#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[২৬]
" আ প নি! "
বিপর্যস্ত রূপে দাঁড়িয়ে তানসীভ। আপাদমস্তক হালচাল লক্ষ্য করে আঁতকে উঠলো লাজুক। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল বহুগুণ। ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি। কালো হুডির একপাশ অল্প ছেঁড়া। যত্রতত্র ছোপ ছোপ র'ক্তের দাগ। মুখমণ্ডলে আঘাতের চিহ্ন। গালে, ঠোঁটের কোণে কালশিটে দাগ। দুলে উঠলো গোটা দুনিয়া। সংকোচ, সীমারেখা ছাড়িয়ে গেল মন। নিজেকে আর সামলাতে পারলো না লাজুক। বেসামাল ভঙ্গিতে ছুটলো স্বামীর উদ্দেশ্যে। অশান্ত ঝড়ের ন্যায় আছড়ে পড়লো শক্তপোক্ত, চওড়া বুকে। নিমিষেই শূন্যে উঠে গেল দু'পা। অভেদ্য বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিলো তানসীভ। গভীর, অদম্য হাহাকারে মিলেমিশে গেল কপোত কপোতী। দু'টো হৃদয়ের দ্রুত স্পন্দন একাকার হয়ে গেল। নিঝুম ঘরে একান্ত সঙ্গিনীর পরম উষ্ণতা। ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেললো মানুষটি। কাঁধের বাঁকে গুঁজে দিলো মুখ। কেঁপে উঠলো রমণীর শরীর। অবিরাম অশ্রুতে ভিজে গেল হুডি। ক্রন্দনরত সঙ্গিনীকে নিজের সঙ্গে আরো যত্ন সহকারে আগলে নিলো তানসীভ। ক্লান্ত, বড্ড বিপর্যস্ত সে। একটুখানি সুখকর আশ্রয়ের বড় প্রয়োজন। শূন্যে ভাসমান শরীরের সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দেয়া তার ওপর। অতিবাহিত হলো কিছু সময়। সে-ই ভঙ্গিতে ধীরপায়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো তানসীভ। এক পায়ের ধাক্কায় বন্ধ হলো দরজা। বুকের মাঝে বন্দী করে নিলো তার নূর'কে। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালো বেডে। ধীরস্থির, সাবধানী ভঙ্গিমায় রমণীর পিঠ স্পর্শ করলো বিছানা। অশ্রুসজল চোখে তাকালো লাজুক। বোধশক্তি ফিরে এলো এতক্ষণে। মানুষটা নিজের সবটুকু ভর সহনীয় পর্যায়ে ওর ওপর ছেড়ে দিয়েছে। মাথা রেখেছে বুকের বাঁ পাশে। ঠিক হৃদয় বরাবর। অর্ধাঙ্গিনীর এলোমেলো হৃদস্পন্দনে ধীরলয়ে হারিয়ে ফেললো নিজেকে। বন্ধ হলো চোখের পাতা। শিউরে উঠলো লাজুক। হলো অপ্রস্তুত। চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। এক ফোঁটা তপ্ত জল টপ করে গড়িয়ে পড়লো। আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো স্বামীর মাথায়। চুলের ভাঁজে ভাঁজে ছুঁয়ে দিলো আদুরে স্পর্শ। কম্পমান স্বরে বলে উঠলো,
" এ কি হাল করে এসেছেন আপনি? কি হয়েছে? এত র'ক্ত! এত আঘাতের চিহ্ন! কার সঙ্গে লড়াই করে এসেছেন? আপনি ঠিক আছেন তো? "
জবাব এলো না বিপরীত মানুষটার তরফ থেকে। লাজুক তাড়া দিলো,
" উঠুন না আপনি। আমাকে দেখতে দিন। র'ক্ত বন্ধ করা দরকার। খুব যন্ত্রনা হচ্ছে? আমাকে বলুন। "
চরম অসহায়ত্বে ডুকরে কেঁদে উঠলো রমণী। বুকের মাঝে আরো গভীরভাবে মিশে গেল স্বামী মানুষটি। ক্ষীণ কণ্ঠে জানান দিলো,
" আ'ম ফাইন। "
" না আপনি ঠিক নেই। ব্যথা পেয়েছেন জায়গায় জায়গায়। র'ক্ত ঝড়ছে। আপনি ঠিক নেই। "
" উঃ! "
অস্ফুট শব্দ ধ্বনিত হলো। দিশেহারা হলো লাজুক। চোখের পলকে করে ফেললো অভাবনীয় এক কাণ্ড। দু হাতের আঁজলায় ভরে নিলো মুখখানা। মুখোমুখি আনলো মুখ। চোখে চোখ মিললো। গূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তানসীভ। ঠোঁট সামান্য প্রসারিত।
" এসব কি হচ্ছে? একটুও মিথ্যা বলার চেষ্টা করবেন না। আমি কিন্তু আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। চোখ কখনো মিথ্যা বলে না। শুনছেন? অ্যাই অ্যাই। একদম চোরা হাসি দেবেন না। ঠিকমতো হাসতে পারেন না যখন, হাসবেন না। তাই বলে এমন গু'ণ্ডা ব'দমাশ মার্কা হাসি দেবেন না। "
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কৌতূকময় হাসি লুকানোর ব্যাপক চেষ্টা করলো তানসীভ। তবে অর্ধাঙ্গিনীর আকস্মিক বাঘিনী রূপ তাকে যে শান্ত থাকতে দিচ্ছে না। লাজুক জোর করে মুখখানা চেপে ধরে চোখে চোখ রাখলো। র'হস্যের পর্দা ভেদ করতে প্রশ্ন করে উঠলো,
" আপনি কে? কি আপনার পরিচয়? "
" ওয়ান অ্যান্ড অনলি হাসবেন্ডের নাম.. ভুলে গেলে? "
" একদম রসিকতা করার চেষ্টা করবেন না। রসিকতা আপনাকে মানায় না। "
" ওকে। "
চোখ পাকিয়ে তাকালো লাজুক,
" ওকে! এমন নির্লিপ্ততা দেখিয়ে লাভ নেই আজ। সত্যিটা বলতেই হবে। "
তক্কে তক্কে বেশ বিনোদন পাচ্ছে মানুষটা। কয়েক ঘণ্টা পূর্বের বিনাশকারী ঝড় যেন সুদূর অতীত এখন! দু'জনে মেতেছে নিজস্ব খুনসুটির দুনিয়ায়।
" কে আপনি? "
" মির্জা তানসীভ শাহ্। "
" উউউ! আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি এবার। শান্ত মানুষ রেগে গেলে ভ'য়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। জানেন তো? "
তানসীভ দুর্বোধ্য মাথা নাড়লো। হ্যাঁ, না বোঝা মুশকিল। লাজুক ভয় ধরানোর চেষ্টা করলো,
" আমি রেগে গেলে কিন্তু খুব খারাপ হবে। "
ভাবলেশহীন ঘুম ঘুম ভাব। হাই তুললো তানসীভ। স্ত্রীর দু হাতের আঁজলায় মুখখানা বন্দী। তন্মধ্যে হাই তুলছে। কি যে আদুরে দৃশ্যটা। চুমু খাওয়ার বাসনা জাগছে মনে। জোরপূর্বক নিজেকে মনে মনে শাসালো লাজুক। অবশেষে ভ'য়ঙ্কর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেই ফেললো,
" আপনি যদি সত্যিটা না বলেন আমি কিন্তু.. বিছানা আলাদা করে ফেলবো। দু'জন আলাদা। "
এমন ভ-য়ঙ্কর শাস্তির কথা শুনে থরথরিয়ে কাঁপতে ব্যর্থ হলো তানসীভ। অর্ধাঙ্গিনীর হাতের তালুতে গাঢ় চুমু খেল। ইতিবাচক মাথা নেড়ে বোঝালো আপত্তি নেই তার। লাজুক স্তব্ধ! এ কেমন পা'ষাণ, নির্দয় পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দিলো পিতাজি? স্ত্রী রাগ করে বিছানা আলাদা করতে চাইছে, তবুও বান্দা নির্বিকার! ছ্যা ছ্যা ছ্যা! গাল ফুলিয়ে ফেললো রমণী। বিড়বিড় করে উঠলো,
" খারাপ লোক একটা। মোটেও সেবাশুশ্রূষা করবো না আমি। থাকুক এভাবেই। কষ্ট পাক। তাতে আমার কি? "
বুকে মুখ গুঁজে দিলো তানসীভ। আয়েশি ভঙ্গিতে মুখমণ্ডল ঘঁষে নিলো। মৃদু কন্ঠে জানালো,
" সবটা তোমারই। "
" হুহ্! এক জীবনে চাইলাম কি আর পাইলাম কি? সবই রবের ইচ্ছে। নাহলে এমন মন্দ লোকের দিকে ফিরে তাকাই আমি? আ.."
একাকী বিড়বিড় করে আর বলা হলো না। বুকের বাঁ পাশে আবৃত ত্বকে মৃদু যন্ত্রনা অনুভূত হলো। দাঁতের দাগ বসে গিয়েছে কি! শিহরিত, যন্ত্রনা কাতর রমণী শুনতে পেল সে-ই ত্যাছড়া জবাব,
' যা পেয়েছে শুকরিয়া আদায় করা হোক। '
•
বিকেলের ম্লান আলো ছড়িয়ে রয়েছে ড্রয়িং রুমে। দুর্বল শরীরে সোফায় বসলো আফসানা। বাবুকে ঘুম পাড়িয়ে একটুখানি স্বস্তি মিললো। সদ্য মা হয়েছে সে। শরীর এখনো দুর্বল। ধকল কাটিয়ে উঠতে কিছুদিন সময় প্রয়োজন। মনটা অজানা আশঙ্কায় শঙ্কিত। মোবাইল, টিভি থেকে যথাসম্ভব দূরে ছিল গত দুইদিন। শাহেদ কেমন সন্দেহজনক আচরণ করছিল। যান্ত্রিক দুনিয়া থেকে যথাসম্ভব দূরে রেখেছে ওকে। অজ্ঞাত কোনো কারণে ফ্যাকাশে হয়ে ছিল তার মুখখানা। জিজ্ঞেস করায় কিছু বলেনি। এড়িয়ে গিয়েছে। কি হয়েছে? স্পষ্ট করে না বললে, সে জানবে কি করে? রিমোট নিয়ে টিভি চালু করলো আফসানা। বাড়ির সকলে কেমন আছে, আল্লাহ্ জানেন। সন্ধ্যায় ইনশাআল্লাহ্ বোনটাকে ফোন করবে। হসপিটাল থেকে সে-ই যে গেল এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। সব ঠিক আছে তো? লাজুক তো এমন অসামাজিক আচরণ করার মেয়ে নয়। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। অজানা ভয়ে হীম হলো শরীর। অ্যাই! সব ঠিক আছে তো? আকস্মিক ভাবনায় ছেদ পড়লো। নিউজে তখন বলা হচ্ছে,
- ' উত্তরা থেকে গ্ৰেফতার হয়েছে হাই-টেক ক্রাইম সিন্ডিকেটের মূল এক্সিকিউটর, হ্যাকার এস.কে। ব্যবসায়ী পারভেজ হাওলাদার এবং তরুণী রূপা মা'র্ডার কেসে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর নতুন মোড়। '
এস.কের গ্রেফতারের লাইভ ফুটেজ দেখা মাত্রই আফসানার বুকের ভেতর কান্নায় মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখ বেয়ে অনবরত নোনা জল গড়িয়ে পড়লো। লাজুকের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা সম্পর্কে অজ্ঞাত সে। তার শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে জানানো হয়নি। সে শুধু জানে পারভেজ হাওলাদার কেসে নতুন মোড় এসেছে। হয়তো.. হয়তো মির্জা তানসীভ শাহ্ নির্দোষ। তার বোনের সংসারটা বেঁচে যাবে এ দফায়। বোবা কান্নায় ভেঙে পড়লো আফসানা। রবের নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগলো। অন্যায়কারী যেন যোগ্য শা'স্তি পায়। ছাড় পাক নির্দোষ প্রাণ।
•
নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে অবস্থিত এই রেস্টহাউস। সেদিনের সে-ই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পর অতিবাহিত হয়েছে চারদিন। এ কয়দিন এখানেই তাদের ছোট্ট সংসার জীবন কাটছে। আশুলিয়ার সেই মনোরম পরিবেশ কিংবা গুলবাহার মঞ্জিল। কবে নাগাদ ফেরা হবে, জানা নেই। মানুষটা ক'দিন ধরে বেশ ব্যস্ত। তার অগোচরে কিসব কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। যখন তখন বেরিয়ে পড়ে। রেস্টহাউসে তখন লাজুক একা। বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত তানসীভের বিশ্বস্ত কয়েকজন ব্যক্তি। নিজেকে কেমন অচেনা লাগে লাজুকের। রিফিউজি অনুভূত হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো রমণী। বাইরের মনোরম পরিবেশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। হালকা বাতাস ছুঁয়ে গেল মুখমণ্ডল। দেখতে দেখতে কিভাবে সময়গুলো পেরিয়ে গেল। আর মাত্র এক সপ্তাহ। তাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের ছয় মাস পূর্ণ হবে। অর্ধ বর্ষ। সময়গুলো চোখের পলকে কেটে গেল যেন। মনে হয় এই তো সেদিন। তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। এই অপ্রত্যাশিত পথচলার সূচনা।
--
ব্যস্ত এক দিন। বৃহস্পতিবার। মামাতো বোন নয়নতারার সঙ্গে শপিংমলে এসেছে লাজুক। চারদিকে কোলাহল, দোকানিদের ডাকাডাকি। ক্রেতাদের ব্যস্ত পদচারণা। ভার্সিটি থেকে ফিরতেই তাড়া দিলো নয়ন। তার কিসব দরকারি জিনিসপত্র কেনার রয়েছে। একা যাবে না। লাজুক আপু যেন অবশ্যই সঙ্গ দেয়। আপু ভালো দামাদামি করে সেরাটা কিনতে পারে। কেনাকাটায় সে আবার অত পটু নয়। ষোড়শী বোনের আদুরে আবদার ফেলতে পারলো না লাজুক। অগত্যা দুই বোন মিলে বিকাল নাগাদ বেরিয়ে পড়লো। এলো শহরের অন্যতম ব্যস্ত এই শপিংমলে। মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ পুরো মল। কসমেটিকস, ব্যাগ। ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাছাই করতে লাগলো দু'জনে। মামাতো বোন বেড়াতে এসেছে তাদের বাসায়। সেরা আতিথেয়তা আবশ্যক যে।
" আপু! "
ফিসফিসিয়ে ডেকে উঠলো নয়নতারা। লাজুক ঘুরে তাকালো,
" হ্যাঁ বল। "
আঙ্গুলের ইশারায় সিগন্যাল দিলো নয়নতারা। প্রাকৃতিক ডাক এসেছে। এখনই সাড়া দেয়া প্রয়োজন। লাজুক আশেপাশে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো,
" ঠিক আছে চল। "
" তোমার যেতে হবে না। তুমি এই আইশ্যাডো প্যালেটটা দামাদামি করো তো। আমি এই যাবো আর আসবো। "
বোনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত পায়ে নিকটবর্তী লেডিস ওয়াশরুমে অগ্রসর হলো নয়ন। লাজুক তাড়াহুড়ো করে আইশ্যাডো প্যালেট কিনে ফেললো। অহেতুক দামাদামি করলো না আজ। দিনকাল এমনিই ভালো নয়। মেয়েটা এভাবে একা চলে গেল। অতি সত্বর তার সাথে থাকা উচিত। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ঠিকঠাক করে লাজুক ছুটলো ওয়াশ রুম এরিয়ায়।
কিছুটা দূরেই নীরব এক করিডোর। এখানকার দোকানপাট প্রায় বন্ধ। শুনশান নীরবতা। লাজুক সতর্ক হয়ে উঠলো। মেয়েটা এত জায়গা থাকতে এই শুনশান জায়গায় এসেছে কেন? পায়ের গতি বাড়ালো রমণী। কিছুটা এগোতেই হতবাক! বি'স্ফোরিত হয়ে গেল চোখ! অজ্ঞাত এক ব্যক্তির বুকে লেপ্টে রয়েছে নয়নতারা। একলাফে বেড়ে গেল লাজুকের হৃদস্পন্দন। দীর্ঘদেহী মানুষটা এদিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। লম্বা অবয়ব। প্রশস্ত কাঁধ। কালো পোশাক পরিহিত। অস্বাভাবিক শক্তপোক্ত গড়ন তার। লাজুক কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটনা ঘটে গেল। চোখের পলকে নয়নকে বাহুডোর থেকে ছিটকে সরিয়ে ফেললো মানুষটা। সজোরে মুখ বরাবর ঘু'ষি মা'রলো আগন্তুক ছ্যাঁচড়া ছেলেটার। ঘটনা এত দ্রুত ঘটলো যে লাজুক কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইলো। অতঃপর বিষয়টি বোধগম্য হলো তার। সে দ্রুত পায়ে ছুটে গেল বোনের কাছে।
তিনতলার রেলিং ঘেঁষে অভিভূত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নয়নতারা। চোখে বিস্ময়! মুগ্ধতা! তার সামনেই ভ'য়ঙ্কর এক কাণ্ড ঘটে চলেছে! অথচ মেয়েটা ডুবে রয়েছে তার ফ্যান্টাসির দুনিয়ায়। যেন কোনো ফিকশন ক্যারেক্টার হঠাৎ বাস্তবে নেমে এসেছে। মেয়েটা হা হয়ে গিলে নিচ্ছে শ্যাম পুরুষটির সৌন্দর্য। আকস্মিক বাহু টেনে ধরে স্বপ্নের দুনিয়া থেকে বের করে আনলো লাজুক। বোনের কাণ্ডে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট, বিভ্রান্ত সে। অপরদিকে ছ্যাঁচড়া ছেলেটার কানের নিচে পড়লো এক আগ্রাসী থাবা। হন্তদন্ত ভঙ্গিতে দৌড়ে পালালো ছেলেটা। বিরক্তিকর ভঙ্গিতে হাত ঝাড়া দিলো তানসীভ। অবেলায় যত্তসব ঝামেলা। নারী ঘটিত ঝামেলা থেকে বরাবরই কয়েকশ মাইল দূরে সে। দৌড়াতে দৌড়াতে সে-ই ঝামেলা আজ সোজা এসে পড়েছে বুকে। বিষয়টা মোটেও পছন্দ হলো না তার। তবে গোটা ঘটনা ভেবেচিন্তে তপ্ত শ্বাস ফেললো। বোনের হাত ধরে লাজুক এগিয়ে এলো ধীরপায়ে। মানুষটা চলে যাচ্ছে। হঠাৎ পিছু ডেকে উঠলো লাজুক। সৌজন্যমূলক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো,
" থ্যাংক ইয়্যু। "
কৃতজ্ঞতাভরা আন্তরিক স্বর। ওপাশ থেকে নূন্যতম ভদ্র আচরণ মিললো না। মিললো না কোনো সৌজন্যমূলক শব্দও। বড় বড় কদম ফেলে চলে গেল মানুষটা। লাজুকের চোখেমুখে বিভ্রান্তি। এদিকে নয়নতারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে! ওই তো তার বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নে দেখা ম্যাচো ম্যান!
-
' মির্জা তানসীভ শাহ্-র বুকে জড়িয়ে কে এই অজ্ঞাত তরুণী? '
' কি তার পরিচয়? '
' গার্লফ্রেন্ড নাকি স্ত্রী এই মেয়েটা? '
' নাকি কোনো অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত? যে কারণে আজ পর্যন্ত মিডিয়ার সামনে আসেনি এই মেয়ে! '
' বরাবরই নারী ঘটিত ঝামেলা থেকে দূরে মির্জারা। আজ প্রথমবারের মতো কনিষ্ঠ মির্জা উত্তরসূরী কি সে-ই সীমারেখা অতিক্রম করলো? '
স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছে ছবিটি। মির্জা তানসীভ শাহ্-র বুকে লেপ্টে রয়েছে অজ্ঞাত এক তরুণী। চুলে ঢাকা মুখ। সাধারণ বেশভূষা। নাম পরিচয়হীন। নয়নতারা এবং তানসীভের ছবি দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়লো অনলাইন দুনিয়ায়। এদিকে বাড়িতে বেশ অশান্তি হলো। নয়নতারার গালে চ'ড় মা'রলো মা। মেয়েটা দিনকে দিন বড্ড বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে। শেষমেষ পরপুরুষের গায়ে ঢলে পড়ছে? ছবিতে যতই মুখ ঢাকা থাকুক। নিজের মেয়েকে চিনতে মোটেও ভুল হয়নি তার। নয়নতারা কেঁদেকেটে সত্যিটা জানালো। তবুও ছাড় মিললো না। মা অনেকক্ষণ বকাঝকা করলেন। বাবাও গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। কাঁদতে কাঁদতে নয়নতারা চলে গেল রুমে। কেঁদেকেটে বালিশ ভেজালো। দেয়ালে দেয়ালে অভিযোগ জানালো। হঠাৎ বেজে উঠলো ফোন। লাজুক আপু কলিং। নাকের পানি চোখের পানি মুছে কল রিসিভ করলো নয়ন। ওপাশ থেকে সালাম দেয়া হলো। অতঃপর সর্বপ্রথম প্রশ্ন,
" লোকটাকে তুই চিনিস? "
ডুকরে কেঁদে উঠলো নয়নতারা।
" দোহাই আল্লাহ্'র আপু। তুমি অন্তত আমাকে বিশ্বাস করো। ওই তানসীভ মির্জাকে জীবনে প্রথমবার সামনাসামনি দেখেছি আমি। হ্যাঁ, মোবাইলে অনেকবার দেখেছি। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু সামনাসামনি এই প্রথমবার দেখলাম। বিশ্বাস করো। "
চোখ বুজে গভীর শ্বাস ছাড়লো লাজুক। জানতে চাইলো,
" শপিংমলে ঠিক কি হয়েছিল? তুই ওই শুনশান করিডোরে কি করছিলি? "
চুপ হয়ে গেল নয়ন। শুকনো ঢোক গিললো। লাজুক কড়া স্বরে ডেকে উঠলো,
" নয়ন। কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি। "
" আপু আমি.. আমি ওই.. ফ্রেন্ডের সাথে মিট করতে গেছিলাম। "
" মিথ্যা বলে ফ্রেন্ডের সাথে মিট? কোন ফ্রেন্ড? বয়ফ্রেন্ড?"
নয়নতারা চুপ। লাজুক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। টিনেজ মেয়েদের নিয়ে এই এক সমস্যা। আজকালকার বেশকিছু ছেলেমেয়ে অল্প বয়সে পেকে যাচ্ছে। ফ্যান্টাসির দুনিয়ায় বাস করে বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। ওরা কেন বোঝে না? ফিকশন আর রিয়েলিটি সেম নয়। রিয়েলিটি বড্ড হার্শ।
" এক্সাক্ট কি হয়েছিল? "
" আমি.. বাবুর সাথে মিট করতে গিয়েছিলাম। "
" বাবু? কার বাবু? " বিভ্রান্ত লাজুক।
" ওই মানে.. নোমান। আমার বফ। "
চোখমুখ কুঁচকে ফেললো লাজুক। নিজেকে কেমন ওল্ড এইজ ওমেন মনে হচ্ছে। জেন-জি হিসেবে সত্যিই লজ্জিত সে।
" হু, বলতে থাক। "
" নোমানকে বাই বলে আমি ফিরে আসছিলাম তোমার কাছে। হঠাৎ একটা লোক এলো। আজেবাজে কথা বলে টিজ করতে লাগলো। ভয় পেয়ে আমি দৌড় দিলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে ঠাস। তানসীভ নামক সুদর্শন পুরুষের চওড়া, প্রশস্ত, শক্তপোক্ত বক্ষপটে আছড়ে পড়লাম। "
কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল নয়নতারা। লাজুক কড়া কণ্ঠে বললো,
" আজেবাজে সাহিত্য ঝাড়া বন্ধ কর তো। ওই মির্জা লোকটা কোনোভাবে তোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি তো? তার তো রেপুটেশন আবার খুউব ভালো। "
কণ্ঠে ঝড়ে পড়ছে বিদ্রুপ। মির্জা তানসীভ শাহ্-র কুকীর্তি সম্পর্কে এই শহরের কে না জানে! টুকিটাকি সে-ও জানে। নয়ন হতাশ হয়ে বললো,
" কিছু করার সুযোগ পেলাম কোথায়? বুকে আছড়ে পড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তো ছিটকে ফেলে দিলো আমাকে। আরেকটু হলে হাতে খুব ব্যথা পেতাম গো। "
" মামী জানতে পারলে তোর কপালে দুঃখ আছে রে নয়ন। একে তো পরপুরুষের বুকে গিয়ে পড়েছিস। মানলাম এক্সিডেন্টলি। তবুও সেখানে তুই আবার ফ্যান্টাসি খুঁজে বেড়াচ্ছিস? "
চ'ড় খাওয়া গালে হাত দিয়ে মুখখানি কাঁচুমাচু করে ফেললো নয়নতারা। যত যাই হোক। সুন্দর পুরুষ দেখলে তার আবার মাথা ঠিকঠাক কাজ করে না। করবে কি করে? লোকটা কি যে সুন্দর! একদম গম্ভীর। টল। ডার্ক হ্যান্ডসাম। ইশ্! লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গেল নয়নতারা। লাজুক ওপাশ থেকে জ্ঞানের বাণী ঝাড়ছে। তাতে কার কি? নয়ন তো ডুবে নিজ দুনিয়ায়।
-
মির্জা জহুরুল শাহ্-র স্টাডি রুম। টেবিলের ওপর রাখা স্বনামধন্য তিনটা পত্রিকা। সবগুলোর মেইন হেডলাইন একটাই। মির্জা উত্তরসূরীর রমরমা খবর। বিরক্ত হয়ে একটা পত্রিকা ছুঁড়ে ফেললেন তিনি।
" ডিসগাজটিং! "
বিপরীতে দাঁড়িয়ে তানসীভ। কঠোর মুখভঙ্গি। হাতের মুঠো শক্ত। বুকের ভেতর জ্ব'লন্ত অগ্নি।
" দেখেছো, সারা শহর তোমার প্রেম কীর্তনে মজেছে। এতকাল তো নিজেকে খুব সামলালে। শেষমেষ শপিংমলে গিয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে হাতাহাতি করার খুব দরকার ছিল কি? এমনিতে বিয়ে করতে বললে তো খুব নাক ছিটকাও। "
জন্মদাতা পিতার অশালীন ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় নিজেকে শান্ত করা দুষ্কর হয়ে উঠলো। বুকের পাটা দ্রুত ওঠানামা করে চলেছে। আরো শক্ত হলো মুঠি।
" মেয়েটাকে চিনি না। "
" বাহ্! চেনো না এখন! তা জড়িয়ে ধরার সময় মনে ছিল না? মিডিয়া কি এতকিছু জানে? তারা তো তোমার অমর প্রেম কাহিনী ছাপিয়ে ফেলছে। "
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন জহুরুল সাহেব। গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ ভাবলেন। অতঃপর বললেন,
" একটা সল্যুশন পেয়েছি। "
তানসীভ নির্বিকার দাঁড়িয়ে।
" বিয়ে। হ্যাঁ বিয়ে করে ফেলো। "
ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সুঠামদেহী মানুষটা। জহুরুল সাহেব বলে চলেছেন,
" অ্যাজ স্যুন অ্যাজ পসিবল বিয়ে করে ফেলো। মিডিয়ার মুখ বন্ধ করা দরকার। আগামী বছর আমাদের জন্য বড় সুযোগ আসতে চলেছে। টার্নিং পয়েন্ট। এই পিক টাইমে এসে এভাবে মানসম্মান খোয়ানো যাবে না। "
একটুখানি থেমে,
" মিডিয়া তো জানে না মেয়েটা কে। যখন সময় হবে তোমার বিবাহিতা স্ত্রীকেই ওই মেয়ের জায়গায় দাঁড় করানো হবে। সবাই ভাববে ছবির মেয়েটা তোমার স্ত্রী ছিল। ব্যস ঝামেলা শেষ। "
কিছু মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলো তানসীভ। মনে মনে কিসব ছক কষে নিলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো,
" আপনি সিরিয়াস? "
" অলওয়েজ। "
" অ্যারেঞ্জমেন্ট করুন। "
আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না মানুষটা। বড় বড় কদম ফেলে বেরিয়ে গেল স্টাডিরুম থেকে। জীবন তাকে বারংবার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে। শেষমেষ বিয়ের মতো একটা বিষয়ে এমন জ'ঘন্য নাটকীয়তা! অকল্পনীয় বটে! তবে তাকে এটা করতেই হবে। ফর দ্য ফিউচার।
চলবে।