ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

২৪তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[২৪]

" আল্লাহ্! "

হসপিটালের লেবার রুম। আফসানার যন্ত্রনা কাতর আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়েছে রুমে। পেট ছিঁড়ে ফুঁড়ে যাচ্ছে বেদনায়। বিছানার চাদর শক্ত করে মুঠোবন্দী। আধম'রা জীবের ন্যায় কাতরাচ্ছে আফসানা। ঘামে ভিজে গিয়েছে শরীর। হন্তদন্ত ভঙ্গিতে করিডোরে ছুটে এলেন মা সুমনা বেগম। ফ্যাকাশে হয়ে গেছে চেহারা। লেবার রুমের সামনে শাহেদ ও তার মা দাঁড়িয়ে। সুমনা বেগম ছুটে এলেন এদিকে। কাঁপা গলায় জানতে চাইলেন,

" শাহেদ। বাবা, আমার মেয়ে? "

অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো শাহেদ,

" লেবার রুমে। "

আতঙ্কে চুপ হয়ে আছে মানুষটা। ঘেমে যাচ্ছে মুখখানা। পাশ থেকে মা বললেন,

" আল্লাহ্ রে ডাকেন বেয়াইন। সব ঠিক হইয়া যাইবো।‌ "

লেবার রুম থেকে ভেসে এলো বড় মেয়ের অবর্ণনীয় কষ্টদায়ক গোঙানি। তীব্র আর্তনাদ। সুমনা বেগমের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। আলতো করে হাত রাখলেন দেয়ালে। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু ঝড়তে লাগলো।

" হে আল্লাহ্! আমার মেয়ের কষ্টটা একটু কমিয়ে দাও। সহ্য ক্ষমতা বাড়িয়ে দাও আল্লাহ্। আমার নাতি-নাতনিকে সুস্থভাবে দুনিয়ায় পাঠাও। দয়া করো মাবুদ। "

ভেতরে ক্ষণে ক্ষণে আফসানার আর্তনাদ। স্ত্রীর এই চরম অসহায়ত্ব, যন্ত্রনা সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়েছে শাহেদ। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। র'ক্তক্ষরণ হচ্ছে। বলশূন্য হয়ে পড়ছে শরীর। এখানে এই আর্তনাদের ভীড়ে আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। দুর্বল পায়ে সেখান থেকে সরে গেল শাহেদ। গন্তব্য পাশ্ববর্তী মসজিদ। আসরের ওয়াক্ত পেরিয়ে যাচ্ছে। রবের দরবারেই একমাত্র শান্তি মিলবে। মিলবে সকল কষ্টের সমাধান।

-

বিগত কয়েকঘণ্টা যেন এক যুগের মতো দীর্ঘ কাটলো। লেবার রুমে এখনো যন্ত্রনারা ভেসে বেড়াচ্ছে। ওয়েটিং চেয়ারে পাশাপাশি বসা দুই বেয়াইন। আবেগতাড়িত হয়ে আছেন। তসবীহ পড়ে চলেছেন শাহেদের মা। লাজুক লেবার রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে। ইফরাত পাশেই। মিনিট পাঁচেক আগে এসেছে সে। আফসানার সঙ্গে পরিচয় স্বল্প মুহূর্তের। তবুও পরিবারের একজন সে। ছোট জায়ের বোন। না এসে পাড়লো না সে। লাজুক কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। অনবরত রবের নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করে চলেছে। ভিজে যাচ্ছে চোখ। ব্যথা হচ্ছে বুকে। অবশেষে সে-ই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এলো। নবজাতকের মধুরতম কান্নার ধ্বনি ভেসে এলো লেবার রুম থেকে। উপস্থিত সকলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো।

" বেয়াইন! "

দুই বেয়াইন আবেগাপ্লুত হয়ে একে অপরকে সৌজন্যমূলক আলিঙ্গন করলেন। দীর্ঘক্ষণ যাবত চাপিয়ে রাখা দমটুকু এবার ছাড়লো লাজুক। গাল বেয়ে পড়লো অশ্রু। ইফরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুখকর হাসলো।‌ মহান রবের অশেষ কৃপা, ডাক্তারদের অক্লান্ত চেষ্টা। এছাড়া আফসানার অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোর। নরমাল ডেলিভারিতে ফুটফুটে সন্তান জন্ম দিয়েছে সে। অস্ত্রপাচারের প্রয়োজন পড়েনি। শাহেদ সদ্য মাগরিবের নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে ফিরেছে। টুপি খুলে পকেটে রাখছিল। তখনই খেয়াল করলো আনন্দঘন পরিবেশ। বুকের মাঝে এক পশলা বৃষ্টি নেমে এলো। দ্রুত পায়ে ছুটে এলো সে। ডক্টর সে মুহূর্তে লেবার রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। হাসিমুখ ওনার। উপস্থিত সকলে উদগ্রীব হয়ে ছুটে গেল।

" ডক্টর! আমার ওয়াইফ কেমন আছে? "

" আমার মেয়ে, নাতি/নাতনি ঠিক আছে তো? "

" নাতি হয়েছে নাকি নাতনি? "

একেকজনের একেকরকম প্রশ্ন। মহিলা ডক্টর মুচকি হেসে উঠলেন। লাজুক চুপটি করে উদগ্রীব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। লালচে হয়ে উঠেছে মুখশ্রী। ডক্টর হাস্যোজ্জ্বল মুখে সুসংবাদ জানালেন,

" কংগ্ৰাচুলেশনস শাহেদ সাহেব! আপনার স্ত্রী একটি ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ্ মা এবং বাচ্চা দুজনেই একদম সুস্থ আছে। "

আনন্দে কেঁদে উঠলো লাজুক। মা আলতো করে ওকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুপাত করলেন। শাহেদের মা উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন,

" আলহামদুলিল্লাহ্ আলহামদুলিল্লাহ্। নাতি হইছে আমার। শাহেদ! খোকা তুই বাপ হয়ে গেছিস। "

শাহেদ থমকে দাঁড়িয়ে। বুকে লুকায়িত সমস্ত ভয় যেন এক নিমেষে অপার্থিব স্বস্তিতে রূপ নিলো। চোখে অশ্রু। ঠোঁটে খুশির ছোঁয়া। অন্তরে রবের প্রতি সীমাহীন কৃতজ্ঞতা। তার মা বিগলিত হয়ে উঠলেন,

" ডাক্তার, আমার নাতিরে দেখতে পারি? "

" এখন নয় খালাম্মা। কিছু চেকআপ বাকি আছে। ইনশাআল্লাহ্ এরপর আপনার নাতি আপনার কোলে দেয়া হবে। "

" আচ্ছা আচ্ছা। "

ডক্টর চলে গেলেন। পাশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়লো শাহেদ। দু হাতের তালুতে ঢেকে ফেললো মুখ। অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আলহামদুলিল্লাহ্ আলহামদুলিল্লাহ্ আলহামদুলিল্লাহ্!

•

রাত প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। ছিমছাম আধুনিক কেবিনের ভেতর শান্ত, নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে দৃশ্যমান নিঝুম আসমান। ঘুমে বিভোর ক্লান্ত আফসানা। পাশে বসে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে লাজুক। আজ রাতটা হসপিটালে থাকা হবে। ইনশাআল্লাহ্ আগামীকাল সকালে ডিসচার্জ দেয়া হবে আপুকে। পরিবারের সদস্যদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রয়ে গেছে শুধু লাজুক, শাহেদ। লাজুক বোনের সঙ্গে এই কেবিনেই থেকে গেল।‌ দুই বোনকে স্পেস দিতে শাহেদ জায়গা করে নিলো হসপিটালের নামাজ এরিয়ায়। বোন ঘুমিয়েছে। আরামে ঘুমাচ্ছে সে। এটা নিশ্চিত হয়ে লাজুক আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো। পাশের ছোট দোলনায় তখন ঘুমিয়ে নতুন অতিথি। ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণ। হাঁটি হাঁটি পায়ে লাজুক দোলনার পাশে এলো। তাকালো ভাগ্নের দিকে। একদম ছোট্ট, আদুরে পুতুলের ন্যায় বাবুটা। লাল টুকটুকে ঠোঁট। কপাল, ঠোঁট দেখতে একদম আপুর মতো হয়েছে। বাকিটুকু কি ভাইয়ার মতো? হয়তো। কি যে আদুরে ছানাটা! আরাম করে ঘুমিয়ে আছে। বাচ্চাটা ভারী শান্ত। একটুখানি শরীর। কোলে নিতেই কেঁপে ওঠে হাত।‌ লাজুক প্রথমবার কোলে নেয়ার স্মৃতিচারণ করে কেমন শিউরে উঠলো। আল্লাহ্! এই পুঁচকে একদিন বড় হয়ে যাবে। আধো আধো বুলিতে কথা বলবে। এরপর একদিন ম্যাচো ড্যাশিং ম্যান হয়ে যাবে। খালুর মতো? ভাবনাটা বোধগম্য হতেই কেঁপে উঠলো শরীর। আস্তে করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো লাজুক। মুচকি হেসে সরে গেল। কেবিনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো। সোফায় গিয়ে বসলো সে। আজ রাতের জন্য এটাই তার শয্যা স্থান। বিগত ঘন্টাব্যাপী উত্তেজনা, মানসিক চাপের পর অবশেষে একটু স্বস্তি পেল। পরিহিত হিজাব খুলে একপাশে রাখলো রমণী। ওড়না ভালোমতো শরীরে জড়িয়ে নিলো। মনের ভেতর উপচেপড়া আনন্দ।‌ একজনের সঙ্গে কথা বলার মতো মন প্রাণ টাস টাস করে চলেছে। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। এবেলা অবধি নিঃসন্দেহে জেগে রয়েছে সে। লাজুক পাশে থাকা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলো। কল করলো কাঙ্ক্ষিত নম্বরে। কল বেজে চলেছে। বেজে চলেছে। কেটে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে রিসিভ হলো। ওপাশ হতে গম্ভীর, চিরচেনা সেই পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

" হু? "

একান্ত আপন মানুষটির কণ্ঠস্বর শুনে লাজুক তার অন্তর্মুখী স্বভাব হারিয়ে ফেললো যেন। খুশিতে আত্মহারা হয়ে এক নিঃশ্বাসে ভাগ্নে জন্মগ্রহণের সুসংবাদ জানালো। কণ্ঠে জড়ানো চপলতা, ওপাশ হতে স্পষ্ট টের পেল তানসীভ।

" বাবুটা এত্ত ছোট! ওর ছোট ছোট হাত-পা। কোলে নেয়ার সময় আমার কি যে ভয় লাগছিল! মনে হচ্ছিল এই বুঝি পড়ে যাবে। আও আও করে কেঁদে উঠবে। "

খুশিতে ভরে গেল মন। একটু থেমে সংকোচের সহিত বললো,

" আপনি.. আসবেন না? বাবুকে দেখবেন না একবার? "

ফোনের ওপাশে নীরবতা। শুধুমাত্র ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙ্গুল চালানোর মৃদু শব্দ। অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে মাত্র এক শব্দে পরিস্থিতি জানান দিলো মানুষটি,

" বিজি! "

এক শব্দের শুকনো, নিরুত্তাপ জবাবে ম্লান হয়ে গেল লাজুকের মুখখানি। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো অভিমান। এত বড় খুশির দিনেও মানুষটা হৃদয়হীনের মতো আচরণ করছে? মোবাইলটা শক্ত থাবায় চেপে ধরলো রমণী। গাল ফুলিয়ে অভিমানী সুরে বললো,

" বুঝি বুঝি।‌ সবটাই বুঝি আমি। হৃদয়হীন এই মানবের সকল ব্যস্ততা শুধু আমারই জন্য। দিনকে দিন পাথরের মতো অনুভূতিশূন্য হয়ে উঠছেন। পঁচা আপনি। "

প্রথমবারের মতো এমন শিশুসুলভ আচরণ। কণ্ঠে আকাশছোঁয়া অভিমান। ওপাশে ব্যস্ত মানুষটির ঠোঁট সামান্য প্রসারিত হলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো কৌতূকপূর্ণ হাস্যরেখা। মোবাইলটা ধরে আরেকটু নিচে নামালো। গভীর, সম্মোহনী স্বরে জানিয়ে দিলো অকাট্য এক সত্য।

" হৃদয়ের সবটুকু অনুভূতি লিখেছি.. শুধু একজনের নামে। "

অপ্রত্যাশিত, মোহাবিষ্ট এই মন্তব্যে এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল লাজুক! গলার কাছে আটকে গেল শব্দেরা। লজ্জায়, অকল্পনীয় সুখে রঙিন হলো মুখ। ওপাশে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। হঠাৎই ক্ষুদ্র এক ধ্বনি। কেটে গেল ফোনটা। হতবিহ্বল হয়ে সোফায় পড়ে রইলো রমণী! চুমুর সে-ই দুষ্টু ধ্বনি কানে ঝাঁ ঝাঁ করে চলেছে। ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এলো বুক কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস। আনমনে ফোনটা চেপে ধরলো বুকে। ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে শরীর। লজ্জালু রঙ মেখেছে পুরো চেহারায়।

•

নির্জন সড়কে কেমন থমথমে আবহ। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা। সাদা প্রিমিও গাড়ির পেছনের সিটে বসা লাজুক। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। পুচুটাকে ছেড়ে কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর আদরে যত্নে লুকিয়ে রাখবে সোনাটাকে। কি যে আদুরে হয়েছে বাবুটা! মাশাআল্লাহ্! ছোট ছোট হাত-পা গুলো ধরে শুধু আদর করতে মন চায়। ভাগ্নেকে ঘিরে আদুরে-আহ্লাদী নিজ ভাবনায় বিভোর রমণী। তার অগোচরে পিছু পিছু আসছে কুচকুচে কালো রঙের দশ চাকার ডাম্প ট্রাক। প্রায় পনেরো মিনিট যাবত আঠার ন্যায় পিছু পড়েছে। লাজুক এতক্ষণ ভাবনায় ডুবে ছিল। খেয়াল করেনি। আস্তে ধীরে স্বাভাবিক হলো সে। বিগত দিনের কথা স্মরণ করে সন্দেহ জাগলো মনে। কি ভেবে যেন পেছনে ঘুরে তাকালো। শীতল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো অন্তরে। রতন ভাই যখন ডান লেনে গাড়ি নিচ্ছেন। ট্রাকটাও ঠিক তাই করছে। ডানে, বামে। সুনিপুণ ভঙ্গিতে পিছু করে চলেছে। দানবাকার ট্রাকটি ম-রণঘাতী ফাঁ'দের ন্যায় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। রমণীর নিশ্বাস দ্রুত হলো। ঘেমে গেল মুখ। ফ্যাকাশে মুখখানি রিয়ার ভিউ মিররে লক্ষ্য করলো রতন। দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং হুইল আয়ত্তে নিলো। রিয়ার ভিউ মিররে পুনরায় সুক্ষ্মভাবে মেপে নিলো দশ চাকার মরণফাঁ'দ। অনড় স্বরে বলে উঠলো,

" ভয় পাইয়েন না ভাবী। এই হা'লারা আপনার গায়ে একটা আঁচড়-ও কাটতে পারবো না। আল্লাহ্ ভরসা। "

উদ্যোমী স্বরে রবের প্রতি ভরসা প্রকাশ করলো রতন। হাইওয়ের এক শুনশান, জনমানবহীন রাস্তায় ঢুকে পড়লো গাড়ি। ঠিক তখনই ভ'য়ঙ্কর রূপ ধারণ করলো ডাম্প ট্রাক। কোনোরূপ হর্ন না দিয়ে দা'নবীয় ভঙ্গিতে গতিবেগ বাড়িয়ে দিলো। বিশাল হাই-বিম লাইটগুলো যেন প্রিমিও গাড়িকে কালবৈশাখী অন্ধকারে ছেয়ে ফেললো। আরম্ভ হলো রুদ্ধশ্বাস ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। রতন হার মানতে নারাজ। এক্সিলারেটরে পা চেপে ধরলো। স্পীডোমিটারের কাঁটা ১০০-১২০-১৪০ ছুঁয়ে ফেললো। কিন্তু ধাওয়ারত ডাম্প ট্রাকের চালক যেন আজ সাক্ষাৎ কোনো জ'ল্লাদ। এক চুল পরিমান গতি কমালো না সে। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে তেড়ে আসছে ট্রাক। প্রিমিও-র বাম্পারে ধাক্কা দেয়ার অবিরাম প্রচেষ্টা। পেছনের সিট আঁকড়ে ধরে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো লাজুক। অনবরত কাঁপছে ঠোঁট। স্মরণ করে চলেছে রবকে। বাতাসে তখন ইঞ্জিনের গর্জন। পিচঢালা সড়কে টায়ারের বিপজ্জনক ঘর্ষণ। সে এক ভয়ানক- শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য!

-

বিল্ডিংয়ের গ্যারেজে এসে থামলো গাড়ি। দুপুরের মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে চারপাশে। গাড়ির দরজা খুলে দিলো শাহেদ। অত্যন্ত সাবধানী ভঙ্গিমায় স্বামীর হাত ধরে গাড়ি থেকে নেমে এলো আফসানা। শাহেদ আলতো করে কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট প্রাণকে বুকে জড়িয়ে নিলো। আফসানা দুর্বল শরীরে দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে পরম তৃপ্তির ছোঁয়া।

" এসো। "

এক হাতে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রাখা। অপর হাতে স্ত্রীকে আগলে নিলো শাহেদ। দু'জনে অগ্রসর হলো তাদের ফ্ল্যাটে। ধীরপায়ে ফ্লাটে প্রবেশ করলো আফসানা। বিস্ময়ে অভিভূত হলো চোখের পলক! পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে মনোমুগ্ধকর, ছিমছাম, ভালোবাসায় জড়ানো সারপ্রাইজ! সোফার ওপর এবং সিলিং থেকে ঝুলে আছে হালকা নীল, সাদা রঙের একরাশ বেলুন। ঘরের ঠিক মাঝখানের দেয়ালে সুতো দিয়ে পরম যত্নে গাঁথা নীল রঙের কাগজের হরফ। তাতে লেখা,

" ওয়েলকাম হোম, লিটল প্রিন্স অ্যান্ড মাই সুপার ওম্যান।"

সেন্টার টেবিলে রাখা আফসানার প্রিয় রজনীগন্ধা তোড়া। একগুচ্ছ লাল গোলাপ। স্বামীর এই অপ্রত্যাশিত, গভীর ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো আফসানা। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো আনন্দ অশ্রু। শাহেদের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার স্বর্গীয় হাসি উপহার দিলো সে। বিনিময়ে সুখকর হাসলো শাহেদ। স্ত্রীর কপালে চুমু এঁকে দিলো। স্বল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে মা। অগোচরে মুখ বাঁকিয়ে ফেললেন। পুত্রবধূর জন্য এমন আয়োজন চোখে বিঁধছে ওনার। বেলুন টাঙানো, ফুলের তোড়া। যত্তসব ঢঙ!

" একখান পোলা জন্ম দিতে না দিতেই এমন ঢঙ! সামনে না জানি আর কি কি করে! "

অজান্তেই ওনার বুকের ভেতর ঈর্ষার ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। অসন্তোষের সহিত সেখান থেকে চলে গেলেন উনি।

-

শুনশান সড়কের এক মোড়। অকল্পনীয় ভ'য়ঙ্কর রূপ ধারণ করলো ডাম্প ট্রাক। কোনো ব্রেক চাপলো না। অমানুষিক হিং'স্রতায় তেড়ে এলো। সরাসরি প্রচণ্ড এক ধাক্কা দিলো সাদা গাড়িটার পেছনে। কান ফাটানো ধ্বনিতে কেঁপে উঠলো গোটা হাইওয়ে। তীব্র-বিধ্বংসী ধাক্কার চোটে সাদা গাড়িটা রাস্তা থেকে ছিটকে গেল। শূন্যে ডিগবাজি খেল তিনবার। অতঃপর উল্টো হয়ে পিচ ঢালা সড়কে আছড়ে পড়লো নি'র্মমভাবে। মুহূর্তের মধ্যে দুমড়ে-মুচড়ে এক দলা লোহার আবর্জনায় রূপ নিলো গাড়িটা। গাড়ির ইঞ্জিন থেকে বের হতে লাগলো দমবন্ধকর কালো ধোঁয়া। আগুনের ফুলকি। অদূরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে দশ চাকার ডাম্প ট্রাক। সাইলেন্সার পাইপ দিয়ে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। মেঘলা আকাশের নিচে অত্যন্ত পৈ'শাচিক সে উপস্থিতি! ক্ষুদ্র এক মেসেজ পৌঁছালো এস.কে'র নিকটে,

" মিশন সাকসেসফুল। খাঁচায় ডানা ভেঙে পড়ে আছে পাখি। "

•

আকাশ ভেঙে নামছে ঝুম বৃষ্টি। কালো মেঘলা চাদর জড়িয়ে আকাশের বুকে। গুলবাহার মঞ্জিলের লিভিংরুমে মর্মান্তিক আহাজারি। সুমনা বেগম হাউমাউ করে কেঁদে চলেছেন।

" ও আল্লাহ্! আমার মেয়েটা! এ কোন জাহান্নামে আনলা ওরে? ওরে বাঁচাও আল্লাহ্! আমার বাচ্চাটাকে দয়া করে বাঁচাও। "

ইফরাত পাশেই বসা। কাঁদতে কাঁদতে ওনাকে শান্ত করার চেষ্টা করে চলেছে। এক কোন বিধ্বং'সী ঝড় ধেয়ে এসেছে তাদের জীবনে! একে একে সবটা নিঃশেষ করে দিচ্ছে। রায়হান বেশ কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে। একের পর এক ফোনকল করে চলেছে। কোনো সুরাহা মিলছে না। সবটা আউট অফ কন্ট্রোল। এভাবে কিভাবে হতে পারে? ড্যাম ইট! মেজাজ ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে রায়হান। অন্ধকার জগৎ থেকে চিরকাল দূরে থেকেছে সে। আজ অজান্তেই সে-ই অন্ধকার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে সবটা ঠিক হবে? আদৌও কি কিছু ঠিক হবে? যা ঘটছে তা যে স্বাভাবিক কিছু নয়। বড্ড অস্বাভাবিক। অতিপ্রাকৃতিক!

" তোমার দেবরকে বিশ্বাস করেছিলাম আমি। আমার আদরের মেয়েটাকে ভরসা করে তুলে দিয়েছিলাম। ভুল করেছিলাম আমি। পাপ করেছিলাম। তোমার ওই খু-নী দেবর আমার মেয়ের যোগ্য না। যোগ্য না ওই গু'ণ্ডাটা। আমার মেয়েকে মে'রে ফেললো ও। শেষ করে দিলো। ওরে লাজুক! লাজুক মা আমার! মায়ের বুকে ফিরে আয় মা। ফিরে আয় না মা। "

ইফরাত পাশে বসা। তার উদ্দেশ্যে কাঁদতে কাঁদতে একাধিক অভিযোগ করে চলেছেন সুমনা বেগম। সর্বশেষ ফোনকলেও কোনো সুরাহা মিললো না। উত্তপ্ত মেজাজে পায়চারি করে চলেছে রায়হান। তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন জহুরুল সাহেব। থমথমে মুখ। বড় ছেলের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলেন,

" কোনো খোঁজ পেলে? "

চোখ বুঁজে শ্বাস ফেললো রায়হান। নিজেকে কোনোমতে ধাতস্থ করে স্বল্প শব্দে জবাব দিলো,

" না। "

" না মানে কি? দিনদুপুরে এসব কি হচ্ছে? "

নিজেকে আর সামলাতে পারলো না রায়হান। জীবনে প্রথমবারের মতো বাবার সামনে উঁচু গলায় কথা বলে উঠলো,

" এসব কি হচ্ছে সেটা তো আমার চেয়ে ভালো তোমার জানার কথা। এই অন্ধকার জগতের অধিপতি তুমি। সব তোমার নখদর্পণে। আজ আমাকে জিজ্ঞেস করছো কি হচ্ছে এসব? তোমাদের পাপের শাস্তি পাচ্ছে একটা নিষ্পাপ মেয়ে। ওই যে দেখতে পাচ্ছো। মেয়েটার মা সে-ই কখন থেকে আহাজারি করে চলেছে। ওনাকে এখন কি জবাব দেবে? স্ক্রিপ্ট রেডি করেছো? নাকি সেটাও আমাকে রেডি করতে হবে? বলো? "

চরম আশ্চর্যান্বিত হলেন জহুরুল সাহেব! রাগের চোটে ফুলে উঠলো নাকের ডগা। ধমকে উঠলেন ছেলেকে।

" রায়হান! মুখ সামলে কথা বলো। "

" স্যরি আব্বা। আজ আর নিজেকে সামলাতে পারছি না। প্লিজ লিভ মি অ্যালোন। নাহলে খারাপ কিছু একটা হয়ে যাবে। "

কথাটা শেষ করে রায়হান গিয়ে দাঁড়ালো লিভিংরুমের বড় জানালা বরাবর। বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। আসমান কাঁপিয়ে ঝড় হচ্ছে আজ। প্রকৃতি অত্যন্ত অশান্ত। ঝড়ো হাওয়ার দাপটে এঁকেবেঁকে যাচ্ছে বড়বড় গাছপালা। কোথায় সমাপ্তি এই ঝড়ের? বড় ছেলের থেকে এমন অপ্রত্যাশিত আচরণে জহুরুল সাহেব হতবাক! রাগে ক্ষোভে মুখ লাল। লিভিংরুমে ঘুরে তাকালেন উনি। বাধ্যগত কর্মচারীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আমিরুল সাহেব। ভারাক্রান্ত মুখাবয়ব। নীরবে একটাই অভিযোগ করে চলেছেন যেন,

" আপনাকে ভরসা করেছিলাম স্যার। "

জহুরুল সাহেব অসন্তোষের সহিত দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। বুকের ভেতর মোচড় দিচ্ছে অজানা আশঙ্কা। নিজেকে শান্ত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন উনি। কি হচ্ছে এসব?

গুলবাহার মঞ্জিলের পরিবেশ গুমোট। অপরদিকে মির্জা তানসীভ শাহ্ এর মোবাইলে এলো অজ্ঞাত এক বার্তা।

' ওয়ান-জিরো। দ্যাট ওয়াজ জাস্ট দ্য ট্রেইলার। '

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন