ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

২৫তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[২৫]

বাইরে ঝুম বৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়ার দাপট। নির্জন রেস্টহাউসের অভ্যন্তরীণ চিত্র ভিন্ন। বড় শান্ত। নিঝুম। মৃদু তালে উড়ছে জানালার পর্দা। বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে এক রমণী। ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল। অল্প কিছু চুল ঢেকে রেখেছে কপালের এক পাশ। কপালের উন্মুক্ত ত্বকে ছোট ট্যাপ ব্যান্ডেজ। সহসা খুলে গেল ঘরের দরজা। কোনোরূপ অযাচিত শব্দ হলো না। ধীরপায়ে, নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করলো মানুষটা। রমণীর শিয়রের কাছে এসে দাঁড়ালো। পড়নে নেভি ব্লু শার্ট। হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। এলোমেলো চুল। সঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে রইলো তানসীভ। ধীরে ধীরে হিং'স্র চাহনি অতীন্দ্রিয় মায়ায় নরম হয়ে এলো। বেডের পাশে সাবধানী ভঙ্গিমায় হাঁটু গেড়ে বসলো সে। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিলো। পরম মমতায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো স্ত্রীর মাথায়। এলোমেলো চুলগুলো যত্ন করে কানের পাশে গুঁজে দিলো। হাতের রুক্ষ গাঁট ছুঁয়ে গেল রেশমি চুলের কোমলতা।

নির্বাক তাকিয়ে মির্জা তানসীভ শাহ্। এই প্রথম.. সত্যিকার অর্থে ভয় পেয়েছে সে। বুকের ভেতর জমায়েত ভয়টুকু কোনো বুলেট, ছু'রি কিংবা মৃ'ত্যুকে ঘিরে নয়। বরং আপনজনকে হারিয়ে ফেলার। যে মানুষটা অজান্তেই তার অন্ধকার জীবনের একমাত্র নূর হয়ে উঠেছে। চোয়াল শক্ত মানুষটার। অথচ ভেতরে ভেতরে কাঁপছে প্রতিটি স্নায়ু। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারতো আজ। ডামি গাড়ির ফাঁদ যদি সময়মতো কাজ না করতো? যদি সুক্ষ্ম হিসাবটুকু একটুও এদিক-সেদিক হয়ে যেতো? যদি বি'স্ফোরণের ভ'য়ঙ্কর আগুনে এই নিষ্পাপ মুখখানি চিরদিনের মতো নিভে যেতো! বী'ভৎস কল্পনাটুকুও সহ্য হলো না তার। বুকের ভেতর কেউ যেন নি'ষ্ঠুর মুঠো পাকিয়ে ধরলো হৃদপিণ্ড। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো। এত বছর ধরে অসংখ্য বিপদকে ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করেছে সে। মৃ'ত্যু ভয়কে হেসেখেলে উপহাস করেছে। কিন্তু আজ..? আজ মৃ'ত্যুকে নয়, বরং মৃ'ত্যুর ভয়াবহ সম্ভাবনাকেই ভয় পেল। নিজের জন্য নয়। শুধুমাত্র এই ঘুমন্ত রমণীর জন্য। মহান রবের অশেষ রহমতে অক্ষত সঙ্গিনী। তবুও সঙ্গিনীকে হারিয়ে ফেলার তীব্র ভয় অন্তরে জেঁকে বসেছে। ক্ষণে ক্ষণে মোচড় দিচ্ছে বক্ষমাঝে। তানসীভ আস্তে করে কিছুটা ঝুঁকে গেল লাজুকের ফ্যাকাশে মুখাবয়বে। দু'ভ্রুয়ের মধ্যিখানে দীর্ঘ, গভীর চুমু এঁকে দিলো। তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল লাজুকের কপাল। ঘুমন্ত রমণীর ঠোঁটের কোণে স্বস্তির আভাস ফুটে উঠলো। যেন অবচেতন মনে একান্ত আপন মানুষটির অস্তিত্ব অনুভব করতে পারলো। দীর্ঘ চুমু এঁকে তানসীভ ঠোঁট জোড়া নামিয়ে আনলো নিচে। ঘুমে মগ্ন স্ত্রীর কোমল ঠোঁটে আলতো স্পর্শ এঁকে দিলো। ক্ষণস্থায়ী সে স্পর্শ। অস্ফুট, ভাঙা স্বরে বলে উঠলো তানসীভ,

" ঘুমাও নূর। আমি আছি তো। "

-

শুনশান সড়কে আজ ভ'য়ঙ্কর মরণফাঁ'দ হতে বেঁচে ফিরেছে লাজুক নূরাইন। পিচ ঢালা সড়কে তখন দানবাকৃতির ডাম্প ট্রাক দু'র্ধর্ষ ভঙ্গিতে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ভয়ে, আতঙ্কে লাজুকের অবস্থা করুণ। ট্রাকের প্রথম ধাক্কাটি গাড়ির পেছনের বাম্পারে আঘাত করলো। ছিটকে গিয়ে জানালার কাঁচের কোণায় স্বল্প আঘাত পেল লাজুক। কপালের চামড়া কেটে বিন্দু বিন্দু র'ক্ত জমলো। মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো রমণী। তানসীভের ক্ষুরধার অপরাধী মস্তিষ্ক প্রতিপক্ষের এই নোংরা চাল বহু আগেই ধরে ফেলেছিল। হাইওয়ের এক ব্লাইন্ড স্পট। রতন তার জীবনের সেরা খেলাটা খেললো। অত্যন্ত দক্ষ, দুঃসাহসিক ভঙ্গিতে গাড়িটা হাইওয়ে থেকে এক ঝটকায় ঢুকিয়ে ফেললো সরু, ধুলোবালি মাখা লেনে। সেখানেই ঘটলো অকল্পনীয় ধামাকা! তানসীভের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই সরু লেনে দাঁড়িয়ে ছিল একই মডেল, একই রঙের আরেকটি সাদা ডামি প্রিমিও গাড়ি। চোখের পলকে অদলবদল হলো দু'টো গাড়ি। শত্রুর অজান্তেই সেফ জোনে চলে গেল লাজুক। তার বদলে মরণফাঁ'দের মুখোমুখি হলো ডামি গাড়ি। গাড়ির চালক তানসীভের বিশ্বস্ত এক চ্যা'লা। বিশোর্ধ্ব তুখোড় স্ট্যান্ট কার ড্রাইভার। চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। শ'ত্রুদের চোখে ধুলো উড়িয়ে সে-ই শুনশান পরিবেশে বাস্তবায়িত হলো মির্জা তানসীভ শাহ্ এর বি'ধ্বংসী কাউন্টার প্ল্যান।

হাইওয়েতে উঠে এলো ডামি গাড়ি। দা'নবের ন্যায় তাড়া শুরু করলো ট্রাক। গাড়ির পেছনে হিং'স্র আঘাত করার ঠিক কয়েক মিনিট পূর্বে নিখুঁত টাইমিং কার্যকর হলো। চলন্ত গাড়ি থেকে অমানুষিক ক্ষিপ্রতায় দরজা খুলে লাফিয়ে পড়লো বিশোর্ধ্ব ছেলেটা। গড়াতে গড়াতে নিজেকে লুকিয়ে ফেললো রাস্তা পার্শ্ববর্তী ঝোপের আড়ালে। ডাম্প ট্রাকের চোখের সামনেই বি'ধ্বংসী কার এক্সিডেন্ট হলো। প্রিমিও গাড়িটি শূন্যে তিনবার ডিগবাজি খেল। দুমড়ে-মুচড়ে রূপ নিলো এক দলা লোহার আবর্জনায়। অথচ ট্রাকচালক টেরও পেলো না যে তার দৃষ্টির অগোচরে ঘটে গেছে এক অলৌকিক, সুনিপুণ পরিকল্পনা। এস.কে'র পরিকল্পনা মাফিক এই দুর্ঘটনা ঘটলো। মিসেস মির্জার মৃ'ত্যু নয়। বরং তাকে গুরুতর আহত করে তানসীভকে মানসিক ভাবে চরম অসহায়ত্বে ভেঙে ফেলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। যা এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন রুট ধরলো। আসন্ন পরিস্থিতি কি করে মোকাবেলা করবে এস.কে! এতবড় দুর্ঘটনার পর মির্জা তানসীভ শাহ্ কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? কখনোই নয়। কি হতে চলেছে মির্জার আসন্ন র'ক্তক্ষয়ী চাল!

•

বিলাসবহুল ডার্ক-রুম। দেয়ালে নিয়ন আলোর নীলচে আভা। ঘরের মাঝ বরাবর পাশাপাশি মাঝারি আকৃতির তিনটা ফোর-কে (4K) মনিটর। মনিটরের সামনে রিভলভিং চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসা এস.কে। হাতে ম'দের সরু গ্লাস। ঠোঁটের কোণে পৈ'শাচিক হাসি। দৃষ্টি নিবদ্ধ মনিটরে। অন্তরে বিজয়ের সাময়িক আনন্দ। সে আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আকস্মিক হিমায়িত হলো ঘরের পরিবেশ। মেইন সিপিইউ-এর ভেতরকার কুলিং ফ্যানগুলো মৃদু আর্তনাদ তুলে দ্রুত গতিতে ঘুরতে আরম্ভ করলো। মনিটরের নীল আলো আচমকা রক্তাভ লাল রঙে গ্লিচ করে উঠলো। এস.কে কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্ক্রিন জুড়ে কোটি কোটি বাইনারি কোড, ডেটা ফাইল চিলির মতো স্ক্রল হতে লাগলো।

' অ্যাক্সেস ডিনাইড.. সিস্টেম ওভাররাইড! '

এস.কে নিজের অজান্তেই মস্তবড় ভুল করে ফেলেছে। বিজয় উল্লাসে মত্ত হয়ে তানসীভকে মেসেজ পাঠিয়েছে। ক্ষণিকের জন্য ওপেন করেছে নিজ আইপি প্রোটোকল। সে-ই সামান্য লুপহোল ই বি'ষধর সাপের ন্যায় কব্জা করে ফেললো তানসীভের আইটি বাহিনী। রিমোটলি এস.কের মেইন সিকিউরিটি ফায়ারওয়াল বাইপাস করে ফেললো তারা। মেইন সার্ভারের ভেতরে নিজাম পুশ করে দিলো ভ'য়ঙ্কর 'রুট-কিট' ভাইরাস। ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এস.কের হাতের গ্লাসটা ফ্লোরে পড়ে গেল। ভেঙে হলো চুরমার। চোখের মণি স্তব্ধতায় জমে বরফ। তার আজীবনের জমানো সমস্ত অপরাধের ডেটাবেজ, আন্তর্জাতিক হুন্ডি নেটওয়ার্কের কোডেড ফাইল, তানসীভকে ফাঁ'সানোর জন্য তৈরিকৃত সেই এআই অডিও মেকিংয়ের আসল 'র-ফাইল'। ব্যাকগ্রাউন্ডে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কপি হয়ে ট্রান্সফার হচ্ছে অজ্ঞাত এক সার্ভারে। এস.কে উন্মাদের ন্যায় কিবোর্ডে আঘাত করতে লাগলো।

" নো! নো! এটা হতে পারে না! আমার সিকিউরিটি হ্যাক করা ইম্পসিবল! কিল দ্য প্রসেস! শাট ডাউন দ্য সার্ভার! "

তৎক্ষণাৎ চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো এস.কে।

" স্টপ! স্টপ ইট! "

তড়িঘড়ি করে মেইন পাওয়ার কর্ডের দিকে হাত বাড়াতেই মনিটরের স্পিকার ফেটে গেল। শোনা গেল কানে তালা লাগিয়ে দেয়ার উপক্রম বিকট সাইরেন। লাল রঙের সতর্ক সংকেত ঝলসে উঠলো একটার পর একটা স্ক্রিনে।

' ট্রান্সফার কমপ্লিট - ১০০% '

এক সেকেন্ড.. দুই সেকেন্ড.. অতঃপর পুরো সার্ভারের ভেতরে নেমে এলো ডিজিটাল প্রলয়। তানসীভ বাহিনীর পাঠানো কমান্ড কোড, একের পর এক সার্ভার ধ্বং'স করতে লাগলো। মনিটরজুড়ে ভেসে উঠল অসংখ্য এরর বার্তা। মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেলো হার্ডড্রাইভের সবুজ বাতি। পরমুহূর্তেই মেইন মাদারবোর্ড থেকে আগুনের ফুলকির সঙ্গে বেরিয়ে এলো কালচে ধোঁয়া। জ্বলে যাওয়া সার্কিটের তীব্র গন্ধে ভরে গেল পুরো ঘর। একটার পর একটা স্ক্রিন কালো হয়ে গেল। সবশেষে,

' কমপ্লিট সিস্টেম ফেইলর। '

ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা। এস.কের বহু বছরের গঠিত অপরাধ সাম্রাজ্য! চোখের সামনেই ভেঙে পড়লো।

" নোওওও! "

গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো সে। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা। অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে চোখের মণি। শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো। মুখের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।

" ইম্পসিবল.. ইটস্ ইম্পসিবল.. "

মাথার চুল দু'হাতে শক্ত করে মুঠো করলো সে।

" নো.. নো.. নো..! "

ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়চারি করতে লাগলো এস.কে। আচমকাই থেমে গেল। হিং'স্র জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো ডেস্কের ওপর। দামি মেকানিক্যাল কিবোর্ড তুলে সজোরে ছুঁড়ে মা'রলো দেয়ালে। কিবোর্ড ভেঙে টুকরো টুকরো। এরপর মাউস। মনিটর। সাউন্ড সিস্টেম। হাতের কাছে যা পাচ্ছে, তা-ই আছড়ে আছড়ে ফেলছে। কাঁচ ভাঙার শব্দে কেঁপে উঠলো পুরো ঘর। চোখের তারায় যুক্তির লেশমাত্র নেই। শুধুমাত্র উ'ন্মাদ ক্রোধ। আকস্মিক টেবিলের কোণে পড়ে থাকা মোবাইল টুং করে উঠলো। কাঁপা হাতে মোবাইল তুলে নিলো এস.কে। যান্ত্রিক পর্দায় ভেসে উঠলো,

' ওয়ান-ওয়ান! হাউ ডিড ইউ লাইক দ্য হাই-ভোল্টেজ শো? '

মস্তিষ্কের সকল নিউরন এক লহমায় ছিঁড়ে গেল। বোধগম্য হলো পুরো বিষয়টা। উন্মাদনার চূড়ায় পৌঁছে চিৎকার করে উঠলো এস.কে।

" তানসীভ! "

আহত, ক্ষি'প্ত শিকারির গর্জন,

" আই উইল কিল ইউ! "

ধপাস করে টেবিল উল্টে দিলো। সশব্দে পড়ে গেল চেয়ার। ভাঙা কাঁচের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো এস.কে। টের পেল না কোনোরূপ ব্যথা। মুঠো শক্ত। এতখানি শক্ত যে নখের আঁচড়ে নিজ তালু থেকে বিন্দু বিন্দু র'ক্ত ঝড়ছে। বোধশক্তি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। র'ক্তবর্ণ ধারণ করেছে চোখজোড়া।

-

রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর। ঘন গাছপালায় ঘেরা আলিশান তিনতলা বাড়ি। ধীরে ধীরে রূপ নিলো ভয়ানক এক মরণফাঁ'দে। কোনো সাইরেন নেই। নেই কোনো আলো। অন্ধকারের বুক চিরে পুরো বাড়িকে চারপাশ থেকে কর্ডন করে ফেললো এসিপি সাদমান সিদ্দিকীর বিশেষ কাউন্টার-সাইবার ক্রাইম ফোর্স। পনেরোজন সশস্ত্র পুলিশ অফিসার ট্যাকটিক্যাল গিয়ার পড়া। নিজ নিজ রিভলভার, শটগান উঁচু করে পজিশন নিলেন। তানসীভের লিক করা সার্ভার আইপি ট্র্যাক করে সাদমান সিদ্দিকী সরাসরি এসে পৌঁছেছেন এস.কের গোপন আস্তানায়। অন্ধকার পরিবেশে শোনা গেল এসিপির ধারালো, নিচু কণ্ঠস্বর,

" ভেতরের আসামী সাধারণ কোনো অপরাধী নয়। কোনো প্রকার ওয়ার্নিং শট ছাড়া সে যদি পালানোর চেষ্টা করে, সরাসরি পায়ে শুট করবে। মুভ! "

-

আধঘন্টা পূর্বে পুরো ঘরজুড়ে তাণ্ডব চলেছে। আগত মুহুর্তের কথা ভেবে এস.কে চিন্তিত। ভাঙাচোরা ঘরেই রয়েছে সে। রিভলভিং চেয়ারে দেহ এলিয়ে দেয়া। বন্ধ চোখ। অত্যধিক রাগে কাঁপছে শরীর।

বাড়ির পেছনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলো সাদমান বাহিনী। আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো। ধীরপায়ে অগ্রসর হতে লাগলো দোতলায়। ঠিক তখনই পুরো বাড়ির মেইন পাওয়ার গ্রিড ট্রিপ করল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে গেল ডুপ্লেক্স বাড়িটা। সাদমান সিদ্দিকী তৎক্ষণাৎ আদেশ করলেন,

" ফ্ল্যাশলাইট অন করো! সবাই পজিশন নাও। "

সকলে পজিশন নিতে নিতেই কানফাটানো সাইরেন বেজে উঠলো। ফায়ার-অ্যালার্মের সাইরেন শুনে বিভ্রান্ত হলো সাদমান বাহিনী।

" আগুন! "

তৎক্ষণাৎ সিলিংয়ে থাকা স্বয়ংক্রিয় 'ফায়ার স্প্রিঙ্কলার' গুলো সচল হয়ে গেল। পুরো বাড়ির ভেতর কৃত্রিম বৃষ্টির মতো পানি ঝড়তে লাগলো। লহমায় ভিজে গেল পুলিশ সদস্যরা। পানি আর ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ফ্ল্যাশলাইটের আলোগুলো প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করলো বিভ্রান্তিকর, অন্ধ আবহ। পুলিশ অফিসাররা চরমভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। আকস্মিক নিচতলার করিডোরে এক ভূতুড়ে অবয়ব দেখা গেল। সাদমান সিদ্দিকী চেঁচিয়ে উঠলেন,

" স্টপ! এক পা-ও নড়বে না। "

অবয়ব নড়েচড়ে উঠতেই গু'লি করলেন এসিপি। দেয়ালে লেগে পলেস্তারা খসিয়ে দিল বুলেট। সহসা বি'ধ্বংসী গো'লাগুলি আরম্ভ হলো। চোখের পলকে আশপাশ থেকে আক্রমণ শুরু করলো এস.কে বাহিনী। অন্ধকারে ভেজা শরীরে চললো আঘাত, পাল্টা আঘাত। সে-ই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলো না হুডি পরিহিত এস.কে। সকলের চোখে ধুলিসাৎ দিয়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি হতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হন্তদন্ত ভঙ্গিতে গ্যারেজে ছুটে এলেন সাদমান সিদ্দিকী। চোখের সামনে দিয়ে রাস্তায় ধূলো উড়িয়ে কালো সেডান গাড়িটি মিলিয়ে গেল অন্ধকার পথে। শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে আঘাত করলেন এসিপি। ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে ওয়াকিটকিতে আদেশ করলেন,

" কন্ট্রোল রুম! আসামী ব্ল্যাক সেডান নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টর হয়ে টঙ্গী ডাইভারশনের দিকে পালাচ্ছে। অল চেকপোস্ট অ্যালার্ট করো। আই ওয়ান্ট দিস স্ক্র্যা'উন্ডাল অ্যাট এনি কস্ট! "

-

নৈশকালীন ফাঁকা পিচ ঢালা সড়কে এগিয়ে যাচ্ছে সেডান গাড়িটি। গতি ১৫০ ছুঁয়েছে। এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরা ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে। ফ্লাইওভারের গোড়ায়, ল্যাম্পপোস্টের অন্ধকার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ঘোর বিপদ। কালো Honda rebel 300 ইতিমধ্যে চালু। মানুষটির পড়নে কালো হুডি। মুখ আবৃত কালো হেলমেটে। সেডান গাড়িটা চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। মির্জা তানসীভ শাহ্ আগ্নেয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো নি'ষ্ঠুর, শীতল হাসি। হাতের গিঁটগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হলো। বাইকের ক্লাচ ছেড়ে এক্সিলারেটর মোচড় দিলো তানসীভ। যান্ত্রিক গর্জন তুলে কালো রঙা বাইকটি ছায়ার মতো ধাওয়া শুরু করলো। পুলিশের হাত থেকে ছাড় পেয়েছে। কিন্তু শিকারী বাঘের করাল থাবা থেকে কি করে নিজেকে বাঁচাবে সে!

চলন্ত বাইকের হ্যান্ডেলবার শক্ত হাতে ধরা। অন্য হাতে হুডির ভেতর থেকে বের করলো ভারী নাইন-এমএম রিভলভার। বাইকের গতি আরো বাড়িয়ে দিলো তানসীভ। গাড়ির একদম ডান লেনের সমান্তরালে চলে এলো। গতির তীব্র বাতাসে উড়ছে হুডির পেছনাংশ। রিভলবার সোজা তাক করলো সেডানের পেছনের চাকা বরাবর। পরপর দুটো গু'লির কান ফাটানো আওয়াজ। কেঁপে উঠলো হাইওয়ের বাতাস। প্রথম বুলেট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। তবে দ্বিতীয়টা নিখুঁতভাবে বিদ্ধ হলো গাড়ির পেছনের ডান দিকের টায়ারে। চলন্ত অবস্থাতেই টায়ারটি বিকট শব্দে ব্লা'স্ট হলো। উগ্র গতিতে রাস্তা জুড়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা ভঙ্গিতে দুলতে শুরু করলো সেডান। টায়ারের রিম পিচ ঢালা রাস্তায় ঘষা খেল। চারদিকে ছড়াতে লাগলো আগুনের ফুলকি। স্টিয়ারিং হুইল শক্ত হাতে চেপে ধরলো এস.কে। রিয়ার ভিউ মিররে দেখতে পেল সে-ই আগ্রাসী অবয়ব। ক্ষোভে মস্তিষ্ক টগবগ করে উঠলো। ব্রেক চাপার বদলে আচমকা স্টিয়ারিং ডানদিকে মোচড় দিলো এস.কে। উদ্দেশ্য, চলন্ত গাড়ি দিয়ে তানসীভের বাইককে সরাসরি ক্র্যাশ করা। ফ্লাইওভারের শক্তপোক্ত দেয়ালে ছিটকে ফেলে দেয়া! যেই ভাবা সেই কাজ। গাড়ির ভারী বডিটা প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মা'রলো তানসীভের বাইকের সামনের চাকায়।

মেটালের সাথে মেটালের ঘর্ষণে তীব্র-তীক্ষ্ণ শব্দ হলো। শারীরিক শক্তি এবং রাইডিং স্কিল ব্যবহার করে কোনোমতে বাইককে ব্যালেন্স করতে সক্ষম হলো তানসীভ। বুটের তলা পিচ ঢালা রাস্তায় ঘষা খেয়ে ধোঁয়া ওড়ালো। হার মানার পাত্র নয় মির্জা তানসীভ শাহ্। বাইকের থ্রটল আরো চেপে ধরলো সে। সরাসরি গাড়ির উইন্ডশিল্ডের সামনের দিকে চলে গেল। চলন্ত বাইকের ওপর প্রায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, এক অকল্পনীয় ক্ষিপ্রতায় নিজের শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে দিল তানসীভ। সরাসরি আছড়ে পড়লো চলন্ত গাড়ির বনেটের ওপর! অপরদিকে তার বাইকটি চালকহীন অবস্থায় ছিটকে গিয়ে হাইওয়ের ডিভাইডারে সজোরে ধাক্কা খেল। গাড়ির বনেটের ওপর শুয়ে, এক হাতে ওয়াইপার শক্ত করে চেপে ধরলো তানসীভ। অন্য হাতের কনুই দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করলো। চুরমার করে দিলো সামনের কাঁচ। কাঁচের টুকরোগুলো এলোপাথাড়ি ছিটকে পড়লো এস.কের মুখে। তানসীভ ভাঙা কাঁচের ভেতর হাত গলিয়ে দিলো। সরাসরি চেপে ধরলো দা'নবের কলার। প্রবল ধস্তাধস্তিতে এস.কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রেক কষতেই পুরো গাড়িটা হাইওয়ের মাঝখানে তিনবার চক্কর কাটলো। উল্টো লেনে ঘুরে গিয়ে বিকট শব্দে থমকে দাঁড়ালো।

লা'থ খেয়ে খুলে গেল গাড়ির দরজা। বেরিয়ে এলো এস.কে। তানসীভ এক লাফে নেমে এলো জমিনে। হেলমেট খুলে ছুঁড়ে ফেললো পাশে। ধূর্ত শিকারির চোখে তাকিয়ে দু'জনে। শুনশান অন্ধকারে আরম্ভ হলো দুই তীক্ষ্ণধী মস্তিষ্কের দৈহিক লড়াই। জ্যাকেটের ভেতর থেকে ধারালো এক ডাগার বের করলো এস.কে। তানসীভের বুক বরাবর আঘাত করতে উদ্যত হলো। অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় এস.কের হাতটা আটকে ফেললো তানসীভ। সজোরে কপাল দিয়ে আঘাত করলো নাক বরাবর। নাক ফেটে লাল তরল বেরিয়ে এলো। হাত ফসকে পড়ে গেল ডাগার। কোনোরূপ সুযোগ না দিয়ে একাধারে আঘাত করতে লাগলো তানসীভ। একের পর এক ঘু'ষি, লা'থি। এস.কে যথাসম্ভব পাল্টা আঘাত করতে লাগলো। কখনো সফল। কখনোবা ব্যর্থ। সর্বশেষ ঘু'ষি পড়লো এস.কের নাক বরাবর। ছিটকে পড়লো গাড়ির বনেটে। বলশূন্য হয়ে পড়লো শরীর। নাকমুখ দিয়ে অনবরত র-ক্তপাত হচ্ছে। কলার ধরে টেনে তুললো তানসীভ। চোখে চোখ পড়লো। ধীরস্থির ভঙ্গিতে রিভলভারের ব্যারেল চেপে ধরলো এস.কের কপালে। নির্মম-পৈ'শাচিক উন্মত্ততায় দাউদাউ করছে চোখ জোড়া। ঠিক তখনই লাল নীল আলোর ঝলকানি। সাইরেনের বিকট শব্দে কেঁপে উঠলো হাইওয়ে। চোখের পলকে পুরো জায়গাটা ঘেরাও করে ফেললো পুলিশের ছয়টা গাড়ি। দ্রুত পায়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন এসিপি সাদমান সিদ্দিকী। চেঁচিয়ে উঠলেন,

" তানসীভ! ড্রপ দ্য গান! আইন নিজের হাতে নেবেন না। "

এক মুহূর্তের জন্য সাদমানের দিকে তাকালো তানসীভ। অতঃপর দৃষ্টি পড়লো এস.কের ফ্যাকাশে মুখাবয়বে। ঠাণ্ডা, পা'ষাণ, অনুভূতিহীন চাহনি। কিছু একটা ভেবে নিলো মন। ধীরজ, শান্ত ভঙ্গিতে রিভলবার নামিয়ে ফেললো তানসীভ। এস.কের হাতে হ্যান্ডকাফ পড়ালো পুলিশ। টেনে নিয়ে যেতে লাগলো পুলিশ ভ্যানের দিকে। আকস্মিক থেমে গেল এস.কে। র'ক্তাক্ত মুখ। চূর্ণ অহংকার। পরাজিত মস্তিষ্ক। ধীরে ধীরে পিছু ঘুরে দাঁড়ালো সে। পুলিশ সতর্ক ভঙ্গিতে তাকে ধরে রাখা। তানসীভের সঙ্গে দৃষ্টি মিললো। চরম পরাজয়ের মাঝেও অত্যন্ত কুৎসিত, রহস্যময় হাসি উপহার দিলো এস.কে। মাথার হুডি ভালোমতো টেনে নিলো তানসীভ। দৃঢ়তার সহিত অদম্য তার অঙ্গভঙ্গি। চোখেমুখে কাঠিন্যতা। করাল হিং'স্রতায় প্রজ্বলিত চোখ জোড়া। শত্রু যে-ই হোক না কেন, তার জ্যান্ত চামড়া ছাড়াতে প্রস্তুত মির্জা তানসীভ শাহ্। ধ্বং-সলীলা এখনো অব্যাহত।

•

মধ্যরাত পাড় হয়েছে। ভোরের ছাইরঙা আলো ফোটেনি এখনো। ঘরজুড়ে একাকী পায়চারি করে চলেছে লাজুক। একাকী এই রেস্টহাউসে ছটফট করে চলেছে মন। অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে শিরায় উপশিরায়। বুকের ভেতর শূন্যতা। নিস্তব্ধতায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। চোখে ঘুম নেই। অন্তরে অজানা ভীতি। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত। স্নায়ু টানটান। হঠাৎ কাঠের ভারী দরজার লক খুলে গেল। দরজা বরাবর তাকালো লাজুক। স্তব্ধ হয়ে গেল চোখের পলক!

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন