ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

২৯তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[২৯] [ প্রাপ্তমনস্কদের জন্য ]

অপরাধ জগতের অন্ধকার গলিতে সকলের র'ক্ত হিম হয়ে আসে তার নাম শুনে। শোভন খন্দকার ওরফে এস.কে। এস.কে নামেই পরিচিত আন্ডারগ্রাউন্ড ক্রাইম নেটওয়ার্কে। ' শ্যাডো ওয়ার্ল্ড ' এর গুরুত্বপূর্ণ এক পদে আসীন সে। জিনিয়াস হ্যাকার। আটত্রিশ বছর বয়সী এই অবিবাহিত ব্যক্তির বিকৃত মস্তিষ্ক সাধারণ মানুষের ভাবনাতীত। তার তৈরিকৃত কোড এবং সাইবার সিকিউরিটি যেন জনসাধারণের চোখে আস্ত এক গোলক ধাঁধা। বাঘা বাঘা ব্যক্তিরা সেই গোলক ধাঁধায় একবার ফেঁ'সে গেলে চিরদিনের জন্য শ্যাডো'র গোলাম হয়ে যায়। এস.কে ব্যতিত প্রতাপশালী অনেক রাঘববোয়ালরাও এই শ্যাডো ওয়ার্ল্ডের বঙ্গদেশীয় সিন্ডিকেটের অংশ। দেশীয় এই সিন্ডিকেটের সাইবার বিভাগ সামলায় এস.কে। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল কর্ম সম্পাদন করতে ডাক পড়ে তার। এস.কের অনৈতিক কার্যকলাপের পরিধি ছোটোখাটো কোনো অপরাধে কখনোই সীমাবদ্ধ ছিল না। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে দেশীয় সিন্ডিকেটের কোটি কোটি টাকার অবৈধ হুন্ডি নেটওয়ার্ক সামলাতো সে। বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, মন্ত্রী, আমলাদের গোপন ব্যক্তিগত ডেটা হ্যাক করে ব্ল্যাকমেইলের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল সে। বিদেশে অ'স্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার এবং ডার্ক সিন্ডিকেটের সমস্ত ক্রিপ্টোকারেন্সির ট্রানজ্যাকশন তার ওপর নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিতেন শ্যাডো ওয়ার্ল্ডের বর্তমান মহারাজ। শ্যাডো ওয়ার্ল্ডে নির্ভরযোগ্য, এক বিকারগ্রস্ত দক্ষ খেলোয়াড় ছিল এই শোভন খন্দকার ওরফে এস.কে। ডিজিটাল সার্ভেলায়েন্স ব্যবহার করে অগণ্য মানুষের জীবন তছনছ করে দিয়েছে সে। যেন অদৃশ্য-ভয়ানক কোডে জীবন্ত কবর দিয়েছে বহু মানুষকে।

-

রূপা আক্তার। বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাধারণ কর্মচারী। শ্যাডো ওয়ার্ল্ডের চতুর, সাহসী ইনফর্মার। সিধা সাদা রূপের অধিকারী সে। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে শ্যাডো জগতের এক ইনফর্মার হয়ে উঠেছে। একসময় পুলিশের ফাঁদে আটকা পড়লো রূপা। দিনের পর দিন মেন্টালি ব্রেইন ওয়াশ। ন্যায়, অন্যায়ের মধ্যকার দ্বিধা। অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে সত্যের পথে ফিরে এলো সে। হাত মেলালো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েকমাস ধরে শুধুমাত্র দু'টো ডার্ক ফাইল পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলো। ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি রূপা। সে যার সিস্টেমে হাত বাড়িয়েছে, সে আস্ত এক উ'ন্মাদ। রিয়েল-টাইম আইপি ট্র্যাক করে রূপার বেঈমানি ধরে ফেললো এস.কে। অসুস্থ, পৈ'শাচিক ক্ষো'ভে ফেটে পড়লো। বেঈমানির শা'স্তি কতখানি ভ'য়ঙ্কর হতে পারে, তা প্রমাণ করার এক আদিম খেলায় মাতলো।

অন্য সব দিনের মতো সেদিনটাও ছিল সাধারণ। রাতের বেলা। অফিস শেষে অটোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রূপা। কলিগরা ধীরে ধীরে সকলে চলে গিয়েছে। পথে আজ যানবাহন কম। কেমন ভয় ভয় হচ্ছে। হাঁটতে লাগলো রূপা। যদি সামনে গিয়ে কোনো অটো বা রিকশা পাওয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে তুলনামূলক নীরব, অন্ধকার পথে উপস্থিত হলো সে। সেখানেই অপেক্ষায় ছিল ঘোর বিপদ। ক্লোরোফর্ম দিয়ে অবশ করা হলো। নিখুঁতভাবে কিডন্যাপ করলো এস.কের পালিত বাহিনী। অচেতন রূপাকে নিয়ে যাওয়া হলো পুরনো ঢাকার এক পরিত্যক্ত টেক্সটাইল মিলে। সেখানে রূপার ওপর ধেয়ে এলো পা'শবিক, নরক যন্ত্রণা। রাতভর পালাক্রমে রূপার ছটফটে, র-ক্তাক্ত শরীরের ওপর শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন চললো। আরম্ভ করলো স্বয়ং এস.কে। শেষ করলো তার ছেলেরা। অকল্পনীয় যন্ত্রনায় জ্ঞান হারিয়ে ফেললো রূপা। প্রাণ পাখি তখনো ছিল। যখন এস.কে গ্লাভস পরিহিত হাতে ছু'রির বি'ভৎস চিত্রাঙ্কন করলো শরীর জুড়ে। হ'ত্যা করলো বর্বর রূপে। এখানেই সমাপ্ত নয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাসময়ে অন্ধকার এক রাতে বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচে ফেলে দেয়া হলো নিথর দেহটি। হাতে গুঁজে রাখা 'ইকুয়েডরিয়ান রোজ'। এস.কে কোনো সাধারণ খু"ন হিসেবে লুকাতে চাইলো না বিষয়টা। বরং পুরো দেশবাসী, পুলিশ প্রশাসন এবং তার সিন্ডিকেটের ভেতরকার শত্রুদের জন্য চরম, র'ক্তহিম করা নিদর্শন রেখে গেল। বেঈমানির শা'স্তি বড় ভ'য়ঙ্কর!

-

হাই প্রোফাইল পার্টি ছিল সে রাতে। আলো ঝলমলে আয়োজন। ম'দ্যপ পারভেজ হাওলাদার অসভ্যতা করার চেষ্টা করলো তানসীভ পত্নী লাজুকের সঙ্গে। ফলস্বরূপ হিং'স্র চিত্তে ঝাঁপিয়ে পড়লো তানসীভ। বেড়ধক পে'টালো। জনসম্মুখে বজ্রকণ্ঠে প্রাণনা'শের হুমকি দিলো। যথারীতি খবর পৌঁছে গেল এস.কের নিকটে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো পৈ'শাচিকতা। দাবার বোর্ডে মির্জা তানসীভ শাহ্'কে আজীবনের জন্য হারাতে, এরচেয়ে বড় সুযোগ মিলবে কি আর? শত্রুর শত্রু হয়ে উঠলো তার বড় হাতিয়ার। একক নিশানা।

অর্ধমৃ'ত অবস্থায় হাসপাতালে ভিআইপি কেবিনে ভর্তি পারভেজ হাওলাদার। হ্যাকিং দক্ষতা ব্যবহার করে সিসি ক্যামেরা আয়ত্তে নিয়ে নিলো। ছদ্মবেশে আহত পারভেজকে কিডন্যাপ করলো স্বয়ং এস.কে। কোনোরূপ ভুলচুক নয় এদফা। কিডন্যাপ করে পারভেজকে নিয়ে যাওয়া হলো সে-ই একই টেক্সটাইল মিলের টর্চার সেলে। ব্যক্তিগতভাবে পারভেজ হাওলাদারের সঙ্গে এস.কের কোনোরকম শত্রুতা বা লেনদেন ছিল না। পারভেজ তার কোনো ক্ষতি করেনি। শুধুমাত্র নিজ স্বার্থ হাসিল করার জন্য, তানসীভকে চিরতরে হটিয়ে ফেলার জন্য, পারভেজকে দাবার গুঁটি বানালো এস.কে। গোটা এক রাত চললো নি'র্মম নির্যাতন। রূপার মতো একই প্যাটার্নে হ'ত্যা করা হলো। লা'শ ফেলে রাখা হলো বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচে। শক্ত হয়ে আসা হাতে গুঁজে রাখা ফুল। বেশকিছু প্রমাণ অত্যন্ত সাবধানে, চতুরতার সহিত একে একে সাজানো হলো। ডাবল মা'র্ডার কেসে ফেঁ'সে গেল তানসীভ।

-

সিরিয়াল কি'লার সন্দেহে গ্ৰেফতার হলো মির্জা তানসীভ শাহ্। কোনোরূপ নাটকীয়তা নেই, নেই কোনো হাঙ্গামা। চুপচাপ হাজত বন্দী হলো সে। প্রসন্ন হলো এস.কে। নগণ্য ভেবে তাচ্ছিল্য করে বসলো প্রতিপক্ষকে। তবে তানসীভ শাহ্ কোনো ছোটোখাটো সাধারণ ছিঁচকে অপরাধী নয়। তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক জানিয়ে দিলো, সামথিং ইজ রং। কেউ খুব নিখুঁতভাবে ফাঁ'সাচ্ছে তাকে। খেলছে এক ভ'য়ঙ্কর খেলা। হাজত বন্দী অবস্থায় প্রথম চাল দিলো তানসীভ। অন্ধকার এক রাতে চুপিসারে সেলের কাছে এলো কনস্টেবল। সকলের অগোচরে নিজের বাটন মোবাইল তুলে দিলো তানসীভের হাতে। বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করলো না মানুষটি। কল করলো বিশ্বস্ত সঙ্গী নিজামকে। আইটি এক্সপার্ট বন্ধুকে যথাযথ নির্দেশনা দিলো। সে-ই মোতাবেক চটজলদি কাজে লেগে পড়লো নিজাম।

নিজামের ডিকোড করা কয়েকটি অকাট্য পাল্টা প্রমাণ এবং সিসিটিভি হ্যাকিংয়ের র-ফাইল সুনির্দিষ্ট একটা আইনি নথিতে সাজানো হলো। মধ্যরাতে অজ্ঞাত পরিচয়ে পার্সেল হিসেবে পৌঁছে গেল ব্যারিস্টার আশফাক আহমদের বাসভবনে। তিনি আগে থেকেই সন্দেহ করছিলেন। এবার হাতে মিললো কিছু চমৎকার প্রমাণ।‌ আইন মৌখিক জবানে বিশ্বাসী নয়। প্রমাণে বিশ্বাসী। রাতভর সকল প্রমাণ খুঁটিনাটি চেক করলেন আশফাক আহমদ। নিশ্চিত হলেন প্রমাণ সত্য। কারচুপি নেই কোনো। অবশেষে আদালতে প্রথম শুনানির তারিখ পড়লো। আত্মবিশ্বাসের সহিত আদালতে হাজির হলেন তিনি। প্রথম শুনানীতে ছোটোখাটো ধামাকা সৃষ্টি হলো। স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো বিচারালয়। শর্তসাপেক্ষে মির্জার জামিন মঞ্জুর করালেন তিনি। হলো নাটকীয় এক প্রত্যাবর্তন!

-

আন্তর্জাতিক ক্রাইম সিন্ডিকেট ' শ্যাডো ওয়ার্ল্ড '। ভ'য়ঙ্কর এর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-কানুন, পরিচালনা ব্যবস্থা। অলিখিত এক কঠোর নিয়ম রয়েছে এই পা'পিষ্ঠ জগতের। প্রতি চার বছর পরপর গোপন ব্যালট, ক্ষমতার প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুন ‘মহারাজা’ নির্বাচিত হয় এখানে। পুরো সিন্ডিকেটের সমস্ত অর্থ, হুন্ডি নেটওয়ার্ক, অ'স্ত্র চোরাচালান এবং অবৈধ ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকে সেই মহারাজার হাতে। বঙ্গদেশীয় সিন্ডিকেটেও আন্তর্জাতিক জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্বাচন হয়। আসন্ন সেই মহা-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী বছর। বর্তমানে সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় এবং ভ'য়ঙ্কর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন তানসীভের প্রতাপশালী পিতা মির্জা জহুরুল শাহ্ এবং সিন্ডিকেটের বর্তমান রাজা ইলিয়াস সাহেব। এককালে ব্যবসায়ীক পার্টনার ছিলেন তারা। ধীরে ধীরে সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠলেন একে অপরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী। র'ক্তপিপাসু শত্রু।

সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ ভোট, অফশোর ব্যাংক ব্যালেন্স এবং আন্তর্জাতিক লবিংয়ের দিক থেকে আগামী নির্বাচনের জন্য এখন অবধি স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে মির্জা জহুরুল শাহ্। জহুরুল সাহেবের এই অপ্রতিরোধ্য উত্থানে সিংহাসন হারানোর ভয়ে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন বর্তমান রাজা ইলিয়াস সাহেব। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন জহুরুল সাহেবকে সোজা পথে দমানো অসম্ভব। ফলস্বরূপ ওনাকে নির্বাচন থেকে সরানোর জন্য এক পৈ'শাচিক, কুৎসিত ষ"ড়যন্ত্রের ছক আঁকলেন ইলিয়াস সাহেব। সেই ম-রণঘাতী ষ'ড়যন্ত্রের ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব দেওয়া হলো ওনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী, সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান ডিজিটাল হাতিয়ার এস.কে'কে। জহুরুল সাহেবের মূল শক্তি টাকা কিংবা ক্ষমতা নয়। বরং ওনার কনিষ্ঠ পুত্র মির্জা তানসীভ শাহ্। পর্দার অন্তরালে থেকে বাবার গোটা সাম্রাজ্য একা হাতে সামলায় সে। ফলস্বরূপ এই ভয়াবহ ষ'ড়যন্ত্রের প্রথম এবং প্রধান টার্গেট করা হলো তানসীভকে।

এস.কের মিশন ছিল বেশ সুস্পষ্ট। তানসীভকে যদি কোনোভাবে ফাঁ'সানো যায় তবে চিরতরে শেষ হয়ে যাবে সে। মানসিকভাবে একদম পঙ্গু, নিঃশেষ হয়ে যাবেন জহুরুল সাহেব। একবার উনি শেষ হয়ে গেলে, আগামী নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করবেন ইলিয়াস সাহেব। একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করবেন শ্যাডো ওয়ার্ল্ডে।

-

তানসীভকে ফাঁ'সানোর পেছনে শুধুমাত্র মহারাজের প্রতি আনুগত্য ছিল না। ছিল ব্যক্তিগত, বিকারগ্রস্ত প্রতিশোধের আগুন। একই সিন্ডিকেটের সদস্য তারা। ক্ষমতার লড়াই, প্রতিপক্ষ হিসেবে যথেষ্ট কারণ ছিল শত্রুতার। দিনের পর দিন সুক্ষ্ম ষ'ড়যন্ত্রের জাল বুনে আসছিল এস.কে। বিভিন্নভাবে ফাঁদ পাতছিল তানসীভের বিরুদ্ধে। কুপোকাত করতে চাচ্ছিল অনৈতিক পন্থায়। গতবছর ঝড়বৃষ্টির এক রাতে, গোপন আস্তানায় প্রথমবারের মতো সশরীরে মুখোমুখি হয়েছিল মির্জা তানসীভ শাহ্ এবং এস.কে। মুখোমুখি হয়েছিল দুই বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিষ্ক। সে রাতে এস.কের ডিজিটাল হ্যাকিং বা কোডিং কাজে আসেনি কোনো। তার আগেই বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তানসীভ। বেড়ধক মে'রে র'ক্তাক্ত করে দিয়েছিল। বাঁ হাতে ফ্র্যাকচার হয়েছিল এস.কের। কর্কশ শব্দে তাচ্ছিল্যের সহিত বলেছিল তানসীভ,

' স্ক্র্যা'উন্ডাল। '

সেই ভয়ংকর মা'র, নিজস্ব পৈ'শাচিক অহংকার ধুলোয় মিশে যাওয়া। চরম অপমানের দগদগে ক্ষোভ-ক্ষত প্রতিটি সেকেন্ডে রয়ে গেছে এস.কের বিকৃত মনে। যেকোনো মূল্যে তানসীভকে নিঃশেষ করে দেয়ায় কুৎসিত কামনায় কাটতে লাগলো দিনরাত। অবশেষে মিললো সুবর্ণ সুযোগ। বাস্তবায়িত হলো ষ'ড়যন্ত্রের ভয়াবহ রূপ।

-

প্রতিশোধের আগুন তখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। একদা একদিন আশ্চর্যজনক খবর মিললো। পবিত্র বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে মির্জা তানসীভ শাহ্। তানসীভের মতো পা'ষাণ, হৃদয়হীনের জীবনে কার আগমন হলো? নিজের জীবনে কোন নারীকে স্থান দিয়েছে সে? নোংরা মস্তিষ্কে এক নতুন জঘ'ন্য খেলার রসদ জোগালো এস.কে। শত্রুর সবচেয়ে প্রিয় এবং সুন্দর জিনিসের ওপর আঘাত করার চেয়ে বড় প্রতিশোধ আর কী হতে পারে? তানসীভ পত্নী লাজুক নূরাইনের পুরো লাইফ হিস্ট্রি, বায়োডাটা বের করা ছিল তার বাঁ হাতের খেল। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের সকল খবরাখবর হাতের মুঠোয় চলে এলো। এলইডি মনিটরে ভাসছে একে একে লাজুকের ছবিগুলো। এস.কের বিকারগ্রস্ত চোখ জোড়া হঠাৎ থমকে গেল লাজুকের কৈশোরের এক সাধারণ, নিষ্পাপ ছবির ওপর। সেই ছবিতে লাজুকের সরলতা, নিষ্কলুষতা দেখে এস.কের বি'ষাক্ত মন জঘন্য কামনায় কিলবিল করে উঠলো। স্ক্রিনে লাজুকের ছবির গালে নিজের আঙুল ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বিড়বিড় করতে লাগলো এস.কে। মেয়েটির পবিত্র, শান্ত রূপ ধীরে ধীরে রূপ নিলো এক বিকারগ্রস্ত ম্যানিয়ায়। লাজুককে নিজের করে পাওয়ার কুৎসিত, বিষা'ক্ত আসক্তি গ্ৰাস করে ফেললো তাকে।

আরম্ভ হলো নিবিড়, নিঃশব্দ নজরদারি। লাজুকের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে ফলো করতে লাগলো এস.কে। নিজ অহমিকা ভঙ্গ করে কালো গাড়িতে করে বারকয়েক পিছু নিলো। স্বচক্ষে দেখে ভাবনাতীত ঘোর আরো গাঢ় হলো। নামহীন জোরালো অধিকারবোধ জন্মালো মনে। নিজের এক বিশ্বস্ত লোক নিযুক্ত করলো লাজুকের পেছনে। লাজুকের লাইভ লোকেশন, তার দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আপডেট পৌঁছাতে লাগলো এস.কের নিকটে। পথেঘাটে কিংবা সরাসরি বাড়িতে ফুল প্রেরণ। চিরকুট প্রেরণ। দিবারাত্রি বুনতে লাগলো কুৎসিত পরিকল্পনার জাল। একটিবার মির্জা আউট হলেই লাজুক নূরাইন হয়ে যাবে তার। শয্যা সঙ্গিনী করে পি'ষে ফেলবে সমস্ত কোমলতা। বিদঘুটে , বি'শ্রী লালসায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো দেহমন। এস.কে নোংরামির দুনিয়ায় এতখানি মত্ত হয়ে গিয়েছিল যে ভুলে বসেছিল তার প্রতিপক্ষ ঠিক কে। মির্জা তানসীভ শাহ্! সাধারণ কোনো গু'ণ্ডা, বদমাশ নয় সে। তুফানের বেগে আঘাত হানে এস.কের পরিকল্পনায়।

স্বল্প দিনের মধ্যেই প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন তানসীভ টের পেয়ে গিয়েছিল অজ্ঞাত আগন্তুকের বিষয়ে। কেউ দিবারাত্রি তার স্ত্রীর ওপর নজরদারি করছে, অথচ টের পাবে না সে? অসম্ভব! অল্প সময়ের মধ্যেই অজানা আগন্তুকের বেশে এস.কের অস্তিত্ব ধরা দিলো। সবটা জেনেও ঠান্ডা মাথায় শত্রুকে নিজের পাতা ফাঁদেই খেলার সুযোগ দিলো তানসীভ। এস.কে লাজুকের জীবনে ঠিক ততখানি পৌঁছাতে সক্ষম হলো, যতখানি চতুরতার সঙ্গে অ্যালাও করলো সে। শত্রুকে তার নিজের তৈরিকৃত কাল্পনিক বিজয়ের ভ্রমে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে রাখলো মানুষটি। দিনরাত লাজুকের ওপর নজরদারি চলছিল। অন্যদিকে শত্রুকে বিভ্রান্ত করে তানসীভ নিজের চাল দিলো। গুছিয়ে নিতে লাগলো জোরালো ধ্বং'সাত্মক পরিকল্পনা। এস.কের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, হুন্ডি নেটওয়ার্ক, রিয়েল আইপি-র ব্যাক-এন্ডে ধীরে ধীরে পৌঁছাতে সক্ষম হলো। রাতারাতি কিছুই হয়নি কিন্তু। দীর্ঘদিনের তুখোড় বুদ্ধিসম্পন্ন, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ছিল এস.কের বিনাশ। তানসীভ এমনভাবে দাবার বোর্ডে নিজ গুটিগুলো সাজিয়ে নিলো যে এস.কে চেকমেট দিতে গিয়ে হতভম্ব! অজ্ঞাতসারে বাঘের হা করে রাখা মুখগহ্বরে, নিজ মাথা ঢুকিয়ে ফেলেছে সে। ধ্বং'স বোধহয় এবার অবধারিত।

-

তানসীভকে হারানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা অন্তরে। স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলো ভ'য়ঙ্কর ফেক অডিও রেকর্ড। পারভেজ হাওলাদারকে খু'নের নির্দেশনা দিচ্ছে তানসীভ। এমনটাই সে অডিওতে। মানুষটাকে আইনী এবং মানসিকভাবে চরম হয়রানিতে ফেললো এস.কে বাহিনী। বিপরীতে তানসীভ শাহ্ এমন পাল্টা চাল দিলো, যা এস.কের দূরতম কল্পনায়ও ছিল না। তার বিশ্বস্ত এক ইনফর্মার এবং দেশের জনপ্রিয় একটি নিউজ চ্যানেলের মিডিয়া ম্যানেজার। এক ধাক্কায় দু'জনকে ফাঁ'সিয়ে দিলো তানসীভ। ভাইরাল হলো ফেক এ.আই ভিডিও ক্লিপ। টিট ফর ট্যাট। এ.আই-র বিপরীতে এ.আই। কাজে দিলো মাস্টারপ্ল্যান। অতঃপর একে একে হলো চাল, পাল্টা চাল। দাবার বোর্ডে ভয়ানক খেলা জারি রইলো। অতঃপর বুড়িগঙ্গা তীরে এক বি'ধ্বংসী রাতে এস.কে উপলব্ধি করতে পারলো। তানসীভের তৈরিকৃত ভ'য়ঙ্কর, নিরেট, অভেদ্য ম'রণফাঁদে নিজে এসে আটকা পড়েছে সে। সমস্ত অহংকার, কুৎ'সিত লা'লসা এমনকি প্রাণটাই শেষমেষ হারালো সে। নিথর দেহ লুটিয়ে পড়লো জমিনে। অবসান ঘটলো শহরের বুকে চলমান এক দীর্ঘ অভিশপ্ত অধ্যায়ের।

•

রাত প্রায় নয়টা। আশুলিয়া। দোতলা বাড়ির ছিমছাম বারান্দা। মনোমুগ্ধকর-মায়াবী চাদরে আচ্ছাদিত! মেঝেতে কাঠের তক্তা। তার ওপর পাতানো একখানা পাটি। বারান্দার রেলিং, কোণার স্তম্ভ বেয়ে ওপরে উঠে গেছে সবুজ লতানো গাছ। যার গা বেয়ে জড়িয়ে আছে একরাশ ছোট ছোট হলদে আলোর টুনি বাতি। উষ্ণ আলোর মৃদু আভা। ঝুলন্ত টবের সবুজাভ মেলা। চারপাশের অন্ধকারকে বড্ড আদুরে করে তুলেছে। দূরে দেখা যাচ্ছে নিঝুম শহরের টিমটিমে আলো। বারান্দার মায়াবী সে আলোয় ঝুলে আছে ম্যাক্রেম স্টাইলের বড় দড়ি বোনা দোলনা। কয়েকটা নরম কুশনের সান্নিধ্যে উদাস মনে বসে রয়েছে লাজুক। দোলনা আলতো করে দুলছে। দুলছে লাজুকের মন তীব্র এক অভিমানে। আজকের দিনটা কেটেছে বেশ কোলাহলে। ইফরাত, তন্বী, তুহিন ছিল সারাদিন। রায়হান এসেছিল বিকেল নাগাদ। বহুদিন পর সকলের সান্নিধ্যে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এসবের ভীড়ে চাতক পাখির ন্যায় আকাঙ্ক্ষিত মানুষটির প্রত্যাশায় ছিল লাজুক। সে-ই যে সাতসকালে জরুরী কাজের বাহানায় বের হলো, দিনভর নিখোঁজ সে। বিকেল নাগাদ কোনোমতে যোগাযোগ হয়েছিল। মায়া জড়ানো স্বরে তাড়াতাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ করলো লাজুক। তবুও এলো না পা'ষাণ লোকটা। মেহমান চলে গিয়ে এখন বাজে রাত নয়টা। অভিমানের তোপে রমণীর চোখে অশ্রু জমলো। লাল বর্ণ ধারণ করলো চেহারা। চুপটি করে দোলনায় হেলান দিয়ে দোল খেতে লাগলো। বুকের মাঝে ঝড়ো হাওয়া।

অতিবাহিত হলো কিছু সময়। মেঝেতে পরিচিত শব্দ। আপন মানুষটার উপস্থিতি। আস্তে করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো লাজুক। দোলনা হতে নামলো না সে। না তাকালো স্বামীর দিকে। ধীরপায়ে এগিয়ে এলো তানসীভ। বাইরের পোশাক ছেড়ে ফ্রেশ হয়েছে সে। পড়নে ওভারসাইজড্ স্লিভলেস ম্যান'স্ টপ। কুশন গুলো একটুখানি সরিয়ে অতি সন্নিকটে বসলো মানুষটা। স্বামী সান্নিধ্যে উষ্ণতায় কেঁপে উঠলো লাজুক। তবুও পাথরের ন্যায় অনড় রইলো। কিছুক্ষণ নীরবতা। গম্ভীর, মোলায়েম স্বরে বলে উঠলো তানসীভ,

" রাগ হয়েছে? "

জবাব দিল না রমণী। দোলনার দড়ি আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। তাকিয়ে রইলো নিচের পাটিতে। তানসীভ ধীরস্থির ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিলো। লাজুকের নরম হাতের ওপর নিজের শক্ত, রূক্ষ হাতটা রাখলো। আলতো করে আঙুল বুলিয়ে দিতে লাগলো হাতের উল্টো পিঠে। চেষ্টা করলো স্ত্রীর আদুরে অভিমান ভাঙানোর। মা'দকাচ্ছন্ন কণ্ঠে আস্তে করে ডেকে উঠলো,

" নূর! "

কেঁপে উঠলো সর্বাঙ্গ। তরঙ্গ বয়ে গেল হৃদয়ের অলিগলি। অভিমানে কম্পিত স্বরে বলে উঠলো লাজুক,

" ডাকবেন না ও নামে। "

" কেন? "

" আপনি.. খারাপ। ভালো নন। "

" কখনো ভালো ছিলাম কি? "

ত্যাড়াবাঁকা কথাবার্তা। ঠোঁট ভেঙে কান্না এলো রমণীর। অস্ফুট স্বরে বললো সে,

" খুব খুব খারাপ আপনি। "

" সময়মতো আসিনি বলে এত অভিমান? "

মাথা একটুখানি নুয়ে স্ত্রীর ক্রন্দনরত মুখ দেখার চেষ্টা করলো তানসীভ। কিন্তু আবেগী রমণী অপরদিকে ঘুরে মুখ লুকানোর চেষ্টা করে চলেছে। মোক্ষম অ স্ত্র ব্যবহার করলো এবার মানুষটা,

" হাতটা ব্যথা করছে। অনেকক্ষণ বাইক চালিয়েছি আজ।"

শুনিয়ে শুনিয়ে উদাসীন ভঙ্গিতে বললো তানসীভ। ব্যস কাজ হলো এবার। উদ্বেগের সহিত তৎক্ষণাৎ ঘুরে তাকালো লাজুক। চোখ গেল স্বামীর হাতে। নিমিষেই ধক করে উঠলো বুকের ভেতর। সে রাতে বুড়িগঙ্গায় প্রাণনা'শক লড়াইয়ে বেশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে মানুষটা। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। আঘাতের কালশিটে দাগ কোথাও কোথাও এখনো দৃশ্যমান। ডক্টর সাবধানে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।‌ রেস্ট করতে বলেছেন। ডান হাতে সামান্য ফ্র্যাকচার। নিজের যত্ন নেয়ার বদলে শরীরকে আরো যন্ত্রনা দিচ্ছে সে। মন মর্জি মতো চলছে। বউয়ের কথায় দু দণ্ড শান্তিতে থাকে না একটু। সেকেন্ডের মধ্যে গলে গেল রমণীর অভিমানের মেঘমালা। ব্যাকুলতার সহিত স্বামীর কাছে চেপে বসলো লাজুক। ব্যথিত হাতে আদুরে পরশ বুলিয়ে দিতে লাগলো। ভেজা, আকুল স্বরে বললো,

" নিজের ব্যাপারে আপনি এত নির্বিকার কেন? হ্যাঁ? আমার একটা কথাও শুনবেন না বলে পণ করেছেন? আঘাতে আঘাতে এই আমাকে র-ক্তাক্ত করে খুব আনন্দ পান? "

সহসা সঙ্গিনীর কোমর জড়িয়ে তাকে নিজ চওড়া, শক্ত বুকে টেনে নিলো তানসীভ। মায়াবী আলো-ছায়ার মাঝে একটুখানি দুলে উঠলো দোলনা। লাজুকের চুলে মুখ গুঁজে দিলো তানসীভ। কাঁপলো রমণীর দেহমন। ফিসফিস করে বললো মানুষটা,

" তোমায় আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করার আগে নিঃশেষ হয়ে যাক প্রাণবায়ু।‌ তবুও আমার নূরের কোমলতায় একবিন্দু আঁচড় না লাগুক। "

ঠোঁটের ওপর আলতো করে রাখলো তালু। নরম হাতের তালুতে থেমে যাওয়ার আকুলতা। সিক্ত স্বরে বললো লাজুক,

" দয়া করে থামুন। আর কিচ্ছুটি শুনতে চাই না। অলুক্ষণে কথাগুলো কি করে বলছেন আপনি? একটুও মায়া দয়া হলো না? "

ফিচেল হাসলো তানসীভ।‌ স্ত্রীকে নিবিড়ভাবে বাহুডোরে আগলে নিলো।‌

" নির্দয় আমি। জানো না? "

" ভুলে গেছি।‌ "

" ভুলোমনা হলে চলবে? "

বুকের মাঝে আহ্লাদে বিড়ালের ন্যায় মিশে গেল লাজুক। শিশুসুলভ মায়াবী কণ্ঠে বললো,

" আমি কিন্তু এখনো রেগে আছি।‌ "

" কথা বলছো তো।‌ "

" দায়সারা। মন থেকে বলিনি। "

" মন থেকে বলানোর জন্য কী করণীয়? "

বুকের বাঁ পাশে নাকমুখ ঘঁষে দিয়ে,

" জানি না। "

" কষ্ট পাচ্ছি কিন্তু। "

" নির্দয় মানুষ কষ্ট পায় না। আমাকে এখন একটু আরাম করতে দিন। "

" করছো তো। "

" আপনি ডিস্টার্ব করছেন। শশ্! "

ঠোঁটের কোণে স্বস্তির আভা ছড়িয়ে পড়লো। স্ত্রীকে আরেকটু আদুরে ভঙ্গিতে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিলো তানসীভ। দেহ এলিয়ে দিলো দোলনায়। শান্ত রাতের মনোরম পরিবেশ। বাতাসে ছড়িয়ে হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর!

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন