ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

২৩তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[২৩] [ প্রাপ্তমনস্কদের জন্য ]

" তোমাদের ওপর দিয়ে এত বড় ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একটা বারের জন্য আমাদের জানানোর প্রয়োজন বোধ করলে না? "

সন্ধ্যার ম্লান আলোয় ছেয়ে আছে লিভিংরুম। সোফায় বসে রয়েছে লাজুক। হাতে মোবাইল। ভিডিও কলে সংযুক্ত সে বড় জা ইফরাতের সঙ্গে। অপর প্রান্তে ইফরাতের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। আদ্র কণ্ঠে বলে উঠলো উপরোক্ত কথাটা। যুক্ত করলো আরো অভিমান,

" এতটাই পর হয়ে গিয়েছি আমরা? "

লাজুক কিছু বলবার পূর্বে ইফরাত পুনরায় বলতে লাগলো,

" স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইয়ার নামে কিসব আজেবাজে অডিও লিক হয়েছে। সাধারণ জনগণ, মিডিয়া সবাই উত্তাল। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের দূরে ঠেলে দিচ্ছো? "

লাজুক শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে,

" ভাবী, আপনি ভুল বুঝছেন। উনি আসলে.. আপনাদের ঝামেলামুক্ত রাখতে চাচ্ছেন। উনি চান না ওনার জন্য কোনোরকম আইনি জটিলতা আপনাদের স্পর্শ করুক। এজন্য নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। আপনাদের সুরক্ষার কথা ভেবে। "

একের পর এক বিপদ হাতছানি দিচ্ছে। তানসীভ শাহ্ যথাসম্ভব নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। পরিবার থেকে একটুও সহায়তা নিতে নারাজ সে। এজন্য জহুরুল সাহেব যথেষ্ট অসন্তুষ্ট। ওই বাড়িতে চাপা উত্তেজনা, ক্ষোভ বিরাজ করছে। ফলস্বরূপ আজ প্রথমবারের মতো ইফরাতের কণ্ঠস্বর উঁচু হলো। ক্ষিপ্ত, কান্নাভেজা কন্ঠে বলে উঠলো,

" সুরক্ষা নাকি অবহেলা? শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করো না লাজুক। ভাইয়া যা করছেন, জেনেবুঝে স্বেচ্ছায় করছেন। উনি আসলে কখনো আমাদের আপন ভাবেন ই নি। রায়হান যত চেষ্টাই করুক না কেন, উনি আজীবন সৎ ই ভেবে এসেছেন। সৎ ভাই কখনো আপন হয় নাকি? "

শেষোক্ত কথাটা মুখনিঃসৃত হতে থমকে গেল ইফরাত! কথাটা ফেরত নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালো। তবে এতক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার হয়েই গিয়েছে। ভীত, দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে সে তাকালো লাজুকের দিকে। কাঁপছে অন্তঃস্থল। অপরদিকে ইফরাতের মুখনিঃসৃত শেষ বাক্যটি যেন লিভিংরুমে ভ'য়াবহ বো-মার ন্যায় আছড়ে পড়লো। এক লহমায় পাথরের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে গেল লাজুক! বরফের মতো জমে গেল হাতের আঙ্গুল। নিঃশ্বাস আটকে গেল গলার কাছে। গুলবাহার মঞ্জিলে লুকায়িত এতবড় কুৎসিত সত্য তার কল্পনার বাইরে ছিল। মির্জা তানসীভ শাহ্ এবং মির্জা রায়হান শাহ্ আপন ভাই নয়! তারা সৎ ভাই! মির্জা জহুরুল শাহ্ এর অতীত যে কতখানি অন্ধকার এবং পাপের চাদরে আবৃত, প্রথমবারের মতো অনুধাবন করতে পারলো লাজুক। ইফরাত ততক্ষণে এটা ওটা বলে বিষয়টা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে লাজুক এসব থেকে সম্পূর্ণ দূরে। ফ্যাকাশে মুখে জানালার বাইরে অন্ধকারাচ্ছন্ন দুনিয়ায় দৃষ্টি রাখলো। অন্তরে তীব্র শূন্যতা। কানে বেজে চলেছে নিস্তব্ধতার সুর। মন বলে উঠলো.. সে এবং তার স্বামী মানুষটা যে গোলকধাঁধায় ফেঁ'সে গিয়েছে.. তার প্রতিটি দেয়াল যেন মিথ্যা এবং বিশ্বাসঘা'তকতায় তৈরি। ভয়ে কেঁপে উঠলো বুকের ভেতর। উনি জানেন এ বিষয়ে? জানেন বলেই কি ভাইয়ে ভাইয়ে অজ্ঞাত এক সুবিশাল দূরত্ব!

•

সন্ধ্যা নেমেছে ধরনীতে। মফস্বলের এক ব্যস্ত মোড়ে চায়ের দোকান। সোডিয়াম বাতির আবছা আলোয় দৃশ্যমান বেশকিছু মানুষ। কাঠের বেঞ্চিতে বসা তারা। দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক, সাম্প্রতিক আলাপচারিতায় ব্যস্ত। কোণার দিকে বসা এক তরুণ। কথা বলতে বলতে মোবাইল স্ক্রল করে চলেছে। ফেসবুকে হঠাৎ সামনে এলো একটা ভিডিও। কৌতূহলী হয়ে ভিডিও প্লে করলো সে। পুরো ভিডিও দেখে চক্ষু চড়কগাছ! ধাক্কা দিয়ে উঠলো পাশে থাকা মাঝবয়সী লোকটির বাহুতে। উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,

" আরে মামা! খাইছে। দেখো কি লিক হইছে। "

তরুণের উত্তেজিত কণ্ঠে বাকিরা চমকে গেল! চা খাওয়া থেমে গেল। একেকজন একেক প্রশ্ন করতে লাগলো,

" কি হয়েছে ভাগিনা? চিল্লাও ক্যা? "

" নতুন আবার কোন মুসিবত হইলো? "

" নেতানিয়াহু ম রে গেছে নাকি? "

তরুণ চোখমুখ কুঁচকে ফেললো,

" আরে না কেউ ম'রেনি। এই দেখো তোমরা। একদম ঝাঁকাস! "

" কই? দেখি দেখি। "

উত্তেজিত হয়ে উঠলো বাকিরা। তরুণ তাদের উদ্দেশ্যে মোবাইল ঘুরিয়ে দিলো। ভলিউম বাড়িয়ে দিলো। মনোযোগ সহকারে ভিডিওটা পরপর কয়েকবার দেখলো তারা। হতবিহ্বল হয়ে গেল!

" সর্বনাশ! ভাগিনা এইডা কি দেখাইলা তুমি? "

" ব্লকবাস্টার টিজার। "

চোখ টিপে দিলো তরুণ। একজন বয়স্ক লোক বলে উঠলো,

" একটার পর একটা লিক হচ্ছে। প্রথমে অডিও এখন আবার ভিডিও। কোনটা রেখে কোনটা বিশ্বাস করবো? "

" বিশ্বাস করার দরকার কি কাকু? বিনোদন নাও খালি। খেলছে ওরা। পিওর দর্শক আমরা। "

তরুণের কণ্ঠে আমোদ। উপস্থিত বাকি লোকগুলো কেমন গ্যাড়াকলে পড়ে গিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকে দাবানলের মতো শেয়ার হতে লাগলো এক মিনিট ঊনচল্লিশ সেকেন্ডের ভিডিও টা। স্তব্ধ হয়ে গেল দেশবাসী! চোখেমুখে অপার বিস্ময়! মির্জা তানসীভ শাহ্ এর তরফ থেকে ছোঁড়া প্রথম সংহারক বো-মা। ধামাকা না হলে চলে!

-

' নিউজ গ্লোবাল ' হেড অফিস। দেশের শীর্ষস্থানীয় এক জনপ্রিয় নিউজ চ্যানেল। অফিসের কেবিনে পিনপতন নীরবতা। দরদর করে ঘামছেন চ্যানেলের প্রধান মিডিয়া ম্যানেজার। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপ। স্ক্রিনে লুপ এ চলছে সে-ই লিক ফুটেজ। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে..

এক বিলাসবহুল শপিংমলের অন্ধকার বেইজমেন্ট। স্যুট বুট পড়ে দাঁড়িয়ে মধ্যবয়স্ক মিডিয়া ম্যানেজার। ওনার বিপরীতে হুডি পড়া ছদ্মবেশী একজন দাঁড়িয়ে। মিডিয়া ম্যানেজার বলে চলেছেন,

" আপনাদের আইটি টিম অডিও রেডি করেছে? "

" অলমোস্ট ডান। "

" বেশ। সময় হলে স্রেফ নক দেবেন। আমার টিম রেডি। দেখবেন চ্যানেলে চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজের ঝড় উঠবে। আমার চ্যানেল এমনভাবে নিউজ ডিজাইন করবে যে লোকে বিশ্বাস করতে বাধ্য। প্রাইম টাইম শো-তে মির্জা তানসীভ শাহ্ কে কি'লার প্রুফ না করে আমি ক্ষ্যান্ত দেবো না। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না যে অডিওটা ফেক। হা হা হা। "

হেসে উঠলো দু'জনে।

" আপাতত এতটুকু রাখুন। বাকিটা কাজ হলে পাবেন। "

অন্ধকার সেই বেইজমেন্টে অর্থ লেনদেন হলো দু'জনের। এতটুকুই দেখা যাচ্ছে এক মিনিট ঊনচল্লিশ সেকেন্ডের ভিডিওতে। রাতের আঁধারে মিডিয়া ম্যানেজারের অবয়ব অনেকখানি দৃশ্যমান। কণ্ঠস্বর স্পষ্ট। ভিডিও দেখে মিডিয়া ম্যানেজারের মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। পা'গলের মতো চেঁচিয়ে উঠলো সে,

" না না না। এসব মিথ্যা। এসব ফেক। বন্ধ করো এসব। "

রাগে, ক্ষোভে, আতঙ্কে উনি টেবিলের ওপর থাকা দামি ল্যাপটপ, কাঁচের পেপারওয়েট, ফাইলপত্র ছুঁড়ে মা'রলেন মেঝেতে। কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ওনার এতদিনের অর্জিত মান-সম্মান, ক্যারিয়ার, চ্যানেল টিআরপি। সব এক সেকেন্ডে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সব শেষ। সব! মির্জা তানসীভ শাহ্ কে ফাঁ'সানোর জন্য ওনার পুরো টিম দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা পরিশ্রম করে চলেছে। প্রতিটা প্রাইমটাইম শো-তে তানসীভকে খু'নী প্রমাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আজ এভাবে ওনার ভুয়া ফুটেজ লিক করলো কে? কার এতবড় দুঃসাহস! মির্জা তানসীভ শাহ্! ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন উনি। বুকের ওপর পাথরসম বোঝা। ঘেমেনেয়ে একাকার অবস্থা। সব শেষ হয়ে গেল ওনার। সব শেষ!

পুরো সিস্টেম এক লহমায় কাঁপিয়ে দিয়েছে মির্জা তানসীভ শাহ্। বাজিয়ে দিয়েছে নিজ রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের সুর। এসিপি সাদমান সিদ্দিকী নিজ কেবিনে বসা। ওনার হাতেও মোবাইল। পজ করা ভাইরাল ভিডিও ফুটেজ। সুনিপুণ ভঙ্গিতে মিডিয়ার আগ্রাসী মুখ বন্ধ করে দিয়েছে জুনিয়র মির্জা। যারা দিবারাত্রি তাকে অপরাধী প্রমাণ করতে ব্যস্ত ছিল। তারাই আজ নিজ অস্তিত্ব রক্ষা করতে মরিয়া। এরচেয়ে ভ'য়ঙ্কর প্রত্যাবর্তন আর কি হতে পারে? এসিপির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো দুর্বোধ্য হাসি।

•

ঘন অন্ধকার নেমেছে শহরের বুকে। রান্নাঘরে ব্যস্ত লাজুক। কাউন্টারের ওপর রাখা গোলাকার কাঁচের পাত্র। রাতের জন্য রুটি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। হাত দু'টো যান্ত্রিক ভাবে কাজ করে চলেছে। অত্যধিক দুশ্চিন্তায় কাতর মন। ডুবে রয়েছে গতকালের সে-ই ফোনালাপে। বড় ভাবীর মুখনিঃসৃত অমোঘ শব্দগুলো কানে কামড়ে ধরেছে যেন।

' সৎ ভাই কখনো আপন হয় নাকি? '

তানসীভ, রায়হান আপন ভাই নয়। সৎ ভাই! স্বামী মানুষটার এমন ভ'য়ঙ্কর অতীত কিছুতেই হজম করতে পারছে না লাজুক। ক্ষণে ক্ষণে অস্থির হয়ে পড়ছে অন্তঃস্থল। শ্বশুরের না জানি আরো কত কলুষিত অতীত রয়েছে! গুলবাহার মঞ্জিলের প্রতিটি ইট যেন রহস্যঘেরা। যত্রতত্র ছড়িয়ে কালো মেঘের হাতছানি। গভীর ভাবনায় ডুবে গেল রমণী। হাত ব্যস্ত আটার মণ্ডে। এক লহমায় বদলে গেল আবহ। পেছন থেকে দু'টো শক্ত, চওড়া হাত জড়িয়ে ধরলো লাজুকের কোমড়। মানুষটির প্রশস্ত-উদোম বুক লেপ্টে গেল সঙ্গিনীর পেলব পিঠের সঙ্গে। তপ্ত, ভারী নিঃশ্বাস আছড়ে পড়লো ঘাড়ের উন্মুক্ত ত্বকে। আকস্মিক এই পুরুষালি স্পর্শে শিউরে উঠলো লাজুক। বাঁধন মুক্ত হতে চাইলো। তবে পারলো না। মানুষটির অদম্য বাঁধন তাকে নিজের সাথে আরো নিবিড় ভাবে পিষে ফেললো। ক্ষণিকের জন্য নীরবতা। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো লাজুক,

" ঘুম হয়েছে? "

ঘাড়ে ডুবে গেল নাকমুখ। অস্ফুট স্বরে গুঙ্গিয়ে উঠলো সে,

" হু। "

মা'দকতায় আচ্ছন্ন কণ্ঠস্বর। হৃদয়ের গহীন অরণ্যে আঁচড় কাটলো। থেমে থেমে জানতে চাইলো রমণী,

" কিছু লাগবে? "

আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে গেল ঘাড়ে। সমতল রেখার ন্যায় স্পর্শগুলো বুলিয়ে গেল ত্বকে। অবশ হয়ে কেঁপে উঠলো রমণীর হাত। কোমড়ের ফাঁক গলিয়ে সঙ্গিনীর আটা মাখা হাত দুটোর ওপর নিজের হাত রাখলো তানসীভ। হাত দুটোকে নিজ মুঠোয় পুরে একসঙ্গে আটার মণ্ড মাখতে আরম্ভ করলো। দুই জোড়া হাতের যুগলবন্দীতে মণ্ডের অবস্থা নাজুক। নাজুক অবস্থা লাজুক মেয়েটিরও। ঘাড়, কাঁধে পুরুষালি ঠোঁটের অবিরাম মিঠে যন্ত্রনা। অন্যদিকে দু হাতের মুঠোবন্দী এই নৈকট্য। মিলেমিশে পাথরের ন্যায় জমে যাচ্ছে সে।

" ছাড়ুন না। "

কণ্ঠে ব্যকুলতা। নে'শালো তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে শিরায় শিরায়। আরো গভীরভাবে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নেয় সঙ্গিনীকে। মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে রমণী। ধীরে ধীরে নীলাভ দাগ ফুটে ওঠে গলার ভাঁজে। আটার মণ্ড অবহেলায় পড়ে রয়েছে যথাস্থানে। লাজুককে সম্মুখে ঘুরে দাঁড় করালো তানসীভ। দেহ দু'টো ছুঁই ছুঁই। অধিক নিকটে। রমণীর পড়নের ড্রেস পিঠের অংশ যথেষ্ট উন্মুক্ত। ধীরে ধীরে রূক্ষ হাত বুলিয়ে যায় সেখানে। এক হাতের অবাধ বিচরণ পিঠে। অপর হাত গলার ভাঁজে। মুখখানি টেনে নিলো আরো কাছে। আটায় মাখামাখি দেহের কিছু অংশ। গভীর, অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে মানুষটা। অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে লাজুক। বলশূন্য হয়ে পড়ছে শরীর। কাঁপছে অন্তঃস্থল। গলা বেয়ে হাত ধীরে ধীরে উঠে আসে চিবুকের নিচে। বৃদ্ধাঙ্গুল স্পর্শ করে নিচের ঠোঁট। কেঁপে ওঠে রমণীর চোখের পাতা। নে'শা ধরে যায় মানুষটির বক্ষস্থলে। প্রমত্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। আস্তে ধীরে হটে যায় মধ্যকার সর্বশেষ দূরত্ব। গোটা দুনিয়ার জটিলতা ভুলে দু'জনে বিভোর হয় এক অপার্থিব জাদুকরী আবহে।

•

রাত্রি বেলা। ঘরের লালচে আলো র'ক্তবর্ণ রূপ ধারণ করেছে যেন। কোনো ইংলিশ গান নয় আজ। স্রেফ গা ছমছমে নীরবতা। আরামকেদারায় শুয়ে রয়েছে সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি। নাম তার এস.কে। চোখের তারায় ফুটে উঠেছে রাগ, ক্ষোভ। সামনেই টেবিল। সেখানে ল্যাপটপে চলমান ভাইরাল ভিডিও ক্লিপ। মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই শব্দ ' বিশ্বাসঘাতকতা '। টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে ইনফর্মার লোকটা। তানসীভ, লাজুকের পেছনে নিযুক্ত ছিল সে। ভয়ে কাঁপছে লোকটার শরীর। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঝড়ছে ঘাম। হঠাৎই লোকটা হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে মেঝেতে। দুই হাত জোড় করে আকুতি জানায়,

" বিশ্বাস করেন বস। খোদার কসম। আমি.. আমি কিছু করি নাই। ওই ভিডিও আমি করি নাই। আমি নির্দোষ। বস! বস আমাকে বিশ্বাস করেন। আমি কিছু করি নাই। আমাকে ফাঁ'সানো হচ্ছে। ওই ওই... "

আর বলা হলো না লোকটার। এস.কে ঠাণ্ডা স্বরে বলে ওঠে,

" বেইজমেন্টে ওই দুইজন ছাড়া শুধু তুই ছিলি। ভিডিওতে দুইজনকেই দেখা গেছে। শুধু তুই নাই। "

কেঁদে উঠলো লোকটা।‌ আকুতিমিনতি জানাতে লাগলো,

" আমি কিছু করি নাই বস। ভিডিও আমি করি নাই। কিচ্ছু করি নাই আমি। একটু বিশ্বাস করেন। আপনার নুন খাইছি আমি। আমি.. "

আরামকেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এস.কে। এ মুহূর্তে তার মুখে কোনো রাগ নেই। বরং অদ্ভুতুড়ে-হিমশীতল শান্ত হাসি। সে হাসিতে পরাণপাখি উড়ে যায় লোকটার। ডুকরে কাঁদতে থাকে। এখনো হাত জোড় করে বসা। এস.কে ধীরপায়ে হেঁটে লোকটার সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছুটা ঝুঁকে পড়ে। নিচু, ফিসফিসে কণ্ঠে বলে,

" ঈমানদার লোক খুব পছন্দ করি আমি। আই.. লাইক দেম। কিন্তু বেঈমান? উঁহু.. বেঈমানদের আমি এই পৃথিবীতে রাখি না। "

" বস.. "

আর একটাও শব্দ নয়। মুহুর্তের মধ্যেই ধারালো, ভ'য়ঙ্কর ছু-রিটা গেঁথে যায় ঠিক কপালের মধ্যখানে। ফিনকি দিয়ে র"ক্ত ছিটকে পড়ে এস.কে'র চোখেমুখে। গেঁথে যাওয়া ছু'রিটা ডানে বামে নৃ'শংসভাবে মোচড়াতে থাকে সে। ফোঁটা ফোঁটা র-ক্তে রঞ্জিত হয় মুখ। স্তব্ধ চোখ জোড়া ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যায়। লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। গলা বরাবর বুট পরিহিত পা চেপে ধরে এস.কে। পিষে পিষে ভেঙে দেয় গলার হাড়। র'ক্তে ভিজে যায় দামী কার্পেট। ঘরে উপস্থিত বাকি তিনজন লোক নির্বিকার দাঁড়িয়ে। নিত্যনৈমিত্তিক সাধারণ চিত্র এ। এস.কে স্বল্প নিচু হয়ে মৃ"তদেহের দিকে তাকালো। তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই। নেই কোনো ছটফটানি। হাত ফসকে পড়ে যায় ছু'রি। পরম শান্তিতে পকেট হতে সিল্কের মোলায়েম রুমাল বের করে। আস্তে ধীরে মুছে নেয় র"ক্তমাখা মুখ। মুছতে মুছতে একপর্যায়ে থেমে যায় হাত। হিং'স্র পশুর ন্যায় চাহনি। বিড়বিড় করে উঠলো সে,

" খেলবো এবার র'ক্তের হোলি। "

•

সকাল থেকেই শরীর খারাপ লাগছে আফসানার। ম্যাজম্যাজ করছে।‌ কোমড় বরাবর সূক্ষ্ম যন্ত্রনা সূচের ন্যায় ফুটছে। একদণ্ড শান্তি মিলছে না। মেক্সি পরিহিতা নারী ঘরজুড়ে আস্তে ধীরে হাঁটতে লাগলো। দম কেমন বন্ধ হয়ে আসছে। বুকের ভেতর পাথরসম বোঝা অনুভূত হচ্ছে। ঘেমে যাচ্ছে শরীর। হাঁটতে হাঁটতে পাশের রুমে গেল আফসানা। শাশুড়ি বিছানায় বসা। চোখ বুঁজে তাসবিহ গুনে চলেছেন। আফসানা এসে আস্তে ধীরে বিছানায় বসলো। অসহায় কণ্ঠে ডেকে উঠলো,

" মা! "

চোখ মেলে তাকালেন মা।

" কি হইছে? খারাপ লাগে এহনো? "

" কেমন যেন লাগছে মা। দম বন্ধ হয়ে আসছে। "

" পেটে, পিঠে ব্যথা করে? "

" কোমড়ের দিকে হালকা একটু অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। "

" ও কিছু না। এহনো তো ডেটের কয়দিন বাকি আছে। শেষ সময় এমন একটু আধটু লাগে। ঠিক হইয়া যাইবো। আল্লাহ্ রে ডাকো। "

মা তেমন গুরুত্ব দিলেন না। মলিন চোখে তাকিয়ে রইলো আফসানা। এমন অস্বস্তি হচ্ছে কেন? বেবির নড়াচড়া তো আলহামদুলিল্লাহ্ ঠিক আছে। প্রসব বেদনাও মনে হচ্ছে না। তাহলে? আফসানা আস্তে করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। পেটে আলতো করে রাখলো হাত। সতর্ক পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মা তখনো তাসবীতে মগ্ন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অস্বস্তি রূপ নিলো প্রচণ্ড ব্যথায়। পিঠ ফুঁড়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণায়। দুপুর গড়িয়ে ব্যথা আরো বৃদ্ধি পেল। বিছানার চাদর মুঠোবন্দী করে ছটফট করে চলেছে আফসানা। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম। মা এই অবস্থায় ঘাবড়ে গেলেন। এটা তবে সত্যিই প্রসব বেদনার ইঙ্গিত? কিন্তু ডেট তো এখনো ক'দিন বাকি।

" ইয়া আল্লাহ্! "

অসহায় কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো আফসানা। যন্ত্রনায় নীল রগ ভেসে বেড়াচ্ছে ত্বকে। পুত্রবধূর নিদারুণ যন্ত্রণা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন শাশুড়ি মা। তড়িঘড়ি করে ছুটলেন বেড সাইড টেবিলের কাছে। কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল তুলে নিলেন। কল করলেন ছেলেকে। প্রথমবার কল হয়ে কেটে গেল। অফিস টাইম। ব্যস্ত ছেলেটা। আল্লাহ্! একা একা কিভাবে সবটা সামলাবেন তিনি? অসহায় বয়স্কা নারী কেঁদে উঠলেন। রবকে স্মরণ করে দ্বিতীয়বারের মতো কল করলেন ছেলেকে। আফসানার যন্ত্রণাবিদ্ধ চিৎকার তখন ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে বাতাসে।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন