ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

২৮তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[২৮] [ প্রাপ্তমনস্কদের জন্য ]

চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নদীর পঁচা পানি। বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে কটু গন্ধ। ঘাটে বাঁধা পুরনো দু'টো পরিত্যক্ত লঞ্চ। মরিচা ধরা ক্রেনের লোহাগুলো অন্ধকারের বুকে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে। বড় ভূতুড়ে। বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে চাঁদের আলো ঝিলমিল করছে। ভ'য়ঙ্কর, মায়াবী সেই সৌন্দর্য! পিঠে শক্ত করে চেপে রাখা ট্রাভেল ব্যাগ। নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে এস.কে। রহস্যময় চোখে তাকিয়ে বুড়িগঙ্গার কুৎসিত সৌন্দর্যে। ঠোঁটে কুটিল হাসি। টিকটিক করে সময় অতিবাহিত হয়। আস্তে ধীরে দৃশ্যমান হয় আকাঙ্ক্ষিত যান। ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা এগিয়ে আসছে তার উদ্দেশ্যে। একটু একটু করে দৃষ্টি সীমার মধ্যে চলে আসে। একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। পরিত্যক্ত এই ঘাটে থেমে যায় নৌকা। মাঝি নৌকা থেকে নেমে আসে ঘাটে। অগ্রসর হয় এস.কের উদ্দেশ্যে।

" চলেন বস। "

এস.কের শান্ত চাহনি ধীরে ধীরে বদলে যায়। জাগ্রত হয় ন'রপিশাচ সত্ত্বা। আকস্মিক ভয়ানক এক আ'ক্রমণ। নৌকার লৌহ ধাতব কিনারে ধপাস করে আছড়ে পড়ে মাথাটা। পরপর চারবার নি'ষ্ঠুর আঘাত। র'ক্তে র'ক্তে রঞ্জিত হয় নৌকার কিনারা। থেঁ'তলে যায় মাথার একপাশ। অতঃপর মাঝির র-ক্তাক্ত মাথাটা চেপে ধরে বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে। দেহের সর্বশেষ শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা করে মাঝি। তীব্র গতিতে ছটফট করে হাবুডুবু শরীর। দাঁতে দাঁত চেপে মাথাটা আরো নি'র্মমভাবে পানিতে চেপে ধরে এস.কে। ধীরে ধীরে ক্ষয় হয় শক্তি। উড়ে যায় প্রাণবায়ু। দা'নবীয় হাসি ফুটে ওঠে এস.কের মুখে। সহসা চারপাশ থেকে তীব্র আলো ঘিরে ফেলে তাকে। কর্কশ স্বরে বিড়বিড় করে ওঠে এস.কে,

' কাম বেবি। লেটস্ এনজয় দ্য গেম। '

পৈ'শাচিক উল্লাসে মুঠোবন্দী হাত শূন্যে তোলে এস.কে। একে একে খুলে যায় প্রতিটি আঙ্গুল। ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর। ফাইভ। বুম্! পুলিশের গাড়িগুলো সন্নিকটে চলে এসেছে। একদম সীমারেখার গণ্ডিতে। ঠিক সে মুহূর্তে বুম্! ভ'য়ানক এক মরণফাঁ'দে আটকা পড়ে সামনে থাকা পুলিশের প্রথম গাড়ি। তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয় পরিত্যক্ত ওই ঘাটে। আগুনের এক বিশাল গোল্লা উঠে গেল মেঘের দিকে। বাতাসে ডিগবাজি খেলো গাড়ি। প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়লো লৌহ জমিনে। লোহা, কাঁচের টুকরো চারদিকে তীরের মতো ছিটকে ছিটকে পড়লো। ভ্যানের ভেতরে থাকা পুলিশ অফিসারদের আহত, র"ক্তাক্ত শরীর ছড়িয়ে পড়লো এদিক-ওদিক। বিকারগ্রস্ত, নি'ষ্ঠুর হাসি ফুটে ওঠে এস.কের মুখে। অক্ষত বাকি গাড়িগুলো থেমে গেল নিরাপদ দূরত্বে। তৎক্ষণাৎ গাড়ি হতে বেরিয়ে এলো স'শস্ত্রবাহিনী।‌ নিজ নিজ পজিশন নিলো। মুহুর্তের মধ্যেই শুরু হলো র"ক্তক্ষয়ী সং'ঘর্ষ। আঁধার চিরে হঠাৎই কোথা থেকে উদয় হয় এক ঝাঁক কুকুর। রটউইলার, ডোবারম্যানের রা'ক্ষুসে বাহিনী। মুখের লালা, ধারালো দাঁতগুলো আঁধার মাঝে চকচক করছে। দা'নবাকার কালো কুচকুচে কুকুরগুলোর সম্মিলিত গর্জনে কেঁপে ওঠে আকাশ বাতাস। স্তব্ধ হয়ে যায় পুলিশ সদস্যরা! প্রতিপক্ষ হিসেবে মানুষ প্রত্যাশা করেছিল তারা। কিন্তু কুকুর? কুকুরের মোকাবেলা করবে কি করে? গু'লি ছুঁড়বে তো কোথায় ছুঁড়বে, বুঝে ওঠার আগেই হা'মলা করে বসে বিদেশি জাতের রা'ক্ষুসে ট্রেনিং প্রাপ্ত কুকুরগুলো। একে একে হামলে পড়ে পুলিশদের ওপরে। বডি-আর্মর, ভারী বুট এবং ট্যাকটিক্যাল গিয়ার পরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ট্যাকটিক্যাল শিল্ড ব্যবহার করে তারা এই অপ্রত্যাশিত শত্রু বাহিনীকে আটকানোর চেষ্টা করে চলেছে।

ঘাটের ওপর বেশ দূরে বিছানো ট্র্যাভেল ব্যাগ। তাতে মাথা রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে এস.কে। পায়ের ওপর পা তুলে রাখা। ধূলোময় ঘাটে শান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে সে। চোখ বন্ধ। কানে হেডফোন। চলছে ইংরেজি গান। গানের প্রতিটি বিটের তালে তালে দুলছে পুরো শরীর। সে যেন কোনো কনসার্টে বসে মৃ"ত্যুর অর্কেস্ট্রা উপভোগ করে চলেছে। হঠাৎ থমকে গেল বাতাস। সুউচ্চ যান্ত্রিক গর্জন তুলে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করলো কালো কুচকুচে বাইক।‌ পিছুপিছু আগমন হলো মির্জার সুপ্রশিক্ষিত বাহিনী। বাইক হতে নেমে এলো তানসীভ। দু চোখ ক্ষুধার্ত বাঘের ন্যায় জ্বলজ্বল করে চলেছে। আশেপাশের ন'রককুণ্ড তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অবলোকন করলো সে। এস.কের বি'ধ্বংসী অ্যানিম্যাল ট্যাকটিক্স ধীরে ধীরে বোধগম্য হলো। কানে ইয়ারবাড। সুতীক্ষ্ম ভঙ্গিতে দ্রুত আদেশ জারি করলো সে,

" নিজাম.. ইমিডিয়েটলি 'অ্যাকোস্টিক ডিভাইস' অ্যাক্টিভ কর! বাপ্পী, তোফায়েল.. ফ্লেয়ার গান (Flare Gun) ফায়ার কর! রাইট নাউ। "

নিজাম দ্রুত পায়ে ছুটে গেল তাদের একটা গাড়ির কাছে। ফটাফট ঢুকে পড়লো ভেতরে। ঠিক সে মুহূর্তে ক্ষুধার্ত কুকুর একটা বৃথা হামলে পড়লো বন্ধ দরজায়।‌ সেদিকে বিন্দুমাত্র মনোনিবেশ করলো না নিজাম। দ্রুতগতিতে নিজের সবচেয়ে কার্যকরী সঙ্গী ল্যাপটপ অন করলো। এক, দুই করে পেরিয়ে গেল বেশ কিছু মুহূর্ত। অতঃপর চালু হলো হাই-ফ্রিকোয়েন্সি 'অ্যাকোস্টিক ডিভাইস'। কুকুরের শ্রবণেন্দ্রিয় বড্ড সংবেদনশীল।‌ মানুষের কানে এই শব্দ পুরোপুরি স্পষ্টভাবে পৌঁছাতে ব্যর্থ। কিন্তু কুকুরগুলো ঠিক শুনতে পেল। মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য-ভয়ানক কম্পন আঘাত করলো কুকুরগুলোর মস্তিষ্কে। রা'ক্ষুসে কুকুরগুলো কা'মড়ানো ছেড়ে একে একে যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। গর্জন তুলে আর্তনাদ করতে লাগলো। রূক্ষ থাবায় যথাসম্ভব চেপে ধরতে চাইলো কান। ভেস্তে গেল আ'ক্রমণাত্মক ভাব। অপরদিকে বাপ্পী, তোফায়েল করলো আরেক কাণ্ড। ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ফ্লেয়ার গান ব্যবহার করতে শুরু করলো। বুনো প্রাণী স্বভাবতই আগুনে ভয় পায়। ভয়ে, আতঙ্কে রটউইলারগুলো দিক হারিয়ে উল্টো দিকে পালাতে শুরু করলো।

কুকুর বাহিনীর এই আকস্মিক পতন। সাথে অ্যাকোস্টিক শব্দ তরঙ্গের গ্লিচ। এস.কের হেডফোনের সিগন্যাল হঠাৎ জ্যাম হয়ে গেল। ইংরেজি গানের সুর কেটে গিয়ে সেখানে তীক্ষ্ণ কানফাটানো আওয়াজ হলো। এক ঝটকায় চোখ মেলে তাকালো এস.কে। আয়েশি ভঙ্গি হারিয়ে গেল মুহুর্তেই। বিজয় উল্লাসে অত্যধিক ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে। এখানেই করে বসলো জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ধোঁয়া, আগুনের কুণ্ডলী ঠেলে বীরদর্পে এগিয়ে আসছে মির্জা তানসীভ শাহ্। চোখে খু'নে অভিব্যক্তি। হাতে রি'ভলবার। কঠোর শিরা উপশিরা। আকস্মিক আগত শত্রুদের উদ্দেশ্যে গু'লি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ময়দানে উপস্থিত হলেন এসিপি সাদমান সিদ্দিকী। প্রতিপক্ষ এতক্ষণ লুকিয়ে ছিল আশেপাশে কোথাও। হঠাৎ উদয় হয়েছে রণক্ষেত্রে। এসিপির সুদক্ষ বাহিনী তাদের সামলাতে মরিয়া। চোখে ঘন অন্ধকার দেখছে এস.কে। গোটা সাম্রাজ্য বুঝি ধূলোয় মিশে যাওয়ার উপক্রম।

' এস.কে! আফটার লং টাইম! ডিড ইয়্যু.. লাইক ইট? '

গূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তানসীভ। ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসি। আকস্মিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো এস.কে। পাতলা জ্যাকেটের ভেতর থেকে বের করে আনলো পি'স্তল। বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে সরাসরি তানসীভের বুক লক্ষ্য করে ট্রিগার চাপলো। এক ঝটকায় পাশে ডাইভ দিলো তানসীভ। বু'লেট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। আরম্ভ হলো ম'রণঘাতী লড়াই। দৈহিক বল প্রয়োগ করে একে অপরকে হারাতে বদ্ধপরিকর দু'জনে। পি'স্তল এতক্ষণে ছিটকে পড়েছে জমিনে। আঘাতে আঘাতে র'ক্ত ঝড়ে পড়ছে। সাদমান সিদ্দিকী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াইয়ে মগ্ন। তানসীভ সামলাচ্ছে এস.কে। আঘাত, পাল্টা আঘাত। র'ক্তের বদলে র'ক্ত। অকস্মাৎ গু'লিবিদ্ধ হয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়লো বাপ্পী। আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তানসীভ। চোখের সামনে বিশ্বস্ত ছেলেটা চেতনা হারালো। মস্তিষ্কে ধপ করে আগুন জ্ব'লে উঠলো। অতীতের সমস্ত কর্মফল এক মুহুর্তে বাস্তবায়িত হলো যেন। চতুরতার সহিত ডাইভ দিয়ে অচেতন বাপ্পীর পাশে পৌঁছালো এস.কে। কেড়ে নিলো ছেলেটার হাতে থাকা পি'স্তল। তাক করলো তানসীভের চওড়া বুক বরাবর। ধাঁই করে ছুটলো বু'লেট। হঠাৎ পি'স্তল লুটিয়ে পড়লো জমিনে। স্তব্ধ হলো চোখের মণি। পরপর আরো দু'টো আঘাত। সামনে, পেছনে। সমানতালে বু'লেটের ভ'য়ঙ্কর ছোবল। বুকে, পিঠে বিদ্ধ হলো পরপর তিনটে গু'লি। সমস্ত অহংকার, পৈ'শাচিকতা, বুদ্ধিমত্তা এক নিমেষে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। পরাজিত, নিষ্প্রাণ চাহনি। ধপাস করে এস.কে লুটিয়ে পড়লো জমিনে। র'ক্তের লাল আভায় রঞ্জিত দেহ। চোখজোড়া খোলা। শূন্যতা ভরা ম্লান চাহনি। ধীরে ধীরে প্রাণবায়ু ত্যাগ করলো দেহ। রি'ভলবার হাতে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে তানসীভ। বুকের বাঁ পাশে বু'লেট ছুঁড়েছে সে। অপরদিকে এসিপি সাদমান সিদ্দিকী পিঠ বরাবর দু'টো গু'লি করেছেন। পরক্ষণেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন শত্রু নিধনে। থমকে দাঁড়িয়ে তানসীভ। হঠাৎই পাশ থেকে আক্রমণ। তানসীভ কনুই দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরলো শত্রুর। ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হলো এই রুদ্ধশ্বাস পতন।

•

মানসিক বিকারগ্রস্ত, জিনিয়াস সা'ইকোপ্যাথ এস.কে। গতরাতে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সে। বুড়িগঙ্গার পরিত্যক্ত ঘাটে আইন এবং বেআইনি বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে নিঃশেষ করে দেয়া হয়েছে তাকে। এস.কের মৃ"ত্যুর পর অতিবাহিত হয়েছে দশ ঘণ্টা। সকাল হতেই নজিরবিহীন আলোড়ন সৃষ্টি হলো দেশব্যাপী। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গৃহস্থ ঘর, মিডিয়া পাড়া। সর্বত্র একটাই ব্রেকিং নিউজ। হতবিহ্বল হয়ে গেল দেশবাসী! মুখোমুখি হলো এক নতুন, ভ'য়ঙ্কর সত্যের। বিজনেসম্যান পারভেজ হাওলাদার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রূপা। উভয়ের মা'র্ডার কেসে এসেছে নতুন মোড়। লাইভ মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে এস.কে কর্তৃক সংঘটিত অগণিত অপরাধের ডিজিটাল প্রুফ। এস.কের ডেড নিউজ আজকের রমরমা, গরমাগরম ব্রেকিং নিউজ। দেশের আপামর জনসাধারণ আজ প্রথমবারের মতো পরিচিত হলো অন্ধকারে নিমজ্জিত, কাল্পনিক এক গোলকধাঁধার সঙ্গে। নাম তার,

' শ্যাডো ওয়ার্ল্ড! '

সাধারণ জনগণের মনে তখন ঘুরপাক খাচ্ছে অসংখ্য প্রশ্ন..

' কে এই এস.কে? আগে কখনো তো নাম শুনিনি। '

' এটা কি সে-ই লোক যে কিনা গত বছর পলিটিশিয়ান হক'কে কট খাইয়ে দিলো? '

' নিউজে তো তাই বলছে। এই লোক বহুত ধুরন্ধর ছিল। অনেক হাই প্রোফাইল লোককে ব্ল্যাকমেইল করে কার্যসিদ্ধি করেছে।‌ '

' কি ভয়ানক লোক আল্লাহ্! '

' মির্জা তানসীভ শাহ্ তারমানে খু'নী নয়? নির্দোষ সে? '

' কি জানি বাবা। এসব স'ন্ত্রাসীদের ভ'য়ঙ্কর মারপ্যাঁচ আমরা সাধারণ পাবলিক বুঝবো না। এরা যে কে কখন নিজেকে বাঁচাতে অন্যকে কট খাইয়ে দেবে, আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানেন না। '

' এটা অবশ্য ঠিক বলেছো ভাই।‌ '

' লোকটা নাকি সাইকো ছিল। ভাবা যায়? একই শহরে এক সাইকোর সঙ্গে আমরা বসবাস করেছি।‌ '

' লোকটা যে সাইকো তার ডাবল মা'র্ডার কেসের নমুনা দেখেই তো বোঝা যায়। মাথায় তার ছেড়া আছে। '

' ভ'য়ঙ্কর লোক ছিল রে। ভাগ্যিস আমাদের মতো সাধারণ জনগণের ওপর কু নজর দেয়নি। নাহলে কবেই আমাদের স্মৃতিচিহ্ন মুছে যেতো। বউ বাচ্চা হয়তো কোনদিন লা'শটাও খুঁজে পেতো না। '

চায়ের দোকানে জমেছে আড্ডা। অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন বয়সী মানুষজন। সবার মনেই কিলবিল করে চলেছে বহু প্রশ্ন। যার উত্তর অজানা।

-

বিলাসবহুল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বেডরুম। ঘরের এলইডি মনিটরে চলছে লাইভ ব্রেকিং নিউজ। এস.কে মৃ'ত্যুর খবর। সেই সঙ্গে মির্জা তানসীভ শাহ্-র জয়ধ্বনি। অকল্পনীয় সাহসিকতার জন্য গুনগান। বিছানায় আধশোয়া হয়ে নিউজ দেখছিলেন জহুরুল সাহেব। রাতের নাইট ড্রেস এখনো পড়নে। এস.কের একেকটা গুমোর ফাঁ'স হয়ে চলেছে। চলছে একের পর এক কুকীর্তির কেচ্ছা। স্তব্ধতায় সংকুচিত হয়ে উঠলো চোখের মণি। থরথরিয়ে কাঁপছে পুরো শরীর। বুকের ভেতর তীব্র কা'মড়। যন্ত্রনা অনবরত মোচড় দিয়ে চলেছে। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরলেন হাত। ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল। বিড়বিড় করে উঠলেন,

' তানসীভ! '

শেষমেষ ওনার তিলে তিলে গড়ে তোলা অভিশ'প্ত এই পাপের রাজত্ব কি.. চূড়ান্ত, র'ক্তক্ষয়ী সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! নিজের ঔরসজাত পুত্রের হাতেই ঘটবে ওনার চির সমাপ্তি! বুকের ব্যথা ক্ষণে ক্ষণে বেড়ে চলেছে। দরদর করে ঘামছেন তিনি। নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেলেন বিছানায়। ব্লাড প্রেশার হাই।

•

কালবৈশাখী ঝড়ের শেষে শান্ত, সতেজ রূপ ধারণ করেছে পরিবেশ। অভিশ'প্ত সে-ই রাতের পর অতিবাহিত হয়েছে এক সপ্তাহ। ধীরে ধীরে চেনা ছন্দে ফিরে আসার চেষ্টা চলমান। রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে। চায়ের পট চাপিয়ে রাখা। চুলার পাশে দাঁড়িয়ে লাজুক। চেহারায় পরম স্বস্তি। আদুরে সোনালী রোদ মেখে রয়েছে চোখেমুখে। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো।

" উনি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছেন? "

প্রায় একঘন্টা হবে মানুষটা বাইরে বেরিয়েছে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে বলেছিলেন। এরমধ্যে চলে এলেন? হঠাৎই পুরনো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো দেহমনে। কেঁপে উঠলো চোখের পাতা। ভয়ের চোরাস্রোত বয়ে গেল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পুনরায় কলিংবেল বেজে উঠলো। আতঙ্কে ফ্যাকাশে হলো চেহারা। চুলা আস্তে করে বন্ধ করে দিলো সে। বাইরে বডিগার্ড রয়েছে। আল্লাহ্ ভরসা। সবটা তো ঠিক হয়ে গেছে। ধীরপায়ে মেইন দরজায় এগিয়ে গেল লাজুক। দরজা খুলতেই বিস্ময়ে, আনন্দে স্তব্ধ হয়ে গেল চোখের পলক!

" আসসালামু আ'লাইকুম ভাবী। সারপ্রাইজ! "

দরজায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে তন্বী। ইফরাত, তুহিন। লাজুক বিস্মিত চোখে তাকিয়ে! বিড়বিড় করে সালামের জবাব দিলো। তন্বী এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে। হুঁশ ফিরলো রমণীর। পাল্টা আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিলো সে।

" কেমন আছো তন্বী? "

আলিঙ্গন মুক্ত হলো তন্বী। একগাল হেসে বললো,

" ভালো আছি ভাবী। তোমার কি খবর গো? আমাদের তো একদম ভুলেই গেছো। "

লাজুক দরজা বন্ধ করে মুচকি হাসলো।

" কি যে বলো না তুমি? আপনজনদের ভোলা এতটাই সহজ নাকি? "

" কে জানে! দেবর মশাই তো আমাদের ভুলে দিব্যি নতুন সংসারে মজেছে। "

ইফরাতের কণ্ঠে অভিমান। লাজুক অনুধাবন করতে পারলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

" এখন তো সবটাই জানেন ভাবী। আপনার দেবর শখ করে এখানে পালিয়ে আসেননি। সবকিছুর পেছনে যথাযথ কারণ ছিল। "

আগত তিন অতিথি সোফায় বসলো। টেবিলের ওপর মিষ্টির প্যাকেট রাখলো তুহিন। আশেপাশে তাকিয়ে তুহিন দুষ্টু হেসে উঠলো,

" ভাবী এতবড় বাড়িতে একা নাকি? সাতসকালে ভাইয়া কোথায় গিয়েছে? "

" উনি একটু বেরিয়েছেন। আপনারা বসুন ভাইয়া। আমি আসছি। "

মিষ্টির প্যাকেট হাতে রান্নাঘরে গেল লাজুক। তন্বী উঠে দাঁড়ালো। বিমোহিত হয়ে দেখতে লাগলো লিভিংরুম। মাশাআল্লাহ্! এর আগে মামার মুখে কয়েকবার শুনেছে এই বাড়িটার কথা। শহরের দুই প্রান্তে মামা বিলাসবহুল দু'টো বাড়ি উপহার দিয়েছেন তার দুই ছেলেকে। এই বাড়িটা তানসীভ ভাইয়ার। কি সুন্দর বাড়িটা! আগে কখনো আসা হয়নি। আজ প্রথম আসলো তারা। তন্বী, ইফরাত কথা বলতে বলতে আশপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলো। কিছুক্ষণ বাদে ফিরে এলো লাজুক। হাতে নাস্তার ট্রে। পানি। টেবিলের ওপর ট্রে রাখলো সে।

" ভাবী, তন্বী কিছু মুখে নিন। ভাইয়া! "

তুহিন বললো,

" ব্যতিব্যস্ত হবেন না ভাবী। আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে এসেছি। রিল্যাক্স। "

" প্রথমবার এ বাড়িতে এসেছেন আপনারা। কিছু মুখে না নিলে আমার খারাপ লাগবে।‌"

" ওকে ওকে।‌ নিচ্ছি। আমাদের জন্য আপনার মন খারাপ হলে, শেষে ভাইয়া আমাদের গর্দান নেবে। "

দুষ্টুমি করলো তুহিন। তন্বী ভাইয়ের কথায় ভেংচি কাটলো। মুচকি হাসলো লাজুক। টুকটাক নাস্তা করলো ওরা। তন্বী, তুহিন দুই ভাই-বোন বাড়িটা ঘুরে দেখতে লাগলো। অপরদিকে একাকী স্পেস পেল ইফরাত, লাজুক। দু'জনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লিভিংরুমের খোলা অংশে। স্কাইলাইটের মতো খোলা, মনোরম এই স্থান। ইফরাত জানতে চাইলো,

" কেমন আছো? "

" এই তো আলহামদুলিল্লাহ্। বাড়ির সবাই কেমন আছেন? মা? "

" আছে সবাই আলহামদুলিল্লাহ্। সবটা সামলে উঠতে সময় লাগবে একটু। "

ইতিবাচক মাথা নাড়লো লাজুক। চুপ সে। ইফরাত আস্তে করে বললো,

" খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। ভেবেছিলাম ভাইয়ার জন্য তোমাকে বোধহয় চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। আল্লাহ্'র কাছে অশেষ শুকরিয়া। "

" ওসব কিছু আমি জানতাম না ভাবী। আমাকে জানানো হয়নি। আমি শুধু ভেবেছিলাম আল্লাহ্'র রহমতে বড় বিপদ থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু এসবের পেছনে যে কত বড় ষ'ড়যন্ত্র ছিল আমি কল্পনাও করতে পারিনি। "

" ভাইয়া যদি সময়মতো সবটা ট্যাকেল না দিতেন.. ইয়া আল্লাহ্! "

পুরনো দুঃস্মৃতি স্মরণ করে আঁতকে উঠলো ইফরাত। লাজুক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ভ'য়ঙ্কর এক কালবৈশাখী পিছু ফেলে এসেছে তারা। বাকি দিনগুলো রবের অশেষ রহমতে ভালো কাটুক। নির্বিঘ্নে কাটুক।

" এস.কে'কে তুমি চিনতে? "

" ভয়ানক দুঃস্বপ্ন হিসেবে চিনতাম। নামধাম, পরিচয়, তার ইনটেনশন সম্পর্কে জানতাম না। "

" তোমার ভাইয়ার কাছে শুনলাম লোকটা নাকি তোমার পেছনে পড়েছিল।‌ স্টক করতো। "

" জ্বি। মেন্টালি ডিস্টার্বড্ ছিল লোকটা। নিউজে যা কিছু জানলাম, ভাবতেই লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। লোকটা ভ'য়ঙ্কর টাইপের পি'শাচ ছিল। বহু মানুষের জীবন তছনছ করেছে। "

" আল্লাহ্ বড় বাঁচা বাঁচিয়েছেন। "

" আলহামদুলিল্লাহ্! "

কিছু সময় নীরবতা। উশখুশ করতে লাগলো লাজুক। তা লক্ষ্য করলো ইফরাত। নম্র কণ্ঠে বললো,

" যা বলার বলে ফেলো বোন। মনের মধ্যে চাপিয়ে রেখে বোঝা বাড়িয়ো না। "

" ভাবী.. কিছু মনে করবেন না। এতগুলো দিন ধরে মনের মধ্যে সবটা কিলবিল করছে। আপনার দেবরকে যে জিজ্ঞেস করবো সে উপায় নেই। উনি নিজের দুনিয়ায় লড়াইয়ে ব্যস্ত। "

" বলে ফেলো। "

আশ্বাস দিলো ইফরাত। লাজুক থেমে থেমে মৃদু কন্ঠে বললো,

" ভাইয়া আর উনি.. আপন ভাই নন? "

" না। "

বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। পুরনো ব্যথা জেগে উঠলো পুনরায়।

" এসব মানে.. আমি ভাবতেই পারছি না। "

ইফরাত চুপ।

" ওনাদের দুই ভাইয়ের মধ্যকার সম্পর্কে অদ্ভুত শীতলতা ছিল। এটা আগেই টের পেয়েছিলাম। তাই বলে এমনটা..? কল্পনাও করিনি। "

নিশ্চুপ শুনলো ইফরাত। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। লাজুক জড়িয়ে আসা কণ্ঠে বললো,

" ভাইয়ার মা। তিনি.. কোথায়? "

ইফরাত কিছু বলতে উদ্যত হলো ঠিক তখনই লিভিংরুম হতে ডেকে উঠলো তন্বী,

" ভাবী'স। তোমরা কোথায়? এদিকে আসো তো। "

লাজুক, ইফরাতের কথোপকথনে ব্যঘাত ঘটলো। ইফরাত ছোট জা'কে বললো,

" ডাকছে। পরে কথা হবে এ বিষয়ে। চলো। "

ইফরাত ধীরস্থির ভঙ্গিতে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। লাজুক ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। অস্থিরতায় বিপর্যস্ত মন।

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন