#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[২২]
" ইকুয়েডরিয়ান রোজ পাওয়া যাবে? "
অভিজাত এই ফ্লাওয়ার স্টুডিও। চারপাশে বিদেশি টিউলিপ, অর্কিডসহ নানারকম ফুলের সুবাস। কাউন্টারে বসে থাকা ম্যানেজারের উদ্দেশ্যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছে মানুষটি। নি'ষ্ঠুর শিকারির ন্যায় তীক্ষ্ণ চাহনি। সে চাহনির তীব্রতায় ভড়কে গেলেন ম্যানেজার। দ্রুততার সহিত জবাব দিলেন,
" স্যরি স্যার। ইকুয়েডরিয়ান রোজ আউট অফ স্টক। "
তানসীভ কিছুটা অগ্রসর হয়ে মাথা ঝুকালো। হুডি, কালো মাস্কের আড়ালে লুকায়িত মুখশ্রী। লোমকূপ দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো ভ'য়ঙ্কর। ছদ্মবেশী এক রুদ্রমূর্তি যেন। কণ্ঠে ধারালো ভাব।
" গত দুই-তিন মাসের মধ্যে এই রেয়ার রোজ যারা অর্ডার করেছে, তাদের লিস্ট চাই আমার। "
ম্যানেজার ভীত স্বরে আমতা আমতা করে বললো,
" স্যরি স্যার। কাস্টমারদের সিক্রেট ইনফরমেশন তো আমরা এভাবে কাউকে দিতে পারি না। এটা আমাদের পলিসির বাইরে। "
তানসীভ কপালটা একবার হালকা চুলকে নিলো। সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না। আঙ্গুলটা এবার বাঁকা করা দরকার। পকেট হতে শান্ত ভঙ্গিতে নতুন বাটন মোবাইল বের করলো সে। লাজুক এসব থেকে যথেষ্ট দূরে। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে ডাচ টিউলিপের দিকে। দ্রুত, ব্যস্ত ভঙ্গিতে নিজামের উদ্দেশ্যে মেসেজ টাইপ করলো তানসীভ। স্বল্প, ধারালো শব্দে নির্দেশ দিলো মেসেজের মাধ্যমে,
' হ্যাক দ্যেয়ার সার্ভার। নাউ। '
মেসেজ পাঠানো শেষে ফোনটা পকেটে পুরে নিলো মানুষটা। ঘুরে দাঁড়ালো স্ত্রীর শান্ত, অপরূপা অবয়বে। সেদিকে দৃষ্টিপাত করে অত্যন্ত ভাবলেশহীন, গম্ভীর স্বরে আদেশ দিলো,
" প্যাক সাম প্রিমিয়াম ফ্লাওয়ার্স ফর মাই বিউটিফুল ওয়াইফ। "
কিছু মুহুর্তের মধ্যেই কথার টোন বদলে যাওয়া। এমনতর মুড সুইং। ম্যানেজার ঘাবড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ এক কর্মচারীকে নির্দেশ দিলো স্টুডিওর সবচেয়ে প্রিমিয়াম অর্কিড, লিলির রাজকীয় তোড়া সাজাতে। কর্মচারী সাথে সাথে কাজে লেগে পড়লো। টিউলিপের সুবাসে মগ্ন রমণী লজ্জায়, চরম আকস্মিকতায় এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল! কানে ভেসে চলেছে ক্ষুদ্র সে সম্বোধন। ' মাই বিউটিফুল ওয়াইফ! ' লাজে রাঙা হলো গাল। অন্তরে প্রশান্তির বর্ষণ। লজ্জা মাখা মুখখানি স্বামীর দিকে ফিরতে ব্যর্থ হলো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো টিউলিপে। যেন এই নশ্বর পৃথিবীতে টিউলিপ বিহীন দেখার মতো দ্বিতীয় কিচ্ছুটি নেই। একদমই নেই। তানসীভের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন স্থির, কাঁচের গ্লাস গলিয়ে স্টুডিওর বাইরে। রাস্তার ওপারে ল্যাম্পপোস্টের নিচে অন্ধকার ছায়ায় পার্ক করা গাড়ি। কুচকুচে কালো গ্লাসে ঢাকা। গাড়ির ইঞ্জিন চালু। কিন্তু হেডলাইট নেভানো। ভেতরকার আরোহীর অবয়ব স্পষ্ট নয়। তবে আরোহীর মূল টার্গেট এই স্টুডিওতে অবস্থানরত মিস্টার অ্যান্ড মিসেস মির্জা। যা বুঝতে একটুও অসুবিধে হলো না তানসীভ শাহ্ এর। সঠিক পথেই এগোচ্ছে তারা। মাইন্ড-গেম কেবল তো শুরু হতে চলেছে। লেটস্ এনজয় দ্য গেম!
•
আধো অন্ধকারে ছেয়ে আছে ঘর। ডিম লাইটের নীলচে আলোয় দৃশ্যমান একজোড়া কপোত কপোতী। বাম হাতটা মাথার পেছনে রাখা। ডান হাতে কোমড় জড়িয়ে রাখা। পরম মায়ায় বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে সঙ্গিনীকে। তানসীভের চওড়া, উষ্ণ, উদোম বুকে চুপটি করে শুয়ে রয়েছে লাজুক। ঘরজুড়ে পিনপতন নীরবতা। কেবল দু'টো শরীরের ওম, ভারী নিশ্বাসের ওঠানামা। আস্তে করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে উঠলো লাজুক,
" গাড়িটা উত্তরা থেকে আমাদের ফলো করছিল। "
" হু। "
নির্বিকার কণ্ঠস্বর। আলতো করে আঙ্গুল বুলিয়ে চলেছে স্ত্রীর কোমড়ের বাঁকে। কামিজের সরু ফাঁকে।
" গাড়িটা ওদেরই কারোর, তাই না? "
লাজুকের কণ্ঠে ভয়ের চোরাস্রোত।
" কি চাইছে ওরা? কেন করছে এসব? আমাদের দু দণ্ড শান্তিতে থাকতে দেবে না? ওরা কা.. "
বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠলো লাজুক। এক লহমায় থমকে গেল হৃদস্পন্দন। মুহুর্তের মধ্যে কোমল শরীর আছড়ে পড়লো বিছানায় নরম গদিতে।কোনোরূপ আঘাত লাগলো না। পিঠ বিছানা ছোঁয়ার আগেই ভারী, উষ্ণ দেহ রমণীর অতি সন্নিকটে চলে এলো। দেহের অতি সন্নিকটে অপর দেহটা। নরম দু হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে মাথার দুই পাশ বরাবর বিছানায়। হুট করে ঘটে যাওয়া কাণ্ডে শিহরিত চোখে তাকিয়ে লাজুক। দিশেহারা বক্ষপিঞ্জর। পুরুষালি মা'দকতায় আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে তানসীভ। চোখের তারায় সম্মোহনী, তীব্র আকুলতা। নে'শাক্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ লাজুকের ঠোঁটের ওপর। ছোট্ট, কালো তিলে। রমণীর উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে চলেছে তানসীভের গাল। একটু একটু করে আরো নিকটবর্তী হলো মানুষটা। এতটাই কাছে যেন দু'জনের হৃদস্পন্দন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। তানসীভ পরম যত্নে, গভীর তৃষ্ণায় ঠোঁটের পরশ বুলিয়ে দিলো ক্ষুদ্র, চিত্তাকর্ষক তিলে। অবশ করা শিহরণে বুঁজে গেল রমণীর চোখ। ঘন হলো শ্বাস। ক্ষুদ্র তিলে ঠোঁট ছুঁয়ে রেখে নিচু গলায় বললো মানুষটা,
" একটুখানি শান্তি চাচ্ছি। দেবে? "
এমন অমোঘ আবদার। অভেদ্য মায়াজাল। অস্বীকার করার সাধ্য কার? লাজুকের ভেতরকার সকল দ্বিধা, সংকোচ এক মুহূর্তে কর্পূরের ন্যায় উড়ে গেল। অজান্তেই রমণীর হাত আঁকড়ে ধরলো স্বামীর হাত। আঙ্গুলের ফাঁকে আঙ্গুল গলিয়ে গেল। একত্রে মুঠোবন্দী হলো দু জোড়া হাত। অবাধ্য অনুভূতিরা। সব সীমানা পেরিয়ে, দূরত্ব ঘুচিয়ে তানসীভ নৈকট্য বাড়ালো। কপালের মধ্যখানে গভীর, দীর্ঘ চুমু এঁকে দিলো। সে ঠোঁটের ছোঁয়া লাজুকের আত্মায় কম্পন সৃষ্টি করলো। আস্তে ধীরে নিচে নেমে এলো ঠোঁট জোড়া। দু চোখের পাতা, নাকের নরম ডগা, গালের তুলতুলে ত্বক। একে একে সর্বত্র অধিকারের সহিত আদর ছুঁয়ে দিলো। চোখ বন্ধ করে পৃথিবীর সকল দুশ্চিন্তা ভুলে, স্বামী সোহাগে গা ভাসিয়ে দিলো রমণী। ধীরে ধীরে আরো অবাধ্য, তৃষ্ণার্ত হলো স্পর্শ। ঠোঁটজোড়া প্রায় ছুঁই ছুঁই। কম্পিত ওষ্ঠাধর দখল নিতে সেকেন্ডের দূরত্ব মাত্র। ঠিক তখনই কর্কশ স্বরে বেজে উঠলো বাটন মোবাইল। অন্তরঙ্গ আবহ মুহুর্তের মধ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠলো মানুষটির চোখেমুখে। তৃষ্ণার্ত, ঘন শ্বাসে ওঠানামা করে চলেছে বুক। ঘাম চিকচিক করছে চেহারা জুড়ে। অবাধ্য মনটাকে কোনোরূপ সংবরণ করলো সে। বাটন মোবাইল বাজছে। নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে কোনোমতে ধাতস্থ করে সঙ্গিনীর সান্নিধ্য হতে সরে গেল তানসীভ। লাজে র'ক্তিম রমণীর অবস্থা তখন নাজুক। বেসামাল। বিছানা ছেড়ে নেমে এলো তানসীভ। নিজাম কলিং। কল রিসিভ করলো মানুষটা। বিরক্তিকর, নিচু গলায় বলে উঠলো,
" বল। "
" ঝামেলা হয়ে গেছে ভাই। তোর অডিও লিক হয়ে গেছে। ফেসবুক, ইউটিউব সব জায়গায় মাতামাতি। "
মুহুর্তের মধ্যে শক্ত হলো চোয়াল। চোখের মণি দুটো স্থির। চাহনিতে ঝরে পড়ছে বি'ধ্বংসী আগুন। নিজাম আরো দুই একটা কথা বললো। কোনোরূপ শব্দ ব্যয় না করে কল কেটে দিলো তানসীভ। স্বামীর মুখাবয়বের এই আকস্মিক পরিবর্তন। সোজা হয়ে বসলো লাজুক। তানসীভের ভ'য়ঙ্কর, অন্ধকার দৃষ্টি দেখে বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো। ঘরে পিনপতন নীরবতা। এ আবার নতুন কোন বিপদ ঘনিয়ে এলো?
•
সূর্যের আলোয় আলোকিত ঘর। থমথমে পরিবেশ। ব্যস্ত হাতে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে তানসীভ। বাইরে বেড়োবে সে। তখনই মোবাইল বেজে উঠলো। স্মার্টফোন। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে আব্বার নাম্বার। ভাবলেশহীন ভাবে কল রিসিভ করলো তানসীভ। কানে ঠেকালো মোবাইল। গম্ভীর, অসন্তোষের স্বরে বলে উঠলেন জহুরুল সাহেব,
" এতবড় বোকামি কি করে করলে তুমি? মির্জাদের মানসম্মান পুরোপুরি না ডুবিয়ে শান্ত হবে না? তোমার একের পর এক ভুল কর্মকাণ্ড। এদিকে পরিবারের সম্মান মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। মিডিয়া কিভাবে উত্তাল হয়েছে আদৌও জানা আছে? নাকি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছো শুধু? "
তানসীভ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে কোনোরূপ অনুশোচনা কিংবা দুশ্চিন্তা নেই। একদম শান্ত নদীর ন্যায় মুখশ্রী। শীতল, অনুভূতিহীন। বাবার একাধিক দোষারোপ শুনলো সে। বিপরীতে কোনো জবাবদিহিতা দেয়ার প্রয়োজন করলো না। একদম সংক্ষিপ্ত, ধারালো গলায় বললো শুধু,
" রাখছি। "
আর কোনো শব্দ ব্যয় করলো না সে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো। মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেললো বিছানায়। ত্রস্ত হাতে শার্টের সর্বশেষ বোতাম লাগালো। রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে লাজুক। স্বামীর রূঢ় রূপ দেখে কেমন গুটিয়ে গেল। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, ভেবেই দম বন্ধ হয়ে আসছে।
•
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ল্যাম্পপোস্ট। টিম টিম করে আলো জ্বলছে। শুনশান নীরবতা ভেঙে গলির মাথায় থামলো একটি বাইক। বন্ধ হলো ইঞ্জিন। নিভে গেল হেডলাইটের আলো। মৃদু আঁধারে তলিয়ে গেল সেই জায়গা। বাইক হতে নেমে এলো দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী ব্যক্তি। মাথায় ক্যাপ। মাস্কে ঢাকা মুখ। কালো পোশাকধারী ব্যক্তিকে দূর হতে চেনা দুষ্কর। সতর্ক দৃষ্টি আশেপাশে বুলিয়ে নিলো মানুষটা। ধীরপায়ে অগ্রসর হলো সম্মুখে। গলি পেরিয়ে আরেকটু ভেতরে প্রবেশ করলো। ঢুকলো ছোটোখাটো সাধারণ এক হোটেলে। হোটেল মালিক ক্যাশিয়ারের স্থানে বসা। হিসাবনিকাশ করে চলেছেন। হোটেলের একপাশে গরম ধোঁয়া ওঠা চা তৈরি হচ্ছে। অপরপাশে ডুবো তেলে ভাজা হচ্ছে সিঙ্গারা, সমুচা। হোটেলের একদম পেছনকার টেবিল দখল করেছেন সাদমান সিদ্দিকী। সিভিল ড্রেসে বসে রয়েছেন তিনি। বেশভূষায় একটু ভিন্নতা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘুরে বেড়াচ্ছে আশেপাশে। ক্ষণিকের মধ্যে কালো পোশাকধারী তানসীভ এসে বসলো বিপরীত দিকের কাঠের বেঞ্চিতে। দু জোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুখোমুখি। সাদমান সিদ্দিকী সোজা হয়ে বসলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলেন তানসীভের অভিব্যক্তি। সিরিয়াল মা"র্ডার অ্যালিগেশন। ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন। অর্গানাইজড ক্রাইম কানেকশন। সবটা এই লোকের বিরুদ্ধে। তবুও চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। অসংখ্য বিপদের ভীড়ে কি করে এত ধৈর্যশীল, শান্ত সে!
" অডিওটা শুনলাম তানসীভ সাহেব। বেশ ভাইরাল। "
টেবিলে আঙুল ঠুকে হালকা উপহাসের সুরে,
" মিডিয়া, আইনী মারপ্যাঁচ থেকে এবার নিজেকে কিভাবে মুক্ত করবেন? সবসময় তো আর আদালতপাড়ার সিনারি চলবে না। হুটহাট জামিন মিলবে না। "
তানসীভ শাহ্ বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালো না এ উপহাসে। শান্ত ভঙ্গিতে বসা সে। ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠলো,
" ডিজিটাল টেকনোলজির এই যুগে অডিও ক্লিপ ভাইরাল, কোনো ব্যাপারই না। এ.আই ইউজ করে যে কারো ভয়েস ক্লোন করে হুবহু এমন হাজারো অডিও বানানো সম্ভব। ডিপফেক অডিওর ব্যাপারে তো আমার চেয়ে ভালো আপনার জানার কথা।"
" হু, জানি। "
একটু থেমে এসিপি বললেন,
" মিডিয়া, পুলিশ, আদালত.. সবাই যখন একই দিকে সন্দেহের আঙুল তোলে। তখন সাধারণত মানুষ ভয় পায়।"
চক্ষু সরু হয়ে আসে,
" আপনি পাচ্ছেন না। কে-ন? "
অল্প বয়সী একটা ছেলে এগিয়ে এলো। টেবিলের ওপর রাখলো দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা। চলে গেল ছেলেটা। তানসীভ এসিপির চোখে সরাসরি তাকালো। শান্ত, ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
" ভয় গিল্টি পায়। মির্জা তানসীভ শাহ্ নয়। "
সাদমান সিদ্দিকী চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। বললেন,
" আপনার প্রবলেম কি জানেন? আপনি খুব বেশি কাম। এটাই চিন্তার বিষয়। "
উনি সরাসরি বললেন এবার,
" অডিওতে আপনার ভয়েস, টোন সবটা সেম। এত কয়েন্সিডেন্স! কি করে সম্ভব? "
" আজকের এ.আই কয়েক মিনিটের স্যাম্পল পেলে মুর্দা লোকের ভয়েস রি-ক্রিয়েট করতে পারে। সেখানে আমি জিন্দা। "
তানসীভ দৃঢ়তার সাথে যোগ করলো,
" অডিওতে যে কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে.. ওটা যে ফরেনসিক ভাবে আমারই কণ্ঠ, তার কোনো লিগ্যাল এভিডেন্স আছে আপনাদের কাছে? নেই। অডিও ক্লিপ টোটালি এডিটেড। আমাকে ফাঁ'সানোর এক সস্তা চেষ্টা। "
সাদমান সিদ্দিকী গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে,
" ধরুন, আমি মেনে নিলাম। এটা ফেক। কিন্তু আদালতে কি বলবেন? আইন তো মুখের কথায় বিশ্বাস করবে না। এভিডেন্স চাই। এভিডেন্স। "
টেবিলের ওপর মুঠোবন্দী করে রাখা দু'হাত। ধীরস্থির ভঙ্গিতে একটুও দ্বিধাবোধ না করে জবাব এলো,
" স্পেক্ট্রোগ্রাম অ্যানালাইসিস। ওয়েভফর্ম ইনকনসিসটেন্সি। আর্টিফিশিয়াল নয়েজ লেয়ারিং। ডু ইট। অ্যান্সার পেয়ে যাবেন। "
এসিপির ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম সতর্কতার রেখা ফুটে উঠলো। মানুষটা শুধু বুদ্ধিমান নয়। সাইকোলজিক্যালি ডেঞ্জারাস! আইটি সেক্টরের এত গভীর বিষয়গুলো কি করে জানে সে? এগুলো তো সাধারণ কোনো গু'ণ্ডার জানার কথা নয়। তানসীভ শেষের কথাটুকু গম্ভীর স্বরে বললো,
" এ.আই ইমোশন ইমিটেট করতে পারে। কিন্তু ইমপারফেক্ট হিউম্যান কেয়স (chaos)? পুরোপুরি ইমিটেট করতে পারে না। রেস্ট ইজ আপ টু ইয়্যু। "
সাদমান সিদ্দিকী তানসীভের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনলেন। তার ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল। প্রশংসার নয়। সতর্কতার। তিনি বুঝতে পারলেন, সামনে বসা মানুষটা কোনো সাধারণ গুণ্ডা বা চাঁদাবাজ নয়। একদম ঠাণ্ডা মাথার দক্ষ খিলাড়ি। কোথায়, কখন, কিভাবে নিজের চাল চালতে হয়, ভালো করেই জানা আছে এর। খেলা জমবে এবার।
•
পরেরদিন সকাল। আশুলিয়ার ফাঁকা সড়ক ধরে এগিয়ে চলেছে সাদা রঙের প্রিমিও গাড়ি। এগিয়ে যাচ্ছে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। গাড়ির পেছনের সিটে কাঁচ ঘেঁষে বসা লাজুক। ড্রাইভার হিসেবে রয়েছে তানসীভের বিশ্বস্ত চ্যা'লা রতন। গাড়ির বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ মেয়েটির। বেশ কিছুদিন পর আজ ভার্সিটি যাচ্ছে সে। জীবনে যা কিছু ঘটে চলেছে সেগুলো সামলাতে সামলাতে বড় ক্লান্ত সে। বিগত দিনগুলোতে লোকচক্ষুর আড়ালে গৃহবন্দী থাকতেই স্বস্তি পাচ্ছিল লাজুক। বাইরে বের হওয়ার ন্যূনতম প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু আজ না এসে উপায় ছিল না। ভার্সিটি যেতে হবে। প্রেজেন্টেশন রয়েছে। জরুরী এটা। নচেৎ এমন বিপদের মুহূর্তে ঘর থেকে বের হতো না সে। গাড়ির মৃদু এসির বাতাসেও রমণীর কপাল বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত ঘাম গড়িয়ে পড়লো। একের পর এক বিপদ যেন তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। একটা কাটে তো দশটা এসে হাজির। কবে, কোথায় এর সমাপ্তি? মানুষটা একাকী আর কত সর্বগ্রাসী ঝড়ঝাপ্টার সঙ্গে লড়বে? ভেতর থেকে কান্নারা দলা পাকিয়ে ওপরে উঠে আসতে চাইলো। ইয়া রাব্বে কারীম! দয়া করে সাহায্য করুন। হেফাজতে রাখুন আমার মানুষটিকে। মনে মনে রবকে স্মরণ করে চলেছে লাজুক। আস্তে ধীরে দৃষ্টি পড়লো রিয়ার ভিউ মিররে। মুহূর্তের মধ্যে স্থির হয়ে গেল চোখের মণি। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। অজানা, তীব্র শঙ্কায় কেঁপে উঠলো পুরো শরীর। রিয়ার ভিউ মিররে যা দেখলো, তা বিশ্বাস করতে না পেরে লাজুক তৎক্ষণাৎ মাথা ঘুরিয়ে পেছনের কাঁচ দিয়ে তাকালো। বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল। এক পলকের জন্য হৃৎস্পন্দন থমকে দাঁড়ালো। হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছে সে! সেই কালো রঙের অজ্ঞাত গাড়ি। বি"ষধর সাপের ন্যায় অনুসরণ করে চলেছে! গাড়ির গতি ওদের গাড়ির গতির সাথে হুবহু মিল রেখে ওঠানামা করছে। যেন কোনো চতুর শিকারী। শিকারকে বাগে পাওয়ার জন্য ওঁত পেতে আছে। বি"ষাক্ত সাপের ন্যায় কুন্ডলী পাকিয়ে পেঁচিয়ে ফেলতে চাইছে দুর্ভেদ্য, অন্ধকার জালে। প্রচণ্ড আতঙ্ক ভর করলো মস্তিষ্কে। এদের আসল উদ্দেশ্য কী? ফাঁকা রাস্তায় প্রাণনাশ? নাকি তার চেয়েও ভ'য়ঙ্কর, ভিন্ন কিছু? আতঙ্কে লাজুকের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কপালে জমে থাকা ঘাম বিন্দুগুলো ঠান্ডা স্রোতের ন্যায় নেমে এলো গাল বেয়ে গলায়। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। কাঁপা, জড়তাগ্রস্ত গলায় সে সামনের দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠলো,
" র.. রতন ভাই! "
দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং সামলাচ্ছে রতন। অনেকক্ষণ আগেই লক্ষ্য করেছে গাড়িটা। তবে চুপচাপ সবটা সয়ে নিয়েছে। যতক্ষণ প্রতিপক্ষ চুপ, সেও চুপ। একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই অ্যা'টাক!
" ভয় পাইয়েন না ভাবী। কিছু করতো না এরা। হুদাই ভয় দেহাইতাছে। ভাই সব জানে। আপনের চুলের একটা ডগাও ছোঁয়ার সাধ্য নাই এই হা'লাগো। "
রতনের কথায় অভয়। তবুও রমণীর ভেতরকার হিমশীতল আতঙ্ক এক বিন্দুও কমলো না। জানালার কাঁচের বাইরে মাথা বের করার মতো সাহস বা শক্তি কোনোটাই এই মুহূর্তে অবশিষ্ট নেই। সিটের সাথে নিজেকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিলো সে। হৃদপিন্ডের ধকধক শব্দ। কানে বাড়ি খাচ্ছে বারংবার। কাঁপতে কাঁপতে চুপিসারে আরেকবার পিছু ঘুরে তাকালো লাজুক। পেছনের দৃশ্য দেখে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। কালো গাড়িটা আর আগের অবস্থানে নেই! ভীড়ের মধ্যে দু'টো লোকাল বাসের পেছনে অস্তিত্ব লুকিয়ে নিয়েছে। অত্যন্ত চতুরতার সহিত। আলাদা করে চেনা দুষ্কর। কিন্তু লাজুক জানে। বিপদ এখনো পিছু ছাড়েনি। কখন থেকে ঠিক কিভাবে অনুসরণ করে চলেছে তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা মুশকিল। ধূর্ত, ক্ষমতাবান, নৃ'শংস এক ব্যক্তির নজরে পড়েছে লাজুক নূরাইন। দিনকে দিন চারপাশে অদৃশ্য খাঁচা। আরো ছোট হয়ে আসছে যেন। শ্বাসরোধ হয়ে আসছে লাজুকের। কীভাবে মিলবে এই র"ক্তহিম রহস্য জাল হতে মুক্তি?
•
অন্ধকারাচ্ছন্ন বিশাল ঘর। ভারী মখমলের পর্দা টেনে দেয়া। দিনের আলো ভেতরে প্রবেশ করতে ভীত। ঘরের এক কোণে জ্বলছে মৃদু আলোর ল্যাম্প। অপার্থিব, রহস্যময় আভা ছড়িয়ে ঘরময়। ঘরের ঠিক মাঝ বরাবর দামী চামড়ার আরামকেদারা। সেখানে আয়েশ করে শুয়ে রয়েছে এক ব্যক্তি। কানে হেডফোন। ডান হাতে ধরা সরু ক্রি'স্টালের ম'দের গ্লাস। বাম হাতে তাল মেলাচ্ছে হেডফোনে বাজতে থাকা ইংরেজি প্যাশনেট গানের সাথে। গানের মা'দকতায় বন্ধ চোখ। তার ঠিক সম্মুখে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে এক লোক। লোকটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কিছু বলবার অপেক্ষায় অধীর হয়ে দাঁড়িয়ে সে। ঘরের ভেতরকার নীরবতা, আরামকেদারার মানুষটার নিস্পৃহতা, লোকটার অন্তঃস্থ ভয় বৃদ্ধি করে চলেছে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে নিজ গতিতে ঘূর্ণায়মান। অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। অবশেষে বিরক্তি সহকারে এক কান হতে হেডফোনটা সামান্য সরিয়ে ফেলে অজ্ঞাত ব্যক্তি। চোখ খোলে না সে। ম'দের গ্লাসে আলতো করে এক চুমুক। অন্য হাতের তর্জনী নেড়ে লোকটাকে কথা বলার ইশারা করে। আদেশ পেয়ে লোকটা গলা ঝেড়ে নেয়। কিছুটা জড়তা নিয়ে জানানো শুরু করে সাম্প্রতিক আপডেট।
" বস! মির্জা তানসীভ শাহ্ সত্যিই গা ঢাকা দিয়েছে। আশুলিয়ায় উঠেছে তারা। মিডিয়া, রাইভালদের চাপ আর নিতে পারেনি। পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। লোকচক্ষুর আড়ালে এখন ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়। বাইরে ঘাটে খুব কমই দেখা যায়। "
অজ্ঞাত ব্যক্তি কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া দেখালো না। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো তাচ্ছিল্যের হাসি। সে মুহূর্তে অনুচর লোকটা পরের বাক্যটি উচ্চারণ করলো।
" এখন অবসরে বউকে নিয়ে ফূর্তি করে বেড়ায়। বাইকে করে ডেটে যায়। রাস্তায় বাইক থামিয়ে ফুলের তোড়াও কিনে দেয়। "
মুহূর্তের মধ্যে ঘরের ভেতরকার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল যেন। আচমকা খুলে গেল অজ্ঞাত ব্যক্তির চোখের পাতা। লালচে আলোয় হিং'স্র পশুর ন্যায় চকচক করে উঠলো চোখের মণি। শান্ত মুখভঙ্গি ধীরলয়ে কঠোর, নি'ষ্ঠুর রূপ ধারণ করলো। হাতে ম'দের গ্লাস। এমনভাবে চেপে ধরলো যেন, এখনই ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলবে। ভারী, কর্কশ গলায় জানতে চাইলো অজ্ঞাত ব্যক্তি,
" অডিওর কী খবর? হোয়াট অ্যাবাউট দ্য অডিও লিক? "
লোকটি মৃদু প্রসন্ন, আশ্বস্ত কণ্ঠে জানালো,
" অনলাইন দুনিয়ায় ইতিমধ্যে আগুন লেগে গেছে বস। মিডিয়া পুরো ক্ষে'পেছে। টকশো থেকে শুরু করে নিউজ পোর্টাল। সব জায়গায় শুধু তানসীভের নাম। সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন, সবাই ১০০% বিশ্বাস করে নিয়েছে ওটা তানসীভেরই কণ্ঠস্বর। ওই অডিও রেকর্ডিংয়ে যেভাবে ঠান্ডা মাথায় পারভেজকে খু"ন করার নির্দেশ দিচ্ছে। সেটা শুনে সবাই ওকে ভ'য়ঙ্কর খু"নি ভাবছে। "
অভূতপূর্ব এই আপডেটে অজ্ঞাত ব্যক্তির কঠোর মুখাবয়ব ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে গেল। নির্দয় মুখখানা সামান্য বাঁকিয়ে পৈ'শাচিক হাসলো সে। তার মানে বুননকৃত ফাঁ'দ নিখুঁতভাবে কাজ করেছে। মির্জা তানসীভ শাহ্ এর চারপাশের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে আসছে। আরামকেদারায় আরো আয়েশ করে শুলো অজ্ঞাত ব্যক্তি। নিচু, ফিসফিসে গলায় বিড়বিড় করে উঠলো,
" ইয়্যু আর প্লেয়িং আ ক্লেভার গেইম, মির্জা। বাট.. আই'ম দ্য ওয়ান হোল্ডিং দ্য রেইন্স। "
আস্তে ধীরে কানে হেডফোন চেপে ধরলো সে ব্যক্তি। ঘরের লালচে আলোয় আরো ভ'য়ঙ্কর রূপ ধারণ করলো হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী।
চলবে।