যখান থেকে লাজুক অবাক! উঁচু গলায় ডেকে উঠলো মেয়েটা,

" এই যে শুনছেন? অবেলায় কোথায় যাচ্ছি আমরা? গোসল বাকি তো আমার। "

ওদিক থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। গায়েব। দিনদুপুরে গায়েব মশাই। লাজুক এলোমেলো ভাবনায় পড়ে গেল। একবার তাকালো অগোছালো কাজকর্মে। আরেকবার তাকালো নিজ বেশভূষায়। বেলা বাজে সাড়ে তিনটা। কাজকর্ম সেরে গোসল করার নিয়ত করেছিল সে। গোসল শেষে কাজকর্ম করতে গেলে ধূলোবালি মাখামাখি হয়ে দ্বিতীয় দফা গোসল করতে হতো। এখন তো ভারী মুশকিল হয়ে গেল। নোংরা শরীরে বাইরে যাবে কি করে? তা-ও আবার কোথায় যাচ্ছে কিছুই তো স্পষ্ট নয়। ভারী মুসিবত তো। লাজুক বিড়বিড় করতে করতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত পায়ে ছুটলো দোতলায়। আর বোধহয় মিনিট আটেক বাকি। পাঁচ মিনিটে গোসল সেরে, তিন মিনিটে রেডি। নইলে সর্বনাশ! ধুর!

-

রৌদ্রোজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে বাড়ির বিশাল প্রাঙ্গনে। লাজুক তড়িঘড়ি করে মেরুন রঙা ওড়না ঠিক করতে করতে একপ্রকার দৌড়ে বাড়ির বাইরে এলো। মশাই হাউকাউ না করে ওঠে। দৌড়ঝাঁপ শেষে মেয়েটা এসে দাঁড়ালো গন্তব্যে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলে উঠলো,

" এসে গেছি। "

" সাত মিনিট লেট। "

রসকষহীন কণ্ঠস্বর। কেমন ভুল ধরছে। লাজুক মুখটা পেঁচার মতো করে নিলো।

" হ্যাঁ। দেরি তো হবেই। মানুষ আমি। রোবট তো নই। কিভাবে যে যু'দ্ধ করে এত্ত তাড়াতাড়ি গোসল সেরে নিলাম। ইয়া আল্লাহ্! "

তাড়াহুড়ো সময়টুকু স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো মেয়েটি। হঠাৎই কানে এলো,

" ইউ কুড হ্যাভ কল্ড মি.. হেল্প করে দিতাম। "

তানসীভের মুখনিঃসৃত গম্ভীর, কৌতুকপূর্ণ শব্দমালা। লাজুক রীতিমতো স্তব্ধ! র'ক্তিম মুখশ্রী। শিহরিত চোখে তাকিয়ে মেয়েটি। মানুষটা ওপাশে ফিরে নিজ কর্মে ব্যস্ত। ভাবখানা এমন যেন মাত্র সে কোনো দ্বৈত অর্থপূর্ণ বেফাঁ'স মন্তব্য মোটেও করেনি। দেখতে যেমন ভুলো ভালা নয়। তেমন মনের ভেতরটাও। আসতাগফিরুল্লাহ্! কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে লাজুক শিউরে উঠলো। নজর লুকানোর চেষ্টা করলো। আস্তে ধীরে স্বাভাবিক হলো পরিবেশ। লাজুক গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়ালো স্বামীর পাশে। আরেক দফা আশ্চর্য হলো! এতক্ষণ কথার তালে তালে ঠিকমতো খেয়াল ই করেনি সে।

" এটা কি? "

নরম কাপড়ের টুকরোয় কাঁচ মুছতে মুছতে জবাব দিলো তানসীভ,

" চিনতে পারার কথা। "

লাজুক চোখ মুখ কুঁচকে নিলো। বান্দা তো ভারী বদ। কথাবার্তা বলেই না তেমন। আবার যখনই বলে হেঁয়ালি করে বলে। সোজাসাপ্টা কথা বলতে কি শেখেনি?

" হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। এত বড় সাইজ। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। চিনতেও পেরেছি। "

বিপরীতে কিছু বললো না সে। কাঁচ মোছা সমাপ্ত করে নরম কাপড়টা ছুঁড়ে ফেললো পাশেই। লাজুক বাইকের দাপুটে বডিতে তাকিয়ে মিনমিনে গলায় বললো,

" বাইকে করে যাবেন? জিপ নেবেন না? "

" না। "

" ঠিকঠাক চালাতে জানেন? এক্সিডেন্ট... "

কথাটুকু তৎক্ষণাৎ গলার ভেতর গিলে নিলো মেয়েটা। এমন ভ-য়ঙ্কর, নি"ষ্ঠুরতার সহিত মানুষটা তাকিয়েছে যে তার অন্তরাত্মা প্রায় উড়ু উড়ু। তানসীভ বাইকে উঠে বসলো স্ব-ভঙ্গিমায়। কালো কুচকুচে হেলমেট পড়ে নিলো। চাবি ঢোকালো। লাজুক বুঝতে পারলো বসার সময় হয়েছে। মূল সমস্যা তো এখানেই। দুরুদুরু কাঁপছে বুক। কম্পিত ভঙ্গিতে মেয়েটা বুঝে উঠতে পারলো না পা রাখবে ঠিক কোন জায়গায়। এতটুকু জায়গায় বসবে কি করে? পথেঘাটে চিৎপটাং না হয়ে যায়। আল্লাহ্ রক্ষা করুন। কোনোমতে অবুঝ শিশুর মতো বাইকে উঠে বসলো মেয়েটা। পা'ষাণ লোকটা একটু সাহায্য-ও করলো না। লাজুক সবে বসেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কোনোরূপ আগাম সঙ্কেত না দিয়ে তানসীভ এক ঝটকায় এক্সিলারেটর মোচড় দিল। বাইকটা উচ্চ যান্ত্রিক গর্জন তুলে চালু হলো। আকস্মিক জোরদার গতির ধাক্কা সামলাতে না পেরে লাজুক ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠলো। এক লহমায় আছড়ে পড়লো মানুষটির চওড়া, শক্ত পিঠের ওপর। নিজেকে সামলানোর মরিয়া চেষ্টায় দু-হাতে শক্ত করে খামচে ধরলো মানুষটির পরিহিত হুডেড শার্ট। বুকের ভেতরকার অনিয়ন্ত্রিত ধুকপুকানি তানসীভের পিঠে স্পষ্ট তরঙ্গের ন্যায় অনুভূত হচ্ছে। ভয়ার্ত, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলো লাজুক,

" আস্তে চালান। আমি ভয় পাচ্ছি। "

সম্মুখের পথে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অত্যন্ত গম্ভীর, সম্মোহনী এক স্বরে বললো তানসীভ,

" আমাকে ধরো। "

আতঙ্কিত চোখ জোড়া বন্ধ করে লাজুক কোনোমতে বলতে সক্ষম হলো,

" ধরে আছি তো। আমি পড়ে যাবোওও। "

নিচু, ধারালো কণ্ঠে আদেশ দিলো মানুষটা,

" হোল্ড মি টাইট। "

লাজুক কিছু বলবার পূর্বে বাতাসের বুক চিঁড়ে দুর্বার, অবাধ্য গতিতে ছুটলো কালো রঙের দাপুটে বাইকটা। আকস্মিক এই কাণ্ডে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। এবার আর কোনো সংকোচ বা লোকলজ্জা নয়। পড়ে যাওয়ার চরম আতঙ্কে দু-হাতের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করে স্বামীর কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরলো। কোমল দেহটা তানসীভের পিঠের সাথে লেপ্টে গেল আঠার মতো। কালো হেলমেটের আড়ালে পা'ষাণ মানুষটার ঠোঁটে এক টুকরো বিজয়ী ক্রুর হাসি ফুটে উঠলো। তবে সে বাইকের গতি বিন্দুমাত্র কমালো না। বরং নিজ দেহের প্রতিটি কোষে অত্যন্ত সন্নিকটে, তীব্রভাবে অনুভব করতে লাগলো পেলব আরেকটি উষ্ণ শরীরের উপস্থিতি। আজকের প্রকৃতিও যেন তাদের এই নতুন সমীকরণকে স্বাগত জানাতে বড্ড মনোরম। শুনশান পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো। বয়ে যাওয়া বাতাস। সবটা বেশ আদুরে। গতির রোমাঞ্চকর নিবিড়তায় ধীরে ধীরে কাছাকাছি এলো দু'টো হৃদয়। নীরবে নিভৃতে বয়ে গেল হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর।

-

আশুলিয়া থেকে উত্তরা বেড়িবাঁধ হয়ে বাইক এসে পৌঁছালো দিয়াবাড়ি। বাইকের গতিবেগ ধীরে ধীরে কমে গেল। নিরিবিলি এক স্থানে থামলো। এতক্ষণে প্রাণ ফিরে পেল লাজুক। তড়িঘড়ি করে নিজেকে সরিয়ে নিলো স্বামীর সান্নিধ্য হতে। দ্রুত ভঙ্গিতে বাইক হতে নেমে এলো মেয়েটা। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গাল। লাল টুকটুকে রঙে রঙিন হয়েছে মুখশ্রী। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ করে তানসীভ নেমে এলো। হেলমেট খুলে ফেললো। হুডি, কালো মাস্কের আড়ালে আবৃত হলো শ্যাম সৌন্দর্য। গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করলো অর্ধাঙ্গিনীর নাজুক রূপটা। মনে মনে হাসলো সে। তবে অভিব্যক্তি বরাবরের ন্যায় স্বাভাবিক। মানুষটা থেকে মনোযোগ ফেরাতে লাজুক আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিলো। মাশাআল্লাহ্! কি সুন্দর দৃশ্য! কাশবনের মৃদু বাতাসে উড়তে লাগলো লাজুকের ওড়না। নির্মল হাওয়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস ছাড়লো রমণী। আবেশে বুঁজে গেল চোখ। আশপাশে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো সে। কাশবনে চমৎকার সময় কাটালো। হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়ালো এক ভ্রাম্যমাণ দোকানের সামনে। আদুরে ভঙ্গিতে স্বামীর কাছে আবদার করলো,

" ভুট্টা খাবো। "

মাস্ক আবৃত তানসীভ চোখের ইশারা করলো দোকানদারকে। দোকানদার সে ইশারা বুঝতে পারলো। ভুট্টা রেডি করতে লাগলো। লেবু, লবণের মশলা মাখানো গরম পোড়া ভুট্টা। হাতে নিলো লাজুক। প্রিয় মুখরোচক খাবারের সুগন্ধে জিভে পানি চলে এলো। তৃপ্তি করে এক কামড় দিলো মেয়েটা। আবেশে, স্বাদে আপনাআপনিই বুঁজে গেল চোখ।

" উমম! "

মন ভরে লাজুক পোড়া ভুট্টা খেতে লাগলো। তানসীভ বিল পরিশোধ করতেই লাজুক হঠাৎ খাওয়া থামিয়ে দিলো। বলে উঠলো,

" আপনি খাবেন না? "

গম্ভীর স্বরে জবাব এলো,

" এসব খাই না। "

সোজাসাপ্টা, শুকনো জবাবে লাজুক ম্লান হাসলো। ভুট্টায় কামড় দিলো।‌ হঠাৎই বিস্বাদ, তিতকুটে লাগছে মুখের খাবার। মনের ভেতর এক তুচ্ছ অভিমানিনী মোচড় দিয়ে উঠলো। ওনার সামনে আমি খাচ্ছি। উনি খাবেন না? লাজুক অন্তর্মুখী স্বভাবের দেয়াল ভেঙে শেষবারের মতো ক্ষুদ্রতর চেষ্টা করলো। ভুট্টায় এক কামড় দিয়ে, কামড়ানো সেই অংশটুকু বাড়িয়ে দিলো স্বামীর উদ্দেশ্যে। তানসীভ গভীর, অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে। শান্ত, হরিণী চাহনির অদম্য আবদারের সামনে অবশেষে হার মানলো পা'ষাণ মন। মাস্কটা সামান্য নামালো তানসীভ। অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ঝুঁকে গেল। স্ত্রীর হাতে থাকা ভুট্টায় ছোট্ট এক কামড় দিলো। নীরব আত্মসমর্পণ। লাজুকের বুকের ভেতরকার সমস্ত মেঘ কেটে এক লহমায় রোদ হেসে উঠলো। লাজে রাঙা বিজয়িনীর হাসি উপহার দিলো মেয়েটা।

-

সন্ধ্যা নেমেছে শহরের বুকে। বনানীর অভিজাত সড়ক কৃত্রিম আলোয় ঝলমল করে চলেছে। রাস্তার একপাশে থামলো বাইকটা। নেমে এলো লাজুক। পরক্ষণেই বাইক বন্ধ করে তানসীভ নেমে এলো। পরিহিত হুডি আরেকটু যত্ন সহকারে টেনে নিলো মাথায়। লাজুক কৌতূহলবশত জানতে চাইলো,

" আমরা এখানে কি করছি? "

তানসীভ নিশ্চুপ দাঁড়ালো সম্মুখে ঘুরে। তার চাহনি অনুসরণ করে লাজুক তাকালো সামনে। ধীরে ধীরে বোধগম্য হলো বিষয়টা। আকস্মিক ডেটের পেছনে এটাই তবে প্রকৃত কারণ? দেখা যাক, পরিকল্পনা ঠিকঠাক বাস্তবায়িত হয় কিনা।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন