#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[২৭]
" মা! তুমি এসব কি বলছো? "
অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে লাজুক! কোনোভাবে বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না সংবাদটুকু। পাশেই বসা মা সুমনা বেগম। উনি মমতাময়ী রূপে ছোট মেয়ের কাছে এগিয়ে এলেন। আলতো করে ধরলেন মেয়ের হাত।
" এভাবে বলিস না মা। আমরা কি তোর পর, বল? তোর বাবা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেক ভেবেচিন্তে ই নিয়েছেন।"
লাজুকের মাথা কাজ করছে না যেন। ঘেমে জবজবে শরীর। এলোমেলো কিছু চুল কানের পেছনে গুঁজে নিলো। ঠোঁট গোল করে তপ্ত শ্বাস ফেললো রমণী। মিহি কণ্ঠে বললো,
" মা! তুমি কি আদৌও বুঝতে পারছো তুমি কি বলছো? ওই মির্জার সাথে ভাইরাল ছবিটায় নয়ন। আমি নই। বিয়ে যদি করতেই হয় নয়ন। উঁহু। কিসব বলছি আমি? ওর বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি? "
বিভ্রান্তিকর অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছে লাজুক। কথাগুলো বারবার জড়িয়ে যাচ্ছে। কোনোমতে নিজেকে শান্ত করলো সে।
" ওই লোকটার বিয়ে করতে মন চাচ্ছে। ভালো কথা। ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিক। আমি এখানে কোথা থেকে আসছি? আমরা একে অপরকে চিনি নাকি জানি? ওইদিন শপিংমলেই তো প্রথম দেখা। "
" লাজুক মা আমার। সোনা মা। তুই ঠিক কথাই বলেছিস। ওনারা ভালো একটা মেয়ে খুঁজছেন ছেলের জন্য। আর তোর বাবাকে তো বড় স্যার খুব ভালো করেই চেনেন। জানেন। বিশ্বাস করেন। এতটাই বিশ্বাস করেন যে.. "
" ওনার ছেলের জন্য আমাকে চেয়ে বসলেন? "
বাকি কথাটুকু সমাপ্ত করলো লাজুক। সুমনা বেগম ইতিবাচক মাথা নাড়লেন।
" হু। তোর বাবার কাছে এত করে অনুরোধ করলেন যে তোর বাবা আর মানা করতে পারলেন না। "
" তোমরা এমনটা কি করে করতে পারো? যে কাণ্ড নয়ন ঘটিয়েছে তার জন্য আমাকে দয়া করে শাস্তি দিয়ো না। "
কান্নায় ভেঙে আসছে কণ্ঠস্বর। ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি।
" এভাবে বলিস না মা। তুই না আমার ভালো মেয়ে? ছেলেটা ভালো। শিক্ষিত। ধনী পরিবার। হ্যাঁ একটু বখে গেছে। বড়লোকের ছেলেরা অমন একটুআধটু বখে যায়। কিন্তু ছেলেটার চারিত্রিক কোনো সমস্যা তো নেই। আলহামদুলিল্লাহ্। ওই বাকি যেসব ত্রুটি আছে, দেখবি বিয়ের পর ইনশাআল্লাহ্ ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। জানিস তো বউ পেলে ছেলেরা এমনিই শান্ত, ভেজা বেড়াল হয়ে যায়। "
" এটা নাটক, সিনেমা নয় মা। বাস্তবতায় ফিরে আসো। দয়া করে একটু বোঝার চেষ্টা করো। আমরা একে অপরের জন্য নই। আমরা টোটালি ভিন্ন দুই দুনিয়ার মানুষ। একে অপরের সঙ্গে.. যায় না কোনোভাবে। "
লাজুক নানাভাবে বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে মা'কে বোঝানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ঘুরেফিরে ফলাফল একটাই। শূন্য। যে ব্যক্তি জেদ ধরে যুক্তিতর্ক এড়িয়ে যায়, তাকে বেলাশেষে বোঝানো বড় মুশকিল। লাজুক মা'কে বোঝানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। স্বল্পভাষী বাবার সঙ্গে সাহস করে একবার কথা বলার চেষ্টা করলো। লাভ হলো না। আপু আফসানা তখন সদ্য অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সুসংবাদ পেয়েছে। শরীরের অবস্থা বিপর্যস্ত। নাজুক। সে-ও মা'কে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করলো। মা-বাবা যেন সন্তানের সুখ দেখার লোভে অন্ধ হয়ে গেলেন। ভূত-ভবিষ্যৎ বিচার বিবেচনা করলেন না। ভালো প্রস্তাব। ধনী পরিবার। ছেলে ইনশাআল্লাহ্ বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। অকাট্য এক যুক্তি। এই যুক্তির বলিদান হলো লাজুক নূরাইন। মেয়েটা নম্র, ভদ্র। পিতা-মাতার বাধ্য সন্তান। মায়ের ভাষ্যে ওনার সোনা মা। মেয়েটা নিজ জায়গা থেকে বেশি কিছু করতে ব্যর্থ হলো। পারলো না মা-বাবার মুখের ওপর দুই চার কথা শুনিয়ে বিয়েটা ভেস্তে দিতে। পারলো না উঁচু গলায় তাদের অসম্মানজনক কথা বলতে।
ধীরে ধীরে বুকের ভেতর অভিমানের সুউচ্চ পাহাড় সৃষ্টি হলো। বিশেষ করে মায়ের প্রতি। মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন সে। সে-ই মা ই ওকে বুঝতে পারলো না! এভাবে পর করে দিলো? রবের প্রতি সীমাহীন ভরসা এবং মা-বাবার প্রতি অভিমান। দুইয়ের সংমিশ্রনে বিয়েতে মত দিতে বাধ্য হলো লাজুক। দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল চোখের পলকে। বিয়ের আগে ওই মির্জার মুখোমুখি হয়নি সে। না ওপাশ থেকে কোনোরকম আগ্রহ দেখানো হয়েছে। না দেখিয়েছে সে। এরপরের ঘটনাগুলো কেমন নাটকীয়তার সহিত এগিয়ে গেল। যথাসম্ভব আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের প্রথম রাতেই অনাকাঙ্ক্ষিত সে-ই বি'ষবাক্য। বিয়েটা করতে চায়নি মির্জা। সদ্য বিবাহিত স্বামীর মুখনিঃসৃত গম্ভীর স্বরে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল যেন। দ্রুততার সহিত নিজ আবেগ লুকাতে সক্ষম হলো লাজুক। সে-ও দমে গেল না। মানসিক শান্তি বজায় রাখতে শুনিয়ে দিলো সত্যিটা। বিয়েটা সেও করতে চায়নি। কোনোরূপ দয়ামায়া যেন দেখানো না হয়। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ সে। কোনো ফ্যালনা কিংবা বোঝা নয়।
--
পুরনো দিনগুলো স্মৃতিচারণ করে লাজুকের মুখে লজ্জা মাখা হাসি ফুটলো। কি কাণ্ড করেই না বিয়েটা হলো!
' আমরা একে অপরের জন্য নই। আমরা টোটালি ভিন্ন দুই দুনিয়ার মানুষ। একে অপরের সঙ্গে.. যায় না কোনোভাবে। '
একথাই তো বলেছিল মা'কে। দেখতে দেখতে আজ কয়েকমাস পেরিয়ে গিয়েছে। সে-ই পঁচা, অনাকাঙ্ক্ষিত মির্জার সঙ্গে বিয়ের ছয়মাস পূর্ণ হতে চলেছে। মানুষটির কথা স্মরণ করতেই কেমন লাজে রক্তিম হলো রমণী। ঠোঁটে লাজ, অন্তরে সুখের ছোঁয়া।
•
মেঘলা রাতের থমথমে অন্ধকার। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে আছে হাইওয়ের পিচ ঢালা রাস্তা। লকড প্রিজন ভ্যানের ভেতরে দু-পাশে চারজন সশস্ত্র পুলিশ কনস্টেবল। হেভি শটগান উঁচিয়ে বসে আছেন। মাঝখানে লোহার বেঞ্চিতে দুই হাত-পায়ে ভারী শেকল, হ্যান্ডকাফ পড়া এস.কে। মাথা নিচু। চুপচাপ বসে রয়েছে। চুলগুলো এলোমেলো। মুখে মা'রপিটের পুরনো শুকিয়ে যাওয়া র'ক্ত। অন্ধকারে বিকারগ্রস্ত সাপের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে চোখজোড়া। পারভেজ হাওলাদার এবং রূপা মা'র্ডার কেসের পরবর্তী শুনানি পরশুদিন। আদালতে হাজির করা হবে তাকে। ওপর মহলের নির্দেশে কড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে সাধারণ কারাগার থেকে হাই-সিকিউরিটি এক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আজ। প্রিজন ভ্যানের একদম সামনে চালকের পাশের সিটে বসে আছেন একজন সিনিয়র অফিসার। ওয়াকিটকিতে যোগাযোগ রাখছেন এসিপির সঙ্গে। সব ঠিকঠাক চলছে। আকস্মিক ভ্যানের চাকা তীব্র গতির ব্রেক কষে স্কিড করলো। সামনের রাস্তা দিয়ে বিপজ্জনক ভঙ্গিতে চলে গেল বড় একটা লরি।
" আরে দেখেশুনে চালাবে তো। "
উঁচু গলায় সতর্ক করলেন সিনিয়র অফিসার। হঠাৎই পেছনে ভিন্ন কাহিনী শুরু হলো। লোহার বেঞ্চ থেকে ধপাস করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো এস.কে। নিজ শরীর মুচড়ে নিখুঁত, ভয়ংকর খিঁচুনির নাটক শুরু করলো। মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে লাগলো। চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলেন কনস্টেবলরা।
" এই কি হয়েছে তোর? দেখি। "
একজন কনস্টেবল মানবিক খাতিরে এস.কে'কে সোজা করতে নিচু হলেন। ঠিক তখনই ঘটলো অকল্পনীয় ধামাকা! এস.কের পায়ে থাকা ভারী শেকলের স্প্রিং লক, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আলগা করা। অকল্পনীয় ক্ষিপ্রতার সহিত কনস্টেবলের মুখে লা'থি মা'রলো সে। ছিটকে অদূরে পড়ে গেল কনস্টেবল। ঠিক সে মুহূর্তে আরেক কাণ্ড। এস.কের মুখের ভেতর লুকিয়ে রাখা বিশেষ চুইংগাম আকৃতির 'স্মোক-বম্ব'। দাঁত দিয়ে কা'মড়ে ছুঁড়ে মা'রলো গাড়ির জমিনে! সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে পুরো প্রিজন ভ্যানের অভ্যন্তর কুচকুচে কালো হয়ে গেল। বি'ষাক্ত রাসায়নিক ধোঁয়ায় ঢেকে গেল ভেতর। কনস্টেবলরা ঠিকমতো চোখ মেলতে পারছেন না। তীব্র কাশির চোটে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এদিক ওদিক হাতড়াতে লাগলেন তারা। সিনিয়র অফিসার ওয়াকিটকিতে চেঁচিয়ে চলেছেন। সহসা অন্ধকারের বুক চিরে শোনা গেল ভারী হ্যান্ডকাফের তীক্ষ্ণ ঝনঝনানি শব্দ!
চারদিকে ধোঁয়াশা আর যন্ত্রনাদায়ক শ্বাসকষ্ট। হ্যান্ডকাফ পরা দুই হাত একসাথে করে একজন কনস্টেবলের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরলো এস.কে। হেঁচকা টানে কোমর থেকে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিলো। সিনিয়র অফিসার দ্রুত ভঙ্গিতে প্রিজন ভ্যান থেকে বেরিয়ে পেছনদিকে ছুটে এলেন। ভারী লোহার দরজা বাইরে থেকে খুলে ফেললেন। এখানেই হলো চরম ভুল। ধোঁয়ার মেঘ ঠেলে নি'ষ্ঠুর ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো এস.কে। রিভলবার থেকে একাধারে গু'লি ছুঁড়ে চলেছে। সিনিয়র অফিসার পাল্টা গু'লি চালালেন। যন্ত্রনাকাতর পুলিশ বাহিনী পজিশন নেওয়ার আগেই, অন্ধকারের সুযোগ নিলো এস.কে। প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে এলো। দৌড়ে ঢুকে পড়লো পাশের অন্ধকার গলিতে। পুলিশ সদস্যরা টর্চের আলো ফেলে ধাওয়া করলেন। গলির ভেতর নামলো বুলেটের বৃষ্টি। তবে ব্যর্থ হলেন তারা। কিছুদূর এগিয়ে আঁধার মাঝে ভূতুড়ে ভঙ্গিতে থেমে গেল এস.কে। ঠোঁটে ক্রুর হাসি। এক ঝটকায় মেইন হোলের ভারী লোহার ঢাকনা সরিয়ে ফেললো পা দিয়ে। পুলিশ খুব নিকটে। ধেয়ে আসছে ঝড়ের বেগে। কোনোরূপ দ্বিধা না করে এস.কে সরাসরি ঝাঁপ দিলো। ড্রেনেজ লাইনের ভেতর! হারিয়ে গেল ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ লাইনের অন্ধকার গোলকধাঁধায়। পুলিশ যতক্ষণে এসে পৌঁছালো ততক্ষণে কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে সিনিয়র অফিসার! সাধারণ কোনো কয়েদী নয় এই এস.কে। চরম বিকারগ্রস্ত এক সাইকোপ্যাথ সে। মস্তিষ্কের আগাগোড়ায় যার ভ'য়ঙ্কর ত্রুটি।
•
রাত তখন গভীর। আশুলিয়ার ডুপ্লেক্স বাড়ি। ইনডোর সুইমিং পুলের পরিবেশ বড় নিঝুম। পানির নিচের নীলচে আলো পুলের স্বচ্ছ জলরাশিকে দিয়েছে মোহনীয়, মায়াবী রূপ! হিমশীতল জলের বুক চিরে দ্রুত গতিতে সাঁতার কেটে চলেছে তানসীভ। এস.কে পালিয়েছে। বি'ষধর সাপ পালিয়েছে সাপুড়ের আস্তানা থেকে। অত্যধিক চাপে মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। সমস্ত ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা দূরীকরণ করতে এক নাগাড়ে সাঁতার কেটে চলেছে মানুষটা। অতিবাহিত হয় কিছু মুহূর্ত। পুলের এক কিনারে পানির ওপর মাথা তুললো তানসীভ। চওড়া বুক, অবিন্যস্ত ভেজা চুল বেয়ে জলকণারা চকচক করে গড়িয়ে পড়ছে। চিন্তিত মুখভঙ্গি। সহসা পুলের পাড়ে উপস্থিত হলো লাজুক। দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো স্বামীর ভেজা অবয়বে। ধীরে ধীরে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো রমণী। অবিন্যস্ত চুল। ভেজা বুক। ফোলা বাহু। শক্ত চোয়াল। সবশেষে সিগারেটে পোড়া ঠোঁটে এসে চোখজোড়া স্থির হলো। শিরশিরিয়ে কেঁপে উঠলো অন্তঃস্থল। কেটে গেল ঘোর। স্বাভাবিক হলো দৃষ্টিভঙ্গি। চিন্তিত মানুষটাকে লক্ষ্য করে মায়া হলো। মানুষটা সর্বদা এমন করে। মাথার মধ্যে যেন পুরো পৃথিবীর টেনশন নিয়ে ঘোরে। কাউকে কিচ্ছু বলেও না। সাহায্যও নেয় না। নিজেকে একচ্ছত্র বীরসেনা মনে করে নাকি?
ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠলো। ধীরপায়ে এগিয়ে এলো লাজুক। পুলের একদম কিনারায় এসে বসলো। ফর্সা পা দু'টো ডুবিয়ে দিলো পুলে। তানসীভের ঠিক সামনে। চিন্তা মগ্ন মানুষটি। ওর উপস্থিতি টের পায়নি এখন অবধি। বাহ্! বড় আশ্চর্যের বিষয়! পা দু'টো নেড়েচেড়ে পুলের পানিতে মায়াবী ঝঙ্কার তুললো রমণী। ভাবনায় ছেদ পড়লো। তানসীভ ভ্রু কুঁচকে গভীর, অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকালো স্ত্রীর দিকে। সালোয়ার কামিজ পরিহিতা রমণী। ওড়না শোভা পাচ্ছে দেহের ঊর্ধাংশে। খোলা চুল। কোমলমতীর পুরো অবয়বে চোখ বুলিয়ে দৃষ্টি স্থির হলো ভেজা ফর্সা পায়ে। অ্যাডমস অ্যাপল দ্রুত ওঠানামা করলো। চোখ বুঁজে মাথা ঘুরিয়ে নিলো তানসীভ। গম্ভীর স্বরে বললো,
" ঘুমাওনি? "
" রাতে ঘুম ঘুম ঘুম আসে না। "
মায়াবিণী সুর তুললো কেমন মা'দকাচ্ছন্ন ভঙ্গিতে। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো তানসীভ।
" ঘরে যাও। ঠাণ্ডা লাগবে। "
" আপনার লাগবে না বুঝি? "
তাকালো তানসীভ।
" তুমি, আমি এক নই। "
" সে তো মোটেও নই। জেন্ডার ভিন্ন। হি হি। "
বোকা হাসলো লাজুক। মানুষটার চিন্তা দূর করতে কিসব আবোলতাবোল বকে চলেছে সে। করছে স্বভাব বিরুদ্ধ আচরণ। হঠাৎ বলে উঠলো,
" আজ রাতটা পুলে কাটানোর ইচ্ছা আছে নাকি? "
ভ্রু কুঁচকে তাকালো মানুষটা। লাজুক পানিতে ভেজা অবয়ব ইশারা করে বললো,
" কত রাত হয়েছে, খেয়াল আছে? উঠে আসুন। ঘুমাবেন না? "
একটু একটু করে এগিয়ে এলো মানুষটা। ভেজা চুল বেয়ে পড়ছে পানি। আলতো ছোঁয়ায় ধরলো রমণীর দু গোড়ালি। বরফশীতল পানির স্পর্শে নাকি এই তীব্র পুরুষালি স্পর্শে! জানা নেই। শিউরে উঠলো লাজুক। একটু একটু করে মসৃণ, ভেজা ত্বক বেয়ে ওপরে উঠলো রূক্ষ হাত জোড়া। কম্পিত চিত্তে বসে রমণী। কাঁপছে ঠোঁট। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে অবাধ্য আবেশে। পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়ে স্বল্প উঁচু অবধি এলো হাত দু'টো। থেমে গেল হাঁটু হতে সামান্য নিচে। আকস্মিক এই নিবিড়তায় স্তব্ধ হয়ে গেল বাতাস। গভীর সম্মোহনে, স্থিরচিত্তে বললো পা'ষাণ পুরুষ,
" আগুন নিয়ে খেলতে এসো না মেয়ে। জ্বলেপু'ড়ে ভ'স্ম হয়ে যাবে। "
ধারালো সতর্কবাণী। এক ইঞ্চিও পিছপা হলো না রমণী। গভীর, অন্তর্ভেদী চোখের মনিতে চোখ রাখলো। লাজ, সংকোচ আজ পালাই পালাই।
" দিবারাত্রি অনলের তীব্রতায় জ্বলেপু'ড়ে ছারখার হচ্ছি। আর কতকাল পোড়াতে ইচ্ছুক? সময়টুকু জানিয়ে অন্তত শান্ত করুন এই আমাকে। "
লাজুকের মুখনিঃসৃত অকাট্য আত্মসমর্পণ। তানসীভের পুরুষালি কাঠিন্য এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হলো। গোড়ালি বরাবর আকস্মিক জোরালো টান। নীলচে পানিতে প্রগাঢ়-মায়াময় আলোড়ন সৃষ্টি হলো। দিশেহারা লাজুক সরাসরি আছড়ে পড়লো তানসীভের প্রশস্ত, উন্মুক্ত ভেজা বুকের ওপর। পরিহিত পোশাক, মসৃণ চুল পানিতে ভিজে লেপ্টে গেল শরীরে। পুলে আকস্মিক এই পতন। চরম আতঙ্কে বন্ধ হলো রমণীর চোখের পাতা। দু হাতে আঠার মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সঙ্গীর গলা। পেলব দেহটা পানির অতলে মিশে রয়েছে পুরুষালি দেহের সঙ্গে। তানসীভ এক হাতে লাজুকের কোমর জড়িয়ে রাখা। অপর হাতে মুখের ওপর থাকা ভেজা চুলগুলো সযত্নে সরিয়ে দিলো। পুলের মৃদু আলোয় ভেজা ঠোঁট। র'ক্তিম গাল। অপার্থিব, তীব্র মা'দকতা সৃষ্টি করলো। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো লাজুক। নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ছুঁয়ে চলেছে স্বামীর চিবুক। লাজে লাল হয়ে কম্পমান, নিচু গলায় বললো রমণী,
" খুব বেয়াড়া হয়ে গেছেন আপনি। একদম.. অন্যরকম। "
গভীর, তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে তানসীভ। বললো,
" বুকের মাঝে আজ তৃষ্ণার দাবানল। একটুখানি নিভিয়ে দেবে? নূর! "
সজ্ঞানে এই প্রথম নামটা শুনলো লাজুক। শিউরে উঠলো আত্মা। নূর সে? নূরাইন থেকে নূর? নাকি তানসীভের জীবনে এক টুকরো নূরের আলো? অস্ফুট স্বরে আওড়ে ওঠে রমণী,
" নূর! "
কপালে ঠেকে যায় কপাল। নত হয় চোখ। তপ্ত শ্বাস আছড়ে পড়ে অপরজনের মুখে। লাজুকের নিবিড় চাহনি। কম্পিত ঠোঁট। নে'শার ঘোরে আচ্ছন্ন করে তোলে। অপরিমেয় তৃষ্ণা মিশে প্রতিটি শব্দে,
" মাই নূর! ইউ আর দ্য ওনলি কিউর ফর দিস বার্নিং সোল। "
লাজুক কিছু বলবার পূর্বে বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো শিহরণ। পরম আবেশে সঙ্গিনীর ভেজা, কম্পিত ঠোঁটে হারিয়ে গেল তানসীভ। পানির অতলে গাঢ় হলো দুই উষ্ণ শরীরের অবাধ্য নিবিড়তা।
-
ঘরের ভেতর মায়াবী নীলচে আলো। অবর্ণনীয় লাজে র'ক্তিম রমণী। সিক্ত দু'টো দেহ। রমণী লাজে রাঙা দৃষ্টি লুকোতে ব্যস্ত। সে ব্যস্ততায় মানুষটির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো মোহনীয় হাসি। প্রতিটি পরশ বড় সাবধানী। আদুরে। মিশে রয়েছে পরম তৃষ্ণা, তীব্র ব্যাকুলতা। ভেতরকার সবটুকু সংকোচ, জড়তা আজ কেটে গেল চিরতরে। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টির অবিরাম সুর। অভ্যন্তরে উষ্ণতার খোঁজে বেয়াড়া নিবিড়তা।
•
নিকষ কালো রাত। শুনশান সরু গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে বাইক। বাইকে আয়েশি ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তানসীভ। ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট। বিদঘুটে, বি'ষাক্ত ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়। অন্ধকারের মাঝে জ্বলজ্বল করে চলেছে শিকারী দৃষ্টি। অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হলো না। গলির ঠিক বিপরীত প্রান্তে অন্ধকার কাটিয়ে দৃশ্যমান হলো একটি সিভিল কার। থামলো কাছাকাছি। গাড়ি হতে বেরিয়ে এলেন এসিপি সাদমান সিদ্দিকী। পরিহিত পোশাক সাধারণ। আইনী রক্ষকের পোশাক নয়। অন্ধকার সরু গলিতে মুখোমুখি হলো দুই পরম শত্রু। ন্যায় বনাম অন্যায়। কিন্তু শিকার একটাই। তিন হাত দূরত্বে এসে থামলেন সাদমান সিদ্দিকী। বাতাসে ধোঁয়া ছড়িয়ে ত্যাছড়া হাসলো তানসীভ।
" পরাজয় হজম করতে এত কষ্ট? রাতবিরেতে ডেকে পাঠিয়ে বউকে তাঁতিয়ে তুলছেন যে! "
সুক্ষ্ম খোঁচা হজম করে নিলেন সাদমান। বিপরীতে বলে উঠলেন,
" কি করবো বলুন? বউ নেই তো। সময়জ্ঞানের অত খেয়াল থাকে না। বিরক্ত হওয়ার মানুষটা খুঁজে পাইনি এখনো। "
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো দুর্বোধ্য হাসি। সাদমান সিদ্দিকী পকেট হতে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। লাইটার হাতড়ে টের পেলেন, তা অনুপস্থিত। বিরক্তি সূচক 'চ' শব্দ করলেন। হঠাৎই গুড থ্রো। সঠিক সময়ে ক্যাচ ধরতে সক্ষম হলেন এসিপি। লাইটার পাকড়াও করে প্রশংসা করলেন বুঝি,
" গুড শট! "
" কাম টু দ্য পয়েন্ট। "
লাইটার দিয়ে সিগারেটে আগুন ধরাতে ধরাতে সাদমান সিদ্দিকী বললেন,
" এস.কে পালিয়েছে.. "
" নাকের ডগা দিয়ে। "
" হ্যাঁ। আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এস.কে'কে এভাবে হেলাফেলা করা উচিত হয়নি। আরো সাবধান হওয়া উচিত ছিল। ডিপার্টমেন্টের ভেতরে যে কালসাপ লুকিয়ে ছিল আগেভাগে টের পাইনি। "
" ওকে ধরার ক্ষমতা আপনার ওই অফিশিয়াল লেগাল বুকের কোনো ধারায় নেই। "
কন্ঠে স্পষ্ট বিদ্রুপাত্মক ভাব। বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লো। সাদমান সিদ্দিকী দাঁতে দাঁত চাপলেন। তানসীভ একদম সত্য, নি'র্মম জায়গায় আঘাত করেছে। আইনি সীমাবদ্ধতা, উপর মহলের পলিটিক্যাল প্রেসার। সব মিলিয়ে ওনার হাত বাঁধা। অপরিসীম আইনী সীমাবদ্ধতায় বন্দী উনি। তপ্ত শ্বাস ফেললেন এসিপি। ওনার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় জুয়া খেলতে এসেছেন আজ। সোজাসাপ্টা বলেই ফেললেন,
" অফিশিয়াল ব্যাকআপ, লেগাল ইমিউনিটি আমি দেবো। আপনি পুরো আন্ডারগ্রাউন্ড ডার্ক নেটওয়ার্ক অ্যাক্টিভ করুন। "
মির্জা তানসীভ শাহ্-র অদম্য, পাথরের ন্যায় শান্ত চোখ। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন সাদমান সিদ্দিকী। অতঃপর অমোঘ প্রস্তাব পেশ করলেন,
" লেটস্ মেক আ ডিল। "
বরফশীতল, ক্রু'র হাসি ফুটে উঠলো মানুষটার ঠোঁটে। বাইক হতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। চোখে খেলা করছে কৌতুক, আত্মবিশ্বাস।
" অ্যাট লাস্ট আন্ডারগ্রাউন্ডের কাছে হাঁটু মুড়লো আইন?"
দাঁতে দাঁত চেপে পরিস্থিতি হজম করতে লাগলেন সাদমান সিদ্দিকী। পরিস্থিতি আজ ওনায় এখানে দাঁড় করিয়েছে। আইনের দৌড় যেখানে শেষ হয়, মির্জা তানসীভ শাহ্-র রাজত্ব সেখান থেকে শুরু। শিকারকে জ্যান্ত খাঁচায় বন্দী করতে ন্যায়-অন্যায়ের যৌথ মিলন আজ অত্যাবশ্যক। হয়ে যাক না কিছু মুহুর্তের জন্য বেআইনীর সঙ্গে সমঝোতা! পদতলে চাপা পড়লো সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটুকু। তানসীভের চোখে ক্ষুরধার শিকারী চাহনি। মস্তিষ্কে চলছে নানাবিধ হিসাব।
' লেটস্ হান্ট ডাউন দ্য প্রে। '
চলবে।